সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘আবার শুয়ে পড়েছে।'
'থাক শুয়ে। রোজ অফিসে বেরবার আগে নেকামি আমার ভালো লাগে না। আমাকে খেটে খেতে হয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করতে হয়।'
'আমিও কিছু বসে বসে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে গোঁফে তা মেরে খাই না। তোমার ইঞ্জিনে রোজ আমাকে ফুয়েল ঢালতে হয়।'
'সারাদিন তুমি বিশ্রাম পাও। দুপুরে একটু গড়াতে পারো। সারাদিন আমাকে চরকি পাক মারতে হয়। সে খবর রাখো?'
জপের মালা কপালে ঠেকিয়ে মৃণালিনী বারান্দার কোণ থেকে বললেন, 'কেন ঝগড়া করিস খোকা? বউমা সারাটা দিন বাড়ি মাথায় করে রাখে।'
'মা, যে বাড়ি মাথায় করে রাখে সে এই সামান্য কাজটুকু পারে না।'
'ওটা সামান্য নয় বাবা। ওই লগবগে জিনিস তুমি ছাড়া কে খাড়া করবে?'
'কোন রাসকেল, রোজ রোজ ওটাকে শুইয়ে দিচ্ছে?'
মৃণালিনী জিভ কেটে বললেন, 'ছি: ছি: রামের বাহনকে ইংরেজি গালাগাল দিসনি বাবা।'
'রামের বাহনের নিকুচি করেছে। লঙ্কায় যা করেছ, করেছ, এটা পশ্চিমবঙ্গ।'
তাপস দুম দুম করে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। স্ত্রী ছায়া চলল পেছন পেছন। জানে তাপসের একার মুরোদে কুলোবে না। সাহায্য করতেই হবে। মুখপোড়া হনুমান। হনুমানকে মুখপোড়া বলে ফেলেই টুক করে কপালে হাত ঠেকাল। রাম আর হনুমান দুজনেই সমান পূজনীয়। উত্তর ভারতে মহাবীর মন্দিরে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত।
টিভির এরিয়াল ছাদে ত্রিভঙ্গমুরারী হয়ে শুয়ে আছে। প্রায় ফুট ছয়েক লম্বা ডাণ্ডার মাথায় অ্যালুমিনিয়ামের পাখনা, ছাদ থেকে ছবি ধরে নীচের ওই বাক্স যন্ত্রের পর্দায় চালান করে। মুক্ত বাতাসে উদার পরিবেশে এসে তাপসের মেজাজ নরম হয়ে গেল। নীল শাড়িতে ছায়াকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে। বেশ একটু প্রেম প্রেম ভাব আসছে। হনুমানের মুখের সঙ্গে স্ত্রীর মুখ মনে মনে একবার মিলিয়ে নিল। কীসে আর কীসে? চাঁদে আর চাঁদমালায়। স্বভাবে সামান্য মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও চেহারায় আকাশ পাতাল ফারাক।
তাপস স্ত্রীকে প্রশ্ন করলে, 'তোমার হনুমান সব ছেড়ে এই টিভি অ্যান্টেনা নিয়ে পড়েছে কেন বলতে পারো? এটাকে কি দশানন রাবণ ভেবেছ? না, তোমাকে ভেবেছে অশোক কাননে সীতা!'
'তোমার হনুমান বোলো না। হনুমান তোমারও নয় আমারও নয়। তাকিয়ে দ্যাখো কোনও ছাদে অ্যান্টেনা নেই। সব ধরাশায়ী।'
'কোথা থেকে মালেরা এলো বলো তো!'
'মাল আবার কী, মাল, যত বাজারে ভাষা! হনুমান কবে থেকে মাল হল। সেদিন মায়ের সামনে তুমি আমাকেও মাল বলেছ।'
বুদ্ধিসুদ্ধি যাদের কম তাদেরকেই মাল বলে। এমন কিছু খারাপ কথা নয়। নাও হাত লাগাও। এখনও আমার অনেক কাজ বাকি। তোমার ওই হনুমানের জন্য চাকরিটা এবার আমার যাবে।
লকপক লকপক করে অ্যান্টেনা ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। ওপরের পক্ষবিস্তারে বাতাস ধরে দুজনকেই টাল খাইয়ে দিচ্ছে। ছায়ার ভীষণ হাসিরোগ। এবার কোনও কারণে হাসতে শুরু করলে আর থামতে চায় না। হাসলে শরীরের জোর কমে যায়।
তাপস বিরক্ত হয়ে বললে, 'শুধু শুধু হেসে মরছ কেন? ঠিক করে ধরো।'
বাতাসে ছায়ার চুল উড়ছে। শাড়ি এলোমেলো করে দিচ্ছে। তাপসের ভীষণ ভালোবাসা পাচ্ছে। ছায়ার এই বিরহী চেহারা তাকে উন্মনা করে দেয়! বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয়। মনে হয় জন্ম-জন্মান্তর বেঁচে থাকে।
ছাদের আলসের এক পাশে হুক দিয়ে জ্যাম করা ছিল। হনুমান হুকটুক সব খুলে নামিয়ে দিয়েছে। হুক লাগাবার ক্ষমতা তার নেই। মিস্ত্রি ডাকতে হবে। জিনিসটা আগে আবিষ্কার করলে কষ্ট করে খাড়া করার দরকার হত না।
তাপস বললে, 'নাও আবার আস্তে আস্তে শুইয়ে দাও। এ আর তোমার আমার ক্ষমতায় হবে না। মিস্ত্রি চাই।'
অ্যান্টেনা আবার শুয়ে পড়ল। ছায়া বললে, 'আজ চিত্রমালা ছিল গো! সব মাটি হয়ে গেল।'
'মাটি হয়ে গেলে আমি আর কী করতে পারি বলো। হনুমান সামলাতে পার না। নিজের হনুমান এলে কী করবে?'
'যা:' বলে ছায়া চটাস করে চড় মারল।
পাশের বাড়ির তিন তলার চিলের ছাদ থেকে মলয় বললে, 'আগে কাজ তারপর মারামারি।'
ছায়া ছুটে নীচে নেমে গেল। মলয় তাপসের বন্ধু। মলয়দের এরিয়াল হনুমানে কেতরে দিয়ে গেছে। একেবারে শুইয়ে দেয়নি।
তাপস হেঁকে বললে, 'কী আজ বেরোবি না?'
'বেরবো।'
'আমাদেরটা একেবারে শুইয়ে দিয়ে গেছে ভাই। হুকফুক সব ছিটকে বেরিয়ে গেছে।'
'যাও এখন লোক ডেকে আনো। একে বলে আধুনিক ব্যাধি। যবে থেকে এই যন্তর বাড়িতে ঢুকেছে সেইদিন থেকে জীবনের শান্তি চলে গেছে।'
ছ'ফুট লম্বা এরিয়েল দণ্ড তার সাজপোশাক নিয়ে ছাদে শুয়ে রইল।
তাপস বেরোবার সময় বউকে বললে, 'একসময় তো প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে। ছপটি মেরে অনেক বাঁদরকেই তো সামলাতে। আজ দুপুরে ওটাকে একটু চোখে চোখে রাখো, নয়তো একটা একটা করে পাঁজর খুলে নিয়ে চলে যাবে।'
'এই ভাদ্রমাসের রোদে সারা দুপুর আমি ছাদে বসে থাকব!'
'কেন বড়ি হলে কী করতে। বেনারসী হলে কী করতে! আচার হলে কী করতে!'
আর কথা বাড়াবার সময় নেই। তাপস ঝড়ের বেগে স্টপেজের দিকে ছুটল।
দুপুরের দিকে ছায়ার একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। একটু আগে তাপসের এক সেট প্যান্টজামা ইস্ত্রি করেছে। নিজের একটা শাড়ি ইস্ত্রি করেছে। যখন শুয়েছিল তখন বিদ্যুৎ ছিল, এইমাত্র লোডশেডিং হয়ে গেল। চলমান পাখা ধীরে ধীরে থেমে আসছে। পাশের ঘরে মা বলছেন, 'মুখপোড়ারা জ্বালিয়ে খেলে।'
আধো নিদ্রা আধো জাগরণে ছায়া শাশুড়ির গলা শুনতে পেল। গুমোট গরমে আর শুয়ে থাকা যাবে না। উঠতেই হবে। পাঁচ মিনিট আগে আর পাঁচ মিনিট পরে। শরীর শিথিল হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। চোখ আটকে আছে সিলিং-এ। পাখা সম্পূর্ণ অনড়। ভেন্টিলেটার দিয়ে টি ভি এরিয়ালের কালো তার ঢুকেছে। দেওয়াল বেয়ে নেমে এসে কোণের দিকে টি ভি'র পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
তারটা হঠাৎ নেচে উঠল।
বাতাস নেই তার নাচছে কেন?
ছায়া উঠে বসল। এরকম তো কোনও দিন হয় না। তারের বাড়তি অংশ টিভি'র পেছনে আলগা হয়ে ঝুলছিল। সড়সড় করে ওপর দিকে উঠে গেল। কেউ বাইরে থেকে টানছে। টানের বেশ জোর আছে। টিভিটা স্ট্যান্ড থেকে উলটে পড়ে যাওয়ার মতো হল।
ছায়া চড়াক করে লাফিয়ে উঠে টিভিটা চেপে ধরে এরিয়েলটা খুলে দিল। প্লাগ সমেত তার সড়সড় করে ওপর দিকে উঠতে উঠতে ভেন্টিলেটারে আটকে গেল।
ম্যাজিক। যাদুকর পি সি সরকার পরলোকে। তবু ম্যাজিক।
প্লাগটা নীচে পড়ে গেল। তারটা বাধামুক্ত হয়ে সুড়ুৎ করে ভেন্টিলেটার গলে বাইরে চলে গেল।
কার কাজ? তবে কি এরিয়েল খাড়া করতে মিস্ত্রি এসেছে।
ছায়া ঘরের বাইরে এসে মাকে জিগ্যেস করল, 'হ্যাঁ মা ছাদে কি মিস্ত্রি এসেছে?'
'কই না তো?'
'তা হলে?'
'তা হলে কী?'
ছায়া তরতর করে ছাদে উঠে গেল। উঠতে উঠতে মনে হল, একা নয়, মিস্ত্রি সদলে এসেছে। সারা ছাদ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
ছাদে এসে চক্ষুস্থির। বড় ছোট মাঝারি গোটা সাতেক নধরকান্তি হনুমান কাজে লেগে গেছে। এরিয়াল সন্ধিপদ প্রাণী। অনেক তার গাঁট। হনুমানের ইঞ্জিনিয়ারিং-এ সব খুলে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন অংশের এক একটি এক এক জনের কাঁধে। একটাকে চেহারা দেখে মনে হল বীর। সেটা সর্বাঙ্গে তার জড়িয়ে আলসের ওপর ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে আছে।
কোমরে আঁচল জড়িয়ে 'তবে রে মুখপোড়া' বলে এগিয়ে যেতেই বেশ প্রমাণ মাপের স্ত্রী হনুমানটি দ্রুত এগিয়ে এসে ছায়ার গালে সপাটে একটি চড় বসিয়ে দিল।
চড় খেয়ে চড় হজম করার মেয়ে ছায়া নয়। এত বড় অপমান। সেও সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিল। এ তো আর ত্রেতা নয়। ঘোর কলি। এইপ্রকার চড়ের জন্যে হনুমান সুন্দরী প্রস্তুত ছিল না। সে তার মাতৃভাষায় দলবলকে এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে আহ্বান জানাল। বীর হনুমান নিজের কায়দায় নিজেকে অকেজো করে বসে আছে। এরিয়েলের প্যাঁচ মেরে অসহায়। সে হুপ-হাপ করে ডাকতে লাগল। বাকিগুলো খ্যাঁকরা খ্যাঁ করছে। ছায়ার রঙ্গরঙ্গিনী মূর্তি দেখে এগোতে সাহস পাচ্ছে না।
আশেপাশের বাড়ির ছাদ থেকে সমস্বরে সকলে চিৎকার করছে।
'ওগো তোমাদের বউকে মেরে ফেললে। খণ্ড খণ্ড করে দিলে।'
ছায়া অ্যান্টেনার একটা খোঁচা হাতে তুলে নিয়ে পাঠশালার পণ্ডিতদের মতো ধমকাচ্ছে, 'চোপ, একদম চোপ।' ওপাশের বাড়ির ছাদ থেকে একটি ফচকে ছেলে নামতা পড়তে শুরু করেছে 'দু এককে দুই, দুই দু গুণে চার।' ছায়ার ডানগালটা জ্বালা করছে হনুমানের চড়ে। তবু সে ছাড়ার পাত্রী নয়। তাপস তাকে যা বলে গিয়েছিল এখন সে তাই করতে পেরে মনে মনে ভীষণ খুশি।
ছায়ার আস্ফালনে বাচ্চা হনুমানরা পড়া না পারা ছাত্রের মতো কোণের দিকে চলে গেছে। তার জড়ানো বীর হনুমান আলসে থেকে দুপ করে লাফিয়ে নেমে পড়ল। ছায়া পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘট করে সিঁড়ির দরজাটা একবার দেখে নিল, কত দূরে। প্রয়োজন হলে ছুটে পালাতে হবে। বীরের সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা তার নেই।
তাপসের মায়ের হাঁটুতে বাত। তবু তিনি চারপাশের চিৎকার শুনে ওপরে উঠে এসেছেন। দৃশ্য দেখে সাহস করে ছাদে আসতে পারছেন না। সিঁড়ি থেকেই বলছেন—'অ বউমা এরিয়েল যায় যাক, তুমি নেমে এসো।'
ছায়া বললে, 'জীবনে আমি কাউকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিনি, আজ এসপার ওসপার যা হয় একটা কিছু করে ফেলব।'
'অ বউমা ধেড়েটা এগিয়ে আসছে। তুমি পালিয়ে এসো বউমা।'
বীর হনুমানের কী মনে হল কে জানে, ছায়ার মধ্যে সীতাকেই বোধহয় দর্শন হল। সীতার মতোই দেখতে। তাপসের নাকটা আর একটু টিকালো হলে রামচন্দ্র বলতে আপত্তি হত না।
ছায়া বীরাঙ্গনার মতো বললে, 'আয় সাহস থাকে তো এগিয়ে আয়।'
বীর হনুমান ছায়ার পায়ের তলায় এসে লুটিয়ে পড়ল। একবার করে মাথা ঠেকায়, একবার করে মুখ তুলে তাকায়। মুখে একটা অপরাধীর ভাব। যেন বলতে চাইছে—'মা জননী, অপরাধ করে ফেলেছি ক্ষমা করো।'
তাপসের মা বললেন, 'এ কী দৃশ্য, আহা এ কী দৃশ্য!'
দৃশ্যের আশেপাশের ছাদ থেকে যারা টিপপুনি ছুঁড়ছিল তারা সব চুপ।
ছায়া বললে, 'এ সব কী করেছিস? তোর বউ আমাকে চড় মেরেছে কেন?'
বীর খ্যা খ্যা করে স্ত্রীকে কী বলতেই, গুটি গুটি এসে ছায়ার পায়ে মাথা রাখল।
ছায়া বলল, 'আর কোনও দিন এরকম অসভ্যতা করবে?'
হনুমান দম্পতি নীরবে তাকিয়ে রইল।
ছায়া বললে, 'চুপ করে সব লাইন দিয়ে বোসো, একটা করে কলা পাবে।'
কী থেকে কী হয়।
দিকে দিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল, মুখুজ্যে বাড়ির বউ ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন। পিল পিল করে লোক আসছে আর যাচ্ছে। কারুর মামলা, কারুর ছেলের চাকরি, কারুর জনডিস, কারুর পেটের ব্যামো। মেয়েরা আসছে ছেলে কোলে।
*
'মা, মাথায় একটু ফুঁ দিয়ে দাও, নজর লেগেছে।'
'মা গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দাও একজ্বরী হয়ে আছে তিন হপ্তা।'
মাঝে মাঝে বাড়ির সামনে গাড়ি এসে থামছে। দূর থেকে নাম শুনে ছুটে এসেছেন প্রভাবশালী ব্যক্তি।
'মা ব্যবসা বড় ঢিমে যাচ্ছে। একটু ব্লাড-সারকুলেশন করে দাও না।'
'মা হৃদয়টাকে একটু দুলিয়ে দাও।'
তাপস প্রথম প্রথম একটু বিরক্ত হয়। বউ ক্রমশই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। নিজের সম্পত্তি থেকে ক্রমশই জনসাধারণের সম্পত্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভারী ভারী চেহারার মানুষ এসে পা জড়িয়ে ধরছে—'মা একটু কৃপা করো মা।'
না চাইতেই বড় বড় সন্দেশ আসছে। ফল আসছে। ভালো ভালো ধূপ আসছে, ফুল আসছে। ছায়ার মুখে একটা দেবী ভাব এসেছে। তাপস এখন স্ত্রীর প্রাইভেট সেক্রেটারির মতো, দ্বাররক্ষীর মতো।
মাঝরাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে, কী থেকে কী হয়ে গেল। সে যুগে সীতা পাতাল প্রবেশ করেছিলেন, এযুগে রামচন্দ্রের পাতাল প্রবেশ। এক চড়েতেই কী হয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন