সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

যুগটা বেশ ভালোই। মাছের মতো সব উপর দিকে ভেসে উঠেছে। সারফেসে সাঁতার। গভীর বিষয়ও নেই, গভীরে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। চটজলদি শর্টকাটের যুগ। সর্বত্র আদিখ্যেতা আর দেখনাই। পুরো কথাও আজকাল কেউ বলে না। সব অনুচ্চারিত অর্ধেক শব্দ—প্রমো, অ্যাড, ক্যালি, ফান্ডা, ম্যাথস এইরকম—এটসেটরা।
পিতা পরলোকে গমন করেছে। দৈত্যের মতো তিনটি সন্তান। ঝড়ের মতো গতিসম্পন্ন তাঁদের তিনটি বধূ। এই ঝড়েরই তিনটি শিশু সন্তান। শুভ্র কেশ শ্বেত বস্ত্র পরিহিতা জননী। পিতা কিছু সম্পত্তি রেখে গেছেন। ছেলে তিনটির একজন চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, দ্বিতীয়টি অ্যাডভোকেট, তৃতীয়টি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, আমেরিকায় থাকেন। পরলোকগত ভদ্রলোকের দুই মেয়ে। বড়ো মেয়ে দক্ষিণ কলকাতায় এক সম্পন্ন ব্যবসায়ীর স্ত্রী। দ্বিতীয় মেয়ে প্রেম করে এক অধ্যাপককে বিবাহ করেছেন। সাবেক আমলের বাড়ি বেশ বড়ো। তার নানা অলি-গলি।
শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান। ভালো কীর্তনীয়া এসেছেন। একদিকে চলেছে ক্লাসিক্যাল কীর্তন। এসেছেন দুই বিশুদ্ধ পণ্ডিত। তাঁদের একজন কঠোপনিষদ পাঠ করছেন। আর একটু দূরে দ্বিতীয় পণ্ডিত পাঠ করছেন গীতা। শ্রোতা হিসেবে কিছু মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে। সারি সারি চেয়ার পাতা। পরিবারের শিশু সদস্যরা তার ফাঁকে ফাঁকে চোর চোর খেলছে। এদের মধ্যে যেটি একেবারে শিশু সে এক একবার এক একটি চেয়ারে উঠছে আর উলটে উলটে পড়ে যাচ্ছে। পণ্ডিত মশাইরা বিদায় পাবেন, তাই এতটুকু বিচলিত না হয়ে একজন গীতা বিদায় করেছেন, আর একজন কঠোপনিষদের দায় সামলাচ্ছেন। তিন পুত্রের তিন মাথা তেল চুকচুকে করে কামানো। তিনজনেই শ্রাদ্ধীয় অনুষ্ঠানে পুরোহিতকে ঘিরে বসে আছেন। অল্প অল্প মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে। যে যেমন শুনছেন সেই রকম বলছেন। বড়ো ছেলে জীবনে কখনও পা মুড়ে বসেননি। তিনি একটি বিপুল ভুঁড়ির মালিক। সেটি অবশ্যই অস্বস্তির কারণ। হাঁসফাঁস করছেন। থেকে থেকে মন্ত্র ফেঁসে যাচ্ছে। মন্ত্রের ফাঁকে ফাঁকে একটি করে স্বগতোক্তির প্রবেশ—এভাবে পারা যায়!
দ্বিতীয় ছেলে অ্যাডভোকেট, ক্রিমিনাল সাইডে কোর্টে সওয়াল জবাব করতে হয়। তিনি সেই কায়দাতেই মন্ত্র পড়ছেন। যেন পিতা এক ক্রিমিনাল। আর শাস্ত্রধারী পুরোহিত এই শ্রাদ্ধের জজ সাহেব। পুত্র পিতাকে ছাড়াতে এসেছেন।
তৃতীয় সন্তান কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, তিনি ভাবছেন এই অ্যাডভান্স টেকনোলজির যুগে শ্রাদ্ধটাকে কম্প্যুটারাইজড করে ফেললে কেমন হত! এই কলার পেটো, গুচ্ছের কলাপাতা, আতপ চাল, তারপরে কামানের গোলার মতো গোলগোল পিণ্ডির সারি, গঙ্গামাটি, গঙ্গাজল, চতুর্দিকের এই থই থই আয়োজন। এসবের কী অর্থ। তিনি ভাবছেন আমেরিকায় ফিরে গিয়ে বাঙালির এই শ্রাদ্ধ পর্বটিকে কম্পিউটারে ঢুকিয়ে একটা প্রাোগ্রাম তৈরি করলে কেমন হয়। তিনি মন্ত্র উচ্চারণ করছেন না। শুধু লিপ দিচ্ছেন। শরীরে আমেরিকান কোলন মেখে বসেছেন। ফ্লোরা ধুপের গন্ধ ছাপিয়ে তার গাত্র-গন্ধ শ্রাদ্ধ বাসরে পায়চারি করছে। মালা দিয়ে সাজানো পিতার ছবি, তাঁর হাঁপানি ছিল। এই ধূপের গন্ধ আর কোলনের গন্ধ পাঞ্চ হয়ে তাঁর নাকে গিয়ে লাগছে। শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে যাঁর শ্রাদ্ধ, তিনি জ্যোতির্ময় শরীরে উপস্থিত থাকেন। শরীর জ্যোতির্ময় হলেও নাকটা যাবে কোথায়। সেই নাকে এই গন্ধে শ্বাসকষ্ট। সেই কষ্ট বোঝাবার জন্যে তিনি তাঁর ছবিটিকেই উলটে দিলেন। যৌবনে কুস্তি করতেন, সেই পুরোনো অভ্যাসের আড়াই প্যাঁচে নিজের ছবিই ধরাশায়ী। মেজ চিৎকার করে উঠলেন, গেল গেল! বড়ো মন্ত্র থামিয়ে বললেন—তোর গলায় তিরিশ কেজি মালা চাপালে তুইও ওইভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতিস।
আমরা কাট করে স্বর্গলোকে চলে যাই এইবার। শ্রীভগবান জ্যোতির্ময় শরীরে ব্রজবাবুকে ফিরে আসতে দেখে জিগ্যেস করলেন—ব্রজ কী হল, তোমারই শ্রাদ্ধ, তুমি ফিরে এলে? ব্রজবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন—প্রভু এ শুধু এক পিতা নয় পশ্চিম বাংলায় জীবিত অথবা মৃত সমস্ত পিতারই শ্রাদ্ধ হচ্ছে, ওই যে দেখছেন আমার বড়ো খোকাটি, বহু খরচ করে তাকে মানুষ করেছিলুম। ভেবেছিলুম আপনার আদর্শে মানুষের মতো মানুষ হবে। ও এখন ক্যাপসুল খায় হুইস্কি দিয়ে। ভগবান প্রশ্ন করলেন—সে আবার কী! বঙ্গদেশে কী বিশুদ্ধ জলের অভাব হইয়াছে! যদি সংক্রমণের ভয় থাকে তাহলে তো আজকাল দেখি সর্বত্রই বোতল বোতল মিনারেল ওয়াটার বিক্রি হয়।
ব্রজবাবু বললেন—আমাদের দেশে সে ব্যাপারেও সন্দেহ। এই যেমন ধরুন মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ মানুষ থাকাই উচিত। মানুষকে যদি বোতল ভাবেন তাহলে তার ভেতরে মানবতা কি তরল হয়ে আছে। না সে কথা নয় আপনার ওই পৃথিবীতে একাজাতির মানুষকে ব্রাহ্মণেরা জল অচল জাতি বলে। তা আমার ওই বড় পুত্তুরটির উদর আমার পুত্রের হাতে জল খেতে অস্বীকার করে। দেখছেন না ওর উদরটি ওর শরীর থেকে বেরিয়ে বাইরে পালাতে চাইছে। উনি হলেন দুটি সত্বা। একটি হল উদর আর একটি হল প্রবর। সেই ছড়ার মতো—আগে চলে ভুঁড়ি পিছে চলে নর। জল সহ্য করতে পারে না বলেই উদরে মদ ঢালে। আবার মাঝে মাঝে বলে, আমি এজেন্সি ফিট করেছি। গোগ্রাসে নির্বিচারে খেয়ে বলে হজমের জন্যে ভাবি না সে বুঝবে আমার এজেন্ট। —বিলিতি এজেন্ট।
ঈশ্বর জিগ্যেস করলেন—ব্রজ তুমি কি উনবিংশ শতাব্দীর মদ্যপান নিবারণী সমিতির সদস্য ছিলে?
ব্রজবাবু বললেন—প্রভু ওদেশে এখন উলট পুরাণের যুগ। ওখানে এখন জলপান নিবারণী সমিতি পাড়ায় পাড়ায়। ওই যে দেখছেন আমার তিনপুত্র, ওরা তিনজনেই সপরিবারে মদ্যপান করে। ঈশ্বর জিগ্যেস করলেন—ব্রজ, তুমি তোমার যৌবনে যা করে এসেছ তার সব রেকর্ড আমার দপ্তরে আছে। তোমার ওই যে বিষয় সম্পত্তি সে তুমি কোন পথে করেছ আমরা জানি। তুমি নিজে খেয়েছ অন্যকে উপবাসী রেখে। তুমি তোমার বড়োলোকি ছড়ি ঘুরিয়েছ অন্যের ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে। তোমার যে গায়ে গায়ে পাঁচটি পুত্র কন্যা সেটা কি তোমার সংযমের পরিচয়? সাদা থান পরে ওই যে তোমার সহধর্মিণী জড়সড় হয়ে এক পাশে বসে আছে সে তো তোমার ভোগেরই পরিণাম! এই নারীকে তো তুমি সারাজীবন ভোগের ভূমি হিসেবে ভেবে এসেছ। শেষ বয়সে তুমি মালা তিলক ধারণ করেছিলে। তোমার কি ধারণা, বলদের গলায় তুলসীর মালা ঝোলালে সে মহাপ্রভু হয়ে যাবে! তুমি যেমন মাল তুমি যাদের রেখে এসেছ তারা সেই রকমই পয়মাল!
ব্রজবাবু বুদ্ধি করে বললেন—প্রভু, তা হলে আমি স্বর্গে এলুম কী করে?
ভগবান হাসতে হাসতে বললেন—ব্রজ, এটাকে তুমি স্বর্গ ভেবেছ! স্বর্গ এখন নরক। আর নরকই এখন স্বর্গ।
ব্রজবাবু সবিস্ময়ে বললেন—সে কী!
ভগবান হাসতে হাসতে বললেন—পৃথিবীতে এখন যারা ধার্মিক, সমাজসেবী, পরহিতব্রতী, মিডিয়া যাদের মহাপুরুষ বলে কলমের পর কলম লেখে তারা মারা যাওয়ার পর কাতারে কাতারে এসে এখানে পাইপগান, পিস্তল, আর ডি এক্স বের করে বলে, স্বর্গ চাই স্বর্গ। আমরা কায়দা করে আকাশকুসুম দিয়ে সাজানো তোরণের ভেতর দিয়ে স্বর্গে ঢুকিয়ে দিই। নরকের বাসিন্দাদের সব এখানে ট্রান্সফার করে দিয়ে নরকের নাম স্বর্গ রেখে সেখানে প্রকৃত স্বর্গবাসের অধিকারীদের চালান করে দিয়েছি।
ব্রজবাবু জিগ্যেস করলেন—প্রভু, নরকের লটবহর সেসব গেল কোয়ায়? কুম্ভীপাকের পাক, রৌরবের রৌরব, যে কটাহে গরম তেলে পাপীদের ভাজা হত সেই কড়া আর তেল, ড্যাঙ্গস, নানা মাপের হাতলে লাগানো কাঁঠালের মতো দেখতে সেই নিপীড়নের অস্ত্রগুলো গেল কোথায়?
প্রভু হাসতে হাসতে বললেন, শোনো ব্রজ, সেগুলো পৃথিবীতে দান করে দিয়েছি। কড়াগুলো নিয়ে গেছে বিভিন্ন ধর্মপ্রতিষ্ঠান। উৎসবে খিচুড়ি রান্না হবে। কড়া এখন পাপ থেকে পুণ্যে চলে গেছে। তেল গেছে তেলে ভাজার দোকানে। আর ড্যাঙ্গস গেছে নেতাদের অস্ত্র ভাণ্ডারে। তাদের এজেন্টদের হাতে হাতে ঘুরছে। সেই ডান্ডার জোরে তোমাদের দেশে গণতন্ত্র আর ডেমোক্রেসি চলছে। গণভোটে জননেতা মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর মন্ত্রীমণ্ডলী ঠান্ডা ঘরে গদিআঁটা ঘোরানো চেয়ারে বসে তাঁদের দুর্গন্ধী মুখ গহ্বরে গোমুখী মিশ্রিত বাক্য গঙ্গা প্লাবনে তোমাদের দেশকে সুজলাং সুফলাং শস্য শ্যামলাং করতে চাইছে।
ব্রজগোপাল মাথা নীচু করে বসে রইলেন। প্রভু, তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—ব্রজ, একটা কথা শুনে রাখো—গরিবের কথা বাসি না হলে সত্য হয় না।
ব্রজ চমকে বললেন—প্রভু, আপনি গরিব!
প্রভু হাসতে হাসতে বললেন—বাবা ব্রজগোপাল, এক সময়ে আমি প্রকৃতই ঐশ্বর্যশালী ছিলুম। আমার ঐশ্বর্য ছিল মানুষ। সেই মানুষের সংখ্যা যখন কমতে কমতে প্রায় শূন্য হয়ে এল তখন আমি সত্যই দরিদ্র হয়ে গেছি। এখন ভাবছি আমার সেই সুন্দর পৃথিবীতে এত দানব এল কোথা থেকে! আমার একটাই সন্দেহ—গরুকে আমি যত দুধ দিয়ে পাঠাই তার চেয়ে বেশি দুধ মানুষ কী করে দুয়ে নেয়?
ব্রজগোপাল বিনীতভাবে বললেন—প্রভু, আমি জানি। যে পদ্ধতিতে বাড়ায় তার নাম হল ফুকো দেওয়া।
ঈশ্বর হাসতে হাসতে বললেন—মানুষের বীজের নাম শুক্র। দানবের এজেন্টরা মানুষের শুক্র থেকে ঈশ্বরের উপাদান বের করে নিয়ে দানবের উপাদান ঢুকিয়ে দিচ্ছে। জেনে রাখো ব্রজগোপাল, কামজ সন্তান হল ঈশ্বরের জারজ সন্তান। পৃথিবীতে তোমাকে পাঠিয়েছিলুম ঈশ্বরের আদলে তৈরি করে। তুমি দানবের জীবনযাপন করে দানব হয়ে ফিয়ে এলে। আর রেখে এলে আধডজন দানব! তারা তোমার শ্রাদ্ধ করছে না। করছে আমার শ্রাদ্ধ! বলো—জয় হিন্দ, বলো লং লিভ ডেমোক্রাসি, বলো মানুষেরই জয়গান গাই। শোনো আমার প্ল্যান হল আমি একবার পৃথিবীটাকে একটু ঝাঁকাব। পশ্চিম ভারতের খানিকটা ধসিয়ে দিয়েছি। হিমালয়ের দিকে দানব রাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে। ভারতবর্ষের ল্যাজের দিকে আগুন ঢুকিয়ে দিয়েছি। মাঝখানে ড্যাঙ্গস যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এইবার একদিন দ্বারকার মতো তোমাদের ওই অপবিত্র ভারতবর্ষকে সমুদ্রে চুবিয়ে দোব। দেখি কোন শালা কী করতে পারে!
ওদিকে শ্রাদ্ধ বাসরে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ব্রজগোপালের ছবির উপর যে যত পেরেছে মালা চাপিয়েছে. একজন কুঁই কুঁই করে বললে—ছবিটাকে সোজা করে দিলে হত না!
ব্রজগোপালের অ্যাডভোকেট পুত্র বললে—পিতা খাড়া থাকলেও পিতা, উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলেও পিতা। পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন