সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

দুজনে মশগুল হয়ে কথা বলছেন। গঙ্গার ধারে বেওয়ারিশ একটা বিশাল মাঠ। বিকেলে ফুটবল, সকালে মর্নিংওয়াক। আজকাল ঘরে ঘরে টিভির মতো, ঘরে ঘরে মর্নিংওয়াক ঢুকেছে। বাঙালি হঠাৎ খুব ভুঁড়ি কনসাস হয়েছে। আগে ভুঁড়ি ছিল মধ্যপ্রদেশের শোভা। তখন বেশির ভাগ বাঙালি ধুতি পরত। সাহেবি প্যান্টের কালে ভুঁড়ি বেমানান। প্যান্টের কোমর আর কাঁহাতক বাড়ানো যায়। কোমরে বাড়তি কাপড় আর কত রাখা যায়। সেদিন এক বিয়ে বাড়িতে দেখলুম একজন আর একজনের ভুঁড়ি মাথায় দিয়ে শুয়ে আছেন। জিগ্যেস করে জানলুম, ভুঁড়িটা সিরিয়াল ডিরেকটারের, মাথাটা প্রডিউসারের। অনেক আগে ওই মাঠে দু-চারজন বৃদ্ধ ভ্রমণকারীকে দেখা যেত। কেউ কাশছেন, কেউ কাঁপছেন, কেউ হাপরের মতো হাঁপাচ্ছেন। এখন যেন উৎসব। সৌন্দর্য সচেতন সুন্দরীরা হাঁ করে গঙ্গার বাতাস টানছেন, কখনও দ্রুত হাঁটছেন, কখনও মন্থর। আগে প্রবীণরাই আসতেন এখন পাহারাদারি করার জন্যে সঙ্গে আসেন স্ত্রী। দাঁতে দাঁত চেপে স্বামীকে সতর্ক করেন—'হাঁ করে কী দেখছ? আ গেল! এইজন্যই শরীরটা সারছে না। রোগ তো একটাই। এ রোগের তো কোনও ওষুধ নেই।' এখন এমন অবস্থা হাঁটতে গেলেই ধাক্কা লাগে। অনেকেই অবশ্য মর্নিংওয়াকের নামে বাঁধানো বটতলায় বসে মজলিশ করেন। আর দেখেন।
সেইরকমই দুজন। আলোচনা হচ্ছে।
'মিলেনিয়ামটা কী রে?'
'ভাইরাস। খুব হচ্ছে চারদিকে।'
'ধুর, সে তো ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া। আমি বলছি মিলেনিয়াম। খুব ঘটা করে আসছে।'
'খুব সাবধান! একদম ঠান্ডা লাগিও না, যা-তা খেয়ো না। পেটটা ঠিক রাখো। পেট থেকেই যত অসুখ। একবার তোমার জন্ডিস হয়ে গেছে। বেঁচে ফিরে এসেছ। সে-ও তোমার ওই জামাইয়ের দৌলতে। মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করেছিল বলে খেপে গিয়েছিলে তখন। এখন দেখো, প্রিমিয়ামটা কেমন পেলে!'
'মিলেনিয়াম মনে হয় কোনও সায়েব! আলোর বলে চেপে আমেরিকা থেকে ময়দানে আসছে!'
'ও ছেড়ে দাও, ওদের অনেক উপগ্রহ আছে। প্লেন, হেলিকপটার সব পুরোনো হয়ে গেছে ওদের কাছে। আমেরিকায় একটা লোকও গরিব নয়। সব মিলিয়নিয়ার। যার মিলিয়ান আছে সেই তো মিলেনিয়াম। আম। কত আম আছে ইংরেজিতে শুনবে? হারমোনিয়াম, ডিলিরিয়াম, প্যান্ডিমোনিয়াম, ক্যালসিয়াম, জিরেনিয়াম। আমাদের দুটো মোক্ষম জিনিস হল, রাম আর আম। মুখে রাম পেটে আম।'
'কোন গাছের আম?'
'ও তোমার ওই মিলেনিয়াম। একটা ল্যাংড়া পনেরো টাকা। আঁটিটাতেই দশ ঢুকে গেছে।'
'যাই বলো ভাই, আমাদের পান্তা-পেঁয়াজের নো তুলনা। আমেরিকানদের জন্যে দু:খ হয়।'
'বাজে বোকো না! আমাদের জীবনে কী আছে ভাই! বড় লোকের শখের পান্তা অর গরিবের অভাবের পান্তায় অনেক তফাৎ! পান্তফান্তা নার্থিং, আসলি চিজ রুপিয়া। টাকা।'
'খাটি কথা! গিভ মি মানি আই উইল গিভ ইউ ফ্রিডাম, কে যেন বলেছিলেন?'
'কেউ বলেননি। নেতাজি বলেছিলেন, গিভ মি ব্লাড আই উইল গিভ ইউ ফ্রিডম।'
'ওই হল, এক বোতল ফ্রেশ ব্লাড ছশো সাতশো নশো। নিজেকে গরিব ভেবো না ভাই। তোমার আমার সকলের ভেতরেই বোতল বোতল রক্ত, কত বোতল তার ঠিক নেই। ইউটিলাইজ করা যাচ্ছে না, এই যা দু:খ, লকড হয়ে লকারে পড়ে আছে। পুড়ে গেলে আর কিছুই পড়ে থাকবে না। যাক, মিলেনিয়াম দেখতে যাবে না কি? নাচা-গানা, রং, তামাশা!'
'মুর্খ! কালকে কি দেখা যায়! আগামী কালকে কি দেখতে পাচ্ছ। কাল হল মহাকালীর জিভ, একটু একটু করে বেরোবে আর তুমি একটু একটু করে চিতার দিকে এগোবে!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন