সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার ছেলেকে আমি সায়েব বানাব।
রঙে নয়। শিক্ষায়, দীক্ষায়, মেজাজে, সহবতে। আমি কালো। আমার ছেলে ঝুল-কালো। যখন হাসে, মনে হয় ভাল্লুকে শাঁকালু খাচ্ছে। বাপ হয়ে ছেলের সমালোচনা করা উচিত নয়। বউ ফরসা, ছেলেটা এমন কেন আবলুস কাঠের মতো হল? অভিজ্ঞরা বলেন ছেলেরা বাপের দিকে যায়, মেয়েরা মায়ের দিকে। কৃষ্ণ কালো, কোকিল কালো, কোলো চোখের মণি। কালো জগৎ-আলো।
সায়েব পাড়ার ইস্কুলে ব্যাটাকে ভরতি করতে হবে।
পয়সা যখন আছে, কেন করব না। কিন্তু পয়সায় তো আর নামকরা স্কুলের দরজা খুলবে না। সে অনেক হ্যাপা। শুনেছি শিশু যখন মাতৃজঠরে ভ্রূণের আকারে গর্ভসলিলে হেঁটমুণ্ডু, ঊর্ধ্ব-পুচ্ছ, তখনই নাকি ভালো স্কুলের ওয়েটিং লিস্টে নাম লেখাতে হয়। স্ত্রীর কানের কাছে চিৎকার করে ইংরেজি বই পড়তে হয়। পুরোনো দিনের লেখকের লেখা চলবে না। হাল আমলের লেখক চাই। আমেরিকান লেখক হলে ভালো হয়। গোর ভাইডাল, সস বেলো, স্টেইনবেক। স্ত্রী ডাকলে হ্যাঁ বলা চলে না। বলতে হবে ইয়েস! এমন কিছু বই পড়ে শোনাতে হবে যাতে ইয়াংকি স্ল্যাং আছে। হ্যারলড রবিনস, হেডলি চেজ। এ সব করার উদ্দেশ্য, ভ্রূণের চারপাশে একটা ইংলিশ মিডিয়াম তৈরি করা। মানে বনেদটাকে বেশ শক্ত করে গেঁথে তোলা।
আমার শ্যালিকা এসব ব্যাপারে ভারী এক্সপার্ট। আমার বউয়ের মতো গাঁইয়ে নয়। বহুকাল আগেই চুলে তেল মাখা ছেড়েছে। শ্যাম্পু করে করে চুলের চেহারা করেছে কী সুন্দর। ম্যারিলিন মনরোর মতো। ফুরফুর করে হাওয়ায় উড়ছে। ঠোঁটে চকোলেট কালারের লিপস্টিক, তার ওপর লিপগ্লস। আজ পর্যন্ত, আমি একবারও ফ্যাকফ্যাকে ঠোঁট দেখিনি। অলওয়েজ স্মার্ট। চোখে ব্ল্যাক পানথারের চোখের মতো বিশাল এক গগলস। সেক্সকে সোচ্চার করে রেখেছে। শাড়ি পরার অসাধারণ কায়দা কোথা থেকে সে রপ্ত করে রেখেছে। যেমন কোমর, তেমনি তার কায়দার প্রদর্শনী। চিনে খাবার ছাড়া খায় না! মাঝে মধ্যে ফ্রাই খায়। স্যুপ দেখলে আমার বউয়ের মতো 'মেগগে' করে ওঠে না। শুনেছি মাঝে মধ্যে একটা দুটো বিড়ি-ফোঁকাও করে থাকে। নাইটি পরে শুতে যায়।
সেই মায়ের ছেলে পেট থেকে ড্যাডি ড্যাডি করে পড়বে, তাতে আর আশ্চর্য কী আছে! শ্যালিকা বলে, সাজপোশাক, আহার-বিহারের ওপর মানুষের অনেক কিছু নির্ভর করে। বিকিনি পরলে বাঙালি মেয়েও, কিস মি কিস মি ডার্লিং বলে সি-বিচে ছুটতে থাকবে। শাড়ি পরলে, বলদ, গোয়াল, সাঁজালে, সিঁথির সিন্দুর, সন্ধের শাঁখ, এই সবই মনে আসবে। মনে আসবে ঘুঁটে, গোবর, গুল, গঙ্গাজল। দোজ ডেজ আর গন পাঁচু!
এখন বাইকের পেছনে বয় ফ্রেন্ডের কোমর জড়িয়ে ধরে অফিসে যাওয়ার যুগ পড়েছে। জিনসের পেছনে লেখা থাকে—Look Here. সাঁঝের বেলায় আর সাঁঝাল নয়, পার্ক স্ট্রিটের আলো-আঁধারি, ঝকাঝম ঝকাঝম বারে বসে লাল ঠোঁটে, লাল পানীয়ের গেলাস।
আমার ছেলের মা সারাজীবন কী করে এল? ছাপা শাড়ি পরে এতখানি একটা খোঁপা করে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হেঁশেল ঠেলা। পেটে পুঁই শাক, লাউয়ের ডাল, ছ্যাঁছড়া, খোসা চচ্চড়ি। সেই মায়ের ছেলে ব্যা-বা, ব্যা-বা করবে না তো, কী করবে?
বউয়ের তো অনেক ধরন আছে। কেউ বউমা, মানে যার মধ্যে মা মা ভাবটা বেশ প্রবল। কেউ বধূ। যার মধ্যে কন্যাভাব প্রবল। কেউ শুধুই বউ, সাদামাটা ঘরোয়া একটা ব্যাপার। কেউ ওয়াইফ। স্লিভলেস ব্লাউজ, অর্গান্ডির শাড়ি, সে এক আলাদা ব্যাপার। কেউ আবার মিনসে। একটু রং-চটা। দেহে তেমন বিন্যাস নেই, একটু এলোমেলো। বেঁচে থাকার ধরনটা গেলেও হয়, থাকলেও হয়। সংসার চলছে চলুক।
কথায় আছে, স্বভাব না যায় মলে, ইজ্জত যায় না ধুলে। ইজ্জত বলে না ইল্লত বলে কে জানে! একই মায়ের দুই মেয়ে! আমারটি একরকম, শ্যালিকাটি আর একরকম। ওই জন্যেই মানুষের উচিত শ্যালিকাকে বউ করে বউকে শ্যালিকা করা। সে তো আর হওয়ার উপায় নেই, ভেতরে ভেতরে ফোঁস ফোঁস করে জীবন কাটাই।
একদিন, দুদিন ইংরেজি সিনেমায় নিয়ে গেলুম। ঘুমিয়ে ঘণ্টা পার করে দিলে। কী গো, ঘুমোচ্ছ কী, ছবি দেখ। অত বড় একজন অভিনেতা—'মারলন ব্রান্ডো।'
—মুখে সুপুরি ঠুসে কী যে ইংরেজি বলছে কিছুই বুঝতে পারছি না মাথামুণ্ডু।
—বোঝার চেষ্টা করো।
—তুমি করো। পরে আমাকে গল্পটা বলে দিও।
—লাও, বোঝ ঠ্যালা।
দ্বিতীয়বার ঘুমের আয়োজন করতে করতে বললে, মোগলাই খাওয়াবে তো?
—ওই এক শিখে রেখেছে, কলকাতায় এলেই মোগলাই। মোল্লার দৌড়।
—কেন চাইনিজ খাবে চলো।
—না বাবা, আরশোলার গন্ধ।
—ফ্রিস ফ্রাই।
—না বাবা, হাঙরের তেলের গন্ধ।
আমাদের পাশে এক ভদ্রলোক বসেছিলেন, তিনি বললেন, স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, ও সহজে ফয়সালা হবে না। এখন দয়া করে চুপ করুন, পরে বাইরে গিয়ে যা হয় করবেন।
ইস! লজ্জার একশেষ। তারপর থেকে কোনও দিন আর বউকে কোনও ব্যাপারে চাপাচাপি করিনি! যা হবার তা হবে। এখন ছেলেটা বেশ চড়কো হয়েছে, তাকেই মানুষ করার চেষ্টা করি।
অনেক ধরাধরির পর বেশ নামজাদা এক সাহেবি স্কুল থেকে একটা ভরতির ফর্ম মিলল। আমার চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য। ফর্ম জমা পড়বে, তারপর পরীক্ষা দিতে হবে। রেজাল্ট দেখে দশজনকে নেওয়া হবে।
এইটুকু ছেলের কী পরীক্ষা হবে। মুখে এখনও আধো আধো বুলি। কোমর থেকে প্যান্ট খুলে পড়ে যায়। কেউ কোনও উলটোপালটা কথা বললে আঁচড়ে-কামড়ে দেয়।
ওই আঁচড়ানো-কামড়ানোটাই ভয়ের। স্কুলের প্রিন্সিপ্যালকে যদি কামড়ে দেয়। সারা জীবনের মতো হয়ে গেল। নার্সারি রাইম আর পড়তে হচ্ছে না। দুলেদুলে পড়ে যাও, সকালে উঠিয়ে আমি মনে মনে বলি। পাড়ার বাংলা স্কুলে ইস্তিরি চটকানো জামা প্যান্ট পরা ছেলেদের সঙ্গে জীবন কাটিয়ে কেরানিগিরি করো। পিত্তি চটকানো ভাত, ঢ্যাঁড়স ভাতে কাঁচালংকা দিয়ে বাকি জীবন গিলে মরো।
ছেলেকে খুব তালিম দিতে থাকলুম মাসখানেক ধরে। পাখির ইংরেজি, বার্ড। সাহেবরা উচ্চারণ করে ব্যার্ড। টিকটিকির ইংরেজি গেকো। পাখিটি—দ্য বার্ড, স্ত্রীলোকটি, দ্য উওম্যান। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম কী? মানুষ কবে চাঁদে গিয়েছিল? কী তাঁদের নাম? সুপ্রভাত, গুড মর্নিং। আমি স্যান্ডউইচ খাই, আই ইট স্যান্ডউইচেস। স্যান্ড মানে বালি, উইচেস মানে ডাইনিরা। আগামীকাল, টুমরো। হাড়ের ভেতর থাকে মারো। টুম্যারো। গতকাল ইয়েসটারডে। বলো বাবা, বলো। মানিক বলো! না, মানিক বড় সেকেলে, বাংলা নাম। বলো জ্যাকি, বলো! আমি ভালো ছেলে, আই অ্যাম এ গোড না গুডই বলো, আই অ্যাম এ গুড বয়!
পরীক্ষার দিন সাতসকালে স্বামী-স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে গেলুম পরীক্ষা দেওয়াতে। কর্মকর্তারা বললেন, আপনারা রাস্তায় দাঁড়ান, অভিভাবকদের ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। ছেলেকে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। ছেলেও শালা তেমনি। নিজের ছেলেকে কেউ শালা বলে। রাগে বলে। সে ব্যাটা মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় চেঁচাতে লাগল, না আমি যাব না।
বলতে চেয়েছিলুম, ডোন্ট বি ফাসসি জ্যাকি। রাগে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ভূতো, মারব এক চড় রাসকেল।
সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, ফাদার কিচলু। তিনি বললেন, ও, দ্যাটস নট দি ওয়ে।
—কী করব ফাদার। রাগে মাথায় খুন চেপে যাচ্ছে।
—ও: নো নো, খুন চাপিলে চলিবে না! বি সফট, বি এ ফাদার, নট এ বুচার।
—কাম, মাই সান। মাই লিটল হোলি চাইলড।
ফাদার জানোয়ারটার কোমর দু-হাতে জড়িয়ে ধরে মিশনারি কায়দায় কাছে টেনে নিতে চাইলেন।
কোন মাল থেকে কী মাল বেরিয়েছে জানা ছিল না। ভূতো তার পুরোনো দাওয়াই ছাড়ল। ঘ্যাঁক করে ফাদারের ডান হাতে দাঁত বসিয়ে দিল।
—ও গড, হি ইজ এ লিটল সেটান, অ্যান আগলি ডাকলিং। আই নিড সাম অ্যান্টিসেপটিক, এ টেটভ্যাক।
—টেটভ্যাক লাগবে না ফাদার। ট্রিপল অ্যান্টিজেন দেওয়া আছে।
—অ্যান্টির্যাবিজ দিয়েছিলেন কি?
সে তো কুকুরকে দেয় ফাদার।
—হি ইজ মোর দ্যান এ ডগ।
আমি ওকে একটা কষে চড় মারতে পারি ফাদার! ভীষণ রাগ হচ্ছে।
নো নো ডোন্ট ডু দ্যাট। একটি চড় আপনি আপনার গালে মারুন।
কামড়াবার পর ছেলে একটু শান্ত হল। ফাদারের গাউনের ঝোলা বেল্ট ধরে আমাদের দিকে তাকাতে তাকাতে স্কুলে গিয়ে ঢুকল। আহা বেচারার যা ছিরি হয়েছে। তখন এত করে বারণ করলুম, ভদ্রমহিলা শুনলেন না, চোখে কাজল পরাবার কোনও প্রয়োজন ছিল! সায়েবদের ছেলেরা কাজল পরে? সারা মুখে কাজল চটকেছে। ভাগ্যিস, ভূতের মতো গায়ের রং, তা না হলে কী সুন্দরই না দেখাত!
স্কুলবাড়ির দিকে তাকিয়ে দুজনে গাছতলায় বসে রইলুম পাশাপাশি। শালির ছেলেটা কী স্মার্ট! এই বয়সেই ইংরেজি গালাগাল দিতে শিখেছে! আধো আধো ভাষায় কী সুন্দর লাগে শুনতে! ও ছেলে বিলেত যাবেই। ওই জন্যেই লোকে মেম বিয়ে করে। ছেলেটা অন্তত সাহেব হবে! আমার বউটাকে দ্যাখো! ঠিক যেন শাড়ি জড়ানো প্যাকিং কেস! প্যাকিং কেস থেকে ভূতই বেরবে।
সারা স্কুলবাড়িটা হঠাৎ কেঁদে উঠল। অসংখ্য শিশু কাঁদছে। হাজার রকম সুরে। ঠিক যেন শুয়োরের খোঁয়াড়ে আগুন লেগে গেছে! কী হল রে বাবা! সব অভিভাবকই চঞ্চল হয়ে উঠলেন। কান্নার পরীক্ষা হচ্ছে নাকি! পরীক্ষক হয় তো প্রশ্ন করছেন—হাউ টু ক্রাই! একটু পরে হয় তো হাসি শোনা যাবে। যাক বাবা, এই একটা আইটেম আমার ছেলে ফুল মার্কস পাবে। কেউ হারাতে পারবে না।
এক বাঙালি ভদ্রলোক আমার ছেলেকে চ্যাংদোলা করে স্কুলবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন, ব্যাটা হাত পা ছুঁড়ে চেল্লাচ্ছে দ্যাখো। কানের পোকা বেরিয়ে আসবে।
—নিন মশাই, আপনার ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যান। নিজে কেঁদে সব ছেলেকে কাঁদিয়ে এসেছে। নিয়ে যান, নিয়ে যান!
এসো বাবা এসো, কে মেরেছে বাবা।
মায়ের আদিখ্যেতা শুরু হল। আদর দিয়ে বাঁদর হয়েছে। দু চোখ বেয়ে কালো জল পড়ছে। ভূতের কান্না তো, কালোই হবে!
—ওটাকে নর্দমায় ফেলে দাও।
—আহা, বাছা আমার! ফুলে ফুলে কাঁদছে।
—রাসকেল আমার।
কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে চল্লুম—চল, তোর আর সায়েব হয়ে দরকার নেই। তুই বাঙালিই হবি চল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন