সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রতি রবিবার দাদা এক জোড়া জুতো খুব পালিশ করে। চামড়ার জুতো। জুতো জোড়াটা ছিল আমার বাবার। বাবা চলে গেছেন। আজ প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। নরম কাপড় দিয়ে পালিশ করতে করতে এমন করে ফেলে আয়নার মতো মুখ দেখা যায়। বাবা যে খাটটায় শুতেন তার তলায় সুন্দর একটা পিঁড়ের ওপর সাজিয়ে রাখে।
বাবা মারা যাওয়ার পর দাদাকে চাকরিতে ঢুকতে হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। দাদার খুব ইচ্ছে ছিল, অনেক লেখাপড়া করবে। বিলেত যাবে। সে আর হল না। এক মারোয়াড়ি ফার্মে চাকরি করে। দাদার স্বপ্ন হলুম আমি। দাদা বলে, 'আমার ইচ্ছে ছিল, হল না। তোকে হতে হবে। রোজ যখনই সময় পাবি, ওই জুতোর দিকে তাকিয়ে থাকবি। দেখবি, একটা শক্তি পাবি।'
মাধ্যমিক পরীক্ষা এসে গেল। আর ক'দিন মাত্র বাকি। এমন একটা ভয় এল মনে। প্রথমে মনে হল, আমি পাশ করতে পারব না। তারপর মনে হল, যদিও পাশ করি, কোনওরকমে করব। ভালো নম্বর পাব না। আর ভালো নম্বর না পেলে পড়াশোনা শেষ। থাকতে হবে দাদার ঘাড়ে। আমার চোখে জল এসে গেল। যতই পড়ছি ততই সব ভুলে যাচ্ছি। আমার এই অবস্থার কথা কারোকে বলতে পারছি না। লেখাপড়ায় আমি খুব একটা খারাপ নই। আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।
আমাদের অবস্থা এক সময়ে খুব ভালো ছিল। মানুষের সবদিন তো ভালো যায় না। কর্মচারীরা প্রবল আন্দোলন করে বাবার কারখানাটা উঠিয়ে দিলে। বাবা আর নতুন করে কিছু করতে চাইলেন না। বললেন, অনেককে নিয়ে বড় কিছু করার দেশ এটা নয়। হাসপাতাল-স্কুল-কলেজ কারখানা এ সবই বন্ধ হয়ে যাবে। বাবার অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। মানুষ ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে। বাবা স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়লেন। যে ঘুম কোনওদিন ভাঙে না। চলে যাওয়ার সাতদিন আগে কথায় কথায় বলছিলেন—এবার জন্মালে বিলেতে জন্মাব। সাতদিন পরেই স্ট্রোক। দাদা বাবার ইউনিফর্ম পরে নেমে এল খেলার মাঠে। বললে—চলছে, চলবে। যা চলছিল, যেমন চলছিল সবই ঠিক সেইরকম চলবে।
ছেলেবেলায় দাদা যখন ছোট ছিল, ছাতে ঘুড়ি ওড়াত। আমার হাতে লাটাই। আকাশে ঘুড়ি, দাদার হাতে সুতো, সে কী চিৎকার— দুয়ো, আমার বাজারে কেউ নেই, আমি আছি ভয় নেই। ছেলেবেলার এই স্লোগানটাকেই একটু অন্যরকম করে নিয়ে, দাদা এখন থেকে থেকে হুঙ্কার ছাড়ে—আমার পাশে কেউ নেই, আমি আছি ভয় নেই।
সকালে দমাদ্দম ডন-বৈঠক মারার পরই এই স্লোগানটা বারে বারে বেরোতে থাকে। আমাকে বোঝায়, জীবন কেমন জানিস, তোকে বাঘে তাড়া করেছে। তুই ছুটছিস। উঠে গেছিস পাহাড়ে। বাঘ তখনও তোর পেছনে। পাহাড় চূড়া থেকে তুই পড়ে যাচ্ছিস খাদে। পড়ে যেতে যেতে কোনওরকমে একটা লতা ধরে ঝুলছিস। বাঘটা উঁকি মারছে। এই সময় হঠাৎ বেরিয়ে এল এক পাহাড়ি ইঁদুর, ইয়া এত বড়। ইঁদুরটা ধারালো দাঁত দিয়ে তুই যে লতাটা ধরে ঝুলছিস সেইটা কাটতে লাগল। তুই ঝুলছিস। নীচে গভীর খাদ। পড়ে গেলেই মৃত্যু। এমন সময় তুই দেখলি, পাশেই তোর হাতের নাগালের মধ্যে ঝুলছে এক থোলো পাকা আঙুর। বাঁ হাতে লতাটা ধরে ঝুলছিস, ইঁদুর কাটছে, মাথার ওপর বাঘ ঝুঁকে আছে, তুই ডান হাতে একটা করে আঙুর ছিঁড়ছিস আর মুখে দিচ্ছিস, নীচে গভীর খাদ হাঁ করে আছে। তোকে যেভাবেই হোক ঝুলে থাকতে হবে। মৃত্যুর পরোয়া করি না, জীবনকে উপভোগ করি।
আমার দাদা সাংঘাতিক দাদা। বাবাকে ভীষণ ভালোবাসত। বাবাই তার গুরু। বাবার সমস্ত জিনিস, বাবার ঘরে এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছে, যেন বাবা বাথরুমে গেছেন। এখনি এসে জামাকাপড় পরবেন। চশমাটা চোখে দেবেন, জুতো পরে হাতে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে যাবেন। দাদা বাবার ঘরে কারোকে শুতে দেয় না। বলে, বাবার মন্দির। ঘরের সংখ্যা কম। আমরা দু'ভাই বারান্দায় শুই। দাদা বাবার বিছানায় মশারি ফেলে ভালো করে গুঁজে মাথার কাছে ছোট টেবিলে এক গেলাস জল চাপা দিয়ে রাখে।
দাদাকে মনে হয় আমার বাবা। ছোট বাবা। বাবা যেমন রোজ রাতে দাদাকে পড়াতে বসতেন, দাদাও আমাকে নিয়ে সেইরকম বসে। বাবার মতো মুখ, চোখ, কপাল, খাড়া নাক, এমনকি গলার আওয়াজও। পরীক্ষা যেদিন শুরু হবে, তার আগের দিন রাতে দাদা আমাকে নিয়ে বসেছে। বলছে, 'সব একবার রিভাইস করে নে।'
আমি কেঁদে ফেললুম, 'দাদা আমার কিচ্ছু মনে নেই। সব ভুলে গেছি। আমি বসে বসে ফেল করব।'
দাদা কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে রইল। তারপর হঠাৎ যেন আগুনের মতো জ্বলে উঠল। কোনও বাধা পেলেই দাদা যেমন হয়ে যায়। বাবার নাম ছিল সুরেন্দ্রনাথ। বাবার সামনেও কোনও বাধা এলে, বুক চিতিয়ে বলতেন, আমার নাম সুরেন্দ্রনাথ, সারেন্ডার নট। আত্মসমর্পণ করব না।
দাদা আমার কাঁধে একটা ঝাঁকুনি মেরে বললে, 'তুই সারেন্ডার নট-এর ছেলে হয়ে এই কথা বলছিস! আয় আমার সঙ্গে।'
দাদাকে অনেকটা মহাদেবের মতো দেখতে। আমাকে টানতে টানতে বাবার ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বললে, 'বোস মেঝেতে, বাবু হয়ে।'
বসলুম। একসঙ্গে চারপাঁচটা ধূপ জ্বেলে বাবার ছবির সামনে রাখলে। ছবিটা খাটে। ধূপদানিটা সামনের টুলে। মৃদু একটা আলো জ্বেলে দিল। খাটের তলায় চোখের সামনে বাবার জুতো জোড়া। ঝকঝক করছে। ছোট্ট একটা আসনের ওপর।
দাদা, আমার পাশে বসল। প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে।
বললে, 'বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাক বেশ কিছুক্ষণ। চোখের পাতা ফেলবি না।'
একভাবে তাকিয়ে আছি। জল আসছে চোখে। বাবার হাসি হাসি মুখ। বসে আছেন চেয়ারে। গায়ে একটা কাশ্মিরী শাল। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তোলা। সেই ছবিটাই বড় করা হয়েছে।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মনে হল, ছবিটা জীবন্ত। চোখের পাতা পড়ছে। ঠোঁট নড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি। কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে। সব ঝাপসা হয়ে আসছে। হঠাৎ খটখট জুতোর শব্দ কানে এল। যে ঘরে বসেছিলুম, সেটা যেন নিমেষে মিলিয়ে গেল। লম্বা সোজা একটা রাস্তা। দু'পাশে সারসার বিশাল বিশাল গাছ। বহু দূরে আকাশের গায়ে নীল একটা পাহাড়। জল চিকচিক একটা নদীর রেখা।
আমার সামনে সোজা হয়ে হেঁটে চলেছেন বাবা। আমি তাঁর শক্ত পায়ের গোছ দেখতে পাচ্ছি। গোড়ালিটা ঢুকে গেছে চামড়ার তৈরি ঝকঝকে জুতোর মধ্যে। বাবার হাঁটার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল। কখনও পা ভাঙত না হাঁটুর কাছ থেকে। সৈনিকের মতো মার্চ করতেন। চিবুকটা থাকত খাড়া। যেন খাপখোলা একটা তরোয়াল হেঁটে চলেছে। আর হাঁটতেন খুব দ্রুত গতিতে।
আমি, আমার দাদা দুজনে প্রায় ছুটছি। তাল রাখতে পারছি না। জুতোর ভয়ংকর শব্দ আমাদের আগে আগে চলেছে। কাঁকুরে পথ। শেষবেলার রোদ লুটিয়ে আছে, গাছের ফাঁক দিয়ে যেখানে যেখানে আসতে পেরেছে। বাবু বলতুম আমি বাবাকে। দাদা বাবাই বলত। বাবার জুতোর গোড়ালির চাপে ছোট ছোট কাঁকর গুঁড়িয়ে পাউডার হয়ে যাচ্ছে। মশরমশর শব্দের সঙ্গে জুতোর গোড়ালির শব্দ।
বাবার চওড়া পিঠ। সুন্দর মাথা। শক্ত ঘাড়। ব্যায়াম-করা শরীর। আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন না। কেবল এক একবার বলছেন, 'ঠিক আসছ তো, ঠিক আসছ তো।'
আমরা প্রায় ছুটছি। আমাদের নজর বাবার দিকে। সুন্দর দুটো পা। কালো কুচকুচে জুতো। সমান সমান দূরত্ব রেখে একটার পর একটা পা পড়ছে। আর বিশাল লম্বা এক ফালি কাপড়ের মতো পথটা গুটিয়ে যাচ্ছে। আমার পায়ে ভোঁতা মুখ ছোট্ট একজোড়া বুট। আমাদের জুতোর ঠোক্করে, ছোট ছোট সাদা মসৃণ পাথর ঠিকরে চলে যাচ্ছে।
উলটো দিক থেকে বাতাস বইছে জোরে। বাবার মাথার পেছন দিকের বড় বড় চুল উড়ছে। আমাদের কপালে চুল খেলা করছে। হঠাৎ পেছন দিকে থেকে একটা টাঙ্গা আমাদের অতিক্রম করে সামনে চলে গেল। সাদা ঘোড়ার পায়ের টগবগ শব্দ। নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে চাকার কেটে কেটে চলে যাওয়ার অদ্ভুত আওয়াজ। পেছন দিকে তিন-চারজন যাত্রী। তাদের মধ্যে একজন সিল্কের রুমাল নাড়ছে। টাঙ্গাটা ক্রমশ দূর থেকে দূরে একটা দেশলাইয়ের খোলের মতো হয়ে গেল। পথটা যেন নাড়া খেল। নির্জন আরও নির্জন হল। সাদা স্বাস্থ্যবান ঘোড়াটা বাবার হাঁটার শক্তি যেন আরও বাড়িয়ে দিল।
আমি মাথা নীচু করে, হাত মুঠো করে সারা শরীর দুলিয়ে হাঁটছি। আমার চোখ আমার ছোট পায়ের ছোট জুতোর দিকে। পথের সাদা কাঁকরের দিকে। মাঝে মাঝে চোখ যাচ্ছে বাবার পায়ের দিকে। কী গতি, কী শক্তি! টাঙ্গার বড় বড় লোহার চাকাও হেরে যায়। আমাদের দুই ভাইয়ের সঙ্গে বাবার একটা যেন রেস চলেছে। আকাশের গায়ে নীল পাহাড়টাকে অনেক বড় দেখাচ্ছে। নদীর সুতো এখন চওড়া ফিতে। বাবা পাহাড় ভীষণ ভালোবাসতেন। পাহাড়টাকে ধরার জন্যে যেন ছুটছেন। আমি ঘেমে গেছি। আমার ছোট ছোট পা দুটো যেন আর চলছে না। হঠাৎ আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলুম মুখ থুবড়ে। দাদা বলছে, 'রাজা পড়ে গেছে। রাজা পড়ে গেছে।' বাবা অনেকটা দূরে ছিলেন। আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন গটগট করে। আমি দেখতে পাচ্ছি কালো জুতো। পাউডারের মতো ধুলো জমেছে। বাবা সামনে এসে আমাকে তুলতে তুলতে বলছেন, 'পড়ে গেছে তো কী হয়েছে? এই তো আবার উঠে পড়েছে।'
আমার হাঁটু দুটো ছড়ে গেছে। দাদা বলছে, 'কেটে গেছে।'
বাবা বলছেন, 'ও অমন অনেক কাটবে ছিঁড়বে। সামনেই নদী। পাহাড়ি নদীর জল ওষুধের মতো। ওখানে গিয়ে ধুয়ে মুছে দেব।'
আবার আমাদের হাঁটা শুরু হল। বাবার সেই এক গতি। আমার হাঁটুর কাটা থেকে অল্প অল্প রক্ত ঝরছে। এক সময় বললুম, 'বাবা, আমি যে আর পারছি না।'
বাবা থেমে পড়লেন। আমার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললেন, 'পারছ না মানে! তুমি ওই নীল পাহাড়ে যাবে না?'
'আমার শরীর আর পারছে না।'
'শরীর নয় তোমার মন। তোমার মনে হেরে গেছে। তুমি হেরে যাবে? যারা টাঙ্গা করে গেল তারা এতক্ষণে নদী পেরিয়ে মাথায় উঠে গেছে। ওই পাহাড়ের চূড়ায় নানা রঙের পাথর পাওয়া যায়। এক একটার রং প্রজাপতির পাখার মতো। আর পাথরের ফাটলে ফাটলে আছে তুলো ঘাস। এত কাছে এসে তুমি বলছ, পারবে না। ওদের কাছে তুমি হেরে যাবে!'
দাদা বলছে, 'বাবা, আমরাও তো টাঙ্গায় যেতে পারতুম।'
বাবা বলছেন, 'ও তো দুর্বলের যাওয়া, সবল যায় পায়ে হেঁটে। হাঁটার একটা আলাদা আনন্দ আছে। সব জিনিসই জয় করে নিতে হয়। কষ্টের পর যে বিশ্রাম তার আনন্দ অনেক বেশি। হারি আপ হারি আপ মাই বয়েজ। সূর্য ডোবার আগে আমাদের আবার ফিরে আসতে হবে। কেন পারবে না! বীর কখনও হারে না।'
আবার আমাদের হাঁটা শুরু হল। পথ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। গাছ সরে যাচ্ছে। নদী এগিয়ে আসছে। পাথর আরও বাড়ছে। এইবার বড় বড় পাথর। সাদা দুধের মতো, হালকা সবুজ লালের ছিট। ক্রমশই ঢালু হচ্ছে পথ। একসময় শুধুই পাথর। টাঙ্গাটা একপাশে দাঁড়িয়ে। আর এগোতে পারেনি। চালক ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিয়ে একপাশে বসে আছে উদাস হয়ে।
বাবা বলছেন, 'দেখছ, অন্যের কাঁধে চড়ে কিছু দূর যাওয়া যায়, শেষ পর্যন্ত যেতে হলে নিজের শক্তিই ভরসা।'
বাবা এইবার পাথর থেকে পাথরে লাফ মেরে মেরে চলেছেন। কী ব্যালেন্স। জুতোর শব্দ হচ্ছে খটাস খটাস। গোড়ালির পেরেকের সঙ্গে পাথরের কোণা লেগে সিগারেট লাইটারের মতো আগুনের ফিনকি ছুটছে।
নানা মাপের অত পাথর, দিগন্ত-বিস্তৃত অত পাথর দেখে চোখে ঘোর লেগে যাচ্ছে।
বাবা বলছেন, 'শরীরটাকে পাখির মতো হালকা করে দাও। মনে করো তোমার ডানা আছে। ভাবলেই হবে। মানুষ সব পারে, মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই।'
আমরা আরও ঢালু বেয়ে একেবারে নদীর বুকে নেমে এলুম। জল বেশি নয়, কিন্তু ভীষণ স্রোত। কাঁচের মতো জল। একেবারে তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ছোট বড় পাথর বালির দানা কিচকিচ করছে। বাবা পকেট থেকে রুমাল বের করে জলে ভিজিয়ে আবার হাঁটুর থেঁতলে-যাওয়া জায়গা দুটো থুবে থুবে আলত করে লাগালেন। সব ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল। হাতে লেগেছিল। সেই জায়গাগুলোও মেরামত করলেন।
জিগ্যেস করছেন, 'কী, খুব জ্বালা করছে?'
করছে। তবু আমি বললুম, 'না না, ঠিক আছে।'
বাবা খুশি হয়ে বলছেন, 'বা: ভেরি গুড। এই তো ট্রেনিং। কষ্ট, জ্বালা, যন্ত্রণা, আমাদের জীবনের সঙ্গী। একদম পাত্তা দেবে না তাহলেই কাবু হয়ে যাবে। এখানে হাঁটতে এসেছ, হেঁটে যাও। থামবে না, থেমে পড়বে না, ভেঙে পড়বে না। এই হল পথ, তুমি হলে পথিক। আর এই জুতো হল গতি। দ্যাখো না, আমি কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছি। আর হ্যাঁ, জুতো হল আত্মবিশ্বাস। ওই দ্যাখো পেছনে তাকাও।'
আমি ফিরে তাকালুম। অবাক কাণ্ড। দেখি একটা ঘর দালান। চারপাশে আমগাছ, জামগাছ, লিচু গাছ। সকালের রোদ। পাখি ডাকছে। দালানে একটা দোলা। একেবারে এতটুকু একটা শিশু দোলায় শুয়ে হাত, পা নাড়ছে। ছোট্ট লাল লাল, কচি কচি দুটো পা। বাবার গলা। তিনি বলছেন, 'চিনতে পারছ? তোমার বাবা।'
আমি বাবার দিকে ফিরে তাকালুম। আশ্চর্য! ওই দিকটায় সেই খরস্রোতা নদী। নীলপাহাড় খাড়া উঠে গেছে আকাশের দিকে।
বাবা বলছেন, 'আবার দ্যাখো।'
একজন কিশোর গ্রামের পথ ধরে স্কুলে যাচ্ছে। বগলে বই।
বাবা বলছেন, 'বাড়ি থেকে দেড় মাইল দূরে ছিল তোমার বাবার স্কুল। রোজ হেঁটে যেত, হেঁটে ফিরত। তাইতো আমি এখনও এত হাঁটতে পারি। একদিনও কামাই হত না। টিফিন ছিল ছোলা ভিজে আর আদা। একটু নুন।'
ফ্রুর ফ্রুর করে বাঁশি বাজল। নিমেষে দৃশ্য বদলে গেল। খেলার মাঠ। লাল জার্সি পরা একটি ছেলে দুর্দান্ত খেলছে। গোল। হাততালি। খেলা শেষের বাঁশি। ভারিক্কি চেহারার এক ভদ্রলোক ছেলেটির হাতে একটা বড় কাপ তুলে দিচ্ছেন। লাল জার্সি পরা ছেলেটি মাথায় কাপ নিয়ে বেরিয়ে আসছে মাঠ থেকে। হই হই উল্লাস।
বাবা বলছেন, 'আমাদের স্কুল ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ান হল। আমাদের সময় পড়া আর খেলা। দুটোই ছিল।'
একটা ঘর। জানালার ধারে একটা টেবিল। টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। এক যুবক বই খুলে মনোযোগ সহকারে পড়ছে। টেবল ক্লকে রাত দুটো। যুবকের গায়ে গেঞ্জি। ভীষণ ভালো স্বাস্থ্য। টেবিলের ওপর ডান হাত। হাতের গুলি ঠেলে উঠেছে।
বাবা বলছেন, 'কলেজ হোস্টেল। কাল থেকে শুরু হচ্ছে বি. এস. সি. পরীক্ষা। ওই ছেলেটি জীবনের কোনও পরীক্ষাতেই ভয় পায়নি কোনও দিন। সারা রাত পড়বে। ভোরবেলা...'
ঠিং ঠাং শব্দ। জিমনাসিয়াম। যুবক একা বারবেল ভাঁজছে। ভোরের আকাশ। দূরে একটা পার্ক। জল টলটলে দিঘি।
বাবা বলছেন, 'দেহচর্চায় শুধু দেহ বড় হয় না, মনও বড় হয়। মনের সব ভয় কেটে যায়।'
দৃশ্য বদল হল। বিশাল একটা বাড়ি। বড় বড় থাম। অনেক সিঁড়ি। সুন্দর সেই যুবক কালো গাউন পরে ধাপে ধাপে নেমে আসছে। হাতে গোল করে গোটানো একটা কাগজ।
বাবা বলছেন, 'ওই দেখো সিনেট হল। তোমার বাবা কনভোকেশান থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসছে। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল। তোমার বাবার কাঁধে যিনি হাত রাখছেন, তিনি তোমার ঠাকুরদা। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে বড় উকিল ছিলেন। তোমার ঠাকুরদার মুখের ভাবটা দ্যাখো; যেন কোহিনুর পেয়েছেন। পিতার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ পুত্রের সাফল্য। ছেলের মধ্যেই বাবা বেঁচে থাকে। অনন্ত কাল ধরে এই হয়ে আসছে। তোমার সাফল্যেই আমার সাফল্য। তুমি আমাকে আনন্দ দিলে তবেই আমি আনন্দ পাব। জানবে মানুষের পা হাঁটে না, হাঁটে মন পায়ের সাহায্যে। কোনও জিনিস হাত ধরে না, ধরে মন। দেহ বড় হয় না, বড় হয় মন। ইচ্ছে করলে মানুষ আকাশের চেয়েও বড় মন করতে পারে। পৃথিবীর সব কিছু দুর্বল। ইচ্ছাই প্রবল। সব চেয়ে শক্তিশালী হল মানুষের ইচ্ছে।'
হঠাৎ সব অদৃশ্য। কেউ কোথাও নেই। শুধু বড়, ছোট পাথর। পাহাড়ি নদীর বয়ে চলার কুল কুল শব্দ। একটা পাথরের ওপর বাবার জুতো জোড়া। চকচকে কালো জুতো। মিহি পাউডারের মতো ধুলো। নদীর ওপারে সেই নীল পাহাড়। খাড়া উঠে গেছে আকাশে দিকে। কান ছুঁয়ে সাঁসাঁ শব্দে বাতাস বহে যাচ্ছে। নদীর তরতরে জল পাথরে পাথরে গান শুনিয়ে যাচ্ছে। আমরা চলেছি, চলেছি আমরা থেমে নেই।
ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। আলো কমে আসছে। নীল পাহাড় ধূসর হয়ে গেছে। পৃথক পৃথকভাবে আর কোনও কিছুই চেনা যাচ্ছে না, সব একাকার।
চিৎকার করলুম, 'বাবা।'
প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতেই পাহাড়চূড়া থেকে উত্তর এল, 'রাজা।'
স্লেট পাথরের মতো আকাশ, দৈত্যের মতো পাহাড়, দুধের মতো নদী, একেবারে চূড়ায় সাদা হাঁসের মতো এতটুকু একজন মানুষ, 'রাজা, এই এইখানে। তুমি নদীর বাধা পেরিয়ে চলে এসো। এখানে এলে তুমি দূর দূর, কত দূর দেখতে পাবে। মিছরির মতো মিষ্টি বাতাস। কত রকমের পাথর ছড়িয়ে আছে এখানে। কোনও কোনও পাথরে সোনার আঁচড়।'
'ভীষণ অন্ধকার।'
'মনের মশাল জ্বেলে নাও।'
'নদীতে ভীষণ স্রোত।'
'মনের ভেলা ভাসাও।'
'পাহাড় ভীষণ উঁচু।'
'মনের মই তার চেয়ে উঁচু।'
'আমার পা চলছে না।'
'আমার পৃথিবী ঘোরা জুতোটা পরে নাও।'
'আমার দাদা কোথায়?'
ঠিক আমার পাশ থেকে উত্তর এল, 'তোর পাশে।'
ঘোর কেটে গেল। বিছানায় বাবার ছবি। সামনেই কালো চকচকে জুতো। দাদা রোজ অফিসে বেরোবার আগে প্রণাম করে। আমি কোনওদিন করি না। জুতোয় মাথা ঠেকালুম। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, শুধু জুতো নয় জীবন্ত দুটো পা এসে গেছে। জুতোটা গরম।
দাদা বলছে, 'আর কোনও ভয় আছে, রাজা?'
'না দাদা, আমি পেয়ে গেছি।' অনেকদিন পরে কাঁদছি আমি।
দাদা বলছে, 'রাজা, জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হল কৃপা।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন