আজও দাঁড়িয়ে আছি

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শরৎ আর শীত এই দুটি ঋতু অতীতের ঢাকনা খুলে দেয়। যত বর্তমান সব অতীতের প্রান্তরে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক জায়গা সেখানে। ওইটাই মনে হয় অনন্তের ঠিকানা। গত আর আগতের মাঝখানে বর্তমান একটা চৌকাঠ মাত্র। ভবিষ্যৎ টপকে অতীতের তেপান্তরে চলে যাচ্ছে সেখানে মিঠে আলো, মিঠে রোদ। সংঘাতশূন্য মৃতুহীন একটা জায়গা। ভবিষ্যৎ বর্তমানে এসে মরে গিয়ে অতীতে চলে যায়।

শীত এসে উত্তুরে বাতাসে দক্ষিণের দরজা খুলে দেয়। অতীতের দরজা। যমের দক্ষিণ দুয়ার। আমি এটা বেশ অনুভব করি। ক্রমশ ছোট হতে হতে শিশু হয়ে যাই। দুজন রমণী এসে দুপাশ থেকে আমার দুটো হাত ধরেন। একজন আমার মা আর একজন আমার বড় মা। ছেলেবেলায় পরিবার পরিজনকে বলতে শুনেছি, দুজনেই ডাকসাইটে সুন্দরী। শিক্ষিতা। শিল্পকুশলী। দুজনেই সমান লম্বা, স্লিম।

আমার একটি হাত মায়ের হাতে, আর একটি হাত বড়মার হাতে। দুজনের পরিধানেই পিঙ্ক রঙের শিফন শাড়ি। থ্রিকোয়ার্টার হাতার ব্লাউজ। হালকা নীল কার্ডিগান। মাথায় সিল্কের স্কার্ফ। পায়ে ডোরাকাটা পাম শু। কানে দুলছে পেডেন্ট। গলায় সরু মফচেন। লম্বা, লম্বা ধবধবে সাদা আঙুল। দুজনেরই অনামিকায় লাল টকটকে রুবির আংটি। আমরা তিন জনে শীতের রোদে মজা করে হাঁটছি। কখনও ঝুলে পড়ছি। কখনও তিড়িং করে লাফিয়ে উঠছি। পায়ের তলায় বাঁশপাতা মচমচ শব্দ করছে। বেশ কিছুটা দূরে আমার বাবা আর জ্যাঠামশাই গল্প করতে করতে হাঁটছেন। মাঝে মাঝে হাহা করে হেসে উঠছেন। প্রান্তরের নির্জনতায় দোলা লাগছে। দুজনেই কৃতী পুরুষ। পরস্পরের অন্তরঙ্গ বন্ধু।

আমরা সাঁওতাল পরগনার স্বাস্থ্যকর কোনও একটা জায়গায় বেড়াতে এসেছি। যেমন আসি প্রত্যেক বছর। অনেক কথা, গল্প, হাসি ফেলে রেখে যাই নানা রঙের অদৃশ্য নুড়ি। অদৃশ্য কালপ্রবাহ তার ওপর দিয়ে বইতেই থাকবে। চড়া শীতে তাই কড়া রোদ কমলালেবুর মতো মোলায়েম। দূরে বহু দূরে ধূসর পর্বত শ্রেণী আকাশ আটকে তরঙ্গের মতো বিস্তৃত। দুধারে মুংলি বাঁশের ঝাড়। বিশাল বিশাল ইউক্যালিপটাসের সার। সায়েবদের মতো গায়ের রং। তেলা, মসৃণ। পাতায় পাতায় সুন্দর গন্ধ। আর একটু এগোলেই সেই নদী। সূর্য নিয়ে ছুটছে। ছোট ছোট তরঙ্গ ভঙ্গে চিকির মিকির হাসি। নাকে আসবে জলের গন্ধ। শুকনো শীত ভিজে ভিজে হয়ে যাবে। নদীর বুক থেকে একটা আলো উঠে এসে আমার মায়েদের মুখ দুটিকে উদ্ভাসিত করবে, নাকের নাকছাবির পাথর আভা ছড়াবে। আমি অবাক হয়ে দেখব—দুজন মা দুর্গা নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে বহু রকমের পরিযায়ী পাখির হরেক ভাষার কলরব শুনছেন। সাদা, কালো, চকোলেট কতরকমের রং, কতরকমের জলখেলা।

মা তাঁর দিদিকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে থাকবেন, কেন পাখিরা স্বদেশ ছেড়ে এই নির্জন বিদেশে চলে আসে? এখন এই বয়েসে আমি যেমন ওই দুজনকে প্রায়ই প্রশ্ন করি। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে আপনারাই বা কেন পরিযায়ী পাখির মতো অনন্তের আকাশে উড়ে গেলেন? হাসি-খুশি দুজন মানুষের জীবন থমকে গেল। রান্নাঘরে শ্মশানের নীরবতা নামল। জোড়া উনুনে নানারকম রান্নার কেরামতি বন্ধ হল। ফুল বাগানে ফুল ফুটতে ফুটতে আর ফুটল না। আগাছার উল্লাস। সাজানো ঘরের সজ্জায় পাউডারের মতো ধুলোর স্তর জমতেই থাকল। বড়োমার এসরাজ, মায়ের হারমোনিয়াম পরিত্যক্ত বালিকার মতো পড়ে রইল একপাশে। কোনও রাতে হঠাৎ বেজে উঠল না আর। একটা একটা করে তার ছিঁড়তে লাগল আচমকা শব্দে। ছাদের তারে শুধুই ঝোলে পুরুষদের জামা কাপড়। শীত এল, বাসন্তী রঙের শাড়িগুলো গেল কোথায়? অতীত অতি অহংকারী। বর্তমানের কোনও প্রশ্নের উত্তর দেয় না। মৌনী।

আমরা হাঁটছি। এবার নদীর কিনারা ধরে। ওদিকে একটা দেশ আছে—চুমার। ঐতিহাসিক জায়গা। আমাদের লক্ষ একটি নীলকুঠি। ভেঙে-চুরে পড়ে আছে ইটে লেখা ইতিহাস। সার সার শ্যাওলা ধরা চৌবাচ্চা। যখন নীল হত তখন এই চৌবাচ্চায় ভেজানো হত। হাফপ্যান্ট পরা নীলকর সাহেব বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকত ওই জায়গাটায়। বিশাল একটা অশত্থ গাছ বাড়িটার মাঝখান থেকে সোজা উঠে গেছে আকাশের দিকে। বসে আছে এক ঝাঁক টিয়া। মহা কলরব। একটা নৌকার কঙ্কাল পড়ে আছে নদীর তীরে। আমার দুই মা হঠাৎ গান ধরলেন, রবীন্দ্র সংগীত। খালি নীলকুঠির ভেতর থেকে সেই গান প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসতে লাগল। ছোট মায়ের কী আনন্দ! গান ছেড়ে কু কু করে চিৎকার করতে লাগলেন। বড়মা আদর করে পিঠে একটা কিল মেরে বললেন, 'তুই কি কোনওদিন বড় হবি না?' ছোট মা বড়মাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'দিদি তুমি বড় হও, আমি ছোটই থাকি।'

সেদিনও ছিল শীতের সকাল। খুব ভোর। চারপাশ ধোঁয়া ধোঁয়া। রাস্তার আলো যেন নেশাখোরের চোখ। বড়মা দাঁড়িয়ে আছেন পাথরের মূর্তি। বিদায়। ছোট বিদায়। ভাবিস না, তোর ছেলেটার জন্যে এখনও একজন মা রইল। একটি প্রদীপ তিন দিন জ্বলে রইল একটি নিরালা ঘরে। মানুষ প্রদীপ হয়ে যায়, তারপর উঠে যায় আকাশে, একটি তারা। যে চিনতে পারে, সে পারে। তিনটে বছর। বুঝতেই পারিনি, যে, আমার ছোট মা নেই। আবার শীত। এবার সাঁঝবেলা। খেলার মাঠের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে কুয়াশা। বিশ্রী মেঘ মেঘ এক বিকেল। আমি বাড়ি যাব। কিছুতেই ওরা আমাকে যেতে দেবে না। আমি বন্দি না কি? মারামারি করে, আঁচড়ে কামড়ে ছিটকে চলে এলুম।

ঘর আছে। বড় মা নেই। কেউ নেই। এইবার আমার দাঁড়িয়ে থাকার পালা। আজও দাঁড়িয়ে আছে। নিরালম্ব দুটি হাত দুপাশে ঝুলে আছে। ধরার কেউ নেই।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%