সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমরা পাঁচ বন্ধু। আমি, শ্যামল, মলয়, সুখেন আর নিতু। পাড়ায় আমাদের নাম হয়েছে পেন্টাগন। আমরা ছিলুম চারজন, নিতু আসায় চতুর্ভুজ পঞ্চভুজ হয়েছে। নিতু বিহারের ছেলে। ডেরি-অন-শোনে বাড়ি ছিল। মা-বাবা দুজনেই মারা যাওয়ার পর এখানে চলে এসেছে মামাদের কাছে। আমাদের মধ্যে নিতুকেই সবচেয়ে সুন্দর দেখতে। একমাথা কোঁকড়া চুল। বিহারের জল হাওয়ায় সবল শরীর। যা খায় তাই হজম হয়। সর্দি নেই, কাশি নেই, জ্বর নেই, মাথা ব্যথা নেই। নিতুর অনেক গুণ। ভারী সুন্দর গান গায়। সুন্দর ছবি আঁকে। কখনও রেগে যায় না। রাগলেও রাগে না। হেসে সব ভুলিয়ে দেয়।
আমরা চারজন এক স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ি। নিতু হঠাৎ বিহার থেকে চলে এসেছে। মামারা নিতুকে নিয়ে কী করবেন মামারাই জানেন। তিন মামার তিন রকম মত। বড়মামার স্টেশনারি দোকান। বড়মামা বলেন নিতুকে ব্যাবসা শেখাব। মেজমামা একটা কারখানায় কাজ করেন। তাঁর মত, সুযোগ পেলেই নিতুকে অ্যাপ্রেন্টিস করে ঢুকিয়ে দোব। ছোটমামার কোনও মত নেই। তিনি সেতার বাজান। শিল্পী-শিল্পী ভাব। সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। সাধনা নিয়েই ব্যস্ত। সব দেখেশুনে নিতুর ধারণা হয়েছে তার কিছুই হবে না। সকলেই চাইছেন নিতু রোজগারে নেমে পড়ুক। নিজের পায়ে না দাঁড়ালে কে বসে বসে খাওয়াবে।
বেলা চারটের সময় রোদের তেজ যখন কমে আসে, রাস্তায় যখন লম্বা-লম্বা ছায়া নেমে আসে আমরা তখন বই বগলে হইহই করতে করতে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে আসি। খেলার মাঠে ফুটবল পড়ার শব্দ ওঠে। পিঁ পিঁ করে বাঁশি বাজতে থাকে। আমরা খেলি না। খেলার মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখি। তারপর আমাদের একটা জায়গা আছে সেখানে গিয়ে পা ছড়িয়ে বসি। নিতু আসে। গানে গল্পে সন্ধে নেমে আসে। যে যার বাড়ি গিয়ে পড়তে বসি।
জায়গাটা হল গঙ্গার ধারের একটা ভাঙা ঘাট। পাশেই বিশাল বটগাছ। শিবের মন্দির। রাধাকৃষ্ণের মন্দির। পাড় ঢালু হয়ে জলের দিকে নেমে গেছে। শ্যামল খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে। তার পকেটে থাকে স্কুল থেকে কুড়িয়ে আনা রংবেরঙের চক। ভাঙাঘাটের পৈঠেতে সে রোজই কিছু না কিছু ছবি আঁকে। কোনও দিন প্রধান শিক্ষকের মুখ। কোনওদিন অঙ্কের স্যার। কোনও দিন স্কুলের দরোয়ান। মাঝে মাঝে পড়ার বইয়ের গল্পের চরিত্র। ছবিতে সকলেরই স্বভাব সুন্দর ফুটে ওঠে। হেডস্যারের তিরিক্ষি মেজাজ। অঙ্কের স্যারের মারমুখী স্বভাব। দরোয়ানের দেহাতি মুখ। রোজই আঁকে। রোজই মুছে যায়। কে যে মুছে দেয়। মনে হয় মাঝরাতে যখন আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ি তখন চুপি চুপি জোয়ারের জল এসে সব মুছে দিয়ে যায়।
*
আজ আমরা অনেকক্ষণ বসে আছি। সূর্য সেই কখন ছ্যাঁক করে জলে ডুব দিয়েছে। আকাশে কত রকমের মেঘ, কত রকমের রং। রং-বেরঙের পাল তুলে নৌকা চলেছে নবদ্বীপ, মুর্শিদাবাদ। কোথায় যাচ্ছে কে জানে। সবই মহাজনী নৌকো। নুন বোঝাই, খড় বোঝাই।
শ্যামল বললে, 'নিতুর আজ কী হল বল তো?'
মলয় বললে, 'বড়মামা হয়তো দোকানে বসিয়ে দিয়ে কলকাতায় সিনেমা দেখতে গেছে।'
'নিতুটার যে কী হবে? সুখেনের ভীষণ ভাবনা।
মলয় বললে, 'নিতুটা না এলে বড় বিপদে পড়ে যাব। একটা অঙ্ক খুব আটকে গেছে রে? একটা করতে পারলে পুরো চ্যাপটারটা হয়ে যাবে।'
নিতুর অঙ্কে ভীষণ মাথা। খড়ি দিয়ে ভাঙাঘাটের শানবাঁধানো ধাপে ঝটাপট অঙ্ক কষে আমাদের অবাক করে দেয়।
সুখেন বললে, 'দেখবি, নিতুটা মস্ত বড় গাইয়ে হবে। ওর যা গলা! যে কোনও গান একবার শুনলেই অবিকল গাইতে পারে।'
নিতুন ভাবনায় আমাদের গল্পটল্প সব থেমে গেছে। পকেটের চানাচুর মিইয়ে এল। নিতু না এলে খেতে পারছি না। এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। আকাশে ওড়ার আগে বটের ডালে বসে পেঁচা ডাকছে চ্যাঁ-চ্যাঁ করে।
সুখেন জলের দিকে একটা ঢিল ছুঁড়ে দিয়ে বললে, 'নিতুটাকে ওর মামারা আমাদের হাতে দিক না? স্কুলের সেক্রেটারিকে ধরে ওকে আমাদের ক্লাসে ঠিক ভরতি করে দিতে পারব। দেখবি ও ঠিক ফার্স্ট হবে। স্কুলের মাইনেও লাগবে না, কিচ্ছু না।'
আমরা উঠে পড়ব কি না ভাবছি, হঠাৎ নিতু এসে হাজির হল।
'কী রে এত দেরি করলি! কী হয়েছিল?'
নিতু পান খেয়েছে। ঠোঁট লাল। হঠাৎ সন্ধেবেলা পান! ভালো খাওয়াদাওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। ঠোঁট লাল, মুখ শুকনো। সুখেন বেশ কিছুক্ষণ নিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, 'তোর আজ একটা কিছু হয়েছে। নিশ্চয় কিছু হয়েছে।'
'কী আবার হবে?' যাই হোক না কেন, নিতু কখনও কারুর নিন্দে করে না। সবাই ভালো।
আমি চানাচুরের ঠোঙাটা বের করে বললুম, 'তুই আসছিস না বলে খেতে পারছি না। নে ধর।'
নিতু হাত পেতে চানাচুর নিল। সুখেন বললে, 'তুই নুকোচ্ছিস। সত্যি করে বল তো কী হয়েছে?'
'আমার আবার কী হবে। আমার যা হওয়ার সবই তো হয়ে গেছে।'
নিতু চানাচুর খেতে লাগল। নিতুর ডান গালটা বাঁ গালের চেয়ে লাল হয়ে আছে। আমি লক্ষ করে করে ঠিক ধরেছি। চানাচুর চিবোতেও যেন বেশ কষ্ট হচ্ছে।
'নিতু তোর গালটা কেন লাল হয়ে আছে রে?'
'মনে হয় রক্ত বেড়েছে। স্বাস্থ্য ভালো হলে মানুষের গাল গোলাপি হতে থাকে।'
'তা একটা গাল হবে কেন?'
'একটা একটা করেই তো হয়। প্রথমে ডান, তারপর বাঁ।'
'ও।' ও বলেই চুপ করতে হল।
দিনের আলো নিবে আসছে দেখে মলয় পকেট থেকে অঙ্কটা বের করে ফেলল। সেই বিশ্রী ঝামেলা। পিতা পুত্রের বয়েস নিয়ে চিরকালের ঝামেলা। দশ বছর আগে আর দশ বছর পরে। ক্লাসে অঙ্কের স্যার একদিন মলয়কে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড় করিয়ে এইরকম একটা অঙ্ক কষতে দিয়েছিলেন। মলয় অ্যায়সা অঙ্ক কষেছিল, আমরা হেসে মরি। পুত্রের বয়েস পিতার বয়েসের চেয়ে দশ বছর বেশি হয়ে গেল। মলয় প্রথমটায় ধরতেই পারেনি, কেন সবাই হাসছে। মলয় সমানে তর্ক করে গেল, আজকাল ও-রকম হয় স্যার, সব পুত্র তো ভবিষ্যতে পিতা হতে পারে। অতীতের পুত্র ভবিষ্যতের পিতা। এই তো জগতের নিয়ম। মাথায় ডাস্টারের গাঁট্টা খেয়ে ব্ল্যাকবোর্ড থেকে সরে এসে কান ধরে বেঞ্চিতে দাঁড়িয়ে রইল। স্যার মুখ ভেঙচে বললেন, 'ওরে আমার দার্শনিক রামছাগল রে!'
সেই অঙ্ক নিতু ধরেই করে দিলে। পিতা পিতাই রইল, পুত্র পুত্র। কোনও স্থান পরিবর্তন হল না। উত্তরও মিলে গেল। আমরা অবাক হয়ে যাই, নিতু এত অঙ্ক কবে কোথায় শিখল? বিহারের স্কুলে? খুব কাঁচা লঙ্কা খেলে অঙ্কের মাথা খোলে। নিতুর ধারণা। মলয়ও খেতে শুরু করেছে। এখনও মাথা তেমন খোলেনি। দেখা যাক ফাইনালে কী হয়।
নিতু এইবার গান ধরেছে, 'তু গঙ্গা কি মৌজ ম্যায় যমুনা কি ধারা।' ওপারের মন্দিরে ফুট ফুট করে আলো জ্বলে উঠছে। এপারের মন্দিরে আরতির তোড়জোড় শুরু হচ্ছে। টিং-টিং করে ঘণ্টা বাজছে। আমাদের উঠতে হবে। একটা দিন শেষ হয়ে গেল। কড়া নিয়ম। সন্ধের সময় বাড়ি ফিরতে হবেই। বটের ডাল থেকে হুস হুস করে বাদুড় উড়ে যাচ্ছে।
নিতু কিন্তু উঠল না। বসেই রইল।
'কী রে তুই যাবি না?'
'কোথায় যাব?'
'কেন? বাড়িতে!'
'আমার বাড়ি বলে কিছু আছে?'
কথাটা ঠিকই। নিজের বাড়ি আর মামার বাড়িতে অনেক তফাত। মা মারা গেলে মামার বাড়ির আর কী থাকে?
'তুই তা হলে কী করবি?'
'এখানে অনেকক্ষণ বসে বসে গান গাইব। মন্দিরে আরতি শুরু হবে দেখব। তারপর শ্যামলদের বাড়ির রকে গিয়ে বসে থাকব।
আমি বললুম, 'তুই আমাদের বাড়িতে চল।'
'না রে, তোরা এখন লেখাপড়া করবি। আমি গেলে তোদের মা-বাবা বিরক্ত হবেন।'
'কিচ্ছু বিরক্ত হবেন না। তুই চল না। তুইও বসে বসে পড়বি।'
এমন একগুঁয়ে ছেলে, কিছুতেই উঠল না। বললে, 'যার যা জায়গা। তোদের বাড়ি আছে, মা বাবা আছে, ভবিষ্যৎ আছে, আমার কী আছে বল?'
নিতু আবার গান ধরল, 'বচপনকি মোহব্বতকো দিলসে না জুদা কর না।'
নিতু একা বসে রইল গঙ্গার ভাঙাঘাটে। আমরা খেলার মাঠের পাশ দিয়ে বাড়িমুখো হলুম। কিছুটা পথ যেতেই নিতুর ছোটমামার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। হন্তদন্ত হয়ে আসছেন।'
'তোমরা নিতুকে দেখছ? আমাদের নিতু।'
'হ্যাঁ, গঙ্গার ধারে একা একা বসে আছে।'
'দেখেছ, কী কাণ্ড, সারাদিন না খেয়ে আছে।'
নিতু সারাদিন না খেয়ে আছে! কই একবারও তো সে কথা আমাদের বলল না! আবার পান খেয়েছে। নিতুর ছোটমামাকে অনুসরণ করে আবার আমরা ঘাটে ফিরে এলুম। ফিরে আসতে আসতে দূর থেকে নিতুর গলা কানে এল, 'ও জি ও ওও, তু গঙ্গা কি মৌজ মে যমুনা কি ধারা।'
আমাদের আবার ফিরে আসতে দেখে নিতু অবাক হয়ে গেল, 'এ কি তোরা?'
নিতু প্রথমে তার ছোটমামাকে দেখতে পায়নি। বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। বটের ডালে চ্যাঁ-চ্যাঁ করে পেঁচা ডাকছে।
'নিতু।' ছোটমামার গলা শুনে নিতু উঠে দাঁড়াল।
'ছোটমামা তুমি?'
'হ্যাঁ, আমি। চল বাড়ি চল।'
'না, আমি যাব না।'
'যাবি না কেন?'
নিতু চুপ করে আছে। আমরা একসঙ্গে প্রশ্ন করলুম, 'কেন যাবি না? তোর কী হয়েছে? তুই সারাদিন না খেয়ে আছিস কেন? তুই সে কথা আমাদের বললি না কেন?'
আমাদের খুব অভিমান হয়েছে। কেন হবে না! নিতু আমাদের বন্ধু। তার কিছু হওয়া মানে আমাদের হওয়া।
নিতু ধরা ধরা গলায় বললে, 'আমি ঘরের কথা কাউকে বলতে চাই না। মা মারা যাওয়ার দিন আমাকে বলে গিয়েছিলেন, তোর কী হবে জানি না, তবে তোকে মুখ বুজে অনেক কিছু সহ্য করতে হবে। যাই হোক হাসিমুখে থাকবি। নিজের দু:খের কথা পরকে বলবি না।'
নিতুর কথা শুনে আমাদের খুব রাগ হল। আমরা এত নিতু নিতু করি। আমরা হলুম নিতুর পর! বেশ তবে তাই হোক। নিতুর ছোটমামাই বুঝুন নিতুর ব্যাপার। আমাদের কী?
'চ রে চ।' আমরা ফাঁকা খেলার মাঠের পাশ দিয়ে অন্ধকার পথ ধরে যে যার বাড়ি ফিরে গেলুম।
পরের দিন আবার যখন আমরা গঙ্গার ধারে ফিরে এলুম বিকেলের আসরে, তখন নিতুর ওপর আমাদের রাগ পড়ে গেছে। নিতুর ওপর কি রাগ করা যায়? মলয়ের আবার একটা অঙ্ক আটকেছে। এবার সেই বিদঘুটে চৌবাচ্চাটা। একদিক দিয়ে জল ঢুকছে আর দুদিক দিয়ে জল বেরোচ্ছে। মলয় বলল, 'সারা সকাল চেষ্টা করেও এই চৌবাচ্চা ভরতে পারলুম না।'
শ্যামল বললে, 'আগে একটা মিস্ত্রি ডেকে ফুটো বন্ধ করা, তবে যদি ভরতি হয়!'
'সে তো আলাউ করবে না। ওই তিন ফুটোঅলা সর্বনেশে জিনিসটাই ভরতে হবে তা না হলে অঙ্ক!'
সুখেন বলল, 'আমি পকেটে করে আজ খাবার এনেছি। নিতু খান না খাক, পান খেয়ে ঠোঁট রাঙা করে ধাপ্পা মারুক, আজ আর ভুলছি না। আগে খাও, তারপর অন্য কথা।'
গল্পে গল্পে সময় কাটছে, নিতুর কিন্তু আসার নাম নেই। সূর্য ডুবে গেল। মন্দিরে-মন্দিরে আলো জ্বলে উঠল। শ্যামলই প্রথমে আবিষ্কার করল লেখাটা। নীচু হয়ে ঘাটের পৈঠাতে আগের দিনের আঁকা ছবি দেখতে দেখতে লাফিয়ে উঠল, 'এই দ্যাখ, নিতু কী লিখে রেখে গেছে।'
আমরা ঝুঁকে পড়লুম। দিনের শেষ আলোয় লেখাটা পড়া গেল, 'আমি চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি জানি না। এখানে আমার স্থান হল না। যেখানেই থাকি তোদের কথা চিরকাল মনে থাকবে—নিতু।'
আমরা অবাক হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। এই বিশাল পৃথিবীতে নিতু বেমালুম হারিয়ে গেল। আমরাও তার কথা ভুলে বড় হতে হতে প্রায় বুড়ো হয়ে এলুম। আমাদের সেই পেন্টাগন আর নেই। পাঁচটা বাহু পাঁচ দিকে ছিটকে গেছে। আর কেউ নিতুকে মনে রেখেছে কি না জানি না, আমার মন থেকে নিতু কিন্তু মুছে যায়নি। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনেও নিতু বড় হয়েছে। নিতুকে আরও বেশি মনে পড়ত যখনই রেডিওতে বৈজু বাওরার ওই গান দুটো শুনতুম। কতদিন নিতুর মামাদের জিগ্যেস করেছি, বিরক্ত হয়ে বলেছেন, জানি না।
কী ভাবে কী হয়! মনে ইচ্ছে থাকলে হারানো মানুষের সঙ্গে এইভাবে বোধহয় যোগাযোগ হয়ে যায়। অফিসের কাজে আন্দামান গেছি। আন্দামান থেকে জাহাজে 'হাটবে' বলে একটা দ্বীপে গিয়ে নেমেছি। জেটিতে সরকারি জিপ এসেছে। দ্বীপের ভেতরে একটা স্কুল দেখতে যাব। বিশাল-বিশাল গর্জন গাছের সারির মধ্যে ট্রাঙ্ক রোড। জিপ ছুটছে। আমি সামনে বসে আছি ড্রাইভারের পাশে। আমাদের পেছনে বসে আছেন আরও তিনজন। প্রকৃতিতে তন্ময় হয়ে গেছি। এমন দৃশ্য জীবনে দেখিনি। ঘাড়ের কাছে আঙুলের ছোঁয়ার চমকে উঠেছি।
'চিনতে পারিস?'
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকালুম। ফরসা একটা মুখ। হালকা নীল ডোরাকাটা শার্ট। খুব চেনা মুখ। কোথায় দেখেছি, কোথায় দেখেছি।
'তুই নিতু?'
'ইয়েস, আমি নিতু।'
আনন্দের ওপর আনন্দ! ডবল আনন্দ! যে স্কুলে চলেছি, নিতু সেই স্কুলের শিক্ষক! আনন্দে চোখে জল এসে গেছে। পরশমানিক পেলেও মানুষের বোধহয় এত আনন্দ হয় না।
কথা ছিল স্কুল আর দ্বীপের অন্যান্য অংশ দেখে সন্ধের মুখে জাহাজে ফিরে যাব। রাত একটার সময় জাহাজ নোঙর তুলে বহু দূরে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দিকে চলে যাবে। নিতু বলল, রাতের খাওয়া সেরে যা। আমি ঠিক সময়ে তোকে বন্দরে পৌঁছে দোব।
রাজি হয়ে গেলুম। তিরিশ বছর পরে নিতুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা। তিরিশ বছর ধরে যে প্রশ্নটা মনে মনে ঘুরছিল সেইটা দিয়েই শুরু করলুম, 'তুই খাসনি কেন? তোর গালের ডান দিকটা লাল কেন?'
নিতু হো হো করে হেসে উঠল। আমরা তিরিশটা বছর পেরিয়ে গিয়ে সেই গঙ্গার ধারে যেন বসে আছি। আসলে বসে আছি একটা ঢালু সবুজ মাঠে, পাঁচশো ফুট উঁচু একটা গর্জন গাছের তলায়। সামনে ট্রে-তে চা বিস্কুট।
নিতু বললে, 'তাহলে শোন। চড় চাপড় রোজই দু-একটা জুটত, গ্রাহ্য করতুম না। সেদিন যা হয়েছিল তাকে বলে ধোলাই, আড়ং ধোলাই। কারণটা শুনবি, সকালে বড়মামা আমাকে দোকানে বসিয়ে কেনাকাটায় গেলেন। যেসব জিনিস বিক্রি হয় তার দামও বলে গেলেন। কেবল একটা জিনিসের দাম বলতে ভুলে গেলেন, আর আমিও খেয়াল করিনি, সে জিনিসটা হলো সুতোয় বাঁধা হাতলাট্টু। সেই যে ছেলেবেলায় যাকে আমরা বলতুম ইয়োইয়ো জিনিসটা তখন খুব চলেছিল।'
নিতু এক চুমুক চা খেল। 'দোকানে খদ্দেরপাতি তেমন হত না। প্রথমেই যে এল সে একটা ছেলে। কিনবে ওই লাট্টু। মহাবিপদ। দাম জানি না। আবার খদ্দের লক্ষ্মী, হাত ছাড়া করতে মনে লাগে। অনেক ভেবে মনে হল ও জিনিসের দাম আর কত হবে, এক আনা। ছেলেটা লাফাতে লাফাতে কিনে নিলে। ছেলেটা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ব্যবসা একবারে জমজমটা হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবলুম, কী পয়া দোকানদার! মামা বসলে একটা খদ্দেরও আসে না, ভাগনে বসতে না বসতেই লাইন দিয়ে খদ্দের আসছে। দেখতে দেখতে দু ডজন লাট্টু শেষ। দুপুরে দোকান বন্ধ করার সময় বড়মামা এলেন। খুব গদগদ হয়ে বললুম, কী বিক্রি! দু'ডজন লাট্টু শেষ। কত করে বেচলি? বেশ চড়া দামে, এক আনায় একটা। হাতে হাতে পুরস্কার। সপাটে ডান গালে এক চড়। রাসকেল, এই একটা লাট্টুর দাম দশ আনা, আবার এক চড়।'
নিতু হো হো করে হেসে উঠল। চাঁদ উঠেছে, গর্জন গাছের মাথার ওপর। কী নির্জন দ্বীপ! নিতু আর আমি পাশাপাশি বসে আছি। পেন্টাগনের দুটো বাহু অনেকদিন পরে জোড়া লেগেছে। আর তিনটে বাহুর একটা মলয় মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিল, দুর্ঘটনায় মারা গেছে তিন বছর আগে। আর দুটো বাহু শ্যামল আর সুখেন বিদেশে চলে গেছে।
'তারপর?'
নিতু বলল, 'তারপর পথেই জীবন, পথেই মরণ আমাদের। মা বলতেন, মামার বাড়িতে পড়ে থাকলে মানুষ, মানুষ হতে পারে না। বাবা বলতেন, জীবন একটা খেলা, একটা চ্যালেঞ্জ। সেই খেলতে খেলতে কোথায় চল এসেছি দ্যাখ।'
'দেশে আর ফিরবি না?'
'দেশ? কে আছে আমার? কার কাছে ফিরব? এখানকার শ্মশানটা কত সুন্দর জানিস? সমুদ্রের বেলাভূমিতে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে চিতার আগুন নিবিয়ে দেয়। মানুষের অস্থি আর সমুদ্রের ঝিনুক পাশাপাশি থাকে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন