সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকার কল্যাণে একটাই হয়েছে। বছরে বার তিনেক অন্তত নিজেকে খোঁজার একটা সুযোগ পাওয়া যায়। আমাদের সব দিনই একদিন। সকালে শয্যাত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে আবিষ্কার করি, যাক, আজও তাহলে বেঁচে আছি। খোলা জানালা আর বারান্দা দিয়ে এপাশ ওপাশে তাকাই। একইধরনের পানসে আকাশ। সামনের বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে সেই একই ঝাঁঝালো সূর্য। গোটাকতক শহুরে পাখির বিরক্তি ভরা ডাক। এ হল পড়তি মানুষের এলাকা। সাবেক আমলের রংচটা, নোনাধারা বাড়ি। তখন ইংরেজ আমলের বেনিয়ান, মুৎসুদ্দিরা সব খেলিয়ে বাড়ি কিনেছিলেন। বিরাট, বিরাট সব যৌথ পরিবার ছিল। বড়, মেজ, সেজ, ন, রাঙা। এক একজন এক একরকম। বড় রাশভারী, তো মেজ মেজাজি, সেজ খেয়ালি, ন রাগি আর রাঙা ফচকে।
জীবন যেন যাত্রার পালা। ভোরবেলা সব ভোঁভোঁ। কোথায় কনসার্ট, কোথায় হাহা হাসি, কোথায় ডায়ালগ, দুয়ো রানির কান্না। সেসব এক রাতের পালা! মানুষের জানাই থাকে রাত পোহালে ফরসা হবে পালা। গালচে গোটান, নর্তকীর গলায় ছেঁড়া মালা এধারে, ওধারে। বাঁশের তলায় নেড়ি কুকুর ন্যাজ গুটিয়ে শুয়ে। এ পালা কিছু দীর্ঘ দিনের। চক মেলানো ঝকঝকে বাড়ি। মেয়েদের গায়ে ভরি ভরি গয়না। জামাইবাবুর পাতে মাছের মুড়ো। পাতের পাশে পেস্তা ছড়ানো ক্ষীরের বাটি, মর্তমান কলা সটান, ল্যাংড়া আমে কাঁঠালে মাছি। আহারান্তের উদগারে গোয়ালের বাছুর-মা চরে ফিরে এসেছে ভেবে প্রতিধ্বনি করে উঠত। বড়জা, মেজজাকে কোনওরকমে এড়িয়ে বউ এসে বলত, কোমরের কশিটা আলগা করে দাও। পেট নয় তো, ধামা।
এসব চোখের সামনে দেখা। সেই ছাপ্পান্ন বছর আগের সকালে। ফিটন থেকে ফোর্ড। দুর্গা পুজোয় জোড়া ঢাক। পালা-পার্বণে সাতশো লোকের পাত পেড়ে খাওয়া। হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে যেভাবে যক্ষা কি ক্যানসারের রোগী পান্ডুর হয়ে আসে, তারপর পড়ে থাকে তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র অতি হতচ্ছেদ্রায়, সেইরকম চোখের সামনে জ্ঞানহীন হয়ে গেল পল্লির জনবসতি। কোনও কোনও পরিবারের শেষ প্রতিনিধিকে দেখি, হঠাৎ দেখা। বুক খোলা আধময়লা পাঞ্জাবি, মলিন একটি লুঙ্গি, রাস্তায় এক ধার দিয়ে সন্তর্পণে, পা মেপে চলেছেন মাদার ডেয়ারির দুধ আনতে। এমন কেউ নেই যে তাঁর এই সামান্য কাজটি করে দিতে পারে। কপালের কাছে চশমার উপর হাতের আড়াল দিয়ে রোদের ঝলক সামলাচ্ছেন। চোখে ছানি। মাঝে মাঝে থামছেন, হাপরের মতো শ্বাস নিচ্ছেন। হয়তো অবাক হয়ে ভাবছেন, যৌবনের সেই ঝলমলে রংদার পৃথিবীটার এ কী হাল হল।
বিপুল বিশৃঙ্খলা, বিকট শব্দ, ভাঙা পথঘাট, ধুলো, ঘাম। পদে পদে বিভ্রান্তি। সংঘর্ষ। মনান্তর, মানুষের অকারণ ব্যস্ততা। কোথাও কোনও শ্রী নেই। ক্ষিপ্ত, উৎক্ষিপ্ত পরিবেশ। সর্বাঙ্গে ধুনো জড়িয়ে গাছেরা বসন্তবিদায় কোন নবপল্লবে নতুন বর্ষকে আবাহন জানাবে! এখন বাক্স খুলে নতুন বছরকে বের করতে হবে। সেই একই ফর্মা। কিছু গান, কিছু কথা। একই রকমের স্মৃতিচারণ। একই মুখের মেলা। অনুষ্ঠান যাঁরা সাজান, যাঁরা অংশগ্রহণ করেন, সবাই জানেন, হচ্ছে না কিছুই। করতে হয় করা।
আমাদের জীবনের সুর কেটে গেছে। এলোমেলো প্রাণধারণ। একটা ডোবায় অনেক তেলাপিয়া। রোজই একজলে চলে যাচ্ছে, রোজই কিছু জন্মাচ্ছে। বাংলা শালের খবর কেউ রাখে না। আমাদের জীবন থেকে দুটো জিনিস চলে গেছে, ভক্তি আর শ্রদ্ধা। আজকাল কেউ প্রণাম করে না। যুবকরা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে বৃদ্ধদের এড়িয়ে চলে। মা আর মেয়ের মধ্যে বয়েস ধরে রাখার প্রতিযোগিতা। কর্তারা কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। ছোটরা কেরিয়ার বানাবার চাপে বিমর্ষ।
আমপাতা, শোলার ফুল দিয়ে কে সাজাবে প্রবেশদ্বার। কে স্থাপন করব মঙ্গলঘট! কে সাজাবে নৈবেদ্য সযত্নে। কোথায় পূজারী। বড় অবহেলায় উচ্চারণ, পুরুত। পুজোর জায়গায় নবীনদের অবশ্যই অনুপস্থিতি। প্রদীপের শলতে উসকে দেওয়া জন্যে, গঙ্গাজলের ঘটি এগিয়ে দেওয়ার জন্যে হাজিরা দেবেন কয়েকজন প্রাচীন, প্রাচীনা। যে বাড়িতে তেমন কেউ নেই, সে বাড়িতে পুজোপাঠও নেই।
আজকাল মানুষ ফ্ল্যাটে থাকেন। সেখানে ঢালাও ঠাকুরঘর বলে কিছু থাকে না। সেপসিফিকেশন হাল, দুটো বেডরুম, কিচেন, ডাইনিং স্পেস। একটা ঝুল বারান্দা চেয়ারের মাপে। এরই মধ্যে যেটা নিয়ে মানুষ বেশি ব্যস্ত, সেটা হল বাথরুম। দুটো বাথরুম অতিশয়, গর্বের, জনে জনে ডেকে ডেকে বলার মতো। এরপর মানুষের শ্রেণিবিন্যাস এইরকম হতে পারে, এক বাথরুমওলা পরিবার। দু-বাথরুমওলা পরিবার। আজকাল জুতোর ঘর থাকতে পারে, ঠাকুর ঘর নৈব চ। সেদিন এক পরিবারে ঠাকুর ঘরের বদলে ঠাকুর আলমারি দেখলুম। চারতলা আলমারি। গ্রাউন্ড ফ্লোরে গুরুদেব, দেবদেবীর ছবি। গঙ্গাজলের শিশি। হোমিওপ্যাথিক ঘণ্টা। উগ্রগন্ধী ধূপের প্যাকেট। ফাস্ট ফ্লোরে কাগজপত্র, ব্রিফকেস। থার্ডফ্লোরে আই লেভেলে মদের বোতল। ঠাকুরের চেয়েও গর্বের, সসম্ভ্রমে পরিচয় দেওয়ার মতো। সবই বিলিতি, অতিশয় দামি।
আজকাল বাঙালিকে জোড়া ভূতে ধরেছে—আড্ডা আর ক্লাব কালচার। কথায় কথায় আড্ডা। নববর্ষের আড্ডা, হোলির আড্ডা, বড় দিনের আড্ডা, বিজয়া দশমীর আড্ডা।
আর যে কোনও ছুতোয় বোতল বোতল গিলে, অসংলগ্ন হয়ে চেত্তা খেয়ে পড়া।
এ সব ভাই আপনার সোসাইটির ব্যাপার। বোতলেই ব্রহ্ম।
বললে, ইংরিজি নববর্ষে বিলিতি খেয়েছি দামি ক্লাবে প্যান্টালুন পরিবেশে। আর বলছ যখন বাঙালি হতে, তখন না হয় খালের ধারে বসে বাংলা খাই। আর স্খলিত কণ্ঠে গাই, 'বঙ্গ আমার জননী আমার, অনেক সাধনায় এই দাঁড়িয়েছি মা। অমি জাত ভুলে যে বেড়াই ঘুরে, বাংলা গেছি ভুলে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন