সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

জলটল খেয়ে বেশ গুছিয়ে বসেছি। আজকের কাগজটায় একবার চোখ বোলাব, তারপর দাঁত বের করা কাপে তিনের চার কাপ চা খেয়ে মুখটাকে টক করে দোকান খুলব। অফিসকে আমরা এক এক সময় এক এক আদুরে নামে ডাকি। কখনও দোকান বলি, কখনও মামার বাড়ি বলি, কখনও ক্লাব বলি। সরকারি অফিসে মার্চেন্ট অফিসের মতো বাঁধাবাঁধি অত থাকে না। একটু ঢিলেঢালা ভাব। কেউ কারুর দাস নই। আমরা সবাই দেশসেবক। দেশ জননীর সেবা করতে এসেছি। মাসের শেষে সামান্য দক্ষিণায় কায়ক্লেশে সংসার চলে। কাজের জবাবদিহি বড় কর্তার কাছে নয়, দেশের মানুষের কাছে। যাঁরা আমাদের নিন্দে করেন, অপদার্থ, ঘুসখোর বলেন, তাঁদের আমরা তেমন পাত্তাটাত্তা দিই না। জনসেবায় অমন দুচার কথা সহ্য করতেই হয়। চামড়া একটু পুরু না করলে দেশসেবা করা যায় না। মনের আস্তরণে একটু গন্ডার ভাব আনতে হয়। রাইনোসেরাস না হলে পাবলিক সারভেন্ট হওয়া যায় না। যে যাই বলুক, গুনগুন করে গেয়ে যাও কিশোরকুমারের সেই বিখ্যাত গান—
কুছ তো লোগ কহেঙ্গে
লোগোঁ কা কাম হ্যায় কহনা
ছোড়ো বেকার কি বাতোঁমে।
যে দাদাকে ধরে চাকরিটা পেয়েছিলুম, তিনি প্রায়ই বলতেন, দেশসেবা বড় 'থ্যাংকলেস জব' হে। আমরা সবাই যিশুখ্রিস্ট! কাঁটার মুকুট মাথায় চাপিয়ে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ত্যাগ, ত্যাগ। আমাকে অবশ্য মই ঘাড়ে করে পোস্টার ফোস্টার মারতে হয়নি। আমার কাজ ছিল লেখা। উনুনের যেমন কয়লা চাই, নেতাদের তেমনি অক্ষর চাই। রাশি রাশি অক্ষর। একের পেছনে আরেক, মাইলের পর মাইল। নেচে নেচে বেরোবে। গরম গরম, নরম নরম আবেগে তুলতুলে, রাগে গমগমে, বিদ্রুপে কষকষে। পলিটিক্যাল বক্তৃতা আর বিয়ে বাড়ির ছ্যাঁচড়া এক জিনিস। নৃতত্ব, ভূতত্ব, সমাজতত্ব, অ্যানাটমি, ভ্যাসেকটমি, সব এক কড়ায় ফেলে, লংকা ফোড়ন দিয়ে রগরগে করে পাতে ফেলে দাও। গভীর জ্ঞানের কোনও প্রয়োজন নেই। এ লাইনে জ্ঞান হল ডিসকোয়ালিফিকেশন। পিঠে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য সার্জেনকে ডাকার প্রয়োজন হয় না। বাঁদরেও দিতে পারে। পারে না, ভালোই দেয়। ভাসা ভাসা জ্ঞানের ফুলঝাড়ু দিয়ে ঝেঁটিয়ে দাও। নরুণ দিয়ে ছানি অপারেশন।
ওই কর্মটি আমি ভালোই পারি। 'বন্ধুগণ' বলে একবার শুরু করলে আণবিক বোমা পর্যন্ত আমার পথ পরিষ্কার। কীর্তনীয়ার সখী গো-র মতো। এক টানেই ভক্তদের হৃদয় ফর্দাফাই। তা দাদা খুশি হয়ে, প্রচার দপ্তরে এই চেয়ারটি আমার পাকা করে দিলেন। ঢুকেছিলুম তলায়, মুখের জোরে ধীরে ধীরে ঠেলে উঠছি ওপর দিকে। আমার দাদা কবে ডিগবাজি খেয়ে সরে পড়েছেন। এই খেলায় যা হয় আর কী। সাপলুডোর মতো। এক চালে জনপ্রিয়তার সাপের মুখ গলে একেবারে ন্যাজে। আবার কোন চালে মই পাবেন কে জানে। যিশু এখন শিশুর মতো হামা টানছেন। সাবালক হতে সময় লাগবে। দলফল ভেঙে চুরমার। বাজারে অনেক আঠা বেরিয়েছে। মানুষের মাথা, ভাঙা দল কিংবা টুকরো দিল জোড়ার আঠা এখনও বেরোয়নি।
এই অফিসে ঢুকে একটা গূঢ় তথ্য আমি জেনে ফেলেছি যা বাইরে জনসাধারণের সঙ্গে মিশে থাকলে জানা যেত না। এদেশ থেকে সায়েব এখনও যায়নি। সাদা চামড়া চলে গেছে, সায়েব কিন্তু পড়ে আছে। লাহিড়ী সায়েব, দাস সায়েব, বোস সায়েব, মিত্তির সায়েব। সায়েবদের কী সব চেহারা! গেজেটেড হলেই সায়েব। আগে পাড়ার গিন্নিবান্নি মহিলাকে গেজেট বলা হত। তাঁর কাজ ছিল বাড়ি বাড়ি হাঁড়ির খবর জোগাড় করে দুপুরে মহিলামহলে পেশ করা। এ গেজেট অবশ্য সে গেজেট নয়। বিশাল একটা মোটা বই। সেই কেতাবে যাঁর নাম তিনিই সায়েব। সেখানেও স্তর আছে। ক্লাস ওয়ান, ক্লাস টু। অনেকটা সেই ট্যাঁস ট্যাঁস ফিরিঙ্গির মতো। মাইনে কারুরই খুব বেশি নয়। তবে দাপট আছে। দেশের সব কিছুই তো এঁদের হাতে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমিসংস্কার, কৃষি, শিল্প। ফাইল নাড়ানো প্রভুর দল। মাথা নাড়া বুড়োর মতো অথবা বুড়ো শিবের মতো। নাককাটা সেপাই নয়। গেজেটেড সেপাই। নিজেদের নাম কেটে অপরের যাত্রাভঙ্গ করার ক্ষমতা রাখেন। ঢলঢলে প্যান্ট। মাঝে মাঝেই টেনে তুলতে হয় কোমরের দিকে। হাওয়াই শার্ট। বাড়িতে কাচা। কলারে ইস্ত্রি নেই। কুঁচকে মুচকে ব্যক্তিত্বশূন্য, লতপতে একটা ব্যাপার। অনেক আবার নস্যি নেন। স্নাফ ইওর নোজ অ্যান্ড স্নিফ এ ডিসিশন। গেজেটেড হলে টেবিলে একটা মাঝারি মাপের কাচ পাওয়ার অধিকার জন্মায়। চায়ের চরণ-চিহ্নিত টেবিলে কাচ, কাচের তলায় শ্রীরামকৃষ্ণ, মা কালী, স্বামী বিবেকানন্দ কদাচিৎ। স্টোর থেকে একটি তোয়ালে পাওনা হয় সাহেবদের। কোট ঝোলাবার হুক দম্পতি সমেত একটি আয়না, একটি বৈদ্যুতিক ঘণ্টা, টেলিফোনের একটি একসটেনশন লাইন, বিমর্ষ চেহারার একটি দেওয়াল ক্যালেন্ডার, সামনে একটি ডেস্ক ক্যালেন্ডার, কলঙ্কিত অ্যাসট্রে, গোটাকতক মুশকো চেহারার পেপারওয়েট, কলমদান প্রভৃতি নিয়ে সায়েব বসেন ক্ষমতার ঠাটে। দুপাশে জমতে থাকে পাহাড়ের মতো ফাইলের স্তূপ। হরেক রকমের বায়না। জনসাধারণের জীবন যন্ত্রণা অষ্টপ্রহর কেঁদে চলেছে, সায়েব আমাকে দ্যাখো। জল নেই, কল নেই, জমি নেই, লোহা নেই, সিমেন্ট নেই, পথ নেই, আলো নেই। ফাইল নীচে থেকে ওপরে ওঠে। সায়েবের কাজ 'অ্যাজ প্রাোপোজড' বলে সই মারা। নীচে যিনি আছেন, তিনি লেখেন 'পুট আপ ফর পেরুজাল অ্যান্ড নেসাসারি অ্যাকসান।' তারপর 'অ্যাজ প্রাোপোজড' হতে হতে 'ওঁ গঙ্গায় নম', গ্যাঞ্জেস ডিসপোজাল। মানকুণ্ডুর মানসবাবু, বর্ধমানের বরোদাবাবু, ক্যানিংয়ের কালোবাবু জেলা অফিসে যাচ্ছেন আর আসছেন, রোজই শুনছেন ফাইল ওপরে গেছে। 'অ্যাজ প্রাোপোজড'। কেউ উলটে দেখেনি প্রাোপোজালটা কী। পেঁয়াজের খোসার মতো প্রাোপোজালের খোসা ছাড়ালে কিছুই আর মেলে না। ব্রহ্মের স্বরূপের মতো। ওদিকে যাঁর আর্জি তিনি ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন। উত্তর পুরুষ শ্রাদ্ধের মন্ত্র পড়তে থাকেন। আব্রহ্ম স্তম্ভ পর্যন্ত, অর্থাৎ স্তম্ভে স্তম্ভে মাথা ঠুকে তিনি এখন ব্রহ্মে। বিবেকবান দেশসেবক দেশবাসীদের যেমন উপদেশ দেন, দেখবেন মানুষ যেন কাজ পায়, 'ফ্রম পিলার টু পোস্ট, পোস্ট টু পিলার', এই বদনাম ঘোচাতে হবে, সব রেডটেপ খুলে নিজেদের প্যান্টের তলায় ঘুনসি করে নিন। গুনগুনিয়ে আবার সেই গান : কুছ তো লোগ কহেঙ্গে। লোগোঁ কা কাম হ্যায় কহনা। সায়েব নস্যি নিতে নিতে জেলার নেতাকে বললেন, সব কিছুর একটা প্রাোসিডিওর আছে। কালভার্ট কালভার্ট করছেন, স্যাংসন কোথায়? কোন স্কিমে হবে? এখন যেমন সাঁতরে খাল পেরোচ্ছেন পেরিয়ে যান। ফিনান্সে প্রেপোজাল গেছে। ফিনান্স থেকে সি এম, সি এম থেকে ক্যাবিনেট, ক্যাবিনেট থেকে সি এম থেকে ফিনান্স, ফিনান্স থেকে পি ডব্লু ডি থেকে লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট; সেখান থেকে অঞ্চল, অঞ্চল থেকে পঞ্চায়েত। ইজ ইট সো সিম্পল? নিন এক টিপ নস্যি নিন। তবে হ্যাঁ মিনিস্ট্রি যদি উলটে যায়; কান্ট হেলপ, তখন প্রেসিডেন্টেস রুল, মানে গভর্নর, হয়তো বলবেন, একটু অপেক্ষা করুন নির্বাচন তো হবেই, নতুন ক্যাবিনেট ডিসিশন নেবে। ক্যাবিনেট, কফিন, কেবিন সব যেন সমার্থক শব্দ। কখন কী ভূত বের করে কে জানে।
অফিসে আমার নিজের পয়সায় কেনা একটা কেটলি আছে। সেটার চেহারা তেমন ভালো না হলেও কাজ চলে যায়। গোটাকতক ভাঙা কাপ আছে। আর আছে আমার পিওন, ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো অমূল্য। অমূল্যর প্রথম বউ তিনটি সন্তান উপহার দিয়ে ক্ষয়কাশে ভুগে ভুগে সরে পড়েছে। অমূল্য দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। সাহস আছে। যা মাইনে পায় তাতে নিজেরই চলে না। দ্বিতীয় পক্ষ চটজলদি দুটি প্রাণ নামিয়ে দিয়েছে। অমূল্য এখন পাঁচে পঞ্চবাণ। এ অফিসের নিয়ম হল কেউ কারুর কথা শুনবে না। যার যা কাজ, তিনি যদি সেই কাজ ভুলেও করে ফেলেন, তার চেয়ে অপরাধ আর কিছু নেই। কর্মচারীদের দুটো ইউনিয়ন। দুরকম রাজনৈতিক রং। মঞ্চে ফোকাস মারছে। অভিনেতারা হাত-পা ছুঁড়ছে। গদিতে যখন যে দল তখন সেই ইউনিয়নের প্রবল পরাক্রান্ত। অমূল্যর বয়েস হয়েছে, পাঁচ পাঁচটা ছেলে মেয়ে, তাই একটু মান্য করে চলে। কথাবার্তা শোনে। বারে বারে চা আনে, ব্যাংক থেকে টাকা তুলে এনে দেয়, পোস্টাপিসে লাইন দিয়ে খাম পোস্টকার্ড এনে দেয়। টিফিন এনে দেয়, ভাগ পায়।
অমূল্য আজ গেঞ্জি পরে এসেছে। নীল জামাটা কাল বড় ছেলে বেচে দিয়ে চায়নাটাউনে শামমিকাপুরের নাচ দেখেছে। বার বার দেখো, হাজার বার দেখো। কাল রবিবার ছিল। এর আগে ছেঁড়া ছেঁড়া একটা গরম কোট ছিল অমূল্যর, সেটা ঝেড়ে জুয়া খেলেছিল। ছাতা, জুতো, বাসন কোসন সবই এইভাবে গেছে। অমূল্যর ভয় কোনও দিন ঘুমের সময় পরনের কাপড়টা খুলে নিয়ে বেচে না দেয়!
অমূল্য ফুটপাতের দোকান থেকে চা এনেছে। সহকর্মী বিমলও এসেছে। সাধারণত বারোটায় আসে, আজ বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে বলে সকাল সকাল চলে এসেছে। বিমল আবার শিল্পী। গান লেখে, গান গায়। নতুন একটা গান লিখেছে। টেবিলে তাল দিতে দিতে গানে সুর চড়াচ্ছিল, এক তারা, দু তারা, তারা তিন চার। তা ধিন ধিন তা, তারা তিন চার, তোমার কথাই কেন, ভাবি বার বার।
গান শুনতে শুনতে সবে সিকি কাপ চা খাওয়া হয়েছে, এমন সময় ব্যানার্জিসায়েব ধড়ফড় করে ঘরে ঢুকলেন। ইনি হলেন এক নম্বর সাহেব। লম্বা চওড়া, হৃষ্টপুষ্ট। কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনাম আছে। জীবনে কারুর ভালো করেননি। সুযোগ পেলেই সহকর্মীদের বাঁশ দেন। প্রমোশন আটকে দেন। এমন সব ব্যবস্থা নেন যাতে ঘন ঘন মোশান আছে। এর তূণে মারাত্মক দুটি অস্ত্র আছে, মাসপেনসান অ্যান্ড ট্রানসফার। তৈল মর্দনে ভারী ওস্তাদ। আমরা নাম রেখেছি তেলসাহেব।
সাহেব এলেই তড়াক করে উঠে দাঁড়াতে হয়। সার্ভিস কনডাকট রুলে কী আছে জানি না, তবে এটাই নিয়ম। বড় এলেই ছোট উঠে দাঁড়াবে। পুলিশদের সার্ভিস কনডাকট রুল পড়ে আমার চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল।
গম্ভীর গলায় বললেন, বসুন বসুন।
বিমলের উঠে দাঁড়াতে একটু দেরি হচ্ছিল। টেবিলে হাঁটু তুলে গাড়ু হয়ে বসেছিল। পেছন দিকে শরীর ঠেলে, হাঁটু নামিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। কে জানত ব্যানার্জিসায়েব এসে পড়বেন! চেয়ার আর টেবিলের মাঝখানে পা আটকে বিপর্যয় কাণ্ড। ব্যাগ থেকে আনারস বের করার মতো অবস্থা। যাক ওঠার আগেই বসার হুকুম পেয়ে বেচারা বেঁচে গেল। ব্যানার্জিসাহেব তির্যকে বিমলকে একবার দেখে নিলেন। হয়ে গেল তোমার। ট্রানসফার টু কুচবিহার।
ব্যানার্জিসাহেব। কোনওরকমে সামনের চেয়ারে পেছন ঠেকালেন। চাকরির খাতিরে মানুষকে কত যে নীচে নামতে হয়। কুলীনকুল সর্বস্ব ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণ মানে বড় পদ, তাঁকে বসতে হল আমার মতো এক হরিজনের সামনে। ছোট পদ মানেই হরিজন।
ব্যানার্জিসাহেব মুখ বেজায় গম্ভীর। হাসেন, তবে আমাদের সামনে নয়। হাসলে পার্সোন্যালিটি লিক করবে। ভোরে টিনের চালে বসে কাক যে সুরে ডাকে সেই সুরে ব্যানার্জিসাহেব বললেন, দুর্গাপুজো সম্পর্কে কোন আইডিয়া আছে!
দুর্গাপুজো? কী রকম আইডিয়া স্যার? মানে সার্বজনীন পুজো! প্রত্যেক বছর চাঁদা কী স্যার! দিতে দিতে ফতুর হয়ে যাই।
ওইতেই হবে, ওইতেই হবে। একটা বক্তৃতা লিখতে হবে। দুর্গাপুজোর সঙ্গে একটু স্মল স্কেল ইনডাস্ট্রি পাঞ্চ করে দেবেন। বেশি বড় করার দরকার নেই। পাঁচ দশ মিনিটের মতো হলেই হবে, বেশ জমিয়ে লিখবেন। মনে রাখবেন মন্ত্রীর বক্তৃতা। যদি একচান্সে মনে ধরাতে পারেন, সঙ্গে সঙ্গে ওপর দিকে উঠে যাবেন। চরচর প্রমোশন। আর যদি জিনিসটা না জমে, ট্রানসফোর্ড টু কুচবিহার।
বলছেন?
ইয়েস। দেবতা প্রসন্ন হলে মানুষের কী না হয়।
মিত্তিরসাহেব আর বাগড়া দিতে পারবেন না!
কারুর বাপের ক্ষমতা নেই বাগড়া দেয়। মন্ত্রী সো ডিজায়ার্স। কখন দিচ্ছেন লেখাটা?
কালকে।
আরে না, না, কাল উইল বি টু লেট। বেলা তিনটে নাগাত আসব। অ্যাসেমব্লিতে টুক করে মন্ত্রীকে ধরিয়ে দিয়ে যাব। ব্যানার্জিসাহেব চলে গেলেন। বিমল বললে, দুর্গাপুজোয় ইনডাস্ট্রি ঢোকাবি কী করে?
দ্যাখ না, ঠিক ঢুকিয়ে দেব। মহাভারতে অত মাল ঢুকতে পারে, পুজোয় স্মল স্কেল ঢুকতে পারে না!
বন্ধুগণ।
ওই দেখুন দুর্গা দশভুজা। সিংহবাহিনী, অসুরদলনী।
আমরা, এই আমরা, যারা আজ ক্ষমতার আসনে বসে ছিল, তারাও দশভুজা অসুর দলনকারী।
দেশে আইন শৃঙ্খলাহীন যে জঙ্গলের রাজত্ব চলছিল আমরা সেই আসুরিক শক্তিকে শক্ত হাতে দাবিয়ে রেখে ধীরে ধীরে জনজীবনে শান্তির শিবলিঙ্গকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। মধুবাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধব:, ওঁ মধু, ওঁ মধু, ওঁ মধু।
বিমলকে গৌরচন্দ্রিকাটা পড়ে শোনালুম। চারটে লাইন একেবারে ফর্মুলায় ফেলা। সমস্ত পুজোর আগে যেমন গণেশ পুজো, একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদর গজাননং, সেইরকম যারা ছিল তারা বদ, আমরা যারা এসেছি, তারা গনেশের মতোই, বিঘ্ননাশকরং দেবং হেরম্বং, নিজেরাই নিজেদের প্রণাম করি। জনগণেশের সেবক আমরা। একেবারে কড়া নির্দেশ, মন্ত্রীর ভাষণের শুরুতেই পূর্বতন সরকারকে দু ছত্র চপেটাঘাত অবশ্যই করতে হবে। মা দুর্গার দশহাতের সঙ্গে মালটা কায়দা করে লাগিয়ে দিয়েছি। এইবার বাকিটা দুর্গা বলে নামিয়ে দিতে পারলেই ল্যাঠা শেষ।
বন্ধুগণ, আমাদের এই তেত্রিশ কোটি দেবদেবী সমাদরে পুজো পান না। খুবই দু:খের কথা। আমরা যদি গদিতে পাকাপোক্তভাবে বসতে পারি, তাহলে ধীরে ধীরে সুপরিকল্পিতভাবে জনজীবনকে উৎসবে উৎসবে ভরিয়ে তুলব। এক যায় তো আর এক আসে। প্যান্ডেল আর খুলতেই হবে না। আলোর ঝালর বারোমাস ঝুলতেই থাকবে। মাইক গানে গানে আকাশ বাতাস অষ্টপ্রহর উদ্বেল করে রাখবে। যেও না নবমী নিশি লয়ে তারাদলে, কবির এই আক্ষেপ আর থাকবে না। আমাদের আগে যাঁরা ছিলেন তাঁরা সব নিশিকেই অমাবস্যা নিশি করে তুলেছিলেন, আমরা আজ কৃতসঙ্কল্প, বন্ধুগণ, সুযোগ দিন, আপনাদের জীবনে নবমীর রাতকে আমরা চিরস্থায়ী করে ছেড়ে দোব। আপনারা আমাদের পাকা করুন, আমরাও আপনাদের পাখার বাতাস করব।
পুজো যত বাড়বে দেশের মানুষের অবস্থাও তত ভালো হবে। ঈশ্বরের আশীর্বাদ নেমে আসবে অকৃপণ ধারায়। বসুন্ধরা সুজলা সুফলা হবে। খরা থাকবে না, বন্যা আসবে না। শরতের শস্যক্ষেত্রে বাতাস নেচে যাবে বাতুলের আনন্দে। পুজো মানেই শিল্প। পুজো অর্থনীতিকে ঠেলা মারে, চাঙ্গা করে তোলে। কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি তাল তাল এঁটেল মাটি ডাঁই করে। চ্যাঁচারি, দরমা, খড়, পাট, দড়ি, শোলা, জরি, সলমা, চুমকি, সাটিন কাঁচামাল আসতেই থাকে, আসতেই থাকে। সপরিবারে শিল্পী আটচালায় বসে পড়েন প্রতিমা গড়ার কাজে। বাবুরা আসতে থাকেন বায়নার টাকা নিয়ে। দুর্গাপুজো সবচেয়ে বড় পুজো। একঢিলে ছ'পাখি। মা দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, অসুর। জীবজন্তুর মধ্যে সিংহ, প্যাঁচা, হাঁস, ময়ূর, ইঁদুর। মা দুর্গাকে সপরিবারে সাপ্লাই দিতে হয়। সবই ম্যাগনাম সাইজের। প্রচুর বাঁখারি, বিচুলি, পাট, মাটি, তুঁষ, কাপড়, রং লাগে। আমি তাঁদের ধন্যবাদ জানাই যাঁরা মায়ের একান্নবর্তী পরিবারকে ভেঙে টুকরো টুকরো করেছেন। পরোক্ষে তাঁরা বাংলার দরিদ্র শিল্পী পরিবারকে প্রভূত সাহায্য করেছেন। একেই বলে কারুর সর্বনাশ কারুর পৌষ মাস।
বন্ধুগণ, আপনাদের গলায় গামছা দিয়ে যাঁরা চাঁদা নিয়ে যান, তাঁদের ওপর অসন্তুষ্ট হবেন না। ভক্তের ভক্তির পুজো নাই বা হল। সবাই কী আর রামপ্রসাদ, রামকৃষ্ণ। পাড়ায় হুল্লোড়ের পুজোই হোক। এক কমিটি ভেঙে শত কমিটি হোক। শিল্প বাঁচুক, শিল্পী বাঁচুক। আমরা যদি সুপরিকল্পিতভাবে আরও কিছু দেবীকে জাতে তুলতে পারি, তা হলে কুমোরপাড়া সারা বছরই রমরমে হয়ে থাকবে, কাপড় জামার দোকানে সারা বছরই পুজো লেগে থাকবে। প্যান্ডেলওয়ালাদের প্যান্ডেল আর খুলতে হবে না। এক যাবেন, আর এক আসবেন। তাসাপার্টি ন্যাশনাল অর্কেস্ট্রার চেহারা নেবে।
বন্ধুগণ, এই সব মূঢ়, ম্লান, মূক মুখে হাসি ফুটবে। মা হাসবেন, ছেলে হাসবে। বছরে একবার চাঁদা দিতে গায়ে লাগে। দিতে দিতে অভ্যাস হয়ে গেলে, ইনকামট্যাক্স, সেলট্যাক্সের মতো সহজ হয়ে যাবে। মনে তখন আর কোনও বাধা থাকবে না। তৈয়ার বলে, গেরস্থ হাসি হাসি মুখে, আপ্যায়নের ভঙ্গিতে চাঁদা তুলে দেবে।
বন্ধুগণ, এ চাঁদা নয়, পরভৃতিকা। চাঁদা নয়, বলুন পারকোলেশন অফ ওয়েলথ। চাঁদা নয়, বলুন সাম্য। আমাদের সংবিধান যে সাম্য, মৈত্রী আর একতার কথা বলেছেন, তা রাজনীতি দিতে পারবে না। রাজনীতি কোনও নীতিই নয়, একধরনের ছ্যাঁচড়ামি। বারোয়ারিই হল সমস্যা সমাধানের পথ। চাঁদায় প্রতিপালিত হবে শিল্পী, চাঁদায় প্রতিপালিত হবে বেকার। আমরা আর কতজনকে চাকরি দিতে পারব! বেকারদের ফেলে দিন মায়ের চরণে, বাবার চরণে! বাছারা বেঁচেবত্তে থাক। তাদের বাঁচা দরকার। তা না হলে নির্বাচনে লড়বে কারা, দেওয়ালে দামড়া অক্ষরে জাতিকে জাগরণের বাণী শোনাবে কারা! জয় হিন্দ।
না, জয় হিন্দ এখানে চলবে না। রেডিয়ো কি টিভির ভাষণে চলে। পাড়ার পুজোর প্যান্ডেলে বেমানান। কেটে উড়িয়ে দিলুম।
বিমল শুনে বললে, একটু যেন ফাজলামো হয়ে গেল রে। মিনিস্টার না রেগে যান। রেগে গেলে তোর চাকরিটা যাবে মাইরি!
একটু প্যাঁচ কষে দিলুম। কেন বল তো?
নিজের ওপর নিজে প্যাঁচ কষলি। কালিদাসের টেকনিক। যে ডালে বসে আছিস সেই ডালটা কেটে ফেলার প্যাঁচ?
আজ্ঞে না স্যার। ব্যানার্জিসায়েবের বাঁশ তৈরি হল। হাতে করে নিয়ে যাবেন, পেছনে করে ফিরে আসবেন। ওই মাল আমাকে গত বছর বাঁশ দিয়েছিল, মনে আছে?
তোর সেই প্রাোমোশন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ইন্টারভিউতে যত জামাই ঠকানো প্রশ্ন করে আমাকে আউট করে দিয়ে নিজের শালাকে ঠেলে তুলে দিলে। সে মালকে তো চিনিস। একেবারে নীলকণ্ঠ। পাপ করে করে পাকতেড়ে মরে গেছে।
বিমল ফিস ফিস করে মুখে শব্দ করল। ব্যানার্জিসায়েবে আসছেন।
কী, হয়ে গেছে?
এমনভাবে বললেন, যেন আমি মালের বাপের চাকর। মাল শব্দটা আমি বিমলের কাছে শিখেছি।
হ্যাঁ স্যার।
দিন দিন। বড় হয়ে গেল না কি? ক' মিনিট?
চার-পাঁচ মিনিট হবে।
দেন ইট ইজ অলরাইট। প্রাইভেট সেক্রেটারি এর মধ্যে বারতিনেক ফোন করেছেন। এত জিনিস আবিষ্কার হয়েছে, বক্তৃতা লেখার একটা যন্ত্র বেরোলে বেশ হত। কল টিপে জল বের করার মতো। দরকার মতো এক মিটার, দু-মিটার বক্তৃতা বের করে নেওয়া যেত।
বিমল বললে, কাজটা কী ভালো হল? কে লিখেছে বলে, সেই দুর্বাসা যখন চিৎকার করবে, তখন তো মাল তোমাকে নিয়ে টানাটানি হবে।
তুইও যেমন, মালকে চেনো না, হেসে হেসে বলবে, এই যে স্যার লিখে নিয়ে এসেছি। ভেরি ডিফিকাল্ট সাবজেক্ট। পুজোর সঙ্গে ইনডাস্ট্রি। আপনার মাথাতেও আসে স্যার।
বিমল মন্ত্রীর গলা নকল করে বললে, এইরকম মাথা বলেই আপনাদের মতো গাধাদের সামলাতে পারছি।
আমি ব্যানার্জি সাহেবের গলায় বললুম, হেঁ হেঁ তা যা বলেছেন স্যার। আমাদের গাধা বললে, গাধারাও স্যার প্রতিবাদ করবে।
বিমল বললে, থাক, নিজেদের চিনতে পেরেছেন দেশের মানুষের সৌভাগ্য। এক তারা দু তারা, তারা তিন চার।
বিমল আবার গান ধরল, টেবিলকে তবলা করে। তিন তালে বেশ কিছুক্ষণ কালোয়াতি চলল। অফিস না পাড়ার ক্লাব, এ প্রশ্নের কোনও অর্থ হয় না।
দেখতে দেখতে বেলা বাড়তে লাগল। দু-চারজন পাবলিক খবরাখবর সংগ্রহে এলেন। শিল্পের খবর। কী করলে, কী হয়! দেশে চাকরি নেই। ব্যবসা বাণিজ্যের দিকেই তো ঝুঁকতে হবে।
একজনকে বলা হল, ইট তৈরি করুন। গঙ্গায় ভীষণ পলি পড়েছে। কাটুন আর ছাঁচে ফেলে ইট বানান। সভ্যতার ফাউন্ডেশনই হল ইট। নাক সেঁটকাবেন না। ইট শুনতে খারাপ লাগলে বলুন বিলডিং ব্লকস। মানুষের যেমন আদি মানব আছে, শিল্পেরও তেমনি আদি শিল্প আছে। ইট সেইরকম একটি জিনিস। ইটের মার নেই। পচবে না, গলবে না। থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান ব্যবহার। বাড়ি তৈরিতে লাগবে প্লাস মানুষ যত রাজনীতি সচেতন হবে ইটের ব্যবহারও তত বাড়বে। ইটের নাম তখন ব্রিকব্যাটস। ভেঙে টুকরো করে সাপ্লাই দিন। অপোনেন্টকে ঘায়েল করার এর চেয়ে ভালো দিশি গোলা আর কী আছে!
আর একজনকে বলা হয় পাঁপড় তৈরি করুন। বাংলার ঘরে ঘরে পাঁপড়শিল্প চালু হোক। এটা আমাদের সাম্প্রতিক মস্তিষ্কতরঙ্গ। কর্তৃপক্ষ ভেবেচিন্তে বের করেছেন। ঘরে ঘরে মেয়েরা বেকার। চুল বাঁধছেন আর চুলোচুলি করছেন। মেয়েদের একবার পাঁপড়শিল্পে জুড়ে দিতে পারলে, পাড়া জুড়াবে, বর্গী আসবে। বর্গী নয় নির্জন দুপুরে ঘুঘুর ডাক কানে আসতে থাকবে। পাঁপড়ের ওপর প্রায় চল্লিশ পাতার একটা রিপোর্ট, সাইক্লোস্টাইল করে, হলদে মলাট দিয়ে বেঁধে মন্ত্রীর টেবিলে দেওয়া হয়েছে। উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
TOTAL EMPLOYMENT AND PAPAD
সাতটা অধ্যায়। অতীত বাংলা, বর্তমান বাংলা, ইতিহাসে পাঁপড়, ডালের উৎপাদন, গুদাম ও পোকা খাওয়া ডাল, জল ও লোহাজল, বাঙালির আহারবৈচিত্র্য, পাঁপড় ও পার্ক, পেট ও পাঁপড়, অ্যালকোহল ও পাঁপড়, অবাঙালি সম্প্রদায় ও পাঁপড়, তেলেভাজা পাঁপড় ও সেঁকা পাঁপড়, বিবাহ ও লোকাচারে পাঁপড়, হজম বদহজম ও পাঁপড়, বর্ষা ও পাঁপড়। সাতটি অধ্যায় জুড়ে পাঁপড়ের শ্রাদ্ধ, শান্তি তিলকাঞ্চন।
ভদ্রলোক বললেন, কী যে রসিকতা করেন মাইরি। পাঁপড় আবার একটা শিল্প!
আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই, কুটির শিল্প।
বিমল বললে, পেঁয়াজিটাও একটা শিল্প।
ভদ্রলোক চেয়ার ঠেলে উঠতে উঠতে বললেন, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। যা আপনারা দিনরাত বছরের পর বছর করছেন।
* * * * * *
সেদিন, বেলা তিনটে হবে, পুজোর দীর্ঘ ছুটির পর অফিস সব খুলেছে, বসে বসে একটু স্টিম নিচ্ছি, কাজে মন বসাতে আরও দিন পনেরো সময় লাগবে, ততদিনে কালীপুজো এসে যাবে। কালীপুজো, ভাই ফোঁটা মিলিয়ে আবার দুদিন ছুটি। পুজোর ছুটিতে মধুপুর মেরে এসেছি। কালীপুজোয় দীঘা যাব, ক্যালেন্ডার দেখছি। একদিন ক্যাজুয়েল নিলে পরপর তিনদিন হয়ে যাবে।
সবে মধুপুর থেকে এসেছি। ছুটির ঘোর এখনও কাটেনি। বেলা পড়ে এলেই মনে হয় মধুপুরে পাথরোল নদীর ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আকাশ লাল করে পশ্চিমে সূর্য ডুবছে। বেশ ভাবে ছিলুম। হঠাৎ মুখার্জিসায়েব এসে ভাব চটকে দিলেন।
দু-আঙুলে নস্যির টিপ। সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, কেমন আছেন?
ভালো আছি স্যার। আপনি!
চলছে। চলে যাচ্ছে ঈশ্বরের কৃপায়।
বেশ নাদুসনুদুস বিশ্বাসী মানুষ। এক সময় অধ্যাপনা করতেন। এই চাকরিতে মাঝামাঝি জায়গায় ঢুকেছিলেন। চর চর করে ঠেলে ওপর দিকে উঠে গেছেন। এঁর জীবনে দুটি হবি। এক নম্বর, উঁচু পোস্ট খালি দেখলেই ইন্টারভিউ দেওয়া। সে যেখানেই হোক। দু'নম্বর, একটু লেখা।
প্রথমটা আমাদের কাছে তেমন ভীতিপ্রদ নয়। লেখাপড়া করে উনি ইন্টারভিউ দেবেন, সে তো নিজের পাঁঠা। তার জন্যে দু-একটা বইপত্তর জোগাড় করে দেওয়ার অনুরোধ, এমন কিছু বড় বায়না নয়। রাখলে রাখা যায়, না পারলে বলে দেওয়া যায়।
দু-নম্বর হবিটাই আমাদের পক্ষে বেশ ভীতিপ্রদ, অন্তত আমার পক্ষে। এই সায়েবটি খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। তখন আকাশ অন্ধকার। দরজার পেরেকে আয়না ঝুলিয়ে ঝাঁ করে দাড়িটা কামিয়ে নেন। তারপর পায়চারি করতে করতে মাথায় ভাব এসে যায়। পাখির মতো একটা দুটো করে লাইন আসতে থাকে ডানা মেলে। বেগ যখন বেশ টনটনে হয়ে ওঠে, ধাঁ করে চলে আসেন লেখার টেবিলে। প্যাডের কাগজ টেনে নিয়ে প্রথমেই লেখেন—ওঁ সরস্বতী। তারপর গড়গড়িয়ে কলম চলল। ভূতাবিষ্টের মতো লিখেই চললেন। সকালে বাজারের ভাবনা নেই। ফেরার পথে সন্ধেবেলাতেই সেরে ফেলেন। ভাবের মাত্রা এমন মাপাপাত্রে আসে যেন টাইম বোমা। সাড়ে সাতটা বাজল, শেষ লাইন নেমে গেল। লেখার তলায় খ্যাঁস করে একটা দাঁড়ি, দুটো ফুটকি। ফিনিস।
নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের মতো নিষ্ঠাবান কর্মী। অফিস দশটায়। আসেন ঠিক ন'টায়। অফিসে বসেই সাইরেন শোনেন। আর আমরা, যারা অবশ্যই দেরিতে আসি আর তাড়াতাড়ি চলে যাই, তাদের মাঝেমধ্যেই ডেকে ডেকে বলেন, ঠিক সময়ে অফিসে আসা একটা সৎ অভ্যাস। দেশের মানুষ আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা নীতিভ্রষ্ট হলে জাতি নীতিভ্রষ্ট হবে। ফলো মি। রাত দশটা বাজলেই আমি শুয়ে পড়ে, উঠি ভোর চারটেয়। যত ভোরে ওঠা যায় ততই দিন বড় হয়। কাজের সময় বেড়ে যায়। আমি নিজে হাতে সব কাজ করি।
বড় কর্তা যখন, তখন তো মাইলড কিংবা কড়া ডোজে উপদেশ দেবেনই। পিতা অন্ন দেবেন, শিক্ষক কান মলে দেবেন, কবিরাজ পাঁচন দেবেন, স্ত্রী মুখ ঝামটা দেবেন, প্রতিবেশী বাঁশ দেবেন, পুত্র দু:খ দেবে, গুরু দীক্ষা দেবেন, গাভিন হলে গরু দুধ দেবে, যার যা ধর্ম। আমরা এক কান দিয়ে শুনি ও কান দিয়ে বের করে দি। ঈশ্বর কান দিয়েছেন কেন?
মুখার্জিসায়েব সাজ-পোশাকে খুব সাদাসিধে। ঝলঝলে প্যান্ট জামা। বাড়িতে কাচা। কলারে ইস্ত্রি নেই। শীতে একটা আকার আকৃতিহীন কোট বেরোয়, গলায় একটা টাই ওঠে। নস্যি নাকে পুরে, চারপাশে বেশ ভালো করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। দপ্তরে আমি একা কুম্ভ। বিমল ছুটির ওপর ছুটি চাপিয়ে চলেছে। রবিবারের পর সোমবারেই ওর আর বেরোতে ইচ্ছে করে না। দীর্ঘ ছুটির পর নাকি চাকরি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। বৃদ্ধ পিতা ঠ্যাঙা নিয়ে তাড়া করলে তবেই আবার কোঁত পাড়তে পাড়তে অফিসে আসে। সেই ঠ্যাঙাটি মনে হয় এখনও বেরোয়নি।
মুখার্জিসায়েবকে দেখলে ভীষণ আতঙ্ক হয়। মন বলে ওঠে, এই রে মরেছে। নিজের চেম্বারে টেনে নিয়ে যাবেন, পাঁচনের মতো এক কাপ চা খাওয়াবেন, মুখটা বোদা মেরে যাবে। তারপর মড়াখেকো একটা ফোলিও ব্যাগ থেকে, মোটা খাতা বের করে একের পর এক কবিতা পড়তে থাকবেন। ওঁর ধারণা, ওগুলো খুবই উচ্চ স্তরের মাল, জীবনদর্শনের মশলায় ঠাসা, তেমনি তার কারিকুরি। ধৈর্য ধরে শুনলুম, বা: বেশ হয়েছে, বলে সরে পড়লুম, সেটি হচ্ছে না। সে গুড়ে বালি। প্রতিটি কবিতার ব্যাখ্যা চাই। কী বুঝলে মানিক, বলো দেখি! ফলে কান খাড়া করে শুনতে হবে। কী লিখেছেন, কারুর বাবার ক্ষমতা নেই ধরে। নিজেও হয়তো জানেন না। ব্যাখ্যা শুনে বলবেন, হ্যাঁ, ধরেছি ঠিক, তুমি অবশ্য অন্য রাস্তায় গেলে। তা হোক, ভালো কবিতার ধর্মই হল, যে যেমন বোঝে। ছ'টা বাজবে, সাতটা বাজবে, অফিস খাঁ খাঁ করবে, অফিস পাড়া নির্জন হয়ে যাবে। তখনও কবিতা চলবে। আর্ডালি পিছন টুলে বসে ঢুলতে থাকবে। ঝাঁটা হাতে ঝাড়ুদার বারে বারে উঁকি মারতে থাকবে। চোখোচোখি হলেই, সেলাম সায়েব। সায়েব অন্যমনস্ক বলবেন, হ্যাঁ হ্যাঁ সেলাম।
জীবনেরও জানালা আছে
নীলডানা গণেশের গাত্র চর্মে
হৃদয়ের হাসি শুনি
বিধবার নিমীলিত চোখে।
সেলাম সায়েব। হ্যাঁ হ্যাঁ সেলাম।
মাঝরাতে ফিটনের চাকা ঘোরে
দুর্দান্ত ঝড় ওঠে
কদম্বের চুলচেরা বুকে,
সাজানো অজানা
পণ্ডিতের তর্ক জোড়ে
টোল ভেঙে পড়ে
সেলাম সায়েব,
হবে হবে সব হবে
মৃত্যু মেতে ওঠে
প্রেয়সীর
অস্পষ্ট জটার বাঁধনে।।
সুইপার মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠবে, সেলাম সায়েব। আমিও সাহস করে বলব, স্যার, প্রায় আটটা বাজল।
তাই নাকি? তা হলে চলো ওঠা যাক।
উঠতেও অনেকখানি সময় লাগবে। সমস্ত টেবিল সজ্জা একে একে ড্রয়ারে ঢুকবে। তিনটে ক্যাবিনেটে চাবি পড়বে, সেই চাবি আবার আর একটা লকারে গচ্ছিত হবে। সেই লকারের চাবিটি ব্যাগে ঢুকবে। নিজের হাতে দুটো জানলা বন্ধ করবেন। একটা মাত্র আলো রেখে বাকি আলো আর পাখার সুইচ অফ করবেন। তারপর যাবেন বাথরুমে। ফিরে এসে বলবেন, চলো, তোমাকে মানিকতলা পর্যন্ত লিফট দিয়ে দি। সে আবার আর এক বাঁশ। আমাকে উজিয়ে ফিরে আসতে হবে ধর্মতলা। সেখান থেকে শুরু হবে গৃহযাত্রা। বাড়ি যখন ফিরব তখন চোরেদের সিঁদ-কাঠি নিয়ে জীবিকায় বেরোবার সময় হয়েছে।
মুখার্জি সায়েব মুচকি হেসে বললেন, কী, আজ আমাদের সিটিং হবে না কি? না:, আজ থাক।
হাতে যেন স্বর্গ পেলুম, হ্যাঁ স্যার, আজ থাক।
কেন থাক বলো তো?
অধ্যাপক ছিলেন, তাই সব সময়েই সব কিছুর ব্যাখ্যা খোঁজেন। বললুম, তা তো জানি না স্যার।
আচ্ছা, এর মধ্যে তুমি কী দুর্গোপুজোর ওপর কোনও কিছু লিখেছিলে?
মরেছে, 'হ্যাঁ' বলব, না 'না' বলব! এগোলে নির্বংশের ব্যাটা, পেছলেও নির্বংশের ব্যাটা।
বিমলের কথাই বোধহয় ফলতে চলেছে। কালিদাস ডাল কেটে কবি হয়েছিলেন, আমি বেকার হব। ভয়ে ভয়ে বললুম, হ্যাঁ স্যার।
ধরেছি ঠিক, আর এক টিপ নস্যি নিলেন।
কেন স্যার, কী হয়েছে?
মার দিয়া কেল্লা।
কার কেল্লা স্যার! আমরা কেল্লা?
একরকম তোমারই কেল্লা বলতে পারো।
চাকরিটা গেল স্যার?
কোথাকার জল কোথায় গড়ায় একবার দ্যাখো। মন্ত্রীর খুব পছন্দ হয়েছে, একেবারে উচ্ছ্বসিত। আমাকে আজ বললেন, মুখার্জি, একবার খোঁজ করুন তো, ও-জিনিস মাথামোটা ব্যানার্জির কলম থেকে বেরবে না। ফাইন্ড আউট দি ম্যান। আমার তখনই সন্দেহ হয়েছিল, এ তোমার কাজ। ওই কাঁচা খেকো দেবতাকে সন্তুষ্ট করা কম কথা? এইবার দেখা যাক, তোমার জন্যে একটি নতুন পোস্ট তৈরি করা যায় কি না। প্রত্যেকবার ফাইনান্স বাগড়া দেয়।
মনে মনে বললুম, ওই জন্যেই তো স্যার, বসে বসে আপনার ভট্টি কাব্য শুনি, একটাও হাই তুলি না। মাথা খাটিয়ে উদ্ভট লাইনের ব্যাখ্যা খুঁজি।
তা হলে চলো।
কোথায় স্যার?
মন্ত্রী সকাশে।
আমাকে আবার টানাটানি কেন?
তার মানে? মন্ত্রী তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে বলেছেন।
ছুটি হতে এখনও ঘণ্টাখানেক বাকি, এই দপ্তর কিন্তু বন্ধ করে যেতে হবে।
হ্যাঁ, বন্ধ করেই যাবে। তুমি তো রাজদর্শনে যাবে। সাত খুন মাপ।
আপনিই বলেছিলেন, জনসংযোগ দপ্তর ঠিক সময়ে খুলবে, ঠিক সময়ে বন্ধ করবে।
আজ আর কোনও নিয়ম নেই। সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করতে পারেন, মন্ত্রী পারেন না। নাও, উঠে পড়ো।
অগত্যা উঠতেই হল। পাশ কাটানো গেল না। বাইরেই গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মুখার্জি সায়েব ড্রাইভারকে হুকুম দিলেন, অ্যাসেমব্লি চলো। ভয়ে বুক ধুকপুক করছে। যতই বলছেন ভয়ের কী আছে, খেয়ে তো আর ফেলবেন না, ততই ভয় বেড়ে যাচ্ছে। একটু বড় বাইরে বাইরে ভাব।
অ্যাসেমব্লিতে আমাদের মাননীয় মন্ত্রীর একটি ঘর।
মন্ত্রীরা সব সময়েই মাননীয়। সায়েবরা বলেন অনারেবল। আমি এক মন্ত্রীর স্ত্রীকে জানি যিনি জেলা পরিদর্শনে গিয়ে ভোরবেলা ডাকবাংলোর হাতায় দাঁড়িয়ে জনৈক তটস্থ উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে বলেছিলেন, অনারেবল মিনিস্টার রোজ দেড় সের পরিমাণ দুধ খান। আপনি অবিলম্বে সেই দুধের ব্যবস্থা করুন।
ইয়েস ম্যাডাম বলে তিনি যেই দৌড়তে যাবেন অধনস্তন বললেন, দিক ঠিক করে দৌড়ন স্যার। পুরুলিয়া শহরে গবাদি পশুর বড় অভাব, দু-একটা চা-গরু মিলতে পারে, দেড় সের খাঁটি দুধ পাবেন কোথায়?
দ্যাটস নট ইওর লুক আউট, বলে তিনি ডাকবাংলোর কম্পাউন্ডে ভূতেধরা মানুষের মতো গোল হয়ে ঘুরপাক খেতে লাগলেন।
জিগ্যেস করেছিলুম, চা-গরুটা কী জিনিস মশাই?
আরে ম্যান, চা-গরু অনেকটা ছাগলের মতো দেখতে হয়। যখনই বাঁটে হাত দেবেন, ছিড়িক করে এক চামচে দুধ ছাড়বে, এক কাপ চা করার মতো। আমরা নাম রেখেছি চা-গরু।
এ দেশে মন্ত্রীরাই শুধু বুদ্ধিমান নন, বুদ্ধিমান প্রজারও অভাব নেই। গুঁড়ো দুধ ডিস্টিলড ওয়াটারে গুলে বটের আঠা মিশিয়ে দেড় সের খাঁটি গোদুগ্ধ তৈরি হল। বটের আঠা কম বলকারক! ছটা বাচ্চা পেড়ে ছাগল যখন নেতিয়ে পড়ে তখন বটপাতা খাইয়ে তার স্তনে দুধ আনা হয়। বৃক্ষ বট, মন্ত্রী বট, আহার বটদুগ্ধ।
অ্যাসমব্লিতে মন্ত্রী মহোদয় বসে আছেন। চোখ জবাফুলের মতো লাল। দেখলেই বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। সবসময় দাঁতমুখ খিঁচিয়ে খিঁচিয়ে মুখটাই ডিসফিগার্ড হয়ে গেছে। অনবরত চিৎকার করে বক্তৃতা দিয়ে গলা হয়েছে ফাটা কাঁসরের মতো।
চোখ দুটো মোটরগাড়ির ব্যাকলাইটের মতো। জ্বলছে, জ্বলবে। দাঁত খিচিঁয়ে বললেন, কী চাই? মুখার্জি সায়েব থতোমতো খেয়ে বললেন, আজ্ঞে এনেছি।
ঠেঙিয়ে ব্যাটার নাম ভুলিয়ে দাও।
মুখার্জিসায়েব মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, আজ্ঞে স্যার!
আপনাকে নয়, চুপ করে বসুন। আমি সনাতনকে বলছি। অপদার্থ শয়তান। পুলিশ কী করছে? তোমাদের পুলিশ?
ধরছে আর ছাড়ছে। এ মুখ দিয়ে ঢুকছে, ও মুখ দিয়ে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসছে।
মন্ত্রী টেবিলে এক ঘুসি মেরে বললেন, এই আমলারা, রাসকেল আমলারাই আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে গদি টলিয়ে দিলে। গেট আউট।
সনাতন বললেন, আমি আবার কী করলুম।
তোমাকে বলিনি পাঁঠা। আমি এই মুখার্জিকে বলছি।
মুখার্জি সায়েব কাঁদোকাঁদো মুখে বললেন, আমাকে স্যার আমলা বলবেন না। আরও দুধাপ ওপরে উঠলে তবেই আমলা হতে পারব।
তাহলে বসুন। সনাতন তুমি যাও। তোমাদের দ্বারা কিস্যু হবে না। আমরা নাম জপে যদ্দিন গদিতে আছি, যা পারো কামাই করে নাও। গাড়ির পারমিট বেরিয়েছে?
কবে!
নেমে গেছে?
কাল নামছে।
তবে আর কী? যাও বোতল খুলে বসে পড়ো।
লোহার পারমিটটা যে এখনও আটকে আছে।
কেন?
তা তো জানি না। ফাইলটা আটকে রেখেছে।
হোয়াট! মন্ত্রীর অর্ডার চেপে রেখেছে! আমি ওই সান্যালের প্যান্ট খুলে নেব। অফিসার হয়েছে, অফিসার।
হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে নিলেন।
মুখার্জিসায়েব মিউ করে বললেন, মিস্টার সান্যাল স্যার পোল্যান্ড গেছেন।
পোল্যান্ড! পোল্যান্ড কেন?
আজ্ঞে লোহা চিনতে।
অপদার্থ। কে অ্যালাউ করেছে?
আপনিই স্যার করেছেন।
আই ওয়াজ মিসলেড।
মি: সান্যাল স্যার কি এমের লোক।
এই সি এমরাই দেশের বারোটা বাজিয়ে দিলে। কবে যে আবার ওয়ান পার্টি রুল হবে। সামনে বার আমাকে সি এম হতেই হবে। সনাতন?
বলো দাদা।
আরও এম এল এ চাই। মেজোরিটি আমার। তোমাকে আমি লোহা দিয়ে ইস্পাত দিয়ে সিমেন্ট দিয়ে মুড়ে দোব।
দেশের লোক দাদা বড় সোয়ানা হয়ে গেছে।
বোকা বানাবার কল চালু করে দাও! এখনও সময় আছে। নাউ অর নেভার। এখন তুমি যাও তাহলে, অ্যা:।
সনাতন নামক জীবটি মাখনের মতো মাখোমাখো হাসিতে মুখ ভরিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। হাসি যেন মুখ ছেড়ে হাত লম্বা হয়ে বেরিয়ে আসছে। ঘর খালি হল। মন্ত্রী মহোদয়ের মুখ সাহিত্যসভার প্রধান অতিথির মতো ভীষণ গোমড়া হয়ে আছে। যে জানে না, সে দেখলে ভাববে, বউ বুঝি খুব বকেছে। এ যে পলিটিক্যাল মার বাবা। কোথায় কে এক অপোনেন্ট অ্যায়সা কলকাঠি নেড়েছে, আসনে ভূমিকম্প।
টেবিলে তিনবার টোকা মারলেন। দীর্ঘ একটি নি:শ্বাস ছাড়লেন। তারপর মুখার্জি সায়েবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনারা আর মানুষ হলেন না।
কেন স্যার?
সব অসতী, অসতী। ঘর করছেন একজনের সঙ্গে, শুতে যাচ্ছেন আর একজনের সঙ্গে। আপনারা হলেন বাজারের বেশ্যা।
এ স্যার কী বলছেন? ছি ছি!
চপ, প্রতিবাদ করার সাহস আসছে কোথা থেকে। বাইরের খোলসটা হল সতীসাধ্বীর আর ভেতরের ভাবটা হল বারবনিতার। এক বাবুতে মন ওঠে না। নতুন নতুন চাই, নতুন নতুন।
হৃষ্টপুষ্ট মন্ত্রী মহোদয় চেয়ারে বসে বসেই স্প্রিংঙের মতো নাচতে লাগলেন, ওপর নীচ, নীচ ওপর।
নতুন নতুন বলার সময় মুখের চেহারা হল কোলা ব্যাঙের মতো। ডোবায় বসে ডাকছেন, যেন, গ্যাঙোর গ্যাং। আচ্ছা জায়গায় এনে ফেললেন আমার শুভানুধ্যায়ী মুখার্জিসায়েব। একেবারে বাঘের ঘরে চারপাশে ঘোগের বাসা।
নাচ করে মন্ত্রী মহোদয় দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, মুখার্জি, আমি প্রতিবাদ পছন্দ করি না। যা বলব, তা মানতে হবে। মন্ত্রীর অবজার্ভেশনে কখনও ভুল হয় না। ভুল হলে দেশ শাসন করা যেত না, বুঝেছেন?
ইয়েস স্যার।
হ্যাঁ, ইয়েস স্যার। আমরা ইয়েসম্যানই পছন্দ করি। ওই সান্যালটার আমি বারোটা বাজাবই। পোল্যান্ডে গেছে, আর একটু ঠেলে কুমেরুতে পাঠিয়ে দোব রাসকেল।
মুখার্জি সায়েব বললেন, আমি প্রতিবাদ করিনি স্যার। শুধু বলতে চেয়েছিলুম, আমি ওই গণিকাদের দলে পড়ি না। আই অ্যাম সো ডিভোটেড টু ইউ।
শুধু কথায় চিঁড়ে ভিজবে না মুখার্জি। প্রমাণ চাই, প্রমাণ। ডিভোসনের প্রমাণ।
কীভাবে স্যার!
ওই সান্যালের চেয়ারে আপনাকে আমি বসাব। ওই চেয়ারে আমি আমার লোক চাই।
কী করে বসব স্যার?
ফুল, দ্যাটস নট ইওর লুক আউট, আই উইল অ্যারেঞ্জ ইওর প্রমোশন।
কিন্তু সি, এম?
ইডিয়েট। আমি দুর্নীতির অভিযোগ এনে হারামজাদাকে সাসপেন্ড করব। আপনাকে দোব প্রমোশন। বাট ইউ মাস্ট বি ভেরি অনেস্ট। আমার লোককে আপনি মেটিরিয়েল দেবেন উইদাউট এনি হ্যারাসমেন্ট।
অফকোর্স স্যার।
আ, এই ছেলেটি তাহলে আমার বক্তৃতা লিখেছিল?
হ্যাঁ স্যার।
চেয়ার থেকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে নমস্কার করলুম। ধাঁই করে টেবিলে হাঁটু ঠুকে গিয়েছিল। মনে মনে বাপ বললুম। মুখে যেন যন্ত্রণার রেখা না পড়ে। তাহলে কেস কেঁচে যাবে। যাঁর সামনে এসে বসেছি তাঁর একটা আঙুল নাড়ায় আমার বরাত ফিরে যেতে পারে। কতদিন ধরে জীবনবৃক্ষে মুকুল আসছে, ফল ধরছে, ঝরে পড়ে যাচ্ছে, পাকছে না। এইবার এমন সার পড়তে পারে হয় গাছ জ্বলে যাবে, নয়তো পদোন্নতির ফল পাকবে।
বোস বোস, হি লুকস ভেরি ইনোসেন্ট। তোমার লেখায় বেশ ডেঁপোমি আছে হে। আমাদের গ্রাম্য ভাষায় তোমাকে পেছনপাকা বলা যেতে পারে।
আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার।
রাজনীতি করো?
আজ্ঞে না স্যার।
এইরকম দুটো মাল আমার চাই মুখার্জি। বাইরে ইনোসেন্ট, ভেতরে শয়তানি। তোমাকে আমার কাজে লাগবে। যাও। এখন যাও। আমার কাজ আছে।
আমরা দুজনে সমস্বরে ইয়েস স্যার বলে উঠলুম।
মুখার্জিসায়েব গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, যাক তোমার কপালটা এত দিনে ফিরল। একই পোস্টে ঘ্যাঁসড়াচ্ছো বছরের পর বছর।
হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, একবার তো আপনার জন্যই আমার প্রাোমোশন হল না। আপনার ভাগনেকে লড়িয়ে দিলেন।
এ তুমি কী বলছ? নিজের ভাগনে আগে না তুমি আগে? এর পরের চান্স তোমারই হতো।
আপনার কী মনে হল?
তার মানে?
এই যে মন্ত্রী বললেন, পেছন-পাকা, ভেতরে শয়তানি, চাকরিটা যাবে না তো?
আরে না, না, ওসব সোহাগের কথা। মেজাজ এখন খুব চড়েই থাকবে। টার্ম শেষ হয়ে আসছে, ইলেকশন প্রায় এসেই গেল। চলো তোমাকে মানিকতলা পর্যন্ত লিফট দিয়ে দি।
সেরেছে রে, আবার মানিকতলা!
মানিকতলা বাজারের কাছে গাড়ি দাঁড়াল। সায়েব বাজার করবেন। আমাকে বললেন, এত ভালো আর রকম রকম মাছ তুমি কলকাতার অন্য কোনও বাজারে পাবে না। মাছ কিনবে নাকি?
অপরাধীর মতো মুখ করে বললুম, আমার মাছ কে রাঁধবে স্যার।
মনে মনে বলুলম, আপনি তো তিন হাজারি মনসবদার, ছরকম মাছ দিয়ে ভাত খেতে পারেন। আমাদের একবেলা এক চিলতে জোটাতেই জিভ বেরিয়ে যায়।
তিনরকমের ব্যাগ হাতে গাড়ি থেকে নামতে নামতে মুখার্জিসায়েব বললেন, বুঝলে, আমি একটু ভোজনবিলাসী। তিনরকমের মাছ না হলে আমরা মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। সবাই ঠাট্টা করে বলে মৎস্যাবতার। মাছের কপালটাও আমার ভালো। এই বাজারে ঢুকলেই দেখতে পাবে।
আমিও যাব স্যার?
বা:, মাছ দেখবে না। সব রকম মাছ তুমি চেনো?
একটা মাছই আমি চিনি, তা হল কাটা পোনা।
কাটাপোনা, হা: হা: কাটা পোনা আবার মাছ নাকি হে। চলো চলো, ফলুই দেখবে চলো। রূপোর মতো চেহারা। জলের গামলা ছেড়ে দশ বারো হাত করে লাফিয়ে উঠছে।
কলকাতায় বেশ কাঁঠালপাকা গরম পড়েছে। প্রাণ একেবারে আইঢাই। সবে সকাল সাড়ে দশটা। শহরে যেন আগুন ছুটছে। জামার বুকের সবকটা বোতাম খুলে দিয়ে বিমল চেয়ারে বসে ঝিামোচ্ছে। কাল সারারাত কোথায় গান গেয়ে এসেছে।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
হ্যাঁ বলছি।
একবার আসতে হচ্ছে।
এখুনি?
হ্যাঁ, এক্ষুনি। অনারেবল মিনিস্টারের তলব।
আপনি কে বলছেন স্যার?
অনারেবল মিনিস্টারের পি এ।
অনারেবল মিনিস্টারের ঘর খুঁজে পেতেই জীবন বেরিয়ে গেল। মন্ত্রী মহলে এত ঘুরপাক! দেউড়ির পুলিশকে বলা ছিল, তাই কাছা ধরে টানাটানি।
চারটে টাইপরাইটার একই ছন্দে বেজে চলেছে। চারটে টেলিফোনের একটা থামে তো আর একটা বাজে। টেলিফোনের সামনে যিনি বসে আছেন, তিনি অষ্টভুজ মহাদেবের মতো টেলিফোনের ভোজবাজি দেখাচ্ছেন। তুলছেন, ফেলছেন, ফেলছেন, তুলছেন। যেন জিলিপি ভাজা হচ্ছে।
মন্ত্রী মহোদয়ের ঘরের বাইরে লাল আলো জ্বলছে। এনগেজড। অনেকক্ষণ বসে আছি। একটু উশখুশ করলেই প্রজাপতি গোঁফওয়ালা এক ভদ্রলোক ধমকের সুরে বলছেন, চুপ করে বসুন। সময় হলেই ডাক আসবে। আচ্ছা ল্যাঠা রে বাবা! আমি তো আসিনি, তিনিই তো ডেকেছিলেন।
অবশেষে ডাক এল। প্রজাপতি গোঁফ ধমকের সুরে বললেন, যান, ডাকছেন।
সব মেজাজ দ্যাখো! যেন ঘেয়ো কুকুর! মন্ত্রী মহোদয়ের হাওয়া লেগেছে আর কী! নীল রঙের দরজা ঠেলে ঘরে পা রাখতেই, পা যেন ডুবে গেল। জলে নয়, নরম কার্পেটে। টেবিলের সামনে পাঁচটা সারিতে অন্তত কুড়িটা চেয়ার। ঘোড়ার খুরের আকারে বিশাল একটি টেবিল। টেবিলের আবার একতলা, দোতলা হয় এই প্রথম দেখলুম। অনেকটা ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখোনি গোছের অভিজ্ঞতা। একতলায় কাচ লাগানো, তার ওপর মন্ত্রী মহোদয়ের হাত। দোতলায় ব্যালকনিতে যাবতীয় দ্রব্যসম্ভার, যেন খেলার সামগ্রী। কলমদানি, ভেলভেটের পিনকুশান, হ্যানাত্যানা। সারা ঘরে হিলহিল করছে একটা যান্ত্রিক ঠান্ডা।
মন্ত্রী মহোদয়ের কাশি হয়েছে। বিশ্রী কাশি। সাইবেরিয়ায় যেন হায়েনা কাশছে। ঘরটা এত পেল্লায়, ক্ষমতার ঘূর্ণায়মান আসনটি এত বিরাট, আর আমি এত ক্ষুদ্র, মনে হল, আমি একটা টিকটিকি। টকটক না করলে, নজরেই পড়ব না।
সেই গানটা মনে খেলে গেল, আমি এসেছি, আমি এসেছি-ই বঁধু হে।
লয়ে এই হাসি রূপ গান।
দরজা থেকে দু-পা এগিয়ে, দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ক্ষীণকণ্ঠে ঘোষণা করলুম, আমি এসেছি স্যার।
দেখেছি। অমন ন্যাকা সুরে কথা বলছ কেন? লিঙ্গ ঠিক আছে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
দ্বিতীয় সারির তিন নম্বর চেয়ারে বোসো।
ভয়ে ভয়ে বসলুম। সংবর্ধনাটা তেমন সুবিধের হল না। লিঙ্গ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। মেডিকেল বোর্ডে না পাঠিয়ে দেন! আজ আবার চোখে চশমা উঠেছে।
মোমাছি কাকে বলে জানো?
আজ্ঞে হ্যাঁ, যে মাছি মধু খায়।
তোমার মাথা। এ কি গরু যে পালন ধরে চ্যাঁক চোক করলেই দুধ দেবে! মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে। সংগ্রহ করে চাকে রাখে। বুদ্ধিমান মানুষ চাক ভেঙে সেই মধু খায়। ভাল্লুকেও খায়। আমাদের এই রাজনীতির মতো। আমরা চাক বেঁধে মধু সঞ্চয় করে যাচ্ছি, বিরোধী ভাল্লুকেরা এসে সব সাবাড় করে দেবে। মধু খেয়েছ?
ছেলেবেলায় স্যার, সেই জন্মাবার পরেই, ঠোঁটে একবার দেওয়া হয়েছিল।
গাধা কোথাকার! আমি রোজ চার চামচে মধু দিয়ে পাতিলেবুর রস খাই।
ভীষণ দাম।
লিখতে পারবে?
কী লিখতে হবে বলুন?
পশ্চিমবাংলায় মৌমাছির চাষ। জমি কুপিয়ে, মৌমাছির বীজ ছড়িয়ে চাষ নয়, মৌচাক বসিয়ে মাছির চাষ। গাধাদের বিশ্বাস নেই। তিন পাতা ধান চাষ লিখে, দাঁত বের করে সামনে এসে দাঁড়ায়, এনেছি স্যার।
পারব স্যার। বারুইপুরে মৌমাছির চাষ আমি দেখে এসেছি।
হুঁ। শোনো, মৌমাছির সঙ্গে একটু রাজনীতি ঢুকিও। বেশ কায়দা করে ঝাড়বে। এখন বাজে বেলা বারোটা। তিনটের মধ্যে চাই। তুমি দুটোর মধ্যে দেবে। তারপর টাইপ হবে। চারটের সময় আমাদের পৌঁছতে হবে। টিভি সেন্টারে। সংস্কৃত কোটেশান একদম ব্যবহার করবে না। আমার ফলস টিথ, উচ্চারণে ভীষণ অসুবিধে হয়।
মুখে এসে গিয়েছিল, প্লেব্যাক করলে কেমন হয় স্যার! ভাগ্যিস বলে ফেলিনি।
মাত্র দু-ঘণ্টা সময়, তিন পাতা লিখতেই হবে, নয়তো চাকরি চলে যাবে। কী এখন লিখি? প্রথমেই লিখি, মৌমাছি, মৌমাছি, কোথা যাও নাচি নাচি, দাঁড়াবার সময় তো নাই। পরোপকারী মৌমাছি, হুল ফোটালেও গাছে গাছে মানুষের জন্য অমৃতকোশ ঝুলিয়ে রাখে। মৌমাছি আর আদর্শ রাজনৈতিক দল নেতার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। দু-পক্ষই যা করেন, সবই হিতার্থে। হিতার্থে শব্দটা চলবে না। দাঁতে দাঁত ঠুকে যাচ্ছে। ফলস টিথে অসুবিধে হতে পারে। মানব কল্যাণে। না চলবে না। য ফলা আছে। মানুষের উপকার লিখি। সহজ সরল যুক্তাক্ষর বর্জিত।
মৌমাছি একশো মাইল রেডিয়াসে, ও বাবা রেডিয়াস আবার ইংরেজি শব্দ, একশো মাইলের পরিধিতে ওড়াওড়ি করে, ফুলে ফুলে, ফুলিফুলি মধু সংগ্রহ করে এনে, মোমচাকের কন্দরে কন্দরে মধুভাণ্ডে মধু সঞ্চয় করে। ফ্লো এসে গেছে।
এই মধুই হল সেই অমৃত যে অমৃত উঠেছিল সমুদ্রমন্থনে, সেই অমৃত যে অমৃত অসুররা ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল, দেবতারা কৌশলে কেড়ে নিয়েছিলেন, বন্ধুগণ, পশ্চিম বাংলার অমৃতভাণ্ডে, আমাদের শ্রমে, নিষ্ঠায়, দেশহিতব্রতে উন্নয়নের যে মধু সঞ্চিত হয়েছে একদল উন্মত্ত, লোমশ ভাল্লুক, মাতোয়ারা হয়ে রাতের অন্ধকারে তা খেয়ে চলে যাবে, এ কী আপনারা সহ্য করবেন? অসুরকুলের এই ঘৃণ্য প্রয়াস আমাদের রুখতেই হবে। রুখবই রুখব।
মধুর মতো মধুর বস্তু কী আছে! উপনিষদ বলছেন, ওঁ মধুবাতা ঋতায়তে, মধুক্ষরন্তি সিন্ধব: মার্ধ্বীন: সন্তোষধী: মধুনক্ততোষসো ইত্যাদি। মধুর একেবারে ছড়াছড়ি। দ্রব্যগুণে মধুর কোনও তুলনা হয় না, গ্লুকোজ, সুক্রোজ, ল্যাকটোজ, ফ্রাকটোজ, ক্যালোরিতে ঠাসা, এক এক ফোঁটা, এক একটি অ্যাটম বোম। অ্যালকোহল রক্তে মিশতে ছ'ঘণ্টা সময় নেয়। মধু জিভে পড়ামাত্রই রক্তে মিশে যায়। মধু দিয়ে মকরধ্বজ মেড়ে খেলে মানুষ শতায়ু হয়।
বন্ধুগণ, আপনারা ঘরে ঘরে বাক্স চাক বসিয়ে মৌমাছি পালন করুন। মধুর উৎপাদন বাড়ান। মধু মানে স্বাস্থ্য, মধু মানে যৌবন, যৌবন মানে জীবন, জীবন মানে জাতি। কর্মে, ধর্মে, মর্মে বাঙালি জেগে ওঠো। আমরা বড় পেছিয়ে পড়েছি। ইন কিলাব জিন্দাবাদ।
আ:, টেরিফিক লিখে ফেলেছি। বাচ্চে লোক এক দফে তালি বাজাও।
দুটো বেজে দশ মিনিটে বক্তৃতা মন্ত্রীর হাতস্থ হয়ে গেল। নিজেই নিজেকে বললুম, কামাল কর দিয়া গুরু।
মন্ত্রী মহোদয়ের খুব পছন্দ হয়েছে মনে হল। সংস্কৃত শ্লোকটির ব্যাপারে সামান্য একটু আপত্তি তুললেন। ওটাকে বাদ দিলে কেমন হয়।
শ্লোকটার লাইনে লাইনে স্যার মধু। এ সুযোগ অর পাওয়া যাবে না। কবে আবার মধু হবে।
থাক তা হলে। গাড়িতে যেতে যেতে তুমি আমাকে বার কয়েক তালিম দিয়ে দিও। তিনটে পাঁচে আমাদের মহাযাত্রা শুরু হল। সামনে দুজন বডি গার্ড। পেছনে আমরা তিনজন। একজন হলেন মন্ত্রী মহোদয়ের পি এ।
যেতে যেতে শ্লোকের তালিম চলেছে। বলুন স্যার, ওম। উঁহু ওঁ নয় অউম।
খুব খেপে গেলেন, লিখেছ ওঁ, বলতে বলছ অউম।
আজ্ঞে খাস সংস্কৃত ওঁ এর উচ্চারণ অউম, যেমন বাডজেটের উচ্চারণ হল বাজেট। বলুন স্যার, মধুবাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধব:, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক হচ্ছে। ক্ষরন্তি না, উচ্চারণ হবে, হখসরন্তি।
বেশ জুতসই একটা গালাগাল দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। হঠাৎ বাঁধা পড়ে গেল। আমাদের ওভারটেক করে পাশ দিয়ে সাঁ করে আর একটা গাড়ি বেরিয়ে গেল। মন্ত্রী মহোদয় চমকে উঠে বললেন, 'কে গেল, মনে হচ্ছে আর একজন মন্ত্রী গেলেন।
পি এ কিছুই দেখেননি। ভিকটোরিয়ার মাঠে জোড়া শালিক দেখছিলেন। বোকার মতো বললেন, না, স্যার।
তুমি থামো, গবেট কোথাকার, আমি গাড়িতে ফ্ল্যাগ উড়তে দেখেছি।
সামনের বডিগার্ডের মধ্যে একজন বললেন, হ্যাঁ স্যার মন্ত্রী গেলেন।
আমি দেখেছি। জঙ্গল আমাকে ওভারটেক করে চলে গেল।
জঙ্গল মানে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট। অরণ্য দপ্তরের মন্ত্রী। রাগে রাগে আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের মুখ জবাফুলের মতো লাল, হোয়্যার ইজ মাই ফ্ল্যাগ রাসকেল? মাই ফ্ল্যাগ!
আমি তোমার চাকরি চিবিয়ে খাব গাধা। হোয়ার ইজ মাই ফ্ল্যাগ!
কাকে এইসব মধুর সম্ভাষণ হচ্ছে? গাড়ির সামনে ফ্ল্যাগ পতপতিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কার! মন্ত্রী মহোদয় পেছন থেকে ড্রাইভারের ব্রহ্মতালুতে ঠাঁই করে একটা চাঁটা মেরে বললেন, কী, কথা কানে যাচ্ছে না!
গাড়ি হুড় হুড় করে রাস্তার বাঁ দিকে গিয়ে থেমে পড়ল। ড্রাইভার দরজা খুলে রাস্তায় নেমে পড়ল। বুড়ো হাবড়া, রাতকানা নয়, ফাইন ইয়ংম্যান। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। বেশ ডাঁটে দরজা বন্ধ করে, হন হন করে হেঁটে চলল ময়দানের দিকে।
আমরা সকলেই হাঁ হয়ে গেছি। ব্রহ্মতালুতে চাঁটা খেলে, রাতে বিছানায় ছোট বাইরে করে ফেলার কথা আমরা ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি। এ তো দেখছি সঙ্গে সঙ্গে কুইক অ্যাকশন।
মন্ত্রী বললেন, যাচ্ছে কোথায়, রাসকেল যাচ্ছে কোথায়?
একজন বডিগার্ড সামনের দিক থেকে নেমে পেছন পেছন দৌড়ল। আমরা কথা শুনতে পাচ্ছি না, দূর থেকে মূকাভিনয় দেখছি। দুজনেরই হাত পা খুব নড়ছে। বডিগার্ড ভদ্রলোক ঘাড় ধরে ড্রাইভার ছেলেটিকে আমাদের দিকে টেনে আনছেন।
মন্ত্রী মহোদয় রাগে পাঞ্জাবি খামচাচ্ছেন। বুকের কাছটা গিলে হয়ে গেল। লোকে মন্ত্র জপ করে। মন্ত্রী মহোদয় ক্রমান্বয়ে বলে চলেছেন, শুয়োরের বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা। গাড়ির কাছাকাছি আসতেই, মন্ত্রী বললেন, ওর কানটা একবার খালি আমার হাতে ধরিয়ে দাও। তারপর যা করার আমিই করছি।
ছেলেটার কি প্রাণের মায়া নেই? বেপরোয়ার মতো বললে, যান, যান সব করবেন।
আমার হাঁটুতে বিশাল এক চড় মেরে, মন্ত্রী স্প্রিংয়ের মতো নাচতে লাগলেন, জুতো, জুতো পেটা করব। জুতো পেটা করব।
ড্রাইভার বললে, বাংলা বনধ করে দোব।
মন্ত্রী বললেন, ষড়যন্ত্র, কনসপিরেসি, কনসপিরেসি। এ ব্যাটাকে বিরোধীরা ফুসলে নিয়েছে। হ্যাঙ হিম, কিল হিম, শুট হিম।
মোটর সাইকেলে একজন সার্জেন্ট যাচ্ছিলেন। এ রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করাবার নিয়ম নেই। বাইক ঘুরিয়ে তিনি এগিয়ে এলেন। খুব তড়পাবার তালে ছিলেন। মন্ত্রী মহোদয়কে দেখে সটাস করে একটা স্যালুট ঠুকলেন।
কী হয়েছে স্যার!
রাগে মন্ত্রী মহোদয়ের মুখ দিয়ে কথা সরছে না। জোরে জোরে নি:শ্বাস নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কোনওরকমে বললেন, ওকে মেরে ফ্যালো।
পি এ মাথায় ফাইলের বাতাস শুরু করে দিয়েছেন। প্রেসার কোথায় উঠেছে কে জানে! চারশো টারশো হবে হয় তো।
সার্জেন্ট ভদ্রলোক খুব বিপদে পড়ে গেছেন। এমন পথনাটক তিনি জীবনে দেখেছেন কি না সন্দেহ! বেশ ঠান্ডা মাথায় ড্রাইভারকে জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে?
উনি পেছন থেকে আমার মাথায় চাঁটা মেরেছেন, বাপ তুলেছেন, জুতো মারার আগে আমি গাড়ি পার্ক করে নেমে পড়েছি। মন্ত্রী বলে হাতে মাথা কাটবেন নাকি!
মন্ত্রী মহোদয় হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, হি ইজ এ লায়ার।
ড্রাইভার বললে, আপনি এঁদের জিগ্যেস করুন, মিথ্যে বলছি কি না।
আমি মনে মনে বললুম, আমি অন্তত সাক্ষ্য দোব না, যে দেয় দিক। চাকরিটা যাক আর কী। জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে শত্রুতা। আমি বলে প্রমোশনের ধান্দায় তেলিয়ে চলেছি। মাসখানেকের মধ্যে ফাইল না নড়লে হয়ে গেল। পরের নির্বাচনে কোন মহাপ্রভুরা দু'হাত তুলে নেচে নেচে আসবেন কে জানে!
সার্জেন্ট জিগ্যেস করলেন, কী করছিলে তুমি?
কিছুই করিনি।
মন্ত্রী মহোদয় হাওয়া বেরোতে থাকা বেলুনের মতো ছটফট করতে করতে বললেন, রাসকেল পি এ, তুমি কিছু বলছ না কেন? বোবা হয়ে গেছ! বোবা।
পি এ বললেন, ও গাড়িতে ফ্ল্যাগ লাগাতে ভুলে গেছে।
ড্রাইভার বললে, আমি ফ্ল্যাগ পাব কোথা থেকে? তিনদিন আগে দুর্গাপুর থেকে আসার পথে, বর্ধমানে, জনতা গাড়ি থামিয়ে ওঁকে জুতোর মালা পরাতে গিয়েছিল। সেই সময় একশো মাইল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে আমি ওঁকে বাঁচাই। সেই গণ্ডগোলের সময় পাবলিক ফ্ল্যাগ খুলে নিয়েছিল। আমাকে না দিলে ফ্ল্যাগ আমি পাব কোথা থেকে স্যার! আপনিই বলুন।
মন্ত্রী মহোদয় জ্বলন্ত অঙ্গারের দৃষ্টিতে পি এ-র দিকে তাকালেন। ওই দৃষ্টিতেই কাজ হল। পি এ আমতা আমতা করে বললেন, স্যার আমি বলেছি, ডিপার্টমেন্ট দিতে দেরি করছে।
তুমি আমাকে বলোনি কেন?
বললে কিছু হত না স্যার। ওটা অন্য দলের হাতে।
কনসপিরেসি, কনসপিরেসি, বলে মন্ত্রী দেহের হাল গাড়ির আসনে ছেড়ে দিলেন।
সার্জেন্ট ড্রাইভারকে নরম গলায় বললেন, যাও গোলমাল কোরো না, যেখানে যাচ্ছিলে সেখানে চলে যাও। তোমার চাকরির মায়া নেই!
না স্যার, আমি তো কেরানি নই, ড্রাইভার। আমাদের লাইনে চাকরির অভাব নেই।
এভাবে গাড়ি ফেলে পালালে তোমার জেল হয়ে যাবে যে।
ড্রাইভার গাড়ির আসনে এসে বসতেই মন্ত্রী মহোদয় বললেন, অকৃতজ্ঞ বেইমান।
ড্রাইভারের সাহসও কম নয়, সে বললে, আপনিও।
হোয়াট!
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনিও।
জানো, তোমাকে আমি নিজে হাতে তুলে এনে স্টিয়ারিং-এ বসিয়েছি!
সে আমার হাত বলে। একশো কুড়ি, তিরিশ, চল্লিশ মাইল স্পিডে কে আপনার গাড়ি চালাবে! ক'জন ড্রাইভার কলকাতায় আছে। আমি মিনি চালালে এর চেয়ে বেশি রোজগার করব। দিন নেই রাত নেই আপনার হোল ফ্যামিলির খিদমত খাটছি। মাইনে পাঁচশো, উপরি জুতো-ঝ্যাঁটা-লাঠি।
খুব লম্বা-চওড়া বাত হয়েছে তোমার। দাঁড়াও, ফিরে আসি।
ফিরে আর আসতে হচ্ছে না, এবারে পাবলিকেই খতম করে দেবে। মেয়েমানুষের যৌবন আর নেতাদের গদি এক জিনিস।
আমি সে ফেরার কথা বলছি না গাধা। আজ ফিরে আসি, তারপর তোমাকে দেখাব কত ধানে কত চাল।
ভয় দেখালে ভিড়িয়ে দোব স্যার। স্টিয়ারিং আমার হাতে।
মন্ত্রী গুম মেরে গেলেন। আমি বললুম, বলুন স্যার, মধু ক্ষরন্তি সিন্ধব:, মার্ধ্বিন: সন্তোষধী। মন্ত্রী মহোদয় দাঁত খিচিয়ে বললেন, ধ্যাততেরিকা মধু। রাখো তোমার মধু।
ওভারটেক করা মন্ত্রী আগেই এসে পড়েছেন। সাদা অ্যামবাসাডার এক পাশে বিশ্রাম করছে। যে পতাকা নিয়ে এত গোলমাল সেই পতাকা গাড়ির ঠোঁটে নেতিয়ে পড়ে আছে। আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের পরাজয় মানে আমাদের পরাজয়।
মাথা নীচু করে হাঁটছি!
কানের কাছে মন্ত্রী ফাটলেন। বোমা ফাটার মতই ব্যাপার।
দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, এ কোথায় নিয়ে এলে, এটা তো টয়লেট।
মাথা নীচু করে হাঁটার পরিণাম। নেতাকেই সবাই অনুসরণ করে, নেতা যে এতক্ষণ আমাকেই অনুসরণ করছিলেন, জানব কী করে! ইতিমধ্যে কর্মকর্তাদের একজনের টনক নড়েছে। তিনি ছুটতে ছুটতে এলেন, এদিকে স্যার, এদিকে।
গোটা তিনেক দরজা ঠেলে, আমরা শীতপ্রধান এলাকায় রাগপ্রধান মানুষটিকে নিয়ে প্রবেশ করলুম। রাস্তায় দেখেছি, ঠ্যালা চেপে প্যাকিং বাক্স চলেছে, গায়ে লেবেল সাঁটা। তির চিহ্ন, দিস সাইড আপ, সতর্কবাণী, গ্লাস হ্যান্ডল উইথ কেয়ার। আমরা অনুরূপ একটি গোলমাল মানুষকে যে ঘরে এনে ফেলেছি, সেটি হল মেকআপে রুম।
বিজেতা মন্ত্রী মহোদয় আয়নার সামনে বসে পড়েছেন। জনৈক মেকআপম্যান তাঁর মুখমণ্ডল নিয়ে বড় ব্যস্ত। ঘষা-মাজা চলছে। পোড়া হাঁড়ি মাজার কায়দায়। নানারকম মলম মালিশ করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে পাউডারের প্রলেপ পড়ছে। গায়ে একটা ছাপকা ছাপকা গাঢ় রঙের পাঞ্জাবি। আমাদের পাড়ায় একজন দাদের মলম ট্রেনে ট্রেনে বিক্রি করতে বেরোবার সময় এইরকম আলখাল্লা ধরনের জামা পরেন। মানুষের দৃষ্টি সহজে আকর্ষণ করার জন্যে। দাদের মলম আর রাজনীতি প্রায় একই বস্তু। দুটোই চুলকুনির ওষুধ। সারুক না সারুক, লাগিয়ে যাও।
বিজিত মন্ত্রী মহোদয় মুখটাকে তোলো হাঁড়ির মতো করে আর একটা চেয়ারে বসলেন। বেশ বোঝাই গেল দুজনে বিশেষ সদ্ভাব নেই। উনি বোধহয় রাজনীতির সুতো টানাটানিতে ইদানীং শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। ডানপাশে এলিয়ে পড়ে একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, দেরি করে ফেলেছেন দাদা, গাড়ি ব্রেকডাউন হয়েছিল বুঝি!
আমাদের মন্ত্রীও কোনও জবাব দিলেন না। আয়নায় নিজের মুখের দিকে রাগ রাগ চোখে তাকিয়ে রইলেন। পারলে চড় কষাতেন।
মেকআপম্যান বললেন, এই সাদা পাঞ্জাবি চলবে না।
মন্ত্রী দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, বাপ চলবে।
মেকআপম্যান বললেন, বাপস।
বাঁপাশের মন্ত্রী বললেন, ঠোঁটে একটু লিপস্টিক মাখলে মন্দ হয় না। চিত্রতারকারা মাখেন।
কালার টিভির হলে মাখিয়ে দিতুম স্যার।
আপনাদের এখানে হেয়ার ড্রেসার নেই?
আজ্ঞে না স্যার। আমাদের এখানে সব কিছু ফেসিয়াল। মুখের ওপরেই যত অত্যাচার।
আমার ঝুলপি ঠিক সেপে নেই। দাড়ি কামাতে গিয়ে ছোট বড় হয়ে গেছে।
আমাদের মন্ত্রী এদিকে বিদ্রোহ করে বসে আছেন, মুখে কিছু মেখেছে কি তোমাকে আমি মেরে তক্তা করে দোব।
মুখটা বড় তেলতেল করছে স্যার।
পুরুষ মানুষের মুখ তেলতেলেই হয়। ওটা স্বাস্থ্যের লক্ষণ। মেকআপ নেবে মেয়েমানুষ। বুঝেছ ছোকরা! মেয়েছেলের মুখে যা খুশি মাখাও।
অনুষ্ঠান পরিচালক পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন, হাত জোড় করে বললেন, স্যার, ক্যামেরার খাতিরে মুখটাকে একটু পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয়। তা না হলে আলো জাম্প করবে।
আমি আমার ভোটারদের খাতিরেই কিছু করিনি, তুমি আমাকে ক্যামেরা দেখাচ্ছ।
সবাই করে স্যার। রাজ্যপাল এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হালকা মেকআপ অ্যালাউ করেন। টিভিতে মুখটাই সব। টিভি-র মুখ রক্ষা করুন স্যার।
সরষের তেল ছাড়া আমি মুখে কিছু মাখি না।
এক দিন স্যার।
পাশের মন্ত্রী বললেন, আমি কী রকম লক্ষ্মী ছেলে দেখুন, সব মেখেছি। মুখের চেহারাই পালটে গেছে। উ: মুখে যে কত ময়লাই জমে। আমাদের মুখ নয় তো মুখোশ। আজ রিয়েল চেহারাটা জনসাধারণ দেখবে।
পরিচালক আমাদের মন্ত্রীকে বললেন, দেরি হয়ে যাচ্ছে স্যার।
মন্ত্রী মহোদয় এবার একটু টসকালেন, ঠিক আছে, সামান্য একটু লাগাও। আমার সিসটেমটা একটু অন্যরকম, নেচারস ন্যাচারাল বিইং। বিয়ের সময় মুখে একটু স্নো মেখেছিলুম, সারারাত ঘেমে মরি।
এখানে ঘাম হবে না স্যার। স্টুডিওতে শীতে কেঁপে মরতে হয়।
নাও, নাও, লাগাও, লাগাও।
মেকআপম্যান মন্ত্রীর মুখমণ্ডলে যথেচ্ছাচার শুরু করে দিলেন। সেই গল্পে পড়েছিলুম, রাজা একজনের কাছে মাথা নীচু করেন, তিনি হলেন ক্ষৌরকার। টিসু পেপার দিয়ে মুখ ঘষা হচ্ছে। তেল কালিতে কাগজ কালো হয়ে যাচ্ছে। ক্রিম আর পাউডার মাখিয়ে যখন তাঁকে ক্যামেরার উপযুক্ত করে ছেড়ে দেওয়া হল, তখন তিনি নিজের মুখ দেখে আনন্দে আটখানা! এত রূপ ছিল কোথায়! কলকাতার পলিউশনে চাপা ছিল।
আয়নায় মুখ দেখছেন আর বলছেন, রোজ একটু করে মাখলে বেশ হয়। আহা, এ-মুখ বউকে যদি একবার দেখাতে পারতুম।
মেকআপের ভদ্রলোক বললেন, এই তো তৈরি করে দিলুম। সাবধানে নিয়ে যান। কাল সকাল পর্যন্ত ঠিক থাকবে। অনুষ্ঠান পরিচালক বললেন, পাঞ্জাবিটা স্যার পালটালে বেশ হত। একটা গেরুয়া পাঞ্জাবি দিচ্ছি, দয়া করে পরুন।
আপনার ওই অনুরোধ আমি রাখতে পারছি না, ভেরি ভেরি সরি। আমি বাউল নই, মন্ত্রী।
সাদায় স্যার ভূতের মতো দেখাবে।
শাট আপ। আচ্ছা, আচ্ছা, অ্যাজ ইউ লাইক।
সদলে দুই মন্ত্রী স্টুডিয়োতে চলে গেলেন। আমরা ফেউয়ের দল। বাইরের অফিসঘরে বসে রইলুম। সামনে একটা মনিটার। পর্দায় ভেতরের খেলা দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রী রাগ রাগ মুখে গাঁট হয়ে বসে আছেন। আমার সেই জ্ঞানগর্ভ লেখাটি তাঁর হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কাগজ দেখে কেরামতি চলবে না। জীবন্ত আলোচনা। পশ্চিমবাংলার উন্নয়নে সোচ্চার চিন্তা। কোথা থেকে এক মডারেটার ধরে আনা হয়েছে। তিনি খুব কেতা মেরে একপাশে কেতরে বসে আছেন। কালো কার বাঁধা একটি করে স্পিকার বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার মতো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। জামার তলায়, বক্ষসংলগ্ন হয়ে আছে।
ফ্লোর ম্যানেজার অনুষ্ঠান পরিচালনায় বিভিন্ন সংকেত বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কলা দেখালে, স্টার্ট। চেটো বুদ্ধদেবের ভঙ্গিতে তুললে স্টপ। আঙুল দিয়ে লাট্টু ঘোরালে, আলোচনা গুটিয়ে আনুন। সময় শেষ হয়ে আসছে।
মডারেটার তেড়েফুঁড়ে ভূমিকা করলেন। পশ্চিমবাংলার অর্থনীতি আর লজ্জাবতী বধূর মতো মুখ ঢেকে নেই। আধুনিকার অসংকোচ পদক্ষেপে, গ্রাম থেকে জেলা শহরে, শহর থেকে রাজধানীতে, রাজধানী থেকে বিদেশে এগিয়ে চলেছে। উৎপাদন বেড়েছে, চারিদিকে হইহই পড়ে গেছে।
ভদ্রলোক দ্বিতীয় মন্ত্রীর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, কেমন করে আপনারা এই অসাধ্য সাধন করেন, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?
আমাদের মন্ত্রী সরোষে বললেন, ইনসালটিং। আগে আমাকে প্রশ্ন না করলে, আমি ওয়াক আউট করব।
অপর মন্ত্রী ব্যঙ্গের গলায় বললেন, ওয়াক আউট করাটা অপোজিশনের একচেটে কাজ। নিজের ভূমিকা ভুলে যাবেন না। মনে রাখবেন, বসে আছেন ট্রেজারি বেঞ্চে। আপনার অবশ্য দোষ নেই, কোয়ালিশনে না এলে, চিরকালই আপনাকে অপোজিশন বেঞ্চে বসতে হত।
ফ্লোর ম্যানেজার প্রাোডিউসার দুজনেই ধেই ধেই করে নাচছেন, স্টপ স্টপ।
আমাদের মন্ত্রী আসন ছেড়ে উঠে পড়েছেন। সদর্পে ওয়াক আউটের জন্যে প্রস্তুত। দ্বিতীয় মন্ত্রী ট্রেজারি বেঞ্চে বসে চিৎকার করছেন—শেম শেম।
অনুষ্ঠান পরিচালক বিব্রত মুখে বললেন, স্যার, এ অ্যাসেমব্লি নয়, টিভি-স্টুডিয়ো।
আমাদের মন্ত্রী বললেন, আমার একটা প্রেসটিজ আছে।
দ্বিতীয় মন্ত্রী বললেন, আমারও আছে।
আপনার দপ্তর ছোট, বনবিভাগ, আমার দপ্তর শিল্প।
বন বিভাগ ছোট? হাসালেন দাদা। পশ্চিমবঙ্গের অরণ্যভূমির মাপ জানা আছে মন্ত্রী মহোদয়?
পশ্চিমবাংলার ছোট-বড় শিল্পের সংখ্যা কি আপনার জানা আছে?
আরে মশাই, শিল্প বড় না অরণ্য বড়! কাঁচামাল না দিলে আপনার শিল্প তো লাটে উঠবে।
পরিচালক বললেন, ছেলেমানুষি হয়ে যাচ্ছে স্যার।
আমাদের মন্ত্রী এক দাবড়ানি দিলেন, চুপ করুন আপনি। আমাদের ব্যাপার, আমাদের ফয়সলা করতে দিন।
তা হলে, আপনাদের এই তরজাটাই রেকর্ড করেনি। জমবে ভালো।
স্টেশান ডিরেকটার ছুটে এলেন। এ সমস্যার কী সমাধান। এ তো নির্বাচনের আগে, আসন ভাগাভাগির চেয়েও জটিল ব্যাপার।
ফ্লোর ম্যানেজার বললেন, কোরাসে উত্তর দিলে কেমন হয়। সমবেত সংগীত যখন হয় সমবেত প্রশ্নোত্তর কেন হবে না?
যেমন ধরুন, প্রশ্ন যদি হয়, পশ্চিমবাংলার এই অভূতপূর্ব উন্নতি কীভাবে সম্ভব হল? ওঁরা দুজনেই একসঙ্গে উত্তর দিলেন, আমাদের সুশাসনে।
আমাদের মন্ত্রী কটমট করে তাকিয়ে বললেন, ইয়ারকি হচ্ছে? মন্ত্রীর সঙ্গে ইয়ারকি। জানো তোমার চাকরি খেয়ে ফেলতি পারি!
পারেন স্যার, তবে বদহজম হবে।
অ্যাঁ কী বললে?
স্টেশান ডিরেকটার বললেন, আচ্ছা ফাঁপরে পড়া গেল দেখছি।
দ্বিতীয় মন্ত্রী পা নাচাতে নাচাতে বললেন, একটা জিনিস বুঝতে পারছিস না, মধু তো আমার অরণ্যসম্পদ।
আমাদের মন্ত্রী বললেন, তোমার বাপের সম্পদ।
অবজেকশন, অবজকেসান, মাননীয় স্পিকার, ও, এটা তো আবার অ্যাসেমব্লি নয়।
আমাদের মন্ত্রী নিজেকে সংযত করে বললেন, মধু দুরকমের, এক, বনের মধু, সেটা মধুই নয়, তার ওপর আমার কোনও কনট্রোল নেই। দুই চাষের মধু, সেটাই হল আসল মধু, গ্রামীণ শিল্পের মধু। ইচ্ছে করলে আমি উৎপাদন বাড়াতে পারি, আমি উৎপাদন কমাতে পারি।
ও:, রাজা ক্যানিউট রে। দিস ফার অ্যান্ড নো ফারদার।
শুনলেন। আপনারা শুনলেন।
ডিরেকটার বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ, হাড়ে হাড়ে টের পেলুম, বাঘ আর গরুকে এক ঘাটে জল খাওয়াবার ক্ষমতা নেই।
দুই মন্ত্রী কোরাসে বললেন, কে বাঘ, কে গরু?
কোরাস উনি বলেন আমি বাঘ, উনি বলেন আমি বাঘ।
ইনি বলেন ওটা গরু, উনি বলেন ওটা গরু।
ডিরেকটার বললেন, আপনারা দুজনেই বাঘ, আর একই জঙ্গলে দুটো বাঘ থাকতে পারে না। প্রাোগ্রাম ক্যানসেলড।
*
ঘাড় চুলকে, মুখ কাঁচুমাচু করে একদিন বলেই ফেললুম, স্যার, আমার একটা প্রমোশন দীর্ঘদিন দরকচা মেরে রয়েছে, পাকছে না, ফাটছে না, বসছে না। বড় কষ্ট পাচ্ছি।
মন্ত্রী মহোদয় সবে খানাপিনা সেরে এসেছেন। মেজাজে বসন্তের বাতাস বইছে, কোকিল ডাকছে কুহু স্বরে। দাঁতখোঁচাটা ওয়েস্ট পেপার বাসকেটে ফেলে দিয়ে বেশ ভাবুক ভাবুক মুখে বললেন, কোন হারামজাদা চেপে রেখেছে?
জানি না স্যার।
অপদার্থ। জেনে আমাকে জানাও। কমপ্রেস আর তোকমারি একসঙ্গে লাগাতে হবে। তোমার তিন হাজার টাকা মাইনে হওয়া উচিত।
বুকটা কেমন করে উঠল। তিন হাজার মাইনে হলে রোজ মাছ খাব। চারা নয়, বেশ পাকা পোনা। সকাল বিকেল। সন্তাহে তিনদিন মুরগি চালাব। রোজ সকালে হাফবয়েল, পুরু মাখন দিয়ে দুপিস রুটি। রাতের দিকে বাড়িতেই একটু ঢুকু ঢুকু। গালগলায় তিনথাক মাংস নেমে যাবে! আর ইডেনে আগাছার জঙ্গলে বসে যে ইভটিকে গত তিন বছর ধরে বলে আসছি—একটু অপেক্ষা করো, একটু অপেক্ষা করো, সবুরে কাবুলি মেওয়া ফলে, তাকে টেনে তুলে আনব ঘরে। সেই অভাগীর জন্যে কম রোদ পুড়েছি, জলে ভিজেছি! কাকে ব্রহ্মতালুতে বড় বাইরে করে করে, উত্তাপে চাকরী মাপের একটা টাকই তৈরি করে দিলে। সেদিন অন্ধকারে ঝোপের আড়ালে বসে দুজনে হাতে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি আর তারা গুনছি, এমন সময়কে একজন প্রেমঘাতক ঝোপের ওপাশে ছোট বাইরে করতে লাগল। কী তার তেজ? আখের রস, কি বিয়ার খাওয়া মাল। পিঠ ফুঁড়ে যাচ্ছে। ওঠার উপায় নেই। এমনভাবে বসেছিলুম দুজনে আইনের ভাষায় যাকে বলে, কমপ্রাোমাইজিং পজিশন। কলকাতার মানুষের তো কোনও আক্কেল নেই। হত হাউড পার্ক! এ শহরে হাইডিং হাইডিং চলে সব, কেবল হাইড পার্কটা নেই। সেই প্রথম শীতের ভূতঘাটে গিয়ে ছোট বাইরে স্নাত প্রেম-কান্তিকে গঙ্গাবারি ধৌত করে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে প্রশ্নবাণ, ভিজে এলি কোথা থেকে? প্রেমে আর রণে অনৃত ভাষণ অ্যালাউড। অম্লানবদনে বলতে হল, রিটারনিং ফ্রম বার্নিং ঘাট। এক সহকর্মী হঠাৎ পটল তুললেন। এই তো মানুষের জীবন মা। এই আছে এই নেই। মা অমনি কোথা থেকে একমুঠো নিমপাতা এনে বললেন, চিবিয়ে খা। রাত সাড়ে দশটার সময় বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে প্রেমানন্দে নিমপাতা চর্বণ। অহো, এই বদান্য মন্ত্রী মহোদয়ের জাঁকে সেই প্রেম এবার কার্বাইড পাকা হবে। রাতে বাড়ি ফিরে আর নিমপাতা নয়, স্ত্রীর সেবা। লং লিভ এই গভরমেন্ট।
তা হলে?
বলুন স্যার?
খুশি তো। প্রমোশন হোক না হোক, তোমার ইভ্যালুয়েশন হয়ে গেল। তিন হাজার। তিন হাজারের এক পয়সাও কম নয়?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বড় আনন্দ হচ্ছে।
তবে আর কী! এই আনন্দেই একটা কাজ সেরে ফ্যালো।
বলুন স্যার। আপনার জন্যে আমি সব করতে পারি। আই লাভ ইউ। আর একটু হলেই ডার্লিং শব্দটা বেরিয়ে পড়েছিল। কী দু:সাহস আমার!
মন্ত্রী মহোদয় অবাক হয়ে আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, অবাক করলে ছোকরা। আমাকে তুমি প্রেম নিবেদন করছ। আমাকে সবাই দুর্বাসা বলে। কত কী যে ভস্ম করেছি। আচ্ছা শোনো, একটু গোবরের খবর নাও তো।
গোবর স্যার?
হ্যাঁ স্যার। দুটো জেলা আগে ধরো। হুগলি আর চব্বিশ পরগনা। দুটো জেলায় কত গোবর উৎপাদন হয়।
গোবর আবার উৎপাদন হয় নাকি। সে তো গরুতে ঘ্যাস ঘ্যাস করে নাদে।
গর্দভ। সেটাও একটা উৎপাদন। তুমি করবে কী, লেটেস্ট সেনসাস থেকে ক্যাটল পপুলেশনটি বের করবে। করে, একটা স্যাম্পল সারভে করবে।
সে আবার কী জিনিস?
তুমি প্রত্যেকে জেলায় টেন পারসেন্ট গরুকে মিট করবে। গরুর মালিককে জিগ্যেস করবে, আপনার গরু দিনে কতবার মলত্যাগ করে। এক এক গরুর, এক এক হ্যাবিট। দেখবে মানুষের মতোই। আমার যেমন।
আপনার গরু আছে স্যার?
তুমি একটা গরু। আমি মানে আমি। আমার সকালে একবার, রাত্রে একবার। তোমার কতবার?
আজ্ঞে, আমার বারবার।
তোমার অ্যামিবায়োসিস, জিয়ার্ডিয়াসিস আছে।
ওই স্যার তিন হাজার টাকা হলে রোজ চিকেন ব্রথ খাব, ঠিক হয়ে যাবে। হবে তো স্যার!
ও, সিওর। তা গরুরও ওইরকম। তুমি একটা অ্যাভারেজ করবে। অ্যাভরেজ এল হয়তো ওই জেলার গরু দিনে চারবার করে। এইবার তুমি কী করবে?
কী স্যার?
যে কোনও একটা গরু, মোটামুটি স্বাস্থ্যবান গরুর পেছু নেবে। অ্যাজ ইফ তুমি একটা ষাঁড়। ফলো করতে করতে, ফলো করতে করতে, যেই সে ঘ্যাস করে করল, অমনি তুমি স্যাম্পলটা কালেক্ট করে নিলে।
ঘেন্না করবে স্যার।
অ্যা: ঘেন্না করবে? ওরে আমার ঘুঁটেকুড়ুনির ব্যাটা।
মন্ত্রী মুখ ভেঙালেন। তৎক্ষণাৎ রইল তোর চাকরি বলে উঠে আসতে ইচ্ছে করছিল। স্রেফ তিন হাজার টাকার গাজরের লোভে জেনুইন গাধার মতো হাসি হাসি মুখে বসে রইলুম।
পশ্চিমবাংলার সব বাঙালি মেয়েই এক সময় ঘুঁটে দিতে। ঘুঁটে না দিলে শাশুড়িরা গালে নিমঠোনা মারত।
নিমঠোনা কী জিনিস! জিগ্যেস করার সাহস হল না। কেঁচো খুড়তে সাপ বেরুবে।
আমার মা স্যার ঘুঁটে দিতেন না।
তাঁর মা দিতেন। যত অতীতে পেছবে, দেখবে গরু আর ভড়ভড়ে গোবর। গোবরেই না আমাদের মতো পদ্ম ফুটেছে। খোঁজ নিয়ে দ্যাখো, তোমার ঠাকুরদা মৃত্যুর আগে গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। তোমরা কি জমিদার ছিলে?
না স্যার, জমিদাররা কি চাকরি করে!
আমরা ছিলুম। আমার ঠাকুরদা সঙ্গে গোবরের গুলি নিয়ে ঘুরতেন। এ পকেটে গোবরের গুলি, ও পকেটে আফিমের গুলি। একটা করে পাপ কাজ করতেন, আর সঙ্গে সঙ্গে একগুলি গোবর, একগুলি আফিম মুখে দিয়ে পোস্ট করতেন। এখন তিনি স্বর্গে ডেলিভারি হয়ে গেছেন। তোমার মাথায় কী আছে?
আজ্ঞে বুদ্ধি।
তুমি বুঝি তাই মনে করো? গোবর আছে, গোবর।
না, আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ। (না বললেই তিন হাজারের স্বপ্ন ফুস)
আচ্ছা, গোবরটা তুমি কালেক্ট করলে। করলে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
এইবার ওজন করো। ধরো দু-কেজি হল। তা হলে কী হল, টোটাল গরু ইনটু টু ইজ ইকোয়াল টু টোটাল অ্যাভেলেবিলিটি অফ কাউডাং ইন দি ডিসট্রিক্ট। ক্লিয়ার?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ক্লিয়ার।
তা হলে, বেরিয়ে পড়ো।
আজই স্যার।
না, কাল থেকে। তোমাকে সাতদিন সময় দেওয়া হল।
গোবর কী হবে স্যার? ঘুঁটে ইনড্রাস্ট্রি!
তোমার মাথা! গোবর গ্যাস তৈরি হবে। সেই গ্যাসে গ্রামের ঘরে ঘরে আলো জ্বলবে, রান্না হবে। মাঠে সার হয়ে ফিরে যাওয়ার আগে, টন টন গোবরের কাছ থেকে আমরা গ্যাসটুকু আদায় করে নোব। একে বলে প্ল্যানিং। পশ্চিমবাংলাকে দেখিয়ে দোব, আমরা কী করতে পারি, আর কী পারি না। এক মাসের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তত ছটা গোবর গ্যাস প্ল্যান্ট আমি বসাবোই। সেন্ট্রাল প্রচুর টাকা স্যাংশান করেছে। সে টাকা ফিরে না যায়। দেশের মানুষ কাজ চায়, কাজ। শুধু গলাবাজিতে কিছু হয় না।
মন্ত্রী মহোদয় ফোন তুলে বললেন, কানাইকে দাও।
ফোন নামিয়ে রেখে বললেন, হিসেবে কোনও কারচুপি কোরো না তাহলেই প্ল্যান ভেস্তে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে তুমিও যাবে। এ ব্যাপারে তোমাকে ডি.এম-রা সাহায্য করবেন।
ফোন বেজে উঠল।
কে, কানাই? আমার ছকটা দেখলে! দেখছ? কী বললে, মঙ্গল। হ্যাঁ হ্যাঁ মঙ্গল অমঙ্গল করবে? রাসকেল। না না, তুমি রাসকেল নও, দ্যাট ব্লাডি মঙ্গল। তা ও ব্যাটাকে একটু ঠান্ডা কর। গাড়ি চাপা বন্ধ করব? এবার তুমি রাসকেল। ইলেকশন এসে গেল। এখন তো ঘুরতেই হবে। লাল? হ্যাঁ হ্যাঁ লাল। না, একটা লাল কলম ছাড়া আর কিছু নেই। ইডিয়েট! লাল ল্যাঙোট পরতে যাব কোন দু:খে! আমি কি কুস্তিগীর। না, তোমার বউদির ঠোঁটে লাল নেই। ঘরে? দাঁড়াও দেখি। হ্যাঁ হ্যাঁ চেয়ারের গদি লাল বটে। হ্যাঁ হ্যাঁ, এখুনি ছিঁড়ে ফর্দাফাই করে দিচ্ছি। জানি না কোন রাসকেলের কাজ, সে ব্যাটার চাকরি খাব। কী বললে, খাওয়াদাওয়া কম করব! ইডিয়েট! আমি চাকরি খাবার কথা বলছি। চাকরি গেলে গলায় কাঁটা ফুটবে কেন? এ কি চারা পোনা ভেবেছ? না না, ইলেকসান পর্যন্ত বোনলেস ভেটকি আর চিকেনেই চালিয়ে নোব। ফিরে আসছি তো? আসছি। তোমার মুখে ফুলচন্দন। কী বললে, মারা না গেলে মৃত্যুর কথা আসছে কেন? আজই থরো চেক আপ, অ্যাকসিডেন্ট! মরেছে। গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি, ও গাড়ি! গেরুয়া রঙের গাড়ি পাব কোথায়? পলা? হ্যাঁ হ্যাঁ, পলা তো আমার আঙুলেই আছে। কত বড়? একটা বড় সাইজের সুপুরির মতো? ও, রাস্তায় বেরোবার সময় প্রথমে ডান পা ফেলব? তাই ফেলব। যদি মনে থাকে।
মন্ত্রী মহোদয় ফোন নামিয়ে রাখলেন।
তাহলে স্যার সাতদিন আপনার কাজে আমাকে যাতে ছাড়া হয় অফিসকে একটু বলে দেবেন।
কীইই?
মন্ত্রীর বিস্ফোরণ।
আমার কাজে অফিসের অনুমতি? আমি বড় না অফিস বড়?
আজ্ঞে আপনি।
যদি প্রশ্ন করতেন, আমি বড় না ঈশ্বর? আমি বলতুম আপনি। সামান্য তেলে যদি তিন হাজারের মাচায় একবার উঠতে পারি, আমাকে আর পায় কে? সেই সিগারেটের বিজ্ঞাপন—মিনিস্টার মে কাম, মিনিস্টার মে গো, আমলাজ উইল গো ফর এভার।
দুর্গা, শ্রীহরি বলে বাঘের সামনে থেকে সরে পড়া গেল। বেশি কচলালে লেবু তেতো হয়ে যায়। বেশি তেলে হড়হড়ে। হড়কে বেরিয়ে যাবে। সাপ নিয়ে খেলা। ওঝার মৃত্যু সাপের হাতে। এই গোবরেই না গেঁজিয়ে যাই। প্রকৃতই যদি ষাঁড় হতে পারতুম, তা হলে গরুর খবর আমার চেয়ে কে আর ভালো জানত? আহা মানবসন্তান না হয়ে যদি গোমাতার গর্ভে এঁড়ে হয়ে জন্মাতুম!
হুগলি এক বিশাল জেলা। গরু-সমীক্ষায় এর কোন অংশে ল্যান্ড করব ভেবেই পেলুম না। মাথায় ধরব, না পায়ে ধরব, না হাতে ধরব! এত বড় একটা কাজ! ধান নয়, গম নয়, গোবরের প্রাপকতা?
বিমল বলেছিল, গরু না হলে কেউ গোবরের কথা এত ভাবে! পাড়ার একটা গরু ধর। পেটে গোটাকতক ঘুসি মার। মাল অটোমেটিক পড়বে। তাকিয়ে দেখ। চোখের দেখায় ওজন পেয়ে যাবি।
গোবর সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই নেই রে। হিসেবে সামান্য ভুল হলেই আমার বারোটা বেজে যাবে।
তা হলে মর।
মরতে হলে ডি এম-এর কাছেই মরা ভালো। সকাল এগারোটায় সময়ে ডি এম-এর দপ্তরে হাজির। মানুষটি ভালো। ভেবেছিলুম খ্যাঁক করে উঠবেন। না, বেশ হেসে হেসেই বললেন, ভদ্রলোকের ছেলে, এ কী গেরো বলুন তো!
আজ্ঞে হ্যাঁ, তা যা বলেছেন। গোবর যে এত মূল্যবান কে জানত! আপনি আমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?
কীভাবে কী করা যায়? মন্ত্রী বলেছেন টেন পারসেন্ট গরুর গোবর চেক করে একটা অ্যাভারেজ বের করতে হবে।
আপনি যেমন, আপনার মন্ত্রীও তেমন। হতেছে পাগলের মেলা খ্যাপাতে খেপিতে মিলে। আমরা মরেছি আমাদের জ্বালায়। রোজ তিন-চারটে করে পলিটিক্যাল লাঠালাঠি হচ্ছে। মাঠে-ঘাটে মানুষের লাশ গড়াচ্ছে, সেই সময় আপনি এলেন গোবরগণেশ হয়ে। সাতসকালে আর জ্বালাবেন না তো!
কানে আঙুল দিয়ে বসেছিলুম। পতি নিন্দা শোনাও পাপ। আহা, ওই হল আর কী। তুমি হো পিতা, তুমি হো মাতা, সখা তুমি হো, কী যেন একটা গান আছে এই রকম। জেলা অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়লুম। একেবারে পণ্ডশ্রম হল তা বলব না। এইটুকু বোঝা গেল, গণ্ডায় আন্ডা মেলালে জেলা অফিস ক্যাঁক করে চেপে ধরবে না।
দোকানে চা খেতে খেতে মাথায় একটা মগজের ঢেউ খেলে গেল। শ্রীরামপুরের কাছে আমার এক বন্ধু আছে। জমিদারের ছেলে। সেই সুসিতের কাছে গেলে সমস্যার হয়তো সমাধান হবে। ওদের গোটা কতক গরু আছে। সুসিত কি এই সময়ে বাড়িতে থাকবে! দেখা যাক চেষ্টা করে।
সুসিত বাড়িতেই ছিল। সবে চান সেরেছে। খেতে বসবে আর কী! একটা পাঁচের ট্রেন ধরে কলকাতায় আসবে। ব্যাবসা করে। স্বাধীন মানুষ। আমাদের মতো গোলাম নয়।
সুসিত বললে, আমাদের তিনটে গরু আছে তবে তারা তো সব জার্সি।
সে আবার কী? জার্সি তো ফুটবল খেলোয়াড়রা পরে।
আরে, না রে বাবা, জার্সি হল বিলিতি গরু। এক একবার পনেরো কেজি দুধ নামায়।
তা নামাক। প্রাত:কৃত্য করে তো?
তা করে। তবে কোয়ানটিটি দিশি গরুর মতো হবে না। সায়েব গরু তো, সায়েবের মতো সিসটেম। একটু কম করে।
তুই ভাই আমাকে বাঁচা। একটু করতে বল, ওজনটা দেখতে হবে। তারপর একটু এদিক সেদিক করে নিলেই বিলিতি গোবর দিশি গোবর হয়ে যাবে।
তা হলে অপেক্ষা কর, করলেই আমি খবর পাঠাতে বলছি।
তোর দাড়িপাল্লা আছে?
সুসিতের কলকাতা যাওয়ার বারোটা বেজে গেল। দুজনে ভরপেট খেয়ে বৈঠকখানায় বসে আছি। কখন গরু দয়া করে একটু করবে। বেলা প্রায় তিনটে বাজল। বিকেলের চা এসে গেল।
কী রে সুসিত, তোর গরুর কী হল?
দাঁড়া দেখে আসি।
সুসিত ফিরে এসে বললে, গরুর বোধহয় কনসটিপেশন হয়েছে মাইরি।
সে কী রে!
খাচ্ছে কিন্তু ছাড়ছে না!
তা হলে দুধে কনসটিপেশন বল?
না তা নয়, দুধ তো গ্ল্যান্ডের ব্যাপার।
তা হলে কী হবে?
তোর তো সাতদিন সময় আছে। আজ বরং সন্ধ্যার দিকে জোলাপ খাইয়ে রাখি। তুই কাল সকালের দিকে আয়।
জোলাপের দাস্তে তো হিসেব মিলবে না রে?
আরে বিলিতি, জোলাপ খেয়ে যা করবে, দিশি তা এমনি করবে।
হঠাৎ ভেতর বাড়িতে উল্লাসের ধ্বনি শোনা গেল, করেছে করেছে। শিশু-কণ্ঠের চিৎকার, মেজকা, গরু পায়খানা করেছে, শিগগির এসো, শিগগির এসো।
আমরা দুজনে শেষ চুমুকের চা ফেলে দৌড়লুম। সুসিতের গোয়ালে ফনফন করে পাখা ঘুরছে। তিনটে অদ্ভুত চেহারার জন্তু বাঁধা রয়েছে।
সুসিত, এরা কি সত্যিই গরু?
আজ্ঞে হঁ্যা, সায়েব গরু। দেখছিস না, গোয়ালে পাখা ফিট করেছি।
তিনটে গরুর মেমসায়েবের মত নাম, শেলি, রুবি, লিলি। শেলি নেদেছে। একপাশে পোয়াটাক মাল পড়ে আছে।
সুসিতের মা বললেন এ গরুর বাবা একটাই দোষ, একেবারে বিলিতি স্বভাব। দুধ বেশি, গোবর কম। তেমন ঘুঁটে হয় না।
তা মাসিমা, দিশি গরু এক একবারে কতটা দেয়?
কী, দুধ?
আজ্ঞে না, গোবর।
তা ধরো তিন-চার কেজি তো হবেই।
দিনে কবার?
সে বাবা এক এক গরুর এক এক স্বভাব। আমার এই মেজো ছেলে সুসিত, দিনে সাত-আটবার—সুসিত বললে, আ:, মা, হচ্ছে গরুর কথা, তুমি আমাকে ধরে টানাটানি করছ কেন?
টানাটানি করব কেন? আমি বলছি, মানুষের মতোই কোনও গরু সকাল সন্ধে দুবার, ঠিক তোর বাবার মতো। কোনও গরু তোর মতো বারবার।
ল অফ অ্যাভারেজ সাধে শিখেছি। যার কল্যাণে টাটা-বিড়লার রোজগার আমাদের ঘাড়ে চেপে পারক্যাপিটা ইনকাম হয়ে যায়। ল অফ অ্যাভারেজে সুসিতের বৈঠকখানায় বসে বেরুল, গরু দিনে চারবার করে, এক একবারে তিন কেজি। এইবার সেনসাস রিপোর্ট দেখে গরুর সংখ্যা বের করে মারো গুণ। যদি হাজার দশেক গরু থাকে, দশ হাজার ইনটু বারো। বাপস, হুগলি তো গোবরে নেবড়ে আছে রে বাবা!
সুসিতের ওখান থেকে বেরোবার পর বেশ খুশি খুশি লাগল। একটা ফর্মুলা আয়ত্তে এলে অঙ্ক কষা সহজ হয়ে যায়। পরীক্ষায় ফেল করার ভয় থাকে না। এখন আমি সব জেলার গোবর সেকেন্ডে বের করে দিতে পারি। গরু গুণিতক বারো সমান সেই জেলার গোবর। আর আমাকে পায় কে! আ-যাও মেরা মন্ত্রী! তিন হাজর আমার হাতের মুঠোয়।
শ্রীরামপুরের বাজারে ফার্স্টক্লাস আম উঠেছে। পেয়ারাফুলির দেশ। পেয়ারাফুলি ছাড়াও, তাজা ল্যাংড়ার ছড়াছড়ি। তিন হাজার তো হবেই। খোদ মন্ত্রী হামারা হাত কা মুঠঠিমে। সারা পশ্চিমবাংলার গোবরের হিসেব আমার বুক পকেটে। আয় শালা, লড়ে যাই।
বেশ তাজা ল্যাংড়া নিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে গৃহপ্রবেশ। সন্ধে হয়ে গেছে। বাতাসে বসন্ত ছেড়েছে। যদিও এখন বসন্ত নয়, বর্ষা এল বলে। মেজাজ ভীষণ খুশি খুশি। পুরোনো দেওয়ালের সব প্ল্যাস্টার ফেলে দোব। নতুন প্ল্যাস্টারের সবুজ ডিসটেম্পার বিজলির আলোয় মিটিমিটি হাসবে। নহবতের সুরে রাঙা শাড়ি পরে তিনি আসবেন। তিন হাজার। কিন্তু কোন পোস্টে তিন হাজার মাইনে হবে! খোদ বড় কর্তারও তো তিন হাজার হয় না। হয় কি? কে জানে বাবা! সে মন্ত্রী বুঝবেন। দ্যাটস নট মাই হেডেক।
খাওয়াদাওয়া হয়ে গেল, রাত প্রায় এগারোটা। গরমের রাত, পাড়া তাই সরগরম। শুয়ে শুয়ে বই পড়ছি। খাবার ঘরে এখনও হল্লা চলেছে। মা আছেন, আমার বোনটা আছে। দেখে এসেছি জানালায় চেন দিয়ে বাঁধা আছে আমাদের মাস তিনেক বয়সের কুকুর, টম। আমার বোন কোথা থেকে নিয়ে এসেছে। অ্যালশেসিয়াম বলে এনেছিল, নেড়িও হতে পারে।
ওপাড়ায় খুব একটা মজা চলেছে। মাঝে মাঝে হাসিতে সব ভেঙে পড়ছে। তিন হাজার এখনও হয়নি। তাইতেই বাড়িতে হাসির ফোয়ারা ছুটছে। হলে কী হবে! সকাল সন্ধে সানাই বাজবে। হঠাৎ আমার বোন ডাকল, দাদা, দেখবি আয়, দেখবি আয়।
দেখার মতোই ব্যাপার!
ব্যাটা কুকুর। জন্মে থেকে শুধু ছাঁটাই খেয়ে আসছে। সেই মুখে পড়েছে ল্যাংড়া আমের টুকরো। তিন টুকরো খেয়ে সামনে থাবা গেড়ে বসে কান খাড়া করে জিব চোকাচ্ছে। আমার বোন তারিয়ে তারিয়ে আঁটি চুষছে। চেনে বাঁধা তাই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছে না। ভুক ভুক করছে আর নেচে নেচে উঠছে। জার্মান সায়েব আমের জন্যে পাগল।
আমার বোন আঁটিটা ছুঁড়ে দিল।
কুকুর আঁটিটা মুখ দিয়ে ধরে আর আঁটি পিছলে চলে যায় নাগালের বাইরে।
দাদা, ঠেলে দে, ঠেলে দে।
একবার দিলুম। আঁটি আবার পিছলে চলে এল।
আবার দিলুম। আবার চলে এল।
আঁটি তো হাড় নয়। পিচ্ছিল জিনিস। কুকুরটার অবস্থা ঠিক আমার প্রাোমোশনের মতো। নাগালে আসে, আবার পিছলে চলে যায়। টম আমার মতোই খেপে উঠেছে।
বার তিনেক হাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে দিয়েছি। কুকুরটা ইতিমধ্যেই বদ মেজাজের জন্যে বিখ্যাত। যা করছি দূর থেকে। চতুর্থবারে, কীভাবে যেন আমার ডান হাতের চেটোর উলটো পিঠটা তার কামড়ের সীমানায় চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘ্যাঁক।
ধরেই ছেড়ে দিল। দিলে কী হবে, ওইতেই যা হওয়ার তাই হয়ে গেল। খানিকটা মাংস কুদলে ওপর দিকে ঠেলে উঠল। হাতের ওপর দিয়ে যেন পাওয়ার টিলার চলে গেল। ওদিকে ল্যাংড়ার চকলা, এদিকে হাতের চকলা।
যে কুকুরকে আম খাওয়ানোর জন্যে সবাই ব্যস্ত হচ্ছিল, তাকে এবার জুতো খাওয়াবার জন্যে তেড়ে উঠল। সে বেচারা বুঝেছে, কাজটা খুব অন্যায় হয়ে গেছে। যে হাত তিন হাজার আনবে সেই হাতে কামড়! কোণের দিকে ভয়ে বসে আছে।
এদিকে আমার পুরো হাত চড়চড় করে ফুলছে।
মেরে কী হবে। অন্যায় করে ফেলেছে, অবলা জীব। এত রাতে ডাক্তার পাই কোথায়।
একটিমাত্র ডিসপেনসারি খোলা ছিল। তেমন নামডাকঅলা কেউ নয়। ঠেকা দেনেঅলা এল এম এফ। পরে এম বি হয়েছেন। বসে বসে সারাদিনের হিসেব মেলাচ্ছিলেন। কম্পাউন্ডার ঝাঁপ বন্ধ করার জন্যে ব্যস্ত।
আমি ঢুকে বলেছি সবে, ডাক্তারবাবু, আমাকে কুকুরে—
দুটো হাত ওপর দিকে তুলে ডাক্তার জাম্প করলেন, ওরে বাপরে, আমি কুকুর নই, ও এখানে হবে না, এখানে হবে না, হাসপাতালে যান, হাসপাতালে যান।
ক্যাশ বাক্স ছেড়ে ডাক্তারবাবু একলাফে রাস্তায় বেরিয়ে গেলেন। এমন আতঙ্কের কী কারণ বোঝা গেল না। কুকুরের কামড় খাওয়া মানুষ কী খ্যাপা কুকুর! জলাতঙ্ক রোগ ছড়াতে এসেছি! কম্পাউন্ডারবাবুকে মাস্তানের গলায় বললুম, যা বলছি, তাই করুন। বেশ খানিকটা তুলো বের করুন। ডাক্তারবাবু চেয়ে সাহসী মানুষ বলেই মনে হল।
নিন, চেপে ধরুন। বেশ করে চাপ দিয়ে ফোলাটাকে থেবড়ে দিন।
বিজ বিজ করে শব্দ হচ্ছে। ব্যাটা টম হাতটাকে বেশ জখম করে দিয়েছে।
নিন, এবার কার্বনিল ঢালুন। আরে মশাই যন্ত্রণা আমার হবে, আপনি অত কাতর হচ্ছেন কেন? নিন, এবার যে কোনও একটা মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিন।
কম্পাউন্ডবাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, কাল থেকেই তলপেটে চোদ্দোটা ইনজেকশন নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। জলাতঙ্ক হলে আর বাঁচবেন না।
কালকের কথা কালকে, এখন একটু টেটভ্যাক ছাড়ুন। আর গোটাকতক পেনিসিলিন ট্যাবলেট দিন।
সারারাত যন্ত্রণায় ছটফট! কেন মরতে তিন হাজার টাকার আনন্দে ল্যাংড়া কিনে মরেছিলুম।
সকালেই ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের কাছে দৌড়োলুম। তিনি আবার আর এক কাঠি ওপরে যান। টিপেটুপে বললেন, এ:, গ্যাসগ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে হে। হাতটা না অ্যামপুট করতে হয়।
সে কী!
তাই তো মনে হচ্ছে।
আমি যে লিখে খাই।
বাঁ হাতে অভ্যাস করতে হবে। অভ্যাসে কী না হয়। অনেকে পা দিয়ে লেখে।
তলপেটে ফুঁড়তে হবে?
বাড়ির কুকুর তো!
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তা হলে প্রয়োজন হবে না।
এরপর যিনিই দেখেন, তিনিই প্রশ্ন করেন, হাতে আবার কী হল?
কুকুর কামড়েছে।
সর্বনাশ! ইনজেকশন নিয়েছ?
দরকার হবে না। বাড়ির কুকুর।
ওই আনন্দেই মরো। কে বলেছে তোমাকে, নিতে হবে না?
আমাদের ডাক্তারবাবু।
কিস্যু জানে না। মানুষমারা ডাক্তার। পাস্তুরে চলে যাও।
একজন আবার রাস্তার কলের পাশে জমা জল দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন, কী, আতঙ্ক হচ্ছে?
আজ্ঞে না।
আজ না হোক কাল হবে।
হঠাৎ পা মাড়িয়ে দিলেন, উ: করে উঠলুম।
হঠাৎ পা মাড়ালেন।
না হে পরীক্ষা করে দেখলুম, কেঁউ কেঁউ করো কি না!
ব্যান্ডেজ বাঁধা ডান হাত বুকের কাছে ঝুলছে। গাংগ্রিন শুনেছি, গ্যাসগ্যাংগ্রিন কাকে বলে জানি না। এদিকে গোবরের রিপোর্ট একটা লিখতে হবে। চব্বিশ পরগনার ডি এমের সঙ্গেও একবার দেখা করা দরকার। বুড়িটা অন্তত ছুঁয়ে রাখতে হবে।
বাসে একজন জিগ্যেস করলেন, হাতে কী হল হে!
কুকুরে কামড়েছে শুনে বেশ যেন আনন্দ পেলেন। আমাকেও কামড়েছিল হে! ওয়ানস আপন এ টাইম, আই ওয়াজ এ প্রাইভেট টিউটার—বলে শুরু করলেন। যে বাড়িতে পড়াতেন, সেই বাড়িতে একটা কুকুর ছিল। শুয়ে থাকত টেবিলের তলায়। একদিন চটি পরতে গিয়ে ন্যাজে পা লাগায়, ন্যাজের অপমানে খাঁক করে কামড়ে দিলে। তারপর ভাই পাস্তুরে গিয়ে ইনজেকশন। এই এত বড় সিরিঞ্জ! লাইনে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ পড়ছি। সামনের দিক থেকে এক একজন করে যাচ্ছেন, আর চিৎকার করে উঠছেন—বাবা রে!
বেয়নেট চার্জ শুনেছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, যুদ্ধে হয়।
এই ইনজেকশনও দেওয়া হয় ওই কায়দায়। দু-হাতে সিরিঞ্জ বাগিয়ে, দূর থেকে ছুটে এসে তলপেটে ফাঁস। আমার সামনে আর মাত্র তিনজন। ভয়ে গা-হাত-পা কাঁপছে। এক-পা এক-পা করে লাইন থেকে সরছি। ইচ্ছে পাশে সরে গিয়ে দে ছুট। পেছন থেকে একজন বললেন, ব্যাটা পালাচ্ছে! আর যায় কোথায়? সবাই মিলে জাপটে ধরে পেড়ে ফেললে। ওঁরা সকলেই ন্যাজকাটা শেয়াল। আমার ন্যাজটিও কাটিয়ে ছাড়ালে? সে যে কী যন্ত্রণা! তা তুমি কবে নিচ্ছ?
আমি নোব না। কামড়েছে বাড়ির কুকুর।
নেবে না মানে! আমি এজেন্ট, স্টেট ব্যাংক, গড়িয়াহাট ব্রাঞ্চ বলছি, বাড়িরই হোক আর রাস্তারই হোক ইনজেকশন ইজ এ মাস্ট।
কুকুর চাটলেও আজকাল পাঁচটা নিতে বলে। কাটলে চোদ্দো, চাটলে পাঁচ। এই হল নববিধান।
তিনটে সিট আগের ভদ্রলোক এতক্ষণ কান খাড়া করে শুনছিলেন, বুঝতে পারিনি। তিনি বললেন, ঠিক বলেছেন, আজকাল আদর করে চেটে দিলেও নিতে হয়। আরে মশাই দুধ খেতে খেতে বাচ্চা ছেলে অসাবধানে কামড়ে দিলেও নিতে হয়।
দেখতে দেখতে সারা বাস আলোচনায় উত্তাল হয়ে উঠল। পেট ফোঁড়ারড়ো পক্ষে আর বিপক্ষে তুমুল তর্কবিতর্ক। ড্রাইভার রাস্তার একপাশে গাড়ি থামিয়ে পেছন ফিরে বললেন,
আরে মশাই, আমাকে একবার শেয়ালে কামড়েছিল। কিস্যু করিনি। এক গুণিন এসে পিঠে থালা বসিয়ে সব বিষ নামিয়ে দিলে।
ব্যস আলোচনা ঘুরে গেল, দৈব আর বিজ্ঞানের দিকে।
চব্বিশ পরগনার জেলাশাসক বুকে ঝোলা হাত নিয়ে আমাকে ঢুকতে দেখেই বললেন, ইলেকশনের আগে আমাকে আর জ্বালাবেন না। এসব পেটি কেস লোক্যাল থানায় ডায়েরি করিয়ে রাখুন। কোন দলের? রুলিং না অপোজিশন?
অবাক হয়ে বললুম, আমি এসেছি মন্ত্রীর গোবরের জন্যে।
মন্ত্রীর আবার গোবর কী? গোবর তো গরুরই হয়। খাটালে খোঁজ করুন।
আজ্ঞে, মন্ত্রীর গোবর-গ্যাস?
ও, এমনি গ্যাসে হচ্ছে না, এবার পাবালিককে গোবর-গ্যাস দেবেন! কত খেলাই জানো প্রভু—সর্প হয়ে দংশ তুমি, ওঝা হয়ে ঝাড়ো। তা ডান হাতটা অমন করে বুকে ঝুলিয়েছিলেন কেন?
কুকুর কামড়েছে।
যাক, রাজনৈতিক দংশন নয়। যে দংশনে আমরা অষ্টপ্রহর জ্বলছি। ইনজেকশন নিয়েছেন?
আজ্ঞে না, বাড়ির কুকুর তো।
বেশ করেছেন। আমার তিনটে কুকুর। কামড়ে কুমড়ে আমার শরীর ফর্দাফাঁই করে দিয়েছে। সর্ব অঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত। যেন বুয়োর যুদ্ধ থেকে ফিরে এলুম।
অমন কুকুর পোষার দরকার কী স্যার?
এ আপনি কী বলছেন? এই যে ভোট দিয়ে যাদের ক্ষমতায় পাঠালেন তাঁরা যদি কামড়াতে আসেন, কিছু করার থাকে। যদ্দিন মেয়াদ তদ্দিন কামড়। কুকুরের কামড় সহ্য হয়ে গেছে বলে মানুষের কামড় আর তেমন অসহ্য লাগে না।
সকলে ভয় দেখাচ্ছেন, ইনজেকশন না নিলে জলাতঙ্ক হবে।
হ্যাঁ সব হবে। আমি ডি এম বলছি, নো ইনজেকশান।
তা হলে গোবর স্যার!
আমাকে গোবর বানালেন? শুনুন, গোবর আছে, গোবর থাকবে, ওইসব অ্যাকাডেমিক একসারসাইজ ইউজলেস।
আমি চব্বিশ পরগনার একটা ফিগার বের করেছি।
আমাকে দিয়ে যান। লিখে রাখি। মন্ত্রী চাইলে সেইটাই সাপ্লাই করব।
যাক কোস্ট ইজ ক্লিয়ার। ডি এম. কে বাজিয়ে গেলুম। এখন হাত নিয়ে দিনকতক পড়ে থাকি। সাতদিনের মাথায় হাজিরা দিয়ে গোময় পরিসংখ্যান পেশ করব।
সন্ধে থেকেই ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। টিপটিপ বৃষ্টি। তুমুল ঝড়জল আসছে। বাড়ির সামনে একটা জিপ এসে দাঁড়াল। তিন হাজার এখনও হয়নি, হবে শুনেই ভি আই পি'রা আসতে শুরু করেছন। তাও কেমন দিনে, ঝড়ের রাতে। কার এই অভিসার।
আমাদের অফিসের ড্রাইভার ইসমাইল জিপ থেকে নেমে এল। বগলে একটা ফাইল।
কে পাঠালেন?
বড় সায়েব।
ইসমাইল, আমি তো ভাই এখন কিছু লিখতে পারব না। আমার হাতের অবস্থা দ্যাখো। তিন মাসের আগে এ হাতে কলম ধরা যাবে কি না সন্দেহ।
সে আর আমাকে বলে কী হবে স্যার! আপনি বড় সায়েবকে বলুন।
তড়াক করে লাফিয়ে জিপে উঠে, ইসমাইল কালবিলম্ব না করে চলে গেল। থাকলেই আমার কাঁদুনি শুনতে হবে। কুকুর কামড়াবার পর থেকেই আমার আচার আচরণ কিঞ্চিৎ কুকুর কুকুর হয়ে গেছে। করুণ সুরে কথা বলতে গেলে এক ধরনের কুঁই কুঁই শব্দ হচ্ছে। রেগে গেলে গড়ড় গড়ড়। আমার মনে হয় তার আগে থেকেই হয়েছে। যবে থেকে মন্ত্রী মহোদয়ের সান্নিধ্যে এসেছি।
ফাইলটা খুলতেই একটা নোট বেরিয়ে এল। বড় কর্তার হুমকি :
আগামীকাল সকাল সাতটার মধ্যে খাজারামকে চুটিয়ে গালাগাল দিয়ে একটা বক্তৃতা লিখে মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করবেন হাসপাতালের লেম্যানস ওয়ার্ডে। জিপ দুর্ঘটনায় আজ সকালে তিনি আহত হয়েছেন। ঠ্যাং ভেঙে গেছে। জরুরি, জরুরি, জরুরি।
খাজারাম সম্প্রতি দল ভেঙে বেরিয়ে গেছেন। তিনি আর একটি দল করেছেন আলাদা সিম্বল, আলাদা ম্যানিফেস্টো। নির্বাচনে নামছেন। খুব হম্বিতম্বি করছেন। বড় বড় বোলচাল মারছেন। মন্ত্রীর মতো আমারও খুব রাগ। পার্টি কমজোর হয়ে যাচ্ছে অন্তর্দ্বন্দ্বে। ধুনোর আঠা দিয়ে সাঁটা মেয়েদের সেলাইয়ের বাক্সের মতো সব খুলে খুলে পড়ে যাচ্ছে।
গালাগালের তুবড়ি ছোটাতে পারি। বাদ সেধেছে হাত। ফুলে ফেঁপে ঢোল। তিন হাজারের খেলা। আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়, আমার হাত ফুলে মনুমেন্ট। বড় অসহায় অবস্থা। ওদিকে মন্ত্রী পড়লেন ঠ্যাং ভেঙে, এদিকে তাঁর কলমচির হাত খাবলাচ্ছে নেকড়ে বাঘে। খাজারাম গলাবাজি করছে। আমাদের মন্ত্রী মহোদয়কে ফেরাতেই হবে। নইলে আমাদের আখেরে কাঁচকলা।
মাঝরাতে বৃষ্টি নামল তেড়ে। ঘণ্টা চারেকেই কলকাতা কাত। একেবারে কল্লোলিনী কেলেঙ্কারি। সব হাবুডুবু। বক্তৃতা লেখা হয়নি, তার একটা জেনুইন কারণ আছে। না হাজিরা দিলে চাকরি চলে যাবে।
বাসও চলবে না, ট্রাম তো সামান্য বৃষ্টিতেই ঠ্যাং তুলে বসে থাকবে। হাফপ্যান্ট পরে জলে নেমে পড়াই চাকরি বাঁচাবার একমাত্র রাস্তা। জল ভেঙে, রিকশা ঠেঙিয়ে যখন হাসপাতালে পৌঁছলুম তখন সর্বাঙ্গে ঝাঁঝি আর কচুরিপানার কুচি লেগে আছে। বেশ রোহিত মৎস্যের মতো খেলে খেলে এসেছি। ওয়ার্ডের বাইরে একটা বেঞ্চিতে মুখার্জি সায়েব বসে আছেন বিরস বদনে। মালকোঁচা মারা ধুতি ভিজে সপসপে।
স্যার আপনি?
তুমি যদি ফেল করো, মন্ত্রীকে ঠেকাতে হবে তো। তোমার হাতে কী হল!
আজ্ঞে কুকুর কামড়েছে।
আ:, তুমি আবার এই দুর্দিনে কুকুর নিয়ে ছেলেখেলা করতে গেলে। ইলেকশনের পর করলে হত না। যাক, লেখা হয়েছে?
আজ্ঞে না!
সে কী! সারারাত তাহলে কী করলে তুমি?
কী করে লিখব স্যার! হাতটা তো অকেজো হয়ে গেছে। ভিজে জামার পকেট থেকে নস্যির ডিবে বের করে এক টিপ নস্যি নিলেন সাঁ করে। ফ্যালফেলে দৃষ্টিতে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন আমি ফাঁসিতে চলেছি।
তোমার মন্ত্রী তুমি সামলাও, আমার কী?
মন্ত্রী কী স্যার আমার একার? তিনি সকলের, সারা দেশের।
ঠিক আছে? ভেতরে যাও বুঝবে ঠ্যালা।
কেবিনের বাইরে পুলিশ পাহারা। কোথায় যাবেন?
মন্ত্রী ডেকেছেন। আমার নাম বলুন।
ভেতরে মন্ত্রী চিল চিৎকার করছেন। সাংঘাতিক একটা কিছু হয়েছে। ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিলল।
কী সুন্দর দৃশ্য—ট্রামের ট্রলির মতো একটা ঠ্যাং ওপর দিকে তুলে মন্ত্রী আমার শয্যাশায়ী। মাথার দিকে গুরুগম্ভীর চেহারার দুজন ডাক্তার, দুজন নার্স। পাশের চেয়ারে আমার মুখচেনা এক বড় কর্তা। যিনি আমাকে একবার বেলা দেড়টা সময় গরম রসগোল্লা খাবার বায়না ধরে দুপুর রোদে সারা ব্রাবোর্ন রোড চষিয়ে মেরেছিলেন। এক এক মাড়োয়ারি মিষ্টির দোকানে ঢুকি আর জিগ্যেস করি গরম রসগোল্লা হ্যায়? তারা হাঁ করে মুখের দিকে তাকায় আর বলে, রসগোল্লা হ্যায়, লেকিন গরম কাঁহাসে মিলেগা। রাত বারো বাজে আইয়ে।
তিনি এখন খুব আমড়াগাছি করছেন, আপনি যদি বাঁদিকে একটা ডাইভ মারতেন স্যার?
ইডিয়েট। তাহলে তো মরেই যেতুম। মরলে খুব সুবিধে হয়, তাই না?
জিপ তো বাঁদিকে ওলটাল। তাহলে স্যার ডানদিকে মারলেন না কেন?
তাই তো মেরেছিলুম। গিয়ারে পা আটকে লাট খেয়ে গেলুম।
অ্যাকসিডেন্টের আগে যদি নেমে পড়তেন।
মন্ত্রী ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, এই এটাকে বার করে দাও তো। ওই মুর্খটাকে।
পুলিশ ছুটে এল, আপনি স্যার বাইরে যান তো, উনি বিরক্ত হচ্ছেন।
গরম রসগোল্লা বেরিয়ে গেলেন।
মন্ত্রী মহোদয় আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন। বেশ স্নেহ মাখানো গলায় বললেন, কী, লিখে এনেছ?
আজ্ঞে না স্যার।
হোয়াট? তুমি লেখোনি?
আমার হাত গেছে স্যার। কুকুরে কামড়ে দিয়েছে।
ষড়যন্ত্র। ও খাজারামের লোক। ওকে পরীক্ষা করো তো।
ডাক্তারবাবুরা বললেন, কোন দলের লোক, স্টেথিসকোপ কিংবা এক্সরেতে তো ধরা পড়বে না।
মূর্খ, ওই হাতটা পরীক্ষা করো। সত্যিই কুকুরে কামড়েছে কি না?
একজন নার্স এগিয়ে পড়পড় করে আমার ব্যান্ডেজ খুলে ফেললেন, স্যার, সাংঘাতিক কামড়েছে। সেপটিক মতো হয়ে গেছে।
বলো কী! কার কুকুর কামড়েছে তোমাকে?
একটু মিথ্যে বলুলম, আজ্ঞে হুগলিতে যখন গোবর সারভে করছিলুম, সেই সময় এক গোয়ালের বাইরে একটা বাঘের মতো কুকুর শুয়েছিল। আমি নধর একটি গরুর পেটে হাত দিয়ে যেই বলেছি, মা ভগবতী একটু করো তো, কুকুরটা অমনি লাফিয়ে এসে খ্যাঁক করে কামড়ে দিলে।
ইনএফিসিয়েনসি অফ দি ডি এম। গ্রস নেগলিজেনস অফ ডিউটিস। আমাকে দেখতে হচ্ছে। ডাক্তারবাবু বললেন, আহা পা-টা অমন করে নাড়াবেন না স্যার। ওয়েট দেওয়া আছে। ট্রাকসান ডিসপ্লেসড হয়ে যাবে। সেরে উঠে যা হয় করবেন।
তুমি ইনজেকশন নিয়েছ?
আজ্ঞে না স্যার। ডি এম টোয়েন্টিফোর পরগনাস বললেন, কুকুরটা যখন পাগল ছিল না তখন না নিলেও চলবে।
হি নোজ নাথিং। এই একে একটা ভ্যাকসিন ঠুকে দাও তো এখুনি।
পেছু হটে দরজার দিকে সরছি। একজন নার্স বললেন, পালাচ্ছে স্যার।
চেপে ধরো, চেপে ধরো।
নারী-বাহিনী চেপে ধরল।
মন্ত্রী বললেন, আমি মন্ত্রী বলছি, তোমাকে নিতে হবে।
তলপেটে প্যাঁক করে ছ সিসি সেরাম ফুঁড়ে দেওয়া হল। যেমন কর্ম তেমন ফল।
মন্ত্রী বললেন, এইবার কাজের কথা।
হ্যাঁ স্যার, কাজের কথা।
লিখতে যখন পারোনি, তখন বলতে তো পারবে?
কী স্যার?
ওই খাজারামকে নস্যাৎ করে দু-চার কথা?
কোথায় স্যার?
তিনদিন পরে একটা আসনের জন্যে পার্লামেন্টারি বাই ইলেকশন। আমার ক্যান্ডিডেট হেরে যাক, ডু ইউ ওয়ান্ট দ্যাট?
নো স্যার!
তাহলে আজই আমরা যাব।
ডাক্তারবাবুরা বললন, আমরা এই অবস্থায় আপনাকে যেতে দোব না।
তোমাদের বাপ দেবে।
আমি মিউ মিউ করে বললুম, এখন আর কুকুরের ঘেউ নয় বেড়ালের মিউ, ইলেকশন পড়েছে যে, পলিটিকসে জড়ালে আমার চাকরি চলে যাবে স্যার!
না জড়ালেও যাবে। আমি যাইয়ে দোব।
মরেছে, এগোলেও নির্বংশের ব্যাটা, পেছলেও নির্বংশের ব্যাটা।
ঘণ্টাখানেক পরে হাসপাতাল থেকে অভিনব একটি শোভাযাত্রা বেরুল। উদাস শহর কলকাতা সেভাবে তাকিয়ে দেখল না। দেখলে নজরে পড়ত, একটি সাদা অ্যামবাসাডার, পেছনে রাগি চেহারার এক মানুষ। ব্যান্ডেজ বাঁধা ডান পা সামনের দিকে ট্রলির মতো প্রসারিত প্রান্তভাগে একটি বাটখারা ঝুলছে। ট্রাক থেকে বেরিয়ে থাকা লোহার 'বারে' যেমন হুঁশিয়ারি লাল চাকতি ঝোলে। চারপাশে বালিশ। তিনি সেট হয়ে বসে আছেন। পাশেই বিমর্ষ চেহারার একটি ছেলে। বুকের কাছে ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত স্লিংয়ে ঝুলছে। মুখটা মাঝে মাঝে বিকৃত হচ্ছে। তলপেটে সিঙি মাছ কাঁটা মারছে।
পেছনে আর এক গাড়িতে দুজন হাড়বিশেষজ্ঞ, একজন সেবিকা, ওষুধপত্র।
মিছিল ক্রমশ রাজনীতির অন্ধকারে অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হয়ে গেল। আর ফিরে এল না, পতাকা উড়িয়ে শ্লোগান দিতে দিতে। এখন কলকাতার উপকণ্ঠে কোনও এক বাজারে মধ্যবয়সী একটি ছোকরা গামছা বিক্রি করে। কেউ জানে না, তার নাম তিন হাজার টাকা। এখন সে দিন আনে আর দিন খায়, কিন্তু সুখে আছে। কোনও বৃশ্চিক দংশন নেই। আগের চেয়ে একটু মোটাও হয়েছে।
সংসারে যাঁরা হাসেন কাঁদেন
আসেন আর ফিরে যান
শূন্য হাতে
তাঁদের করকমলে
সহযোদ্ধার উৎসর্গ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন