সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এমনিই আমাদের সংসার হাওয়া খেয়ে চলেছে, তার ওপর দাদাকে নিয়ে এক অশান্তি। মেজাজ করে রেখেছে একেবারে দুর্বাসা মুনির মতো। পান থেকে চুন খসলেই হল। তেলে বেগুনের মতো জ্বলে উঠবে, আর যত কোপ আমার ভালো মানুষ বউদির ওপর। খেটে খেটে বেচারার সোনার বর্ণ কালি হয়ে গেছে। দাদার ভয়ে একেবারে টুঁ শব্দটি করে না। সবই দেখি, করার কিছু নেই। বেকার বসে আছি আজ বছর তিনেক। যাও বা একটা চাকরি জুটেছিল, চলবে না চলবে না করে তাও চলে গেল। পাক্কা তিন বছর হয়ে গেল, ধর্মঘটের নেতারা প্রতিষ্ঠানের দরমায় আষ্টেপৃষ্টে দাবির ফিরিস্তি সেঁটে, বন্ধ গেটের সামনে পালা করে অষ্টপ্রহর তাস পিটে চলেছে, আর আমরা মাসে মাসে চাঁদা দিয়ে চলেছি। মালিকরা অন্য স্টেটে গিয়ে কারখানা খুলে বসেছে। হায় আন্দোলন!
একটু আগে দাদা অফিস থেকে ফিরেছে। আসার আগে একটা টিউশনি সেরেছে। ছেলে ঠেঙানো কী জিনিস সে আমি জানি। বকে বকে মুখে ফেনা উঠে যায়। শিক্ষকতা করতে গেলে খাঁটি গব্যঘৃত খেতে হয়। এ বাজারে সে মাল জুটবে কোথায়!
বউদি বোধহয় চা করে নিয়ে গিয়েছিল। চিনি কম, কি লিকার পাতলা, কী হয়েছিল কে জানে! মিনিট পাঁচেক হয়ে গেল খুব হম্বিতম্বি চলছে। বউদি যথারীতি নীরব! এ কায়দাটা বউদি ভালো রপ্ত করেছে। দু'পক্ষই সরব হলে আগুন জ্বলে যেত।
হঠাৎ কাপ ডিশ পড়ার শব্দ হল। এ কী! দাদার আর যাই হোক ভাঙাচোরার স্বভাব তো ছিল না। ভয়ে ভয়ে ঘরের বাইরে থেকে উঁকি মারলুম। এ দেশে ইদানীং বউ মারার হিড়িক পড়েছে। বড়ো ছোঁয়াচে রোগ। বউদি দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে, দাদা চেয়ারে কাত। মেঝেতে কাপ আর ডিশ পড়ে ছত্রখান। ঢাল বেয়ে চা গড়িয়ে চলেছে। দাদা দু'হাতে বুকের মাঝখানটা চেপে ধরে আছে। সর্বনাশ! হার্ট অ্যাটাক নাকি? থ্রম্বোসিসের সঙ্গে চা আর বাথরুমের ভীষণ যোগ।
লাফিয়ে ঘরে ঢুকে জিগ্যেস করলুম, কী হল দাদা?
কোনওরকমে ফিসফিস করে বললে, হয়ে গেছে। বড় যন্ত্রণা।
বউদি ছুটে এসে বুকে হাত বোলাতে বোলাতে বললে, ঠাকুরপো, ডাক্তার!
এই অবস্থায় মানুষের আর কাণ্ডকাণ্ড জ্ঞান থাকে না। কোনওরকমে সাইকেলটা বের করে ছুটলুম, ডক্টর চঞ্চল মিত্রের চেম্বারের দিকে। আর কোনও নাম আমার মনে এল না। ডক্টর মিত্র বিলেত ফেরত হার্ট স্পেসালিস্ট। তিনি ছাড়া আর কে দাদাকে সামলাতে পারেন। চৌষট্টি টাকার ধাক্কা। তা হোক। জীবন বড়, না টাকা বড়?
ডক্টর মিত্রের চেম্বারে লাইন পড়ে গেছে। নীল রঙের ঝকঝকে বিলিতি গাড়ি রাস্তার একপাশে বাপ-কা বেটার মতো দাঁড়িয়ে আছে। দেখলেই ভয় আর ভক্তি দুটোতেই মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। ভেতরের চেম্বারে রাগী রাগী চেহারারা অসম্ভব ফরসা এক মানুষ একজনের ব্লাডপ্রেসার পরীক্ষা করছিলেন। মুখ তুলে তাকালেন। চোখে প্রশ্ন।
ডাক্তারবাবু, দাদা হঠাৎ সেনসলেস হয়ে গেছেন।
ফার্স্ট না সেকেন্ড অ্যাটাক?
আজ্ঞে ফার্স্ট।
ভেবেছিলুম বলবেন, আমার সময় নেই, হাতে পেশেন্ট রয়েছে। অন্য কাউকে ধরে নিয়ে যান। তা কিন্তু বললেন না। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, চলুন। যাঁর প্রেসার দেখছিলেন, তাঁর হাত থেকে প্রেসার মাপা যন্ত্র খুলে নিলেন। ভদ্রলোক রাগ রাগ গলায় বললেন, কী হল?
ডাক্তারবাবু শান্ত গলায় বললেন, আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেও মারা যাবেন না, এটা হল লাইফ অ্যান্ড ডেথের প্রশ্ন। এমার্জেনসি। বসে বসে ম্যাগাজিন পড়ুন, গান শুনুন। এই ভাস্কর!
ভাস্কর মনে হয় অ্যাসিসট্যান্ট। ভারী সৌম্য চেহারা। বললে, বলুন স্যার?
গান চালিয়ে দাও, সফট মিউজিক। আমি আসছি।
ব্যাগ হাতে ডাক্তারবাবু আমার পাশে পাশে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
আমার মানসিক দুর্বলতা অনেকটা কেটে এসেছে। প্রকৃত যিনি বৈদ্য, তিনি তো শুধু ফি নিয়ে প্রেসক্রিপশন লেখেন না, তিনি রুগির মনে, রুগির আত্মীয়-স্বজনের মনে একধরনের ভয়শূন্যতা সৃষ্টি করেন। মনে হয় যেন ঈশ্বরের হাতে সব সমর্পণ করে দিতে পেরেছি। রাখে কেষ্ট মারে কে, মারে কেষ্ট রাখে কে?
ডাক্তারবাবু বললেন, ভয় পাবেন না, ফার্স্ট অ্যাটাক, মনে হয় সামলে দিতে পারব।
আমার চোখে জল এসে গেল। মনে হল, সব ডাক্তারই কি এমন না ইনি হৃদয় নিয়ে আছেন বলেই এমন হৃদয়বান!
কী ভাবে জানি না, দাদা বিছানায় শুয়ে পড়েছেন। মাথার কাছে বউদি বসে, হালভাঙা নাবিকের মতো, ঘটনা স্রোত যেদিকে নিয়ে যায়। পায়ের কাছে শিশু ভাইপো। চোখে জল টলটল করছে। ডাক্তারবাবুকে দেখে বউদি ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। ভাইপো কাঁদো কাঁদো গলায় বললে, আমার বাবা।
ডাক্তারবাবু স্টেথিসকোপ ধরা হাত তুলে বললেন, কিছু ভয় নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই সামান্য কথায় রুগির ঘরে অদ্ভুত একটা বিশ্বাস নেমে এল। শমন যেন থমকে দাঁড়াল। মৃত্যু নামক জোঁকের মুখে নুনের ছিটে পড়ল। দাদা হঠাৎ চলে গেলে সংসারের কী হবে রে বাবা! ভাবা যায় না! সব থেকে বিশ্রী অবস্থা হবে আমার। বউদি আর ভাইপোকে বয়ে বেড়াতে হবে সারা জীবন। যে মেয়েটিকে ভালোবাসি তাকে আর বিয়ে করা যাবে না। ভীষ্মের বরাত নিয়ে সংসার সমরাঙ্গনে শরশয্যার ব্যবস্থা পাকা হয়ে যাবে।
রুগিকে পরীক্ষা করতে করতে ডাক্তারবাবু মুখ তুলে বললেন, না বাড়িতে হবে না, হাসপাতালেই নিয়ে যেতে হবে। বায়ুর ঊর্ধ্ব চাপ নয়, হার্টের সাউন্ড সুবিধের ঠেকছে না।
হাসপাতালের নাম শুনে বুক কেঁপে উঠল। বাবা কয়েক বছর আগেই ফ্রি-বেডে প্রায় বিনা চিকিৎসায় অসীম অবহেলায় কুকুর বেড়ালের মতো মারা গেছেন। হয়তো বেঁচেই ফিরতেন, যদি না হাসপাতাল কর্মীরা সেইসময় আন্দোলনে নামতেন। রুগিদের সেইসময় কী অবস্থা! নাকে নল আছে, সিলিন্ডারে অক্সিজেন নেই। সিলিন্ডারে অক্সিজেন আছে, তো নাক থেকে নল খুলে গেছে। দেখার কেউ নেই। বোতলে স্যালাইন নেই, হাতে ছুঁচ ঢুকে আছে। বেডপ্যানের জোগাড় নেই, কুম্ভক করে বসে আছেন। বিছানার তলায় রাস্তার কুকুর ঢুকে বসে আছে। আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুঁড়ে বোমা ফাটিয়ে এমন এক দক্ষযজ্ঞ করলেন, দু-চারটে হার্টের পেশেন্ট হার্টলেস ওয়ার্লড থেকে, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, বলে পগার পারে চলে গেলেন। বাবাও তাঁদের মধ্যে একজন।
সেই হাসপাতালের নাম শুনে গলা শুকিয়ে গেল। বউদিন মৃদু গলায় বললে, তা হলে তো অ্যাম্বুলেন্স চাই! সে তো আজ বললে কাল আসবে।
ডাক্তারবাবু বললেন, সে যুগ নেই। এখন রিসিভার তুললেই নিমেষে চলে আসে। আপনারা বোধহয় অনেকদিন পরীক্ষা করে দেখেননি! মানুষ আর কতকাল অমানুষ থাকবে! আমাদের দেশে সবই ছিল, মানুষ ছিল না। মানুষ আবার মানুষে ফিরে আসতে শুরু করেছে। চেম্বারে রুগি না থাকলে আমার গাড়িতেই পৌঁছে দিতুম।
বউদিকে ফিসফিস করে বললুম, ফিজটা দাও।
বউদিন ফিসফিস করেই বললে, টাকা কোথায়, শেষ মাস না!
ডাক্তারবাবু শুনে ফেলেছেন। এক মুখ হেসে বললেন, কিছু ভাববেন না। ফিজ দেনে-ওয়ালারা ঘর আলো করে বসে আছেন। বুঝেছি হাত খালি। আপনারাই বরং কিছু টাকা রাখুন, পরে শোধ করে দেবেন।
বউদি আর আমি অবাক হয়ে দু'জনে দু'জনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। এই কি সেই পৃথিবী। যাকে আমরা বলি হৃদয়হীন, নিষ্করুণ। যা কিনা টাকার বলবেয়ারিং-এ ঘুরছে। এখন আমার বলতে ইচ্ছে করছে, সত্য সেলুকাস কী...।
বিশ্বাস থেকে যেমন অবিশ্বাস, অবিশ্বাস থেকে তেমনি বিশ্বাস। অ্যাম্বুলেন্স সত্যিই এসে গেল। হাসি হাসি মুখ দুজন স্ট্রেচার-ধারী স্নেহের গলায় জিগ্যেস করলেন, কী কেস? হার্ট?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তাহলে তো এ স্ট্রেচার চলবে না। বিমান, তুমি ওই স্পঞ্জ লাগানো, ইলেকট্রনিক লেভেল কন্ট্রোল লাগানো, শকপ্রুফ বিদেশি স্ট্রেচার নামাও। রুগিকে রেকর্ডপ্লেয়ারের মতো সমান রাখতে হবে।
বাবা! সে আবার কী জিনিস! দেশটা রাতারাতি ইওরোপ, আমেরিকা হয়ে গেল না কি! চাকা লাগানো সুদৃশ্য একটি স্ট্রেচার নেমে এল। কোথাও কোনও দাগ নেই। বাগান থেকে তুলে আনা শিশির ভেজা ফুলকপির মতো টাটকা। ওরা দাদাকে এমন সযত্নে বিছানা থেকে তুলে স্ট্রেচারে রাখলেন, যেন মা তার কোলের শিশুটিকে সাবধানে দোলায় শুইয়ে দিচ্ছে। ঈশ্বর দ্যাখো, মানুষের প্রতি মানুষের কী ভালোবাসা! আমার দাদাকে আমিও বোধহয় এত ভালোবাসি না। দাদা এখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে তাই এত বড় একটা ব্যাপার টের পেল না। পেলে আর বলতে পারত না, রোজ যেমন বলে, ভালোয় ভালোয় এবার সরে পড়তে পারলেই বাঁচি।
ঝড়ের বেগে অ্যাম্বুলেন্স চলেছে। মাথার নীল আলো চক্রাকারে ঘুরছে। অ্যাম্বুলেন্স দেখে সমস্ত গাড়ি পথ ছেড়ে দিচ্ছে। সাংঘাতিক লরিও বাধ্য পশুর মতো একপাশে সরে যাচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ হাত নামিয়েই নিচ্ছে। ভাবা যায় না! একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, কি প্রধানমন্ত্রী, কি রাষ্ট্রপতির বরাতেই এমন খাতির জোটে। দেশটা কবে এমন হয়ে গেল। কালও কি এমন ছিল! গাড়ির ভেতরে গুনগুন করে পাখা চলছে। চারপাশ কাচ দিয়ে এমনভাবে ঢাকা, বাইরের কোনও শব্দই কানে আসছে না। আমি বউদি আর ভাইপো মান্তু একপাশে চুপ করে বসে আছি। সামনে স্ট্রেচারে দাদা। দাদার পায়ের কাছে বিমানবাবু।
হাসপাতালের গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকছে। কী আশ্চর্য, কয়েক দিন আগেও গেটের মাথার আলাকিত লেখাটি ভেঙে ত্রিভঙ্গ হয়েছিল। আজ একেবারে কটকট করে জ্বলছে। ফুটপাথে কিছুদিন আগেও দেখেছিলুম আবর্জনা পড়ে আছে কাদা মাখামাখি হয়ে। আজ সব সাফসুফ। চারপাশে তকতক করছে। মনে পড়ল, বিদেশি একজন ক্রিকেট খেলোয়াড় আমাদের হাসতাপালকে বলেছিলেন, শূকরের খোঁয়ার। সেই ভদ্রলোককে আজ একবার ডেকে নিয়ে এলে হয়।
অ্যাম্বুলেন্স এমার্জেন্সির সামনে এসে দাঁড়াল। খুট শব্দে আমাদের দরজা খুলে গেল। সাদা পোশাক পরা দুজন কর্মী সামনে দাঁড়িয়ে। গলায় স্টেথিসকোপ ঝুলছে মালার মতো। তাঁরা খুব বিনীতভাবে বললেন, ডক্টর মিত্র? হার্ট?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আপনারা চলে আসুন।
আমরা নেমে দাঁড়ালুম। সত্যি বলছি, এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহারের জন্যে আমরা প্রস্তুত ছিলুম না। এতকাল যা শুনে এসেছি, যা দেখে এসেছি সব মিথ্যে। শুনেছি, এমার্জেন্সিতে কেলোর কীর্তি হয়। কোনও অ্যাটেনডিং ফিজিশিয়ান থাকেন না। আর. এম. ও.-কে কোয়ার্টার থেকে গান পয়েন্টে টেনে আনতে হয়। মরণাপন্ন রুগি মেঝেতে কাতরাতে থাকে। কীভাবে আমাদের ব্রেন-ওয়াশ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠান বিরোধী অপ-প্রচারকের দল!
ডক্টর মিত্রের সত্যিই কোনও তুলনা হয় না। শুধু অ্যাম্বুলেন্স নয়, হাসপাতালেও খবর দিয়ে রেখেছেন। জুনিয়র ডাক্তার দুজন বললেন এঁকে আমরা কার্ডিয়াক ইউনিটে নিয়ে যাচ্ছি। বেড নাম্বার থার্টি টু। ওই যে দক্ষিণ দিকের ব্লক। আপনারা সুপারিনটেন্ডেন্টের ঘর থেকে খাতাপত্তর সই করে আসুন। কোনও ভয় নেই। চিয়ার আপ।
করিডর ধরে সুপারিনটেন্ডেন্টের অফিসের দিকে যেতে যেতে মনে হল বিলেতের হাসপাতালে চলে এলুম না কি! চারপাশ ছবির মতো ঝকঝকে তকতকে। ডিসইনফেকট্যান্টের পরিচিত গন্ধ। পাশ দিয়ে সিস্টার আর ডাক্তাররা হেঁটে চলেছেন এমনভাবে, যেন অনুপ্রাণিত হাঁটা। উদ্দেশ্যহীন প্রমোদভ্রমণ নয়। কোথাও উঁচু গলায় কথা নেই। এয়ার কন্ডিশানিং প্ল্যান্টের ঝিরিঝিরি জল পড়ার শব্দ।
সুপারের ঘরে ঢুকতেই মুখ তুলে বললেন, আসুন। বসুন। আমি দেখেছি আপনারা এসেছেন।
কী করে দেখলেন! পরক্ষণেই বুঝতে পারলুম। প্রশ্নের প্রয়োজন হল না। সামনেই একটি ক্লোজড সার্কিট পর্দায় সারা হাসপাতাল ভাসছে। ঘরে আর একজন ডাক্তার ছিলেন। সুপার তাকে বলছেন, ব্যাপারটাকে আপনি ছোট করে দেখবেন না। আমরা এখানে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করতে আসিনি। জনসেবাই আমাদের প্রাোফেশনের মন্ত্র, শপথ। আপনাদের আমি বলেছি, যত দিন না ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ আসছে, ততদিন একটা করে ইনজেকশন দেবেন আর নিডলটা খুলে ফেলে দেবেন। থ্রো অ্যাওয়ে দি নিডল। নিডল বড়, না জীবন বড় ডক্টর সেন?
জীবন? কিন্তু প্রশ্নটা হল টাকার।
টাকার জন্যে কোনও ভালো কাজ আটকে থাকে না। চাই ইচ্ছে। উইল টু ডু। আমাদের দেশে পুলিশ-খাতে কত ব্যয় হয়! ফরেন ট্যুরে কত টাকা যায়! তীর্থস্থানে এই যে এত বড় বড় মন্দির তৈরি হয়েছে, কীভাবে হয়েছে? সাধু সন্ন্যাসীরা টাটা বিড়লা নয়। সব হয়েছে মনের জোরে, অদম্য ইচ্ছায়। মানুষকে মানুষ ভাবতে শিখুন ডক্টর সেন। জমানা বদল গিয়া। এতকাল অর্থটাকেই আপন ভেবেছেন, স্বার্থকে ভেবেছেন অর্ধাঙ্গিনী। মানসিকতা পালটান। আমরা ঈশ্বরের কাছাকাছি চলে গেছি। চাঁদে আমাদের রকেট ল্যান্ড করেছে। মঙ্গলের পাশ দিয়ে হুস করে উড়ে গেছে। ডক্টর গাঙ্গুলিকে আপনি বাড়ি যেতে বলুন। এই প্রাোফেশনের তিনি অযোগ্য। রুগির দিকে যিনি হাসি-হাসি একটি মুখ তুলে ধরতে পারেন না, ধৈর্য ধরে রুগিদের দুটো কথা শুনতে যিনি বিরক্ত হন, হি হিমসেলফ ইজ এ রুগি।
ডক্টর সেন বললেন, এঁরা অপেক্ষা করছেন স্যার!
ও হ্যাঁ। আমি আজকাল বড়ো ভাবপ্রবণ হয়ে উঠছি। আপনারা যদি আমাকে একটু সাহায্য করতেন, সামান্য একটু কো-অপারেশন! আমাদের এই অবস্থাটা হল ঈশ্বরের টিথিং ট্রাবল। ঈশ্বর হওয়ার মুখে মানুষের এই রকম হয়। অলরাইট! আপনি ফার্স্ট ফ্লোরের সবকটা ল্যাভেটারি একবার ইনসপেকট করুন। তারপর একবার দেখে আসুন, ধোবীখানার পেছনে কোনও উৎপাত জুটেছে কি না! বুঝতে পারছেন, কী বলছি? হাসপাতাল হল জীবনদায়িনী কারখানা। ভাং, জুয়া, ডিস্টিলারি—ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও। দশ চক্রে ভগবান ভূত।
উত্তেজনায় দুম করে খাতা খুলে বললন, সরি! একটু শব্দ হয়ে গেল। নিন বলুন নাম, ঠিকানা, বয়স, মেল, ফিমেল, ম্যারিট্যাল স্ট্যাটাস, বেকার না সকার, আশ্রিতের সংখ্যা, মাসিক উপার্জন।
ঝটপট সব লেখা হয়ে গেল। আমরা এখন তা হলে কী করব স্যার! কার্ডিয়াক ওয়ার্ডের বত্রিশ নম্বরে তা হলে যাই আমরা? বড় দুশ্চিন্তায় আছি।
যাওয়ার প্রয়োজন নেই, এখানে বসেই দেখুন। ওয়ার্ডে বাইরে কাউকে আমরা আর অ্যালাউ করছি না। বাইরে থেকে কখনও তাঁরা ঝগড়া নিয়ে আসেন, সমস্যা নিয়ে আসেন, ভাইরাস নিয়ে আসেন, সামটাইমস একসট্রিম কেসে অস্ত্রও নিয়ে আসেন। আমাদের সিসটেমটা এখন 'কাউন্টার-ডেলিভারি'। কাউন্টারে রুগি জমা দিয়ে, কাউন্টারেই ডেলিভারি নেবেন। আচ্ছা, সি থার্টি টু।
প্যানেলে সারি সারি বোতামের ভেতর সুপার দেখে দেখে একটা টিপলেন। পর্দায় সাদা। বাপরে কী এলাহি ব্যবস্থা! দুজন ডাক্তারবাবু, তিনজন নার্স, ঝকঝকে বেড। বেশ বোঝা গেল ই. সি. জি. হচ্ছে। মাথার দিকে অক্সিজেন সিলিন্ডার।
সন্দেহ প্রকাশ করে ফেললুম, স্যার, সিলিন্ডারে মাল আছে তো!
সুপার ইন্টারকম তুললেন। পর্দায় দেখা গেল, একজন সিস্টার রিসিভার তুললেন। সুপার বললেন, চেক সিলিন্ডার।
আবার একটা সন্দেহের কথা বলে ফেললুম, স্যার আমার বাবার নাক থেকে অকসিজেনের নল খুলে পড়ে গিয়েছিল, অ্যান্ড হি...।
হতে পারে, হতে পারে, অনেক সময় ভোঁতা নাক হলে, কি গোঁফ থাকলে ওরকম হয়। আমাদের দেশি স্টিকারও তেমন জোরদার নয়। সাবধানের মার নেই।
আবার ইন্টারকম! ও প্রান্তে নির্দেশ গেল, দুজন সিস্টার সারারাত দুপাশ থেকে দুটো নল ধরে বসে থাকবে। এবং তৃতীয় জন নজর রাখবে ওরা যেন ঘুমিয়ে না পড়ে। হ্যাঁ, আর একটা কথা, একটা বেডপ্যান এখন থেকেই দিয়ে রাখো। এর নাম দূরদর্শিতা। ভদ্রলোক শুনছি অফিস থেকে এসেই আক্রান্ত হয়েছেন, বাথরুমে যাওয়ার সময় পাননি। আমার কথা হল, চাইতে যেন না হয়। জাস্ট লাইক নেমন্তন্ন বাড়ি। বারে বারে ঘুরিয়ে যাও। রিপিট অ্যান্ড রিপিট! ও কি ইনজেকশন! নিডল নিডল। বি কেয়ারফুল অ্যাবাউট নিডল।
ইন্টারকম ছেড়ে দিলেন। ভয়ে বললুম, স্যার আমরা গরিব মানুষ, তিনজন নার্স, এই এলাহি ব্যাপার, এ তো স্যার অমিতাভ বচ্চন...
থামুন মশাই। শিক্ষা আর স্বাস্থ্য স্টেটের দায়িত্ব। রাশিয়ার কথা শোনেননি!
এটা তো স্যার রাশিয়া নয়।
ভালো কিছুর অনুকরণ কালে সাচ্চা হয়ে যায়। যান বাড়ি যান। তেমন কিছু হলে মেসেঞ্জার যাবে।
আচ্ছা, কেসটা কি খুব সিরিয়াস! টেঁসে যাওয়ার চান্স আছে?
আজ্ঞে, হার্ট জিনিসটা তো ঠিক বোঝা যায় না, কখন কী করে বসে?
ঠিক ঠিক, দেহটা পুরুষের হলেও হৃদয় একেবারে মেয়েমানুষ। না:, রিস্ক না নিয়ে টপকে একবার রেফার করি। স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হীরের চেয়েও মূল্যবান!
সুপার রিসিভার তুললেন, হ্যালো, ডক্টর বাসুলী, কী স্যার রেস্ট নিচ্ছেন? আই অ্যাম সরি। আই অ্যাম সরি। কিন্তু উপায় নেই, আমি আপনার নির্দেশমতো কাজ করতে বাধ্য। একটি মধ্যবিত্ত কার্ডিয়াক পেশেন্ট, ফার্স্ট অ্যাটাক, স্ত্রী, একটি বাচ্চা! রাইট স্যার, বড়লোক দুনম্বরি মাল নয়, খাঁটি মধ্যবিত্ত, অদ্য ভক্ষ্য ধনুর্গুণ, হ্যাঁ স্যার, মরলে ফ্যামিলি পথে বসবে। কী স্যার? অ, ভেবে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আপনি আসছেন, যে অবস্থায়, মানে পাজামা, অ লুঙ্গি! শ্যান্ডো। প্যান্টটা স্যার গলিয়ে নিলে হত না! অ, সময়, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সময় একটা ফ্যাকটার। রাইট স্যার, আমি বাইরে যাচ্ছি।
সুপার রিসিভার নামালেন। ভারতবর্ষের এক নম্বর আসছেন, তিন নম্বর একজন সিটিজেনের জন্যে। ভাবা যায় না।
টেবিলের তলায় আঁচড়াবার শব্দে সুপার নীচের দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠলেন, ব্যাটা, তুমি এইখানে! বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা, আমি তোমায় টিভিতে খুঁজছি, অ্যান্ড ইউ আর হিয়ার। শেষ কুকুর।
উত্তেজনায় সুপার সেই শেষ লেড়িটিকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুললেন! দৃকপাত নেই। ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক করে কুকুর কামড়াচ্ছে, তবু ছাড়ছেন না। দরজার দিকে এগোচ্ছেন আর বলছেন, জলাতঙ্কে মরি সেও ভালো, শেষ কুকুর আমি বিদায় করবই। আমি চাই কুকুর-মুক্ত পরিবেশ। ডগ-ফ্রি অ্যাডমিনসট্রেশন। কামড়া, কামড়া, ব্যাক বাইট, ফ্রন্ট বাইট। আজ আর তোমায় ছাড়ছি না।
বাইরে এসে দুম করে কুকুরটাকে আছড়ে ফেললেন। শেষ লেড়ির শেষ চিৎকারে হাসপাতালের আকাশ কেঁপে গেল। আর সেই কাঁপন থামতে থামতে, নীল আলোয় অন্ধকার চিরে এগিয়ে এল ডক্টর বাসুলীর গাড়ি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন