জলছাত

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘মাখনবাবুর বাড়িতে একটা ভালো খেস আছে। গতবছর পাঞ্জাব থেকে কিনেছিলেন।'

'কে চাইতে যাবে?'

'কেন, তুমি? তোমার সঙ্গে তো ওঁর স্ত্রীর ছাতে ছাতে প্রায়ই আলাপ হয়। প্রাণের কথায় এতই মশগুল থাকো, নীচে থেকে ডেকে ডেকে গলা চিরে যায়, তবু উত্তর পাওয়া যায় না।'

'তোমার যা মিনমিনে মেয়েলি গলা, পাশের ঘর থেকেই শোনা যায় না, তা ছাত থেকে।'

'সংস্কৃতিমান লোকের গলা একটু মোলায়েমই হয়। তোমার মতো অমন পানদোক্তা খাওয়া লহরজান, গহরজান টাইপ হয় না। মেয়েদের গলা কেমন হয়? যেন ঝাড়লণ্ঠনে বসন্তের বাতাস লেগেছে। তোমার মেয়েকেও একটু সাবধান করে দিও। তোমারই তো কাউন্টার পার্ট। ছেলের বাবা কিছু জিগ্যেস করলেই ষণ্ড-কণ্ঠে, কী বললেন বলে, সব যেন ভণ্ডুল করে না দেয়! বলবে বাতাসের সুরে, ঝিরি নিশ্বাসে যেন কথা বলে। তালে লয় মিলিয়ে।'

'আজ্ঞে না, সে যুগ আর নেই। মেয়েলি ন্যাকাপনা এখন অচল। একটু পুরুষালি গলাই ভালো। ছেলেরা পছন্দ করে বেশি।'

'তুমি সব জানো। আমিও একটা ছেলে। আমি যা বলব সেইটাই জানবে ঠিক।'

'তুমি ছেলে নও।'

'তার মানে?'

'তার মানে তুমি আর এখন ছেলে নও। আধবুড়ো।'

বিনয় বললে, 'আধবুড়ো হলেও ছেলে তো?'

'আধবুড়ো, না ছেলে, না মেয়ে, একটি ভ্যাবাগঙ্গারাম।'

'তাই না কি? তা হলে অত বড় একটা অফিস সামলাচ্ছি কী করে।'

'আজকালকার অফিস আর সামলাতে হয় না। চলছে চলবের যুগ।'

'এরপর তা হলে বলবে, মেয়েদের ঠোঁটে একটু গোঁফের রেখা থাকলে আকর্ষণ বাড়ে।'

'বাড়েই তো। আমি যা যা বলছি সব সত্যি। তার প্রমাণ আমি আর তুমি!'

'তার মানে?'

'মনে আছে বাহান্ন সালের কথা? যখন তুমি আমার প্রেমে লাট খাচ্ছ!'

'প্রেমে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়।'

'তাই বুঝি বলতে, যত দেখছি তত চমকে উঠছি। তুমি আমাকে এক হাটে কিনে, একহাটে বেচে দিতে পারো।'

'বলেছিলুম।'

'হ্যাঁ বুড়ো। মনে করে দ্যাখো। তখনও আমার এই রকমই গলা, ঠোঁটের ওপর হালকা গোঁফের রেখা। তখন আবার এও বলেছিল, কটা-সুন্দরীর চেয়ে শ্যামল দীর্ঘাঙ্গী আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। সাধে আমি ম্যাড হয়ে তোমার পেছন পেছন ঘুরছি?'

'আরে আমি তোমার পেছনে ঘুরছি, না তুমি আমার পেছনে ঘুরেছ?'

'আহা, তাই নাকি? কি বা শুনি আজ মন্থরার মুখে। কার্সিয়াং-এ মামার বাড়ি গেছি, তোমার জ্বালায় কলকাতায় টিকতে না পেরে। দ্বিতীয় দিন সকালে বাজারে গেছি। মাফলার জড়ানো এ মূর্তি কে? একগাল হাসি, হে হে এই মাত্র নামলুম শ্যামা। প্রাণ অমনি জল হয়ে গেল আমার। এত বড়ো নির্লজ্জ, আমাকেই আবার জিগ্যেস করা হচ্ছে, কোথায় উঠবে শ্যামা? মনে পড়ছে?'

'হ্যাঁ, তা একটু একটু পড়েছে বই-কি!'

'তা হলে, কে ঘুরেছিল? তুমি না আমি?'

'তখন আমার মাথার ঠিক ছিল না।'

'খুব ঠিক ছিল। একেবারে শ্যাম'-পাগল, বুঁচকিটিকে ঠিকই চিনতে।'

'যাক গে, সেসব পুরোনো কথা ছেড়ে কাজের কথায় এসো। খেসটা পারবে আনতে?'

'চেষ্টা করে দেখি। আমি পারব না এমন কাজ অবশ্য খুব কমই আছে।'

শ্যামার মেয়ে রেখাকে আজ দেখতে আসবেন পাত্রপক্ষ। মাসখানেক হল কথাবার্তা চলছে। চিঠিচাপাটি, ছবি দেখাদেখি, প্রাথমিক নির্বাচন শেষ। এইবার মুখোমুখি। অনেকটা লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষার মতো। শ্যামার চেয়ে বিনয়ের দুর্ভাবনাই বেশি। ছবিতে কেরামতি চলে, চেহারায় তো চলে না। মেকআপে তো সব হয় না। তবে ভরসা এই, রেখাকে পুরোপুরি তার মায়ের মতো দেখতে নয়। শ্যামাকে অনেকটা ডেকাথেলন চ্যাম্পিয়ানের মতো দেখতে। আট আনা বারো আনা ছাঁটে চুল কেটে দিলে বোঝে কার সাধ্য পুরুষ কি মহিলা। ভাগ্য ভালো, রেখা অনেকটাই বাপের চেহারা পেয়েছে, গলাটাই যা ভয়ের। ভল্যুম কনট্রোল নেই। আর মেজাজটাও মায়ের দিকেই গেছে। এপাশ ওপাশ সহ্য করতে পারে না, মিলিটারি মেজাজ। অস্ত্রোপচারের ডাক্তারও হতে পারত। ভাবটা এই রকম : ঝামেলা করছে কেটে ফেলে দাও। বোতাম আটকে গেছে। বুকের কাছে জামাটা ফাঁড়াস করে ছিঁড়ে পা গলিয়ে খুলে ফেল। ড্রয়ারের চাবি আটকে গেছে। মারো টান। হুড়দুড় করে সব পড়ে গেল। শ্যামার মতোই চরিত্রে ধৈর্যের ধ-ও নেই। এই তো সেদিন। পায়ের বুড়ো আঙুল চটির স্ট্র্যাপে কীভাবে যেন আটকে গিয়েছিল। চটির বেয়াদপিতে এমনই অধৈর্য হয়ে পড়ল, মার ঝটকা, চটি ছিটকে গিয়ে দুধের ডেকচিতে। বুড়বুড়ি কেটে ডুবে গেল। আঙুলে একবার একটা চোঁচ ফুটেছিল। প্রথমে পাখি ছুঁচ দিয়ে একটু চেষ্টা হল, শেষে ধ্যাত তেরিকা, ব্লেড দিয়ে খানিকটা মাংস উপড়ে, মাস খানেক ব্যান্ডেজ বেঁধে অচল হয়ে বসে রইল। রেখার জন্যে বিনয়ের ঘুম গেছে। এ মেয়ে একমাত্র ডিকটেটারেরই স্ত্রী হতে পারে! পাত্র খুঁজতে হবে জাম্বিয়ায়, নাম্বিয়ায়, ঘানায় কিংবা লিবিয়ায়।

বিনয়দের ফ্যামিলির একটা ট্র্যাডিশন আছে। সেটা হল, কেউ এলেই তাকে এমন খাওয়ানো, যেন তিন দিন হাঁ করতে না পারে। ফুলকো লুচি, বেগুন ভাজা, পাশে চাকনা দেওয়ার জন্যে একটি কাঁচা লংকা, ঝুরো আলু ভাজা। দু'পিস পাকা রুইমাছ ভাজা, অন্তত চার রকমের মিষ্টি, বিগ সাইজের। এক প্লেট রাবড়ি খাও, এবং খেয়ে সামলাও। আজকে সেই ধরনের ব্যবস্থাই হবে। কিঞ্চিৎ বেশি। কারণ যাঁরা দেখতে আসছেন তাঁরা অত্যন্ত বনেদি পরিবারের মানুষ। গাড়ি আছে, বাড়ি আছে। বাড়ির মেঝে মার্বেল পাথরের। পেট্রলের দাম বাড়ায় গাড়ি অধিকাংশ সময়েই গ্যারেজে থাকে। কর্তার হুকুম, নেহাত প্রয়োজনে না পড়লে তেল পোড়ানো চলবে না। কর্তা রিটায়ার্ড ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। কর্তা আর গিন্নি দু'জনেই বেশ গতরওয়ালা মানুষ। দু'ছেলে। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। তিন জামাই গাড়িধারী। একজন ডাক্তার। তিনি প্রফেসান নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। শ্বশুরবাড়িতে কালেভদ্রে আসেন। আর একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি প্রায়ই আসেন। শ্বশুর-শাশুড়িকে গাড়ি চাপিয়ে এখানে-ওখানে বেড়াতে নিয়ে যান। সংসারের প্রিয় জামাই। তৃতীয়টি প্রবাসী। হাওয়াই কোম্পানিতে চাকরি। আজ মাদ্রাজে তো কাল বোম্বাইতে।

বিনয় এসব খবর সংগ্রহ করেছে তার বন্ধুর কাছ থেকে, তিনি এই যোগাযোগের কর্মকর্তা। বিনয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনেছে। কারণ শ্বশুর আর শাশুড়ি বস্তু দু'টিতে তার ভীষণ ভয়। মেয়েটিকে যদি নেয়ও, কেমন ব্যবহার করবে কে জানে? আজকালকার ছেলেমেয়েদের বিশ্বাস করা যায় না। বিয়ের পর নিজমূর্তি ধরতে মাস তিনেক সময় লাগে। বরাতের কথা ফেলে রাখা যায় না ঠিকই, তবু যতটা পারা যায় দেখেশুনে, খোঁজখবর নিয়েই এগোনো উচিত।

বাড়ি-ঘর বেশ মনের মতোই সেজেগুজে উঠেছে। শ্যামা খেসটা শেষপর্যন্ত জোগাড় করে এনেছে। কথায় আছে চিল উড়লে কুটোটা অন্তত নিয়ে যাবেই। শ্যামা হল সেই চিল। সোফাসেট, ডিভান সরে গেছে। মেঝেতেই সব আয়োজন পাকা। বসেও আরাম, দেখেও আরাম। জানলার পর্দা-টর্দা, দরজার পেলমেট সব নতুন করে লাগানো হয়েছে, পুরো ঘরটাই যেন স্টিম লন্ড্রি থেকে কেচে বেরিয়ে এসেছে। আয়োজন দেখে বিনয় নিজে নিজেই বা: বা: করে উঠল।

চারটে প্রায় বাজে। আসার সময় হয়ে এল। কথা আছে চারজন আসবেন। ছেলে, মা, বাবা, একজন পারিবারিক বন্ধু। ছেলের বড় মামা। তিনজন পুরুষ একজন মাত্র মহিলা। মহিলার সংখ্যা কম থাকা ভালো। মেয়েরা বড়ো নাকতোলা হয়। শ্যামার সঙ্গে হয়তো শেষে ঝটাপটিই বেধে গেল! কিস্যু বলা যায় না। মেয়ের মাকে যে প্রথমটায় কেঁচো হয়ে পার করতে হয়, তারপর, ফোঁস ফাঁস চলতে পারে, এই কূটনৈতিক চালটা বিনয় এত করেও বউকে শিখিয়ে উঠতে পারল না। বললেই বলবে, মেয়ের মা হয়েছি বলে চোরের মতো থাকব কেন। সব ফ্যামিলিতেই মেয়ে আছে। বউরাই পরে গিন্নি হয়, গিন্নিরাই শাশুড়ি হয়। আমর দাপট আমি ছাড়ব না। মেয়ে আমার কিছু কম যায় না। তুমিও এমন কিছু ফেলনা নও। শেষের কথায় বিনয়ের অহঙ্কারে বেশ সুড়সুড়ি লাগে। বিনা প্রতিবাদে শ্যামার যুক্তি মেনে নেয়।

দরজার সামনে রাস্তার ধারে বিনয় সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন ব্লেডে দাড়ি চেঁচেছে। গালে মেখেছে আফটার শেভ লোশন। দিশি ধুতিতে কোঁচ। আধুনিক বাপেদের জিওগ্রাফি বেশ পালটে যাচ্ছে। পালটাবে না কেন? বাজেট যেখানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার, মেয়ের বাপ জুতো মশমশিয়ে হবু বেয়াইদের জন্য মুখে সিগারেট গুঁজে, চোখে রিমলেস ঝুলিয়ে রাস্তায় পায়চারি করতে পারে। মেয়ে শিক্ষিতা সুরূপা। দেঁতো হাতি নয়, ট্যারা পেঁচা নয়। বংশোচিত বিনয়ে আপ্যায়ন আসুন, বসুন, দেখুন। পছন্দ হয় ভালো, না হয় ছেলের অভাব নেই। ম্যানম্যানের, প্যানপ্যানের যুগ চলে গেছে।

রাস্তায় একটা ঘোড়ার গাড়ি ঢুকছে। বিনয় অবাক। শতাব্দীর গোড়ার দিকে এমন গাড়ি দেখা যেত। এখনও মাঝে মধ্যে দেখা যায়। চৌরঙ্গীর দিকে। গঙ্গার ধারে রাতের বাবুরা হাওয়া খেয়ে বেড়ান। মাঝে মধ্যে দুধের ক্যান নিয়ে এক-ঘোড়ার একটা গাড়ি এদিক থেকে কোন দিকে যেন যায়। এ ঘোড়াটা তত মড়া-খেকো নয়। মাড়োয়ারীদের বিয়ের ঘোড়ার মতো। পড়তি-জমিদারের মতো। চেকনাই এখনও কিছুটা লেগে আছে।

কোচোয়ান হাঁকল,

'বিনয়বাবুকা কোঠি?'

'হ্যাঁ, এ হি কোঠি।'

'নমস্তে সাহাব।' রাশ টেনে গাড়ি থামাল। জানালা দিয়ে বুলডগের মতো লালমুখ বেরিয়ে এল, 'মনে হয় আপনিই বিনয়বাবু?'

বিনয় হাত জোড় করে বললে, 'আজ্ঞে হ্যাঁ।'

'রোককে রোককে।'

গাড়ি রুখেই আছে। বাঙালির স্বভাব, বাস থেমে থাকলেও যাত্রীরা রোককে বলে হুড়মুড় করে নামেন। কোচোয়ান তিড়িং করে কোচবক্স থেকে লাফিয়ে পড়েই, গাড়ির দরজা এক হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল। চার জোড়া হাঁটু দেখা গেল। লোকে সিটি মারবে। আশেপাশের বাড়ির জানালায় মুখ বেরোতে শুরু করেছে। পুলিশই বা এমন একটা গাড়ি ছেড়ে দিল কী করে!

বহুত কসরত করে বিশাল এক মোটা মানুষ গাড়ি থেকে প্রথমে নেমে এলেন। ভারমুক্ত হয়ে গাড়ি প্রায় এক হাত ওপর দিকে উঠে পড়ল। ঘোড়াটা ভোঁস করে একটা নি:শ্বাস ছেড়ে একটু যেন সুস্থ হল। গাড়ি থেকে অন্যান্য সকলে নেমে পড়লেন। ক্যামেরা থাকলে বিনয় একটা ছবি তুলে রাখত। পর্বতের পাশে যেন তিনি টুকরো টিলা। একজনকে ছাড়া বিনয় আর কাউকেই চেনে না। যাকে চেনে তার নাম হিমাংশু আচার্য। হিমাংশুর যোগাযোগেই এই দেখাশোনা। না চিনলেও স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোকের হাবভাব দেখে বুঝতে অসুবিধে হয় না, তিনিই পুত্রের পিতা। জেলা শহরে আসামী ঠেঙানো মানুষ। অসবর নিলেও সারা দুনিয়াটাকে এখনও যেন এজলাস থেকেই দেখছেন। যে মহিলাকে এরই মধ্যে বার দুয়েক ধমকধামক লাগানো হয়ে গেল, তিনি নিশ্চয়ই স্ত্রী। তা ছাড়া আর কার সঙ্গে অমন ব্যবহার করা যায়।

হিমাংশু হাসতে হাসতে বললে, 'কত্তা ঘোড়ায় চেপে তেল বাঁচাচ্ছেন।'

বিনয় বললে, 'এ জিনিস এখনও আছে?'

'যত্ন করে রাখলে সবই থাকে ভাই। কত্তার বাবা সিভিল সার্জেন ছিলেন। তাঁর আমলের জিনিস। ঘোড়াকে বাতে না ধরলে যৌবন সিল্কের কাপড়ের মতো দু-তিন পুরুষ থেকে যায়।'

কথা বলতে বলতে সকলে ঘরে এসে পড়েছেন। মেঝেতে বসার আয়োজন হয়েছে দেখে কর্তা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন,

'ও হিমাংশু, চিরটাকালই তো সিংহাসনে বসে এলাম, আজ আবার এ কী হল? জানোই তো, আমার মধ্যপ্রদেশ সব প্রদেশের বড়।'

বিনয় বললে, 'ভাববেন না, আমি সোফা প্লেস করে দিচ্ছি এখুনি।' যতটা তটস্থ হলে ভালো দেখায় ঠিক ততটা তটস্থ হয়েই বললে। মন কিন্তু গজগজ করছে, সিংহাসনে বসে এসেছেন। কত বড় কাজি ছিলেন। জেলা সদরের ম্যাজিসট্রেট। রংচটা কাঠের চেয়ার। সে চেয়ার আমি যেন দেখিনি। পেছন দিকের ঠেসান দেওয়ার অংশটা সাধারণত চেয়ারের চেয়ে উঁচু হয়। মাথা ছাড়িয়ে ওঠে। সিংহাসনে বসি। ওরে আমার চিফ জাস্টিস রে।

শোওয়ার ঘর থেকে সোফা বেরোবে। সেই সকাল থেকে রাজেনের সঙ্গে সমানে লেগে থেকে থেকে বসার ঘরের দিশি অঙ্গসজ্জা হয়েছিল। নাও এবার বোঝো ঠ্যালা। নাইনটিনথ সেঞ্চুরির সোফার গতরটি তো নেহাত কম নয়। এ মাল একমাত্র পবননন্দনই একা বহন করতে পারে। তার মত ফিনফিনে বাবুর কম্ম নয়। আয়নায় নিজের চেহারার প্রতিফলন দেখে ঘেন্না ধরে গেল নিজের ওপর। ছেলের বাপের এক কিকে পেনাল্টি সীমানার বাইরে গিয়ে পড়বে। দেহ ছোট হলেও মনও ছোট হয়ে যায়। বড় খোলে বড় জিনিস থাকবে, ছোট খোলে ছোট জিনিস। এই তো নিয়ম।

হিমাংশু, রাজেন আর বিনয়ের চেষ্টায় সেই গায়ে-গতরে সোফা মেঝের ওপর দিয়ে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে যথাস্থানে রাজসিংহাসন হল। পাত্রের পিতা হারানিধি বসে ছাড়লেন। অতখানি ওজন দুটো পায়ের এতক্ষণ ধরে রাখার একটা ক্লান্তি আছে। বসে সুস্থ হয়ে ঘরের চারপাশ ভালো করে এক নজর দেখে নিয়ে বিনয়কে জিগ্যেস করলেন—

'দরজা-জানালা কি বার্মাটিকের?'

'আজ্ঞ না সত্তর সালের বাড়ি, এমনি সিপিটিকেই দশহাত জিভ বের করে ছেড়ে দিয়েছে, বার্মা পাব কোথায়?'

'শুনলে শশাঙ্ক?' শ্যালককে উদ্দেশ্য করে হাসতে হাসতে বললেন, 'বার্মা কোথায় পাব? সন্ধান রাখতে হয় মশাই, সন্ধান রাখতে হয়। সন্ধান করলে ঈশ্বর মেলে, বার্মাটিক মিলবে না? আমরা কী করে পেলুম শশাঙ্ক?'

ত্যারছা চোখে হারানিধি বিনয়ের দিকে তাকালেন। বিনয়ের মনে হল খুব বুড়ি, মোটা এক বাইজি তাকে চোখের ভঙ্গি করছে, তিরছি নজরিয়াকে বান।

'জলছাত করেছেন?'

'আজ্ঞে না।'

'সে এ কী ই! দশ বছর বাড়ি হয়ে গেল, জলছাত হয়নি! কী বলে শশাঙ্ক! ঢালাইয়ের লোহা বেরিয়ে পড়বে। করেছেন কী!'

বিনয়ের ভীষণ অবাক লাগছিল। ভদ্রলোক মেয়ে দেখতে এসেছেন না বাড়ি। মিউমিউ করে বললে,

'এই করব করব করে আর ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারিনি।'

'ওই হয়, করব না করব না করে বুড়ো বয়েসে বিয়ের মতো হবে আর কি? সব কিছুরই বয়েস আছে মশাই। টাকে তেল ঢাললে কি আর চুল গজাবে। তেলের পয়সাটাই বরবাদ হবে। কী বলো শশাঙ্ক?'

শশাঙ্ক যেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয় বয়স্য গোপাল ভাঁড়। হয় হেসে, না হয় তাল দিয়ে ভগিনীপতিকে ঠেকা দিয়ে চলেছে।

'ট্যোটাল কস্ট কত পড়েছিল?' হারানিধি আরও গভীরে যেতে চান।

বিনয়ের এবার বিশ্রী লাগছে। এত কৌতূহল তে অভদ্রতারই শামিল। বিনয় তবু ভদ্রভাবেই বললে,

'ঠিক মনে নেই, সত্তর হাজারের মতো হবে।

'জমি ধরে?'

'না, জমি আলাদা।'

'ক' কাঠা আছে?'

'পাঁচ কাঠার মতো।'

ভদ্রলোক শ্যালকের দিকে তাকিয়ে হাঁটুতে তাল ঠুকে বললেন, 'চলো, উঠি তো হলে?'

বিনয় অবাক হয়ে বললে, 'কেন? সে কী কথা? উঠবেন কেন?'

শ্যালকও ধরতে পারেনি, 'মেয়ে দেখবেন না?'

'আর দেখে কী হবে?'

বিনয় হঠাৎ বলে ফেলল, 'কেন জলছাত নেই বলে?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ধরেছেন ঠিক।'

বিনয় কী ধরেছে নিজেই জানে না। ধরাটা হঠাৎ মিলে গেছে দেখে অবাক হয়ে বললে,

'জলছাতের সঙ্গে মেয়ে পছন্দ-অপছন্দের কী সম্পর্ক?'

'ও, ধরেও ধরতে পারেননি দেখছি। আচ্ছা, ছাত কত বর্গ ফুট আছে?'

'মাপিনি, তবে মনে হয়, ছশো কি সাতশো স্কোয়ার ফুট হবে।'

'জলছাতের খরচ কত হবে বলে মনে করেন?'

'আজ্ঞে ধারণা নেই।'

'পাঁচ সাত হাজার। কী বলো শশাঙ্ক? পাঁচ সাতে হবে না?'

'বড়ো জোর আট।' শশাঙ্ক আর একহাজার ওপরে উঠে জ্ঞান জাহির করল।

'তাহলে একবার বুঝে দেখো, হিমাংশু আমাদের এমন জায়গায় এনেছে যিনি গত দশ বছরে আট হাজার টাকার মুখ দেখেননি। দেখলে জলছাত হয়ে যেত। বিনয়বাবু, আমার ছেলে সি এ, ছ'ফুট লম্বা, গৌরবর্ণ আপনার বাজেট কত টাকা?'

বিনয় আর একটু হলেই বলে ফেলেছিল পঞ্চাশ হাজার। সামলে নিল। ভেতরটা ঘৃণায় কুঁকড়ে যাওয়ার মতো হচ্ছে। আর যাই হোক, এমন মহামানবের পুত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে স্বপ্নেও সম্ভব নয়। সে বলল,

'আমার মতো লোক আর কত খরচ করতে পারে? আপনি নিজেই অনুমান করে নিন।'

'সেই অনুমান করতে পেরেছি বলেই আর সময় নষ্ট করতে চাইছি না, আমাদের আত্মীয়তা, কুটুম্বিতা সবই বড় বড় ঘরে। ছেলের বিয়ে দিয়ে মাথা হেঁট করে থাকতে পারব না। আপনারও অস্বস্তি, আমারও অস্বস্তি, আপনার মেয়েও মাথা উঁচু করে চলতে পারবে না। আমাদের বংশে বউরা এসেছে বড় বড় বংশ থেকে। সোনার কাজ করা জামদানি পরে। শরীরের এক ইঞ্চিও খালি থাকত না, সব সোনায় মোড়া। চলো হে শশাঙ্ক।'

'একেবারে শুধু মুখে চলে যাবেন। একটু জলযোগ করে গেলে সুখী হতুম।'

'জলযোগ? যেখানে সেখানে যোগ করার বয়েস কি আর আছে মশাই? চলো হিমাংশু। আমার তিন কেজি ছোলাই লস হল তোমার জন্যে।'

হিমাংশু আসন ছেড়ে উঠতে উঠতে বললে, 'আজ্ঞে পেট্রল হলে লোকসানের পরিমাণটা আরও বেশি হত।'

'হ্যাঁ, তা অবশ্য হত। আমার গাড়ি আবার একটু বেশি তেল খায়।'

ঘোড়া ন্যাজ নেড়ে নেড়ে খড় খাচ্ছিল। কোচোয়ান বাবুকে দেখে কোচবক্সের ঢাকনা খুলে খড় তুলে রাখল। হারানিধি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি আবার দেবে গেল এক হাত।

মাথার ওপর বাতাস কেটে ছপটি ঘুরল। ঘোড়া ছুটল কদম কদম তালে। হঠাৎ বিনয়ের ভীষণ হাসি পেয়ে গেল। ঘরের একমাত্র সোফায় পা ছড়িয়ে বসে হো হো করে হেসে উঠল। সোফাটা তখনও দেবে আছে। বিনয় হাসছে আর বলছে, 'উরে বাপরে মানুষ, মানুষ।'

শ্যামা ঘরে এসে অবাক। বিনয় কোনওরকমে বললে, 'কী জিনিস এসেছিল গো। মেয়ের বিয়ের আগে জলছাদের ব্যবস্থা করো।'

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%