সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি তখন যুবক। জীবন জ্বালায় ছটফট করছি। নীড়ের ঠিকানা খুঁজছি। একজন জীবন সাথী। এমন একজন আপনজন, যে আমার সঙ্গে দু:খসুখের পথ ধরে জীবনের শেষ পর্যন্ত হেঁটে যাবে। আমরা আনন্দে হাসব, দু:খে চোখের জল ফেলব। নিভৃতে গল্প করব। অভিমানে মৌনী হব।
কোথায় কী। সকলেই ফেরিঅলা। হয় নিজেকে বেচতে চায়, নয়তো কিনতে চায়। সবসময় হিসেব, কতটা দিলুম, পেলুম কতটা মজাটা এই, সকলেই কিন্তু খুঁজছে সেই একজনকে, যার হাতে হাত রাখা যায়, যাকে বিশ্বাস করা নিজেকে সমর্পণ করা যায়। কথাটা হল এই, একজন আর একজনকে খুঁজছে, আমি তোমাকে খুঁজছি, তুমিও আমাকে খুঁজছ, কিন্তু কেউ কারোকে খুঁজে পাচ্ছি না। আছে, সকলের জন্যেই কেউ না কেউ আছে। চিঠির পর চিঠি লেখা হয়, ডেলিভারি হয় না।
একটা কথা একশো ভাগ সত্য, প্রেম মানে বিয়ে নয়। বউ যে প্রেমিকা হবেই এমন কথা জোর গলায় বলা যাবে না। হ্যাঁ, এসেছে জীবনে, থাকবেও হয়তো, কিন্তু প্রয়োজন অবশ্যই মিটবে, জৈব কারণে সন্তানসন্ততিও হবে। একজন মারা গেলে আর একজনের খারাপ লাগবে, ফাঁকা লাগবে কিছুকাল। এ কীরকম, কলের জল, ঝরনার জল নয় কিন্তু। কলের জলে কবিতা নেই, ঝরনার জলে কবিতা আছে। কবিতা কী জিনিস? অক্ষরের মালায় গাঁথা হৃদয়ের কথা। তার কোনও ভাষা নেই, ব্যাকরণ নেই। সে কেমন! গভীর রাতের পাহাড়ি নদী। নিজের মনে বহে যেতে যেতে পাথরে পাথরে কত কথা। মৃদু আলাপনা। হাঁটু গেড়ে বসে কান খাড়া করে শুনতে হয়, নদীর কথা শিলার সনে।
সেই বিভ্রান্তির বয়সে এক জ্ঞানী মানুষ আমাকে বড় সুন্দর একটি কথা বলেছিলেন, শোনো ছোকরা, না চাওয়াটা অভ্যাস করো, চাইলে যা পাবে সেটা হবে ভিক্ষা, তাতে পেট ভরবে, স্বাদ থাকবে না, না চাইতেই কী পাওয়া যায় দ্যাখো না! গাছকে তোমার আদর্শ করো। গাছ কি কিছু চায়। গাছ শুধু দিয়েই যায়, ফল, ফুল, কাঠ, পাতা। তুমি বলবে, গাছ কী পায়? গাছ যা পায় মানুষ তা কোনও দিনই পাবে না। গাছ পায় অক্ষয় আনন্দ। এবার তুমি বলবে, কী করে বুঝলেন। গাছের শাখাপ্রশাখার দিকে তাকাও। আনন্দে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে যেন নৃত্য করছে সদা। বাতাসে তার দুলুনি দ্যাখো। দ্যাখো পাতার হরিৎশোভা। বড় কোনও গাছের ছায়াতলে গিয়ে বোসো, তোমার প্রাণে শান্তি আসবে, আনন্দ পাবে। তুমি শীতল হবে, তোমার ঘুম আসবে। গাছ কত বিচিত্র প্রাণীর আশ্রয়স্থল। তাকিয়ে দ্যাখো, কাণ্ডে ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্যস্ত সমস্ত পিঁপড়ের দল। গুঁড়ি বেয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে লেজ তোলা কাঠবেড়ালি। ডালে ডালে হরেক পাখির হরেক সুরে গান। যে আশ্রয়, আহার, ছায়া দিতে পারে তার আনন্দের পরিমান করা কি সহজ ভাই!
তাঁর কথায় যৌবন কিছুটা শান্ত হল। চাই না, কিছুই চাই না। একখণ্ড প্রস্তরের মতো নিজেকে ফেলে রাখি। কেউ যদি কুড়িয়ে নেয় ভালো, না নেয় না হয় পড়েই থাকব। উদরান্নের সামান্য ব্যবস্থা আর জন-অরণ্যে মিশে যাওয়া। নিজের নয় মানুষের সুখ দ্যাখা, দু:খ দ্যাখা। খেলা তো চলতেই থাকবে। 'কে খেলায় আমি খেলি বা কেন'--এ প্রশ্ন নিরর্থক। কোনওদিন কোনওভাবেই উত্তর মিলবে না। বাঁচতে বাঁচতে জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দেখা যাবে একটা ডাইভিং বোর্ডে দাঁড়িয়ে আছি, নীচে জল, এইবার মারব লাফ, ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে যেতে সেই একই আশঙ্কা, তল আছে তো!
হঠাৎ একদিন অবাক হয়ে আবিষ্কার, আমি হাসতে শিখেছি, প্রাণখোলা হাসি। আমি মেকানিক হয়ে গেছি। পথ চলতে যত ভাঙা গাড়ি দেখি, সারাবার জন্যে ছুটে যাই। মন্ত্র একটাই, জীবন হল ফুটবল খেলা, হয় গোল দেবে, হারবে তারা। তারা কারা? তোমার বিপক্ষ। না হয় গোল খাবে, তুমি হারবে, জিতবে বিপক্ষ; কিন্তু পক্ষ বিপক্ষ তো আমারই সৃষ্টি। আসলে তো সেই এক মানুষ। অনেক মানুষের একজন মানুষ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন