সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অনেকে ভালো আছেন। বিভিন্ন বড় বড় জায়গায় ঘাঁটি আগলে বসে আছেন। দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে বড় বড় কথা বলছেন। বহুতলের 'মিনি' বাগান বারান্দা থেকে খালি সিগারেটের প্যাকেটের মতো নীচের দিকে জ্ঞান আর উপদেশ ছুড়ছেন। মাঝে মাঝে ভোঁ ভোঁ করে বিদেশে উড়ে যাচ্ছেন। কোলাপসিবল গেট লাগানো সুরক্ষিত, উন্নাসিক পরিবার। দয়া করে এদেশে আছেন। কৃপা করছেন। কাকে করছেন?
অনেকেই কিন্তু ভালো নেই। শোচনীয় অবস্থায় স্ত্রী, পুত্র, পরিবার নিয়ে খাবি খাচ্ছেন। যে দেশের বড় কর্তাদের এখনও সাহেব বলা হয় সে দেশের আশা, ভরসা আছে কি?
কেউই ভালো নেই। সব মানুষকে নিয়েই একটা দেশ। ফল আর ফলের বিচি। তিনের চার ভাগ পচে গেলে একের চার ভাগে পচন ধরতে বাধ্য। ওপরতলার ঘৃণায় নীচের তলার ক্রোধ বাড়তে বাড়তে ক্ষিপ্ত আকার ধারণ করেছে। আগুনে ঘৃতাহুতি। মন্ত্র, 'ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও।'
প্রচুর কথা, শ্লোগান, নির্দেশ, উপদেশ বাতাসে ভাসছে। কে কার কথা শোনে! একটু একটু করে ভয়ঙ্কর রকমের একটা মারকুটে জাত তৈরি হয়েছে। ভাষা হয়েছে খুন। কথায় কথায় ছুরি ছোরা। মারো। হয় অন্যকে মারো নয় নিজেকে মারো। মেরে ফ্যালো। চুরমার করে দাও। ছেলেমেয়ের চোখের সামনে মদ্যপ বাপ মুখে বালিশ চেপে ধরে বউকে মেরে পলাতক। ঘরে ঘরে মেয়েদের কী অবস্থা! সবই হচ্ছে, কে যে কখন মরবে জানা নেই। স্বামীর আজ চাকরি আছে তো কাল নেই। কয়েকটি বিষণ্ণ মুখে করুণ দৃষ্টি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো গরিবের পক্ষে সম্ভব নয়। বিরাট খরচ। যারা বেড়ে উঠছে তাদের সামনে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। উঞ্ছবৃত্তিই একমাত্র পথ। দাম্ভিক শাসক গোষ্ঠী শাসনের যে পদ্ধতি বের করেছেন সে পথে আশার আলো নেই। থমথমে ভয়ের থকথকে অন্ধকার। সর্বত্র জুজুর ভয়। বাঘ, সিংহ, হায়না, শেয়াল নয়, সবচেয়ে ভীতিপ্রদ হয়ে উঠেছে মদতপুষ্ট এক ধরনের মানুষ। এরা কেল্লায় থাকে। সম্রাটের সিংহাসন রক্ষা করে।
বহু স্তর তৈরি হয়েছে। বহু স্তর পেরিয়ে রাজার কাছে খবর আসে। মোগল আমলের কেতা?
'কোথাও কোনও বিদ্রোাোহর খবর আছে, চর?'
'জাঁহাপনা অমুক মহল্লায় একটু গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর শুনে এলাম।'
'কারণ?'
'বলছে, রাস্তাঘাটের শোচনীয় অবস্থা। স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, স্কুল নেই, পানীয় জল নেই, রোজ রাতে ডাকাতি, জীবিকা নেই। চোলাই খেয়ে পুরুষগুলো চেল্লাচ্ছে। নারী নিগ্রহ, ধর্ষণ।'
'আমাদের প্রচার যন্ত্রের দম ফুরিয়ে গেল নাকি? মোড়ে মোড়ে, হাটে বাজারে দাঁড়িয়ে চেল্লাতে পারছ না, 'ফিল গুড। তোমরা ভালো আছ, খুব ভালো।'
'সমস্বরে পালটা চেল্লানি—না, আমরা ভালো নেই। আমরা মরে যাচ্ছি। আমাদের মেরে ফেলা হচ্ছে।'
'মরে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণটা বোঝাতে পারছ না! হার্টের জোরে মানুষ বাঁচে, ফেল করলেই ফেল হয়ে যায়। ভালো করে বুঝিয়ে দাও। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা ভয়ঙ্কর রকমের একটা কুসংস্কার। সবরকমের কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসার দিন এসেছে। সবাইকে বেঁচে থাকতে হবে? মামার বাড়ি! যন্ত্রপাতি দিয়ে আমাদের বিজ্ঞান বাহিনীকে পাঠিয়ে দাও। শিখিয়ে দাও, বেশি কথা বলা খুব খারাপ। অনেক কথার অনেক দোষ, ভেবে চিন্তে কথা কোস। বোবার শত্রু নেই।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন