সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মানুষকে বলা হয় মান যুক্ত হুঁশ। হুঁশ হারালে তাকে আর মানুষ বলা যায় না।
সময় সময় আমরা সকলেই হুঁল হারিয়ে ফেলি। ভুলে যাই, আমাদের চারপাশে আরও মানুষ ঘুরছে। এই জগৎসংসারে একটি মানুষ একা ঘুরছে না। গিজ গিজ করছে অসংখ্য মানুষ আমাদের চারপাশে। বেচাল হলেই বিপদ। আর সেই বিপদই অহরহ ঘটছে। ভাগ্যিস ইংরেজি একটি শব্দ আমাদের তূণে আছে, সেই শব্দের আমরা পার পেয়ে যাচ্ছি—সরি।
বগলে ছাতা। বেশ প্রমাণ মাপের। ইস্পাতের খোঁচাটি সঙ্গিনের মতো পেছনে বেরিয়ে আছে। নড়বড় নড়বড় করে চলেছেন তিনি। ব্যস্ত ফুটপাথে এক সাবেক কালের প্রাণী। যৌবনটি যার ফাঁকা ফাঁকা কেটেছে অবিভক্ত বাংলার শহর কলকাতায়। যখন বাস যেত প্রায় খালি। ট্রামে মানুষ আয়েস করে ঠ্যাং তুলে বসে বই পড়তে পড়তে অফিস যেত।
ছাতা বগলে ধীর-গামী মানুষটি পরিবর্তনের কথা ভুলেই বসে আছেন। মাঝে মাঝে ডাইনে বামে মোচড় মারছেন আর ছাতার খোঁচা খাচ্ছে পেছনের দ্রুত ধেয়ে আসা পথচারী। ভ্রূক্ষেপ নেই। যে খোঁচা খাচ্ছে, তার দাঁড়াবারও সময় নেই। পথে আজকাল মানুষের স্রোত বন্যার স্রোতের মতোই। ছুটছে, মানুষ ছুটছে। কার কত রকমের ধান্দা, কেই বা জানছে। ছাতা বগলে মানুষটির শেষ খেল হল, লাল-লাল আপেল দেখে হঠাৎ নীচু হলেন—আপেল কত করে, আপেল?
লি-কার যেন ডিগবাজি খায়-এর ভঙ্গি। ছাতার খোঁচায় পেছনের মানুষটি খতম। লোহার সাঁপিতে হাতের নুনছাল, পাকানো সিগারেটের মতো গোল করে ইঞ্চিখানেক ওপরে তুলে দিল। নাও, এখন ঠ্যালা সামলাও। টেট ভ্যাক নিতে ছোটো। বৃদ্ধ মানুষ, সব বলা কওয়ার বাইরে।
ছাতার একদিককার বাঁকানো প্রান্ত তখন আর এক খেল শুরু করেছে। আপেল বিক্রেতার থুতনিতে গিয়ে ঠোনা মেরেছে।
বৃদ্ধ একবার শেষ কেরামতি দেখালেন। ছাতাটিকে বগলচ্যুত করার জন্যে পেছন দিকে প্রসারিত করেই ঘুরিয়ে দিলেন নীচের দিকে। ছাতার ল্যাং খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলেন অফিস ফেরতা মহিলা। সাংঘাতিক ধরনের ফাউল। খেলার মাঠ হলে রেফারি অবশ্যই হলদু কার্ড দেখাতেন। এখানকার পথের নিয়মে কোনও ফাউল নেই। ফ্রিস্টাইল কুস্তির নিয়মে সমাজ চলেছে। 'বগল, বগল' করতে করতে ভারবাহী চলেছে, মাথায় লগবগ লগবগ করছে প্লাইউডের বিশাল এক টুকরো। বগলে যাওয়ার আগেই মাথার কোনওটা দাগরাজি হয়ে গেল। প্লাইউডের যাত্রাপথ বৌবাজার থেকে এলগিন রোড। নিদেন ছ'টি মানুষকে হাসপাতালে পাঠিয়ে তার যাত্রা শেষ হল। একে বলে বীরের যাত্রা। কোপাতে কোপাতে এসেছে।
হাত ছুঁড়ে কথা বলার অভ্যাস এক সাংঘাতিক অভ্যাস। হাত ছোঁড়া মানুষদের কীর্তি-কাহিনির রেকর্ড খুবই উজ্জ্বল। এঁরা যা করেন, সবই বোলড আউটের পর্যায়ে পড়ে। ক্রিকেটার হলে প্রত্যেকেরই নাম থেকে যেত ইতিহাসে।
বৈঠকখানায় জমিয়ে বসে আছেন। গৃহস্বামীর সঙ্গে খোশগল্প চলেছে। কী করতে পারেন, কিছুই বোঝার উপায় নেই। বেশ শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক। হঠাৎ ক্রিকেট বল ছোঁড়ার কায়দায় ডান হাত ঘুরিয়ে বললেন, 'রাখো তোমার নৈনিতাল, মুসৌরির কোনও তুলনা হয় না।'
পেছন দিক থেকে চা আসছিল, মুসৌরির ধাক্কায় ট্রে সমেত চায়ের কাপ ছিটকে চলে গেল। বিস্কুট গড়াতে লাগল মেঝেতে চাকার মতো; যিনি আনছিলেন, তিনি হতচকিত। যেন ইন্দ্রপতন হল। শরীরে গরম চায়ের বোরিক কমপ্রেস। ফুলকাটা কাপ-ডিশ জোড়ার দামও নেহাত কম নয়। ভদ্রলোক হেসে বললেন—'হে হে দেখতে পাইনি ম্যাডাম।'
রুগির মাথার কাছে বসে হাত নেড়ে বলতে গেলেন, 'তিন দিন, তিন দিনে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন।' পাশের টেবিলের জলের গেলাস চিৎপটাং। ট্যাবলেট ভেসে বেরিয়ে গেল। প্রেসক্রিপশান চান করে উঠল।
রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধুতে কথা হচ্ছে, একজন এমন হাত নাড়লেন, স্কুলের দিদিমণির চশমা ছিটকে বেরিয়ে গেল। হাত নেড়ে কথা বললে সব কথাতেই বেশ একটা জোর আসে। নেতারা বক্তৃতা দেওয়ার সময় ঘুষোঘুষি করেন, সব সময় অদৃশ্য একটা শত্রুকে সামনে খাড়া রাখেন। যত সংগ্রাম যেন তার সঙ্গে। মিছিলের মানুষ স্লোগান দেওয়ার সময় কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়। ব্যাডমিন্টনের ব্যাট যেন বল মারছে। মাথাটা পেছনে চলে আসে, তারপর চাপস মারার কায়দায় সামনে এগিয়ে যায়। মুখ থেকে ছিটকে পড়ে স্লোগান—নিপাত যাক, নিপাত যাক। অনেকে স্লোগান হাত নেড়ে বাতাসে ভাসিয়ে দেন বাস্কেট বলের মতো—চলছে না, চলবে না। অনেক বক্তৃতা দেওয়ার সময় মাইকের গলাটাকে বকের গলা ভেবে মটকাবার চেষ্টা করেন।
গান গাইবার সময় অনেক এমন লাঠালাঠি করেন, মনে হয় প্রেক্ষাগৃহের আসন ছেড়ে ছুটে গিয়ে মাথায় আইসব্যাগ চাপিয়ে পাখার বাতাস করি। চড়ার দিকে গলা তোলার সময় হাতটাকে ঠেলে আকাশের দিকে তোলেন। যেসব উচ্চাঙ্গ শিল্পী হাঁটু মুড়ে নিলডাউনের ভঙ্গিতে বসেন, তাঁরা দ্রুত তানের সময় হাত দুটোকে সামনে খলবল করে এমনভাবে নাড়াতে থাকেন, দেখলে মনে হয় সাবান মেখে বালতির জলে হত ধুচ্ছেন। সমে পড়ার সময় শরীরের আচমকা এমন ভঙ্গি করেন, চমকে উঠতে হয়। যেন দুম করে গাছ থেকে ভাদ্রের পাকা তাল পড়ল।
একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। বিখ্যাত এক শিল্পী তারানা করছিলেন। গান খুব দ্রুত লয়ে চলেছে। জমেছেও খুব। সামনের আসনে মায়ের কোলে বসেছিল শিশু। ওস্তাদজি আচমকা তোপ দাগার মতো এমন তোম, তোম, তুরশম, ক্রম, দ্রুম, দ্রাম করে উঠলেন, শিশুটি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। ওস্তাদজি তখন তারস্বরে করে চলেছেন—অ্যায়, অ্যায়, ন্যায়, ন্যায়। শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে আদো আদো গলায় বলছে—আর করব না, আর করব না। আবৃত্তির আসরে অনেকে এমন করতে থাকেন, দেখে বড় কষ্ট হয়। প্রেমের কবিতায় চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে যায়, কণ্ঠস্বর ফ্যাসফ্যাসে, চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা। দেশাত্মবোধক কবিতায় তড়কা লেগে যায়, চোখ দুটো বেরিয়ে আসে ঠেলে, গলার শিরা ঠেলে ওঠে। হাত-পা সারা শরীর টানটান হয়ে যায়। কষ্ট দেখে শ্রোতাদের বুক ফেটে যায়।
পা দোলানো, আর নাচানো সুন্দর একটি অভ্যাস। বসা মাত্রই পা দুলতে শুরু করল। অটোমেটিক ব্যাপার। খাটে বসে পা দুলছে। দুলুনি ক্রমশই বাড়ছে। খাট মচমচ করছে। অতিথি এসেছেন বাড়িতে। কিছু বলাও যায় না। খাটের তলায় নানা জিনিস। প্রথমেই শব্দ করে উলটে পড়ল পেতলের পিলসুজ। গড়াতে গড়াতে গভীরে চলে গেল। খাটের তলায় শুরু হল পরপর পতনের শব্দ। উলটে গেল পেতলের গেলাস। ঠিকরে পড়ল হামান দিস্তা। বিপ্লব শুরু হয়ে গেল।
ডিভানে বসে পা দোলাচ্ছিলেন। অন্তরালে ছিল খেয়ে রাখা কাপডিশ। কেতরে পড়ল। তলানি চা পড়ে গৃহস্বামীর কার্পেট নষ্ট।
রকে বসে খুব পা দুলছে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল কুকুর। সঙ্গে সঙ্গে খ্যাঁক।
বাসের জোড়া আসনে পাশে যিনি বসে আছেন, খুব পা নাচাচ্ছেন থরথর করে। পায়ে পা ঘষে যাচ্ছে। একে গরম, তায় আন্দোলন, ঘর্ষণে বিদ্যুৎ তৈরি হওয়ার উপক্রম। বললে, কিছুক্ষণের জন্যে থেমেই আবার শুরু হয়।
সিনেমায় সারি-সারি আসনের প্রান্তে কেউ পা নাচাচ্ছেন। সমস্ত রো-তে যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। পয়সায় সিনেমা দর্শন, বিনে পয়সায় থিরথিরে নাচন।
জাতীয় গ্রন্থাগারের লম্বা টেবিলে বসে পা নাচাচ্ছেন কেউ। যিনি বই খুলে নোট নিচ্ছিলেন, তাঁর লেখা চলেছে কেঁপে কেঁপে। অক্ষরের যেন ম্যালেরিয়া হয়েছে। যেন প্ল্যানচেটের ভৌতিক লেখা।
ভোজসভার টেবিলে অভ্যাগতের পা নাচছে। নাচিয়ে নাচিয়ে খাচ্ছেন। তারিয়ে তারিয়ে। টেবিল থিরথির কাঁপছে। কাঁপছে স্যুপের বাটি, কাঁটা-চামচ-গেলাস। হঠাৎ বাতিদান থেকে টপাটপ উলটে পড়ল গোটাকতক জ্বলন্ত বাতি, 'গেল গেল' বলে জনৈক অতিথি লাফিয়ে উঠলেন। হাঁটুর ঊর্ধ্বমুখী ধাক্কায় সব লণ্ডভণ্ড।
নিজেকে সাজাতে সকলে ভালোবাসে। সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। অনেকের মধ্যে এই প্রবণতা এত বেশি যে, অন্যে বিপদে পড়ে যান। অফিসের ওয়াশ বেসিনের সামনে আয়না। মুখটা টুক করে দেখে হাত কি মুখ ধুয়ে সরে পড়লেই হয়। পেছনে লাইন পড়ে না। অন্যে উশখুশ করে না। জানি, পৃথিবীতে নিজের মুখটিই সবচেয়ে সুন্দর। নাক ধ্যাবড়া হোক, চোখ গুলিগুলি হোক, সামনের চুল পাতলা হোক, তবু আমার কাছে আমি ভীষণ সুন্দর। পৃথিবীর তাবৎ সুন্দরী আমাকে দেখামাত্রই কাবু হয়ে পড়বেন। রাতে স্বপ্ন দেখবেন, রাজার পোশাক পরে পক্ষীরাজে চেপে রাজকন্যার ছাদে এসে নামছি। আয়নার দিকে তাকিয়ে আছি তো আছি। একবার ডান পাশে মুখ ঘোরাচ্ছি, একবার বাঁপাশে। কখনও ঠোঁট ওলটাচ্ছি, চোখ বড় করছি। আঙুলে অল্প একটু জল নিয়ে ভুরুর ধনুক মসৃণ করছি। ষোড়শোপচারে নিজের পুজো চলেছে। দু হাত দূরে হাঁ হয়ে কারা দণ্ডায়মান, আমার দেখার দরকার নেই। বুক পকেট থেকে খাটো চিরুনি বের করে এইবার চুলের কেয়ারি। চলছে তো চলছেই।
পানবিড়ির দোকানে আয়না ঝোলে। 'এক প্যাকেট সিগারেট দাও' বলেই হিপ পকেট থেকে চিরুনি বেরল, তারপর স্যাট করে এক পা পেছনে ঠেলে, এক পা সামনে এগিয়ে বর্শা ছোঁড়ার ভঙ্গিতে সামনে নীচু হয়ে চুলে ব্যাকব্রাশ। পেছনের পায়ে পা জড়িয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন অতি ব্যস্ত পথচারী। ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট্ট একটি 'সরি' ছুঁড়ে ক্রেতা প্রসাধনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আবার। এই রকম একজন উগ্র প্রসাধন বিলাসীকে জনৈক ল্যাং-খাওয়া প্রবীণ মানুষ বলেছিলেন—ভাই, সব সময় মনে রাখবে, পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আরও কয়েক কোটি মানুষ আছে। তারা তোমার আশপাশেই ঘুরছে।
চলতে চলতে ডাইনে বাঁয়ে থুথু ফেলা আর এক ভারতীয় অভ্যাস। তিনি ফেলতে ফেলতে চলেছেন, সদাসতর্ক আমি পেছনে থমকে থমকে চলেছি। ফাঁক খুঁজছি কীভাবে ওভারটেক করে বেরিয়ে যাওয়া যায়। সার্কাসের সেই বাঘটাকে স্মরণ করছি, যে ঘূর্ণায়মান আগুনের রিঙের মধ্যে দিয়ে অক্লেশে গলে যেতে পারে।
অনেক মহিলা আছেন। ছুঁচে সুতো পরাবার সময় যাঁদের সুদৃশ্য লাল জিভটি বেরিয়ে পড়ে। শিশুকে কিছু খাওয়ানোর সময় নিজের মুখ নিজের অজান্তেই হাঁ হয়ে যায়।
নিজেকে নিজের মধ্যে ধরে রাখার কৌশল আমরা অনেকেই জানি না। বাসের জানালার ধারে বসে আছি। রাস্তায় বিপজ্জনক তেমন কিছু দেখলেই—'গেলো গেলো' করে উঠছি। অন্য যাত্রী চমকে উঠেছেন। শেষে বিরক্ত হয়ে একজন বললেন—ব্যাটাকে নামিয়ে দে।
পথে পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা। প্রশ্ন হল, কী, কেমন? সহাস্য উত্তর, ভালো, তুমি কেমন? যেতে যেতে প্রশ্ন ছুঁড়ে, উত্তর ফেলে পলায়ন। মাইলখানেক হাঁটার পর খেয়াল হল, আরে এ কী! সেই যে হেসেছিলুম, সে হাসি এখনও মুখে লেগে আছে। বাথরুমের আলোর মতো। জ্বেলেছিলুম, নেবাতে ভুলে গেছি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন