সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

যে প্রেমের শুরু 'হ্যাঁ' দিয়ে সে প্রেম কাচের গেলাস। যে কোনও মুহূর্তে মন ফসকে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে। প্রেম অত সহজ নয়। 'এ তো ছেলের হাতের মোয়া নয় যে খাবে তুমি ভোগা দিয়ে।' শাক্ত কবি গেয়েছিলেন ভগবানের দর্শনকে উপলক্ষ করে। প্রকৃত প্রেম আর ঈশ্বরানুভূতিতে তেমন তফাত নেই। দুটো পথই মানসিক উত্তরণের পথ। যে প্রেম শুধু দেহতেই আবদ্ধ, সে প্রেমের কথা বলছি না। সে প্রেমে কোনও গভীরতা নেই। তাতে শুধু স্বার্থটাই আছে। আছে ভোগ। পুরোটাই লালসা। সেখানে নারীতে আর চমচমে কোনও পার্থক্য নেই।
পুরুষের চোখ দেখলেই মেয়েরা বুঝতে পারে। একটি মেয়ে আর একটি মেয়েকে বলছিল, দ্যাখ দ্যাখ, লোকটা কী ভাবে তাকিয়ে আছে। যেন আবার খাব দৃষ্টি। চোখ দিয়ে যারা বিবস্ত্র করে তারা প্রেম থেকে মেরু প্রমাণ দূরে। মেয়েদের সহজাত একটা ইনস্টিংকট আছে। তারা সহজেই তরঙ্গ ধরতে পারে, সেনসিটিভ রেডিয়োর মতো। সেই একটা একটু অশ্লীল ধরনের গল্প আছে, প্রেমিক প্রেমিকাকে অনেকক্ষণ ধরে আকাশের চাঁদ দেখাচ্ছে। নানারকম বকে যাচ্ছে আবোল তাবোল। শেষে অধৈর্য প্রেমিকা বললে, 'বুজছি, বুজছি, তুমি আমারে...।' বাকিটা আমি লিখতে পারলুম না শালীনতার কথা ভেবে। এই ধরনের দেহজ প্রেমের উপস্থাপনায়, প্রেমিকার 'না' ছাড়া অন্য কিছু নেই। তবে অনেক সময় জোর-জবরদস্তি থাকে। স্বার্থ থাকে। তখন নিরুপায় দেহ সমর্পণ ছাড়া উপায় থাকে না। একে প্রেম বলে না। দেহদান। হল, মিটে গেল। আধুনিক আমেরিকান স্ল্যাং মানে আসছে, পুরোটা লিখতে পারব না, 'ডট ডট ডট অ্যান্ড ফরেগেট।' এইসব ক্ষেত্রে 'হ্যাঁ' 'মানে 'না'-ই।
প্রেমের সম্পর্কে ভারী সুন্দর একটা কথা আছে—'প্রেম কি যাচিলে মেলে!/প্রেম কি সাধিলে মেলে!/আপনি উদয় হয় শুভযোগ পেলে/নদীতে যখন জোয়ার আসে তখন হঠাৎ কোনও এক সময় স্রোত ঘুরে যায়। কুলকুল করে জল বাড়তে থাকে। ঘাটের পইঠা ধীরে ধীরে ডুবে যায়। প্রকৃত প্রেম আসে এইভাবে। কেউ বুঝতেই পারে না, ব্যাপারটা কী হচ্ছে! ভাষা দিয়ে প্রেমকে স্পর্শ করা যায় না। অনুভূতির কোনও ভাষা নেই। আবেগের কোনও ভাষা নেই। প্রেম নীরব একটা ব্যাপার। শীত যখন আসে তখন আকাশ বাতাস কী হেঁকে ডেকে বলতে থাকে, শীত, আমি এসেছি! শিশির কী বলতে থাকে, এই আমি পড়েছি। ঘাসের ডগায়, পদ্মপাতায়। গাছের ফল যেমন ধীরে ধীরে পাকে প্রেমও সেইরকম রং ধরে। পাকে।
যদি কেউ হঠাৎ প্রশ্ন করে, 'তুমি আমাকে ভালোবাসো?'
ভালোবাসার জনটি তখন বিরক্ত হয়ে বলতে পারেন, 'ন্যাকামি কোরো না তো।' কারণ প্রশ্নোত্তরে ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসা শব্দটিতে ভালোবাসা নেই। যাকে প্রশ্ন করে বুঝতে হয় ভালোবাসে কি না, সে ভালোবাসার ঘোড়ার ডিম জানে। ঘরে যখন ধূপ জ্বলছে, তখন যদি কেউ প্রশ্ন করে, 'ধূপ জ্বলছে বুঝি?' তখন বুঝতে হবে, হয় সে ন্যাকা নয়তো তার সেন্স অরগ্যান অকেজো হয়ে গেছে। ব্যাপারটাকে পরিষ্কার করার জন্যে নিজের জীবনের একটা কাহিনি বলি। নিজের কথা বলা খুবই অসভ্যতা, তবু ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলতে হচ্ছে। আমি আর একটা মেয়ে পাশাপাশি একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতুম। কাজটা ছিল সোস্যাল সার্ভিস। বিদেশি প্রতিষ্ঠান। কাজের মধ্যে প্রধান ছিল, কলকাতার বস্তি উন্নয়ন। জীবিকার সন্ধান করে দেওয়া। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। ত্রয়ী কর্মসূচি। রোজ সকালে আমরা একটি অফিসে মিলিত হতুম। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রথমে একটা মিটিং হত। তাঁরা আমাদের দিনের প্রাোগ্রাম ঠিক করে দিতেন। আমরা কাগজপত্র বগলে নিয়ে ফিল্ডে নেমে পড়তুম। দুজন, দুজনের এক একটা টিম। একটি ছেলে একটি মেয়ে। ছেলে আর মেয়েকে এক করে দেওয়ার কারণ ছিল। কোনও বদমতলব নয়। মেয়েটি মেয়ে মহলে ঢুকে যাবে, ছেলেটি ছেলে মহলে। কর্মসূচিতে ফ্যামিলি প্ল্যানিং ছিল। প্রথমে পুঙ্খানুপুঙ্খ অবস্থার তদন্ত, পরে কর্মসূচি নির্ধারণ, এই ছিল প্রাোজেক্ট।
সারাটা দিন কখনও চিকুর রোদে কখনও বর্ষায় আমরা বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে বেড়াতুম। একটা ব্যাপার অনুভব করতুম মেয়েটি সঙ্গে থাকায় কষ্ট অনেক কম হত। বেশ ভালোও লাগত। প্রেম, ভালোবাসা এসব চিন্তা মাথায় আসত না একেবারেই। সহকর্মী। দুজন মিলে কাজ করি। দিনের শেষে অফিসে ফিরে গিয়ে দুজনে মিলে রিপোর্ট লিখি। এই রিপোর্ট তৈরি আমাদের একটা বড় কাজ। প্রতিদিনই কনফারেন্স রুমে দিনের মিটিং সেরে বাড়ি ফেরা। রাস্তায় নেমে, 'কাল আবার দেখা হবে' বলে মেয়েটি চলে যেত পূর্বে, আমি চলে যেতুম উত্তরে। যেতে যেতে মনটা ভরে উঠত নানা কল্পনায়। ক্লান্ত কিন্তু খুশির আমেজে ভরা। সব কিছু ভীষণ সুন্দর মনে হত। জীবনে যেন কোনও অভাবই নেই। মেয়েটির কী মনে হত আমি জানি না। তা ছাড়া আমার ধারণা ছিল, উত্তমকুমারের মতো চেহারা না হলে, মেয়েদের ভালোবাসা পাওয়া যায় না। নিজের একটা গাড়ি থাকা চাই। পকেটে প্রচুর পয়সা থাকা চাই। খাওয়াতে হবে, ঘোরাতে হবে, উপহার দিতে হবে, তারপর জমি তৈরি হলে, চাঁদের আলোয় গাছতলায় দাঁড়িয়ে শেষ কথাটি বলা, আমি তোমায় ভালোবাসি সুধা। আমার মতো হতভাগা মর্কটকে কে ভালোবাসবে! রোদে ঘুরে ঘুরে আর যেখানে সেখানে, যা-তা খেয়ে খেয়ে আমার জন্ডিস হয়ে গেল। অফিস বন্ধ। চিৎপাত হয়ে পড়ে আছি বিছানায়। ভীষণ দুর্বল। সকালটা যদিও বা কাটে, বেলা পড়ে এলে মনটা অসম্ভব বিষণ্ণ হয়ে যায়।
যতরকমের অশুভ চিন্তার ভিড়। দেখাশোনার আপনজনও কেউ তেমন নেই। পৃথিবীতে আমি তখন প্রায় একা। সেদিনও বিষণ্ণ এক সন্ধ্যা বাদুড়ের ডানার মতো ক্রমশই ঘিরে আসছে। দূরে দূরে শাঁখ বাজছে। সন্ধ্যার আগমনী। এমন সময় দরজার কড়া নড়ে উঠল। কোনওরকমে গিয়ে দরজা খুলেই অবাক। সামনে সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে, আমার সহকর্মী সেই মেয়েটি। বুকের কাছে দু-হাতে ধরা একটা প্যাকেট। আরক্ত সন্ধ্যার আকাশ। ল্যাম্পপোস্টের বাতি তখনও ফ্যাকাসে। অন্ধকার শুষে তখনও তেমন উজ্জ্বল হতে পারেনি। ফিকে নীল শাড়ি আর সাদা ব্লাউজ। এলো খোঁপা। মুখেচোখে সারাদিনের ঘোরাঘুরির ক্লান্তি।
উদ্বেগের গলায় সে জিগ্যেস করল, 'কী হয়েছে আপনার?'
সে ঘরে এল। আমি একা। দরজা বন্ধ করতে ভয় লাগছিল। পাছে কেউ কিছু মনে করে। আমি ভয়ে ভয়ে বললুম, 'বাড়িতে আর কেউ নেই কিন্তু।'
'আর তো কারুর থাকার দরকার নেই। আমি তো আপনার কাছে এসেছি।'
সে আবার বিছানায় একপাশে বসল পা তুলে। একগাদা সরবতি লেবু সাজিয়ে রাখল টেবিলে। আমি ভাবছি, এ কী ভালোবাসা না সৌজন্য! সাহস নেই প্রশ্ন করার। এ প্রশ্ন করা যায় না। সেই সময় একটা গান খুব হিট করেছিল, 'বলা কী যায় সহজে, বুঝে নাও, বুঝে নাও, মনের ভাষা।'
বেশ অনুভব করেছিলুম সারা ঘর একটা অনুভূতিতে ভরে গেছে। সে সসঙ্কোচে আমার কপালে হাত রাখল,
'জ্বর আছে?'
'একটু একটু।'
'কতদিন বলেছি, বাইরের জল খাবেন না, যেখানে সেখানে। কে কার কথা শোনে, গোঁয়ার গোবিন্দ।'
এই শেষের বিশেষণটি আমার অনুচ্চারিত নীরব প্রশ্নের উত্তর। এক বছর পরে সেই কপালের হাত নেমে এল আমার হাতে। যা সাধারণত হয় না, তাই হল। আমাদের জীবন মিলে গেল। প্রথম রাতে, ফুলের গন্ধে, বাতাসের শব্দে, যখন প্রশ্ন করলুম, 'সুমি, তুমি কি আমায় ভালোবাসো?'
সুমি একটা ক্লাসিক উত্তর দিয়েছিল সেই ফুলের রাতে। একটি মাত্র শব্দ, 'বোকা পাঁঠা।'
এই একটি শব্দ যে কত স্নেহের! ওর মধ্যে আছে আমার মায়ের গলা, দিদির গলা, প্রেয়সীর গলা। পৃথিবীতে এমন কিছু বিষয় আছে, যার 'না'-টা 'না' নয়। যার 'হ্যাঁ'-টা হ্যাঁ' নয়। একমাত্র বোকা পাঁঠারাই তা জানে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন