সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রেমের তিন পর্ব। প্রথম তেল পর্ব। দ্বিতীয়, তৈল নিষ্কাশন পর্ব। তৃতীয় বিচ্ছেদ পর্ব। তেল পর্বটা কেমন। তখন প্রেমিকা মহারানি। তিনি প্রেমের সিংহাসনে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। প্রেমিক তাঁর পদতলে পুচ্ছ নৃত্য করছেন। সোহাগের বাণী ফোয়ারার জলের মতো বেরোচ্ছে। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য চুনচুন করে ঈশ্বর যেন তাঁকে তৈরি করেছেন। এমন জিনিস পৃথিবীতে 'এক পিসই' তৈরি হয়েছিল। আহা! কী চুল! কী মুখ! কী কণ্ঠস্বর! কী গড়ন! জগৎ ভোলানো এক মোহিনী! তোমার জন্যে আমি জান লড়িয়ে দেব পেয়ারী। আকাশের চাঁদ চাই। ফায়ার ব্রিগেডের মই লাগিয়ে পেড়ে এনে দেব। তোমার জন্যে বাপ-মাকে পগারপারে পাঠিয়ে দেব। তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর হাসি আর গানে ভরে তুলব। তুমি আমার চোখের মণি। কানের পরদা। হৃদয়ের ধুঁকপুকি। তুমি আমার লিভার পিলে। তুমি যখন আমার বুকে মাথা রাখো, মনে হয় হৃদয়টা টুটি-ফ্রটি হয়ে গেছে। এই নাও আমার মানিব্যাগ, আলমারির চাবি। আমারে করো তোমার বীণা। আমি তোমার পায়ের চটি। রাতের নাইটি। আমি তোমার খিদমতগার। আমি তোমার ঘোড়া। মারলে মরব রাখলে থাকব। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই মানু।
চলতে গিয়ে একটু হোঁচট খেয়েছিল অমনি পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। যত বলে কিছু হয়নি ততই বলে না না তোমার লেগেছে। আমাকে দেখতে দাও আইসক্রিম, চা, ভেলপুরি, আর ফুচকা একসঙ্গে পাঞ্চ করে প্রেমিকাকে খাওয়ায়। রাস্তার ধারে গাছতলায় হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে আসবে। মা আসবেন আটটার ট্রেনে। তিনঘণ্টা লেট। সেই অপেক্ষা আর এই অপেক্ষায় কত তফাত। সেটা বিরক্তিকর আর একটা মধুর। প্রেমিকা এলে বসন্ত আসে। মনের বাগান ফুলে ফুলে ভরে যায়। কোয়েল আর দোয়েল কোরাসে শিস দেয়। তুমি এলে, যেন অনেক দিন পরে বৃষ্টি এল, তুমি এলে। রামধনুকের সেতু দিয়ে তোমার নূপুর পায়ের শব্দ তুলে। সব অপেক্ষা মধুর থেকে মধুরতর। জীবন যেন এক স্বপ্ন ঘোর। যত রাতই হোক প্রেমিকাকে বাড়ির দরজায় পৌঁছে দিয়ে গদগদ গলায় বলা হল, তোমার স্বপ্ন নিয়ে কাটবে আমার সারাটা রাত। তোমার এই না থাকাটা আমার কাছে থাকার চেয়েও বড়। এই সময়টায় গান আসবে, কবিতা আসবে গলগলিয়ে যেন উলটে পড়া ড্রাম থেকে আলকাতরা বেরিয়ে আসছে গলগল করে। আর কতকাল বলো হৃদয় নিয়ে তুমি খেলবে। কাছে এসে দূরে দূরে থাকবে। চোখ বোজালেও সে সেই ডুরে শাড়ি জড়ানো দেহের কবিতা। সেই নূপুর পায়ের চলন! সেই দুচোখের দীঘি। যদি প্রশ্ন করি কেন এই বাঁচা? তোমার জন্যে! তুমি, তুমি, তুমি।
অবশেষে বিয়ে হল। ফাঁকা মাঠ, খোলা আকাশ, সরকারি বাগান থেকে প্রেম উঠে এল দেওয়ালের খাঁচায়। আর প্রেমিক-প্রেমিকা নয় স্বামী-স্ত্রী। শ্রী আর শ্রীমতী। এইবার একটু হিসাব-নিকাশ। এইবার একটু ভুল-ত্রুটি ধরা। যেমন এত দেরিতে ঘুম থেকে উঠলে কি ভাবে চলে? সকালে উঠে চা না পেলে, আমার মেজাজ খিঁচড়ে যায়। যাই বলো তোমার হাতের রান্না আমার মায়ের রান্নার ধারে কাছে যায় না। 'আলনাটা একটু গোছাতেও পারো না। সারাদিন করো কি', 'বিয়ের পর বছর ঘুরে গেল, এখনও নতুন বউ হয়ে থাকলে চলে। এই ইস্ত্রিটিস্ত্রি ধরো। একটু ঝুলটুল ঝাড়ো। 'ব্যাগে তিনটে কুড়ি টাকার নোট ছিল, একটা কম দেখছি নিয়েছ নাকি। ওটা দাও আমার টাকা লাগবে।' এইভাবে ধীরে ধীরে প্রেমের কুয়াশা ফেটে বাস্তবের প্রখর রোদ বেরিয়ে আসবে। প্রেম বড় নরম। বড় অবাস্তব। বাস্তবের হামান দিস্তায় সম্পর্ক থেতো হয়। দুজনে দুজনকে চিনতে শেখে আসল স্বরূপে। শেষে শুরু হয় সংগ্রাম। দেখা যায় ছেলের পরিবার মেয়েটিকে হজম করতে পারছে না। গোটা পরিবার বদ হজমের ঢেকুর তুলতে থাকে। শেষে চলন্তবাসের হাতল ধরে ঝুলন্ত যাত্রী যেমন কোনওক্রমে পাদানিতে টিকে থাকার চেষ্টা করে, মেয়েটির ঠিক সেই অবস্থা হয়। সংসারে এক জবরদস্ত অস্তিত্ব। আইন মোতাবেক আটকে থাকা।
মানুষের স্বভাবে আছে ভ্রমরের স্বভাব। ফুলে ফুলে, উড়ে উড়ে। যৌবনে প্রেম, মধ্যবয়সে পরকীয়া। এই পরকীয়া যদি জীবনে স্বকীয়া হতে চায় তাহলেই শুরু হয় অত্যাচার। তখন সেই প্রেমিক-প্রেমিকা আদালতে। বিচ্ছেদ চাই। হয় এ-পক্ষ চাইছে, না হয় অপর-পক্ষ।
প্রেম আছে, কিন্তু বিবাহেই প্রেমের মৃত্যু। প্রেমিকাকে বিবাহ করা উচিত নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন