সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অতি মূল্যবাণ একটি জিনিস চিরতরে হারিয়ে গেল জীবন থেকে। সেটি হল, আমার শৈশব। আর ফিরবে না। সময় থেকে সময় চলে গেল। ফেলে গেল স্মৃতি। জীবনের সঙ্কীর্ণ দিকগুলি তখন বুঝতে পারতুম না।
যে মাঠে আমরা খেলা করতুম, সেটা কার সম্পত্তি আমাদের জানার দরকার ছিল না। যে পুকুরে সাঁতার কাটতুম, ঢিল, ঢিল, ঢিলের পর ঢিল ছুড়ে জলটাকে অশান্ত করে তুলতুম, সেটা কোন জমিদারের, খবর রাখার প্রয়োজন হয়নি। গরিব, বড়লোকের ব্যবধান বুঝতুম না। বড়লোাকরা অবশ্য আমাদের জীবন সীমায় কখনই আসত না। অহংকারের কারাগারে মোসায়েব পরিবৃত হয়ে মেয়াদ খাটত যেন। ঐশ্বর্যের কারাদণ্ড। সংখ্যায় তারা বেশি ছিল না। অদ্ভুত ধরনের মানুষ সব। তাদের নজরে আমরা ছিলুম ছোটলোক। আমরা তাদের জানোয়ার ভাবতুম, তারাও আমাদের জানোয়ার ভাবত। আমাদের অঙ্গে আধময়লা হাফ প্যান্ট, কোনওরকমের একটা জামা। ধুলো কাদা মাখা পা। এলোমেলো চুল। গাছ থেকে ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারা, জামরুল পেড়ে খাই। ছুটে গিয়ে পুকুরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সাঁতরে এপার ওপার করি। পয়সা পেলে তেলেভাজা ফুলুরি কিনে ভাগ করে খাই। ধর্মস্থানে দরিদ্র নারায়ণ সেবা হলে পঙক্তিভোজনে পাতা পেতে খিচুড়ি খেতে বসে যাই। হঠাৎ আসা বাউল যখন একতারা বাজিয়ে মন উদাস করা গান গাইতে গাইতে মাঠের পথ দিয়ে হেঁটে যেতো আমরা তার পিছু নিতুম। তার গানের তালে তালে নাচতুম। তাকে অনুসরণ করে গ্রামের একেবারে শেষ সীমায়, যেখানে আর কোনও লোকালয় নেই। বিশাল প্রান্তর ধূসর নীল আকাশের গায়ে গিয়ে মিশেছে। একটি বটের একটু ছায়া। তার তলায় সেই অচেনা বাউল ঝোলাটি নামিয়ে বসল। তার হাতের অবাক যন্ত্রটিকে তালি তাপ্পি মারা ঝোলায় ঠেস দিয়ে রেখে একটি বিঁড়ি ধরাল। লম্বা একটান মেরে ফিকে ধোঁয়া ভাসিয়ে দিল বাতাসে। চৈত্রের চাষের জমির মতো ফাটা ফাটা মুখ। অসম্ভব রকমের লাল দুটো চোখ। চুল আর দাড়ি মিলেমিশে গেছে।
তিন চার টান মারার পর আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, 'কী রে গোপালের দল, কী দেখছিস?'
আমরা উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করেছিলুম, 'তোমার মতো হতে হলে কী করতে হবে।'
বাউল বলেছিল, 'কিচ্ছু না, পথে নামতে হবে। ইস্কুলে পড়িস তো?'
আমরা খুব দু:খের গলায় বলেছিলুম, 'হ্যাঁ, তা তো পড়তেই হয়।'
বাউল বললে, 'হয়ে গেল, আর কোনও দিন আমার মতো হতে পারবি না। ওরা তোদের হিসেব শিখিয়ে দেবে। দুই আর দুয়ে চার। মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে। একটা চাকরি দেবে, একটা হিসেবের খাতা দেবে, একটা বউ দেবে, গোটাকতক ছেলেমেয়ে। অভাবী মানুষ বাউল হতে পারে না। দশ, বিশ, কুড়ি বিঘে জমি নয়, গোটা পৃথিবীটা আমার জমিদারি। আমার ঘরের ছাতটা কত বড় জানিস? ওই যে মাথার ওপর আকাশ, পুরোটাই আমার ছাত। আমি সম্রাট। তোদের হবে না। জন্মদোষে তোরা ছোট হয়ে জন্মেছিস। আমার কিছু নেই তাই আমি অনেক বড়।'
গাছতলায় কিছুক্ষণ বসে থেকে বাউল মাঠ পেরিয়ে আকাশের দিকে চলে গেল। আমাদের শৈশবও বাউলের মতোই। তফাৎ এই বাউল যায় মুক্তির দিকে। আমাদের শৈশব ভুল পথে চলে যায় বন্ধনের দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন