বোতাম

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার ভীষণ ভয় করে। কী করে কী হবে! শেষ পর্যন্ত পারব তো! সমরেশকে দেখে এলুম। প্যারালিসিস হয়ে পড়ে আছে। ছেলে আর মেয়ে দুটো শুকনো মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখনও বড় হতে অনেক দেরি। ছেলেটা সবার ছোট। মাথায় মাথায় দুটো মেয়ে। স্কুল শেষ করে কলেজ। কলেজ শেষ করে হয় বিয়ে না হয় চাকরির চেষ্টা। এই গোলাকার পৃথিবীর ঘোর-প্যাঁচ তো অনেক। হায়না, নেকড়ে, শেয়াল, ষাঁড়ে ভরতি। কেউ গুঁতোবে, কেউ খাবলাবে, কেউ আঁচড়াবে, কামড়াবে। সবই সহ্য করতে হবে, কায়দা করে পাশ কাটাতে হবে। নিজের জীবন যেন নিজেরই পায়ে ফুটবল। পেলের মতো পায়ে পায়ে কাটিয়ে, এধার ওপার করে গোলের জালে জড়িয়ে দিতে হবে। গোলকারের গোলমালে গোলের খেলা। খেলতেই হবে। যতদিন বাঁচা ততদিন খেলা! মাঠেই আমাদের জন্ম, মাঠ থেকেই চিতায়। দর্শক হওয়ার উপায় নেই। সবাই খেলোয়াড়। এ খেলার আইনে ফাউল নেই, পেনাল্টি নেই।

সমরেশের বিছানার মাথার দিকে তার স্ত্রী সুপ্রিয়া বসেছিল। বেশ রূপসী। সমরেশের বিয়ের দিন আমরা কম হইচই করেছি! একটু হিংসে যে হয়নি তাও নয়। নিখুঁত সুন্দরী। বন্ধুবান্ধবের ভালো চাকরি হলে সুন্দরী বউ হলে, প্রাোমোশান হলে হিংসে হবে না! তাহলে আর বাঙালি হয়ে জন্মালুম কী করতে! সুপ্রিয়া খুব খোলামেলা, হাসিখুশি, হুল্লোড়ে মেয়ে ছিল। বিছানার মাথার দিকে বসে আছে সুপ্রিয়ার ধ্বংসাবশেষ। সমরেশের কেউ কোথাও নেই। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এস পড়ল সুপ্রিয়ার ওপর। লেখাপড়া জানে। সমরেশের অফিসেই একটা চাকরিও পেতে পারে। মধ্যবয়সী, সুন্দরী মেয়েও কি খুব নিরাপদ! মনে হয় না। দেখছি তো চারপাশে। মানুষের খিদে বেড়েই চলেছে।

কী হবে, কে জানে! আমার ভীষণ ভয় করছে।

সুপ্রিয়া বলেছিল, 'কেমন আছেন।'

ভদ্রতার প্রশ্ন। ভালো আছি, বলতে সংকোচ হল। কেউ অসুস্থ থাকলে নিজে ভালো আছি বলতে লজ্জা করে। অপরাধী বলে মনে হয়। তাই বানিয়ে বানিয়ে নিজের কিছু অসুখের কথা বললুম। হার্ট দোল খাচ্ছে। রক্ত মিঠে হয়েছে। চাপ বেড়েছে। সুপ্রিয়া বলেছিল 'সাবধান, এই লোকটাকে আমি বলে বলে পারিনি। স্বামীরা যদি স্ত্রীদের কথা একটুও শুনত।'

আমি আর বেশিক্ষণ বসিনি। ওই অবস্থায় যে-কথাই বলি বোকা বোকা মনে হয়। একটা চলমান সংসার ব্রেক ডাউন হয়ে মাঝপথে গোঁত্তা খেয়ে পড়েছে। এ এখন গাড়ি ঠেলে স্টার্ট করানো যাবে না। মিস্ত্রি এনে মেরামত করানো যাবে না। গাড়ি পড়েই থাকবে। আরোহীরা এইবার যে যার ব্যবস্থা দেখে নাও।

রাস্তায় নেমে লোকজনের ভিড়ে নিজেকে বেশ হারিয়ে ফেলেছিলুম। সবাই চলছে। সবই চলমান। দোকানপাট, কেনাবেচা। মনে হল, এইভাবেই যখন সব চলে, চলে যাবে ঠিকই, কোথায় কোন ঘরে কে কাত হয়ে পড়ল তা নিয়ে অত ভাবার কী আছে! মানুষের বরাত বলে তো একটা কথা আছে। যার যেমন বরাত। এইভাবেই আজ, কাল হবে। কাল, পরশু হবে। মনে মোটামুটি একটা বল এসে গেল। প্রবীণরা বলেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখো। তাই না হয় রাখব। একটা মাদুলি, কি পাথর পরব। মাসে একবার মন্দিরে যাব। পাপ-টাপ আর তেমন না-ই বা করলুম। আর আমার পাপ তো একটাই। মেয়েদের দিকে চোরাগোপ্তা তাকানো। সেটা মনে হয় এমন কিছু পাপ নয়। একটা বদ অভ্যাস। চুরি-জোচ্চুরি করি না। লোক ঠকাই না। ভেজালের কারবার করি না। রাজনীতি করি না। বায়োস্কোপ করি না। আমার বউ চিত্রাকে আমি ভালোই বাসি। বধূ নির্যাতন করি না। আমার বাবাও নেই, মা-ও নেই। বউয়েরি কথায় তাঁদের অসম্মানের পাপ ইচ্ছে থাকলেও করতে পারব না। তাঁরা আমার পথ পরিষ্কার করে রেখে গেছেন। অকারণে বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার হচ্ছে ভেবে, আমার শালিকে বউয়ের মতো করে আদর করেছিলুম। তাও জোর করে নয়। অনেক তেল দিয়ে তার অনুমতি নিয়ে। 'আসতে পারি' বলে নিপাট ভদ্রলোক যেমন অন্যের দরজা ভেজানো ঘরে ঢোকে। তা ছাড়া শালিদের আদর করার অধিকার সব জামাইবাবুরই আছে। শাস্ত্রসম্মত। এর জন্যে পক্ষাঘাত হবে না। বা হঠাৎ চাকরি চলে যাবে না। গেলে গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ বেকার হয়ে যেত। সবার আগে চাকরি যেন আমার অফিসের বড় কর্তার। তিনি তো সব মেয়েকেই 'আবার খাব' সন্দেশ ভাবেন। কী কাণ্ডই যে করে বেচারা! মনটা সব সময় যেন ফলুই মাছের মতো লাফাচ্ছে তার। ওটা একটা রোগ। এক দাগ পালসেটিলা থারটি খেলেই সেরে যেতে পারে। কিছু অসুখ অনেকে ইচ্ছে করেই ভালো করে না। বেশ মজা লাগে। যেমন অনেকে দাদ পোষে। চুলকোতে ভালো লাগে বলে।

এইসব আলোচনা করতে করতে যেই বড় রাস্তায় এসে পড়েছি, চোখের সামনে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এক স্কুটার আরোহীকে মেরে বেরিয়ে গেল একটা লরি। স্কুটারটা তালগোল পাকিয়ে গেল। মানুষটা চুরমার। চারপশে থেকে লোক ছুটে এল। একদল ধাওয়া করল লরিটার পেছনে। শান্ত সুন্দর একটা পরিবেশ নিমেষে রক্তাক্ত। একটা ট্যাক্সি থেকে আরোহীদের টেনে টেনে নামিয়ে লোকটিকেও তোলা হল। সবাই বললে অকারণ। শেষ হয়ে গেছে। একেবারে দলা পাকিয়ে গেছে।

আমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিলুম একপাশে। হাত-পা কাঁপছে। চোখের সামনে ভয়াবহ মৃত্যু সহ্য করা যায়! সুন্দর লাল রঙের স্কুটারটা মারা গেছে। মানুষ নয় বলে পড়ে রইল পথের পাশে। এক সেকেন্ড আগে আর এক সেকেন্ড পরে। সময়ের ওই সাংঘাতিক মুহূর্তটা কোনও রকমে পাশ কাটাতে পারলে স্কুটার আরোহী এতক্ষণে কত দূরে চলে যেত। কোথাও কোনও বাড়িতে তাঁর স্ত্রী হয়তো ঘড়ি দেখছেন আর ভাবছেন স্বামীর আসার সময় হল। মাছের কচুরি বেলছেন। এলেই ভেজে দেবেন গরম গরম। কেন আসছে না, কেন আসছে না করে সময় এগোবে। এক সময় মৃত্যুদূত এসে দরজার কলিংবেল টিপবে। ছোট মেয়েটি ছুটে আসবে বাবা, বাবা বলে। বাবা নয়। এসেছে বাবার মৃত্যুসংবাদ। সব আলো জ্বলছে, অথচ কী ভীষণ অন্ধকার! আমি ভাবছি এইসব, তার মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। আবার সেই রাজপথ। নতুন গাড়ি। নতুন মানুষ। পাশের রেস্তোরাঁয় তিনটি ষণ্ডা মতো লোক, হাতের চেটোর মতো চওড়া কাটলেটে কামড় মারছে। পাশে চায়ের কাপ ধোঁয়া ছাড়ছে। ঠিক ওই জায়গার ওপর দিয়েই দু'চাকা ছুটছে। পেছনে ধাওয়া করে আসছে লরি। মানুষটির চলে যাওয়ার চেয়েও আমি ভাবছি তাঁর পরিবারের কথা। বুড়ি মা বেঁচে নেই তো! অবিবাহিতা বোন। তিনদিন পরেই যার বিয়ে। ছেলে হওয়ার জন্যে স্ত্রী হাসপাতালে ভরতি ছিল না তো!

কে জানে বাবা! আমার ভীষণ ভয় করছে! ঠিক এক সেকেন্ড পরে কী হবে তাই তো জানি না। অথচ কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছি। আজকে দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা করছি বিশ বছর পরের। এই তো আজই ষাট হাজার টাকার ইনসিওরেন্স করেছি। পাকবে সেই বিশ বছর পরে, আমার বয়স তখন হবে ষাট। কোনও মানে হয়! এই সাংঘাতিক ভয়ের পৃথিবীতে এক মিনিট পরে কী হবে কেউ জানে! না আমি জানি, না আমার বউ। সেদিন এক ফার্নিচার-এর দোকানের মালিক বেশ বললেন। একটা খাট কিনতে গেছি। তা বললুম, ভাই এমন একটা খাট দিন, যা সারা জীবন চলে যাবে। ভদ্রলোক আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, 'আপনি কত বছর আছেন, জানতে পারলে আমার সুবিধা হয়। দশ বছর, বিশ বছর। আপনার জানা আছে?'

খুব বোকা বনে গেলুম। সারা জীবন বলার সময় আমার কোনও ধারণাই ছিল না। সেটা কতটা? কত দূর! ভদ্রলোক তখন ভগবানের মতো হেসে বললেন, 'মশাই, জীবন বড় অনিশ্চিত। পদ্মপাতায় জলের মতো। এই আছে এই নেই। একটা খাট দিচ্ছি। নিয়ে যান। তারপর দেখা যাক, খাট আগে যায় না মানুষ আগে যায়। আমার অভিজ্ঞতায় বলে, যেমনই হোক, মানুষই আগে যায়।'

একটু বেশ ঝালে-ঝোলে মেখে তরিবত করে খাওয়াদাওয়া সারা হল। ঢেউ শব্দে বেশ জমাটি একটা ঢেঁকুর উঠল। ছুটির দিন, ভাবছি, একটু গড়িয়ে নিলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। দিবানিদ্রার মহাসুখ। যখন যেমন পারা যায় জীবন থেকে সুখ বের করে নিতে হয় নিংড়ে।

বউ বললে, 'এখন আর গড়িয়ে পড়ো না। পিসিমাকে একবার দেখে এসো। অবস্থা খুব খারাপ।'

তাই তো! পিসিমাকে তো একবার দেখতে যাওয়া দরকার। কী থেকে কী হয়ে গেল। অমন এক সাধিকার মতো মহিলা। সারাটা জীবন যাঁর দু:খের সঙ্গে লড়াই করে কেটেছে। কত কাণ্ড করে বিধবা মহিলা ছেলেটিকে মানুষ করলেন। ভালো মাইনে হল। বিয়ে হল ছেলের। দুই নাতি। জীবনের একেবারে শেষ কালে সুখ ছোঁব ছোঁব করছে। প্রায় ছোঁয়া আর কি। ভগবান পায়ের তলার জমিটা সামান্য একটু টেনে দিলেন খুচ করে। ভোরবেলা মহিলা জপে বসবেন বলে ঠাকুর ঘরে যাবেন। চৌকাঠের ওপর দিয়ে পা বাড়ালেন, এ-ঘর থেকে ও-ঘর। কিছুই না, টাল খেয়ে পড়ে গেলেন। কোমরের হাড়ে একটু চোট লাগল। যা হয়। কেউ বললে, জল দাও, কেউ বললে মলম, আরনিকা। সামান্য চোট। আরে বাবা বৃদ্ধ বয়সের হাড়। একেবারে পাটকাঠির মতো। সেই হল। হিপজয়েন্ট ফ্র্যাকচার। তিনমাস পড়ে থাকো বিছানায়। যে মানুষ রাতে ঘণ্টা চারেকের জন্যে বিছানা নিতেন তাঁর এ কি শাস্তি। বিছানা তাঁকে ভালোবেসে বললে—কিছু মানুষ আসে সেবা করার জন্যে কিছু আসে সেবা নেওয়ার জন্যে। তুমি এসেছিলে সেবা করার জন্যে। এইবার তুমি আমার সেবা নাও। চোট লাগা পাটা ভুল সেটিং--এর জন্যে বিকল হয়ে গেল। শরীরের যেখানে যত গোলযোগ ছিল, ব্যাধিশত্রু, সব তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে এল। রণক্লান্ত সৈনিক এইবার ঘরে ডাক পেয়েছেন। চেতন, অচেতন, অর্ধচেতন স্তরে মন ভাসছে। অলৌকিক দৃশ্য দেখেছেন মাঝে মাঝে। আজ অথবা কাল, যে কোনও দিন বীণা নীরব হবে।

ভীষণ ভয় করে। ভগবানকে বিশ্বাস করে তো তাহলে কোনও লাভ নেই। তিনি তো কোনও রক্ষাকবচ নন। আমার পিসিমার চেয়ে ধার্মিক ক'জন আছেন! আর জীবনে অত কষ্টই বা কে করেছেন। সুখের পেয়ালাটি সবে এগিয়ে এসে ঠোঁট স্পর্শ করব করব করছে। ভাগ্যের হাত থেকে হাতলটি খুলে গেল। হাতলের জোড় খুলে কাপ পড়ে গেল। হল না। এবারটাও হল না। সব দৌড়ে সবাই কি ফিতে ছুঁতে পারে! পরের বার। পিসিমা পরের বার। নেকস্ট টাইম বেটার লাক।

চৌকির ওপর বিছানা। চাদর ঢাকা পিসিমা। মুখটাই শুধু বেরিয়ে আছে। মুখ না বলে কঙ্কাল বলাই ভালো। শুধু পাতলা একটা চামড়ার আস্তরণ। ভীত, সন্ত্রস্ত, করুণ দুটো চোখ। চোখ দেখলেই বন্দি মানুষকে চেনা যায়। বনে পাখি আর খাঁচার পাখি। পিসিমার চোখ মুক্তি খুঁজছে। অনেকদিন এসেছি। ভাগ্যের চাবুক অনেক সহ্য করেছি। অসম্ভব সম্ভব হবে ভেবেছি। ভেবেইছি। আর আমি ভাবতেও পারছি না। পাখি এবার তুমি উড়ে যাও। প্রভু খাঁচা আমার খুলে দাও।

পিসিমা চাদরের তলা থেকে শীর্ণ হাত বের করে আমাকে স্পর্শ করতে চাইলেন। শক্তি নি:শেষ। আমি কোনওভাবেই জিগ্যেস করতে পারলুম না, কেমন আছেন? দেখতেই তো পাচ্ছি। বলতেও পারলুম না। ভালো থাকুন, সাবধানে থাকুন। ও কথার কোনও মানে হয় না। যার জীবন তিনিই জানেন কে কতদিন ভালো থাকবে। কে কখন ভালো হয়ে উঠবে। আমার পিতার তরফের শেষ প্রতিনিধি। যেই চলে যাবেন অন্ধ হয়ে যাবে বইয়ের মলাট। কেউ কোনওদিন আর খুলবে না। খোলার প্রয়োজন হবে না। বিছানার পাশে বসে রইলুম বহুক্ষণ। পিসিমার ভেতরে অদৃশ্য এক নৌকা বেয়ে চলেছে ঢেউ মোহানার দিকে। আমি যেন শুনতে পাছি দাঁড়ের শব্দ। জল কল্লোলের শব্দ।

পথে নেমে এলুম। বড় অসহায় লাগছে নিজেকে। মানুষকে একদিন না একদিন যেতে হবে ঠিকই। কিন্তু এইভাবে কেন? যাবে তো বিস্ফোরণের মতো যাও। ধনুক থেকে ছেঁড়া তীরের মতো যাও। অথবা যেভাবে মানুষ বেড়াতে যায় সেইভাবে যাও। রেলগাড়ির জানালার ধারে মুখ বের করে বোসো। হাসতে হাসতে হাত নাড়তে নাড়তে চলে যাও। আমরাও রুমাল নাড়ি, তুমিও রুমাল নাড়ো।

একটা হিসেব করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমার ছেলে শানুর বয়স এখন পাঁচ। তার মানে এখনও কুড়িটা বছর। কুড়ি বছর টেনে যেতে হবে। স্কুল, কলেজ, জীবিকা। তারপর রাখে ভালো, টান মেরে ফেলে দেয় সেও ভালো। সে হবে ভয়ংকর ভালো। কোথায় যাব। কোন আস্তানায় থাকব। তখন তো অথর্ব। লোলচর্ম। বিস্মৃতিপ্রবণ। ঘৃণিত এক বৃদ্ধ। দুটো জিনিস বর্তমান জগতে অতিশয় ঘৃণার, এক দারিদ্র্য, দুই বার্ধক্য। ঘৃণা নিয়েই মরতে হবে। সসম্মানে আর ক'জন যেতে পারে। এই যে আমার পিসিমা। সবাই এখন ফিসফাস করছে, এই অবস্থায় যাওয়াই ভালো। ভালো হওয়ার যখন আশা নেই, তখন যাওয়াই ভালো। হিসেব তো মিলছে না আমার। কুড়িটা বছর আমাকে টাকার পাইপ লাইন ঠিক রাখতে হবে। কল ঘোরালেই যেন টাকা পড়ে। ছেলের নিজের পায়ে দাঁড়ানো। দুটো মেয়ের প্রায় একই সঙ্গে বিয়ে। এর মধ্যে কতবার সব অসুখে পড়বে। চিত্রার অপারেশান। মেয়েদের একটা না একটা বড় রকমের অপারেশান হবেই হবে। এখন খুব কম বউই আছে যারা অক্ষত জীবন শেষ করেছে। বলা তো যায় না। যদি ব্রেস্ট ক্যানসার হয়। ইউটেরাসে ক্যানসার। হবে না, এ কথা তো জোর করে বলা যায় না। আমারও ক্যানসার হতে পারে। আজকাল তো প্রতি পাঁচজনে একজনের ক্যানসার।

ভীষণ ভয়। এখন চিত্রা যদি আমার চেয়ে আগে চলে যায়। আমি নি:সঙ্গ। আর আমি যদি আগে যাই। চিত্রা কী করে সামলাবে। পুরো পরিবার ভেসে যাবে। ছেলেটা বদ সঙ্গে বখে যাবে। আজকাল তো দুটো ভবিষ্যৎ মানুষের ছেলের। হয় মানুষ হও, না হয় গুণ্ডা হও। গুণ্ডারা যেন চৌবাচ্চার কই মাছ। নেতারা এসে বেছে বেছে তুলে নেবেন। মদত দেবেন। শেল্টার দেবেন। নেতারা হলেন রাজনীতির ইস্কুপ। গুণ্ডারা হল স্ক্রু ড্রাইভার। গদির প্লাইউডে ফিট করে দেবে। বাঁচবে না বেশি দিন। অপঘাতেই মরবে। তবু তো জীবিকা। বোম মেরে, ছুরি মেরে বাঁচা অথবা মরা। তা বীরই বলা চলে। মেয়ে দুটোরই বা কী করবে চিত্রা। প্রেম তো করবেই করবে। দেখতে শুনতে কেউ খারাপ নয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা যেমন হবেই হবে, প্রেমও হবে। বিয়ে হবে। তারপর ডিভোর্স। এক নম্বর স্বামী। স্বামী নম্বর দুই। তিন, চার। আজকাল একটা গান কানে আসে। এক, দো তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট, নয় দশ এগারো বারো। মনে হয় ওটা বিয়েরই গান। চিত্রা যায় যাক, শিবির আগলে আমাকেই বসে থাকতে হবে। যুগকে ঠেকাতে পারব না। তবু চেষ্টা।

বেঁচে থাকাটা কী সাংঘাতিক ভয়ের। আগুন নিয়ে খেলা। অপরেশ এল ম্লান মুখে। সুন্দর চেহারা ছিল। অভিনয় করত এক সময় সখের থিয়েটারে। প্রাইভেট ফার্মে ভালো চাকরি করত। আজ টানা তিন বছর প্রতিষ্ঠান বন্ধ। আজকাল এটা খুব জরুরি। কলকারখানা বন্ধ না হলে মানুষের ভালো হবে না। যেমন অপরেশের হচ্ছে। কাঠের মতো শরীর হয়েছে। লোহার মতো মুখ। কত রকমের চেষ্টা করছে সংসার চালাবার জন্যে। কিছু আর বাকি নেই। কোনওটাই তেমন লাগছে না।

অপরেশ চিত্রাকে বলছে—'ছেঁড়া, খোঁড়া ফেলে দিলেই হয় এইরকম দু-একটা শাড়ি আছে? বড় উপকার হয়।' আমার চোখে জল এসে গেল। পুরুষ মানুষ কাঁদা উচিত নয়। কী করব চোখের জল যে চাপতে পারি না। এই অপরেশ আমার বাল্যবন্ধু। একই সঙ্গে জীবন শুরু করেছি। একই স্কুলে পড়েছি। একই মাঠে খেলেছি। অপরেশের কী প্রাণ ছিল। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজন, সবাই তাকে ত্যাগ করেছে। ওই যে বললুম, দারিদ্র্য বড় ঘৃণার।

চিত্রা দুটো নতুন শাড়ি অপরেশকে দিতে গেল। অপরেশ হাত জোড় করে বললে, 'নতুন শাড়ি চাই না বউঠান। ছেঁড়াখোঁড়া থাকে তো দিন। আপনি ফেলে দেবেন বা বাসনওলাকে দিয়ে দেবেন।'

কিছুতেই নিলে না নতুন শাড়ি। চিত্রা বোঝাতে বোঝাতে শেষে কেঁদেই ফেললে।

অপরেশ বললে, 'বউঠান, মন খারাপ করবেন না। জগতে কেউ ভালো থাকে, কেউ খারাপ থাকে। আবার আজ যে ভালো আছে, কাল সে খারাপ। দিনের এটাই মজা। কখনও একরকম যায় না। চেষ্টাটাই বড় কথা। বেঁচে থাকার চেষ্টা। ভালো থাকার চেষ্টা। ভয় পেলে চলবে না। হাল ছাড়লে চলবে না। এইটাই তো পরীক্ষা। মানুষ নাগরদোলায় চেপে আনন্দ পায় কেন? ওই যে ওঠা-পড়ার ভয়ের আনন্দ।

অপরেশ চলে গেল। তবু আমার ভয় গেল না। কতটা পথ এই একা একা যেতে হবে তা তো জানি না। সেদিন একটা আধপাগলা লোক আমাদের রকে বসে আছে। প্রায় উদোম। পরনের ফুলপ্যান্ট কোলের ওপর ফেলে বোতাম বসাচ্ছে। আমাকে দেখে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, 'আমার আবার ভয় কী? আমার ছুঁচ সুতো, বোতাম সবই আছে। বোতাম ছিঁড়বে, নিজে নিজেই বসিয়ে নেব। আর যেদিন প্যান্টটাই ছিঁড়ে যাবে সেদিন কী করব! বোতাম তুমি বসবে কোথায়'। আমাকে বললে 'শোন'। কাছে গেলুম। খুব চুপিচুপি বললে—'দারা-পুত্র-পরিবার সবই হল বোতাম। বুঝলি ব্যাটা ফুলপ্যান্ট!'

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%