সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এত মারামারি কাটাকাটি, মামলা, মোকদ্দমা, ভুল বোঝাবুঝি, এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু উৎসব, পালাপার্বন, পথে ঢ্যামকুড়কুড় পশ্চাৎ-ভঙ্গ বিসর্জন নৃত্য, সবই বজায় আছে। এই হল বাঙালির বিউটি। এদিকে টিভিতে পেয়ারি দুষমণের খেল চলেছে, ওদিকে বৃদ্ধা মাতাকে যমে ঠ্যাং ধরে টানছে। এদিকে সত্যনারায়ণ হচ্ছে, বউরা সিন্নি মাখছে। ওদিকে বড়ভাই আর মেজভাই কাজিয়া করছে, একটু পরেই হয়তো তাজিয়া বেরিয়ে যাবে। এদিকে প্যান্ডেলে মায়ের সন্ধি পুজো হচ্ছে ধূপধুনোয় অন্ধকার, ভক্তদের মা মা আর্তনাদ, ওদিকে যুব শক্তি শাড়ির আঁচল ধরে টানাটানি করছে। এদিকে চণ্ডী বলছেন, 'স্ত্রীয়া: সমস্তা সকালা জগৎসু', ওদিকে ভোগের জন্য আঁচড়াআঁচড়ি, আদর্শবান যুবক প্রতিবাদ করতে গিয়ে সকলের চোখের সামনে প্রাণ দিচ্ছে। এর নাম ধর্ম। এর নাম, বারো মাসে তেরো পার্বণ করে আমাদের ধার্মিক হওয়ার নমুনা।
যাক এই নিয়ে নাকে কেঁদে লাভ নেই। এইরকমই হয় মানুষের সংসারে। এরই মাঝে আমাদের আসতে হবে বাঁচতে হবে, মরতে হবে। উপায় নেই। আমাদের নিয়তি। আমরা আমাদের ভাই হয়ে আসব, বোন হয়ে আসব, পিতা হব, মাতা হব। চেষ্টা করব ভালোবাসা নিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে বেঁচে থাকতে। চেষ্টা করব কাছে টানতে, সবাই মিলে সদ্ভাবে বেঁচে থাকার অসীম আনন্দ। হাজার হাজার টাকা সে আনন্দ দিতে পারবে না, কিন্তু ক্ষুদ্র স্বার্থ, অহংবোধ, ঈর্ষা, লোভ আমাদের সেই আনন্দ পেতে দেয় না। বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের দুই বউ। একসঙ্গে মিলেমিশে কী সুন্দর থাকা যায়, থাকবে না। দুই ভাই, মায়ের পেটের ভাই, একই মায়ের কোলে মানুষ, ছেলেবেলায় একই সঙ্গে বল খেলেছে, গল্প শুনেছে, এক বিছানায় ঘুমিয়েছে, একসঙ্গে স্কুলে গেছে, আর যেই না বড় হল, অহং আর স্বার্থবোধ জাগল, এ ওকে দেখতে পারে না, ও একে। মুখ দেখাদেখি বন্ধ। নিজের ভাইকে ফেলে বন্ধুর সঙ্গে হলায় গলায়। শলাপরামর্শ, সিনেমা, রেস্তোরাঁ, গালগল্প, বড় প্রাণের জন। পরের কথায় ওঠা বসা, পরের খিদমত খেটে মরা, আর ঘর গেল ভেসে। নিজের ভাই পড়ে মরে গেলেও মুখ ফিরিয়ে চলে যাব, আর প্রাণের বন্ধুর কুকুর অসুস্থ হলে কমলালেবু হাতে ছুটে যাব। এই হল আমাদের খেলা।
এমন অনেক পরিবার আছে, যে পরিবারে ভাইবোনে মুখ দেখাদেখি নেই, অথচ ভাইবোনের সম্পর্ক কতই না মধুর! বোন যদি দিদি হয়, তার ভূমিকা অনেকটা মায়ের মতো, বন্ধুর মতো তো বটেই। ছোট ভাইটি কোলে করে তার দিন কেটেছে। মা ব্যস্ত কাজে, ছোট ভাইকে কে দেখবে, দিদি। বয়েসের ব্যবধান যত কমই হোক, সে দিদি। ভাইটিকে কোলে করে হয়তো নড়তে পারছে না, তবু তার দিদিগিরি ফলানো চাই। দুষ্টুমি করলে হয়তো গাল টিপে দিল, কিংবা চটচট চাঁটি। আবার কান্না থামাবার জন্যে মুখ থেকে লজেন্স বের করে ঢুকিয়ে দিল ভাইয়ের মুখে। এই ভীষণ সংসারে সেইসব স্বর্গীয় দৃশ্যের কোনও তুলনা আছে—খুদে দিদি, খুদে ভাইকে চান করিয়ে, গা মুছিয়ে দিচ্ছে। মাছের কাঁটা বেছে, ভাতের নাড়ু করে কচি হাঁ-য়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। মুখ মোছাতে মোছাতে হঠাৎ চুমু খেয়ে বলছে—সোনাটা।
সে কী ভোলা যায়, দিদির কাছে পড়তে বসা। দিদির অকারণ শাসন। ভায়ের চিৎকার—মা দ্যাখো না, আমায় মারছে। আবার দামাল ভাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে দিদির কোলে, চুল ধরে টান। দিদির চিৎকার—মা আমায় মারছে, কান ধরে ঝাঁকানি, বাঁদর ছেলে। শেষে দুজনেরই বরাতে মায়ের প্রহার। কথা বন্ধ আড়ি। শেষে জলভরা চোখে ভাই এল ভাব করতে—রাগ করেছিস দিদি। আবার ভাব।
এমনি করেই কিন্তু দিন যায় না। কৈশোরের স্বর্গ থেকে যৌবনে চির বিদায়। ভাই তার সংসারে, গলায় প্রেমিকা। ননদের নাম কাঁটা। কোন অখ্যাত অঞ্চলে কার অভাবের সংসারে পড়ে আছে সেই দিদি। মনেও পড়ে না। দিদির কিন্তু মনে পড়ে—চিঠি দেয়। উত্তর যায় না এদিক থেকে। ভালোবাসার উপহার অহংকারে ভেসে যায়—এই অখদ্যে মাল দিয়েছে তোমার বোন। কতই বা দাম। কপাল থেকে চন্দনের টিপ মুছে ফেলতে সময় লাগে এক সেকেন্ড।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন