সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রচুর টাকা কিন্তু একটুও সুখ নেই। তিনটে ছেলে, তিনটেই অমানুষ। মেয়েটা আদুরী ন্যাকা। স্ত্রী এতটাই আয়েসি এক গেলাস জল গড়িয়ে খাওয়ার গতর নেই। শুয়ে, বসে, ফ্যাশান ম্যাগাজিন পড়ে, রূপচর্চা করে দিন কাটে। হবি হল মার্কেটিং। নানারকম অপ্রয়োজনীয় দামি দামি জিনিস কিনে এনে বাড়ি বোঝাই করা।
ছেলে তিনটে মানুষ হল না কেন? মানুষ হয়ে মানুষ কী করে? নিজের শিক্ষা ও যোগ্যতা ভাঙিয়ে উপার্জন করে। এক্ষেত্রে এত টাকা উপার্জনের কোনও প্রয়োজন নেই, বরং বিপরীত, কী করে খরচ করা যায়! অতিভোজনে তিনটেই হাতি। আইসক্রিম আর কোল্ড ড্রিংকস কথায় কথায়। বাপ তিনজনকে তিনটে মোটর সাইকেল কিনে দিয়েছে। তিন চারখানা দামী মোটর গাড়ি আছে। তা থাক, মোটর সাইকেলের একটা হিরো হিরো ভাব আছে। বদমাইসি আর প্রেম মোটর সাইকেলে ভালো হয়।
তিন ছেলে সকাল দশটা দাগাদ বিছানা ছাড়ে। তারপর এদিকে-ওদিকে গোটা পঞ্চাশ টেলিফোন করে। কিছুক্ষণ কাত হয়ে টিভি দেখে। সূর্যাস্তের পর বিলিতি সুগন্ধ উড়িয়ে নারীর সন্ধানে যায়। দামি বার, ডিস্কো, বোতল, রমণী। মাঝরাত পর্যন্ত কোনও সমস্যা নেই। টাকার স্রোতে সময় ভেসে যায়।
তিনটেতে কিছুই করে না বললে ভুল হবে। বড় আর মেজ টিভি সিরিয়াল করে, যা কোনও দিনই ছোট পরদায় আসবে না। ছোটটা একসপোর্ট। কী একসপোর্ট কেউ জানে না। অফিস আছে, সুদৃশ্য সাইনবোর্ড আছে। একজন রিসেপসানিস্ট আছে, সুন্দরী। এই তিন ভাই মাঝে মাঝেই যেটা খুব আন্তরিক ভাবে করে, সেটা হল মারামারি। এই ঘরানাটা তারা আমেরিকা থেকে ফিল্মের মাধ্যমে আমদানি করেছিল। তাদের এই বীরত্বটা বোতলের বীরত্ব। এমনিতে তো গদাই মার্কা চেহারা। দুপাত্র পেটে পড়া মাত্রই আলেকজান্ডার দি গ্রেট। তার ফলে এই হয়, মাঝরাতে মাল আর মার দুটো খেয়েই টলতে টলতে বাড়ি ফিরে আসে। মালটা ট্যাঁকের পয়সায় মারটা মুফতে।
জ্ঞানবাবুর অনেক টাকা, কিন্তু বেজায় দু:খী। ছিলেন সামান্য একজন মিস্ত্রী। ক্রমে নিজের প্রতিভায় কারখানার মালিক। প্রথমে ছোট, ক্রমে বড় হতে হতে বিশাল। পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র আমার সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় আছে। আর যাদের সঙ্গে ছিল তারা ঈর্ষায় কাছে আসে না। দূর থেকে রকম রকম কুৎসা রটনা করে।
জ্ঞানের সঙ্গে মাঝে মধ্যে আমার নির্জনে দেখা হয়। গঙ্গাসাগরে অশ্বত্থগাছের তলায় সন্ধ্যার আবছা আলোয়। অল্প দূরেই মহাশ্মশান। জ্ঞান আমার হাতদুটো আবেগে চেপে ধরে যে কথাটা বলবেই বলবে, 'হ্যাঁ রে! একজন মনের মানুষ পেলি?' তারপরে নিজেই একটা গান ধরবে, লালনের গান, 'আমার মনের মানুষের সনে/মিলন হবে কতদিনে।'
এই দুনিয়ায় সব মানুষ পাওয়া যায়, অর্থের মানুষ, স্বার্থের মানুষ, ধান্দার মানুষ, উপকারী মানুষ, অনুপকারী মানুষ। মনের মানুষ কোথাও নেই। জ্ঞান বুঝেছে, মানুষ হয়ে মানুষের ভালোবাসা না পেলে জীবন একটা মরুভূমি। কোথাও এতটুকু ছায়া নেই, উটের কাফেলা উত্তপ্ত বালির আধিঁর মধ্যে দিয়ে যুগ যুগ ধরে চলেছে, চলেছে...।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন