সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

হাসি পায়। চারপাশে বিজ্ঞাপনের এত উন্নতি। মানুষ ফুর ফুর করে আকাশে উড়ে চাঁদে হাওয়া খেয়ে আসছে। মঙ্গল গ্রহের গা ঘেঁষে শনির দিকে ছুটছে। পৃথিবীতে আরামের শেষ নেই। আমেরিকায় মাথা পিছু চারটে করে মোটর গাড়ি। বোতাম টিপলে আলো, কল টিপলে জল। সাহারার গরমে হিমশীতল ঘর। উন্নত দেশে বড় বড় সব রোবট কলকারখানার হাড়ভাঙা পরিশ্রম থেকে মানুষকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। কোনও কোনও দেশের অর্থনীতি অ্যায়সা উন্নত হয়েছে, সপ্তাহে তিন দিন কাজ, চার দিন ছুটি। মানুষ অনেক খেটেছে। কাঠ কেটেছে, মোট বয়েছে, জল ছেঁচেছে, পাল তোলা জাহাজে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে, আর না, এবার হল আরামের কাল। খাও, দাও, ফুর্তি করো, যুদ্ধ করো, আনবিক বোমা ফাটাও, মিসাইল, ওয়ার হেড তৈরি করো, সেক্স করো, খুন করো, ড্রাগ নাও।
বাঙালি অতি বুদ্ধিমান জাত। সেই গোখেল সায়েব বলেছিলেন, হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টোডে, ইন্ডিয়া থিংকস টোমরো। কী বোকা ওই উন্নত দেশের প্রাণীরা। জীবনে এত আরাম, অথচ অ্যাথলেট আর খেলোয়াড়দের কী কষ্ট। লাফাচ্ছে, ঝাঁপাচ্ছে, ডিগবাজি খাচ্ছে। বল নিয়ে এ পায়ে ও পায়ে কসরত শিখছে। বেসবল, হকি, ফুটবল টেনিস, ক্রিকেট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গলদঘর্ম, নাকাল অবস্থা। কেনরে বাপু কমপিউটারের হাতে সব ছাড়লি, খেলাটাকে কেন ছাড়তে পারলি না। অহংকার? শরীরের অহংকার? দক্ষতায় অহংকার? আমি বিশ্ব বিজয়ী। আমার দল বিশ্ব বিজয়ী। ন্যাজ অমনি ফুলে গেল।
মানুষের শরীরের কোনও দাম আছে? দাম হল মগজের। সেই বোকা দৈত্যের গল্পটা মনে পড়ছে। এক ঝাপ্পড়ে সাতটা মাছি মেরে একজনের খুব অহংকার হল। সকলকেই বলে বেড়ায় এক চড়ে সাতটা। তার নাম হয়ে গেল সাতমারি পালোয়ান। সাতমারি পালোয়ান একদিন রাস্তার ধারের সাঁকোয় বসে আছে। হঠাৎ কোথা থেকে এক দৈত্য এসে সেই রোগাপটকা লোকটিকে চ্যালেঞ্জ করল—তুমি নাকি সাতমারি পালোয়ান, পারবে আমার সঙ্গে ক্ষমতায়?
সাতমারি মুচকি হেসে বললে, কী করতে হবে রে ছনকা।
বিশাল একটা গাছ ঝড়ে ভেঙে পড়েছিল। দৈত্য বললে, এইটাকে তুমি আর আমি দুজনে মিলে ধরাধরি করে শহরে নিয়ে যাব, পারবে?
সাতমারি বললে, এই ব্যাপার? এই কাঠটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে দুজন লাগবে? এটাকে তো আমি একাই এখানে ফেলে দিয়ে গিয়েছিলুম। যাক, বলছ যখন এসো, দুজনেই হাত লাগাই।
দৈত্য একটু ঘাবড়ে গেল। বাবা, কত বড় পালোয়ান।
সাতমারি বললে, তুমি গুঁড়ির দিকটা ধরো, আমি ধরি ডালপালার দিক।
দৈত্য শিকড়ের দিকটা কাঁধে তুলে নিল। সাতমারি ডালপালার দিকে।
সাতমারি ডালে উঠে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে শিস দিচ্ছে, দৈত্য একাই বইছে। ভারে প্রায় নুয়ে পড়ছে।
সাতমারি শিস দিচ্ছে আর মাঝে মাঝে দৈত্যকে জিগ্যেস করছে—কি গো ভায়া, কষ্ট হচ্ছে না কি?
দৈত্য কুঁই কুঁই করে বলছে না, কষ্ট আর তেমন হচ্ছে কই?
বুদ্ধির্যস্য বলং তস্য, এই হল সার কথা।
খেলার জগতে সেই নীতির প্রয়োগ মন্দ কী? স্পোর্টস এখন শুধুই স্পোর্টস নয়, প্রফেশান। ভালো পয়সা আছে। টুর্নামেন্টের আয়োজন যাঁরা করেন, তাঁরা প্রায় ফিল্মস্টারের মতোই। কাগজ স্পোর্টসকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তুলেছে। খেলার খবরে কাগজের কাটতি বাড়ে। পাবলিক খাচ্ছে খুব। খাবে না কেন! দেশ তো এখন সাপোর্টারে ছেয়ে গেছে। রাজনীতির সাপোর্টার, ক্লাবের সার্পোটার। সার্পোটারদের কাজ হল চেল্লানো। দল হারলে চাকু চালানো। নিজেদের মধ্যে কাজিয়া করা। রেফারি আর আম্পায়ারকে ঠ্যাঙানো। সাপোর্টারই মাথায় তুলবে, পায়ে ফেলে ঠেসবে। সাপোর্টারেই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দেবে।
সবই যখন নির্ধারিত হয়, জনসাধারণ নয় কর্তৃপক্ষ ঠিকঠাক করবেন, তখন আর নেচে কুঁদে শক্তিক্ষয় করে লাভ কী? ওঁদেরকেই কমপিউটার ভেবে নিলে হয়! সবই প্রাোগ্রাম করা আছে। চলচ্চিত্রে যেমন নায়ক কখনও লাফায় না, ঝাঁপায় না, মারামারি করে না, সবই স্টান্টম্যান করে দেয়, খেলাতেও সেই একই প্রথা অন্যভাবে চালু হলে ক্ষতি কী!
আমরা খেলা চাই, খেলোয়াড় চাই না। খেলা কারুর কাছে ব্যাবসা, কারুর কাছে সময় কাটাবার উপায়, কারুর কাছে উত্তেজনা। মদ যেমন স্বাস্থ্যকর পানীয় নয় জেনেও হুদো হুদো লোক খেয়ে মরে, একটু কিকের আশায়, বলের কিকও সেই একই কিক। নব্বই মিনিট গ্যালারিতে বসে চেল্লাই। ঘণ্টা কয়েক বাসে গাল-গলা ফোলাই। খেলার মান-ফান বাজে কথা। মাঠ, গ্যালারি, গোলাকার বস্তু, খোলা আকাশ আর অফুরন্ত সময় খেলা নামক ককটেলের উপাদান। বাড়িতে প্রাণ টেকে না, সারা দেশে হেরেহেরে অরাজকতা, খুন, রাহাজানি, অন্ধকার, গর্ত, ভাগাড়, প্রশাসনিক উদাসীনতা, তছনছ সংসার, একটা কিছু চাই তো, নেশার জিনিস! খেলা সেই নেশা। দলের সাপোর্টার হয়ে দলাদলি চালাও।
খেলার জগতের মাতব্বররা বুঝে গেছেন, খেলা নয়, খেলার অভিনয়টাই হল মোদ্দা কথা। কাগজ বাজার গরম রাখবে। মাঠ হবে মঞ্চ। অভিনেতারা আসবে, পুতুল নাচের মতো নাচবে। নাচের পুতুলের সুতো থাকবে উপযুক্তর হাতে। বোকারা চেল্লাবে, গ্যালারি গলে জোয়ারের জলে পড়বে, পুলিসের ধোলাই খাবে। স্পোর্টসের নামে তামাশা চলবে সারা বছর।
এদিকে নব্বই মিনিটে গোল হবে একশো আশিটা। অতি ঊর্ধ্বলোক থেকে বলা হবে, দু-দলের লড়ায়ের ফলাফল হোক ড্র, তা না হলে শহরে আগুন জ্বলে যাবে।
এই তো চাই। এরপর বোতাম টিপে খেলা হবে রিমোট কন্ট্রোল প্রথায়। ভিডিয়ো গেমের মতো। খেলাটাকেও সাট্টা করে নিলে মন্দ হয় না। নম্বরে নম্বরে মিলিয়ে জয় পরাজয় নির্ধারণ। যাত্রার যে রাজা পোশাক পরে হম্বিতম্বি করে, সে আসলে রাজা নয়, প্রজাই। আসল রাজা ইচ্ছে করলে তার গর্দান উড়িয়ে দিতে পারে।
কিছু সাপোর্টার অবশ্য ক্রমশই জ্ঞানী হয়ে উঠছেন।
নেহরু কাপ, বিশ্বকাপের খেলা দেখে বুঝেছেন, এদেশের অন্যান্য সব তামাশার মতো খেলাও এক তামাশা। প্রশাসনে শাসন নেই, ওষুধে ওষুধ নেই, খেলার খেলা নেই। সারা দেশে শুধু নেই, নেই। তাঁরা আর মাঠে যান না। খেলার কথায় নাচেন না। আকস্মিক অদ্ভুত কোনও ফল দেখলে মুচকি হাসেন।
দেহের এক জায়গায় ক্যানসারের কোষক্রিয়া শুরু হলে তা সারা দেহেই ছড়াবে। আরোগ্যের উপায় অ্যামপুট। মুশকিল, এই মুণ্ডুতে ক্যানসার হলে কী হবে?
কেটে ফেলে দিলে পড়ে থাকবে প্রাণহীন ধড়। তা হলে বাঁচার উপায় কী? উপায় নেই। উপায়হীন ধীর মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলো। আর হেঁকে বলো—যুগ যুগ জিও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন