আমার বিয়ে

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ঠিক যেমনটি চেয়েছিলুম। $$$উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। ফরসা রং। সুশ্রী। ছিপছিপে। এস. এ. পাঠরতা। পিতা সরকারের উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত। যোগাযোগের জন্যে বক্স নম্বর দেওয়া আছে। বয়েস তিরিশ। আমার বয়েস পঁয়ত্রিশ। আমার উচ্চতা, পাঁচ চার। আমার গায়ের রং মেটে ফরসা। আমি এম. এ.। ভূতের মতো নি:সঙ্গ। আপনজন কেউ কোথাও নেই। দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজন দু-এক ঘর আছে। তারা তাদের প্রয়োজনে আসে। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলেই চম্পট দেয়। তিরিশটা বছর ধরে আমি স্ট্রাগল করে জীবনের এই পঁয়ত্রিশ বছরে একটা জায়গায় এসে স্থিত হয়েছি। পাকা চাকরি। মাইনে নেহাত খারাপ নয়। ছোট একটা ফ্ল্যাট হয়েছে। রোগজ্বালা তেমন কিছু নেই। মনটা মাঝে মাঝে খারাপ হয়। হু হু করে পাম্প দেওয়া কেরোসিন কুকারের মতো। প্রথমে ভেবেছিলুম সংসার-টংসার করব না। সংসার মানেই বন্ধন। সংসারে মানেই বোঝা। খাবদাব বেড়িয়ে বেড়াব। দেখলুম তাতে খরচা অনেক বেশি। বাইরে খেতে গেলে প্রচুর খরচ। থেকে থেকে পেটের অসুখ। লোকে সাহায্য চায়, চাঁদা চায়, পাগল করে মারে। রাতে একলা বিছানায় ঘুম আসে না, ভয় ভয় করে। আমার আবার ভূতের ভয় আছে। গা ছমছম করে। মনে হয় মাথার কাছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। পিঠে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। কানের কাছে ঠান্ডা নিশ্বাস ফেলছে। মনে হয় ফ্রিজের দরজা খুলে গেছে। এখন আমার একটা বিয়ে করা উচিত। কচি খুকি বউ নয়। বেশ বড়সড় একটা কমলালেবু রঙের বউ। গায়ের রং নয় শাড়ির রং। ঘরের ছিরিটাই ফিরে যাবে। মেয়েলি জিনিস। মেয়েলি গন্ধ। এখানে ওখানে বড় বড় চুল। তার অন্তর্বাস। বিছানায় একটার জায়গায় দুটো বালিশ। টেবিলে জেন্টস ঘড়ির পাশে একটা লেডিজ ঘড়ি। চুড়ির শব্দ। কিছুটা বাস্তব, কিছুটা স্বপ্ন। জীবনের অন্য এক মানে।

বিজ্ঞাপনটাকে আন্ডারলাইন করলুম। এই আমার বউ। নাম নিশ্চয় অর্পিতা। অর্পিতা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে আমার একটু প্রেম মতো হয়েছিল ছাত্রজীবনে। সামলাতে পারিনি। যারা আমার চেয়ে পকেট খরচের টাকা বেশি পেত, তারা আমাকে ল্যাং মেরে দিলে। একটা মেয়েকে প্রেমের সরোবর থেকে খেলিয়ে তোলা কী সহজ কাজ রে বাবা! ওর চেয়ে ফুটবল খেলা অনেক সহজ। বিয়ে করা তো একেবারেই ইজি ব্যাপার। একটা টোপর দিয়ে গোধূলি লগ্নে পিঁড়েতে গিয়ে বোসো, ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে গরম গরম একটা মেয়ের মালিক। অর্পিতাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। সুন্দর বড় বড় চোখ। ফুরফুরে চুল। শান্তশিষ্ট। বুদ্ধিমান একটা নাক। দুল পরার মতো পাতলা দুটো কান। গোল গোল দুটো হাত। তিন-চারটে প্রেমপত্র লিখেছিল। আমার ভালোবাসাকে এমনভাবে উস্কে দিয়েছিল যে, সেই সময় আমি একখাতা ভয়ংকর উদ্বেল কবিতা লিখে ফেলেছিলুম। ছন্দ না থাকলেও গভীর আবেগ ছিল। এত গাছ ছিল যে একটা জঙ্গল হয়ে যেত। এত ফুল ছিল যে তিরিশটা নার্সারি হয়ে যেত। ঘুড়ি আর মেয়ে বেশিক্ষণ হাতে ধরে রাখা যায় না। ছেলেবেলায় দেখেছি, একটা ঘুড়ি কেটে এসেছে, ধরেছি, পেছন থেকে তিনজন লাফিয়ে এসে খামচা-খামচি। হয় কেড়ে নেবে, না হয় ছিঁড়ে দেবে। আমাদের সঙ্গে কিছু ব্যাবসাদারের ছেলে পড়ত। বড়দা টাইপের। পকেটে অনেক পয়সা। অর্পিতাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। মেয়েরা খেতে ভালোবাসে, সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, উপহারে খুশি হয়। তিনটেই টাকার ব্যাপার। নো মানি নো লাভ। হানিদের মানি দিয়ে বশে আনতে হয়। একটা হিরো হিরো চেহারা চাই। গায়ে থাকা চাই ফাইন সেন্ট আর সিগারেটের গন্ধ। মজার মজার কথা বলতে হবে। কথায় কথায় পকেট থেকে চকোলেট বের করে খাওয়াতে হবে। অম্লানবদনে ফাইফরমাশ খাটতে হবে। শরীরের শক্তি দেখাতে হবে। তোয়াজ করতে হবে। প্রেম করা কঠিন কাজ। ওর চেয়ে ব্যায়াম করা সহজ। প্রেম হতেও যতক্ষণ, চটকে যেতেও ততক্ষণ। কলেজে যেমন হাজিরার পার্সেন্টেজ থাকে, প্রেমেরও সেইরকম পার্সেন্টেজ থাকে। প্রেমিকার কাছে রোলকলের খাতা। পার্সন্টেজে কম পড়লেই হয়ে গেল। নামকাটা সেপাই। অর্পিতা আমাকে মাসখানেক নাচিয়ে বুঝে গেল, একেবারেই ফোঁপরা মাল। একটা টাকা নিয়ে কলেজে আসে। যাওয়া আসা পঞ্চাশ পয়সা, আর পঞ্চাশ পয়সায় প্রেম হয় না। অর্পিতার চারে অনেক বড়লোকের ছেলে ঘুরছিল। তারা আমাকে কনুইয়ের কানকি মেরে চারে ঢুকে গেল। আমি উদাস সুরে বসে রইলুম প্রেমের পুকুরপাড়ে।

বিজ্ঞাপনটা দেখে সেই ছাত্রজীবনের অর্পিতার কথা মনে পড়ে গেল। মেয়েটাকে সত্যি আমি ভালোবেসেছিলাম। ভালো না বেসে উপায় ছিল না। দুর্বার আকর্ষণ। সেই রূপকথার রাজকন্যার মতো। হাসলে মুক্ত ঝরে। কাঁদলে হীরে। দুহাত দিয়ে হাঁটু ধরে, শরীরটাকে পেছনে হেলিয়ে যখন গাছতলায় বসে থাকত মনে হত প্রেমের উপন্যাসের কোনও নায়িকা বসে আছে। ঘাড়ের কাছে জমাট রহস্যের মতো আলগা খোঁপা। পৃথিবীর সমস্ত স্নেহের মতো জমাট বুক। হারিয়ে যাওয়া কোনও নগরীর মতো ভারি নিতম্ব। কালিদাসের নায়িকা। সূর্য ওঠা কপাল। ছোরার মতো নাক। অর্পিতা বাস্তব থেকে আমার স্বপ্নে চলে এসেছিল। স্বপ্নেই পেতে বসেছিল তার ঘরকন্যা।

খুব লজ্জা করছিল। তবু নিজের পরিচয় দিয়ে একটা চিঠি লিখে কাগজের বক্সঅফিসের ডাব্বায় ফেলে এলুম। নিজের কথা নিজে লেখা যায়! সেই অসভ্যতাটাই করতে হল। আমার বংশপরিচয়, আমার রোজগার। আমার ভবিষ্যৎ, আমার স্বভাবচরিত্র। আমি কতটা মুক্ত পুরুষ। আমার তিনকূলে কেউ নেই। আমাকে দেখতে কেমন। যেন সাবানের বিজ্ঞাপন। দেওয়ালের সামনে খাড়া হয়ে মাথার ওপর দিয়ে পেনসিল চালিয়ে একটা দাগ মেরে স্কেল দিয়ে মাপতে বসলুম। হাইট পাঁচফুট সাড়ে চার ইঞ্চি। বিয়ের দরখাস্ত চলে গেল। এতকাল গাদাগাদা চাকরির দরখাস্ত হয়েছে, এইবার বিয়ের দরখাস্ত। চিঠিটা ছাড়ার পর থেকেই আমার মনে হতে লাগল, বিয়েটা হয়েই গেছে। নতুন শাড়ির গন্ধ পাচ্ছি। ঘরটা ভরা ভরা লাগছে। নিজেকে দেখাচ্ছে লাজুক লাজুক। একদিন অন্তর দাড়ি কামাচ্ছিলুম। এখন রোজ কামাচ্ছি। গালে উলটো দিকে হাত চালিয়ে দেখি মাখনের মতো মোলায়েম হয়েছে কি না। সবসময় বেশ ফিটফাট থাকার চেষ্টা করি। সপ্তাহের দুবার শ্যাম্পু করি।

এক মাসের মধ্যে একটা উত্তর এসে গেল। মেয়েলি হাতের লেখা। পাকা কথা বলার আহ্বান। সঙ্গে একটা রঙিন ছবি। সেই ছবি থেকে সারাদিন চোখ ফেরাতে পারলুম না। মনে ধরার মতো মেয়ে। আয়নার সামনে ছবি আর আমি পাশাপাশি। দুটো মুখের প্রতিফলন, একেবারে মেড ফর ইচ আদার, সিগারেটের বিজ্ঞাপন! মেয়েটি যেন গাইছে, ওগো, আমি যে তোমার; আমি যে তোমার। এতদিন কোথায় ছিলে গোপাল আমার।

আমার এক বন্ধু ও তার স্ত্রীকে নিয়ে পাত্রী দেখতে গেলুম। ছোটখাটো একটা ফ্ল্যাট। ছোট সংসার। মেয়ের বাবা নেই, মা আছেন। বেশ জাঁদরেল। খুব ব্যক্তিত্ব। মুখটা একেবারে সলিড, চোখে চশমা। কেঁচোর মতো একটা ছেলেও আছে। পশুচিকিৎসক। যে ঘরে বসলুম, সেই ঘরের দেওয়ালে নানারকম কুকুরের ছবি। মায়ের দাপটে ছেলে কেমন যেন খ্যাঁতখ্যাঁতে হয়ে আছে। কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল শিশুদের যেমন হয় সেইরকম। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা আর মিষ্টি এসে গেল। আমরা যথারীতি বলতে লাগলুম, 'এ আবার কেন? এ আবার কেন?'

ভদ্রমহিলা যেন ধমকে উঠলেন, 'কথা না বাড়িয়ে খেয়ে নাও।'

প্রথম থেকেই তুমি সম্বোধন। তা ভালো। শাশুড়ি তো জামাইকে তুমিই বলবেন। ভদ্রমহিলা আমার বন্ধুর বউকে বললেন, চুল কেটেছ বুঝি! আজকালকার মেয়েদের এই এক মদ্দা ফ্যাশান হয়েছে। মনে করে কী ভালোই না দেখাচ্ছে! চুল হল মেয়েদের শোভা।'

ভদ্রমহিলার ছেলে বললেন, 'আজকাল আর বড় চুল কেউ রাখে না মা।'

ভদ্রমহিলা ছেলেকে এক দাবড়ানি দিলেন, 'তুমি চুপ করো।'

ছেলের মুখটা গোবদা হয়ে গেল। মা একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, 'রেখা চলে এসো।'

অদ্ভুত একটা ব্যাজার মুখে মেয়েটি ঘরে এল। মা বললেন, 'মুখে একটা হাসি টেনে নমস্কার করো। মুখটা বেগুনের মতো করে রেখেছে কেন?'

মেয়েটি হাসল না, কেঠো একটা নমস্কার করে বসল।

মহিলা বললেন, 'এই আমার মেয়ে। কর্মঠ, কোনও ন্যাকামি নেই, আদিখ্যেতা নেই। অনেকটা আমার ধাতের। কোনও প্রশ্ন আছে তোমাদের? বোকা বোকা প্রশ্ন। মুড়িঘণ্ট রাঁধতে পারে কি না! চাইনিজ জানে কি না! কার লেখা বই পড়তে ভালোবাসে! ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম কী?'

আমার বন্ধু আমার চেয়ে অনেক স্মার্ট। সে বলল, 'একটাই প্রশ্ন, মাসে কতবার সর্দিকাশি হয়?'

মেয়ের মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, 'পাগল ছাড়া সুস্থ মানুষের যতবার হওয়া উচিত ততবারই হয়। একমাত্র পাগলদের অসুখ করে না।'

এ যেন ব্যাডমিন্টন খেলার চান্স। ভদ্রমহিলা আমার বন্ধুকে আর বল ফেরাতে দিলেন না!

মা মেয়েকে বললেন, 'তুমি যেতে পারো।' মেয়ে উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে আমায় ভালো করে দেখে গেল। আমি চোখে যথেষ্ট প্রেম আনার চেষ্টা করলুম। কেমন এল বলতে পারব না। মেয়ে উঠে যাওয়ার পর, মা জিগ্যেস করলেন, 'পছন্দ হয়েছে? হ্যাঁ, কি না! ঝুলিয়ে রাখাটা আমি পছন্দ করি না।'

বন্ধু বললে, 'যে বিয়ে করবে সে-ই বলুক।'

'তোমরা তাহলে এসেছ কেন?'

'একা আসতে লজ্জা পাচ্ছিল তাই।'

মহিলা আমাকে প্রশ্ন করলেন, 'বেশ! তুমিই বলো, পছন্দ হয়েছে?'

মেয়েটিকে আমার বেশ পছন্দই হয়েছিল। টেরিয়ে টেরিয়ে যা দেখার দেখে নিয়েছিলুম। এখন না হাসলেও পরে হাসবে। মায়ের চাপে ছেলে আর মেয়ে দুটোই কেমন হয়ে আছে। লাজুক লাজুক মুখে বললুম, 'পছন্দ হয়েছে।'

'তোমাকে কত দিতে হবে?'

'আজ্ঞে, প্রশ্নটা ঠিক বুঝলুম না।'

'ঠিকই বুঝেছ? দেনা-পাওনার কথা হচ্ছে। কী কী চাই? দাবি কত?'

'এক পয়সাও নয়। আমার সবই আছে।'

'পরে অশান্তি করবে না তো?'

'সে ভয় নেই। আমি লোভী নই।'

মহিলা তখন ছেলেকে বললেন, 'নাদু, পাঁজিটা নিয়ে এসো।'

পাঁজি এসে গেল। মহিলা তরতর করে পাত উলটে গেলেন। অবশেষে মুখ তুলে বললেন, 'বাইশে অঘ্রাণ। ভালো দিন। গোধূলি লগ্ন। এখনও একমাস সময় আছে। বিয়ে তাহলে পাকা হয়ে গেল। তোমাদের যা করার করো। আমাদের যা করার করি। তোমার বরযাত্রী ক'জন আসবে?

'বেশি না। দশ বারো।'

'খুব ভালো। এই বাজারে ভূতভোজন করিয়ে কোনও লাভ নেই।'

আমরা বেরিয়ে এলুম। বন্ধুর বউ বললে, 'মেয়েটা ভালোই। শরীর স্বাস্থ্য আছে। দেখতেও সুন্দরী। কিন্তু মেয়ের মা অস্বাভাবিক। অহঙ্কারে মটমট করছে। ক্যাঁট ক্যাঁট কথা।'

বন্ধু বললে, 'সে মরুকগে! বিয়েটা তো শাশুড়ির সঙ্গে হচ্ছে না। এক এক মা এক এক রকম। ছেলেমেয়েকে ভদ্রমহিলাই মনে হয় মানুষ করেছেন। তাই একটা কর্তা কর্তা ভাব। কড়া মা।'

একটা মাস ঘোরে কেটে গেল। আমার কেউ কোথাও নেই। বন্ধু নির্মল আর স্ত্রী মিতাই সব করতে লাগল। কেনাকাটা, হ্যানাতানা। ফ্যাচাং তো অনেক। ওই ঘনিষ্ঠ দশ বারোজন ছাড়া কারোকেই বলা হবে না! অকারণ অশান্তি করে কোনও লাভ নেই। ব্যাপারটা চুপিচুপি সেরে নেওয়া ভালো। আগের দিন মিতা তরিবাদি করে আইবুড়ো ভাত খাওয়ালে। বিয়ের দিন সকালে নমোনমো করে গায়ে হলুদও হল। একটা মিনিবাস ভাড়া করা হল। সেইটাতেই বর বরযাত্রী একসঙ্গে যাবে, এইরকমই ঠিক হয়েছিল। মিতা বললে, 'আমাদের একটা প্রেস্টিজ আছে। বরের গাড়ি আলাদা হবে। ফুল দিয়ে সাজাতেও হবে। আমরা ছেলের তরফ। বিয়ে একবার, খরচও একবার।' মিতা আমার মা না-থাকার অভাব পূরণ করে দিলে। কোমর বেঁধে একাই সব করছে। নিজেকেই নিজে অনেক কিছু দিয়েছি। একটা বক্স টাইপ খাট। স্টিলের আলমারি। নতুন প্রেসার কুকার। তিন ভাঁজ আয়না লাগানো ভালো একটা ড্রেসিংটেবল। আমার বউ এসে চুল বাঁধবে, সাজবে গুজবে। আমি তখন তার পেছনে এসে দাঁড়াব। আবেগে আদর করব। আয়না সাক্ষী। বেশ ভালোই খরচ করেছি। মিতা হল পরিচালিকা। সে জানে জীবনের মতো একটা মেয়ে হলে সংসারটাকে কী ভাবে সাজাতে হয়। রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর মিতা সব সাজিয়েগুছিয়ে ছবির মতো করে দিয়েছে। মিতা ভীষণ গুছনে মেয়ে। নিজের সংসারটাকে অলকাপুরীর মতো করে রেখেছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, মিতার মতো একটা বউ পেলে জীবনটা হয়ে যেত যন্ত্রসংগীতের মতো। পরস্ত্রীর ওপর লোভ করা মহাপাপ।

পাঁচটার সময় মিতাই আমাকে সাজিয়ে দিল। সিল্কের ধুতি, পাঞ্জাবি। গায়ের সুগন্ধী স্প্রে। মিতাই চুলের স্টাইল করে দিলে হেয়ার ক্রিম দিয়ে। মুখে লবঙ্গ দিয়ে চন্দনের ফোঁটা। পায়ে ঝকঝকে নিউকাট। হাতে কোঁচার ফুল। ভালো করে তাকিয়ে বললে, 'বেশ দেখাচ্ছে।' হঠাৎ ঠোঁটে একটা চুমু। ভিজে ভিজে। সারা শরীর শিউরে উঠল। নারীর স্পর্শ কী জাদু!

দোরগোড়ায় আকাশি রঙের গাড়ি। রজনিগন্ধার ঝালর ঝোলানো। তার পেছনে তাল তোবড়ানো একটা মিনি। নির্মলের হাতে টোপর। মিতার নির্দেশ, বরের গাড়ি যেন ছাগলগাদাই না হয়। ফাঁকা ফাঁকা যাবে। সূর্য অস্ত গেছে। পশ্চিম আকাশ আবীর লাল। রজনিগন্ধার প্রেমিক সুবাস। দুধসাদা টোপরে অভ্রের চুমকি। গাড়ি থামল বিয়ে বাড়িতে। শাঁখ। উলু। মেয়ের মামা হাত ধরে বাসরে নিয়ে গিয়ে মখমলের গদিতে বসিয়ে দিলেন। খুব একটা হইচই নেই। লোকজন কম। একটু টানাটানির বিয়ে। হতেই পারে। সহায় সম্বলহীন বিধবা মহিলা যতটা পেরেছেন সাধ্যমতো করেছেন।

লগ্ন এসে গেল। আমার হাত ধরে বিয়ের পিঁড়েতে বসানো হল। একটু পরেই আমার জীবন বদলে যাবে। শ্রীর পাশে শ্রীমতী যোগ হবে। উলটো দিকে বসে আছে লাল বেনারসী বউ। দারুণ দেখাচ্ছে। কাশীর পাকা পেয়ারার মতো গায়ের রং। গোলাপি গাল। একটা দুটো ব্রণর ছিট। ভারী চোখের পাতা। নারকেল পাতা ঘেরা দীঘি মতো। একবার তাকাই তো পরক্ষণেই লজ্জায় চোখ নামিয়েনি।

সম্প্রদান করবেন মেয়ের মা। তিনি বসে আছেন পাশে। পুরোহিত মশাই মন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনওটা উচ্চারণ হচ্ছে, কোনওটা হচ্ছে না। সম্প্রদান হবে, চার হাত এক হতে চলেছে। হঠাৎ কে আমাকে ভুঁইকুমড়োর মতো পিঁড়ে থেকে তুলে ধুম করে পাশে ফেলে দিলে।

হইহই ব্যাপার! গুণ্ডামতো সাত-আটটা ছেলে আমাদের ঘিরে ধরেছে। যে-ছেলেটাকে কম্যান্ডোর মতো দেখতে, সে বলছে, 'জগাকে নিয়ে এসে পিঁড়েতে বসা। সাত বছর প্রেম করার পর পাখি নিয়ে যাবে বেপাড়ার কেষ্ট। এটা মগের মুল্লুক। আমরা কি মরে গেছি! মালটাকে তুলে নর্দমায় ফেলে দিয়ে আয়।'

মেয়ের মা চিৎকার করছেন, 'বাবা পল্লব, ফাইট দাও, ফাইট দাও! তোমার জিনিস তুমি লড়ে নিয়ে যাও।' আর লড়ে! আমাকে তুলে বরণডালার ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। পেছনে কী একটা ফুটে গেছে। বরযাত্রীরা ভয়ে পালিয়ে গেছে রাস্তায়। নির্মল একটু লড়তে চেয়েছিল, কষকষে করে তার কান মলে দিয়েছে। জগা পিঁড়েতে বসে পড়েছে। মন্ত্র চালু হয়ে গেছে। পরাজিত রাজপুত্রের মতো আমরা রাস্তায়। রাস্তায় আরও একটা দল। তারা প্যাঁক দিচ্ছে। একজন আমার কাছাটা ফচাং করে খুলে দিলে, 'শালা কার ফল পাড়তে এসেছিলে, পেছনে হুড়কো দিয়ে দেব।'

মিতা বললে, 'ডিফিট! আমরা হারব না। আজই বিয়ে হবে। গাড়ি ভবানীপুর।'

মিতা আমার পাশে। তার একটা হাত আমার কাঁধে। 'আমার বোনকে তোমার বিয়ে করতে আপত্তি আছে?'

'তোমার বোন তো তোমার মতোই হবে। তবে সে কি আমায় বিয়ে করবে!'

'সেটা আমার ব্যাপার।'

গাড়ি যাদবপুর থেকে ভবানীপুরের দিকে চলল। পেছনে বসে আছে হাফ-বিয়ে বর। পেছনে ফুটে গেছে কাজললতা। টোপরটা জগার মথায়। মিতা আমাকে মায়ের মতো জড়িয়ে ধরে আছে। গাড়ি চলল ভবানীপুর।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%