সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

তাঁরাই সুখী যাঁদের মন অর্ধ বিকল। মন যদি সবকিছু গ্রহণ করতে চায় তাহলে এ যুগে বেঁচে থাকার মতো দু:সহ যন্ত্রণার আর কিছু নেই। আমরা অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে পারি, দারিদ্র্যের সঙ্গে সহবাসে অভ্যস্ত। বর্তমান কালের নৈতিক অবক্ষয় এক নতুন অভিজ্ঞতা।
সবকালের সবসমাজেই কিছু না কিছু দুর্নীতি ছিল। ঘুষখোর সরকারি কর্মচারী ছিল। চরিত্রহীন নারী-পুরুষ ছিল। অবাধ্য ছাত্র ছিল। ভোগী স্বার্থপর মানুষ ছিল। তারা থাকত যে যার এলাকায়। ছোট ছোট পচা মশা-ভ্যানভ্যানে ডোবার মতো। দুর্নীতির ক্ষুদ্র জলাশয় এখন দুর্নীতির সমুদ্র, উত্তাল, সুনীতির তট প্লাবিত করে, আদর্শ-টাদর্শ সব ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেছে।
সুনীতি দুর্নীতির চেয়ে আরও আতঙ্কের হয়ে উঠেছে যে জিনিস, তা হল মূল্যবোধহীন মানুষ। বস্তুর গুণ নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের সম্পর্কের বাঁধন খুলে পড়ে গেছে। আদর্শপরায়ণতা এখন উপহাসের বস্তু। যিনি কর্তব্য করতে চান তিনি মূর্খ। এক ধরনের বুদ্ধিমান মানুষ নতুন মূল্যবোধের হৃদয়হীন এক সমাজের ভিত্তিস্থাপন করেছে। ধূর্ততার ইট আর স্বার্থপরতার পলেস্তারা দিয়ে সেখানে নতুন ইমারত তৈরি হবে। গড়ে উঠবে প্রয়োজনের সংসার।
পুরুষের প্রয়োজন হবে নারীকে, নারীর প্রয়োজন হবে পুরুষকে। বিবাহ নয়, হবে চুক্তি। জৈব সম্পর্কের আলগা বাঁধনে সন্তান-সন্ততি আসবে, যাদের বলা হবে মানুষের বাচ্চা। বেড়ালের কাছ থেকে শিখতে হবে সন্তান পালনের নীতি। বেড়াল জননীর সঙ্গে তার সন্তানের সম্পর্ক তদ্দিনই যদ্দিন না তার চোখ ফুটছে। চোখ ফুটে একটু চলে-ফিরে বেড়াতে শিখলেই মায়ের অন্যরূপ। বাচ্চা সোহাগ করে কাছে এলেই ফ্যাঁস করে থাবা। তফাত যাও। নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নাও। কিছুদিন পরেই দেখা যাবে বাচ্চা মাকে দেখলে ফ্যাঁস করে তেড়ে যাবে। কেউ আর কাউকে চেনে না। সম্পর্কিত শত্রু।
সিংহের কাছ থেকে মানুষ শিখবে। সিংহজননী তার শাবকদের নিয়ে পাহাড় বা উঁচু কোনও জায়গায় উঠে যায়। তারপর একের পর এক বাচ্চাদের ঠেলে ঠেলে ফেলে দেয় খাদে। যে শাবকটি খাদ বেয়ে উঠে আসতে পারে সিংহজননী তাকেই মানুষ করে।
মানুষ ছাড়া জীবজগতের শিক্ষাই হল, স্নেহ মমতা দয়া করুণা ভালোবাসার কোনও দাম নেই। শক্তিতে বাঁচো, স্বার্থে বাঁচো, লড়াই করে বাঁচো। পৃথিবীতে আসা মৃত্যুর জন্যে। ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখালেন :
লেলিহাসে ত্বং গ্রসিতুং সমন্তা-
ল্লোকান সমগ্রান বদনৈজ্ব লদ্ভি:।
তেজোভিরাপূর্য্য জগৎ সমগ্রং
ভাসস্তবোগ্রা: প্রতপন্তি বিষ্ণো।
লক লক করে জ্বলছে সর্বশরীর, মুখগহ্বর, গ্রাসিতে সকল দিকে সকল ভুবন। প্রচণ্ড তোমার তেজ অতি-দুর্নিবার, সর্বব্যাপী হয়ে বিষ্ণো! দহিছে সংসার।
ভগবান বলছেন : কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃত প্রবৃদ্ধো
লোকান সমাহর্ত্তুমিহ প্রবৃত্ত:।
অর্জুন আমিই প্রচণ্ড কাল লোকক্ষয়কারী, লোকনাশ হেতু আমি এসেছি ধরায়। মানুষ এতকাল এই সত্যটিকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে। অর্জুনের মতো কাতর কণ্ঠে বলেছে : নমোস্তুতে দেববর প্রসীদ। তোমার রূপ সংবরণ করো, শান্ত হও।
ভীত মানুষ, সংসারে আশ্রয় খুঁজেছে, পিতা-মাতার নির্ভরতা খুঁজেছে, নারীতে ভালোবাসা খুঁজেছে, প্রকৃতিতে বিশ্বজননী খুঁজেছে। ঝুড়ি ঝুড়ি কাব্য সৃষ্টি হয়েছে, বিরহের গানে বাতাস কেঁপেছে, সাহিত্যে সম্পর্কের জায়গান হয়েছে, আদর্শের স্তম্ভ তৈরি হয়েছে। ঈশ্বরের কল্পনা করে মানুষ স্তব-স্তুতি করেছে! উপনিষদের ঋষি সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলেছেন :
হিরন্ময়েন পাত্রেন সত্যাস্যাপিহিতং মুখং।
তৎ ত্বং পূষণ অগাবৃনু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে।
যে সত্য প্রকৃতই সত্য তা আমরা ভুলে থাকতে চাই। যে সত্য হল প্রতি মুহূর্তে আমাদের ক্ষয়, বিনাশ, একের হাতে অন্যের সংহার, মৃত্যু। ঋষিরা বলেছেন, হে জ্যোতির্ময়, তোমার সত্যরূপ দর্শন করার সাধ্য আমাদের হবে না।
ঋষিপন্থা ছিল নিজের আধারকে বিশাল করে মানুষের ক্ষুদ্রতা, পঙ্কিলতাকে ধারণ করার মতো একটা অবস্থা সৃষ্টি করা। নিৎসের যরথুস্ত্র বললেন :
Verily, a polluted stream is man. One must be a sea to be able to receive a polluted stream without becoming unclear.
