সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এখন একটা যুগ পড়েছে, সে যুগের নাম, 'স্যাটা স্যাট'। ফটাফট রুটি তৈরি, স্যাটা স্যাট মেরে দিয়ে ঝপাঝপ বেরিয়ে পড়। সবাই ছুটছে। রাস্তায় গলগল করে লোক ছুটছে। গাড়ি ছুটছে, মাথায় মাল নিয়ে মানুষ ছুটছে। ফুটপাথ কলা দেখাচ্ছে। আঙুর গড়াগড়ি যাচ্ছে। শাঁকালু মুখভার বুড়ো কর্তার মতো ফল পরিবারের একপাশে গুম মেরে পড়ে আছে। কদর নেই তেমন। পাশ থেকে আঙুর উঠে যাচ্ছে। আপেলের লাল-অহংকার। 'কলা' তো এ দেশে যেমন চর্চার বিষয়, সেইরকম আদরণীয় খাদ্যও বটে।
ছাতা, জুতো, ঝ্যাঁটা, ন্যাতা নিয়ে বেশ আছি আমরা। সংসার এখন একটা সরাইখানা। সকালে ঝাঁপ ওঠামাত্রই ঝপাঝপ সব বেরিয়ে পড়ল। জীবন এখন বর্ণমালার কয়েকটি মাত্র অক্ষরে সীমাবদ্ধ। ঝ, ধ আর ঘ। যেমন ঝপাঝপ। ঝপাঝপ পেতে বসে পড়। ঝপাঝপ খেয়ে ফেল ঝপাঝপ তুলে ফেল। না পোষালে মার ঝাঁপ। ঝাঁপ খুলে বেরিয়ে পড় ধান্দায়। তারপর আছে 'ঘ'। ঘোরাঘুরি, ঘুষ আর ঘুসি। চালাও পানসি।
ঘর আছে বটে, ঘরণীর অভাব। অভাব মানে ভাবের অভাব। ভালোবাসা হতে পারে। টাকা থাকলেই ওয়ান রুম, টু রুম। এক ধরনের ভালোবাসাও এপিডেমিকের মতো ছড়াচ্ছে। শাসনের ভ্যাকসিনের বড়ই অভাব। আর অভাব ভাবের। ভাব হয় না; অথচ আমরা এইরকমই বলি—'ভাব ভালোবাসার' ভালোবাসাটিকে আগে বসিয়ে—'ভালোবাসো-ভাব' বলি না। আর একটা শব্দও এসেছে 'ধস্তাধস্তি', অবশেষে 'বিধ্বস্ত'। বাসে, ট্রামে, ট্রেনে, বাজারে, এমনকী উৎসবেও ধস্তাধস্তি। এ ঠেলছে, ও গুতো মারছে, ঘাড়ে কনুই মারছে। ধীর, স্থির মানুষের সংখ্যা ক্রমশই কমছে।
ফুটপাথে ধীরে ধীরে হাঁটছেন। এদিক, ওদিক দেখছেন। দোকানের জানালায় কত কী সাজানো। পোর্সিলিনের সুন্দরী, তুলোর কুকুর, কাগজের মণ্ডের সিংহ। পিছন থেকে কায়দার ধাক্কা, লাট্টুর মতো ঘুরিয়ে দিয়ে চলে গেল। শালোয়ার কামজি পরা ব্যস্তসমস্ত তরুণী। ওড়না উড়ছে। দাঁড়াবার সময় নেই। কম্পিউটার ক্লাস, অথবা হোটেল ম্যানেজমেন্ট, অথবা বিউটি পার্লার।
আগে যাঁরা কবিতা লিখতেন, কি গান গাইতেন, তাঁদের দেখলেই চেনা যেত। এখন যায় না। দু-একজন ছাড়া প্রায় সব কবিরই চুলের বাহার ঘুচে গেছে। আগে এমনও দেখা যেত পেছনে 'ক্লাসিফায়েড' বিজ্ঞাপনের মতো 'ক্লাসিফায়েড' বাবড়ি, সামনে মসৃণ টাক। বোতাম খোলা শান্তিনিকেতনী পাঞ্জাবি। ঘোর মেটে রং। সাইড ব্যাগ। চোখে উদাস দৃষ্টি। চুল নিয়ে, চোখ নিয়ে, সরু সরু আঙুল নিয়ে, গোলাপি গোড়ালি নিয়ে জীবন কাটাতেন। কখনও মেঘলোকে, কখনও সমুদ্রের অতলে নীল সবুজের তরলতায় মুক্তির খোঁজে। একটিমাত্র নারী আর শত শত কবি ও গীতিকার। সেই নারীটি কে? অবশ্যই নিজের স্ত্রী নয়। একমাত্র অক্ষয়কুমার বড়াল তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর অনেক কবিতা লিখেছিলেন। 'এষা' কাব্যগ্রন্থে সংকলিত,
কত যুগ যুগ পরে
এখনও কি মনে পড়ে
তোমার সে হাতে-গড়া সোনার সংসার।
স্ত্রী একটি 'ক্যাটক্যাটে', 'খ্যাটখ্যাটে' চরিত্র, কাব্যে অচল। কবিতায় চাই প্রেমিকা। জীবন যন্ত্রণা। দীর্ঘশ্বাস। ধরি ধরি করি ধরিতে না পারি। শেষে ক্ষয়কাশে মৃত্যু। শীতল একটি সমাধির তলায় চির অন্ধকারে শায়িত কবি। বাবরি ঝরে গেছে। গোঁফ খসে গেছে। লম্বা দাড়ি জট পাকিয়ে গেছে। গীতিকার এই 'এপিসোডে' বেরিয়ে এলেন, 'আমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা'। এইটুকু জানা গেল, প্রেমিকরা প্রেমের খরায় অবশ্যই মারা যাবেন। অকাল মৃত্যুই তাঁর নিয়তি, কিন্তু তাঁকে পোড়ানো হবে না, সমাধিতে পাঠানো হবে। এঁরা সব 'তাজমহল' গোত্রের। প্রেমিকার মৃত্যু নেই। অমর। কবি থাকলেই প্রেমিকা থাকবে। যেমন আলো থাকলেই ছায়া।
গায়করা সেকালে পরতেন পাঞ্জাবি। মার্গসঙ্গীতের তলার দিকে থাকত শেরোয়ানি, চুস্ত, পাজামা। 'আধুনিক' হলে কাঁচি ধুতি। উপর দিকে পাঞ্জাবি 'মাস্ট'। ধ্রুপদ হলে বগলের তলার দিকে ফিতে বাঁধা ফতুয়া পাঞ্জাবি। আর কাওয়ালি হলে লুঙ্গি। বাবরির চেয়ে আরও লম্বা চুল গজাতে না পারলে কীর্তন পরিবেশনের অধিকার জন্মাবে না। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। আড়াআড়ি একটি উত্তরীয় থাকবে। সিল্কের কিংবা পাটের। একটু ভুঁড়ি চাই। তার তলায় ধুতি। লুটিয়ে কোঁচা। গলায় দুলবে গোড়ের মালা—রাধার কী হইল অন্তরে ব্যথা।
বাউলের পোশাক একেবারে 'সেট' করা—আলখাল্লা, পাগড়ি, একতারা। দুটো 'ডিফেক্ট' থাকলে বাউল হবে না। 'স্পন্ডিলোসিস' আর 'স্লিপ ডিস্ক'। হাত না তুললে, আর সামনে ঝুঁকে ঘুরে ঘুরে না নাচলে বাউল হয় না।
এ ছিল সেকালে। একালে অন্যরকম। মুম্বাইতে প্রয়াত মুকেশ ও শ্রদ্ধেয় রফি, দুজনেই সঙ্গীত জগতের দুই স্তম্ভ। তাঁরা থ্রিপিস স্যুট পরে, গলায় টাই দুলিয়ে, প্রেম, বিরহে, বিচ্ছেদের গান গাইতেন। একালের বিদেশিনীরা যে-সাজে, দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটি করে গান করেন, তাতে মনে হয় দুর্গাপুজোর সময় নারকোলডাঙা বারোয়ারি কমিটির বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাই, বলি, 'মা লক্ষ্মী! নিজেকে একটু আবৃত করো। গলা খুলে গান করে, দেহ খুলো না।'
আমাদের 'মর্ডান' শিল্পীরা জিনস আর টি-শার্ট ধরেছেন। সে ভালো। তবে সবাই নয়। অনেকে 'বোরখা পাঞ্জাবি' ধরেছেন। গোড়ালি পর্যন্ত ঝুল। আগে দুহাতে গান হত এখন দশহাতে। গাইবেন একজন, বাজাবেন দশজন, রকম রকম বাজনা। একজন এক ধারে বসে আপন মনে শুধু টিংটিং করবেন। গায়কের সঙ্গে আরও দুজন থাকবেন। তাঁরা একস্ট্রা। একজন গানের খাতা খুলে হারমোনিয়ামের উপর চেপে ধরে থাকবেন। কুস্তিগীরের প্যাঁচ। আর একজন থাকবেন, শিল্পীর ওঠা আর বসার সময় পাঞ্জাবির পেছন তুলে ধরবেন। একজন বিখ্যাত শিল্পী আছেন, তিনি এক আসর সেরে আর এক আসরে গিয়ে পোশাক দুহাতের তালুতে বিলিতি সুগন্ধী ফ্যাঁস করেন। ইন্টারন্যাশনাল বাউলরাও জিনস-পাঞ্জাবি কম্বিনেশন পছন্দ করছেন। একতারা বাজছে 'ক্যাসিওতে'। কারও কারও হাতে 'টয় রিভলভার-এর মতো 'টয়-একতারা'। তাতে তার নেই। বাজে না।
ফ্যাটাফ্যাট, স্যাটাস্যাট। শ্মশানে এসেছেন। সঙ্গে মোবাইল। বাজনা। 'সিনক্রোনাইজ' করা। বাজছে, 'বলো হরি হরি বোল'। কথা হল, 'হ্যালো, কে? হ্যাঁ হ্যাঁ। শ্মশানে। আরে না, না। বাবাকে স্যাটাস্যাট করে পুড়িয়ে এসে যাচ্ছি গুরু। রাগ করো না। বুড়ো মানুষ, মরে গেছে কী আর করা যাবে! না, না, ওয়ান আওয়ার। এই তো, ঢোকাচ্ছে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন