পয়সা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

হঠাৎ আমার প্রচুর পয়সা হল। কী করে হল তা বলব না। তবে হল। পয়সা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার চেহারাও পালটে গেছে। সামনের চুল পাতলা হয়ে টাক বেরিয়েছে। সামনে ভুঁড়ি নেমেছে। দু-চোখের কোলে দুটো ব্যাগ তৈরি হয়েছে। মেজাজটাও ইদানীং বেশ চড়েছে। পয়সা হলে যা হয় আর কি!

বড়লোকদের চালচলন কেমন হয় আমার জানা নেই। বিনয়ী বড়লোক আমি দেখেছি। এঁরা হলেন সাতপুরুষে বড়লোক। ভিটেয় ঘুঘু চরলেও লোকে পুরোনো আমলের বড়লোক বলে খাতির করে। তার মানে, কবে ঘি খেয়েছেন, সেই গন্ধ এখনও হাতে লেগে আছে। আমি একপুরুষে হঠাৎ বড়লোক। আমার কী হওয়া উচিত জানা নেই। তবে শুনেছি বড়লোকেরা বিকেলের দিকে গাড়ি চড়ে হাওয়া খেতে বেরোয়। হাতে ছড়ি। সোজা পা ফেলে দ্রুত বেড়িয়ে বেড়াতে হয়। হজমশক্তিও বাড়ে, তা ছাড়া সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে। কী বুঝতে পারে! খাবার জিনিস প্রচুর, হজমশক্তি একটু কম। হাঁটার ধরন দেখে বুঝতে পারবে, শরীরে শক্তি রাখে, দৃপ্ত ভঙ্গি। কারণ অপুষ্টিতে ভোগে না, কারণ পয়সাওলা। পয়সাই জগৎ। আমি তাই জগৎপিতা।

ড্রাইভার, গাড়ি থামাও।

স্ট্যান্ডের বাঁ পাশে ময়দান ঘেঁষে গাড়ি দাঁড়াল। বা:, চমৎকার বিকেল। পশ্চিমে সূর্য নেমে পড়েছে। আকাশ লালে লাল।

অজয়, চমৎকার বিকেল, কী বলো? অজয় আমার ড্রাইভার।

আজ্ঞে হ্যাঁ।

আজ্ঞে হ্যাঁ না, আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। কবে তোমার অভ্যাস হবে!

হয়ে যাবে স্যার। আগে যাঁদের ড্রাইভার ছিলুম তাঁদের তো স্যার বলতে হত না। লাস্ট যাঁর গাড়ি চালাতুম তাঁকে বলতুম দামুদা।

দামুদা! যাচ্ছেতাই নাম।

নামে কী আসে যায় স্যার! পয়সা তো আর নাম দেখে আসে না।

ছেলেটা যেন দার্শনিক! বয়েস কম হলে কী হবে, অনেক ঘাটের জল খেয়েছে। সত্যিই তো, নামে কী যায় আসে। এই তো আমার নাম পাঁচুসুন্দর। অজয়ের চেয়ে অনেক বিশ্রী নাম। অথচ গাড়ির মালিক আমি, চালায় অজয়।

আমার নিয়ম হল, প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ গাড়িতে বসে থাকা। চারপাশে তাকিয়ে দেখা। তারপর দরজা খুলে নেমে, গঙ্গার ধারের বাঁধানো রাস্তায় পায়চারি। যতক্ষণ গাড়ি থেকে না নামছি ততক্ষণ অজয়ের সঙ্গে বকর বকর করি। বড়লোকদের চালচলন অজয় জানে ভালো। আমি তো সদ্য বড়লোক। টাকাটাই হয়েছে, বড়লোকি চালচলন এখনও শেখার অনেক বাকি। অজয়ের সঙ্গে তাই মাঝে মধ্যে কথা হয়। এই কথার সময় অজয় আর আমার গাড়ির ড্রাইভার নয়, আমারও ড্রাইভার। আমার শিক্ষক।

কাঁচা বয়েসের মেয়েরা কাঁচা বয়েসের ছেলেদের সঙ্গে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আইসক্রিম চলছে, ভেলপুরি চলছে, কোলড ড্রিংকস চলছে।

অজয়, কে যেন বলেছিল, কলকাতার হাওয়ায় টাকা উড়ছে?

আজ্ঞে স্যার হরিরাম গোয়েঙ্কা।

সে আবার কে? অজয়কে কখনও ঠকানো যায় না। যা জিগ্যেস করব, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর। কোনটা ভুল কোনট ঠিক বলা শক্ত। চাকরির জন্যে ইন্টারভিউ দিতে দিতে অজয় পৃথিবীর প্রায় সব কিছু জেনে ফেলেছে। বরাতে চাকরি অবশ্য জুটল না। শেষে ড্রাইভিং শিখে ড্রাইভারি।

মেয়ে দেখেছিলুম, মিথ্যে বলব না, মেয়েই দেখেছিলুম। পয়সা যখন ছিল না তখন হাঁ করে আকাশ, পাখি, গাছপালা, চন্দ্র, সূর্য অনেক দেখেছিলুম। এখন পয়সার সঙ্গে সঙ্গে দুটো 'ম' যেন হামাগুড়ি দিয়ে মনে আসতে চাইছে। আহা, যেন দুটি বালগোপাল, হামা দিতে দিতে আসছে। হাতে নাড়ু।

বুঝলে অজয়, মাঝে মাঝে মনে হয় অ্যারিস্টটল ওনাসিস হয়ে যাই। জীবনটাকে একটু ভোগ করে দেখি।

দেখুন না স্যার! ক্ষতি কী!

ওনাসিসের নাম শুনেছ?

খুব শুনেছি স্যার। জ্যাকলিন কেনেডি যাঁকে বিয়ে করেছিলেন।

তুমি দেখছি সব জানো? কী বলো?

কী বলব স্যার?

আমার সেকেলে বউটাকে বাতিল করতে হবে। ঠিক যেন বড়াই বুড়ি।

বাতিল করবেন কেন? বউদি তো ঘরে থাকবেন। আপনি ফুর্তি করবেন বাইরে। টাকা দিয়ে তো আর স্নেহ-ভালোবাসা কিনতে পারবেন না। স্নেহ-ভালোবাসা সেকেলে জিনিস, ওসব সাবেককালের মহিলারাই দিতে জানেন।

ও কথা কেন বলছ? ওই তো সব জোড়ায় জোড়ায় কেমন ঘুরছে, লাল লাল ঠোঁটে আইসক্রিম চুষছে।

হ্যাঁ চুষছে। ওকে চোষাই বলে। এরপর কাঠিটা ছুঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেবে। আজ প্রশান্তদাকে, কাল অসীমদাকে। ওর মধ্যে কটা বউ ঘরে ওঠে দেখুন! ঘুরতে ঘুরতে যৌবন একদিন চলে যাবে। মেক-আপের যৌবনে আরও কিছুদিন চলবে, তারপর ভোঁ ভোঁ।

মেয়েদের ওপর তোমার দেখছি ভীষণ রাগ। কারণটা কী?

আজ্ঞে, এ বাজারে চাকরি আর বউ দুটোই পাওয়া যায় না।

যদ্দিন টাকা ওড়াতে পারবেন, তদ্দিন পরীরা উড়ে উড়ে আসবে। যেই আপনার ট্যাঁক গড়ের মাঠ হয়ে যাবে অমনি সব হাওয়া।

না:, এইবার একটু বাইরে বেরিয়ে হাওয়া খাওয়া যাক? অনেক জ্ঞানের কথা শোনা গেল।

আচ্ছা অজয়, তুমি কখনও রেস খেলেছ?

আজ্ঞে না, তবে রেসের মাঠে গেছি। বাইরে থেকে দেখেছি, ঘোড়া ছুটছে। এই সময় রেস হয়?

হ্যাঁ, এখন মনসুন রেস।

নেমে পড়লুম গাড়ি থেকে। একপাশে নরম ঘাস, অন্যপাশে পিচের রাস্তা। দূরে গঙ্গা, জাহাজ ভাসছে। মাস্তুলে দেশ-বিদেশের পতাকা। পয়সা হওয়ার পর থেকেই লক্ষ করছি, মনটা মাঝে মাঝেই কেমন যেন ভাবুক হয়ে যায়। এতকাল ছিল অন্ন চিন্তা। চমৎকারা সেই চিন্তা থেকে মন যেই সরে এসেছে, হয়ে গেছি উদাসীবাবা। ভোগের বয়েসে ভোগ হল না, এই বয়েসে আর কী হবে। এই তো মিহি ধুতি, আদ্দির পাঞ্জাবি, চুল ফিরিয়ে মেজাজে ঘুরছি, কেউ তাকাচ্ছে আমার দিকে? কেউ না। ওই তো সিল্কের শাড়ি পরে নধর একটি মেয়ে চোয়াড়ে একটি ছেলের বগলদাবা হয়ে আসছে। নিজেদের ভাবেই মশগুল। যৌবন যৌবনকেই চায়, প্রৌঢ়ে আর কদর কি।

এখন মেয়েছেলে চাইলে মুখ নীচু করে পাড়ায় যেতে হবে। এখন চরিত্রহীন না হলে ভোগ হবে না। অজয় যত বাজে কথা বলে। কোনওদিন বলে বসবে, পয়সা হলে টাকেও চুল গজায়। আসলে ও ব্যাটা একটা চামচা। মন জোগানো কথা বলে।

বেড়াতে বেড়াতে একটা আইসক্রিম স্টলের কাছে এসে পড়েছি। যুবক হলে ঝট করে একটা খাওয়া যেত। এখন খেতে গেলে কেউ হয়তো গ্রাহ্যই করবে না, আমার নিজের মনটাই হেসে উঠবে, বুড়ো বয়েসে ঘোড়া রোগ! ভয়ও আছে, গলা-খুসখুস কাশি।

আবার ফিরে এলুম নিজের গাড়িতে। অজয় বসে ছিল ঘাসের ওপর। মনটা যেন বিষণ্ণ। হবেই তো। ওই বয়েসের ছেলে, জীবনে কত সাধ আহ্লাদ! গাড়ি চালিয়ে সামান্য ক'টাকাই বা পায়। আমাকে দেখে উঠতে যাচ্ছিল, বললুম, বসো বসো, আমিও তোমার পাশে একটু বসি। ওদিকটায় একা একা তেমন ভালো লাগল না।

অজয়ের পাশে বসতেই সামনের আকাশটা নীচে নেমে গেল। পিছন দিকে দুটি শিশু দৌড়াদৌড়ি করছে।

আচ্ছা অজয়, তোমাকে যদি এখন একলাখ টাকা কেউ দিয়ে দেয়, তুমি কী করবে?

ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়ে যেমন গাড়ি চালাচ্ছি তেমন চালাব।

সে কী? আর কিছু করবে না? প্রেম, ভালোবাসা, ফুর্তি?

আজ্ঞে না, এক রাত কা আমির হয়ে পরের দিনই ফকির হয়ে রাস্তায় ঘুরতে চাই না। ওটা তো আমার রোজগার নয়। আমার রোজগারের ক্ষমতায় যেমন আছি তেমন থাকব। ডাল ভাত, নুন ভাত, যেমন জোটে জুটবে।

টাকাটা তো ইনভেস্ট করতে পারো, ব্যবসায়, কি বাড়িতে, এক লাখ থেকে দু'লাখ, দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার...।

আজ্ঞে না, সে মুরোদ আমার নেই। নিজেকে নিজে যত ভালো করে চিনি অত ভালো করে আর তো কেউ চিনবে না। নিজের দৌড় নিজে জেনে গেছি। বড়লোক হওয়ার জন্যে আমি জন্মায়নি।

আমি তো হয়েছি! আমারও তো এক সময় দিন চলত না!

আপনি বরাতে হয়েছেন, কপালে ছিল।

এ সব মানো?

খুব মানি।

বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামতে নামতে শুনছি গানের সুর ভেসে আসছে। মেয়ের বায়নায় একটা স্টিরিও রেডর্ক প্লেয়ার কিনে মহাবিপদ হয়েছে। আমার বিপদ, পাড়ার আর পাঁচজনেরও বিপদ। কান ঝালাপালা। একে তো বিশাল এক বাড়ি হাঁকিয়ে অনেকের আলো বাতাস কেড়ে নিয়েছি।

কেড়ে না নিলে বড়লোক হওয়া যায় না। যতদিন চেয়েছি কিছুই পাইনি।

ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে মনে হল, অজয়টা ভীষণ ভীতু, ম্যাদামারা বাঙালি। বরাত মেনে স্টিয়ারিং ধরেই জীবনটা কাটাতে চায়। মনে মনে অদৃশ্য অজয়কে উপদেশ দিলুম, ওহে যুবক! জীবনে উচ্চাশা না থাকলে কিছুই পাওয়া যায় না। আমার পায়ের জুতো জোড়া সমঝদারের মতো মচমচ শব্দ করছে। সিঁড়ির ঝকমকে মসৃণ হাতলে হাত ঘষতে ঘষতে উঠছি। চারদিক ঝলমল করছে। নতুন বাড়ি, নতুন মোজাইক, নতুন ফার্নিচার। পয়সার একটা আলাদা জেল্লা আছে। জেল্লা সহ্য হয়, শব্দটা সহ্য হয় না। যত ওপরে উঠছি গানের আওয়াজে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার জোগাড়। ওরে গান থামা! থামা বললেই কি থামবে! আমার পয়সা এদের স্ফূর্তিতে জোয়ার এনেছে।

বাপি! তুমি এসে গেছ!

সামনেই আমার মেয়ে। বেশ বড়সড়ো হয়েছে। কী একটা পরেছে, আরও যেন বড় দেখাচ্ছে। না:, এবার বিয়ে দিতেই হবে। আর ধরে রাখা যাবে না। এই বয়েসটা বড়ো ভীষণ। ওই গঙ্গার ধারে দেখে এলুম যে একটু আগে। গালে দুটো একটা ব্রণ বেরিয়েছে।

তোমার গাড়িটা নিয়ে আমরা একটু বেরোচ্ছি।

অ্যাঁ, এখন বেরোবি! অজয়কে এখন ছুটি দোব ভেবেছিলুম। ও তো একটা মানুষ। কোথায় যাবি?

আমরা তিন বন্ধু একটু মার্কেটের দিকে যাব।

অজয় রাগ করবে না?

সে আমরা বুঝব।

সমান বয়েস, সমান চেহারার তিনটি মেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। মিষ্টি গন্ধ উড়ছে, হাওয়ায় ফুরফুরে চুল উড়ছে। পোশাকের খসখস শব্দ।

আমি উঠছি। ঘুরে ঘুরে ক্রমশই ওপরে উঠছি। ওরা নেমে যাচ্ছে নিচে। দু'পক্ষের দূরত্ব বাড়ছে। বাড়বেই তো। আরও বাড়বে। ওরা এক জগতের আমি এক জগতের।

ঘরে এসে দেখি আমার গৃহিনী জড়ভরতের মতো বসে আছে।

কী গো, এইভাবে বসে?

কী-ই করব?

সত্যিই তে, কী আর করবে! কেন, টি ভি দ্যাখো। গান, ফিল্ম।

দূর, ভালো লাগে না! ও সব আমি তেমন বুঝি না।

তা হলে কিছু খাও।

কত খাব! হজম হয় না।

তা হলে এসো দুজনে ঘুরে ঘুরে নাচি।

সে বয়স আর নেই।

বেশ, তাহলে এসো দুজনে ঝগড়া করি।

কী নিয়ে ঝগড়া করব? কোনও অভাবই তো আর নেই। তখন ঝগড়া হত এটা ওটা নিয়ে, এখন কী নিয়ে হবে?

তাও তো বটে। তা হলে এসো কীর্তন করি, সাঁই ভজন।

ভক্তিও নেই তেমন, গলাও নেই।

তা হলে ঘুমোও, ওভাবে পুঁটলির মতো বসে থেকো না।

কত ঘুমোব! ঘুম আর আসে না।

সে কী! ঘুমও আসে না?

না। তুমি এবার মেয়েটার বিয়ের ব্যবস্থা করো। ওর চালচলন তেমন সুবিধের মনে হচ্ছে না।

যাক, তাহলে ভাববার মতো একটা দুশ্চিন্তা পাওয়া গেছে। আমি অবশ্য সুখের মধ্যে একটা দু:খ খুঁজে পেয়েছি।

দু:খ!

হ্যাঁ দু:খ। একটা ছেলে না থাকার দু:খ।

আর কী হবে। সময় চলে গেছে।

হ্যাঁ, সময় চলে গেছে। সব চুকে-বুকে গেছে। আগুন নিভে গেছে, পড়ে আছে ছাই। চললে কোথায়?

চা খাবে তো—

হ্যাঁ, চা—চা খেতে হবে। তার জন্যে যেতে হবে কেন?

বলে আসি।

ঠিক ঠিক। বেশ, বলেই চলে এসো। আমি আবার একলা থাকতে পারি না। শেষের সময় তুমি কাছে থাকবে তো!

ও সব অলুক্ষুণে কথা ভর সন্ধেবেলা নাই বা বললে!

মনে হল তাই বললুম।

মনে আর আসতে দিও না।

মনকে কে বাঁধবে! বা:, বারান্দায় বেশ হাওয়া দিচ্ছে। অনেকটা উঁচুতে উঠেছি। অন্য সব বাড়ির ছাদের মাথা দেখা যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে লোক যাচ্ছে। আলোর বিন্দু খইয়ের মতো ছড়িয়ে আছে। আমার একটাই মাত্র মেয়ে, নাম পদ্মা। অনেক ছেলেমেয়ে আনা যেত। তখন তো উপায় ছিল। বেহিসাবি হলেও মরতে হত।

পদ্মা কি প্রেম করছে? ছেলেটেলে ধরেছে নাকি! কে বলতে পারে? অজয় পারে। ওর সঙ্গেই তো ঘোরে। অজয় আজ আমাকে অবাক করে দিয়েছে। বয়স কম, কিন্তু মনের কী সাংঘাতিক জোর। এ রকম ছেলে লাখে একটা মেলে। একালের ছেলেদের কোন বদ খেয়ালই ওর মধ্যে নেই।

পদ্মা ফিরে এল। গুন গুন করে গাইতে গাইতে সিঁড়ি বেয়ে পা ঘষে উঠছে। নেশা করছে নাকি? টলছে মাতালের মতো। মাঝে মাঝে সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরছে দু'হাতে।

পদ্মা!

বাঅবা, তুমি আমার বাঅবা, তাই তো! হ্যাঁগো, তুমিই আমার বাবা?

পদ্মা আমার বুকে মুখ গুঁজে দু'হাতে গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। তুমি জর্জকে কিছু বলতে পারো না বাবা!

জর্জ! সে আবার কে?

একটা ছেলে। আমাকে পেতনি বলেছে। আমি পেতনি!

আমার বুক থেকে মুখ তুলে পদ্মা দুহাত পিছিয়ে গেল। মুখটা জবাফুলের মতো লাল টকটকে। চারপাশে চুল উড়ছে।

তুমি দ্যাখো তো আমি কি পেতনি, সত্যিই আমি পেতনি?

পদ্মা একে একে জামা খুলছে! শার্ট খুলে ফেলেছে। জিনস খোলার জন্য কাঁপা কাঁপা হাতে ফাস্টনারের মুখ খুঁজছে। একটানে সব খুলে ফেলল। শুধু প্যান্টি আর ব্রা পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার একমাত্র মেয়ে পদ্মা। যখন ও এতটুকু শিশু, তখন কোলে করে কত নাচিয়ে নাচিয়ে ঘুম পাড়িয়েছি। কাঁথা পালটে দিয়েছি। সেই পদ্মা আমার সামনে, আমাকে বিচারকের ভূমিকা নিতে হবে। এ শরীর আমার অচেনা, এর ভেতরে যে মন বাসা বেঁধেছে সে আরও অচেনা। পদ্মা দু'হাত দু'কোমরে রেখে পা দুটোকে ফাঁক করে বললে, কী, কিছু বলছ না কেন বাবা? আমি কি পেতনি! আর রুমকি পেতনি নয়!

কে রুমকি, কে জর্জ! আমার সামনে যে মহিলা দাঁড়িয়ে সে-ই বা কে? আমার ভীষণ ভয় করছে। এই শরীরটাকে এখন ধরে ধরে শোওয়ার ঘরে নিয়ে যেতে হবে। গায়ে হাত দিতে সংকোচ হচ্ছে। তাকাতেই পারছি না ভালো করে।

পদ্মা ঘরে চল।

না-আ, আমায় অপমান করেছে। বিচার চাই, বিচার।

তুমি ঘরে চলো।

পদ্মা টলতে টলতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ভয়ে পিছোতে শুরু করেছি। এ আমার মেয়ে নয়, অপ্রকৃতিস্থা এক মহিলা!

তুমি ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছ কেন জর্জ! পেতনি তোমাকে ধরবে? অ্যাঁ, পেতনি পেতনি!

পদ্মা, আমি তোর বাবা, জর্জ নই, তোর বাবা!

পদ্মা ঠাস করে আমার গালে একটা চড় মারল, মিথ্যেবাদী, মিথ্যেবাদী! তারপর একেবারে কাটা কলা গাছের মতো পালিশ করা মেঝের ওপর উলটে পড়ল।

আর একটা চড় কষিয়ে গেল অজয়। আমি সেদিন সারারাত ভেবেছি। পদ্মার ভবিষ্যৎ কী হবে? অজয়ের মতো সৎ নির্লোভ, সহিষ্ণু স্বামীর হাতে পড়লে মেয়েটা বেঁচে যেতে পারে? শুধু পদ্মা বাঁচবে না, আমিও বেঁচে যাব। আমার ছেলে নেই, অজয়ই হবে আমার ছেলের মতো। যে বলতে পারে, লাখ টাকা পেলে ব্যাংকে ফিক্সড করে দোব, তার হাতে আমার বিশাল এই ঐশ্বর্য ছেড়ে যেতেই সুখ। সব থাকবে, সব রাখবে, সব বাড়াবে। আরও আরও বাড়াবে।

সন্ধের দিকে, গঙ্গার ধারে ঘাসের ওপর দুজনে পাশাপাশি বসে আছি। সূর্য ডুবে গেছে, অন্ধকার তেড়ে আসছে চারপাশ থেকে। সকাল থেকেই অজয়কে মনে হচ্ছে আমার ছেলে, আমার জামাই।

কাল তোমারা কোথায় কোথায় গিয়েছিলে অজয়?

অনেক জায়গায় স্যার।

স্যার বোলো না, কানে খটখট করে লাগে। আমি স্যার নই, সামান্য মানুষ, তোমার বন্ধুর মতো।

আপনিই বলেছিলেন।

আমি বলছি, আর বোলো না। কাল কোথায় কোথায় গেলে?

ময়দান, ফ্লুরি, ট্রিঙ্কাস, স্কাইরুম, হাজরা, ভিক্টোরিয়া, যখন যেখানে হুকুম হয়েছে।

তুমি বাধা দিলে না কেন?

আমি সামান্য ড্রাইভার, হুকুমের চাকর।

তুমি যদি আর ড্রাইভার না থাকো, আরও কাছে, একেবারে কাছে সরে আস?

তার মানে?

তোমাকে আমি চিরকালের জন্যে ধরে রাখতে চাই আমার ছেলের মতো করে, জামাই করে। অজয়, তোমার হাতে আমি পদ্মাকে দিতে যেতে চাই। অজয়ের কবজিতে আমার একটা হাত।

তা হয় না, হিন্দি ছবি হয়ে যাবে।

কেন হয় না! আমি যে ভেবেছি। অনেক ভেবেছি। আমার ছেলে নেই, তা ছাড়া সবই আছে। তুমি আমার সেই ছেলের মতো।

স্ট্যাটাসে মিলবে না, আপনি মেনে নিলেও আপনার মেয়ে আমাকে মেনে নিতে পারবে না, আমিও আপনার মেয়েকে সহজ করে স্ত্রী হিসেবে মানতে পারব না। প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কটা বারে বারে বেরিয়ে আসবে।

কেন আসবে?

তাই আসে, বড়লোকের মেয়ে আর গরিবের ছেলেকে মিলিয়ে দিলে স্বামী-স্ত্রীর সহজ সম্পর্ক আর থাকে না। রঙে রঙে মেলাতে হয়।

তুমি তো আর গরিব থাকছ না, বড়লোক হয়ে যাচ্ছ, আমার পার্টনার, আমার পি. এ. অ্যাসিস্টেন্ট, সব কিছু।

আমি যে বড়লোক হতে চাই না।

তোমার লোভ নেই? উচ্চাশা নেই।

লোভ তো থাকে না, তৈরি করতে হয়। উচ্চাশা! এক একজনের এক একরকম আশা, তার পেছনেই সে দৌড়য়।

অজয়, আমার বড়ো ইচ্ছে, তুমি বেঁকে থেকো না।

আমি স্বার্থপর হতে পারব না।

স্বার্থপর!

হ্যাঁ, আমার মা-বাবা ভাই-বোন পড়ে থাকবে নীচে, আর আমি ফানুসের মতো উঠে যাব উপরে, তা হয় না।

তাঁরাও উঠবেন, তোমার সঙ্গে সঙ্গে উঠবেন।

ক্রীতদাস কারোকে তোলার ক্ষমতা রাখে না। স্বাধীন মানুষই কিছু করতে পারে। আপনার পয়সা আছে, আপনি আমার চেয়ে অনেক ভালো ছেলে পাবেন।

এই তোমার শেষ কথা?

ঘাসের গালচে থেকে নিজেকে তুলে নিতে হল। মানুষ কেন মানুষের কাছে সহজে আসতে চায় না! অজয় গাড়িতে স্টার্ট দিল। কঠোর চরিত্রের ছেলে। কংক্রিটের বাঁধুনি। কিছুতেই নোয়ানো যায় না।

পরের দিন সকালে অজয় আর এল না। একজন বয়স্ক মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে অজয়ের চিঠি। অজয় লিখছে, অসুবিধে হবে ভেবে এই বিশ্বাসী মানুষটিকে পাঠালুম। এঁর হাত ভারী ভালো। একদিন চালালেই বুঝতে পারবেন। আমাকে যা দিতেন তার চেয়ে বেশি দিলে ভালো হয়, এঁর সংসার অনেক বড়।

আমি দুর্গাপুরে ভালো একটা চাকরি পেয়েছি। আজই চলে যেতে হবে। সকালের ট্রেনে। ছুটিতে এসে দেখা করব। আপনি আমাকে যেমন ভালোবেসেছিলেন, আমিও তেমনি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছিলুম।

অনেক দিন আগে কোথায় যেন পড়েছিলুম, ক্ষমতা আর ঐশ্বর্য মানুষকে বড়ো নি:সঙ্গ করে দেয়। আপনার বেদনা আমি বুঝি। উপায় নেই, সহ্য করতেই হবে। ধনবান আর কুষ্ঠ রোগী প্রায় সমান। প্রণাম নেবেন। অজয়।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%