বিসর্জন নাটকে রঘুপতি জয়সিংহকে বলছেন :
মূর্খ, তোমার আমার হাতে সত্য নাই
সত্যের প্রতিমা সত্য নহে, কথা সত্য
নহে, লিপি সত্য নহে, মূর্তি সত্য নহে—
চিন্তা সত্য নহে। সত্য কোথা আছে কেহ
নাহি জানে তারে, কেহ নাহি পায় তারে।
দুর্বলের সত্য এক রকম, সবলের সত্য আর এক রকম। সবল বলবে, বিবেক আবার কী বস্তু! বিবেকের দংশনই বা কী। The bite of conscience, like the bite of a dog into a stone, is a stupidity. সবলের বিবেক থাকে না, বিবেক হল দুর্বলের।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে : Happy is the Country which has no history. সেই দেশই সুখের যে দেশের কোনও ইতিহাস নেই। হেগেলের কথায় : A State has no aim, we alone give it this name or that. সবল দেশ দুর্বল দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। বিজ্ঞানের যত উন্নতি সব চলে যাবে সবলের হাতে। বিজ্ঞান মানুষকে যত না বাঁচাবে তার চেয়ে মারবে বেশি। ইতিহাসে এই হল রাষ্ট্রের স্বরূপ। সহ অবস্থান, বিশ্বশান্তি সবই হল আমাদের কল্পনা, আরোপিত লক্ষ্য। প্রতি বছরে প্রতিরক্ষা খাতে আমেরিকায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়ছে। দশ বছর আগে ছিল পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার। এখন আরও বেড়েছে। ভান্স প্যাকার্ড বলেছেন : Any cutbacks would throw some constituents out of jobs and hit some of their local industries. বিগ পাওয়ারসদের মধ্যে যেই শান্তির আদিখ্যেতা শুরু হয় অমনি আমেরিকার স্টক এক্সচেঞ্জ টলমল করে ওঠে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কোথাও কোথাও একটা যুদ্ধ চাই।
ইতিহাসের লক্ষ কী আমাদের জানা নেই। ইতিহাসের শিক্ষা আমাদের জানা আছে।
যে কোনও দেশের সমাজে একদল মানুষ কালে সভ্য হতে হতে দুর্বল হয়ে পড়ে। নখের ধার কমে যায়, দাঁতের জোর কমে যায়, মন উদার হয়, তখনই বেজে ওঠে মৃত্যুর ঘণ্টা। দেশের সেই অংশ, যে অংশ সভ্যতার ধার ধারে না, যাদের আমরা নিউ জেনারেশন বলি, তারা তেড়ে আসে। অসভ্যতার কখনও ভ্যাকুয়াম থাকতে পারে না। মেকি সংস্কৃতি, মূল্যবোধ সব চুরমার হয়ে যায়। সভ্যতা হয়ে দাঁড়ায় উপহাসের সামগ্রী।
তবু এত যুগ ধরে সভ্যতা বেঁচে আছে কী করে?
এই ব্যাপারে নিৎসের ব্যাখ্যা ভারী সুন্দর। দুর্বল, অসুস্থ মানুষ সবলের চাপে একক হয়ে পড়ে। মনে বনে কোণে শুরু হয়ে যায় তার একক সাধনা। সে হয়ে যায় শান্ত স্থিতধী, জ্ঞানী। যেমন যার দুটো চোখ, তার চেয়ে, যার একটা চোখ সে ভালো দেখে কারণ তার একটা চোখে দুটো চোখের দৃষ্টি এসে জমে। অন্ধের আবার অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়, শ্রবণশক্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রখর হয়। It is precisely the weaker nature who being more delicate and freer makes progress possible.
যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলুম, আংশিক মানসিক পক্ষাঘাত ছাড়া এ যুগে বেঁচে থাকা অসম্ভব। সরে থাকা যাবে না, মরে থাকতে হবে। মাকিয়াভেলির কথা কত সত্য ছিল, the form of government is of very little importance, although the half educated think otherwise.
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন