সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বছরের এই একটি সময়, যে সময় স্বামী-স্ত্রী জোড়ে পথে নেমে পড়েন, সঙ্গে ডাগর ছেলেমেয়েরাও থাকে। সপরিবারে পুজোর কেনাকাটা এ কালের একটা ফ্যাশান। পথের পাশে দাঁড়ালেই দেখা যাবে জোড়ায় জোড়ায় সব চলেছেন। সারা কলকাতা তোলপাড় হয়ে যায়। উত্তর দক্ষিণে গিয়ে গুঁতোগুঁতি করে। দক্ষিণ চলে আসে কেন্দ্রে। ধামা উলটে ফুটকড়াই ছড়িয়ে পড়ার মতো, বাঙালি পরিবার শহরের বাজারে বাজারে গড়াতে থাকেন। সেকালের কত্তা-তান্ত্রিক পরিবারে এসব ঝামেলা ছিল না। গৃহস্বামী আয় ব্যয় খতিয়ে একটা বাজেট ঠিক করে, হয় বড়বাজার থেকে, না-হয় মঙ্গলবার হাট থেকে সওদা করতেন। কেনার আগে দরদস্তুর চলত, দাম নিয়ে কচলাকচলি হত ঘণ্টাখানেক। তখনকার কালের ছেলেমেয়েদের নামের এত বাহার ছিল না। প্রাচীন যুগের হিসাবের খাতা খুললে দেখা যাবে, লেখা আছে, পাঁচীর বেগমপুরী, টেপীর ধনেখালি, পটলের ফরাসডাঙা। তখনকার কালে সেমিজের চল ছিল। ঘটিহাতা ব্লাউজ নামে এক ধরনের ব্লাউজ ছিল। মধ্যবয়সী গৃহিণীরা খুব পরতেন।
ঘরে বসে সাবেক প্রথায় কেনাকাটার চলন আর নেই। এক বাড়ি থেকে একই রকম জামা পরে সাতজন বেরোচ্ছে, কিংবা একই রঙের শাড়ি পরে পাঁচ বউ অঞ্জলি দিতে যাচ্ছে, এমন একজাতি-একপ্রাণ-একতার দৃশ্য আর চোখে পড়বে না। এ কালের কত্তার ভূমিকা আর সেকালের গৌরী সেনের ভূমিকায় বিশেষ তফাত নেই। 'ট্যাঁকে রেস্ত নিয়ে পরিবারের পেছন পেছনে ল্যাংবোট হয়ে ঘোরো। ইওর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট। ফ্যাশানের খবর রাখেন হার হাইনেস। হিজ হাইনেস এ ব্যাপারে একটি গবেট। ম্যাকসি, মিডি, মিনি জানা নেই। রং-কানা, তালকানা, দরদস্তুর করতে জানে না। দাম যা বলবে, লজ্জার মাথা খেয়ে হাফ থেকে শুরু করে খেলিয়ে খেলিয়ে সামান্য ওপরে ওঠা। ধরার কায়দা। সুতো একটু ছাড়ো, আবার টান, আবার ছাড়ো। সংসারকে যিনি খেলান, তিনিই পারেন খোদ দোকানদারকে খেলাতে। দোকানদারও কত্তার চেয়ে গিন্নিদেরই বেশি পছন্দ করেন। কথার পিঠে কথা চলতে থাকে। অভ্যস্ত চোখ, শাঁসালো খদ্দের দেখেই চেনেন। ঠান্ডা পানীয়ের বোতল হাতে হাতে ঘুরতে থাকে। লাটের পর লাট মাল দুম করে নেমে আসে টঙ থেকে। এ পক্ষের দেখার শেষ নেই, ও পক্ষের দেখানোর শেষ নেই। ক্লান্তিহীন কেনা বেচা।
শার্লক হোমস ওয়াটসনকে বলেছিলেন, হাসি-খুশি পরিবারে তুমি কখনও বিষণ্ণ কুকুর দেখতে পাবে না, আবার বিষণ্ণ পরিবারে ফুর্তিবাজ কুকুর চোখে পড়বে না। কুকুর দেখে পরিবার চেনা যায়। আমি বলব, গৃহিণীকে দেখে গৃহস্বামীর অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। সংস্কৃতেও আছে গৃহিণী গৃহমুচ্যতে। বেশ পুডিং ধরনের গৃহিণী দেখলেই বুঝতে হবে, গৃহস্বামীর উপার্জন মা লক্ষ্মীর কৃপায় বেশ ভালোই। গৃহিণীকে কত্তা বেশ কেয়ারে রাখেন। কাজকর্ম বিশেষ করতে দেন না। ভোরের চা নিজেই করেন। এটা করো, এটা দাও সেটা দাও বলে বিশেষ উত্যক্ত করেন না। ঘড়ি ধরা সময়ে সব কিছু হয়। রান্নার তেমন ফ্যাকড়া নেই। মোটামুটি ফ্যাট আর প্রাোটিনেই সব চলে। শাকপাতা, থোড়, মোচার কারবার নেই। অসময়ে অতিথি এলে, 'ওহে চা করো' বলে কত্তা ফতোয়া ঝাড়েন না। রাত দশটাতেই সংসারের ঝাঁপে লাঠি পড়ে যায়। আর যদি উলটোটা হয়, কর্তার পুডিং পুডিং চেহারা, গলার ওপর দুটি চিবুক, তাহলে বুঝতে হবে গৃহিণী বেশ প্রেশারে থাকেন। কত্তার দাপটে মাঝে মাঝেই বলে ফেলেন, 'যম কবে নেবে গো আমায়!'
উভয় ধরনের দম্পতিই পুজোর বাজারে বেরিয়ে পড়েন। বাঙালির এই এক উৎসব। কেনাকাটার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় নেই কারুর। মাথা মুড়োতেই হবে। যেসব গৃহস্বামী পেপারওয়েটের মতো সংসারের ওপর চেপে বসে থাকতে চান, রাশ আলগা করতে চান না, তাঁরা সপরিবারে দোকানে অবশ্যই ঢুকবেন। জেনারেটার চলছে ভ্যাটার ভ্যাটার। ভেতরে নিবু নিবু আলো। কোনওক্রমে একটা পাখা ঘুরছে। হাওয়া ছাড়ছে হোমিওপ্যাথিক ডোজে। লাল শাড়ি, গোলাপি শাড়ি। ক্ষীণাঙ্গী, স্থূলাঙ্গী, দীর্ঘাঙ্গী। আজকাল আবার বিলাইতি সেন্টের ছড়াছড়ি। সব গন্ধ এক সঙ্গে মিলেমিশে হরিদাসের বুলবুল ভাজা।
সদাশিব কত্তারা, যাঁরা সংসারকে লম্বা দড়ি ছাড়ার নীতিতে উদাসীনের শান্তি খোঁজেন, তারা সাধারণত ওই দক্ষযক্ষের মধ্যে ঢুকতে চান না। কয়েক প্যাকেট সিগারেট সম্বল করে ফুটপাথে গদিচ্যুত নেতার মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। মুখে অদ্ভুত এক কবি কবি, দার্শনিক দার্শনিক ভাব। প্রথম পিতা হওয়ার সময় নার্সিংহোমের বেঞ্চে অনেকে এই রকম মুখ নিয়ে বসে থাকেন। ভবিষ্যৎ আসছে, বর্তমানের নায়ক সমর্পিত হয়ে বসে আছেন। আর কী! যা হওয়ার তা হবে।
ফুটপাথে অপেক্ষমাণ ব্যক্তি, যিনি কামানের সামনে বুক পেতে দেওয়ার মতো মানসিক শক্তি খুঁজছেন, প্লাস্টিকের ফুল দেখছেন, লাল আপেল দেখছেন, মনে মনে ভাবছেন, আহা শ'দুয়েক যদি ফেরানো যেত, তাহলে নিজের কিছু শখ মেটানো যেত। গোটা চারেক রেকর্ড কিনতুম বাছা-বাছা। গোটা দুই পেপার ব্যাক। যে সব খরচকে সংসার অপচয় ভাবে, সেইরকম দু-একটা খরচ করা যেত। সিগারেট পুড়ছে, মনে ঢেউ খেলছে, হঠাৎ চোখ পড়ে গেল আর একজনের ওপর। যেন আয়নায় মুখ দেখা। নিজেরই প্রতিচ্ছবি। অপেক্ষমাণ আর একজন। ডিমে তা দেওয়ার সময় পাখির চোখ যেমন ফ্যালফেলে হয়ে যায়, ঠিক সেই রকম এক জোড়া চোখ! পরিবার ভেতরে, অপারেশান থিয়েটারে। কী সংবাদ আসে কে জানে? সাতশো, আটশো, না হাজার? একই নৌকার যাত্রীদের মধ্যে আলাপ হতে খুব একটা দেরি হয় না। ভিড় দেখেছেন? কে বলে লোকের পকেটে পয়সা নেই? পাঁচ টাকা পটল, চল্লিশ টাকা মাছ, পয়সা আসছে কোথা থেকে?
ঘুষের পয়সা। বাঁ-হাতের কারবার।
আপনারও ঘুষ, দু-নম্বর কামাই?
আজ্ঞে না, জীবনে বাঁ-হাতে পাতিনি, পাততেও চাই না।
আমিও তাই, এক পালকের পাখি।
আমাদের কেনাকাটা হল সুইসাইডাল। জাপানিদের হারাকিরির মতো। যখন মরব, তখন একেবারে কপর্দকশূন্য!
আপনার ফ্যামিলি সাইজ?
তিন।
যাক বেঁচে গেছেন।
বেঁচে? দিতে হবে সাতজনকে।
আমাকে মশাই শালীতে মেরেছে। তিন তিনটে। থ্রি কমরেডস। বিয়েও হয় না কিছুতে। কীভাবে আমি এক ন্যাড়া, বেলতলায় গিয়ে বড়টিকে কাঁধে করে এনেছিলুম। এ বছরের ফ্যাশানটা জী জানেন?
মনে হয় 'নিকাহ'। কারণ ওইটাই তো এ বছরের হিট!
'গান্ধীও' তো হিট করেছে। হাঁটু-শাড়ি হলে কিছু ক্ষতি ছিল?
খুব ছিল। আপনার স্ত্রীকে মাস্তানে কামড়ে দিত।
আর একটা হিট বই ছিল—হিম্মতওয়ালা। বড় বড় পোস্টারে দেখেননি—ওয়াচ আউট, দিস ইজ শ্রীদেবী। ফ্যাশান যদি ওই দিকে গিয়ে থাকে, তাহলে দেবীরা এবার জিনস আর গেঞ্জি পরে বেরোবেন।
অ্যাঁ, তাহলে তো আমার স্ত্রীকে ঘটোৎকচের মতো দেখাবে! আপনার স্ত্রী কি স্লিম?—ছিলেন, আমার তোয়াজে কিঞ্চিৎ বেড়েছেন।
ইতিমধ্যে দোকানের ভেতর থেকে স্নেহমাখা ডাক আসবে, কই গো কোথায় গেলে।
'গো' তখন বিল মেটাবার জন্যে বলির পাঁঠার মতো হাঁড়িকাঠের দিকে এগোবেন।
বোঁচকাটি সগৌরবে বহন করার দায়িত্বও কর্তার। দোকানের বাইরে ফুটপাত। সেখানেও ছড়ানো কত্তামারার ইঁদুর কল। রেলিং-এ গা এলিয়ে সারি সারি ন্যাবালাগা অসময়ের ফুলকপি। গোটাকতক ঢুকে যাবে গৃহিণীর মুখ-ফাঁদালো ছেলে ধরার ব্যাগে। ফুলকাটা কাপ-ডিশও পকেট ধরে টানতে পারে। পলতোলা কাঁচের গেলাস। এমন হতে পারে, নতুন আর একটা ব্যাগ কিনতে হল। সব শেষে, রেস্তোরাঁয় শেষ রেস্তটি রেখে বাড়ি ফেরা। ফিশফ্রাই কিংবা ডবল ডিম মোগলাই।
তারপর সদলে ডেরিডামরি, বোঁচকাবুচকি নিয়ে স্টপেজে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা। চার চাকা আসে, ওঠা যায় না। বুক ফসকে প্যাকেট পালাতে চায়। লড়াইয়ের দুটো হাতই জোড়া। পেট ফুলছে, মাথা ধরছে। প্রাণ যায়রে পাঁচু! ট্যাক্সি? অসম্ভব ব্যাপার। ডাকাতি করতে না বেরোলে ট্যাকসি মিলবে না। নিরীহ মানুষের শেষ ভরসা এগারো নম্বর, দুটি পা, সে পা-ও নারাজ, নড়তে চায় না।
অবশেষে বিধ্বস্ত পরিবার লড়ুয়ে ছাতারের মতো লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ফিরে আসবেন। শেষ ইনভেস্টমেন্ট, এক পাতা অ্যান্টাসিড আর মাথা ধরার ট্যাবলেট। প্যাকেট খুলতে খুলতে গৃহিণী বিজয়িণীর মতো বলবেন—বুঝলে, এই দ্যাখো একটা ডটপেন ফ্রি গিফট। কী সুন্দর দেখতে!
ডেঙ্গো ডাঁটার মতো হাত-পা ছ্যাতরানো কত্তা মনে মনে হাসবেন, ডট পেন! মাত্র বারো আনা দাম। 'মা দুর্গা' লিখতে গেলে সস্তার রিফিল হাফটোনে লিখবে—-আ দাগা। বড় দাগা দিয়ে ছেড়ে দিলে মা। পকেট ওলটালে গোটা কতক বাসের টিকিট ছাড়া আর কিছু বেরোবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন