ফিরে আয়

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অ্যালবাম থেকে পোট্রেট সাইজের একটা ছবি খুলে মাধবী কাঁদো-কাঁদো গলায় বললে, 'এই ছবিটাই শেষ তোলা হয়েছিল, এই বছরখানেক আগে। ওর এক বন্ধু তুলেছিল।' অনিল হাত বাড়িয়ে ছবিটা নিল। পরিষ্কার স্পষ্ট ছবি। রাগ রাগ চেহারার এক যুবক। কান চাপা, ঝাঁকড়া চুল। নাকটা খাড়া, গাল দুটো অল্প ভাঙা। কপালের ডানপাশে একটা কাটা দাগ। ছেলেবেলায় দুর্ঘটনার স্মৃতি।

অনিল বললে, 'হ্যাঁ, এই ছবিটাতেই হবে।'

অ্যালবামে আরও অনেক ছবি রয়েছে। বিভিন্ন বয়সের রঞ্জন। অন্নপ্রাশনে, জন্মদিনে, স্কুল থেকে কলেজে। কোথাও মা-বাবার সঙ্গে, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে। মাধবী একে একে পাতা উলটে দেখতে লাগল। সতেরো বছরের সঞ্চিত স্মৃতি।

মাসখানেক আগে অনিলের এক বন্ধু অনিলের একটা ছবি তুলেছিল। অনিল যখন অফিসের টেবিলে বসে কাজ করছে সেই সময়। ছবিটার ফুলসাইজ প্রিন্ট এখন অনিলের চোখের সামনে টেবিলের কাচের তলায়। অনিল রাখেনি। রেখেছে মাধবী। বাঁধাবার খরচা অনেক। তবু কাচের তলায় থাকলে ভালো থাকবে।

অ্যালবাম মুড়ে রেখে মাধবী উঠে গেল। সতরো বছরের ছেলের জন্যে গত তিন দিন অনেক কেঁদেছে। আর কত কাঁদবে। সংসারে সবই সহ্য করতে হয়। সবই সয়ে যায়। বিচ্ছেদ, সে তো টিকটিকির ন্যাজ খসে যাওয়ার মতো। দেখতে দেখতে আবার গজিয়ে ওঠে। শূন্যতা বয়ে যায়। একটু বেদনা, একটু স্মৃতি। চাকা ঘুরতেই থাকে। অভ্যাসের চাকা।

রঞ্জনের ছবিটা অনিলের ছবির পাশেই পড়ে আছে। একটা বড় মুখ, একটা ছোট মুখ। একটা ঝলসে গেছে, আর একটা এখনও তাজা। একটা প্রায় শেষের সীমানাচিহ্নে আর একটা শুরুর মাইল পোস্টে। পথ সেই এক। দুটো মুখের দিকে অনিলের হঠাৎ নজর পড়ে গেল। কী আশ্চর্য সাদৃশ্য!

আজ তিন দিন হয়ে গেল, রঞ্জন নিরুদ্দেশ। অনুসন্ধানের কোনও ত্রুটি হয়নি। সর্বত্র দেখা হয়েছে। পুলিসে ডায়েরিও করা হয়েছে। কোথায় রঞ্জন! বাষ্পের মতো যেন মিলিয়ে গেছে! সঙ্গে কিছু নিয়েও যায়নি। পড়ার টেবিলে স্তুপাকার বই। ড্রয়ারে কলম। শূন্যে একটা মানিব্যাগ। আলনায় জামাপ্যান্ট। যেখানে যা ছিল সবই পড়ে আছে এলোমেলো ছত্রাকার। রঞ্জন উড়ছিল ঠিকই, দাঁড়ে ফিরে আসত। দানাপানি খেত। পড়ুয়া কাকাতুয়ার মতো রাধেকৃষ্ণ না বললেও, আবোল-তাবোল কপচাত। সুখশ্রাব্য না হলেও সকলকে শুনতে হত। এবার পাখি শিকলি কেটে সত্যিই উড়ে গেছে।

রঞ্জন আমাদের বখে যাওয়া ছেলে। সিগারেট তো ছোট নেশা। তার চেয়েও বড় নেশার অভিজ্ঞতা রঞ্জনের হয়েছিল। অনিল জানে, সব জানে। মুখ দেখলে বোঝা যায় মানুষ কতটা পবিত্রতা হারিয়েছে। চোখ দেখলে মনের খবর জানা যায়। এই তো অনিলের মুখ, ওই তো রঞ্জনের মুখ। এই মুখই তো বলতে পারে, ওই মুখের কথা। সব ব্যাঙের গায়েই তো ধীরে ধীরে দেখা দেবে গরলে ভরা বিষাক্ত গুটিকা। ভেকের সন্তান তো ভেকই হবে। সাপের সন্তান সাপ। তবে কী অধিকার ছিল অনিলের রঞ্জনকে শাসনের!

অনিলকে কে শাসন করবে! অনিলের বিবেক। সে বিবেক বহুকাল নিদ্রিত, অনন্ত-শয়ানে পাপের সমুদ্রে ভাসছে। প্রবৃত্তির ক্রীতদাস অনিল আর একজনের প্রবৃত্তিকে কী করে সংযত করবে! উত্তরাধিকার বলে একটা কিছু অবশ্যই আছে। সেটা কী? সে আর ভেবে লাভ নেই। যা হয় তা হয়। রক্তের ধারা নদীর মতোই চলে। কাকের পালক দেখতে দেখতেই কালো হয়ে ওঠে। রঞ্জনের ছবিটা একটা খামে ভরে রেখে অনিল উঠে দাঁড়াল। জীবনে এত জট পাকিয়ে রেখেছে, সব জট কি আর খোলা যাবে? কে খুলবে?

ঘরের দেওয়ালে অনিলের বাবার ছবি কাত হয়ে ঝুলে আছে। বহুকাল কেউ ধুলোটুলো ঝাড়ে না। ফুলের মালার বদলে চারপাশে ঝুলের ঝালর ঝুলছে। অনিলের মাঝে মাঝে চোখ পড়ে যায়। জীবন আর ছবি, দুটোকেই পোকায় কাটে। একটাকে দেখা যায় না, আর একটাকে দেখা যায়। কীটদষ্ট পূর্বপুরুষকে দেখে অনিলের তেমন কিছু ভাবান্তর হয় না। কে, কাকে, কদিন মনে রাখে! আজ কিন্তু ছবির সেই বিবর্ণ মানুষটির দিকে তাকিয়ে অনিলের মন বলে উঠল, ঠিক তুমিও যেমন, আমিও তেমন। এখনও তোমার কত কুকীর্তি মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। শেষ বয়েসে একটু ধার্মিক হয়েছিলে। তাতে তুমি মোক্ষলাভ করেছ কি না জানি না। তবে তোমার নামের কলঙ্ক ধুয়ে যায়নি। আজও শোনা যায়, বকধার্মিক আসু কেমন একে একে সব কটা ভাইকে ফাঁকি দিয়ে বিষয়সম্পত্তি সব গ্রাস করে নিলে? কেউ কেউ আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলে, মোষের মতো শরীর ছিল, যৌবনে স্ত্রী-বিয়োগ হল, রুগণ বড় ভাইয়ের স্বাস্থ্যবান স্ত্রীটিকে বেশ মনে ধরল। তারপর কী হল? মধু ডাক্তারের ইন্টারভেনাস ইনজেকশান। তারপর কী হল? তিনি গেলেন। আপনি রইলেন। কে কাকে কতদিন মনে রাখে। কত মাছই তো বঁড়শি গেলে তবু সব মাছই তো মুখিয়ে থাকে টোপের আশায়। মাছের তো শিক্ষা হয় না। আপনার বউদি কি ঠিক থাকতে পেরেছিলেন? দেহের মধ্যে যারা থাকে তারা কুরে কুরে খায়। সুখ আগে, না ত্যাগ আগে? যে যায় সে কি আর দেখতে আসে কে কী করছে? আসে না। মৃতের জগৎ আর জীবিতের জগৎ আলাদা। আমি জানি না, লোকে বলে, ওই যে তোমার বাবা মাঝে মাঝেই বউদিকে নিয়ে তীর্থে যেতেন, ধর্মের টানেই যেতেন, তবে সে হল মানবধর্ম। মনে নেই, শেষ বয়েসে তোমার জ্যাঠাইমার কী রকম ছুঁচিবাই হয়েছিল। তোমার বাবার বুলডগের মতো মুখ একজিমায় কালো হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কীসের সঙ্গে কী যে সব জুড়ে দেয়। কিন্তু!

অনিল ভয়ে কেমন যেন কুঁকড়ে গেল। যখনই সে এসব ভাবে তখনই ধাক্কা খায় এই 'কিন্তু'তে এসে। পাপ করলে একজিমা বা কুষ্ঠ হয় কি না, সেকথা শাস্ত্রে লেখা নেই। মনে পড়ে, জ্যাঠাইমার শেষ বয়সে বাবা যখন প্রায় না খেতে দিয়ে মৃত্যুকে আরও কাছিয়ে আনলেন, তখন তিনি মাঝে মাঝেই চিৎকার করে বলতেন, তোমার কুষ্ঠ হোক। আর তার বাবা কিছু দূরে বসে মৃদু মধুর হেসে বলতেন, পাগলে কী না বলে? তোমরা বুঝলে, পাগলে কী না বলে! পাগলে যাই বলুক, দগদগে একজিমার ঘায়ে সারা শরীর ঢেকে গেল। পাপ হয়তো রক্তে ঢোকে না কিন্তু কিছু অসুখ রক্ত থেকেই রক্তে ছড়ায়। একজিমা সেইরকম একটি অসুখ। তার মানে আমারও ওই এক পরিণতি। বীজের আকারে প্রবাহে ঢেলে দিয়ে গেছে। আসছে, তার আসছে। পায়ের চেটো বেয়ে ধীরে ধীরে মুখে উঠে আসবে। তোমার কিছু না পাই ওটা পাবই। কিছুই যে পাইনি তাও তো নয়। এত বড় একটা বাড়ি পেয়েছি, তোমার রক্তে যারা কাঁদত তারা আমার রক্তেও কাঁদছে, তোমার সন্দেহ, সংকীর্ণতা, কৃপণতা, লোভ, ভোগের ইচ্ছে সবই তো পেয়েছি। শেষ বয়সে তোমাকে ছুঁতে যেমন ভয় পেতুম এখন তোমার ছবিটাকেও তেমনি ছুঁতে ভয় করে। তবে আমিও আসছি। তুমি ডান দিকে হেলে আছ, আমি বাঁ দিকে হেলে থাকব।

অনিল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। মাথার ওপর বিরাট এক মামলার ছায়া ঘনিয়ে আসছে। কেসটার একটু তদবির করা দরকার। চাকরি তো যাবেই উলটে জেলও হয়ে যেতে পারে। এসব কথা মাধবী জানে না। এক সময় মাধবী শয্যাসঙ্গিনী ছিল। তখন একটু প্রেম-ট্রেম হত। ভালোবাসার কথা হত। সুখ-দু:খের কথা হত। জীবন পরামর্শ হত। এখন মাধবী অ্যাপেনডিকসের মতো। আছে থাক। মাঝে মধ্যে যখন সাইটিস হয়ে ওঠে তখন কেটে ফেলার চিন্তাই আসে। ফেটে বসলে পেরিটোনাইটিস হয়ে জীবন বিপন্ন করে দেবে। মাধবীকে এমন কিছু দেওয়া হয়নি যাতে বলা চলে, ওহে আমি রত্নাকর, তুমি কি আমার পাপের ভাগে নেবে? যেমন রঞ্জনকে বলা সম্ভব হয়নি, আমি তোর আদর্শ পিতা। আমার ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংযমের কাছে নতি স্বীকার কর। যাকে বলা যায়, সে হেসে বললে, ভোগের মাসুল দেবে না মধুকর?

ভবেশবাবুর চেহারা বাঘা উকিলের মতোই। কথা কম। ফি বেশি। যা বলার তা এজলাসেই তো বলব। মক্কেলের সঙ্গে বৃথা বাক্যব্যয়ে পরমায়ু ক্ষয় করে লাভ কী? এখনও অনেক বছর কোর্টে দাঁড়িয়ে চোরকে সাধু, সাধুকে চোর করতে হবে। অনিলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, 'স্টক থেকে অতগুলো টাকার মাল সরালেন, কাজটা একটু আটঘাঁট বেঁধে করলেন না। চুরিতে এত ফাঁক থাকলে উকিলকে পয়সা ঢাললে কী হবে? আমার কী এত ক্ষমতা যে, রাতকে দিন করে দোব। আগেই বলে রাখি আপনার কেসের অবস্থা তেমন ভালো বুঝছি না।'

অনিল আমতা আমতা করে বললে, 'আজকাল মানুষ খুন করে বেঁচে যাচ্ছে, বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর এই সামান্য ব্যাপারে ফেঁসে যাব?'

'ওই তো হয় মশাই। ডাকাতি করে কিছু হল না, ছিঁচকে চুরি করে জেলে চলে গেল। আপনার এখন একমাত্র বাঁচার রাস্তা, দপ্তরের ওই নতুন নিরীহ ছেলেটিকে জড়িয়ে দেওয়া। কী যেন নাম বলেছিলেন?'

'নীহার বোস।'

'হ্যাঁ, ওই নীহারকে বলি দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে হবে। সে রাস্তা কি খোলা রেখে এসেছেন?'

'আপনি কি আমাকে অত বোকা ভাবেন? চাকরিতে চুল পাকিয়ে ফেললুম আর বলির পাঁঠা তৈরি করে রেখে আসব না।'

'কেসটা আমি ওইভাবেই তা হলে সাজাই। তারপর দেখা যাক, জজে মানে কি না। ও-পক্ষের উকিলও তো কিছু কম যায় না।'

'তা ঠিক। তবে ওটা তো চুরিরই জায়গা। ও চেয়ারে যেই বসে সেই চুরি করে। ওপরওয়ালা মিত্তিরের সঙ্গে ভাগের গোলমাল না হলে আমার ফেঁসে যাওয়ার কোনও কারণ ছিল না।'

'ওই তো হয়, সেই চোরেই ধরা পড়ে, দারোগার সঙ্গে যার অবনিবনা।'

অনিল ভবেশবাবুর হাতে একটা খাম গুঁজে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রাস্তায় নেমে মনে হল, কাজটা কি ঠিক হবে! নীহার ছেলেটাকে জড়িয়ে ফেলা। সবে বিয়ে করে চাকরিতে ঢুকেছে। অনিলদা অনিলদা করে। করুক! অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, তুমি তো উপলক্ষ মাত্র। জীবই তো জীবের আহার! নীহারকে ফাঁসাতে পারলে তার নিজের পোজিশান ভালো হয়ে যাবে। চোরের জায়গায় সাধু, সাধুর জায়গায় চোর। বড়কত্তারা বলবে, বাবা, অনিল হল দুঁদে লোক। ঘাতঘোঁত সব জানে। ওর সঙ্গে চালাকি! সঙ্গে সঙ্গে অনিলের আরও প্রাোমোশন। নীহারের সাসপেনসান। জেল। আর তখন?

ভবেশবাবুর বাড়ির সামনে ফুটপাথে অনিল কিছুক্ষণের জন্যে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাস্তায় ব্যস্ত জগতের প্রবাহ বইছে হু হু করে। যত দিন যায় জীবন ততই দ্রুত হতে থাকে। আবার নীহারের চিন্তা মাথায় এল। সাসপেনসান। হাজার হাজার টাকার ডিফালকেসান কেস। বছর পাঁচেকের জেল তো হবেই। আর তখন? অফিস রিক্রিয়েশন ক্লাবের ফাংশানে নীহারের সদ্য বিয়ে করা বউকে দেখেছি। বেশ ভালো। অভিনয়-টভিনয় করে। ভালো নাচে। হাতকাটা ব্লাউজ পরে। ভুরু কামিয়ে আবার আঁকে। ও জিনিস নীহারের একার জন্যে নয়। সকলের জন্যে। নিশ্চয়ই অ্যামবিশান আছে। প্রেম করে নীহারের মতো ছেলেকে বিয়ে করে ফেলেছে। ও প্রেম চটকে যাবেই। কেরিয়ারের লোভ দেখালেই বেরিয়ে আসবে। বিলাস বাঁড়ুজ্জোর হাতে একবার কোনও রকমে ঘুরিয়ে ফেলে দিতে পারলে ও ঠিক লাইনে নিয়ে আসবেই। ধর্মতলার সেই জমাটি দোকানে বারকতক আসা যাওয়া। দু-চারটে ডিরেকটর আর ক্যামেরাম্যানের হাতে লোফালুফি হতে হতে নৈবেদ্যের থালায় চলে আসবে। সারা জীবনে ওরকম মেয়ে কত দেখা হয়ে গেল। না:, বয়স যত বাড়ছে খিদে ততই বাড়ছে। নতুন কি আছে কে জানে। সবই তো সেই এক। তবু রক্তে যেন কীসের জীবাণু ছটফট করে বেড়াচ্ছে। কিছুতেই শান্ত হতে দিচ্ছে না। আরও লোভ, আরও ভোগ। যত রাত বাড়তে থাকে, ততই মনটা নাচতে থাকে।

অনিল হাত তুলে একটা ট্যাক্সি থামাল। ড্রাইভার মনে হয় লোক চেনে। থেমে পড়ল। নীহারের বউয়ের কথা ভাবতে মুখে একটা লম্পট ভাব এসেছে। এরা লম্পটদের বেশ খাতির করে। তা না হলে মাতালরা বাড়ি ফেরে কী করে! অনিল বহুদিন লাল আলোর এলাকা থেকে সহজেই ট্যাক্সি ধরে মাঝরাতে বাড়ি ফিরছে। কখনও কোনও অসুবিধ হয়নি।

বউবাজার স্ট্রিটে একটা গয়নার দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে অনিল একটা লকেট কিনে ফেলল। এতকাল লোকে তাকে তদবির করেছে। ঘুস-ঘাস দিয়েছে। হোটেলে ঘর বুক করে ফুর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। জীবনে ঝাড়বাতি জ্বেলে দিয়েছে। আজ তাকে তদবির করতে হবে। চাকা তো এইভাবেই ঘুরে যায়। আবার যেদিন মওকা মিলবে সেদিন দেখে নেওয়া যাবে। লকেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে অনিলের মনে হল, সেই বর্ষার রাতে, নাটু ঘোষের সঙ্গে রোশান বাঈয়ের ঘরে বসে বসে মাইফেল শুনছে : দেখকুর রঙ্গ-এ-চমন হো ন পরেশাঁমালী। কৌকবে গুঁচ : সে শাঁখে হেঁ চমকতে বালী।

নরেন হালদার এর বাড়ির গলিতে গাড়ি ঢোকে না। অনিল বড় রাস্তাতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। দু'পাশে নোনা ধরা দেওয়াল উঠে গেছে। মাঝখানে পড়ে আছে সরু গলি। দু'হাত অন্তর আঁস্তাকুড়। ভ্যাপসা গন্ধ। রাস্তায় আলো নেই। মাঝে মাঝে খোলা জানলা গলে একটু আধটু আলোর রেখা এসে পড়েছে। ড্যাম্প ঘরে সংসারের খেলা কিছু কম জমেনি। খোলা জানলা দেখলেই অনিলের চোখ চলে যায়। অনেক দিনের অভ্যাস। খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে, ডুরে শাড়ি পরে সদ্য বিবাহিতা বই পড়ছে। পা দুটো হাঁটুর কাছ থেকে ভাঁজ হয়ে ওপর দিকে উঠে রেলের সিগন্যালের মতো হয়ে আছে। কোনও জানলায় চুল বাঁধার দৃশ্য। রাত ঘন হয়ে আসছে। আর কিছুক্ষণ পরেই হাঁসফাঁস শহর ঘুমোতে যাবে। নরেন হালদার আচ্ছা জায়গায় থাকে।

নরেন হালদারের বাড়িতে বাচ্চাদের কান্নার মাইফেল বসেছে। অন্ধকার ঘুপচি নীচের তলায় খানতিনেক ঘরে নরেন চোখ-কান বুজিয়ে তার বংশ বিস্তার করে চলেছে। মাঝখানে শ্যাওলা ধরা উঠোন। চারপাশে তলার ওপর তলা খাড়া মাথা তুলেছে। ভেতরে দোতলা তিনতলার বারান্দা থেকে ভিজে শাড়ি নিথর ঝুলছে। বাতাস ঢুকতে ভয় পায় এ বাড়িতে। নীচের জানালায় জানালায় এক সময় তারের জাল পড়েছিল। ধুলোয়, ধোঁয়ায়, ঝুলে এমন চেহারা হয়েছে! সংসারটাকেই অস্পষ্ট করে তুলেছে।

অনিল ঢুকেই দেখল নরেনের বউ একটা বাচ্চাকে বেধড়ক ঠ্যাঙাচ্ছে। আর একটা মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে টানছে। অনিলের হাসি পেল, এর জন্য সোনার লকেট! এক নজরে মেয়েদের শরীর দেখে নেওয়ার অভ্যাস অনিলের আজকের নয়, অনেক দিনের। গুরু ধরে শিক্ষা। মহিলার ছিল সব। নরেনের হাতে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিকমতো ব্যবহার হয়নি, তদবির হয়নি, সার্ভিসিং হয়নি। করপোরেশনের লরির মতো ইঞ্জিন শব্দ ছাড়ছে। এগজস্টে ডিজেলের ময়লা জমেছে। মুখটা ধারালো। অনিলের হাতে থাকলে বিয়ার খাইয়ে মাসখানেকেই মাংস ধরিয়ে দিত। রং খুবই ফরসা। একটু রক্ত ছোকাতে পারলে গোলাপি আভা ছাড়ত। একে সময় যথেষ্ট চুল ছিল। শ্যাম্পু করে এলো খোঁপা বেঁধে দিলে মন্দ হবে না। দু-একটা ভালো শাড়ি আর ব্লাউজ। তারপর পাশে এসে বোসো। বুকের ওপর লকেটটা কেমন মানায় দেখি?

অনিল পেছন দিক থেকে মহিলাকে দেখছিল। শাড়িতে আটার গুঁড়ো লেগে আছে। জল-হাত মুছেছিল। এখনও খামচা হয়ে আছে। মায়া লাগছিল। সম্ভাবনাময় মেয়েরা অন্যের হাতে থাকলে বড়ো কষ্ট হয়। মানে, কী হতে পারত, কী হয়ে আছে। পরে অবশ্য মায়াটায়া আর তেমন থাকে না। তাহলেও পার্কের গাছের মতো প্রথমটায় যত্ন করে ছেড়ে দাও, তারপর সে তো আপনিই ফুলেফলে শোভা হয়ে থাকবে। পাড়ো, খাও। ছায়ায় গিয়ে বসো। ভালো জিনিসের কদর বুঝতে হয়। মাধবী যখন এসেছিল, কী ছিল? এখন কী রকম হয়েছে? তবে একটু বেশি হয়ে গেছে। সবই বেশি বেশি। এখন আর মানুষের নোলায় জল পড়বে না। বাঘ জিভ ঢোকাবে।

অনিল গলা উঁচু করে বললে, 'নরেন কোথায়?'

মহিলা চমকে মুখ ফিরিয়ে বাঁ হাতে মাথায় আঁচল টেনে বলল, 'ডেকে দিচ্ছি।'

ডেকে দিতে হবে। ডাকলে শুনতে পাবে না। বাচ্চাটা যা চেল্লাচ্ছে। সত্যি কথাই। শব্দ ব্রহ্ম। নরেন কোণের দিকের রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। দু'হাতে আটা। রুটির আটা মাখছিল। বউকে সাহায্য করছিল।

'আরে দাদা আপনি! কী মনে করে?'

অনিল মধুর হেসে বললে, 'তোমাকে মনে করে। খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে!'

'না, না, ব্যস্ত না। এই রুবিকে একটু সাহায্য করছিলুম। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। দাঁড়ান হাতটা পরিষ্কার করে আসি।'

নরেন অদ্ভুত কায়দায় শ্যাওলা ধরা উঠোন পেরিয়ে অন্ধকার কলঘরের দিকে চলে গেল। আর তখনই অনিল বুঝতে পারল রুবির আবার ছেলেপুলে হবে। ভালো, এই তো বয়েস। ধর্ম, সংযম, বৈরাগ্য সবই অর্থহীন। চারপেয়ে জীবের মতো সুখী হতে পারলে জীবনের চেহারাই পালটে যায়। যোগ আর ভোগ নিয়ে আজকের লাঠালাঠি। অনন্তকাল ধরে দুটো মনের তুমুল লড়াই চলেছে।

নরেন অনিলকে শোওয়ার ঘরেই নিয়ে বসাল। তা ছাড়া আর বসাবে কোথায়! ঘরজোড়া খাট। বেডকভারটা বেশ চটকদার, একপাশে আলনা। মেয়েলি জিনিসপত্র ঝুলছে। দেহের গন্ধ বেরোচ্ছে। ঘরে দেবদেবীর ছবি ঝুললেও খুব একটা পবিত্র স্থান বলে মনে হচ্ছে না। দেওয়ালের দিকে খাটের বাজুতে রুবির অন্তর্বাস শুকোচ্ছে পাখার হাওয়ায়। রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ কষার গন্ধ আসছে। রাস্তার দিকের নর্দমা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

সময় নষ্ট করা অনিলের স্বভাব নয়। স্বার্থের কথা তাড়াতাড়ি বলে ফেলাই ভালো।

'নরেন, তুমি তো জানো, আমি সাসপেন্ড হয়ে আছি। যাই করুক কোর্টে আমাকে ফাঁসাতে পারবে না। তুমি যদি আমাকে একটু সাহায্য করো তাহলে আমি আরও কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পারি। এই নাও। এটা তোমার স্ত্রীকে দিও।'

অনিল ভেলভেটের বাক্স নরেনের হাতে দিল। নরেন খুলে দেখল, নীল ভেলভেটের ওপর সোনার লকেট সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। নরেন মনে মনে চমকে উঠল, জীবনের প্রথম ঘুস। টাকার অঙ্কে নেহাত কম হবে না। সৎ পথে নিজের উপার্জনের পয়সায় রুবিকে এমন একটা উপহার কিনে দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। আলো নেবানো ঘরে অন্ধকার বিছানায় দু-চারটে প্রেমের কথা ছাড়া আর কিছু দেওয়ার মুরোদ নেই। দুটি সন্তান দিয়েছে, আর একটি আনছে।

অনিল বললে, 'খুব সুন্দর মানাবে। তোমার বিয়ের সময় আমার সঙ্গে তো তোমার পরিচয় ছিল না। তোমরা দুজনে সুখী হও। হ্যাঁ, যে কথা বলছিলুম। সমস্ত খাতাপত্তর এখন তোমার হাতে। স্টক, ইসু রেজিস্টার, কোটেশান, চালান, পারচেজ ভাউচার। তুমি সামান্য এদিক ওদিক করে দিলেই স্টোরকিপার নীহার জড়িয়ে পড়বে। নীহারের বয়েস কম, চাকরি গেলে আবার পাবে। জেলে গেলে তেমন কষ্ট হবে না। আমি বুড়ো হয়ে গেছি নরেন। চুলে কলপ দিয়ে আর কতকাল বয়েস চেপে রাখব। চুরি সবাই করে। আমি তো কারুর বাড়িতে সিঁধ কাটতে যাইনি। যার অঢেল আছে, এই সরকারের ভাণ্ডার থেকে সামান্য কিছু সরিয়েছি, এতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে! ওই ব্যাটা ডিসপেপটিক ডিরেক্টার প্রাোমোশানের ফিকিরে আমার পেছনে লেগেছে। ব্যাটা দশরথপুত্র শ্রীরামচন্দ্র! নাও, তোমার স্ত্রীকে একেবারে ডাকো, রাত হয়ে যাচ্ছে। তোমাদের বিশ্রামের সময়।'

নরেন গম্ভীর মুখে লকেট কেসটা অনিলের টেবিলের পাশে রেখে দিল।

'অনিলদা, আমার স্ত্রী তেমন মডার্ন নয়। বাইরের লোকের সামনে বেরোতে ভয় পায়। তা ছাড়া, যে কারণে এটা আপনি দিতে চাইছেন, তার কিছুই করা যাবে না। সমস্ত খাতপত্তর সিল করে গর্ভনমেন্ট প্লিডারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া, উপায় থাকলেও আমি আপনার মতো একজন নোংরা লোকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোনও অন্যায় কাজ করতুম না। আমার তেমন অ্যামবিশান নেই অনিলদা। নেহাতই ছা-পোষা মানুষ।'

অনিল গালাগাল তেমন গায়ে মাখল না। ওসব অনেক শুনে শুনে চামড়া পুরু হয়ে গেছে। শুধু জিগ্যেস করলে, 'সব রেকর্ডই এখন তা হলে হাত-ছাড়া?'

'হ্যাঁ, হাত-ছাড়া, আমাদের আর কিছুই করার নেই, যা হওয়ার তা কোর্টেই হবে, ওখানেই আপনাকে লড়তে হবে।'

'আচ্ছা, আমি তাহলে চলি। তুমি এইরকমই সৎ থাকো সারা জীবন। চরিত্রই সব চেয়ে বড় জিনিস, সোনার চেয়েও দামি।'

বাক্সটা তুলে নিয়ে অনিল আবার গলিতে নামল। সেই অন্ধকার, আবর্জনাময় পথ। এবার অবশ্য আরও অন্ধকারের দিকে প্রসারিত নয়। চলে গেছে আলোকিত বড় রাস্তার দিকে। জীবনের চালে এবার হারের সময় এসেছে। সব খেলাতেই কি আর জেতা যায়! এতক্ষণে রঞ্জনের কথা বড়ো মনে হচ্ছে। শরীর ভেঙে আসছে। প্রস্টেটে গোলমাল দেখা দিচ্ছে। হয়তো ক্যানসার। মামা তো প্রসেস্ট ক্যানসারেই গত হয়েছিলেন। পঞ্চাশের কিছু পরেই। চাকরিটা তো যাবেই বোঝা যাচ্ছে। জেলের হাত থেকে বাঁচতে হলে সর্বস্বান্ত হতে হবে। একমাত্র ভরসা রঞ্জন। ছেলে যদি শেষের সময় বাপকে না দেখে, কে দেখবে? কোথায় গেল ছেলেটা?

শালা নরেন, কোনদিন যদি সুযোগ আসে, তোমার বারোটা আমি বাজাবই। যে হারে বংশ বিস্তার করছ, ছানাপোনা নিয়ে একদিন তোমাকে ন্যাজে-গোবরে হতেই হবে। তখন মারব তোমাকে কোপ। হাঁড়ি শিকেয় তুলে ছেড়ে দোব! লুচি দিয়ে ডিমের কারি খেয়ে, বউ জড়িয়ে শুয়ে পড়া বেরিয়ে যাবে! তখন আর নারী-শরীর জরিপ করতে হবে না। জরিপ করবে অভাব। সে সুযোগ কি আসবে অনিল? কত লোককেই তো দেখে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল?

পারছি কই! প্রতিহিংসার শেষ নেই, শক্তি বড় কম। না:, রঞ্জনটার কী হল? একটিমাত্র ছেলে!

রঞ্জনের একটা ঘাঁটি ছিল। স্যাঙাত ছিল অনেক। তারা বলেছিল, আপনি খোঁজ করুন, আমরাও দেখছি। আজকাল খুব মার্ডার হচ্ছে। কেউ ঝেড়ে দিল কি না, কে জানে? ঝেড়ে দিলে তো হয়েই গেল। আর সে বয়সও নেই, শক্তিও নেই, যে নতুন করে সন্তান লাভ করে আবার নব ধারাপাত থেকে শুরু করবে। এখন যা পারা যায়, একটা ট্যাক্সি ধরে মায়ার কাছে যাওয়া। রাত বেশ হালকা ফুরফুরে, মনে বেশ অন্ধকার, মায়া বেশ পুরোনো মদের মতো সোনালি বুজবুজে। পাপের শরীর আর সাপের শরীর একই রকম। দেখলে গা শিউরে ওঠে, ছোবলে বেশ নেশার মৌতাত আসে। গ্যাঁড়া মিত্তির বেশ ভালোই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। গ্যাঁড়া নিজে সেরিব্রাল থ্রম্বোসিসে পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে। তা থাক। আমি তো এখনও খাড়া আছি। মায়া অনেক ঝেড়েছে। না হয় আর একটা লকেট ঝাড়বে। ক্ষতি কী! কত জাহাজই তো সমুদ্রে তলিয়ে যায়!

থাক, মায়া এখন মায়াতেই থাক। রঞ্জনের সন্ধের ঘাঁটিতে একবার যাওয়া যাক। নেতার নাম বুল। কীসের নেতা কে জানে! ওয়াগান ভাঙার, কি চোরা চালানের, কি চোলাই মদের, বুলই জানে। তবে পাড়ায় বেশ দাপট আছে। 'এই শোন' বলে ডাকলে সকলেই থমকে দাঁড়ায়। মাঝে মধ্যে জিপে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। সাবেক কালের বাড়ির নীচের ড্রইংরুমে রোজই চক্র বসে। লোকজনের আসা-যাওয়া। দেওয়ালে কাত হয়ে থাকা সাইকেল। দু-চারটে মোটর বাইক, স্কুটার । গভীর রাত পর্যন্ত কীসের যে ষড়যন্ত্র চলে। মাঝে মাঝে ফোন বেজে ওঠে। রঞ্জন এই আড্ডায় কী করে এসে পড়েছিল, কেনই বা এসেছিল?

বুলের চোখ দেখলেই বোঝা যায়, সারাদিনই চড়িয়ে থাকে। ছেলেটাকে দেখতে ভারী সুন্দর। অপঘাতেই মরবে। কোনও সন্দেহ নেই। এসব ছেলে বেশিদিন বাঁচে না। অনিলকে দেখে বুল ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মুখে সিগারেট। অনামিকায় হীরের আংটি চকচক করছে। ফরসা কপালে এলোমেলো ঘন কালো চুল। অনিল জিগ্যেস করলে, 'কোনও সন্ধান পেলে?'

'হ্যাঁ, একটা উড়ো খবর পেয়েছি। রেন্টুর বউয়ের সঙ্গে দীঘা যাওয়ার কথা ছিল। হয়তো তাই গেছে।'

'রেন্টুটা কে? নাম শুনেছি বলে মনে হচ্ছে না তো!'

'রেন্টু ছিল রেসের বুকি। দীঘায় একটা হোটেল করেছিল। বছর চারেক আগে দীঘাতেই জলে ডুবে মারা যায়। লোকে বলে মার্ডার। ওর বউই নাকি খুনটা করায়, মহিলার অনেক উপ ছিল। এখনও আছে। ওপরতলার জিনিস। কেস-ফেস দাঁড়ায়নি। সেই মালের খপ্পরে আপনার ছেলে পড়েছে। আমরা বারণ করেছিলুম। শোনেনি। চুষে শেষ করে ছিবড়ে ফেলে দেবে। একবার খবর নিয়ে দেখতে পারেন।'

'কোথায় নিতে হবে?'

'ডিকসন লেনে চলে যান। মঞ্জুলা চ্যাটার্জিকে সবাই চেনে। একটা নীল রঙের ওপেল গাড়ি আছে। নিজেই চালায়। বিলিতি স্টাইলের বাড়ি। বাগান আছে। কুকুর আছে।'

ঘরে ফোন বেজে উঠল। বুল চলে গেছেন। সামনের বাড়িতে রেকর্ডে ঠুংরি বেজে উঠল। শরৎকাল। আকাশে মানচিত্রের মতো সাদা মেঘ উঠেছে। কোন বাড়িতে রেডিও খুলেছে। কাঁপা কাঁপা গলা শোনা যাচ্ছে, ট্রেন দুর্ঘটনায় বত্রিশ জনের জীবনাবসান। ধবধবে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে রোগা চিমসে মতো একটা লোক কুকুর নিয়ে ফুটপাথে বেড়াতে বেরিয়েছেন। চোখে রিমলেস চশমা। কুকুরটার পেটে ক্রশ বেল্ট, প্রভুর হাতে লিড। ভদ্রলোকের মুখে সিগারেট। সামনে টাক পড়ে এসেছে। রাতের আহার শেষ করে সারমেয় নিয়ে হজমে বেরিয়েছেন। কুকুরটা একটা ল্যাম্পপোস্টে ঠ্যাং তুলে পেচ্ছাপ করে, ফোঁস ফোঁস করে শুঁকে, খুড়খুড় করে উত্তর দিকে চলল। অনিলও চলল পেছন পেছন। রাত হয়েছে। বাড়ি ফিরতে হবে। খবর হচ্ছে রেডিয়োয়। মাঝে রেকর্ডের রাগপ্রধান মিশে যাচ্ছে, কোয়েলিয়া গান থামা এবার। রেলমন্ত্রী দুর্ঘটনা সম্পর্কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তোর ওই কুহু তান, ভাল লাগে না আর।

অনিল রিকশা চেপে, শরতের হাওয়া খেতে খেতে, মেঘ-ভাসা আকাশের তলা দিয়ে বাড়ি ফিরে এল। অন্য দিন এলিয়ে পড়ে। আজ খাড়া আছে। শহর বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রিকশার পা তেমন চলছে না। পাশ দিয়ে শেষ বাস চলেছে ধুঁকতে ধুঁকতে। সাদা একটা মোটর গাড়ি পেছনে লাল চোখ মেলে ক্রমশ দূর থেকে দূরে চলেছে। দু পাশের ফুটপাথে খাটিয়া পড়েছে। সারি সারি চাদর ঢাকা মানুষ লাশের মত পড়ে আছে। একটা মরদের কোমরের ওপর একজন জোয়ান ছুকরি দাঁড়িয়ে উঠে খুব দাবাচ্ছে। পায়ের মল বাজছে ছিনিক ছিনিক শব্দে।

বাড়ির সামনে রিকশার ঠুনুর ঠুনুর শব্দ শুনে মাধবী তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল। অন্য দিন অনিলকে দরজার সামনে থেকেই ধরে নিয়ে চৌকাট পার করাতে হয়। আজ তার আর প্রয়োজন হল না। কত বছর পরে অনিল সোজা হয়ে, শক্ত পায়ে বাড়ি ফিরল! অনিল বুঝতে পারল, মাধবী অবাক হয়েছে। দরজা বন্ধ করতে করতে মাধবী জিগ্যেস করল, 'কোনও খবর পেলে?'

'না তেমন কিছু নয়, তবে দীঘায় যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কাল আবার দেখব। আমার কিছু খাবার আছে?' অন্যদিন অনিল খাবার মতো অবস্থায় থাকে না। আজ খুব খিদে। মাধবী বললে, 'হাত মুখ ধোও, দিচ্ছি।' ঢাকা বারান্দায় মৃদু আলো জ্বলছে। উপরি টাকায় অনিল বাড়িতে অনেক রকম কায়দা করেছে, আলোর আবরণ দুধের মতো সাদা। চারপাশ মায়াবী। দেওয়ালে বিদেশি পেন্টিং, গিলটির কাজ করা ফ্রেমে। বাঁ পাশে জাফরির কাজ।

মাধবী আগে আগে চলেছে। পেছনে অনিল। পায়ের কাছে শান্তিপুরী ধুতির কোঁচা লুটোচ্ছে। গ্রিসিয়ান নিউকাটের হালকা মুচ মুচ শব্দ দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। কোথা থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ আসছে। বেশ লাগছে মাধবীর পেছন পেছন যেতে। এতদিন তো অনেকের পেছনেই ঘুরেছে! নিজের স্ত্রীকে তো তেমন খারাপ লাগছে না। মায়ার সঙ্গে এর তফাত কোথায়। কেমন পবিত্র শরীর। ঘটের মতো নিতম্ব। পুরুষ্টু বাহু। চওড়া পিঠ।

অনিল বললে, 'দাঁড়াও।'

মাধবী অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। আদেশ, অনুরোধ, স্নেহ, অত্যাচার কোনটা! শেষেরটাই তো এতকাল জুটে এসেছে। মাধবী দেওয়ালে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিল আর দু'পা এগিয়ে এসেছে। দু'হাতে ধরে আছে সেই লকেটটা। এর চেয়ে অবাক কাণ্ড আর কী হতে পারে? গলায় পরিয়ে দিতে দিতে অনিল বললে, 'তোমার আমি, আর আমার তুমি ছাড়া সংসারে কে আছে?

মাধবী গলায় হাত দিয়ে জিনিসটার স্পর্শ নিতে নিতে বললে, 'হঠাৎ এই দু:খের দিনে?'

'জীবনটাই তো হঠাৎ গো। এই আছে এই নেই। হঠাৎই তো সব পালটে যায়।'

'ছেলেটা কোথায় চলে গেল?'

'আসার হলে আসবে, যাওয়ার হলে যাবে। আমিও তো রোজ এসেছি। আজকের মতো কোনদিন এসেছি কি?'

অনেকদিন পরে অনিল মাধুরীর পায়ে পা জড়িয়ে বুকের ওপর আদরের হাত ফেলে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কারুরই কিন্তু ঘুম এল না। আকাশে আজ অনেক তারা। বাতাস বড়ো এলোমেলো। প্রকৃতিতে যেন কীসের মাতন লেগেছে আজ। এমনও তো হতে পারে, বুল যা বললে, রঞ্জনকে হয় তো খুন করে কচুরিপানা ভরা কোনও এঁদো পুকুরে ফেলে দিয়েছে। আলকাতরার মতো কালো জলে রঞ্জন তলিয়ে আছে। কেউ জানে না। শকুনরাই শুধু অপেক্ষায় বসে আছে।

পরের দিন দুপুরে অনিল বেরোল ডিকসন লেনের মঞ্জুলার সন্ধানে। মঞ্জুলা প্রকৃতই খুব পরিচিত মহিলা। সকলেই তাকে চেনে। নাম শুনে এক ধরনের মুচকি হাসি খেলে যায় মুখে। বুল যেমন বলেছিল বাড়িটা ঠিক সেই রকমই। তবে বড়ো বেশি নির্জন। চারপাশে বাগান। আলিবাবার চিচিঁং ফাঁকের মতো বিশাল একটা গেট। অল্প একটু ফাঁক হয়ে আছে। ঢুকেই ডান পাশে কোনও কালে বোধহয় একটা কারখানা ছিল, টিনের ঘর। মরচে ধরা কিছু খালি ড্রাম পড়ে আছে। যেন নেশাখোরদের আড্ডা। কোনোটা খাড়া, কোনোটা গড়াগড়ি।

কোনও একটা ঝোপে বসে দুটো হাঁড়িচাচা পাখি থেমে থেমে ডাকছে। দুপুরের ইস্পাত চাদরে যেন হাতুড়ি পিটছে। গাড়ি বারান্দার একপাশে ঝকঝকে গাড়ি পার্ক করা। রেন্টু চট্টোপাধ্যায় কত বড়লোক ছিলেন রে বাবা! কে জানে ঐশ্বর্যের গোপন কথা! কেউ কি প্রকাশ করতে চায়। বর্মাকাঠের ঝকঝকে বিশাল দরজা। সোনার মতো পেতলের কারুকাজ করা বিচিত্র কড়া। দুধ-সাদা কলিংবেলের বোতাম। বোতাম টিপতেই ভেতরে একটা কুকুর মিহি গলায় ঘেঁউ ঘেঁউ করে উঠল। দরজা খুলল আয়াশ্রেণির এক মহিলা।

অনিল ইতস্তত করে বললে, 'মঞ্জুলাদেবী আছেন।'

'হ্যাঁ আছেন, ভেতরে এসে বসুন।'

অনিল ভেতরে ঢুকতেই গাঢ় বাদামি রঙের একটা কুকুর এসে ফোঁস ফোঁস করে ঘুরে ফিরে শুঁকতে লাগল। সোফায় বসেও নিস্তার নেই। লাফিয়ে পাশে উঠে বার কতক নাক-মুখ চেটে দিল। লোমে পাউডারের গন্ধ। বসার ঘরটা বিশাল।

কাঠের ওপর ফুলতোলা সব সোফাসেট। নিখুঁত করে সাজানো। দেওয়াল ঘেঁষে এখানে-ওখানে পেতলের কাজকরা, নানা মাপের সাইড টেবিল। বড় বড় জানালায় ফিনফিনে নীল পর্দা। একবারে শেষ প্রান্তে একটা অর্গান। এক পাশের দেওয়ালে একটা মুখোশ ঝুলছে। তিনটে ঝাড়লণ্ঠন। বেলজিয়াম কাঁচের বিশাল আয়না। সব মিলিয়ে রাজকীয়।

মঞ্জুলা ঘরে ঢুকতে অনিল ভীষণ অবাক হয়ে গেল। প্রায় মাধবীর বয়সী। তা ছাড়া এ মুখ কোথাও যেন দেখেছে। নিশ্চয়ই পাপের তাড়নায়। পাপের পথই ঐশ্বর্যের পথ। মঞ্জুলা খসখসে গলায় বলল,

'কে আপনি?'

অনিল চমকে উঠল। মনোযোগ দিয়ে মঞ্জুলাকেই দেখছিল। দেখার মতই জিনিস। শাড়ি এত ফিনফিনে হয়! পারসিদের অবশ্য এমন শাড়ি পরতে দেখেছে। সারা গায়ে মিষ্টি সুবাস। নির্জন দুপুর যেন সম্ভাবনায় ভরে উঠেছে। এক সময় মহিলা খুবই ফরসা ছিলেন। এখন যেন গায়ে ধোঁয়া লেগেছে। বেশ প্যাক করা শরীর। অনিলের হঠাৎ সেই বাউল গানটা মনে পড়ে গেল : চারিদিকে পাপ রে ভাই নেই কোথাও কোনও আলো এর চেয়ে অন্ধ হওয়া ছিল রে ভাই ভালো। অনিল বললে,

'আমি রঞ্জনের বাবা।'

'ও তাই নাকি।'

মঞ্জুলা পায়ের ওপরে পা তুলে বসল। অনিলের গত রাতের আত্মোপলব্ধি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। রক্তে আবার সেই চিৎকার। মশলার গন্ধ। দূর থেকে যেন ভেসে আসছে পেঁয়াজ আর রসুন দিয়ে মাংস কষার মোগলাই মেজাজ। মঞ্জুলার পায়ের অনেকটাই অনাবৃত হয়ে পড়েছে। লোমনাশক মেখে মেখে গোলাপী বর্ণ। সেই পা আবার মৃদু মৃদু দুলছে। চেতনাকে যেন টুকুস টুকুস ঠোকরাচ্ছে।

অনিলে বললে,

'আমার ছেলের খবর আপনি কিছু জানেন?'

মৃদু হেসে মঞ্জুলা বললে, 'হ্যাঁ, ছেলেটি ভালো, বেশ কথা শোনে। তবে একটু খেয়ালি।'

'সে খবর নয়, আজ চার-পাঁচ দিন সে নিরুদ্দেশ, কোনও খবর পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি কি তাকে দীঘায় পাঠিয়েছেন?'

'না:, তার তো কাল আমার সঙ্গে যাওয়ার কথা!'

'আপনার কাছে এর মধ্যে আসেনি?'

'সাত-আট দিন আগে রাতের দিকে এসেছিল। আমি একটু ইনটকসিকেটেড ছিলুম। সেই সময় কি একটা ব্যাপারে, আমি টেম্পার চেক করতে পারিনি, ঠাস করে একটা চড় মেরেছিলুম। ইমিজিয়েটলি হি লেফট। তবে সেটা কোনও কারণ নয়। আগেও আমাদের এরকম হয়েছে। কি টেকস ইট ভেরি স্পোর্টিংলি।'

'এখানে কীজন্যে আসে?'

'আমাকে ভালোবাসে বলে। আই অলসো লাইক হিম। হোয়েন আই ফিল লোনলি, আই নিড কম্পানি। এতে তো দোষের কিছু নেই! উলফের মত মানুষও প্যাক অ্যানিমাল। সঙ্গ চায়।'

তা বলে, ওর একটা ভবিষ্যৎ আছে তো?'

'ভবিষ্যৎ আবার কী? পুওর ডাইজ পুওরার, রিচ ডাইজ রিচার, সিন ডাইজ উইথ দি সিনার। সো হোয়াট।'

'আমি ওর বাবা।'

'সো হোয়াট! সে তো কেউ না কেউ কারুর বাবা হবেই। ল' অফ নেচার।'

'আমার একটা দুশ্চিন্তা আছে।'

'ডাই উইথ দ্যাট।'

'আপনার হচ্ছে না?'

'না, আমি আমার সব সেন্টিমেন্ট মেরে ফেলেছি। পৃথিবীটা আমার কাছে একটা ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট ওয়ার্লড। টুলস অ্যান্ড ইমপ্রিমেন্টসে ভরা। আই হ্যাভ লস্ট আ স্ক্রু ডাইভার, আই উইল গেট অ্যানাদার স্ক্রু ডাইভার।'

'ও।' অনিল কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গেছে। এ আবার সম্পূর্ণ অন্য ধাতু। অন্য শব্দ।

মঞ্জুলা বিরাট একটা বৃত্ত তৈরি করে পায়ের ওপর থেকে পা নামিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেশ কাটা গলায় বললে, 'ইউ লুক সিলি। ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম অ্যান্ড ইয়োর টাইম।'

ঘাড়ধাক্কা খেয়ে অনিল খাঁ খাঁ ডিকসন লেনে এসে দাঁড়াল। ভাদুয়া রোদে পৃথিবী জ্বলছে। শরীর জ্বলছে। মেয়ে মাকড়সার গল্প শুনেছে। একটা বিশেষ সময়ের পরে পুরুষ মাকড়সাকে চুষে খেয়ে ফেলে। ভীমরুল দেখেছে। হলুদ বোলতাকে পায়ে চেপে ধরে মাথায় হুল ফোটাচ্ছে, কড়কড় শব্দে। ঘিলু চুষে নিয়ে উড়ে যাওয়ার পর, বোলতাটা পড়ে পড়ে অনেকক্ষণ ছটফট করতে করতে মরে যায়। অনিল বাড়িটার দিকে পেছন ফিরে একবার তাকাল। মনে হল চাবুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।

এবার তাহলে কী হবে? দীর্ঘ অপেক্ষা। তুই ফিরে আয়। শেষ আর একবার দেখতে হবে মিসিং পার্সনস স্কোয়াডে। তারা কিছু তো একটা করবেই। অনিল একটা ট্রামে উঠে পড়ল। নিজেকে কেমন যেন অসংলগ্ন আর বিক্ষিপ্ত লাগছে। দড়ির বাঁধন খুলে মাঝ রাস্তায় জিনিসপত্র ছড়িয়ে পড়লে যেমন লাগে।

অনিল সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী বললেন, 'এসেছেন ভালো করেছেন, এই ছবিগুলো দেখুন তো।'

অনিলের হাতে একগাদা ফটোগ্রাফ। ধুলোপড়া চায়ের দাগ লাগা টেবিল। টিনের চেয়ার। অল্প আলো। অনিল একের পর এক অনাসক্ত মৃত মুখের ছবি দেখে চলেছে। যেমন তোলার কায়দা তেমন প্রিন্ট। দায়সারা কাজ। তবু দেখলে চমকে উঠতে হয়। যন্ত্রণার মৃত্যু নিয়ে যাওয়ার আগে পদাঘাত করে গেছে। ঠেলে আসা ভাষাহীন নিমীলিত চোখ। ঈষৎ ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁট। গভীর সব ক্ষতচিহ্ন। এদেরই হয়তো কত বোলচাল ছিল। কত অহঙ্কার ছিল, পাপ ছিল। আর কোনওদিন জেগে উঠবে না। অলিখিত ইতিহাস সরকারি ফাইলে চাপা পড়ে রইল। এসব ছবি দেখা যায় না। মনে ভূমিকম্প হয়। বিশ্বাস, অবিশ্বাস সব ভেঙে ভেঙে পড়ে যায়। একটা মুখের সঙ্গে রঞ্জনের মুখের ভীষণ মিল; কিন্তু বয়েসটা বেশি। গলার কাছে গভীর ক্ষত। অনিল খুব ভালো করে দেখল। না, রঞ্জন নয়।

ছবির প্যাকেট ফিরিয়ে দিয়ে সে আবার পথে এসে দাঁড়াল। চড়া আলোয় নিজের হাত-পা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল বারে বারে। মানুষের ভেতরটা যত শক্ত, বাইরেটা তত নয়। বড়ো নরম, বড়ো অপলকা। একটা ঘষা লাগলে ছড়ে যায়। এক কোপে কণ্ঠনালী দু ফাঁক হয়ে প্রাণবায়ু সরে পড়ে। অথচ ভেতরে কত দাপট, কত সব ইচ্ছা অনিচ্ছা। কত বদমায়েশি। ওই তো, শেষকালে ওই ছবির মতো মরা মাছের চোখ, ঝুলে পড়া ঠোঁট। মুখ বিস্বাদ, মন ভারাক্রান্ত। উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে দাম্ভিক সেনানায়ক দেখছে, যুদ্ধে হার হয়েছে। ছত্রাকার রণক্ষেত্র।

বিষ দিয়েই বিষ মারতে হবে।

মায়া! নামটা বেশ। সবই তো মায়া। বর্ণমালায় আর কয়েকটা অক্ষর এগোলেই সায়া। অনিল মনে মনে হাসল। হয় না। কুকুরের বাঁকা ন্যাজ সোজা হয় না। দৈত্যেও পারবে না, দেবতাতেও পারবে না। রক্ত বেরোলেও উট সেই কাঁটা গাছ খাবেই। কাক যত চেষ্টাই করুক গলা দিয়ে কোকিলের সুর বেরোবে? ভেতর থেকে যাকে যেদিকে ঠেলবে তাকে সেদিকে যেতেই হবে। মঞ্জুলার কাছে রঞ্জন কেন? মঞ্জুলা তো তারই বিষয়। রঞ্জন? সে তো ছোট অনিল। ছোট হয়েও বড়। তাকে মেরে বেরিয়ে গেছে।

মায়া-বাঁধন কেটে অনিল ন'টা নাগাদ উঠে পড়ল। নখর-দন্তহীন ব্যাঘ্র আর কত খাবে। থাকত রঞ্জনের মতো একটা শরীর? ভেতরের কলকব্জার অর্ধেক অচল। ঘড়ির মতো অবস্থা। ছোটোখাটো মেকানিকে আর হবে না। খোদ কোম্পানিতে পাঠাতে হবে।

অনিল যখন রিকশা থেকে বাড়ির সামনে নামছে, মাধবী তখন দেখেই বুঝল, আজকের অনিল কালকের অনিল নয়, চিরকালের অনিল। নাকটা লাল। চোখে সন্দেহের লাল নজর। বাতাসে ভেসে আসা গন্ধ। তবে একটু কম। ভেতরটা বেরিয়ে পড়লেও সবটা বেরোয়নি। অনিল মাধবীর কাঁধে ভারী ডান হাতটা রাখল। হাতের বড় বড় লোম গলায় লাগছে। সমুদ্রের ফেনার মতো আলো ছড়ানো, চাপা বারান্দায় মাধবীর পাশে পাশে পা ঘষে ঘষে অনিল হেঁটে চলেছে। ডান পাশেই ঘরের দরজা। একটা পা তুলে ঢুকতে গিয়েও কী ভেবে ঢুকল না, টাল খেয়ে পিছিয়ে এল। বাতাস লাগা গোলপাতার মতো দুলতে দুলতে মাধবীর চিবুকের তলায় একটা আঙুল রেখে মুখটা সামান্য ওপর দিকে তুলে ধরে জড়ানো গলায় বললে, 'ভেবো না, বুঝলে, ভেবো না। আসার হলে সে ফিরে আসবে। আর যদি না আসে তা হলে আসবে না। আমি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে এসেছি। কাল সকালে তোমার ছেলের ছবি কাগজে বেরোবে। রঞ্জন, ফিরে আয়।'

সকালের কাগজে দুইয়ের পাতায় বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। ওপরে রঞ্জনের ছবি। তলায় লেখা, 'অনিল, ফিরে আয়, তোর মা শয্যাশায়ী। টাকার দরকার থাকলে লিখে জানা। ফিরে এসে মাকে বাঁচা। তোর বিরুদ্ধে আমাদের কোনও অভিযোগ নেই।'

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%