সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শুকনো পাতার উপর পা রাখলেন অপরেশ। মচমচ করে একটু শব্দ হল। সরসর করে কি একটা সরে গেল। দিনান্তের শেষ আলোয় ঠিক বোঝা গেল না। অপরেশ একটু ভয় পেলেন। সরীসৃপ জাতীয় একটা কিছু হবে। টিকটিকি কিম্বা গিরগিটি হলে তেমন ভয় নেই। অন্য কিছু না হলেই হল। প্রায় দু বছরের পাতার স্তূপ জমেছে দরজার সামনে। ফলসা গাছের বড় বড় পাতা। দরজার সামনে সবুজ ছাতার মতো শাখাপ্রশাখা মেলেছে গাছটা। এই দুই বছরে মাথায় বেশ কিছুটা বড়ও হয়েছে। গাছটা কেউ পরিচর্যা করে বসায়নি। যত্নও করেনি, নজরও দেয়নি। আপনিই বড় হয়েছে। প্রাণরস সংগ্রহ করেছে মাটি থেকে।
অপরেশ পকেট থেকে চাবি বের করতে করতে ঘাড় উচুঁ করে বাড়িটা একবার দেখে নিলেন। উপরের সমস্ত ঘরের জানালা বন্ধ। কেবল একটা একটু খোলা। জোর বাতাসে মাঝে মাঝে দুলছে। অপরেশ ঘাড় নামিয়ে নিলেন। বয়স বাড়ছে, ঘাড় পেছনে বাঁকালে শিরে টান ধরে।
একগাদা চাবি পকেটে। অপরেশ মনে মনে একটু হাসলেন। অনেক চাবি অনেক দরজা কিন্তু একটাও খুলল না। যে দরজাতেই ঢোকার চেষ্টা করলেন সেই দরজাই নাকের উপর বন্ধ হয়ে যায়। হাতের তালুতে চাবি রেখে অপরেশ চিনতে চাইলেন কোন চাবিটা এই তালার। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল। সন্ধে হয়ে আসছে। তালার গর্তটা আর ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না।
তালাটা পেতলের। তবুও দুবছরের জলে, রোদে, কর্কশ হাওয়ায় বিবর্ণ হয়ে গেছে। চাবি ঢুকলেও সহজে খুলতে চাইল না। কায়দার তালা। আড়াই প্যাঁচে খোলে। অপরেশ একটা পাকই ঘোরাতে পারলেন না। চাবিটা তালায় আটকে পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। পকেটের চাপে সিগারেট চেপ্টে গেছে। হাতের তালুতে ফেলে সযত্নে আঙুলের আলতো চাপে গোল করলেন। আর্ধেক পাতা বেরিয়ে গেল। সেই আলগা সিগারেটই অনেকক্ষণের শুকনো ঠোঁটে লাগালেন। পকেট হাতড়ে বের করলেন দেশলাই। কয়েকটা মাত্র কাঠি আছে। হাওয়া বইছে জোরে। হাওয়ার দিকে পেছন ফিরে দরজার কোণে হাতের আড়াল করে দেশলাই জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালেন। অন্যমনস্কের মতো কাঠিটা ফেলে দিলেন পায়ের কাছে।
শুকনো গলায় একরাশ ধোঁয়া নিয়ে একটু কেশে উঠলেন। বুকের খাঁচাটা এখনও বিশাল। ফুসফুসটা কিন্তু বেশ কম জোর হয়ে গেছে। অপরেশ বুঝতে পারেন শরীরটা ক্রমশই ক্ষয়ে যাচ্ছে। সময়ের বালি কাগজ অনবরতই কর্কশ ঘর্ষণে জীবনীশক্তি গুঁড়ো গুঁড়ো করে উড়িয়ে দিচ্ছে। সিগারেট ঠোঁটে ধরে অপরেশ আবার তালায় হাত রাখলেন। আকাশে আলো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অন্ধকারেই অপরেশ সমস্ত শক্তি দিয়ে চাবি ঘোরাবার চেষ্টা করলেন। অসম্ভব ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যাচ্ছে। এ ধোঁয়া তো সিগারেটের নয়! আজ তেত্রিশ বছর ধরে সিগারেট খাচ্ছেন। ধোঁয়ার স্বাদ আর গন্ধ তাঁর জানা।
হঠাৎ পায়ের কাছে আগুনের জিভ লাফিয়ে উঠল। ফেলে দেওয়া কাঠির আগুনে স্তুপাকার শুকনো পাতা জ্বলে উঠেছে। আগুনের আক্রোশ, অপরেশ লাফিয়ে সরে যাওয়ার আগেই কোমর পর্যন্ত তেড়ে উঠেছে। জ্বলন্ত পাতা হাওয়ায় ছুটছে। অপরেশের লুটোনো কোঁচা, পাঞ্জাবির ঝুলে আগুনের সাপ খেলা করছে। লকলকে আগুনের শিখায় অপরেশ যেন মুগ্ধ হলেন। রূপের আগুনে যেমন মানুষ পতঙ্গ পুড়ে যায়। অপরেশ যেন প্রকৃত আগুনে নিজেকে ঝলসে নিতে চাইলেন।
শুনেছিলেন মাটিতে গড়াগড়ি দিলে আগুন নিভে যায়। কিন্তু মাটি কোথায়। সবই তো আগুন। সেই আগুনে মাটিতেই অপরেশ একটা প্রফুল্ল জন্তুর মতো গড়াগড়ি দিলেন। দেহের চাপে আগুন হয়তো নিভল, অপরেশ কিন্তু ভীষণভাবে দগ্ধ হলেন। অদৃশ্য আগুনে ভেতরটা অনেকদিনই পুড়েছিল, আগুনে এবার বাইরেটা পুড়ে গেল। জ্ঞান হারায়নি অপরেশ। কিন্তু পোড়া পাতার ছাই থেকে উঠে বসার শক্তি যেন তাঁর রইল না।
অতি কষ্টে হাত উঠিয়ে অপরেশ মাথার চুলে হাত রাখলেন। পোড়া হাতের সঙ্গে জড়িয়ে এল একরাশ পোড়া চুলের ছাই। ভয়ে অপরেশ হাত সরিয়ে নিলেন। হাতটা সরাতে গিয়ে অপরেশ প্রথমে লক্ষ করলেন, পাঞ্জাবির হাতাটা নেই। জীবনে এই প্রথম ভয় পেলেন তিনি। চিতা থেকে উঠে আসা শব তিনি দেখেননি, কিন্তু নিজেকে দেখে তাঁর তাই মনে হল।
আশেপাশে মাইল খানেকের মধ্যে কোনও বাড়ি নেই। এই বাড়িটাও উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এই অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষীও কেউ নেই, সাহায্য নিয়ে ছুটেও আসবে না কেউ। অপরেশ অসম্ভব মনের জোর নিয়ে উঠে বসলেন। ঝোড়ো হাওয়ায় গা থেকে ছাই উড়ছে। শরীরের কোথাও আর একছিটে সুতো নেই। বসতে গিয়ে অপরেশের মনে হল, তিনি যেন অসম্ভব মোটা আর ভারী হয়ে গেছেন। সমস্ত শরীরটা যেন একধরনের আঠায় চটচট করছে। একটা মৃদু মাংসপোড়া গন্ধ পাচ্ছেন নাকে। এই গন্ধটাও অপরেশের খুব পরিচিত। জীবনে বহুবার শ্মশানে গেছেন।
অতি কষ্টে পোড়া পাতার ছাই থেকে অপরেশ নিজেকে ওঠালেন। ঘাড় নীচু করে নিজেকে আর দেখতে ইচ্ছা করল না। বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন কত ব্যায়াম করেছেন। মুগ্ধ হয়ে নিজের শরীরে পেশির ঢেউ গুনেছেন। আজ সেই সুন্দর দেহ—অপরেশ আর ভাবতে পারলেন না। দরজায় পিঠ রেখে একটু বসতে গেলেন। পিঠের চাপে দরজাটা আপনি খুলে হাট হয়ে গেল। অপরেশ চিত হয়ে চৌকাঠের ওপর পড়ে গেলেন। পড়ার সময় মনে হল অসংখ্য তন্তু ছিঁড়ে গেল।
শরীরটা এখন যেন বেশ হালকা লাগছে। অল্প আঁচে বাদ্যযন্ত্র সেঁকে নিলে যেমন সুরে বলে, অপরেশের মনে হল তেমনি সুরে বাজছেন। চারদিকে থকথকে ঘন অন্ধকার তবুও কেমন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। এই তো সেই বসার ঘর। সেই সবুজ ঘন কার্পেট। রেকসিন মোড়া সোফা। পালিশ করা বুক সেলফ। অমূল্য বইয়ে ঠাসা। পড়তে ভালোবাসতেন অপরেশ। জীবনের সমস্ত সঞ্চয় বইয়ের পেছনে খরচ করেছেন। পাউডারের মতো ধুলো জমেছে চারদিকে। ধুলো ঝাড়েনি কেন কেউ! ইস এত ধুলো! অপরেশ ফুঁ দিলেন। বাতাস বেরোলো না মুখ দিয়ে। আঙুল দিয়ে দাগ কাটার চেষ্টা করলেন। কোনও দাগ পড়ল না। অপরেশ খুব বিব্রত বোধ করলেন।
অপরেশ খুব আস্তে সাবধানে সোফার উপর বসলেন। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্প্রিং-এর গদির উপর কোনো চাপ পড়ল না। কোথাও কোনোও আলো নেই অথচ সব কিছু কী ভীষণ স্পষ্ট দেখছেন। চোখের সমস্ত পাতা পুড়ে ঝরে গেছে। কপালের চামড়া পুড়ে গেছে। বলা চলে অন্ধই হয়ে গেছেন তবুও কী অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি তাঁর।
দুবছর আগে যেদিন দুপুরবেলা হঠাৎ বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন সেদিন ছিল তাঁর ছেলের জন্মদিন। সারাঘর সাজানো হয়েছিল রঙিন কাগজের স্টিকার দিয়ে। সেই কাগজের শিকল এখনও সিলিং থেকে চারিদিকে ঝুলছে। ঘরের কোণে টিপয়ের উপর বড় ফুলদানিতে নিজের হাতে দু ডজন রজনিগন্ধার স্টিক রেখেছিলেন, সেই ফুল ঝরা শুকনো স্টিক এখনও কঙ্কালের আঙুলের ইসারার মতো সেই কোণেই রয়ে গেছে। অপরেশ উঠলেন। ফুলদানির কাছে গিয়ে শুকনো রজনিগন্ধার ডাঁটি ধরার চেষ্টা করলেন। আশ্চর্য! কিছুতেই ধরতে পারলেন না। কেন এমন হচ্ছে! কী কারণে হচ্ছে! অপরেশের মাথায় এল না।
বসার ঘরের বাইরে এলেন অপরেশ। সোজা করিডর দু'দিকে দু'সার ঘর রেখে চলে গেছে পশ্চিমের বাথরুমের দিকে। দু'বছর আগের ঘটনা স্পষ্ট পড়ে গেল। বেলা তখন কত হবে, দুটো কি তিনটে। সারা বাড়িতে রান্নার সুগন্ধ ঘুরছে। কোঁচার খুঁটে চশমার কাচ মুছতে মুছতে অপরেশ সবে বাথরুমের বাইরে বেরিয়েছেন। চটি দু'পাটি খুলে রেখেছেন পাপোশের উপর আর ঠিক সেই সময়ে বাইরের দরজার কড়া নড়ে উঠল জোরে জোরে। কড়া নাড়ার ধরন দেখেই অপরেশ বুঝেছিলেন এ হাত বন্ধুর নয়, শত্রুর।
দরজাটা কে খুলে দিয়েছিল। বোধ হয় কাঞ্চন। সেদিন সে ধুতি, পাঞ্জাবি পরেছিল। কপালে চন্দনের ফোঁটা। কাঞ্চন বোধহয় ভেবেছিল তার বন্ধুরা এসেছে। বাথরুমের দরজার পাশে চটি দুপাটি যেভাবে খুলে রেখেছিলেন ঠিক সেইভাবেই পড়ে আছে। অপরেশ অবাক হলেন। চলে যাওয়ার পর বাড়িতে কি সমস্ত কর্মতৎপরতা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল? না, তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় বাড়িটাকে মিউজিয়াম করে রাখার চেষ্টা হয়েছে! চটি দুপাটি পায়ে গলিয়ে টানার চেষ্টা করলেন, এক ইঞ্চিও সরাতে পারলেন না। আবার চেষ্টা করলেন, সেই একই ব্যাপার। আশ্চর্য! এ কি কোনও জাদুর প্রভাব!
অপরেশ ফিরে চললেন। করিডোর এসে মিশেছে দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে। ধাপে ধাপে অপরেশ উপরে উঠতে শুরু করলেন। সিঁড়ির বাঁকে বিদেশি শিল্পীর আঁকা এক মহিলার প্রতিকৃতি। ছবির মহিলা অসামান্য সুন্দরী। কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র কি না অপরেশ জানেন না। শিল্পীর কোনও আপনজনও হতে পারে। ধুলোর আবরণে ছবিটি ধূসর। অপরেশ ছবিটার মুখোমুখি হতেই, মহিলার ঠোঁট দুটো যেন মৃদু হাসিতে বিভক্ত হল। অপরেশ অবাক হলেন, প্রতিকৃতি কি হাসতে পারে! অপরেশ ঘন অন্ধকারেও অক্লেশে উপরে উঠে গেলেন।
সিঁড়ির সামনের ঘরটাই ছিল তাঁর বাবার। অপরেশ যেদিন চলে গেলেন, বাবা সেদিন অসুস্থ, শয্যাশায়ী ছিলেন। দেখা করে বিদায় নেওয়ার সময় পর্যন্ত অপরেশ পাননি। পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলেন জেলে বসে। অপরেশ অবাক হলেন, ঘরের দরজা হাট খোলা। ঘরে ফিকে একটু চুরুটের গন্ধ। সেই চুরুট, যে চুরুট বাবা রোজ খেতেন। কী করে এমন হয়! বছরের পর বছর ঘরে বৃদ্ধের শেষ খাওয়া চুরুটের গন্ধ কীভাবে ভেসে বেড়ায়।
অপরেশ ঘরে ঢুকলেন। খাটের ওপর পারিপাটি বিছানা বালিশ। খাটের পাশে শুঁড় তোলা চটি, যে চটি তাঁর বাবা রোজ পরতেন। বিছানার পাশে টিপয়ের ওপর নিকেলের ফ্রেমের চশমা এমনভাবে রাখা যেন এইমাত্র চোখ থেকে খুলে রাখা হয়েছে। পাশেই একটা বই উপুড় করা হয়েছে। ঘরের সংলগ্ন বাথরুমের মেঝে ভিজে। শাওয়ার থেকে টিপটিপ করে জল পড়ছে। সিসটার্নের চেনটা যেন অল্প অল্প দুলছে। তবে কি অপরেশের বাবা জীবিত! মৃত্যুর যে সংবাদ জেলে গিয়েছিল সে সংবাদ মিথ্যা!
অপরেশ দোতলার ঘর থেকে ঘরে ঘুরলেন। কোথাও কোনও জীবনের চিহ্ন নেই। বারান্দার দেওয়ালের এক প্রান্তে কাঞ্চনের হাতের লেখা আবিষ্কার করলেন—'বাবা তুমি এসো, আমাকে বাঁচাও!' অপরেশ চিন্তিত হলেন, কেন কাঞ্চন এমন কথা লিখল! কাঞ্চন এখন কোথায়? কাঞ্চন কি তার মামার বাড়িতে নেই? কাঞ্চনের মা-ই বা কোথায়! সে যে জেলে বসে শুনছিল সকলেই তার শ্বশুরবাড়িতে।
বাড়ির কোথাও একটা কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হল। অপরেশ চমকে উঠলেন। এ বাড়িতে দোতলা তিনতলার ছাদের মাঝে রহস্যময় একটা চোরাকুঠুরির অস্তিত্বের কথা অপরেশের হঠাৎ মনে পড়ল। দোতলার বারান্দার শেষ কোণ থেকে একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সেই চোরাকুঠুরিতে উঠতে হয়। মেঝেতে কাঠের পাটাতন পাতা। এক গাদা অব্যবহৃত ভাঙা ফার্নিচার, বাগানে কাজ করার ছোটখাটো যন্ত্রপাতি স্তূপাকার করা।
বর্ষার জলে ভেজা নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে অপরেশ সেই কুঠুরিতে উঠলেন। ঘরের মেঝের চারিদিকে অজস্র মুরগি আর পাখির পালক ছড়ানো। হলদে হলদে পাখির পা একটা কোণে জমে আছে অজস্র। চারিদিকে ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। চাপ চাপ শুকনো রক্ত। একটা শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার শব্দ আসছে ঘরের একেবারে শেষ প্রান্ত থেকে। অপরেশ ঘরের গভীরে ঢুকলেন। দুটো প্রায় ভেঙে পড়া সোফার উপর চকচকে চেন বাঁধা দুটো কঙ্কাল। একটা বড়, একটা শিশুর। বড় কঙ্কালটির হাতে একসার চুড়ি। এ চুড়ি তো তাঁর চেনা। এই তো তাঁর স্ত্রী। এই তো কাঞ্চন।
সারা ঘরে অপরেশ একবার ভালো করে দৃষ্টিপাত করলেন। দূরে একটা ভারী চেয়ার পেছনে ফেরানো। চেয়ারে হেলান দেওয়ার জায়গার দিকে তাকিয়ে অপরেশ একটু চমকে উঠলেন। এক গোছা সাদা চুল শনের মতো বেরিয়ে আছে। একটা মাথার কিছু অংশ। কাঞ্চনের ছেলেবেলার কোনও পরিত্যক্ত পুতুল নয় তো! অপরেশ এগিয়ে গেলেন। চেয়ারের পেছন থেকে মুখ বের করে অপরেশ ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। কণ্ঠ থেকে কোনও শব্দ বেরোল না। চেয়ারে বসে আছেন তাঁর পিতা। শীর্ণ হাত। আঙুলে বড় বড় বাঁকা নখ। মুখের দুকষ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কোলের ওপর ছেঁড়া একটা মুরগি পড়ে রয়েছে। পায়ের কাছে বসে আছে তাদের পরিবারের বিশ্বস্ত কুকুর। কিন্তু কুকুরটার এ কী অদ্ভুত চেহারা! মাথা আর ল্যাজটায় খালি লোম আর মাংস আছে। বাকিটা শুধু হাড়ের খাঁচা। এই অবস্থায় কোনও পশু বাঁচতে পারে! অপরেশ আশ্চর্য হলেন। আরও আশ্চর্য হলেন তাঁর বাবাকে জীবিত দেখে। কিন্তু এ কী ভয়ংকর রূপান্তর! এ তো মৃত্যুরই সামিল।
অপরেশের পিতা মৃত্যুর কিছু আগে থেকে, মৃত্যু মানে, জেলে পাওয়া মৃত্যু সংবাদের আগে থেকেই তন্ত্র, ডাকিনী বিদ্যা, এইসব নিয়েই মেতে উঠেছিলেন। গভীর রাতে ঘরে মৃদু আলো জ্বেলে নানা সাধনায় ব্যস্ত থাকতেন। মাঝে মাঝে বাড়িতে অদ্ভুত শব্দ শোনা যেত। অপরেশ সারারাত জেগে বসে থাকতেন।
'তুমি আসবে জানতুম', বৃদ্ধ হাওয়ার শব্দে কথা বললেন। শরীরী কেউ এ বাড়িতে আসবে, কী থাকবে, আমি তা চাই না। তাই শরীর নিয়ে তুমি আসতে পারলে না। তুমি যাদের রেখে গেলে, তাদের ব্যবস্থাও আমি সেইভাবেই করেছি! একটু কষ্ট পেয়েছে, তা পাক, জীবনের কষ্টের চেয়ে জীবন্মুক্তির আনন্দ অনেক বেশি। তুমি নিজেই এখন তা বুঝতে পারছ। পারছ না? প্রশ্ন করে বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। সম্পূর্ণ উলঙ্গ। শরীরের মাংস শিথিল হয়ে চারদিকে ঝুলছে। অপরেশ সেই গলিত রক্তমাখা বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করে উঠতে চাইলেন; কিন্তু অনুভূতির শারীরিক অংশগুলো না থাকায়, তা সম্ভব হল না।
'তোমাকে নিয়ে আসি, তুমিও তো এই পরিবারের সভ্য হলে, তোমার অস্থি অবয়ব ওই খালি আসনে ওদের পাশে বসবে, তিনে মিলে এতদিনে তোমরা সম্পূর্ণ হলে।' বৃদ্ধ খলখল করে হেসে উঠলেন। মনে হল অনেকগুলো ছিদ্রপথ দিয়ে হাওয়া বেরিয়ে এল। বৃদ্ধের পেছন পেছন বেরিয়ে গেল কুকুরটা।
অপরেশ চাইলেন সেই গুপ্ত কক্ষ থেকে মুক্ত হতে। কিন্তু আধারে আবদ্ধ হাওয়ার মতো, জলের মতো তিনি আর বেরোতে পারলেন না। ঘরে বৃদ্ধ নেই, তিনি অপরেশের দগ্ধ মৃতদেহ আনতে গেছেন কিন্তু অদৃশ্য কোনও বেতার তরঙ্গে তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—'পারবে না, পারবে না তুমি পালাতে, ঠিক সেইভাবেই তুমি তোমার অতীত অস্তিত্বে আবদ্ধ হয়ে রইলে। ধীরে ধীরে তোমার দেহ পচে যাবে, শুভ্র একটি কঙ্কাল আর তুমি মুখোমুখি বসে থাকবে অনন্তকাল।' সেই হাসি, বাতাসের আবর্তের মতো হাসি সারা ঘরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন