সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি জানি, এই সময়টা আমার পক্ষে আর এক মুহূর্তও বাড়ি থাকা চলে না। যে অবস্থায় আছি সেই অবস্থাতেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে হবে। তা না হলে নীতা হাতের কাছে যা পাবে তাই ছুড়ে মারবে। ঘরের সমস্ত জিনিস তছনছ করে ভাঙবে। আলনা থেকে কাপড় জামা নিয়ে নিয়ে ছুড়ে ছুড়ে ফেলবে। তারপর আমাদের একমাত্র মেয়ে নীপাকে ধরে নির্দয়ভাবে মারবে। সবশেষে দেওয়ালে কিংবা মাটিতে মাথা ঠুকতে ঠুকতে অজ্ঞানের মতো হয়ে যাবে। পুরো ব্যাপারটা ঘটে যাবে খুব সহজে, পরপর, নাটকের সাজানো দৃশ্যের মতো। নীপা প্রথমে কাঁদবে মারের যন্ত্রণায়, তারপর কাঁদবে মা মরে গেছে ভেবে। মার পিঠের ওপর ভয়ে ভয়ে মুখ রেখে মা মা বলে ডাকবে, দুগাল বেয়ে জল গড়িয়ে নীতার পিঠ ভিজিয়ে দেবে। কিন্তু নীতা এতই নিষ্ঠুর যে কিছুতেই সে কোনও উত্তর দেবে না বরং নীপার এই ফুঁপিয়ে কান্নাটাকে উপভোগ করবে।
ওইরকম একটা দৃশ্যে আমি খুব বেমানান। আমার কিছুই করার থাকে না। নীতাকে শান্ত করতে গিয়ে আহত হয়েছি। কোনও কোনও দিন রাগ বেড়েছে। নীতার প্রচণ্ড জেদ, রাগ, অসভ্যতা যাই বলি না কেন, দেখে চরম একটা কিছু করার মুখ থেকে নিজেকে অতি কষ্টে ফিরিয়ে এনেছি। নীপাকে নিজের কোলের কাছে আনতে চেয়ে অবাক হয়েছি। দেখেছি নীপা যেন আমাকে কোনও অচেনা লোকের মতো দেখেছে। ভয়ে ভয়ে কাছে এসেই কান্নায় ভেঙে পড়েছে। বুঝেছি, একটা বয়স পর্যন্ত শিশুদের কাছে মায়েরাই বেশি নির্ভরশীল। সে মা যেমনই হোক।
আমি এখন সেই কারণেই ঝড়ের মেঘ দেখলেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। অন্তত এটুকু দেখেছি আমি নীতার চোখের সামনে থেকে সরে গেলে সে একটু শান্ত হয়েছে। কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে বসে থাকার পর যে কোনও একটা হালকা বই টেনে নিয়ে বিছানার উপর শুয়ে পড়েছে। তারপর হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। ওই সময়টা নীপা জানালার উপর বসে বসে আপন মনে খেলেছে। আমি অনেক পরে ফিরে এসে দেখেছি ঘরে চড়া পাওয়ারের আলো জ্বলছে, রেডিয়োর অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পর কেউই বন্ধ করে নি, চড় চড় করে আওয়াজ হচ্ছে। নীপা মেঝের ওপর তার জন্মদিনে কিনে দেওয়া বড় মেয়ে পুতুলটাকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। একটা আরশোলা তার ঠোঁটের পাশে শুঁড় নেড়ে নেড়ে কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া লালা চেটে চেটে খাচ্ছে। রান্না ঘরে বাসন, কাপ, গেলাস, চামচে, চায়ের কেটলি ছত্রাকার হয়ে পড়ে আছে। দুধের ডেকচির ঢাকনা ফাঁক করে একটা বেড়াল দুধ চেটে নিচ্ছে। খাবার ঘরের টেবিলের উপর একটা ইঁদুর কোথা থেকে একটা রুটির টুকরো খেতে খেতে আমার আসার শব্দ শুনে পালিয়েছে।
আগে প্রথম প্রথম বাড়ি থেকে বেরিয়ে, নিত্যানন্দের বাড়িতে গিয়েই বসে থাকতুম। নিত্যানন্দের কোয়ার্টার আমার বাড়ি থেকে মাত্র সিকি মাইলের পথ। যেখানে বিশাল জলের ট্যাংকটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তারই গায়ে। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা বাগান মতো আছে। নিত্যানন্দের বউ শিখার নিজের হাতে তৈরি কেয়ারি করা বাগান। ছোট হলেও সুন্দর। ছোট্ট ছিমছাম পরিবার। জানালায় সুন্দর পর্দা ঝুলছে। বসার ঘরে রেডিয়ো। শিখা ভীষণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে। এদেরও একটি মাত্র ছেলে, আমার মেয়ের বয়সি।
নিত্যানন্দের এই সাজানো শান্তির সংসারে দু-দণ্ড বসতে ভালোই লাগত। ভিতরের ঘরে শিখা ছেলেকে পড়াত। তারই ফাঁকে কফি করে দিত, কৌটো থেকে নিমকি বের করে ডিশে সাজিয়ে দিত। আমরা দুজনে বসে বসে শিকারের গল্প করতুম। কবে সেই রিজার্ভ ফরেস্টের কাছে একটা ম্যানইটার বেরিয়েছিল, সেই গল্প। গল্পটা হাজার বার শোনা, তবুও শুনতে ভালো লাগত। নিত্যানন্দ চুরুট ধরাত, আমি সিগারেট। শিখা একসময় নিত্যানন্দের পায়ের তলায় গরম জলের একটা বাথটব বসিয়ে দিয়ে যেত পা ডোবাবার জন্যে। নিত্যানন্দ ইদানীং আর্থারাইটিসে একটু কাবু হয়ে পড়েছিল। এই সময়টা সে একটু স্ত্রীর সঙ্গে রসিকতা করত।
দেখতে দেখতে রাত বাড়ত। শিখা ছেলেকে নিজ হাতে খাইয়ে কপালে একটু চুমু দিয়ে বিছানায় মশারি ফেলে শুইয়ে দিয়ে আমাদের কাছে এসে একটু বসত। একটা তোয়ালে দিয়ে ঘষে ঘষে নিত্যানন্দের পা মুছিয়ে পাউডার দিয়ে দিত। তারপর হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলত একদিন সস্ত্রীক মেয়েকে নিয়ে আসুন না। কিংবা চলুন না একদিন নদীর ধারে শাল বনে গিয়ে পিকনিক করি। আর তখনই আমার নীপার কথা মনে পড়ত। কী করছে এখন মেয়েটা, বাড়িতে একা একা। আমি সঙ্গে সঙ্গে যাওয়ার জন্যে উঠে পড়তাম। নিত্যানন্দর বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশন ঘুরে আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে বাড়ি ঢুকতাম আর সেই একই দৃশ্য চোখে পড়ত।
ইদানীং নিত্যানন্দর বাড়িতে আর যাই না। ওর ওই শান্তির সংসারের সঙ্গে নিজের সংসারের তুলনা করে বড় কষ্ট পেতে আরম্ভ করেছিলুম। তা ছাড়া যে সময় নিত্যানন্দ হয়তো একলা গৃহ সুখ পেতে চাইছে সেই সময় তৃতীয় কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি অসুবিধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুখ ফুটে বলতে পারে না চক্ষুলজ্জায়।
এখন আমি সোজা স্টেশনে চলে আসি। প্রথমে প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়াই। খালি বেঞ্চি পেলে মাঝে মাঝে বসি। আশেপাশে যাত্রীরা আপেক্ষা করে ট্রেনের জন্যে। সকলেই যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। মোটঘাট সামলাচ্ছে, সিগন্যালের দিকে তাকাচ্ছে। আবার যারা ট্রেন থেকে নামে তারাও দাঁড়ায় না। প্ল্যাটফর্মে কেউই থাকে না, থাকতে চায় না। ভিড় খালি হয়ে যাওয়ার পর দেখতাম, দুটো কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে আর একেবারে শেষ মাথায় একটা বুড়ি গাছের তলায় আস্তানা নিয়েছে। ভাঙা টিনের মগ, চটা ওঠা এনামেলের থালা পাশে ছড়ানো।
স্টেশনের ব্যস্ততা, ট্রেনের আসা যাওয়া কমে এলে আমি সোজা সিঁড়ি ভেঙে ওভারব্রিজে উঠে যেতাম। মনে হত আকাশের অনেক কাছে চলে এসেছি, হাত বাড়ালেই নাগাল পাব। চোখের সামনে পুরো রেল টাউনটা ভাসছে। ওইতো সেই বড় জলের ট্যাংকটা, ক'দিন হল অ্যালুমিনিয়াম রং করেছে! ছবির মতো সাজানো বাড়ি। সোজা সোজা পরিষ্কার পিচের রাস্তা চলে গেছে। এক একটা বাড়ির সামনে ছোট বাগান, কাঠের গেট। সমস্ত বাড়িতেই আলো জ্বলে উঠেছে। ওভারব্রিজে লোক চলাচল খুবই কম। পা ঝুলিয়ে বসতে বেশ ভালোই লাগে। নীচে সারি সারি রেল লাইন বহু দূরে চলে গেছে। আকাশের গায়ে ঝাপসা একসার পাহাড়ের রেখা আটকে আছে। ওই পাহাড়ের কোলে একটা নদী আছে। আমি যখন প্রথম এই রেল শহরে আসি, নীপা তখন খুব ছোট। নীতার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তখনও এতটা তিক্ত হয়ে ওঠেনি। আমরা সকলে মিলে এক শীতের সকালে ওই পাহাড়ের মাথায় সেবার এক সাধুর আস্তানা দেখে এসেছিলুম। একেবারে মৌনী। মাঝে মাঝে সিগারেট খান, দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। পাশে একটা স্লেট পেন্সিল ছিল। কোন দেশের মানুষ তিনি, বোঝা শক্ত ছিল। আমার মনে হয়েছিল তিনি দক্ষিণ ভারতের। কী খেয়াল হয়েছিল স্লেটে প্রশ্ন লিখেছিলাম—ঈশ্বর কী? তিনি উত্তর লিখেছিলেন—শান্তি। আমি লিখেছিলাম—কীসের অনুসন্ধান? উত্তর পেয়েছিলাম শান্তির অনুসন্ধান। অস্পষ্ট মনে পড়ে আরও যেন কী সব লেখা হয়েছিল। অতীত হল বিস্মৃতি। ভবিষ্যৎ অজ্ঞাত। বর্তমানটাই সব। মানুষ হল পরিস্থিতির দাস। ঈশ্বর হলেন পরিস্থিতির স্রষ্টা।
ওভারব্রিজে বসে বসে সবার আগে আমার সেই সাধুর কথা মনে পড়ত। চোখে ভাসত তাঁর সেই অনায়াসে বসে থাকার ভঙ্গি—হাতের ফাঁকে সিগারেট, চোখ দুটো কোনও সুদূরে আটকানো। সেই সময়ে তিনি এইরকম একটা কথা বলেছিলেন—সাধুরা কোনও ঘটনাকে আশ্রয় করে থাকে না। ঘটনার স্রোত অনেকটা দূর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যায়। ওভারব্রিজে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে থাকতে মনে হয় কথাটা খুব সত্যি। ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে এই যে জগৎ-সংসারের মাথার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছি কেমন শান্তি! মাথার উপর ঝুঁকে আছে আকাশ যেন তারার চাঁদোয়া। হালকা ঠান্ডা হাওয়া। অথচ ওই রেল শহরের কোনও এক খুপরিতে যে ঘটনা চলেছিল তার মধ্যে থাকলে এই অনায়াসে বসে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত।
বসে বসে অনেক কথা মনে পড়ে। মাঝে মাঝে নিত্যানন্দের ঘর, তার সংসার, মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায়। নিত্যানন্দের ফুলো ফুলো দৃপ্ত চেহারা। ছিমছাম সাজানো ঘর। হাসি খুশি বউ। ফুটফুটে ছেলে। সাধু বলেছিলেন—সুখের অনুভূতি বড় ভোঁতা। সুখের মধ্যে থাকতে থাকতে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে! নিত্যানন্দকে দেখে অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। দু:খের অনুভূতিকে তিনি বলেছিলেন ধারালো। সব সময় মানুষকে ধারালো ফলার উপর দাঁড় করিয়ে রাখে। মানুষ তখন ঘুমিয়ে পড়ে না।
হঠাৎ সিগন্যাল নামল। ট্রেন আসছে। একটু পরেই আমার পায়ের তলা দিয়ে এক্সপ্রেস ট্রেন তার বিরাট সরীসৃপ দেহকে গুটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাবে। অসংখ্য জীবন তার জঠরে। সকলেই একটা জায়গায় পৌঁছাতে চায়। এই জায়াটাই কি শান্তি? বহুদিন ধরে এই এক্সপ্রেস আমার পায়ের তলা দিয়ে একেঁবেঁকে চলে গেছে। ট্রেনটা চলে গেলেই আমার কীরকম মনে হয়, একদিন কেউ একজন এই স্টেশনে নামবে। নেমে আমার খোঁজ করবে। আমাকে নিয়ে স্টেশনে একটা বেঞ্চিতে বসে বলবে—এই তোমার জন্যেই খুঁজে খুঁজে এলাম। শোনো জীবনে যেসব ঢিল তুমি ছুঁড়ে দিয়েছ—সেইসব ঢিল ফিরিয়ে আনার কৌশল আমার জানা আছে। যেসব দুধ তুমি ছড়িয়ে ফেলেছ সেসব রাগ আবার আমি বোতলে ভরে দেব। তখন তোমাকে আর এভাবে ওভারব্রিজে বসে থাকতে হবে না। তুমি নিত্যানন্দের মতো নিজের বাড়িতে চেয়ারে বসে বসে গান শুনবে, বাড়িয়ে তোমার স্ত্রীর হাত থেকে চায়ের কাপ নিতে পারবে। তোমার সব স্বপ্নকে পাশাপাশি রেখে একটা অসাধারণ জাজিম বুনতে পারবে।
দুচোখ আশায় ভরে উঠল। তার মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে শুধু আকাশ দেখেছি, দেখেছি অজস্র তারার ছড়ানো চোখ। শেষ ট্রেন সেই কখন চলে গেছে। নিঝুম প্ল্যাটফর্ম। একটা একটা করে সিঁড়ি গুনে গুনে ওভারব্রিজ থেকে নেমেছি! আমার আগে আগে চলেছে একটি ছোট্ট মেয়ে।
তোর জন্যেই নামতে হল। আর একটু বড় হয়ে যা। তখন ওই যে ট্রেনটা যেখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, নদীর জলে ছায়া ফেলে চলে গেল, ওই পথে আমিও যাব। দেখবি সেখানে হয়তো আমি খুঁজে পেয়ে যাব একটি শান্তির জলাশয়, সেখানে সারারাত শান্ত জলে হাঁসের মতো ভাসব, দেখব সারারাত নিঝুম পৃথিবীতে কেমন করে ফোঁটা ফোঁটা শিশির পড়ে, কেমন করে একটি পদ্মের কুঁড়ি সারারাত ধরে একটি একটি করে পাপড়ি খুলে সূর্যের জন্যে চোখ মেলে। আমি তখন বলতে পারব কেমন করে এই পৃথিবীর আকাশের তলায় সারারাত ধরে ফুল ফোটার আয়োজন। সব শব্দ কেমন করে এক শব্দহীন সাগরে আস্তে আস্তে ডুবে যায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন