সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সব দিনের মতোই একটা দিন। একটুই যা তফাত। ক'দিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। কালিঘটা। বিশ্রী বিকট মেঘ। তেড়ে তেড়ে বৃষ্টি। ডিম-সেদ্ধ গরম। সেই ভাবটা আজ নেই। গরম সুপের মতো চনমনে দিন। ঝনঝনে রোদ। বাতাস নেই। তা না থাক। পৃথিবীর বাতাস আজকাল তেমন পাওয়া যায় না। দিনরাত পাখার বাতাসই ভরসা। সে বাতাসের দাম আবার খুব বেড়ে গেছে। ইলেকট্রিক বিলই তার প্রমাণ। চার্জ, সারচার্জ, ফুয়েল সারচার্জ। সব মিলিয়ে পেল্লায় অঙ্ক। ভগবান আজকাল বেশিরভাগ সময়ই কুম্ভকে থাকেন। শ্বাস ফেলতে ভুলে যান। গাছের পাতা পড়ে না।
কাজকর্ম রোজ যেমন চলে আজও সেইরকম চলছে। অফিসের টেবিল কাগজপত্রে ছয়লাপ। কপি, প্রুফ আসছে যাচ্ছে। আমি যে-জায়গাটায় বসি, সেটা একটা যাওয়াআসার পথ। চেয়ারের পেছনে দরজা, টেবিলের পাশ দিয়ে একজন যেতে পারে, এইরকম একটা পথ। একটু ভারী চেহারার যাত্রী যাওয়া কি আসার সময় টেবিলের ডান দিকে সযত্নে সাজিয়ে রাখা ফাইলপত্র ধসিয়ে দিয়ে, হেলিয়ে দিয়ে, এলোমেলো করে দিয়ে চলে যাবেন। এরই নাম, ফেলাতোলার রঙ্গ খেলা। এই প্যাসেজের একপাশে সারাটা দিন পড়ে থাকি। সহকর্মীদের গুলতানি। একটু একটু রসিকতা। কথা কাটাকাটি। চড়া মেজাজের বাক্যালাপ। দিনের মেজাজের ভোল্টেজ এইভাবেই বাড়ে কমে। থেকে থেকে চা আসে। দুপুরের দিকে ঝালমুড়ি। এরই মাঝে মাথার পেছন দিকে কনুইয়ের ঠোকা। ব্যস্ত পথিকের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উদাসীন সঞ্চালনে টনক নড়ে যায়। ভারী পশ্চাদেশের ধাক্কায় আমার দুলদুল চেয়ার নড়ে ওঠে। স্থানটির দার্শনিকতা সারাটা দিন আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। একেবারে দরজার পাশে আমার স্থান। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বিদায় করতে খুব একটা তকলিফ হবে না। বলশালী কেউ নিকালো বললেই নিকলে যাব। এক-পা এদিক আর এক-পা ওদিক। কী মজা! আহার আর অনাহারের মধ্যে প্লাইউডের সামান্য একটি দরজা। দরজার মতো দার্শনিক আর কে আছে! ভাগ্যের দরজা কখনও খোলে, কখনও বন্ধ হয়, কখনও খোলেই না। শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশের মর্ম বেশ উলবদ্ধি হয়—''মৃত্যুকে সর্বদা মনে রাখা উচিত। মরবার পর কিছুই থাকবে না। এখানে কতকগুলি কর্ম করতে আসা। যেমন পাড়াগাঁয়ে বাড়ি—কলকাতায় কর্ম করতে আসা। বড় মানুষের বাগানের সরকার বাগান যদি কেউ দেখতে আসে, তা হলে বলে, 'এ-বাগানটি আমাদের', 'এ-পুকুর আমাদের পুকুর।' কিন্তু কোনও দোষ দেখে বাবু যদি ছাড়িয়ে দেয়, তবে তার আমের সিন্দুকটা লয়ে যাওয়ার যোগ্যতা থাকে না। দারোয়ানকে দিয়ে সিন্দুকটা পাঠিয়ে দেয়।'
এই যে আমার প্রতিষ্ঠান, এটা হল প্রসেসিং ইন্ড্রাস্ট্রি। কনজিউমার গুডস তৈরি হয়। সাহিত্যের রোল, কিমাকারি, কবরেজি, মোগলাই, চাঁপরেজালা, সাত্বিক পায়েসও তৈরি হয়। একালের রাগি ছোকরারা আমার সহকর্মী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাহিত্যকর্ম করেন। পায়ে পায়ে সব এগোচ্ছেন, উন্মেষ, খ্যাত, সুখ্যাত, প্রখ্যাত, বিখ্যাত। কেউ এগোচ্ছেন ছন্দে ছন্দে কবিতার পথে জনহর্ষের দোলায় আন্দোলিত হতে হতে। কেউ মনের ছিদ্রপথে মানুষের মনোজগতে প্রবেশ করে বেরিয়ে আসছেন উপন্যাসের সর্পিল পথে। আমি বসে আছি নক্ষত্র সভায়। প্রতিভার কিরণে উদ্ভাসিত হয়ে।
গেলাসের জল খাওয়ার চল অচল। আমার বাঁ পাশে বোতল। প্রতিভা উন্মোচনী, কণ্ঠক্লেশদায়ী পানীয় নয়, আছে জল। চারপাশে স্তূপাকার কাগজ। প্রবন্ধ, ভ্রমণ, রম্য, রাগি রচনা। মানুষের চিন্তার উর্বর ফসলে আমার গোলা ভরা। এরই মাঝখানে কালো একটা ফোন। থেকে থেকে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে। উতলা মনের পাঠক-পাঠিকারা প্রিয় লেখকের সঙ্গে আলাপ করতে চান। পাঠিকাদের উৎসাহই বেশি। তরল, টলটলে কণ্ঠে তাঁরা কথা বলতে চান প্রিয় কবির সঙ্গে, ঔপন্যাসিকের সঙ্গে। হাজার প্রশ্ন তাঁদের, মনোরমা কেন আত্মহত্যা করল, তার কি বাঁচার কোনও পথই ছিল না! আপনার নায়ক শঙ্করের দুটো দাঁত কেন বাঁধানো! কী করে ভাঙল একবারও জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না পাঠককে! এইসব আকণ্ঠ আকুল পাঠক-পাঠিকাদের ধরে আমি যথাস্থানে চালান করে দিই। আমার বাঁ হাতের বিশ্রাম নেই। ফোন তুলি, ফোন নামাই।
হাত দিয়ে ফোন ধরি, চোখ দিয়ে লেখা। মাঝে মধ্যে কোনও কোনও অতি উত্তেজিত, আবেগপ্রবণ পাঠিকা আমাকেই তাঁর কাঙ্ক্ষিত লেখক ভেবে কথা শুরু করে দেন, 'জানেন, আপনাকে না আমার মারতে ইচ্ছে করে। রুমা যে আপনাকে কত ভালোবাসে সে বোধ আপনার নেই। পার্থর সঙ্গে সে কেন যায়, এটা আপনার মোটা মাথায় ঢুকল না। আপনার ওপর অভিমান। মেয়েদের মনের খবর কিছুই রাখেন না।'
এক নি:শ্বাসে বলার পর যেই একটু ফাঁক পাই তখন আলতো করে বলি, 'ধরুন, আপনি যাকে চাইছেন, তাঁকে দিচ্ছি।' 'আপনি তাহলে কে?' 'আমি এখানকার একজন কর্মচারী।' 'তাহলে আমাদের প্রাইভেট কথা এতক্ষণ শুনলেন কেন?' 'শুনিনি তো, আমার কথাটা বলার ফাঁক খুঁজছিলুম।'
এই যে চৌবাচ্চার মতো জায়গাটা বা একটু বড় মাপের ওয়ার্ডরোব, এখানে সাহিত্যের জামাকাপড় ঝোলে। আমি বুরুশ দিয়ে সাফ করি, রিপু করি, বোতাম বসাই, মাপে বড় হলে কাটাকুটি করি। সুতো বেরিয়ে থাকলে ছেঁটে দিই। কখনও কখনও ডিজাইন বদলাই। পুরোনো মনে হলে ফেলে দিই। আমার জ্ঞান বাড়ে, কল্পনা জাগে, কখনও চলে যাই পাহাড়ে, কখনও সাগরের গভীরে। এক সময় লাঞ্চ প্যাকেট এসে যায়। এক ঠোঙা মুড়ি, এক মুঠো বাদাম, গোটাকতক কাঁচালঙ্কা! পাখির মতো খুঁটে খুঁটে খাই। এ এক প্যাটার্নের জীবন। আনন্দের না দু:খের, বলা মুশকিল।
মন জিনিসটা এমন যার কোনও সীমানা নেই। অনেক সময় পেট্রলের মতো ছড়াতে ছড়াতে বহু দূর চলে যায়। অতীতের দিকেই বেশি যায়। সামনে আর যাবে কী করে। সময় তো বহুত মজার জিনিস। আজ থেকে কালে যাব; কিন্তু কালটা কেমন হবে, কী সব আছে সেখানে, যতক্ষণ না যাচ্ছি জানা যাবে না। এ এক আচ্ছা গান্ধারীমার্কা যাত্রা। চোখে ফেট্টি বাঁধা।
বসে বসে ভয়ঙ্কর এক প্রবন্ধের পাতা ওলটাচ্ছি। নারীমুক্তি। নির্যাতিতা, নিপীড়িত, মাতৃত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা, সংসারের খাঁচায় বন্দিনী রমণীদের মুক্তি দিতে হবে। কী থেকে কী! হঠাৎ মনে হল কাটলেট। ছাপান্ন সালে আমার বান্ধবীকে নিয়ে মধুপুরে গিয়েছিলুম নরম শীতে। সকালে বেড়াতে বেড়াতে, জীবনের যত কথা কইতে কইতে নানারকম গান গাইতে গাইতে, ধরাধরি হাত দোলাতে দোলাতে, জীবন স্বপ্নের দোলায় দুলতে দুলতে, খিদে পেয়ে গেল। তখন মধুপুরের স্টেশনে কেলনারের রেস্তোরাঁ ছিল। পরিপাটি সুন্দর। 'কী খাবে তুমি?' বান্ধবী ঝকঝকে হেসে বলেছিলে, 'কাটলেট খাব।'
সাদা প্লেটে চড়ে একজোড়া কাটলেট চলে এল। ঢাউস নয়। ছোট ছোট। বাদামি রং। মুচমুচে। পিঠে বিজবিজ করছে গরম তেলের দানা। সুবাস আজও লেগে আছে নাকে। স্যালাড। টাটকা মটরশুঁটির গড়াগড়ি। উজ্জ্বল দিন। মধুমাখা রোদ। চোখের সামনে প্রেমিকা। সুস্বাদু কাটলেট। মনের সেতারে ললিত বাজছে। প্রেমের ফুল বিরহে ঝরে যায়। আমার প্রেম ফল হয়ে পেকেছিল। কাটলেট সাক্ষী।
'আমি কাটলেট খাব।' মন বলে উঠল।
এক দাবড়ানি, 'চোপ! কাটলেট খাব! সে-কাটলেট নেই, সেই লিভার নেই, বয়সের ময়ূরপঙ্খী সময়ের নদী বেয়ে দূর অতীতে। মুড়ি, বাদাম খাও। কাটলেটের কাল চলে গেছে। ইংরেজদের সঙ্গে সঙ্গে কাটলেট কালচার দেশছাড়া। স্টিম ইঞ্জিন গেছে, ইন্টার ক্লাস গেছে, কেলনার গেছে। ফার্পো গেছে। চুপ রহো মন।'
প্রবন্ধে মন ভেড়ালুম। আধুনিক সংসার কেমন হবে! মুক্ত নারীর সমাজ কেমন হবে ভয়ঙ্কর সেই দিন আসছে।
'কাটলেট খাব।'
এবার বেশ জোরে। শিশুর বায়নার মতো।
'এই চুপ। কাটলেট এখন পাওয়া যায় না। উত্তর কলকাতার কোনও কোনও জায়গায় পাওয়া যেতে পারে। আগের মতো নাও হতে পারে। লক্ষ্মী ছেলে, পাঠে মন দাও। প্রেস বসে আছে।'
আবার পড়তে শুরু করলুম। ফাইন লেখা, পড়তে পড়তে নিজেকে আবিষ্কার। চেয়ারে বসে আছি একটা পশু। শিমপ্যাঞ্জি। ছোটলোকের চেয়ে ছোটলোক। এই চা করো। এক গেলাস জল দাও। ভালো ইলিশ এনেছি, কাঁচা ঝোল লাগাও। মধুকে খেতে বলেছি। জামাটা ইস্তিরি করে রেখো গো। মাথাটা টিপটিপ করছে, কপালে একটু হাত বুলিয়ে দেবে। এই সব বলে এসেছি এতকাল, স্ত্রীকে আপনজন ভেবে। এত নীচ আমি! হুকুম করেছি, তম্বি করেছি, অভিমান করেছি!
'আমি কাটলেট খাব।' এবারে একেবারে বাঝখাঁই গলা। 'খাবই খাব।'
উঠে পড়লুম। স্পিরিচ্যুয়াল ক্রাইসিস। প্রবন্ধের চাবকানিতে অপরাধবোধ জেগেছে, তার ওপর লোভ। ভেতরটা ছারখার হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় নেমে এলুম।
'মশাই! কাটলেট কোথায় পাওয়া যায়? ফিফটি সিক্স ব্র্যান্ড। মুচমুচে বাদামি। লেজের দিকে হাড়ের ছোট্ট বোতল। যেন ছোট্ট হাতি চেপ্টে দাঁত ছিরখুটে পড়ে আছে।'
তেমন মশাই চোখে পড়ল না। কলকাতার ক্ল্যাসিক্যাল মানুষরা অদৃশ্য। ক্লাসের যুগ শেষ। এখন মাসের যুগ। বিশাল মিছিল চলেছে। গ্যাটকে গাঁট্টা মারো। সাট্টাকো সালাম করো। এইরকম সব কথা। ওদিকে মাদ্রাজি রেস্তোরাঁ। এদিকে চিনে। চিনে মদ ঢুকেছে। মাদ্রাজে অ্যারিস্ট্রোক্র্যাসি। বড়ার দাম বারো টাকা। এক আউনস কফি পাঁচ টাকা।
'মশাই! কাটলেট কোথায় পাওয়া যায়?'
'কলকাতায় জঞ্জাল পাওয়া যায়, মিছিল পাওয়া যায়, আগুন জ্বালা বক্তৃতা পাওয়া যায়, খানাখন্দ পাওয়া যায়, কাটলেট কোথায় পাওয়া যায় জানি না।'
নিজের সঙ্গেই নিজের কথা হচ্ছে। হঠাৎ মনে হল ভয়ঙ্কর নাম করা একটা রেস্তোরাঁর একটা শাখা আছে। রাস্তার এ-পার আর ওপার! সাধারণ মানুষের জন্যে নয় তবু জীবনে একবার যেতে দোষ কী? অন্তরাত্মার প্রবল বাসনা, কাটলেট খাব।
রাজার মতো পোশাক পরা একজন কাচের দরজা খুলে দিলেন। জানি এই খাতিরটুকুর দামও খাদ্যে ধরা হবে। একতলায় পানভোজন। দোতলায় শুধু ভোজন। আমাকে দোতলায় চালান করা হল। অস্বস্তিকর কৃত্রিম পরিবেশ। পয়সাওয়ালারা এইটাই পছন্দ করে। আধো-অন্ধকার। কেমন সব রমণী, পুরুষ। যাই হোক, সাহস করে আসনে বসলুম। পকেটটাও পরীক্ষা করলুম। একটা কাটলেটের কত দাম হতে পারে? দুশো!
ঠাস করে একটা মেনু পড়ল। সামনে গাঢ় রঙের স্যুট পরা এক ভদ্রলোক। অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে। সলিড মুখ। দু:খ, আনন্দ, হাসি কোনও কিছুই লেখা নেই সে মুখে। বাঁ হাতে শক্ত ফোল্ডার, ডান হাতে পেনসিল। প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত চোখ বোলালুম। কাটলেটের কথা লেখা নেই কোথাও।
তখন সাহস করে একেবারে গোলা বাঙালির মতো জিগ্যেস করলুম, 'দাদা! কাটলেট নেই?'
সংক্ষিপ্ত উত্তর, 'আছে, চিকেন কাটলেট।'
'তাহলে কাটলেট।'
'আর কিছু?'
'পরে।'
ভদ্রলোক মিটার ইনস্পেক্টারের মতো টুকটুক করে কী সব লিখে নিয়ে চলে গেলেন। দামটা জানা গেল না। একটা উদ্বেগ। যাক তেমন হলে ঘড়ি, আংটি খুলে দেব।
এইবার একে একে সব আসতে লাগল। যেন আমার অপারেশন হবে। সাদা একটা প্লেট। কাঁটা চামচে, ছুরি, সাদা তোয়ালে কোলে পাতার জন্যে, হাত মোছার রুমাল। জলের বোতল, গেলাস। কাচের বাটিতে গোটা গোটা গোলাপি পেঁয়াজ। সসের বোতল। নানারকম আচার। টেবিল জমজমাট।
বসে আছি, বসেই আছি। কাটলেট আর আসে না। তৈরি হচ্ছে। প্রথমে বাঁধা হবে। ডিমের গোলায় অবগাহন করে, গায়ের বিস্কুটের পাউডার মেখে কড়ায় গিয়ে চড়বে। সময় তো লাগবেই। বসে বসে দেখছি, সুখী নরনারী বেপরোয়া খেয়ে চলেছে। ব্যাটের মতো নান রুটি, নৌকোর মতো আইসক্রিম, স্নেহ জড়ানো ফ্রুট স্যালাড। শুধু খাওয়া নয় প্রেমের দৃশ্যও আছে। মাথায় মাথা ঠেকিয়ে কথা। সপরিবারে খাওয়ার দৃশ্যও আছে।
এইবার আসছে, নাচতে নাচতে আমার কাটলেট আসছে। দূর থেকেই সুবাস পাচ্ছি। গরম কাটলেটের চিটপিট আওয়াজ। মাথার ওপর দিয়ে, কানের পাশ দিয়ে কথাকলির ভঙ্গিতে পরিবেশন। চোখের সামনে সাদা প্লেটে আধ হাত পরিমাণ খাম্বা একটা মাল। ঘুঁটের মতো শুকনো ফাটাফাটা চেহারা। তেমন দর্শনধারী নয়। হয়তো গুণী।
আস্তিন গুটিয়ে আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত হলুম। এক হাতে ছুরি এক হাতে কাঁটা। খাও অন্তরাত্মা, কাটলেট খাও, কত খাবে খাও। ছুরিটা ঠেকিয়েছি, হঠাৎ কানের কাছে কে যেন বলে উঠল, 'আমাকে একটা কাটলেট খাওয়াবে?'
ছুরি আর কাঁটা পাশাপাশি শুইয়ে রাখলুম। এ যে আমার পরিচিত কণ্ঠস্বর!
সেদিন খুব বৃষ্টি পড়ছে। গভীর রাত। জানলায় বিদ্যুতের ঝিলিক। ঘরে মৃদু আলো। প্রতিমা মৃত্যুশয্যায়। ওই যে ওই মেয়েটি, মধুপুর স্টেশনে কেলনারে যে আমার সঙ্গে কাটলেট খেয়েছিল। যার সঙ্গে খড়কুটো দিয়ে পরে আমি ঘর বেঁধেছিলুম। প্রতিমার একটা হাত আমার হাতে। দুজনেই দুজনকে ধরে আছি শক্ত করে। প্রতিমা হঠাৎ বললে, 'কাল একটা কাটলেট এনো না, সেই কাটলেট। অনেকদিন খাইনি।'
পরের দিন আনা হল না। সাত কাজে, শত দুশ্চিন্তায় স্রেফ ভুলে গেলুম। রাতে প্রতিমা বললে, 'কই আনলে না!' আমি বললুম, 'ইস! বড় ভুল হয়ে গেছে গো। কাল অবশ্যই আনব।'
'কাল!' হাসি খেলে গেল ঠোঁটের কোণে।
আমার কাল রইল। প্রতিমার কাল শেষ হয়ে গেল। ভুলে না গেলে তার ঠোঁটে সামান্য এক টুকরো কাটলেট গুঁজে দিতে পারতুম। খেতে পারত না, তবু একটু স্বাদ পেত। এই যে আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে পারলুম না, আর তো কোনও উপায় নেই। কোনওদিন তো দেখা হবে না। মানুষ একবারই আসে, সম্পর্ক একবারই তৈরি হয়।
সত্যিই কি কোনও কণ্ঠস্বর শুনলুম। ঘড়িটা দেখলুম। ১৪ আগস্ট। গতবছর এই দিনেই প্রতিমা চলে গিয়েছিল। 'যা বাকি রইল তা বাকিই রয়ে গেল। তোমার কাছে আর কোনও কৈফিয়ত চাইব না। চাইতে আসবও না।'
'বেয়ারা!'
নিজের গলা শুনে নিজেই চমকে উঠলুম। ভয়ঙ্কর উচ্চস্বর। ক্ষিপ্ত কোনও মানুষের কণ্ঠ। বেয়ারা সামনে হাজির।
'বিল।'
লোকটি একটু অবাক হয়েছে। যার খাওয়াই শেষ হল না, সে বিল চাইছে! ইতস্তত ভাব। আমি আবার বলুলম 'বিল।'
'হাঁ সাব' বলে চলে গেল। আমি টেবিলের দিকে আর তাকাচ্ছি না। চোখ বুজিয়ে অতীতের দিকে ছুটছি। পেট্রল পাম্পের মিটার যেন উলটো ঘুরছে। বয়েস ঝটঝট কমছে। জীবনের ফেলে আসা ঘটনার পথ ধরে ছুটছি। ছায়া শরীর, ছায়া ঘটনা। কোনওটাই নেই, তবু আছে।
বিল এসে গেল। সত্তর টাকা। টাকাটা ট্রেতে ফেলে দিলুম। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি যাব বলে, বিব্রত লোকটির প্রশ্ন, 'আপনি খাবেন না! কোনও গোলমাল!'
কোনও উত্তর নেই আমার। কাচের দরজা। কাঠের সিঁড়ি কার্পেট ঢাকা। বেরোবার দরজায় সেই দ্বারী। ছোট্ট একটা সেলাম। আবার রাস্তা। লাল নীল মোটর গাড়ি। অনাদি অনন্ত মানুষের মিছিল। এইবার টপ করে একটা শব্দ হল। পরিষ্কার শুনতে পেলুম। ছুটে চলা জীবনস্রোতে এক বিন্দু জীবন পড়ার শব্দ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন