সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রত্যাশা কাকে বলে?
আমার জন্য কেউ কিছু করবে। নেতাকে ভোট দিয়ে গদিতে বসালুম। নেতা একটা কিছু করবেন, যাতে আমার ছেলে শিক্ষা পায়। বেঁচে থাকার মতো একটা জীবিকা পায়। আমার পরিবারের মাথার ওপর নীল আকাশ নয়, সর্ব ঋতুর উপযোগী একটা ছাদের ব্যবস্থা হয়। যাক নেতার কাজ নেতা করলেন না। নেতাদের না হয় এইটাই স্বভাব, কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরলেই পাজি। কিন্তু আমার সহোদর তিনি কি করলেন। কোর্টে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে একটা মামলা ঠুকে দিলেন। ভালোই করলেন। জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, আরে এইটাই তো জগতের নিয়ম, ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই। তুমি শোনোনি বুঝি, আপনার চেয়ে পর ভালো। পরের চেয় বন ভালো।' তা সে না হয় হল। দুজনেই উকিলের পকেট ভরাই। ভায়ে ভায়ে কাজিয়া করো উকিলে দালান গড়ো। কিন্তু আমার বউ কি করল, স্বামীর সেবা চুলোয় দিয়ে চুল ছেঁটে ঠোঁটে লিপস্টিক মেরে নারী জাতির বন্ধন উন্মোচনে লেগে গেল। আমার জামার তিনটে বোতাম নেই। এক গেলাস জল চেয়ে পাই না। সকালে চা, দোকানে গিয়ে খেতে হয়। সামান্য অসুখেও সেবা করার ভয়ে নার্সিংহোমে পাঠাতে চায়। জ্ঞানী বললেন, 'তাই না কি! তুমিতো তাহলে জাতে উঠলে। হাই সোসাইটিতে এইরকমই হয়। সেবাধর্ম এখন নীচের তলায়। নীচু জাতের ব্যাপার। তা ভালো, হাই যখন হয়েছি তখন বোতল গেলাস এক করে আরও হাই হয়ে যাই। তা আমার ছেলে কি করল! কোথা থেকে এক পরী জুটিয়ে বুড়ো বাপকে ফেলে উড়ে চলে গেল। জ্ঞানী বললেন, 'তাই নাকি?' তাহলে তো আরও ভালো হল। তুমি তো সাহেব হয়ে গেলে। সাহেবদের দেশে এইরকমই হয়। বাপ-মাকে ফেলে ছেলেরা বউ নিয়ে পালায়।' কী আনন্দ!
কই আনন্দ তো হচ্ছে না। হতাশায় মন ভরে যাচ্ছে। জ্ঞানী বললেন, 'তাই না কি! হতাশা আসছে তা হলে একটা সাধনা করো—কোনও প্রত্যাশা আর রেখো না। প্রত্যাশা থেকেই হতাশা আসে। এসেছ একলা, যাবে একলা, থাকবে একলা, ভাববে একলা। নো প্রবলেম।'
প্রতিশ্রুতি কাকে বলে?
যে কথা কেউ কোনওদিন রাখে না। নির্বিচারে একে তাকে কথা দিয়ে যাও, আশা দিয়ে যাও, কিন্তু বাস্তবে তা কোনওদিন পালন কোরো না। যা বলবে কদাচ তা করবে না; তাহলেই প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রাখা হবে। মাকে বললুম, 'মা এবার শীতে তোমাকে একটা নরম কম্বল কিনে দেব! যেমন হালকা তেমন গরম। সারারাত একটানা তুমি গায়ে রাখতে পারবে না। মাঝে মাঝে গা থেকে একবার করে সরিয়ে দিতে হবে, নয়তো ফোস্কা পড়ে যাবে। বিলিতি কম্বল, দুধের মতো সাদা ধবধবে। তুমি ওই একটা কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকো আমার ভালো লাগে না।' সেই প্রতিশ্রুত কম্বল কি আমি কিনেছিলুম! না। আমি বউয়ের জন্য জর্জেট কিনেছি। নেকলেস কিনেছি। কিনেছি বিদেশি কসমেটিকস। নিজের জন্য তৈরি করেছি তিন প্রস্থ স্যুট। আমার পয়সার অভাব ছিল না। ভুলেও যাইনি। তবু কিনিনি; কারণ কথা দিয়ে কথা রাখলে সে আর কথা থাকে না, হয়ে যায় কাজ। কাজে আর কথায় যোজন প্রমাণ ব্যবধান রাখতে হয়। কথা হল তাত্বিক, অনেক উঁচু স্তরের। কাজ হল কায়িক, অনেক নীচু স্তরের। কথা মতো কাজ করলে কথা খেলো হয়ে যায়। মুরগিতে আর তন্দুরে যা তফাত। কম্বলের কথা ভাবতে ভাবতে কাঁথা গায়ে দিয়েই মা আমার আরও তিনটে বছর পার করে দিলেন। তাঁর সমবয়সি যাঁরাই আসেন সকলকেই বড় মুখ করে বলতে থাকেন, ছেলে আমাকে একটা সাদা সায়েবি কম্বল এনে দেবে। সে না কি সারা রাত গায়ে রাখা যাবে না। মাঝে মাঝে খুলে গা জুড়োতে হবে। মা বলেন। আমি শুনি। ভীষণ ভালো লাগে। যাঁরা শ্রোতা তাদের চোখে-মুখে বিস্ময়। কল্পনায় কম্বল তৈরি হচ্ছে। বাস্তবে এমন কম্বল আছে কিনা আমার জানা নেই। এইভাবেই একদিন মা আমার চলে গেলেন। তাঁর সাততালি মারা কাঁথাটি পড়ে রইল এই পৃথিবীতে, যে পৃথিবীর একটাই মাত্র সত্য 'এই আছি রে বাপ, এই নেই।'
মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এ আমি কী করলুম! জ্ঞানী বললেন, 'ধুর বোকা, নিজের জীবনের দিকে তাকাও। তোমাকে যে যা কথা দিয়েছিল তাই কি রেখেছে?' আমি বসে গেলুম নিজের হিসেব মেলাতে। অবাক হয়ে গেলুম, কেউ কথা রাখেনি। সেই ছেলেবেলা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কেউ কথা দিয়ে কথা রাখেনি। সামান্য সামান্য প্রতিশ্রুতি তাও কারোর পক্ষে রাখা সম্ভব হয়নি। আমার মামার কুকুর ছিল অনেক রকম। বলেছিলুম 'আমাকে একটা বাচ্চা দেবেন?' বলেছিলেন, 'পুষবি? নিশ্চয় দেব। এক একবার সাত আটটা বাচ্চা হয়। এ আর এমন কি?' বছরের পর বছর গেল। বাচ্চার পর বাচ্চা হল। আমাকে কিন্তু একটাও দিলেন না। যাঁদের দিলে তাঁর ব্যাবসার সুবিধে হবে তাঁদেরই দিলেন। মহাদেবদা বলেছিলেন, 'তোকে কুড়ি খানা ঘুড়ি কিনে দেব। আনন্দে সে রাত ঘুম হল না। সারারাত নানা রঙের কুড়িখানা ঘুড়ির কল খাটালুম। মহাদেবদা রোজই ফিরে আসেন খালি হাতে। এক একদিন এক একধরনের গল্প ফাঁদেন। ঘুড়ি নিয়ে বাসে উঠেছিলেন। মানুষের চাপে সব ছিঁড়ে গেল। একদিন বললেন, বৃষ্টিতে সব ভিজে গেল। সব সব মিথ্যে কথা। সেই ছেলেবেলাতেই আমি মিথ্যে কথার আর একটা নাম দিয়েছিলুম মহাদেবদা। কেউ মিথ্যে কথা বললে, বলতুম মহাদেবদা বলছে। আমার মনে খুব ধাক্কা লেগেছিল। প্রাণের বন্ধু বিলেত গিয়েছিল। বলেছিল আসার সময় আমার জন্য একটা কলম আনবে। ফিরে এল আমার জন্য এক গাদা বড় বড় বিদেশের গল্প নিয়ে। কলমের কথা আর তুললই না। কলেজের সহপাঠিণী বলেছিল, তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অচল হয়ে যাবে। সে আমারই এক বন্ধুর সঙ্গে দিব্যি সচল আছে। আমার এক সরকারি বন্ধু বলেছিল, নেকস্ট টাইম তোকে একটা সরকারি ফ্ল্যাট পাইয়ে দেব। সেই নেকস্ট টাইম আর জীবনে এল না। একজন বলেছিলেন, 'আমার মেয়ে বি. এ. পাশ করলেই তাঁর ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। এমনও বলেছিলেন, তোমার মেয়েটিকে দেখে রেখে গেলুম।' চোখের সামনেই দেখলুম ছেলেটির অন্য জায়গায় বিয়ে দিলেন। আমাকে হাসিমুখে নিয়ন্ত্রণ করে গেলেন। কোনও কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। বৃষ্টি পড়ছে। বন্ধু বললেন ফোনে, 'বোসে থাকো। আমি ফেরার পথে তোমাকে লিফট দেব।' আমি আমার অফিসে বসেই আছি। বসেই আছি। সাতটা বাজল, আটটা বাজল। সবাই চলে গেল। বাইরের দুর্যোগ বাড়তেই লাগল ক্রমশ। শেষে আশা ছেড়ে দিয়ে যখন পথে এসে নামলুম, চারপাশে অন্ধকার। ঝোড়ো বাতাস। তিরের ফলার মতো ছুঁচল বৃষ্টির খোঁচা। কোনও যানবাহন নেই। জনপ্রাণী নেই। যখন আর সবাই বেরিয়ে গেল তখন আমিও বেরোতে পারতুম। বেরোলে এই অসহায় অবস্থা হত না। আধমরা অবস্থায় প্রায় মাঝরাতে প্রাণ হাতে করে বাড়ি ফিরে এলুম। ফেরার পথে বন্ধুর বাড়িতে হাঁক মারলুম। বৃষ্টি ভেজা শীতে কাঁপা কাঁপা গলায়। কে একজন বিরক্তি মেশানো গলায় বললেন, 'মাতালটা আবার কে! সে এখন ঘুমোচ্ছে।'
এখন কেউ আমায় প্রতিশ্রুতি দিলে, আমি চোখের সামনে দেখতে পাই ঝোড়ো কালো আকাশ, ছুঁচের মতো বৃষ্টি। পিচ কালো নির্জন পথ আর দিশেহারা একটি মানুষ। জ্ঞানী বললেন, 'নিজেকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস কোরো না।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন