সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মানুষ হলেও তাকে নানাভাবে আর একবার মানুষ হতে হবে। যেমন হীরে! প্রথমে একটা তাল। কোনও শোভা নেই। এইবার জহুরি সেটাকে কেটে কুটে, নানারকম কোণ বের করে জ্বলজ্বলে, মহামূল্য মণিটি করে বাজারে ছেড়ে দেবে। তখন তার দাম হবে লাখ লাখ টাকা।
সেইরকম, ট্যাঁ করে জন্মালেই হল না। স্কুল, কলেজে যেতে হবে। সভ্যতার আদি যুগে ছিল চণ্ডীমণ্ডপে পণ্ডিতমশাই-এর পাঠশালা। মণ্ডপ ভেঙে গেছে। ও সব চলবে না, চলবে না। জমিদার বাবুরা সব খালি বোতলের মতো কাত হয়ে গড়াগড়ি গেলেন। বাইজিরা সব পরদায় উঠে গেলেন। পণ্ডিতরা সব এ. বি. সি. পড়ে সেরেস্তায় গিয়ে কলমপেশার কাজ নিলেন। এসে গেল ইংরিজি স্কুল। 'স্যার'-দের প্রাদুর্ভাব। এসে গেল 'কলেজ'। ইংরেজরা বাড়ি ফিরে গেলেন। 'কালেজ' হল কলেজ। দিশি স্কুলের পাশে বসল 'ইংলিশ মিডিয়াম'। কেজি, নার্সারি। দুটো শোওয়ার ঘর, একটা বারান্দা, একজন মর্ডান দিদিমণি, গোটা পঁচিশ মানুষের বাচ্চা আর কোনও খ্রিশ্চান সন্তের নাম, সেন্ট মেরিজ, সেন্ট অ্যগনেস, হয়ে গেল কমপ্লিট। চালাও জ্যাক অ্যান্ড জিল। হামটি ডামটিকে তুলে দাও পাঁচিলে।
দিশি স্কুলের দশ দশা, ঘুঘু চরার অবস্থা। জরাজীর্ণ বাঁশ গোলার মালিক স্কুল কমিটির সেক্রেটারি। তিনি গাড়ির হর্নকে বলেন হরেন। স্ক্রুকে বলেন ইস্কুরুপ। ট্যাকসিকে বলেন ট্যাসকি। আগে রেসকা চাপতেন এখন বাঁশ আর রাজনীতির কল্যাণে মোটর গাড়ি। অ্যাকসিলেটার এঁর উচ্চারণে অ্যাসকিলেটার। ওয়াইপারকে বলেন হুইপার। শক অ্যাবসর্বার এঁর মহান উচ্চারণ শচ অ্যাসবর্বার। ট্রাফিক জাম্প। এঁর স্ত্রীর পেট অপারেশান করেছিলেন, কলকাতার বিখ্যাত সার্জেন্ট! এই ভদ্রলোক পাড়ার একটি 'কেলাবে'রও মহামান্য প্রেসিডিন্ট।
দিশি স্কুলে নাম লিখিয়ে ভুবনদার টিউটোরিয়াল ভরসা। লেটার নাই বা পেলুম লাভলেটার পেলেই হল। একটি প্রেমিক একটি প্রেমিকা। মানুষকে তো প্রেমিক হওয়ার উপদেশই দেওয়া হয়েছে—নাচেঙ্গে গায়েঙ্গে আয়েস করেঙ্গে। চলো খাণ্ডালা। পাড়াগুলো এখন সব প্রেমের ডিপো। নির্জন জায়গা প্রেমের পীঠস্থান।
ঠাকুরদা খালি পায়ে স্কুলে যেতেন। মানুষ শ্রদ্ধা করতেন। বাবার পায়ে চটি উঠেছিল। ছেলের গলায় নেকটাই। কারণ সে হামটি ডামটির ঘরের লোক। সে সায়েবের বাচ্চা সেজে 'সেন্টলি' স্কুলে যায়। এমন ইংরিজি বলে, সায়েবরাও হার মানবে। গ্রামারের বালাই নেই। ঝটাঝট শব্দগুলো আলটপকা ছেড়ে দাও। সেদিন দুটি বাঙালি ইংরেজ মেয়ে এইভাবে কথা বলছিল, 'আই, মিন ইয়া, ফিশ ফ্রাই, নো নো উইথ সস অ্যান্ড স্যালাড, আই মিন ইয়া, ডিললিশাস। কাম অন, কাম অন।' একটি মেয়ের উত্তর, 'ইন এ হারি, ইয়া, আমি মিন, লেটস গো, রোল ফ্রম কাউন্টার, বাইট অ্যান্ড ওয়াক, ইয়া দ্যাটস ফাইন।'
ইংলিশ মিডিয়ামেই তৈরি হবে একালের শ্রেষ্ঠ মানুষ। এম. বি. এ. পড়ে ম্যানেজার হবে। পার্কস-টার্কস নিয়ে প্রচুর মাইনে। সাজানো ফ্ল্যাট। বাহারি বউ। তিনি আবার 'বুটিক' খুলবেন। লেডিজ ক্লাবের সদস্য হবেন। আর সদা সর্বদা ভুরু কুঁচকে বিশ্বের মানুষকে জ্ঞান দেবেন। এইডসের ওপর সেমিনার করবেন। কিশোর ভৃত্যকে উত্তম মধ্যম পেটাবেন। সদা ব্যস্ত। এইরকম পরিবারে বুড়ো বাবা-মাদের অনাদর চোখে পড়ার মতো। একটি ঘরে বা বারান্দায় উদাস হয়ে বসে থাকেন। মরতে পারছেন না বলেই বেঁচে আছেন। পুত্রবধূর প্রবল দাপট আর কেঁচোসম পুত্রের মিউ মিউ। পুত্রবধূ লেডিজ ক্লাবে সারা বিশ্বের দু:খ দূরীকরণে উৎসাহী, বধূহত্যা, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব কিন্তু বৃদ্ধ শ্বশুর, বৃদ্ধা শাশুড়িকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। শ্বশুর আর শাশুড়ি ক্লাসের মানুষরা তাঁর চোখে আরশোলাও অধম। কেন জন্মায় এরা! বুড়োটাকে যদিও সহ্য হয়, বুড়িটাকে দেখলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে যায়। ও বউমা, বলে বুড়িটা যখন উপদেশ দিতে আসে, মনে হয় মুখে নুড়ো জ্বেলে দি! বধূহত্যা অপরাধ, শ্বশুরের বউয়ের গলা টিপে পুঁটকি পাঁট করলে অক্ষয় স্বর্গবাস।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন