সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমরা যখন ছাত্র ছিলুম অর্থাৎ পাঁচের দশকের কথা, তখন মানুষের এত ভবিষ্যৎ ভাবনা ছিল না। ক্যারিয়ার, টাকা, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি এইসবের জন্যে মানুষ এখনকার মতো এমন উন্মাদ হত না। তখন মানুষ মানুষই ছিল, ইদানীংকালে সবাই যেন রেসের ঘোড়া। সবাই চার-পা তুলে ধুলো উড়িয়ে ছুটছে। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে মেরে বেরিয়ে যেতে চাইছে। যাবে কোথায়! সুন্দর মানুষ হওয়ার সাধনা, না কি উপকারী মহৎ কোনও মানুষ হওয়ার ব্যাকুলতা! অবশ্যই নয়। প্রচুর চাই। গাড়ি, বাড়ি, ক্ষমতা, যশ খ্যাতি। সকলেই সম্রাট হবে, কম হলেও, রাজা কিম্বা মন্ত্রী। সৎসুন্দর মানুষ হয়ে কী হবে! অত্যাচারী বদমাইশ রাজা হয়ে সিংহাসনে বসব। মানুষ মেরে খাব! পশুরাজ সিংহ কি গরুর মতো ঘাস খায়। হিংস্র নৃশংস বলেই না পশুরাজ। মানুষ এখন হিংস্র হওয়ার সাধনায় মেতেছে।
কিন্তু সব মানুষের ভেতরেই যে একটা পেলব মানুষ বসে আছে। পৃথিবীটা যে বড় কোমল। তিনের চারভাগ টলটলে জল। তিনভাগই তো সমুদ্র। অপার অনন্ত। লহরীর পর লহরী। ঢেউয়ের অবিরাম নৃত্যছন্দ। তটভাগে আঘাতের পর আঘাত। ঘাস কত কোমল সবুজ। বালি কত নরম। পুষ্প কত স্পর্শকাতর। পালকে ঢাকা পাখি কত কাতর! লোমে ঢাকা একটি বেড়াল, অথবা কুকুর, এমনকী কেশর ফোলানো সিংহ, সবকিছুর মধ্যেই নরম কিছু আছে, একধরনের উষ্ণতা আছে। একটা আকর্ষণ আছে। সেটাকে সহসা ছেঁটে ফেলা যায় কি!
সেই দূর ছাত্রজীবনে আমার এক প্রেমিকা ছিল। তার নাম ছিল গোপা। সেকালের প্রেম ছিল ভীরু, পাতার আড়ালে কুঁড়ির মতো ফুটত। সহসা একদিন ফুল হয়ে উঁকি মারত। সেকালের প্রেম হত গোপনে, নিভৃতে। আদর্শবাদী অভিভাবকদের সামান্য সমর্থনও ছিল না। প্রেম শব্দটা তখন অতিশয় একপেশে ছিল। প্রেম বলতে বোঝাত দেশপ্রেম। ঈশ্বরপ্রেম! নরনারীর প্রাকবিবাহ প্রেম ভয়ঙ্কর অপরাধের ব্যাপার। চরিত্রহীনতার লক্ষণ। ধরা পড়ে গেলে মস্তক মুণ্ডন, গলায় জুতোর মালা, মুখে চুন কালি লেপন, ইত্যাদি পরিণতি অবধারিত।
আমিও ছাত্র গোপাও তাই। আমিও দশম শ্রেণীর, সেও দশম শ্রেণীর। তার সকালে স্কুল আমার দুপুরে। প্রেমের উপলক্ষ টেস্ট পেপারের আদান-প্রদান। আমাদের প্রাচীন বিদ্যালয়ের শেষ প্রান্তে পরিত্যক্ত একটি ঘরে কয়েক মুহূর্তের ভীরু সান্নিধ্য। কেউ যেন দেখে না ফেলে। আমরা যেন হীরে চোর। জীবন্ত, জ্বলজ্যান্ত একটি মেয়ে। পানপাতার মতো মুখ। টানা টানা চোখ, ধনুকের মতো ভুরু। টিকলো নাক। গোলগোল ফরসা হাত—লম্বা লম্বা আঙুল। ভেলভেটের মতো দেহত্বক। মোটা বিনুনি। বাঁশির মতো কণ্ঠস্বর। এ কে! এ কোন দেবী!
পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। পড়তে পড়তে রাত প্রায় ভোর হয়ে যায়। মধ্যরাতের সেই নিস্তব্ধ পৃথিবীতে খোলা কেতাবের পাতায় কোথা থেকে পরি হয়ে উড়ে আসে গোপা। কাঁধ ছাপানো সোনালি চুল। গায়ে দোলনচাপার সুবাস। কেউ কোথাও নেই। আমি কল্পনায় সেই নিশীথ রাতে গোপার হাত ধরে শাসনের দুর্গ ভেঙে বেরিয়ে পড়ি অবাধ পরিক্রমায়। যেখানে নদী বয়ে যায় মৃদু কোলাহলে পাথরে পাথরে, কবিতা লিখে লিখে, যেখানে চাঁদের আলোয় একটি নীল পাহাড় মাথায় তারার টায়রা পড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে একটি চিতল হরিণ জল খেতে আসে। সেইখানে একটি শীতল শিলাখণ্ডে আমি আর গোপা। তার নরম বুকে আমার মাথা। তার বক্ষদেশের অদ্ভুত স্বর্গীয় উষ্ণতা, তার হাতের স্পর্শ, তার নিশ্বাস, তার কোল, তার আলিঙ্গন, তার সরোবরের মতো চোখে তারার আলো।
পৃথিবীটাই তো আমার প্রেমিকা গোপা। আমি সেইখানেই আছি। কেবল বাস্তবের নিষ্ঠুর আঘাতে কল্পনা চুরমার। এখন মুরগির চেয়ে ঝলসানো মুরগিই স্বাদু। এইরকমই মনে করি আমরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন