হ্যাচাং করে কেতরে গেল

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এ বেশ মজার কাল। সব মানুষই পেতে চাইছে। গাড়ি, বাড়ি, ছাতা, জুতো, ঝ্যাঁটা, বালতি। ঝ্যাঁটা, বালতি আবার কোত্থেকে এল? এসে গেল। আগে ছিল নারকোল কাঠির ঝ্যাঁটা। সকালে পল্লির মানুষ জাগত ঝ্যাঁটা, যার ডাক নাম ছিল খ্যাংরা—সেই খ্যাংরার খ্যাঁচোর খ্যাঁচোর শব্দে। খ্যাংরাধারিণীর কাংস্য কণ্ঠে। মানে, যার সঙ্গে যা যায়। খ্যাংরা হস্তে রূপসি, মধুর কণ্ঠে গান গাইবেন—তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন আমারে, আমারে, আমারে। মানাচ্ছে না। এর সঙ্গে ফুলঝাড়ু গেলেও যেতে পারে। খ্যাংরাধারিণী গুষ্টির তুষ্টি করবেন। সঙ্গে থাকবে টিনের বালতি। কলকাতার সর্বত্র একসময় টিনের বাদ্যি। কলতলায় বসার সময় পিলে চমকানো আওয়াজ, তার সঙ্গে মানানসই টিনের মগ। দুজনেই তাল ঠুকতে ওস্তাদ।

খ্যাংরা আর লোহার বালতির ঐকতান ছাপিয়ে কণ্ঠস্বর শোনা গেল 'অ্যাই তোর বাপকে খাট থেকে ঠেলে ফেলেদে। ন'টায় ভাত ধরাতে হলে আটটায় বাজার গেলে এবার থেকে পিণ্ডি ধরাব। তুমি পটের বিবিটি হয়ে জানলার ধারে কোনও রাজপুত্তুরের জন্যে দাঁড়িয়ে আছ? ওই খেঁদিকে যে নিতে পারে সে আরও ভোরে ময়লার গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে যায়। বিরহীর মতো রাধে-শ্যাম না হয়ে উনুনে পাখা মারে। মিটমিটে আঁচ আর ঘিনঘিনে কত্তা, দুটোই চোখের বিষ। এখুনি উঠবেন, কার্নিসে কেলে মানিক কা, কা, আর ইনি খাটের কিনারে বসে চা, চা।

এসব হল দাপুটে পাকা গিন্নি। গরু চরানোর কায়দায় স্বামী আর সংসার চরাতেন। অম্বল, বদহজম, চুল উঠে যাওয়া, গলব্লাডার, এসব পাত্তাই দিতেন না। সংসারটাকে জীবন্ত করে রাখতেন। বেখাপপা সময়ে বাড়িতে তিন জন অতিথি এলে খিড়কির দরজা দিয়ে সরে পড়ার তাল করতেন না। হই হই অভ্যর্থনা। তেড়ে রান্না। ঝটিতে চার-পাঁচ ক্রোশ 'লাঞ্চ' অথবা 'লেটনাইট ডিনার'। কত্তাদের একটা 'কনফিডেন্স' ছিল, আমার 'গিন্নি' ঠিক ম্যানেজ করে দেবে। সেই সময়কার কত্তারাও বেশ হৃষ্টপুষ্ট ছিলেন। মুখে লেগে থাকত একটা সুখী সুখী ভাব। জামা পড়লে ভুড়িটা ঠেলে উঠত। ধীর মন্থর গতি। কোনও সময়েই মনে হত না তিনি সময়ের পিছনে ছুটছেন। বাড়ির মজলিশ, রকের আড্ডা সরগরম করে রাখতেন কর্তারা। আড্ডায় কেউ একজন থাকতেন যাঁর পেছনে লাগা যায়, রাগানো যায়। কে কতটা স্ত্রৈণ, তাই নিয়ে রঙ্গরস চলত। ঘটা করে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতেন। দুটি চরিত্র সেইসময় প্রকাশিত হত—বরকত্তা, কনেকত্তা। নারীপুরুষ সেই কালে ছিলেন একান্তই পারিবারিক জীব। নিজের পরিবার, অন্যের পরিবার, জ্ঞাতি-গুষ্টি নিয়ে পরিপূর্ণ, সহজ সরল জীবন কাটাতেন। বিপদে পড়লেই মিহি সুরে ডাকতেন, 'কই গো, কোথায় গেলে একবার এসো তো। দ্যাখো তো চোখে কী একটা পড়ল।' গৃহিণী রান্না ফেলে ছুটে আসতেন, দাঁড়াও, দাঁড়াও, রগড়াবে না। লঙ্কার হাতটা আগে ধুয়ে আসি।'

খ্যাংরার শব্দে এমন আর সকাল জাগে না। লোহার বালতি অদৃশ্য। এখন ফ্ল্যাটের যুগ। উঠানওলা বাড়ি নেই বললেই চলে। অ্যাটাচড বাথওলা খুপরি। খুঁজলে ফুলঝাড়ু পাওয়া যেতে পারে। প্লাস্টিকের বালতি। বিপজ্জনক হাতল। বিপজ্জনক দাম্পত্য সম্পর্ক। হাতলের সঙ্গে বালতির সম্পর্কের মতো। দুটি ছিদ্র আংটাটা প্রবেশ করান। গুরুভার নিতে পারে না। থেকে থেকে যে কোনও একটা পাশ থেকে খুলে হ্যাচাং করে কেতরে গেল। আবার কায়দা করে ঢোকাও। চলল কিছুদিন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও অনুরূপ দাঁড়িয়েছে। থেকে থেকে খুলে যায়। এখন নানারকমের বাহারি বউ পাওয়া যায়। আমাদের কালের মা পাওয়া মুশকিল। বয়সে যাঁরা পঞ্চাশ কি ষাটে আছেন তাঁরা পেয়েছেন। মায়ের কাঁকালে চড়ে পাড়া বেড়াতে গেছেন। গেছেন ঝুলনের মেলায়। ফিরে এসেছেন রমকারি মাটির পুতুল নিয়ে। মায়ের হাতে হাতা-খুন্তি, চাকি বেলন। শিলনোড়ায় বাটনা বাটার শব্দ, হলুদ অথবা আদা থেঁতো করার শব্দ শোনা যাবে না। শরীরে শিহরণ ধরানো 'মিক্সি'র বিজাতীয় শব্দ। দুপুর বেলায় পাড়ায় পাড়ায় সেই উদাত্ত হাঁক শোনা যাবে না 'শিল কাটাও।' ইংরেজিতে বলে 'এক্সপ্লেশন'। এখন 'ঝ্যাঁটা' নামক খড়খড়ে শব্দটি মোলায়েম হয়ে 'ঝাড়ু' নাম পেয়েছে। 'ফুলঝাড়ু।' সেটিরও আবার সিনথেটিকে রূপান্তর ঘটেছে। দোকানে গেলে দেখা যাবে নানা রঙে সব দোল খাচ্ছে ছিমছাম। বাজারে হইহই করে ঢুকে পড়েছে নানা চরিত্রের 'মপ'। আমাদের জীবনের ভ্যাকুয়ামে প্রবেশ করেছে যাবতীয় লটবহরসহ 'ভ্যাকুয়াম ক্লিনার'। সেসব গিয়ে উঠেছে টিভিতে। পর্দায় তাাদের নাচানাচি। পরিষ্কারের প্রতিশ্রুতিতে ভরা। একালের 'জীবনতন্ত্র' খুব জ্যালজ্যালে হয়ে এসেছে। সত্যের নগ্নতা ঢাকতে পারছে না। প্রচুর প্রতিশ্রুতি। প্রতিশ্রুতির সংজ্ঞা হল—বাক্যময় গাজর—যা নাকের ডগায় ঝুলবে, আর আমরা ছুটব। আদর্শহীন শিক্ষার পেছনে, নকল সোনার পেছনে, প্রেমহীন সম্পর্কের পেছনে। বড় বড় কথা বলব, শুনব আর মূর্খের স্বর্গ তৈরির চেষ্টা করব।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%