সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

কুরুক্ষেত্রের ওয়ার সেই কবে শেষ হয়ে গেছে। বারকয়েক অ্যাফরেস্টেসান, ডিফরেস্টেসান হতে হতে, পার্টিশন, মার্টিশন হয়ে কিছু ভারতে, কিছু পাকিস্তানে। মহাভারত ছেঁড়াছিঁড়ি হয়নি। অখণ্ড আমাদেরই ভাগে আছে। কুরুক্ষেত্র কম্পাউন্ডে হাউসিং কমপ্লেকস তৈরি হয়েছে। ভারতের বংশধররা সেখানে তেড়ে বংশবিস্তার করে, আলু-মটর, পনির-মটরের চেহরা করে দিয়েছে। ছপপর ফাঁড়কে সন্তান, সন্ততি। স্কুটার, মপেড, মটোর সাইকেল, অটো, টিভি, স্টিরিয়ো, চৌপর দিন গুলতানি চলছে, চলবে।
পলাশির থ্রিহান্ড্রেড ইয়ারস, কুরুক্ষেত্রের ফাইভ থাউজেন্ড ইয়ারস, এইরকম সব হচ্ছে আজকাল। সারাবছর সাইট অ্যান্ড সাউন্ড, না লাইট অ্যান্ড সাউন্ড, কী একটা হয়। প্রেতাত্মারা প্রেত ঘোড়ায় চড়ে ছায়া-বল্লম নিয়ে লড়াই করে। এইসব শুনে যুধিষ্ঠির ক্যাজুয়াল লিভ নিয়ে স্বর্গ থেকে চলে এলেন, ভায়া হিমালয় হয়ে। যুধিষ্ঠির একাই স্বর্গে যেতে পেরেছিলেন, বাকি সব হিমালয়ের ডিপ ফ্রিজে ছিলেন। যুধিষ্ঠির জানতেন জায়গাটা। ইচ্ছে হল—একা কেন যাই, সদলেই যাওয়া ভালো লাক্সারি বাস ভাড়া করে। বাসের পাশে লাল সালুতে লেখা থাকবে, 'যুধিষ্ঠির অ্যান্ড পার্টি।' মহাভারত টেলি সিরিয়াল খ্যাত। রিয়েল দ্রৌপদী। বস্ত্রহরণ পালা, পাবলিক ডিম্যান্ডে বারে বারে, ঘুরে ঘুরে, ঘূর্ণায়মান মঞ্চে দেখাবার ব্যবস্থা। রিয়েল ক্যাসিনোয় পাশা খেলা, শকুনির অট্টহাসি, দুর্যোধনের ব্রেকড্যানস, দ্রৌপদীর স্ট্রিপটিজ। অর্জুনের ইউনাক ড্যানস, উত্তরার টেস্টটিউব বেবি। সামনে পতাকা উড়বে পতপত করে। খড়মের সিম্বল। তার তলায় লেখা—মে দিবস দিল ডাক, লাল বাতি জ্বেলে স্লোগান হাঁক।
যুধিষ্ঠির একটু ঘাবড়ে গেলেন। স্বর্গ থেকে নামার ফার্স্ট পাদানি হল এভারেস্ট। সেখানে পা রাখার জায়গা নেই। নীচের থেকে একজন করে উঠে আসছে। একটা ফ্ল্যাগ জাপটে ধরে চিৎকার করে বলছে, আমার তিনবার হল, আমার সাতবার হল—রেকর্ড। গিনেস কোম্পানিকে খবর দাও। সাউথ কল থেকে, মেয়ে-মদ্দ যে পারছে সেই উঠে পড়ছে একবার করে, যেন কিছুই নয়। বিশাল লম্বা এক সায়েব একপাশে দাঁড়িয়ে কেবল বলছেন, দিস ইস অফুলি ব্যাড। দিস ইজ রিয়েলি ব্যাড।
যুধিষ্ঠির জিগ্যেস করলেন, হু আর ইউ!
—আই অ্যাম হিলারি। আমিই প্রথম এভারেস্ট জয় করি।
—নো স্যার, প্রথম ক্লাইম্বার আমি।
—হু আর ইউ?
—মাই নেম ইজ যুধিষ্ঠির। রেড মহাভারত? হার্ড অ্যাবাউট প্যাঞ্চ প্যান্ডব।
— তোমার রেকর্ড কোথায়!
—মহাভ্যারত। রেকর্ডেড বাই বেদব্যাস।
—ডেট প্লিজ! বিসি, এডি!
—এবিসিডি নয় সায়েব! এই রুটে আই ওয়েন্ট টু দ্যা হেভন।
—হেভন! মাই গড। তার মানে তুমি পড়ে মরেছিলে!
—সশরীরে স্বর্গে যাওয়া যায় সাহেব। সে তুমি বুঝবে না। সে হল সাধনার ব্যাপার।
—আই সি, আই সি। স্যাডনা। মানে ড্রাগস। মারিযুয়ানা, হ্যাস, ব্রাউন সুগার, এল. এস. ডি.। লাইসারজিক অ্যাসিড ডাই ইথাইল অ্যামাইড। দুভাবে নেওয়া যায়, চেজিং আর ইনজেকশন। ডোন্ট টেক ইট। একবার ধরলে আর ছাড়তে পারবে না। তখন ঘটি—বাটি—ছাতা—জুতো—ট্রাউজার—টি-শার্ট বেচে নেশার যোগাড় করতে হবে। শেষে খুন, জখম, রাহাজানি।
—সায়েব, কুরুকসেত্রে অনেক মার্ডার করেছি। সে তোমার গিয়ে পলিটিক্যাল মার্ডার। ওনলি ফর গদি। ইন্দ্রপ্রস্থে এখনও সেই ধারাই চলছে। সেটা নট ফর ড্রাগস, বাট ফর সিংহাসন। তবে হ্যাঁ, আমার অ্যাডিকশন হল জুয়া। ডাইস—গেম। ফর দ্যাট আমি আমার বউকে বেচেছিলুম। অ্যান্ড সি ওয়াজ রেপড বাই দুর্যোধন অ্যান্ড দু:শাসন পার্টি। গ্রেট মাফিয়া লর্ডস। বাট মাই ব্রাদার্স, ভীমা, অর্জুনা, নকুলা অ্যান্ড সহদেবা উইথ দি হেল্প অফ ভগবান শ্রীকৃষ্ণা ফিনিশড দেম আপ। কমপ্লিট কচুকাটা।
—আ, কৃষ্ণা। কৃষ্ণা কনসাসনেস। ড্যানসিং অ্যান্ড সিঙ্গিং হরে কৃষ্ণ, হরে রাম। আমি নিউইয়র্কে দেখেছি।
—আরে, তার জন্মভূমি তো হিমালয়ান রেঞ্জের তলায়। ধর্মসেত্রে, কুরুকসেত্রে সমবেতা যুযুৎসব:। ইয়র্কশায়ার, ফিয়র্কশায়ার তো সেদিনের কথা।
যুধিষ্ঠির গ্লেসিয়ারের ওপর দিয়ে স্লাইড করে কয়েক হাজার ফুট নেমে এলেন। দেবগিরি আবর্জনায় ভরপুর। চায়ের ভাঁড়, ঠোঙা, ন্যাপকিন, টার্পিলিন, ছেঁড়া বুট, অক্সিজেন সিলিন্ডার, পিকঅ্যাকস, রোপ, অ্যামেরিকান বেস্ট সেলারের ছেঁড়া মলাট, পতাকা, প্লাকার্ড ছড়াছড়ি। যেন কলকাতার ইডেন হসপিট্যাল রোড।
যুধিষ্ঠির ডিপ ফ্রিজ থেকে মহাপ্রস্থানের পথিকদের একে একে বের করবেন। তারপর একটু ডিফ্রিজ করে গরমজলে বয়েল করতেই সব চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তারপর একপাত্তর করে কলসির চা খাওয়াতে পারলেই সব ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করবে—এক, দো, তিন, চার, পাঁচ, ছে, সাত, আট, ন, দশ, এগহারো, বারা। লাউ দোলা দেব, ল্যাদোর, ল্যাদোর, লাউ হয়ে দোলে রে।
এমন সময় কণ্ঠস্বর—ধর্মরাজ! মনে পড়ে, বনপর্বে, জলের অনুসন্ধানে তোমার চার ভ্রাতা সরোবরের ধারে চিৎপাত হয়ে পড়েছিল। তখন তোমাকে আমি প্রশ্ন করেছিলুম, অন্তরীক্ষ কণ্ঠস্বর—আমি মৎস্যশৈবালভোজী বক, আমিই তোমার ভ্রাতাদের পরলোকে পাঠিয়েছি। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যদি জলপান করো, তবে তুমিও সেখানে যাবে। আমি সেই যক্ষ। মনে আছে কী কী প্রশ্ন করেছিলুম আমি?
—মনে আছে। দুর্ভাগ্য আমার, তুমি এখনও আমার পিছু ছাড়নি।
—না, ছাড়ি কী করে! আমরা সবাই তো মহাভারতের চরিত্র। প্রশ্নগুলো বলো তো। এত বছর পরেও মনে আছে কি না দেখি।
—সেই বোকা বোকা প্রশ্নগুলো আবার রিপিট করাবে। তাহলে শোনো। প্রশ্ন এক, কে সূর্যকে ঊর্ধ্বে রেখেছে? কে সূর্যের চতুর্দিকে ভ্রমণ করে? কে তাঁকে অস্তে পাঠায়? কোথায় তিনি প্রতিষ্ঠিত আছেন? প্রশ্ন দুই, ব্রাহ্মণের দেবত্ব কী কারণে হয়? কোন ধর্মের জন্যে তাঁরা সাধু? তাঁদের মানুষভাব কেন হয়? অসাধুভাব কেন হয়? তিন নম্বর, ক্ষত্রিয়ের দেবত্ব কী? সাধুধর্ম কী? মানুষভাব কী? অসাধুভাব কী? তোমার চার নম্বর প্রশ্নটা অবশ্য ভালোই ছিল, পৃথিবী অপেক্ষা গুরুতর কে? আকাশ অপেক্ষা উচ্চতর কে? বায়ু অপেক্ষা শীঘ্রতর কে? তৃণ অপেক্ষা বহুতর কে? পঞ্চম প্রশ্নটার মধ্যেও বেশ মজা ছিল। সুপ্ত হয়েও কে চক্ষু মুদ্রিত করে না? জন্মগ্রহণ করেও কে স্পন্দিত হয় না? কার হৃদয় নেই? বেগ দ্বারা কে বৃদ্ধি পায়? ছ'নম্বর প্রশ্নটা ছিল মোটামুটি। প্রবাসী, গৃহবাসী, আতুর ও মুমূর্ষু—এদের মিত্র কারা? সপ্তম প্রশ্নটা ছিল মনস্তাত্বিক। কী ত্যাগ করলে লোকপ্রিয় হওয়া যায়? কী ত্যাগ করলে শোক হয় না? কী ত্যাগ করলে মানুষ ধনী হয়? কী ত্যাগ করলে সুখী হয়? তোমার শেষ প্রশ্ন ছিল, বার্তা কী? আশ্চর্য কী? পন্থা কী? সুখী কে? এর সঙ্গে তুমি একটা লেজ জুড়েছিলে, পুরুষ কে? সর্বধনেশ্বর কে? সেবার তোমার কুইজ কনটেস্টে আমি একশোতে একশো পেয়েছিলুম। শোন, দূরদর্শনে এখন কুইজ কনটেস্ট হয়। কুইজমাস্টার তোমার চেয়ে অনেক শক্ত শক্ত প্রশ্ন করেন। স্কুলের ছেলেমেয়েরা পটাপট উত্তর দেয়। তোমাতে আমাতে যেটা চালু করেছিলুম, রেডিয়ো আর টিভি সেটা মেরে দিয়েছে। তোমার এই নকশাটা এইবার ছাড়ো। আমাদের বয়েসের গাছপাথর নেই।
—দ্যাখো ধর্মরাজ! নিয়ম ইজ নিয়ম। প্রথা ইজ প্রথা। দুজনে দেখা হলেই প্রশ্ন, কেমন আছেন? দাঁতের যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছে, বলবে ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন? চটজলদি উত্তর, ভালো আছি ভাই। দুজনে দু'দিকে ছিটকে চলে গেল। যেমন কোনও সভায় একজন ভারী গলায় বললে, আমি এই সভায় সভাপতি হিসেবে অমুকচন্দ্র তমুকের নাম প্রস্তাব করছি। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘাড়ের কাছ থেকে একজনা গলা বাড়িয়ে বললে, এই প্রস্তাব সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি। এইসব আদিখ্যেতা চলছে, চলবে।
—তোমার সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তুমি একটু বঙ্কাটাইপের আছো। যা প্রশ্ন করার, করে ফ্যালো।
—ধর্মরাজ, কলকাতা বলে একটা জায়গা আছে, নাম শুনেছ?
—অবশ্যই। আমরা তো সেখানেই আছি। আমাদের বাড়ি আছে। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড।
—তা হলে বলো তো ধর্মরাজ, সেই শহরে দুর্লভ কী?
—এটা একটা পশ্ন হল? ভদ্দরলোক ট্যাক্সিড্রাইভার।
—ইয়া আল্লা বিসমিল্লা। ঠিক বলেছ। আমি একবার গিয়েছিলুম। হাতে একটা বোঁচকা। যেই বলি ভবানীপুর যাব, ট্যাক্সি বলে বরানগর। কারও মিটার খারাপ, কেউ গ্যারেজ করবে। কেউ আবার মহারসিক, ছুটিয়ে মারে। দশ হাত তফাতে থামল, যেই ছুটে গেলুম, এগিয়ে গেল হুস করে। আবার থামল। আবার ছুটলুম। হাতলটা ধরতে যাচ্ছি, আবার হুস। থামে এগোয়, এগোয় থামে। বুড়োকে নাস্তানাবুদ করে একসময় সাঁ করে বেরিয়ে গেল। শেষে একজন রাজি হল তো বললে একস্ট্রা দশ টাকা দিতে হবে। আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, কলকাতায় সুলভ কী?
—মিছিল।
—সেন্ট পারসেন্ট কারেকট। মিছিলের পর মিছিল, তাহার উপর মিছিল। সবার উপরে মিছিল সত্য, তাহার উপরে নাই।
—পশ্চিমবাংলা নামক রাজ্যটি কীসের জোরে চলছে ধর্মরাজ?
—এ প্রশ্নের উত্তর তো বালকেও জানে। চলছে বক্তৃতার জোরে।
—এটাও লাগিয়ে দিয়েছ, ধর্মরাজ। খাড়া একটা ডান্ডা, মাথার কাছে একটা হান্ডা, হোসপাইপের তোড়ের মতো বক্তৃতা। লণ্ডভণ্ড শব্দ সমষ্টি। ছেলে বকছে, বুড়ো বকছে, মেয়ে বকছে, মদ্দ বকছে। আচ্ছা, বলো তো ধর্মরাজ, সে দেশের মানুষের আত্মা কী?
—রাজনীতি।
—শক্তি কী?
—স্লোগান।
—ধর্ম কী?
—দুটো ব। বুজরুকি আর বুকনি।
—ভারতের মানুষ স্বদেশ বলতে কী বোঝে?
—অতি সহজ! টয়লেট। হেগে মুতে একসা করার জায়গা হল স্বদেশ।
—ধর্মরাজ! তোমার অবজারভেশন আছে। গোটা দেশটা মনুষ্যবারিতে জবজব করছে। দেখি, প্যান্টপরা বাবু পাতাল রেলের গায়ে হিসু করছে। বললুম—এ কী মশাই! উত্তরে বললে, বিশুদ্ধ দেবভাষায়—ন বেগং ধারয়েৎ ধীমান। বুদ্ধিমান কখনও বেগধারণ করে না। পেলেই করে ফেলে। আচ্ছা, বলো তো ধর্মরাজ, সে দেশের মানুষের কামনা কী?
—যক্ষ! সে দেশের মানুষ খেতে পেলে শুতে চায়। আর, একবার শুয়ে পড়লে আর সে উঠে না। শুয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়।
—সে দেশের মানুষের ভাবনা কী?
—ও ব্যাটার সর্বনাশ হোক। এই তো হালফিল, সে-দেশের এক মানুষের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান পুরস্কার দিতে চাইলেন, বলো বৎস! কী চাও! একটাই শর্ত, তুমি যা চাইবে, তোমার প্রতিবেশী তার ডবল পাবে। সেই লোকটি কী চাইল জানো, যক্ষ! বললে, প্রভু! আমার একটা চোখ কানা করে দিন। তাহলে আমার প্রতিবেশীর দুটো চোখ কানা হয়ে যাবে। ভগবান বললেন, বুঝেছি, তোমার দেশ পশ্চিমবাংলায়!
—আচ্ছা, বলো তো ধর্মরাজ, পৃথিবীর একমাত্র খাঁটি জিনিস কী?
—শত্রুতা। শত্রুর শত্রুতায় কোনও ভেজাল নেই। বাঁশ দেবে তো দেবেই। পুরো ব্যাপারটাই নিখাদ।
—একমাত্র ভেজাল কোনটা?
—ভালোবাসা। পৃথিবীর খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের মতোই পুরোটা ভেজাল।
—পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী টনিক কী?
—সিলভার টনিক। টাকার চেয়ে শক্তিশালী কিছুই নেই। হর্স পাওয়ার।
—পঙ্গুকেও গিরিলঙ্ঘন করায় কোন জিনিস?
—মদ। এই প্রশ্ন সম্রাট আকবর বীরবলকে করেছিলেন। বীরবল বলেছিলেন, মদ। রাজা বিশ্বাস করেননি। এদের এত শক্তি! বীরবল তিনটি লোককে ধরে নিয়ে এলেন। একজন সম্পূর্ণ অন্ধ, আর একজন নুলো, তৃতীয়জন ভিখিরি। বীরবল রাজাকে বললেন, আপনি আড়াল থেকে দেখুন। তিনজনকে খাতির করে বসানো হল। বীরবলের নির্দেশে মদ পরিবেশন করে যাচ্ছে খানসামা। তিন পাত্তর খাওয়ার পর তিনজনেরই কড় ধরেছে। চতুর্থ পাত্র সামনে রাখা মাত্রই কানা নেশাজড়ানো গলায় খানসামাকে বলছে, অ্যায় শ্লা দেখতে পাচ্ছিস না, মদে মাছি পড়েছে। তখন নুলো বলছে মারব এক রদ্দা তিন দিন আর উঠতে পারবি না। ভিখিরি বলছে, লাগা, লাগা, যত টাকা লাগে দিচ্ছি। বীরবল সম্রাটকে বলছেন, দেখছেন জাঁহাপনা, মদের পাওয়ার। কানার চোখ ফুটেছে, নুলোর হাত গজিয়েছে, ভিখিরি বলছে, যত টাকা লাগে দোবো, মার শালাকে।
—বেশ বললে, ধর্মরাজ। আচ্ছা বলো তো, কোন প্রাণীর চোখের পরদা নেই?
—নেতা নামক প্রাণীদের।
—কোন ফল ফলে না।
—কোষ্ঠীর ফল।
—জেগে ঘুমোয় কে?
—মানুষের বিবেক।
—ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোয় কে?
—বউ।
—যন্ত্রণা কী?
—ছেলেমেয়ে।
—সেরা মূর্খ কে?
—স্বামী।
—কার হৃদয় নেই?
—ভগবানের।
—ধর্মরাজ! তুমি আবার পাশ করেছ। তোমার কাজ তুমি করতে পারো।
যুধিষ্ঠির তাঁর পরিচিত জায়গায় এলেন। এই সেই স্থান। পরিবার পরিজন টনটন বরফের তলায় চাপা পড়ে আছে। এ তো অসম্ভব ব্যাপার। খোঁড়াখুঁড়ি করে বের করবে কে? অর্জুন নেই যে বাণ মেরে জল বের করার মতো গাণ্ডীবের টঙ্কার মেরে বরফ ঝরিয়ে দেবে। হঠাৎ কোথা থেকে একজন সামনে এসে হাজির। এক গাল হেসে বললে, 'কী সমস্যা, শেঠজি?'
—আমি শেঠজি নই, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। মহাভারত পড়েছ?
—ওসব আমার আসে না, গুরু। টেলিভিসানে সিরিয়াল দেখেছি। আপনার পার্ট মোটেই ভালো হয়নি। ফাটিয়ে দিয়েছে শকুনি। ভানজে, বলে যখন এসে দাঁড়াত!
—আরে মূর্খ! আমি আসল যুধিষ্ঠির।
—আসলি মাল!
—তুমি কে?
—আমি কলকাতার টেলিফোন ডিপার্টমেন্টের লোক স্বর্গে যাচ্ছি। জীবনে অনেক পূণ্য করেছি। সারা কলকাতা খুঁড়েছি। লাইন কেটেছি, লাইন জুড়েছি। এর কানেকশন ওর ঘাড়ে, ওর কানেকশন এর ঘাড়ে চাপিয়েছি। সেই পুণ্যে আমি স্বর্গে যাচ্ছি।
—তুমি খুঁড়তে পারো?
—পারি মানে? সারা কলকাতা খুঁড়ে শেষ করে এসেছি। এইবার স্বর্গ খুঁড়তে যাচ্ছি।
—তা ভাই, যাওয়ার আগে এই বরফ খুঁড়ে আমার ভাইদের বের করতে পারবে?
—বিশ, বাইশ ফুট তলা থেকে কেবিল বের করেছি আর ক'টা ডেড বডি বের করতে পারব না?
—ডেড বডি নয় রে বাবা, ফ্রোজন বডি। গীতা পড়োনি! ভগবান বলছেন, আমাদের জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। আবার বলছেন, মৃত্যু মানে জামা পালটানোর মতো দেহ পালটানো। রকম-রকম কথা বলেছেন। ব্যাপারটা আমার মাথায় ঠিক আসে না। অবশ্য বলেছিলেন, সেই বিশাল যুদ্ধের সময়, তখন কারোরই মাথার ঠিক ছিল না। এদিকে বাণ ছুটছে, ওদিকে ঘোড়ার চিঁহি!
—আমি, স্যার, গীতার মলাট দেখেছি। পকেটসাইজ গীতার মলাট।
—পরে পড়ে নিও, তাহলে আর সংসারে ঢুকতে হবে না। বৈরাগ্য এসে যাবে।
—আপনি তো স্যার সাট্টা খেলতেন, আমার অনেক টাকা ওইতে গচ্চা গেছে।
—সাট্টা খেলতুম কী রে! সে আবার কী খেলা!
—নম্বরের খেলা। বোম্বাইতে খেলে। আমাদের পাড়ার বাজারে তার বুকি ছিল। সাট্টা কিং। গোলপাতার ঝুপড়ি থেকে তিনতলা পাকা বাড়ি। মোজেক করা। আগে চুল্লু খেত, আসার সময় দেখে এসেছি বিলিতি খাচ্ছে। আমি তার ফোনের লাইন ঠিক রাখতুম বলে আমাকেও প্রসাদ দিত। তার এজেন্টরা স্লিপ লিখত।
—আরে গবেট! আমি রাজার ছেলে। আমাকে পাশা খেলতেই হত। সেইটাই ছিল নিয়ম। ওটা নিয়ে এত হইচই করার কী আছে।
—হইচই? তিন মাস আগে থেকে জনে জনে প্রশ্ন, দাদা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ কি হয়ে গেছে? হেবি সেক্স ছিল। দুর্যোধন ঊরুতে চাপড় মেরে বলছে, আজা মেরি জান।
—সেকস মানে?
—রেপ সিন স্যার! হিন্দি ছবি তো আমরা ওই জন্যেই দেখি, সেকস, রেপ, ঢিসুম ঢিসুম।
—মহাভারতে তোমরা ধর্ম খুঁজে পেলে না?
—না স্যার, কী করে পাব? সবচেয়ে বড় অধার্মিক আপনি, অথচ আপনাকেই বলছে ধর্মরাজ! ধর্মের কী ফের মাইরি।
—আমি অধার্মিক? তুমি আমাকে নতুন কথা শোনালে। তোমার যুক্তিটা শুনি।
—এক নম্বর হল, আপনি জুয়াড়ি। জানেন হেরে যাবেন, তাও আপনি পাগলের মতো শকুনির সঙ্গে জুয়া খেলতে গেলেন। শকুনি একবার করে দান ফেলছে, আর বলছে, জিতেছি। ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব মায় আপনাকে পর্যন্ত জিতে নিলে, তারপর আপনি পাঞ্চালীকে পণ ধরলেন। আপনি পাগল, ম্যাড। ভীম তখন আপনাকে বলেছিলেন, দাদা, জুয়াড়িরা তাদের বেশ্যাকেও কখনও পণ রাখে না, তাদের দয়া আছে আর আপনি নিজের বউকে পণ রাখলেন। এই সহদেব, আগুন লে আও, এই ধর্মরাজের হাত দুটো আমি পুড়িয়ে দেব। অর্জুন ভীমকে চেপে না ধরলে সেদিন আপনার খেল খতম হয়ে যেত। আপনার এমনই নেশা, যেই আপনাকে দ্বিতীয়বার পাশা খেলায় ডাকল, আপনি অমনি ল্যাং ল্যাং করে চলে এলেন। সাধে দু:শাসন আপনার চারপাশে নেচে নেচে বলেছিল, গরু, গরু! কোনও ধার্মিক লোক জুয়া খেলে!
ওহে! তোমার মোটা মাথায় ওটা ঢুকবে না। মানুষ পাপ না করলে ধ্বংস হয় না। এই যে দুর্যোধনরা রজ:স্বলা, একবস্ত্রা পাঞ্চালীকে সভাস্থলে এনে বিবস্ত্রা করতে চাইল, ওইতেই ওদের পাপের ষোলোকলা পূর্ণ হল। তবেই না কুরুক্ষেত্র হল! এসব আমাদের কায়দা।
—আপনি তো স্যার মিথ্যাবাদী। সেই থেকে তো আমরা ঠাট্টা করে মিথ্যাবাদীকে বলি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির।
—ও, তুমি ওটাই ধরে আছ, সেই যে আমি বলেছিলুম, অশ্বত্থামা হত: ইতি কুঞ্জর:। ইতি কুঞ্জর:টা খুব আস্তে বলেছিলুম। সে তো ভগবান আমাকে বলতে বাধ্য করেছিলেন। ভগবান কৃষ্ণ আমাকে বললেন, দ্রোণ যদি আর আধবেলা যুদ্ধ করেন, তাহলে আমাদের সব সৈন্য ফৌত হয়ে যাবে। আমাদের রক্ষার জন্যে আপনি সত্য না বলে মিথ্যাই বলুন। জীবনরক্ষার জন্যে মিথ্যে বললে পাপ হয় না। প্রেমে আর রণে মিথ্যা চলে। ছলে, বলে, কৌশলে, যে ভাবেই হোক, জিততে হবে। সেই পাপের শাস্তি আমি সঙ্গে সঙ্গে পেলুম। আগে আমার রথ ভূমি থেকে চার আঙুল ওপরে থাকত। রথের চাকা, ঘোড়ার পা মাটি স্পর্শ করত না। ওই কাণ্ড করার পর আমার রথ মাটিতে নেমে এল।
—দেবদূত আপনাকে নরকদর্শন করিয়েছিল।
—করিয়েছিল। সে দৃশ্য আমি জীবনে ভুলব না। বীভৎস। শুনবে! সাধুভাষায় সেই অসাধু বর্ণনা। 'সেই পথ তমসাবৃত, পাপীদের গন্ধযুক্ত, মাংসশোণিতের কর্দম অস্থি কেশ ও মৃতদেহে আচ্ছন্ন এবং...'
—শুনতে চাই না। গাঁজা।
—গাঁজা?
—হ্যাঁ গাঁজা। তিনটে ছিলিম ফাটাবার পর মানুষ এই সব দেখে। মশাই, সশরীরে কেউ স্বর্গেও যেতে পারে না, নরকেও যেতে পারে না। গেলে যেতে পারে মানুষের আত্মা। আত্মা হল হাওয়া। ফুউসস। বেলুন দেখেছেন, ধর্মরাজ! ভেতরে হাওয়া। ফুলে আছে। মেলায় গেলে দেখতে পাবেন। একটা বোর্ডে একগাদা ফুলোফুলো বেলুন। বেলুনওয়ালা আপনার হাতে বন্দুক দেবে। আপনি ছররা দিয়ে তাক করে মারবেন। যেটায় লাগে। ফ্যাট। চুপসে ঝুলে গেল। মৃত্যু হল বন্দুকবাজ। আমরা মেলার বেলুন। জীবনের কাঁটা পেরেকে ঝুলছি। এ—পাশ, ও—পাশ দিয়ে গুলি ছুটছে। নিশানা ঠিক না হলে বেঁচে যাচ্ছি। লাগলেই ফট। হাওয়া ফুস। বাইরের সাজ ঝুলঝুলি, বুলবুলি।
—আরে, আমি যে দেখলুম!
—সে আপনি উত্তর কলকাতায় মাছুয়া দেখেছেন।
—মাছুয়া মানে?
—মানে মেছোবাজার, রাজাবাজারের খালও হতে পারে। আপনি তো একটু বোকা টাইপের চিরকালই। যে ভাবে রাজত্বটা হারিয়েছিলেন, যেন ছেলের হাতের মোয়া। শকুনি এল, কপাক কপাক করে মুখে পুরল। আপনাদের টিমে অর্জুন ছাড়া কেউ ভালো লড়াই করতে পারে না। আপনি তো একটা ঢেঁড়স। না পারেন ভালো খেলতে, না পারেন ভালো লড়তে। যত যোদ্ধা সব কৌরবদের টিমে। আপনারা তো জোচ্চুরি করে জিতেছেন। আমার তো দুর্যোধনকে টেরিফিক ভালো লেগে গেছে। কী অভিনয়! একেবারে হিন্দি ছবির ভিলেন। আর ভালো লেগেছিল অর্জুন যখন হিজরে সেজেছিল।
—সেজেছিল, সেজেছিল করছ কেন?
—আমরা তো আর রিয়েল মাল দেখিনি। আমরা সিরিয়াল দেখেছি।
—শোনো কর্তা, তোমার সঙ্গে আর বকবক করতে পারছি না। তুমি আমার ভাইদের বের করে দেবে কি দেবে না, বলো।
—কিছু মাল ছাড়ুন। কলকাতার শেঠরা আমাদের খুব খিলাতো। তাদের লাইন আমরা ঠিক রাখতুম। ফেলো কড়ি মাখো তেল, আমি কী তোমার পর।
—আমার কাছে টাকা নেই, ডলার আছে।
—আইব্বাস, ডলারের এখন অনেক দাম। ছাড়ুন, ছাড়ুন।
—তুমি যাচ্ছ স্বর্গে, সেখানে ডলার কী হবে।
—কত কাজে লাগবে। বিলিতি খাব, রম্ভার বেলিড্যানস দেখব, মেনকার ক্যাবারে।
—ওখানে সব ফ্রি।
—ভগবানের গেটে দারোয়ান আছে স্যার?
—আছে।
—হয়ে গেল। ও ব্যাটারা ঘুস ছাড়া ঢুকতেই দেবে না।
—আমার মনে হয় না, তুমি স্বর্গে ঢুকতে পারবে। সেখানে যেতে হলে পুণ্য চাই। ধার্মিক হতে হবে। ধর্ম ছাড়া স্বর্গে যাওয়া যায় না। ওখানে ঘুস চলে না। এই হিমালয় পার হয়ে বালুকার্ণব ও মেরু পর্বত দর্শন করে, যোগযুক্ত হয়ে তোমাকে যেতে হবে। ইয়ারকি নয়, বাছা। আমরা সেইভাবেই যাচ্ছিলুম। যোগযুক্ত কাকে বলে জান? দম বন্ধ করে, শরীর হালকা করে যেতে হয়। মনে কোনও কুচিন্তা আনা চলবে না। হঠাৎ দ্রৌপদী যোগভ্রষ্ট হয়ে ধপাস করে পড়ে গেল। মরল কী বাঁচল আমার দেখার দরকার নেই। আমি চলতে লাগলুম। ভীম একবার জিগ্যেস করলে, 'দাদা! বউ তো কোনও অধর্ম আচরণ করেনি, তাহলে থ্যাস করে পড়ে গেল কেন?' আমি মনে মনে হাসলুম, ভীমচন্দ্র! দ্রৌপদী কী জিনিস, তোমার কোনও ধারণা নেই। তুমি এক গোদা, সারাজীবন গদা ঘুরিয়ে গেলে, আর রাক্ষসের মতো ভালোমন্দ খেয়ে গেলে। তোমাকে দ্রৌপদী একটা কারণেই নাচাত, অপমানের প্রতিশোধ। দু:শাসনের রক্তপান, দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ। আমাকে মনে করত ভাসুর। নকুল, সহদেব, সেজঠাকুরপো, ছোটঠাকুরপো। মুখে বললুম, 'অধর্ম তো ছিলই, ধনঞ্জয়ের ওপর দ্রৌপদীর বিশেষ পক্ষাপাত ছিল। সেই কারণেই লটকে পড়ল। দ্রৌপদী আমাকে ঘৃণা করত। যোদ্ধা বলে মানতেই চাইত না। ধর্মের কথায় মন ছিল না। আর ভীমকে বলত, মোটা। অর্জুনই ছিল ওর একমাত্র আকর্ষণ। এইবার ধপাস করে সহদেব পড়ে গেল। আমি তাকাচ্ছি না। এগিয়ে যাচ্ছি। মহাপ্রস্থানের পথে দু:খও নেই, শোকও নেই। কে কার! ভীম বলছে, এই মাদ্রীপুত্র নিরহঙ্কার ছিল, সবসময় আমাদের সেবা করত, সে কেন কাত হল?' ভীমসেন, 'সহদেব নিরহঙ্কার ছিল না, সে ভাবত আমার চেয়ে বিজ্ঞ ভূভারতে আর দ্বিতীয় নেই।' আবার যাচ্ছি। টুপ করে নকুল পড়ে গেল। আবার ভীমের প্রশ্ন, 'দাদা! নকুল, এমন অতুলনীয় রূপবান, ধর্ম থেকে কখনও সরে আসেনি, আমরা যা বলেছি তাই করেছে। তবে!' বিরক্ত হয়ে বললুম, 'ভীমভাই! চুপচাপ আমাকে অনুসরণ করো। এখানকার বাতাসে অক্সিজেন কম। যত বকবক করবে তত হাঁপ ধরবে। অর্জুনের মতো তুমি ছিপছিপে নও, নিজেই একটা পর্বত। জেনে রাখো, নকুলের ভেতরে ভেতরে একটা চাপা অহঙ্কার ছিল, আমার মতো রূপবান পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় নেই।' অর্জুন মনমরা হয়ে বেশ হাঁটছিল টুকটুক করে, হঠাৎ সেও শুয়ে পড়ল। ভীম বললে, 'দাদা! ব্যাপারটা কী হল! অর্জুন তো ইয়ারকি করেও কখনও মিথ্যে কথা বলেনি, তাহলে তার এ-দশা হল কেন?' আমি হাসলুম, সত্যবাদী হলেই হয়ে গেল! চরিত্রে অন্য অনেক ছেঁদা থাকে, ভীমসেন। কেন অর্জুন পড়ে গেল ভীমকে বুঝিয়ে দিলুম, 'অর্জুনের একটা হামবড়া ভাব ছিল। একদিনেই কৌরবপক্ষের সব মেরে ফেলব, অহঙ্কার করেছিল, পারেনি। তা ছাড়া অন্য ধনুর্ধরদের ভয়ঙ্কর অবজ্ঞা করত। এমন করাটা অন্যায়। এই কারণেই অর্জুনের পতন হল। এইবার যে এতক্ষণ প্রশ্ন করছিল, সেই ভীম চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল। পড়ে গিয়ে চিৎকার করছে, 'মহারাজ, মহারাজ, দেখুন আমিও পড়ে গেছি। আমি আপনার প্রিয়, তবু আমার পতন হল কেন?' আমি তাকালুম, 'শেষ কথাটা শুনে যাও, ভ্রাতা ভীম, তুমি খুব লোভী ছিলে, খাবার দেখলে তোমার আর জ্ঞান থাকত না। তোমার আর একটা মহৎ দোষ ছিল, অন্যের বল না জেনেই নিজের বলের গর্ব করতে।' ভীম চোখ বুজল। আমি সোজা স্বর্গের পথ ধরলুম। দেখলুম, একটা কুকুর পেছন পেছন আসছে। এইবার বুঝলে ব্যাপারটা! স্বর্গে যাওয়া অত সহজ নয়। চরিত্রে সামান্য খুঁত থাকলেই পড়ে যাবে।
—ধর্মরাজ! স্বর্গে এখন আর ভগবান নেই। সেখানে বিপ্লব হয়ে গেছে।
বিপ্লব মানে সরকার পড়ে গেছে। লেনিন আর স্ট্যালিন দুজনকেই ভগবান খাতির করে স্বর্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই হল খাল কেটে কুমির আনা। তেনারা বিপ্লব করে ভগবানকে স্বর্গছাড়া করেছেন। স্বর্গ এখন কম্যুনিস্টদের দখলে। ভগবান বসে আছেন আমেরিকানদের উপগ্রহে। সেখান থেকে বুশ সায়েবকে টেলিফোন করছেন, আমার রাজ্য ফিরিয়ে দাও। বুশ সায়েব স্বর্গে আর যাবেন কী করে! মর্ত্যেই অ্যাকশন করলেন, রাশিয়ায় কম্যুনিস্টদের বাসা ভেঙে দিলেন। লেনিন আর স্ট্যালিনের স্ট্যাচু উপড়ে ফেলে দিলেন। স্বর্গে এখন অধার্মিকরাই যায়। ধার্মিকরা যায় নরকে।
—তোমার বকুনি থামিয়ে আমার ভাইদের বের করবে কি না?
—মহারাজ, আমি পশ্চিমবাংলার মানুষ। আমাদের নীতি হল, কথা বেশি, কাজ কম। আমরা কাজের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করি স্লোগানে। গান আর স্লোগান। গান আবার দুরকম, একটা গলার গান, সেটা হিন্দি, আর একটা নলের গান মানে বন্দুক। আমরা মানুষ মেরেই, তার স্মরণে মাইক বাজাই। আমাদের বিয়েতে মাইক, জন্মদিনে মাইক, মৃত্যুদিনে মাইক। এই টনটন বরফ খুঁড়ে আপনার ভাইদের বের করা দু:সাধ্য কাজ। জাপানিদের ডাকুন, তারা পারবে। আপনি সশরীরে গিয়েছিলেন, সশরীরে এসেছেন। আপনার সেই কুকুরটাকে নিয়ে একা একাই যান না। দল বাড়িয়ে লাভ কী! আর তা না হলে যোগবলে সব ক'টাকে তুলে নিন। সে-ক্ষমতা তো আপনার আছে। আমি চলি, স্যার। শরীরে টান ধরেছে। স্বর্গের টান।
যুধিষ্ঠির দেখলেন, ছোকরা চলে যাচ্ছে। যাচ্ছে, যাক। মানুষের ওপর নির্ভর করে লাভ নেই। তিনি তো এখন দেবতা। দেবতারা একটা কাজই পারেন, সেটা হল মানুষকে বর দেওয়া—তথাস্তু। কায়িক পরিশ্রম করার ক্ষমতা দেবতাদের নেই। মাথা ঘিরে একটু জ্যোতি বেরোয়, সে জ্যোতির ভোল্টেজ খুব কম। মাধ্যমিক পরীক্ষা, লোডশেডিং, একজন দেবতাকে টেবিলের সামনে খাড়া করলে দাঁড় করালেও টেবিলল্যাম্পের কাজও করবে না। ঝাপসা একটা আলো। বইয়ের অক্ষর স্পষ্ট হবে না। দেবতাদের মাথায় চিন্তা ঢুকেছে—কি খেলে, জ্যোতির ভোল্টেজ বাড়ে। টর্চলাইটে দুটো ব্যাটারি দিলে কত আলো ছাড়ে। দেবতারা কী গিলবে! ক্ষমতা গিলে মন্ত্রীদের চেকনাই বাড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হলে মুখে জ্যোতি খেলে। প্রধানমন্ত্রী হলে যৌবন ফিরে আসে।
বরফের টিলার ওপর সুন্দর চেহারার ভদ্রলোক হাতে বাইনোকুলার নিয়ে বসে আছেন। যুধিষ্ঠির এতক্ষণ লক্ষ করেননি। মুখে একটা সৌম্যভাব। যুধিষ্ঠির এগিয়ে গেলেন,—ভদ্রে!
ভদ্রলোক চমকে উঠলেন।
—আপনি কে?
—ওই যে অনেক নীচে একটা দেশ দেখছেন, ওই দেশের নাম ভারতবর্ষ। আমি ওই দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলুম। আমার দাদু, আমার মা, সবাই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
—সব ছেড়েছুড়ে হিমালয়ের এই শীতে এলেন কেন?
—আমি কি ইচ্ছে করে এসেছি? আমাকে আসিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনী সভায় বস্তুৃতা দিতে গেলুম। একটা মেয়ে ভালোবেসে গলায় মালা পরিয়ে প্রণাম করার জন্যে নিচু হল। ভীষণ একটা শব্দ, বিশাল এক ধাক্কা। আমি টুকরো টুকরো। সেই থেকে বসে আছি এইখানে, স্বর্গে যাওয়ার ভিসা পাইনি। মহাশয়, আপনি কে?
—আমি আপনার পরিচিত খুব একটা পুরোনো চরিত্র। আমার নাম যুধিষ্ঠির, মহাভারতখ্যাত। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ধৃতরাষ্ট্রের কায়দা ভারত এখনও ভোলেনি।
—আপনি যুধিষ্ঠির! কী সৌভাগ্য আমার! আপনিও তো রাজা ছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রই তো আপনাকে হৃতরাষ্ট্র করেছিল!
—আপনার মহাভারত কি ভালোভাবে পড়া আছে?
—না, আমি তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করেছি। আমার বন্ধুবান্ধবরাও ছিল বিলিতি স্বভাবের, ফ্যামিলিতেও বিলিতি বাতাস। ভারতকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনে এসেছি, মহাভারতটা সেভাবে চেনা হয়নি। আই অ্যাম সরি!
—কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ। ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুর থেকে চলে যাচ্ছেন। আমরা দেখা করতে গেছি। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ভীম, তোমার মতো বীর আর দ্বিতীয় নেই। বুকে আয়, বাবা। কৃষ্ণ তো ভগবান। মানুষের মন দেখতে পান। ভগবান জানতেন, ধৃতরাষ্ট্র কী করবেন! ভগবান ভীমের বদলে এগিয়ে দিলেন লোহার ভীম। লোহার ভীম এল কোথা থেকে! দুর্যোধন একটা লোহার ভীম তৈরি করিয়ে টানা তের বছর গদা দিয়ে পিটিয়েছিল। অন্ধরাজ আসল ভীম ভেবে লোহার ভীমকে দু'হাতে বুকে চেপে ধরলেন। ভীষণ শক্তি ছিল তাঁর। এত জোরে চেপে ধরলেন, লোহার ভীম চুরমার! ধৃতরাষ্ট্রের মুখ দিয়ে ভলকে ভলকে রক্ত উঠল, তিনি পড়ে গেলেন। আদর মেরে মেরে ফেলা। আপনাকে যেভাবে মারল ধৃতরাষ্ট্র, আমার ভাইকেও সেইভাবে মারতে চেয়েছিলেন। ভগবান সহায়, তাই বেঁচে গেল। আপনার তো সে উপায় ছিল না!
—ভারতের অবস্থা খুব খারাপ। একেবারে থার্ডক্লাস দেশ।
—কোন কালে ভালো ছিল, মশাই। আমার সময়ে তো রাক্ষসের উপদ্রব ছিল। আর রাজায় রাজায় যুদ্ধ। বেশিরভাগ ভোগী আর লম্পট। ভাবা যায়, ধৃতরাষ্ট্রের একশোটা ছেলে। নাম মনে রাখাই শক্ত।
—আমি শুনেছি, আপনাদের পাঁচ ভাইয়ের একজন স্ত্রী ছিল। ব্যাপারটা তো খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। বেআইনী ব্যাপার। একজন স্বামীর একজন স্ত্রী, এই তো নিয়ম।
—আমাদের সময় অত নিয়মকানুন ছিল না। আর ওটা হয়েছিল আমার মায়ের জন্যে। জতুগৃহের ঘটনাটা আপনার মনে আছে?
—আই অ্যাম রিয়েলি সরি! ভারতেও আমি সহজ সরল কাঁচা প্রধানমন্ত্রী ছিলুম, এখন বুঝতে পারছি। মহাভারতে আরও কাঁচা।
—ওই সেই একই গৃহবিবাদ। রাজত্বের অধিকার নিয়ে নোংরা চক্রান্ত। আমি রাজা হব, না আমার কাজিন ধৃতরাষ্ট্রের ছেলে দুর্যোধন সিংহাসনে বসবে!
—আপনি ইংরিজি জানেন?
—অফকোর্স! মহাভারতে আছে, আমি আর বিদুর দুজনে ম্লেছ ভাষা জানতুম। সংস্কৃতের পাশাপাশি আমরা ফার্স্টবুক পড়েছি। ডগ মানে কুকুর, আবার উলটে নিলেই গড মানে ভগবান। অর্থাৎ, বাঁ থেকে ডানে পড়লে কুকুর, ডান থেকে বামে গেলে ভগবান। আমাকে আপনি ভগবান বলতে পারেন। যখন মহাপ্রস্থানে যাচ্ছি, আমার পেছন পেছন অন্য কোনও প্রাণী নয়, একটা কুকুর। গডের পেছনে ডগ, ইংরিজি ব্যাপার। জতুগৃহ মানে ইনফ্লেমেবল হাউস। দুর্যোধনরা আমাদের পুরো পরিবারকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিল।
—আমাদেরও তো তাই। বংশ নির্বংশ প্রায় করেই ফেলেছে। দেশ সেবার পুরস্কার।
—দু:খ করে লাভ নেই। সেদিন স্বর্গের অ্যানুয়াল কনফারেনসে যিশু বলছিলেন, মানুষকে পাপ থেকে ত্রাণ করতে গিয়ে নিজে গজাল খেয়ে মরলুম। একটা আড়কাঠে হাতে পায়ে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে দিলে। মানুষের তো ওইটাই ধর্ম। যে ভালো করতে চাইবে, তাকেই বাঁশ দেবে। স্বর্গে বাঁশ নেই, বাঁশঝাড়ও নেই। যত বাঁশঝাড় পৃথিবীতে।
—খুব শান্তির জায়গা, তাই না?
—শান্তি হবে না কেন? দেবগত মালিকানা নেই। সব ফ্রি। ভগবানের অ্যাকাউন্টে সব হয়ে যাচ্ছে।
—ওখানে সুযোগসুবিধে কেমন? ফাইভস্টার হোটেলের মতো? অ্যাটাচড বাথ!
—ফাইভস্টার হোটেল আমি দেখিনি। স্বর্গে সব একরকমের ব্যবস্থা। কোনও বিভেদ নেই। প্রত্যেকের জন্যে একটা করে কটেজ। কুঞ্জবন। সকালে হেভি ব্রেকফাস্ট। লাঞ্চ, টি, ডিনার।
—ভেজ আর নন ভেজ?
—দুরকমই ব্যবস্থাই আছে। ফ্রি সেক্স। গর্ভসঞ্চারের কোনও ভয় নেই। পার্মানেন্ট যৌবন। পলিউশন নেই বলে অসুখও নেই। গোটা স্বর্গটাই সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশানড। স্বর্গে ঢোকার সময় প্রত্যেককেই একটা ছোট্ট অপারেশন করা হয়। সাপের বিষদাঁত ভাঙার মতো। হিংসের থলিটা কেটে নেয়। মাছের পিত্তি যেভাবে বের করে সেইভাবে। হিংসেই তো সব অশান্তির কারণ। প্রপার্টি, সেক্স আর জেলাসি এই তিনটেই তো খতরনক। সেই তিনটে নিয়ে কোনও অশান্তি নেই। এনি টাইম টি টাইমের মতো, এনিটাইম সেক্স। মনে হওয়া মাত্রই অপ্সরারা চলে আসে। ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস, ফর্টিসিকস, টোয়েন্টি এইট, ফটিসিকস। প্রত্যেকের জন্যে সেপারেট ঝরনা। বিশাল বিশাল সুইমিং পুল। খাও, দাও, ঘুরে বেড়াও। স্বর্গের ডাক্তার একটা করে ইনজেকশন দিয়ে যায়, থ্রি সিসি একস্ট্র্যাক্ট আনন্দ। মৃত্যু নেই, বিচ্ছেদবেদনা নেই, বঞ্চনা, প্রবঞ্চনা নেই।
—ওখান থেকে চলে এলেন কেন?
—মনে হল, দেখে আসি ভারতের অবস্থাটা কী?
—খুব খারাপ অবস্থা। ভারতের কোন জায়গায় যাবেন?
—ভাবছি, পাঞ্জাবে একবার যাব—শ্বশুরবাড়ির দেশ।
—একবার মরে গেলে মানুষ কি আর একবার মরতে পারে?
—এ প্রশ্ন কেন?
—আপনার কি আর একবার মরার ইচ্ছে হয়েছে?
—আমি তো একবারও মরিনি। হাঁটতে হাঁটতে স্বর্গে চলে গেছি।
—কী ভাবে গেছেন, আপনি জানেন। বিংশ শতাব্দীর মানুষের মাথায় আসে না।
—স্বর্গ আর মর্ত্য একটা জায়গায় এসে মিলেছে। সেই জায়গাটায় কায়দা করে যেতে পারলেই সুড়ুত করে টেনে নেয়। আপনি কখনও মাংসর হাড় বা নলির ভেতরে থেকে মজ্জা টেনে খেয়েছেন?
—কত বার! এক এক সময় টানলেই সুড়ুত করে চলে আসে। আবার এক এক সময় এমন বেআড়া আটকে থাকে, কিছুতেই বেরোতে চায় না। থালায় ঠুকতে হয়।
—স্বর্গ সবসময় মর্ত্যের নলিতে মুখ রেখে টানছে। সাকিং। মানুষ হল মজ্জার মতো। ওই টানের মুখে পড়তে পারলেই সড়াৎ করে স্বর্গের মুখে। সড়াৎ হবে কী করে! পুণ্যকর্মে হড়হড়ে হয়ে থাকতে হবে।
—আমার মনে হয়, আপনাদের সময় স্বর্গটা খুব কাছে ছিল।
—আমারও তাই মনে হয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় দেবতারা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেন। হাততালি দিতেন, পুষ্পবৃষ্টি করতেন। একালে আপনারা তেমন কিছু দেখেছেন কখনও?
—আমরা আকাশজোড়া কালো মেঘ দেখেছি, আর দেখেছি তেড়ে বৃষ্টি। শিলাবৃষ্টিও দেখেছি। পুষ্পবৃষ্টি কখনও দেখিনি।
—কোনও অপ্সরা? হঠাৎ নেমে এল আকাশ থেকে?
—এখন প্লেন ছাড়া তো কিছু নামে না। প্লেনের পেট থেকে হিন্দি সিনেমার নায়িকা নামতে পারেন, বম্বে-দিল্লি ফ্লাইটে। তাঁদের অবশ্য অপ্সরার মতোই দেখতে।
—না, ঠিক ওরকম নয়, ধরুন মেনকা নেমে এল। এসেই কারও সঙ্গে সহবাস করল। গর্ভবতী হল। একটি কন্যাসন্তান প্রসব করে, নদীর ধারে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল।
—আধুনিক সভ্যতায় এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। পৃথিবীর অপ্সরারা অনেকেই এমন কর্ম করছে।
—সেকাল আর একালে কোনও তফাত নেই?
—কোনও তফাত নেই। একালেও রাক্ষস আছে, তাদের নাম টেররিস্ট। একটাই তফাত, তখন ছিল রাজতন্ত্র এখন গণতন্ত্র।
এঁরা দুজনে যেখানে কথা বলছিলেন, তার কিছুটা দূরে বরফের প্রান্তরে দীর্ঘদেহী, সৌম্য চেহারার এক মানুষ, কাঁধে ধনুর্বাণ, চিন্তিত মুখে পায়চারি করছিলেন। যুধিষ্ঠির এগিয়ে গিয়ে বললেন, সৌম্য, আপনাকে চেনাচেনা মনে হচ্ছে! আপনি কে?
—আমি রামচন্দ্র, আপনি?
—আমি যুধিষ্ঠির।
—আচ্ছা! প্রথম পাণ্ডব! তা কি, প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়েছেন?
—না, পৃথিবী আমাকে টেনেছে, তাই ছুটি নিয়ে স্বর্গ থেকে নেমে এসেছি। ভ্রাতা লক্ষ্মণ, সহধর্মিনী সীতা কোথায় গেলেন?
—সীতার সঙ্গে তো আমার বহুদিন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আর লক্ষ্মণ তার বউদির দিকে চলে গেছে। নারীনির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। বধূহত্যার প্রতিবাদে জনমত তৈরি করছে। বলে কি না, আদালতে আমার অপরাধের বিচার হবে। সীতাকে আমি আত্মহত্যায় উস্কানি দিয়েছি।
—সেইজন্য চিন্তিত?
—না, না, চিন্তিত অন্য কারণে। ভারতে আমাকে নিয়ে ভয়ঙ্কর রকমের একটা পলিটিক্স হচ্ছে। আমার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার সময় এখন খুব খারাপ, শ্রীমান পাণ্ডব। রামজন্মভূমি, বাবরি মসজিদ নিয়ে ফাটাফাটি। রাম-রাবণের যুদ্ধে আমি রণক্লান্ত, আমার পরিবার নিশ্চিহ্ন, এতদিন পরে নতুন করে আবার এক অশান্তি। ওরা মন্দির করবেই, এরা কোর্টে চলে গেছে। কেস সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এখন তাঁরা যদি ইনজাংশন দিয়ে দেন, আমার এতকালের ভাবমূর্তি চুরমার হয়ে যাবে।
—আপনার বানরসেনারা কী করছেন? তাঁরা তো পৃথিবীতে এখনও আছেন!
—তাদের কথা আর আপনি জিগ্যেস করে আমাকে লজ্জা দেবেন না, তারা এখন প্রকৃত বাঁদর হয়ে গেছে। পড়েননি, আমার ভক্ত তুলসীদাস কী লিখেছেন, একটা বেদে দোরে দোরে বাঁদর-নাচ দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, বাঁদরটা দু:খ করে বলছে—
কুদকে সাগর উতারা, কোহি কিয়া মিৎ।
কোহি ওঘড়া গিরি দরখৎ, কোহি শিখায়া নীৎ।।
ক্যা কহুঙ্গা সীতানাথকো, মেয়নে কিয়া চোরি।
সোহি কুল উদ্ভব রো, বেদিয়া খিঁচে ডোরি।।
মানেটা বুঝলেন? বাঁদর বলছে, একসময় আমাদের বংশের কেউ কেউ এক লাফে সাগর পার হয়েছে, কেউ কেউ বীরকুলশ্রেষ্ঠ রঘুপতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে জগতে প্রসিদ্ধি লাভ করে গেছে, কেউ বাহুবলে বড় বড় গাছ, পাহাড় উৎপাটন করেছে, কোনও কোনও বানর নীতিবিশারদ হয়ে মানুষকে নীতিশিক্ষা দিয়েছে। কোন অপরাধে আজ আমাদের এই অবস্থা! আমরা কী কিছু চুরি করেছি, যে এই বেদে আমার গলায় দড়ি বেঁধে রাস্তায় রাস্তায় নাচাচ্ছে! ব্যাপারটা বুঝলেন? যুগ একদম বদলে গেছে। আমার কাল, আপনার কাল আর একাল আকাশপাতাল তফাত। সেকালে সব বড় বড় ছিল, একালে সব ছোট ছোট। সেই শক্তি আর নেই। আপনাকে নিয়ে কোনও পলিটিকস হয়নি, না?
—না, আমাদের নিয়ে টেলি-সিরিয়াল হয়েছে।
—আপনার আগে আমাকে নিয়ে হয়েছে, আর তারপর থেকেই শুরু হয়েছে, জয় রাম, জয় শিরি রাম চিৎকার। উত্তর ভারতে রাম-ঢেউ উঠেছে। রাম-রথ বেরল। একটা নির্বাচন হয়ে গেল আমাকে সামনে রেখে। হনুমানকে টেনে এনেছে। হয়েছে বজরঙ্গ দল। মারদাঙ্গা ফাটাফাটি। আর এক লঙ্কাকাণ্ড! ধর্মযুদ্ধ! কাগজে কাগজে আমাকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে, যা-তা লেখা। একেই আমি অসহায়, আরও অসহায় বোধ করছি। সবচেয়ে দু:খের, আমার চেয়ে হনুমান বড় হয়ে গেল! একালের লোক বলে হুনমান!
—সে তো আপনিই বলেছেন—ভরত ভাই কপিসে উরিন হম নাহি। হনুমানের চেয়ে আমি বড় নই। আপনিই তো বলেছেন, ভক্ত ভগবানের চেয়ে বড়।
—আরে মশাই, আমি বলব কেন? আমার মুখে তুলসীদাসের কথা।
—হিন্দিবলয়ে তুলসীদাসই তো আপনাকে পপুলার করেছেন। আপনি ধর্মের লাইনে চলে গিয়ে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনেছেন। আপনাকে নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে। মানুষ মরছে, মানুষ মারছে। কপালে রামনামের ছাপ, হাতে অস্ত্র। আমাদের সে সমস্যা নেই। আমরা জুয়া খেলেছি, যুদ্ধ করেছি।
—বাজে বকবেন না। আপনাদের কৃষ্ণ। আমি তো অবতার! তিনি স্বয়ং শ্রীভগবান। এক গীতা লিখে, সব শেষ করে দিয়েছেন।
—গীতা লেখেননি, গীতা বলেছেন। কুরুক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে অর্জুনকে বলেছিলেন। সেইটারই কপি পরে পাবলিশ হয়। হরেক ভাষায় অনুবাদ, কোটি কোটি এডিশন। খ্রিস্টানের বাইবেল, হিন্দুর গীতা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের যে একটা সুবিধে ছিল। তাঁর চরিত্রের অনেক দিক। আপনার মতো একবগ্গা, একপেশে নয়। আপনি রাজার ছেলে হয়ে বিপদে পড়ে গেছেন। কৃষ্ণ এসেছিলেন গোপের ঘরে। একাধারে যোদ্ধা, রাজনীতিক, প্রেমিক। প্রেম বলে প্রেম। সহস্র গোপিনী নিয়ে কী কাণ্ড। শ্রীরাধিকাকে নিয়ে কুঞ্জকাননে রাতের পর রাত, ঝুলন, রাস, বংশীবাদন। প্রেমই তো সব, রঘুবীর। যুদ্ধ করে কে কবে বড়লোক হয়েছে! না পার্থ, না আমি, না আপনি। দেখুন, লঙ্কার পর আপনি ফিনিশ, কুরুক্ষেত্রের পর আমরা ফিনিশ। কৃষ্ণ বেঁচে আছেন প্রেমের জোরে।
—আমি রঘুবীর, আমি বেঁচে আছি ধর্মের জোরে।
—সে কেবল উত্তর ভারতে, তাও সম্প্রতি কৃষ্ণ ছড়িয়ে গেছেন সারা পৃথিবীতে।
—রামের সঙ্গে কৃষ্ণ মিলিয়ে রামকৃষ্ণ বলে যে!
—সে শুধু পশ্চিমবাংলার। আর এক অবতার এসে বললেন—যিনি রাম, তিনি কৃষ্ণ, একাধারে রামকৃষ্ণ। তিনি ছিলেন সমন্বয়বাদী। সারা পৃথিবী কিন্তু হরেকৃষ্ণ নামে নাচছে।
—আপনার জ্ঞান কম। মহানাম হল, হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। পরের লাইনেই আমি, হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম, হরে হরে। রাম ছাড়া কৃষ্ণ অসম্ভব। যেমন আঠা ছাড়া কাঁঠাল হয় না। সন্ধি করে হয়েছে, কাঁটা-যুক্ত আঠা সমান কাঁঠা। গাছ থেকে আলগা ঝোলে, তাই আল। তিনে মিলে কাঁঠাল। সেইরকম, হরি, রাম, কৃষ্ণ।
—আপনার সমস্যা হল, একালের মেয়েরা আপনাকে তেমন পছন্দ করে না একটি মাত্র কারণে, সেই কারণটা হল সীতা। সীতার সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করলেন, কোনও ভদ্রলোক ওরকম করে না। সন্দেহবাতিকওয়ালা স্বামীরাই ওইরকম করে। অমন একজন সতীসাবিত্রীকে কী করে বললেন, চরিত্রের পরীক্ষা দিতে হবে। রাবণের সঙ্গে তোমার ইয়ে হয়েছে কি না! কী নোংরা কথা! রঘুবীর, এই কী বীরের উচিত কার্য!
—আপনি মশাই, কোন মুখে এ কথা বলছেন! নিজের বউকে বাজি ধরে পাশা খেললেন। রজ:স্বলা, একবস্ত্রা। পরিধানে পাতলা একটি শাড়ি ছাড়া কিছুই নেই। দু:শাসন কেশ আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে এল সভায়। সর্বসমক্ষে বিবস্ত্রা করতে চাইছে। দুর্যোধন কদলীকাণ্ডের মতো বাম ঊরু দেখাচ্ছে। ধর্ষণের ইঙ্গিত। আপনি ধর্মরাজ! মাথা নীচু করে বসে আছেন। আপনার স্ত্রী ধর্ষিতা হচ্ছেন। কিছুই করার ক্ষমতা নেই। কৃষ্ণ ছাড়া আপনারা অচল। কৃষ্ণ কাপড়ের কল থেকে কাপড় যোগালেন। ভদ্রমহিলা ইজ্জত কোনওরকমে রক্ষা পেল। কেশব সহায় ছিলেন বলে, কৌশলে যুদ্ধে জিতলেন। মনে আছে পাকামো করতে গিয়ে কৃষ্ণের কাছে কীরকম দাবড়ানি খেয়েছিলেন আপনি!
—কখন? আমার মনে নেই। কৃষ্ণ ভগবান হলেও আমাকে যথেষ্ট রেসপেক্ট করতেন।
—আপনার অ্যামনেসিয়া হয়েছে।
—সে আবার কী?
—অ্যালঝাইমারস ডিজিজ।
—সেটা আবার কী?
—স্মৃতিটা নষ্ট হয়ে গেছে। মনে আছে, দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদের তলায় লুকিয়েছিল। আপনি তাকে উত্তেজিত করে তুলে আনলেন। অনেক বড় বড় কথা বললেন। বললেন, বীর, তুমি বর্ম পরে চুল বাঁধো, যুদ্ধের জন্যে যা যা অস্ত্র প্রয়োজন, তুমি নাও। আমরাই দিচ্ছি। আমি আবার বলছি, পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে যাঁর সঙ্গে তোমার ইচ্ছা তাঁরই সঙ্গে যুদ্ধ করো, তাঁকে বধ করে কুরুরাজ্যের অধিপতি হও, অথবা নিহত হয়ে স্বর্গে যাও। সেই সময় কৃষ্ণ দাঁত খিচিয়ে বললেন, মহারাজ, কী আবোলতাবোল বকছেন! এক তো শকুনির সঙ্গে বোকার মতো পাশা খেলতে গিয়ে হেরে মরলেন, কোথাকার জল কোথায় গড়াল, এখন বলছেন, একজনের সঙ্গে যুদ্ধ করো, তাকে হারাতে পারলেই রাজ্য তোমার। এই শর্ত কে আপনাকে দিতে বলেছিল পাকামো করে। দুর্যোধনের স্ট্রেংথ আপনি জানেন। যদি আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায়! গদার এক ঘায়ে আপনার খেল খতম হয়ে যাবে। যদি বলে, অর্জুনের সঙ্গে লড়ব। অর্জুন পারবে না। নকুল, সহদেব তো এলেবেলে নস্যি। একমাত্র ভীম। কিন্তু ভীম প্র্যাকটিস করেনি। ফাঁকিবাজ। দুর্যোধন লোহার ভীম তৈরি করিয়ে তেরোটা বছর সমানে গদা দিয়ে পিটিয়েছে। স্বীকার করছি, দুর্যোধনের চেয়ে ভীম বলশালী, সহিষ্ণু, কিন্তু দুর্যোধন অনেক বেশি কৃতী। তার প্র্যাকটিস আছে। বলবানের চেয়ে কৃতীই শ্রেষ্ঠ। দুম করে বলে বসলেন, যে-কোনও একজনের সঙ্গে লড়ে যাও। গদাধারী দুর্যোধনকে হারাবার ক্ষমতা কোনও একজন মানুষ বা দেবতার নেই। আপনাদের বরাতে আবার বনবাস নাচছে। ন্যায়যুদ্ধে দুর্যোধনকে পরাজিত করা অসম্ভব। রাজ্য ভোগ করা আপনার আর হল না। ওই বনেবনে ঘুরবেন আর ভিক্ষে করবেন। মনে পড়ছে, ধর্মরাজ?
—হ্যাঁ পড়ছে। চিরকালই আমি একটু বোকা টাইপের। ধার্মিকরা বোকাই হয়, রঘুবীর।
—তারপর কী হল?
—শুরু হল ধুন্দুমার লড়াই। কৃষ্ণ যা বলেছিলেন, তাই। দুর্যোধন একেবারে ফেরোসাস। ভীমকে মেরে পাটপাট করে দিলেন। একসময় মনে হল ভীমসেন বুঝি কুপোকাত হল। দু-তিনবার অজ্ঞান হয়ে গেল। দরদর করে রক্ত বেরোচ্ছে। দুর্যোধন তাল ঠুকছে—আ যাও পাণ্ডুকা বাচ্চে। কৃষ্ণ আমাকে দাবড়াচ্ছেন—আপনার বোকামির জন্যে আবার আমরা বিপদে পড়েছি। জয়লাভ করেও আমরা সর্বস্ব হারাতে চলেছি এই নির্বোধ যুধিষ্ঠিরের জন্যে, আবার সেই গবেটের মতো পণ, দুর্যোধন একজনকে বধ করতে পারলেই জয়ী হবে। ন্যায়যুদ্ধে দুর্যোধনকে পরাজিত করা অসম্ভব। কৌশলে ভীম তার কাছে শিশু। এই অবস্থায় অর্জুন ভীমকে দেখিয়ে নিজের বাঁ ঊরুতে চপেটাঘাত করল। ভীম মহাবেগে দুর্যোধনের দিকে তেড়ে গেল, দুর্যোধন টুক করে পাশ কাটিয়ে সরে গিয়ে ভীমকে ঝেড়ে দিল এক ঘা। ভীমের একটা পাশ ফেটে গেল। কিছুক্ষণ মূর্ছিত হয়ে রইল। একটু সামলে দুর্যোধনকে মারতে গেল। দুর্যোধন মারলে লাফ, ভীম গদা বসিয়ে দিলে, দুই ঊরুতে। দুর্যোধন পড়ে গেল। ঊরু ভগ্ন। বলরাম ছ্যা-ছ্যা করে উঠলেন। ধিক ধিক ভীম! নাভির নীচে তুমি মেরে দিলে! শাস্ত্রবিরুদ্ধ যুদ্ধ! বলরাম ভীমকে মারার জন্যে লাঙ্গল নিয়ে তেড়ে গেলেন। কৃষ্ণ বলরামকে জাপটে ধরলেন।
—জানি, জানি, জড়িয়ে ধরে অদ্ভুত একটা কথা বলেছিলেন, ছল-চাতুরিতে ভরা। সে এক হেঁয়ালির মতো। বলেছিলেন, নিজের উন্নতি, মিত্রের উন্নতি, মিত্রের মিত্রের উন্নতি, আর শত্রুর অবনতি, তার মিত্রের অবনতি, তার মিত্রের মিত্রের অবনতি—এই ছ'প্রকারই নিজের উন্নতি। এতগুলো শত্রু-মিত্র শুনে বলরামের মাথা ভোম হয়ে গেল। কৃষ্ণ বললেন, ভীম পাশাখেলার সভায় প্রতিজ্ঞা করেছিল, দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করবে। দুর্যোধন সেই কথা মনে রেখে নিজের ঊরু গার্ড করেনি কেন? ন্যায়নীতির বারোটা। ভীমের কোনও দোষ নেই। বলরাম কী আর করেন? ভগবান স্বয়ং দুর্নীতি সমর্থন করছেন। বলরাম বলেছিলেন, গোবিন্দ, ভীম অতি অধর্ম করেছে। ন্যায়যোদ্ধা দুর্যোধনকে কূটযুদ্ধে পরাজিত করেছে, দুর্যোধন চিরকালের জন্য স্বর্গবাসী হবে।
—আর বোকা ভীম! ইয়া শরীর, গপাগপ খায়, ওই যে পড়ে আছে ওইখানে বরফচাপা। স্বর্গে যেতেই পারল না, তিন ফারলং দূরে গোঁত্তা খেয়ে পড়ে গেল।
—আর মনে আছে, গান্ধারী আপনাকে অভিশাপ দিতে চেয়েছিলেন। কৃষ্ণকে বললেন, অবাক কাণ্ড, আপনার সামনে ভীম দুর্যোধনের কোমরের নীচে গদাঘাত করল! আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন! এর নাম ধর্ম! এর নাম বীরত্ব! মানুষ হয়ে রাক্ষসের মতো দু:শাসনের বুকের রক্ত পান করল! আরে ছি ছি! সত্যিকথা বলতে কী, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধটা আপনারা একেবারে গেঁজিয়ে ফেলেছিলেন। স্রেফ ফাউল করে করে জিতে গেলেন। ধর্মের নামে এমন অধর্ম সহ্য হয়! কৃষ্ণের যদুবংশ গান্ধারীর অভিশাপে ছারখার হয়ে গেল, মৃত্যুটাও কী জঘন্য ভাবে হল।
—আপনি, মশাই, বেশি মুখ নাড়বেন না। আপনার যুদ্ধটাও কি খুব সৎভাবে হয়েছে! আপনার হনুমান অনেক চুরিজোচ্চুরি করেছে। ইন্দ্রজিতের যজ্ঞ পণ্ড করার আদেশ দিয়েছেন। রাবণের মৃত্যুবাণ চুরি করিয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা বিভীষণ না থাকলে আপনি কী করতেন, মশাই! রাবণকে আপনি কেমন করে বধ করতেন! একটা করে মুণ্ডু কাটছেন, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আর একটা মুণ্ডু গজিয়ে উঠে হা হা করে অট্টহাসি ছাড়ছে। আপনার তো চক্ষু চড়ক গাছ! মনে পড়ছে শ্রীরাম! অর্জুন ভীমকে নিজের ঊরুতে চাপড় মেরে দেখিয়েছিল—মেজদা, দুর্যোধনের ঊরুতে মার। আর বিভীষণ কী করলেন! ছুটে এসে বললেন, মহারাজ, ব্রহ্মার বরে রাবণের নাভিতে এক অমৃত কুণ্ডল আছে। সেই নাভিকুণ্ড ছেদন না করলে রাবণ বধ হবে না। ইন্দ্রের রথ, যে রথে চেপে আপনি যুদ্ধ করছিলেন, সেই রথের সারথি মাতলি আপনাকে অস্ত্রটাও বলে দিলেন, মারুন ব্রহ্মাস্ত্র। সেই ব্রহ্মাস্ত্র আপনি রাবণের নাভি তাক করে ছুঁড়লেন। অশাস্ত্রীয় কাজ। হিটিং অন দ্যা বেল্ট, হিটিং বিলো দি বেল্ট, দুটোই বেআইনী। ফাউল।
—আপনি ঝগড়া করছেন কেন? গায়ে পড়ে ঝগড়া। আমি দশ অবতারের এক অবতার। আমাকে আপনি যথোচিত সম্মান করছেন না কিন্তু!
—আমিও ধর্মরাজ। আপনি আমার জন্মবৃত্তান্ত জানেন? ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ গোলমেলে। আমরা কেউই পাণ্ডুর পুত্র নই। সেকালের সব বিদঘুটে ব্যাপার। একালের বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। মানুষ ইচ্ছে করলে জন্তু-জানোয়ার হতে পারত। এক মুনি ছিলেন এক অরণ্যে, তাঁর আবার অদ্ভুত নাম, কিমিন্দম। যেমন নাম তাঁর তেমন কাণ্ড! তিনি ভরদুপুরে পুজো-হোম চুলোর দোরে দিয়ে নিজেকে একটা হরিণ করে ফেললেন আর নিজের বউকে হরিণী। তিনি হরিণ হয়ে হরিণীর সঙ্গে মনের সুখে মৈথুন করছেন। ওদিকে পাণ্ডুরাজা বেরিয়েছেন মৃগয়ায়। চালিয়ে দিলেন বাণ। হরিণটি শরবিদ্ধ হল। আহত হরিণ বললে, রাজা! তোমার কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই! গাধার মতো মৈথুনরত মৃগদম্পতিকে বধ করলে! আমি ব্রাহ্মণ। তোমার তো ব্রহ্মহত্যার শাপ হল। অবশ্য তুমি জানতে না আমি কে! কিন্তু আমি তোমাকে শাপ দেব। কোনও উপায় নেই। সেই শাপ হল, স্ত্রীসঙ্গমকালে তোমারও মৃত্যু হবে। মুনিদের তো আপনি চেনেন, মহারাজ। সবাই দুর্বাসা। পাণ্ডুরাজার হয়ে গেল। দু-দুজন স্ত্রী, কিছুই করার উপায় নেই। পুত্র সন্তানের আশায় ছাই। মৃত্যুর সময় কে মুখে জল দেবে। কে শ্রাদ্ধ করবে! তখন তিনি আমার মা কুন্তীদেবীকে বললেন, আমি জোড়হাতে তোমাকে অনুরোধ করছি, লজ্জার কোনও কারণ নেই, তুমি কোনও দেবতা বা মানুষকে ধরো। ধরে সন্তান লাভ করো। সন্তান না হলে আমি স্বর্গে যাব কী করে! আপৎকালে স্ত্রীলোক উত্তম বর্ণের পুরুষ অথবা দেবর থেকে পুত্রলাভ করতে পারে। পৃথিবীতে সকল স্ত্রীলোকই গরুর তুল্য স্বাধীন। কী কাল ছিল তখন! বলুন রঘুবীর! দুর্বাসা মুনি কুন্তীকে বর দিয়েছিলেন, মন্ত্রবলে যে-কোনও দেবতা বা ব্রাহ্মণকে ডাকলেই এসে হাজির হবেন। আর তিনি এসেই বলবেন, চলো সুন্দরী, বিছানায় যাই। কুন্তী সেই বরের কথা পাণ্ডুকে জানিয়ে বললেন, আমি কোনও দেবতাকেই ডাকি। দেবতার সঙ্গে সঙ্গম করলে তাড়াতাড়ি সন্তান হবে। ব্রাহ্মণ হলে দেরি হবে। পাণ্ডু আনন্দে আটখানা হয়ে বললেন, আর বিলম্ব নয়, দেবতাদের মধ্যে ধর্মই শ্রেষ্ঠ, তুমি আজই ধর্মকে আহ্বান করো। মা কুন্তী ডাকা মাত্রই ধর্ম চলে এলেন। শতশৃঙ্গ পাহাড়ের চূড়ায় তিনি মা কুন্তীর সঙ্গে সঙ্গম করলেন। মা কুন্তীর গর্ভে আমি এলুম। জন্মাবার সময় দৈববাণী হল, এই বালক ধার্মিকগণের শ্রেষ্ঠ, বিক্রান্ত, সত্যবাদী ও পৃথিবীপতি হবে। এর নাম যুধিষ্ঠির হবে। অতএব বুঝতে পারছেন রঘুবীর, আমার পিতা সাধারণ মানুষ নন, দেবতা। আমার জন্মের সময় দৈববাণী হয়েছিল। আপনার সময় কিছু হয়েছিল?
—আপনি বিশেষ লেখাপড়া করেননি? তাই না? রামায়ণখানা পড়া আছে ভালো করে!
—না, ওই পুঁথিটা আমার বাবার লাইব্রেরিতে ছিল না।
—আপনার বাবার কোনও লাইব্রেরিই ছিল না। তিনি মৃগয়া, যুদ্ধ আর আমোদপ্রমোদ ছাড়া কিছুই জানতেন না। তা ছাড়া কামুক ছিলেন।
—আপনার বাবা তো স্ত্রৈণ ছিলেন।
—আমার বাবা আপনার বাবার চেয়ে অনেক বেশি ইন্টেলেকচুয়াল ছিলেন। অনেক বেশি কালচারড ছিলেন। সংস্কৃতিবান মানুষরা স্ত্রীর বশীভূত হয়। তাঁরা জরুকে গরু ভাবেন না, আপনার পিতার মতো। আমার সম্পর্কে দেবর্ষি নারদ বাল্মীকিকে কি সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন, জানেন? রাম বিষ্ণুর অংশসম্ভূত। পৃথিবীর পাপ আর অসুর বিনাশ করে ধর্মরাজ্য স্থাপনের জন্যে স্বয়ং নারায়ণ এসেছেন নররূপে। ধরাতল যখন পাপে ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কাঁপছে, তখন ব্রহ্ম আর দেবগণ ক্ষীর-সাগরের কূলে গিয়ে অখিল ভুবনের আশ্রয় সর্বেশ্বর হরির স্তব করতে থাকেন। শ্রীহরি তখন আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, আমি চারখণ্ড হয়ে জন্মাচ্ছি। তার একখণ্ড হল রাম। তার মানে শ্রীখণ্ডের মতো আমি হরিখণ্ড। আচ্ছা, আমরা এইরকম ইতরের মতো ঝগড়া করছি কেন?
—কারণ, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর শেষ, আমরা কলিযুগে এসে হাজির। কলির ধর্মই হল, ধর্ম বলে কিছু থাকবে না। অধর্মটাই ধর্ম হবে। দুটো মানুষ এক জায়গায় হলেই এঁড়ে তর্ক করবে। পুরুষরা নারীর কথায় ওঠ-বোস করবে। মেয়েরা বারে বসে মাল খাবে। স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে ঢলাঢলি করবে। শ্বশুর, শাশুড়িকে উঠতে বসতে বাক্যবাণে ঝাঁজরা করে দেবে। স্বামীদের নাম ধরে ডাকবে। দেরি করে ঘুম থেকে উঠবে। শাড়ি ছেড়ে ম্যাকসি পরবে। ব্লাউজের হাত ছোট হতে হতে স্যান্ডোগেঞ্জি হয়ে যাবে। ঝুলে খাটো হতে হতে একখণ্ড বুকসাপটা ব্যান্ডেজের চেহারা নেবে। অনেক সময় বিলিতি প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে ঘুরবে। রান্নার চেয়ে বুনতে ভালোবাসবে। ফ্রিজ থেকে বাসি খাবার বের করে গরম করে খাওয়াবে। দিকে দিকে ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুডের দোকান বাড়বে। লম্বা চুল সেলুনে গিয়ে কেটে খাটো করবে। চুলে তেল দেওয়ার পাট উঠে যাবে। ঘরে ঘরে শ্যাম্পুর চল হবে। কাঁসার বাসনের বদলে স্টেনলেস স্টিলের চল হবে। ভগবানের ওপর বিশ্বাস চলে গিয়ে গুরুর ওপর বিশ্বাস হবে। সবাই জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে ভাগ্য জানতে চাইবে। মোড়ে মোড়ে লটারির টিকিটের দোকান হবে। কেউ কাজ করবে না, শুধু মাইনে চাইবে। এমনি একপা হাঁটবে না, মিছিলের সঙ্গে এক ক্রোশ ঘুরবে। মানুষ সভ্যতা, ভদ্রতা ভুলে যাবে। 'বাপ' বললে 'শালা' বলবে। পুলিশ প্রকাশ্য রাজপথে দাঁড়িয়ে লরিচালকের কাছে পয়সা খাবে। রাজনীতির দাদারা মাস্তানদের সঙ্গে ঢলাঢলি করবে। অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরবে, সাধুরা জেল খাটবে। খাঁটি বলে কিছু থাকবে না, সবই ভেজাল হয়ে যাবে। মানুষ কাজকর্ম ডকে তুলে টিভি সিরিয়াল দেখবে। ছেলেমেয়েরা দেড় বছর বয়েস থেকেই স্কুলে যেতে শুরু করবে। মায়েরা ছেলে-মেয়েদের 'পড় পড়' করতে করতে ক্ষিপ্ত হয়ে আঁচড়াতে, কামড়াতে শুরু করবে। মায়েদের প্রেসার সব সময় হাই থাকবে। মেজাজ হয়ে যাবে মিলিটারিদের মতো। পরীক্ষায় সবাই লেটার আর স্টার পাবে, কিন্তু লেখাপড়া শিখবে না। মাতৃভাষা শুদ্ধ করে লিখতে পারবে না। রাস্তার চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাবে। গাড়ির চেয়ে হেঁটে গেলে আগে গন্তব্যস্থলে পৌঁছোনো যাবে। টিকিট কাটা যাত্রী রেলের কামরায় চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে, বিনা টিকিটের যাত্রী শুয়ে থাকবে টানটান। ঘুস ছাড়া কোনও কাজ হবে না। ডেলি প্যাসেঞ্জাররা অন্য যাত্রীদের মেরে তুলে দেবে। মানুষের শক্তি কমবে, দলের শক্তি বাড়বে। সৎ শিক্ষিত মানুষ উপোস করবে, ধান্দাবাজ গাড়ি হাঁকবে। মানুষের দাম কমবে, জিনিসের দাম বাড়বে। মানুষ ড্রাগ অ্যাডিকট হবে, এডস বলে একটা নতুন রোগ আসবে। দুরারোগ্য। প্রেম বাড়বে, বিয়ে কমবে। প্রেমিক স্বামী হওয়ার পরেই প্রেমিকাকে ধরে পেটাবে। নারীদের পুড়িয়ে মারার প্রবণতা বাড়বে। মানুষ টাকা-টাকা করে শান্তি হারাবে। রাজকোষ অর্থশূন্য হবে। পাওনাদার সরকারি দপ্তরে নায্য পাওনা চাইতে এলে পেটানি খাবে। মানুষকে টাকা দিয়ে অন্ধকার কিনতে হবে। ডাক্তাররা সব ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাবে। পেটে নল চালাবে, বুকে যন্ত্র বসাবে। মাথায় টুপি পরাবে, ছবি তুলবে। রোগ ধরা পড়তে পড়তে রোগী পটল তুলবে। সবাই সোস্যালিস্ট হয়ে যাবে। একজন রোগীকে পাঁচজনে মিলে দুইবে। সিজার ছাড়া ডেলিভারি হবে না। শাশুড়িকে মা বলতে অজ্ঞান হয়ে যাবে, গর্ভধারিণীকে বলবে মাগি। বড় বড় বাড়ি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। হিন্দুদের মধ্যে বাড়িতে লুঙ্গি পরার চল খুব বেড়ে যাবে। বড়রা বোকা হবে, শিশুরা চালাক। নারীরা পুরুষবিদ্বেষী হবে। দেহজীবীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। উচ্চফলনশীল ধান, গম, সবজি, সার আর কীটনাশকের ঠেলায় বিস্বাদ হয়ে যাবে। সর্বত্র নারীর কর্তৃত্ব বাড়বে। মানুষ চিৎকার করে কথা বলবে। মাইক বাজিয়ে কানের পরদা ফাটিয়ে দেবে। বারোয়ারি পুজোর উৎপাতে মানুষ পাড়াছাড়া হবে। আসল গায়ক-গায়িকার চেয়ে, নকল গায়ক-গায়িকাদের রমরম বেশি হবে। সাদা টাকার চেয়ে কালো টাকা শক্তিশালী হবে। মানুষ ধর্মের নামে অধর্ম করবে। খুন করে পুজো চড়াবে। নিজের স্ত্রীকে লাথি মেরে পরস্ত্রীর পায়ে ধরবে। অন্যায় করে চোখ রাঙাবে। ছাত্ররা শিক্ষককে ধরে ঠেঙাবে। জ্যাঠামশাইয়ের কাছা খুলে দেবে। বাপকে বলবে, বুড়ো মড়া। ছেলেদের হাবভাব মেয়েদের মতো হবে, মেয়েদের হবে ছেলেদের মতো। মেয়েদের ছেলে-বন্ধু বেড়ে যাবে। ছেলেরা বিপদে পড়লে মেয়েদের সামনে ঠেলে দেবে কাজ উদ্ধারের জন্য। স্বার্থসিদ্ধির জন্যে নিজের সুন্দরী স্ত্রীকে অন্যের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আসবে। অর্থের জন্যে পরস্পর পরস্পরকে খুন করবে। ছেলেরা বিয়েতে পণ চাইবে। পণের টাকা আদায়ের জন্যে বধূ নির্যাতন করবে। এক নারীতে পুরুষ সন্তুষ্ট হবে না, এক পুরুষে নারী। সকলেই সকলকে ঠকাবে। চরিত্রে আদর্শ বলে কিছু থাকবে না। গুণ্ডারা দেশ ভোগ করবে, নেতারা তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে গদিতে থাকবে। রোগে মৃত্যুর সংখ্যা যতটা কমবে, খুন আর দুর্ঘটনায় তা বেড়ে ডবল হয়ে যাবে। নতুন নতুন ওষুধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন অসুখ আসবে। কর্কট রোগ বেড়ে যাবে। নতুন নতুন যন্ত্র এসে মানুষকে বেকার করে দেবে। সব ঘট ভেঙে গিয়ে একটা ঘটই থাকবে—ধর্মঘট। পুরুষরা নারীর রোজগারে খাবে। রঘুবীর, এই হল কলির ধর্ম। দেবতারা দেবত্ব হারাবে। পণ্ডিতকে বলবে গাধা, গাধাকে বলবে পণ্ডিত। ওই যে দেখছেন অদূরে বরফের টিলার ওপর এক সুদর্শন যুবক বসে আছেন, উনি সম্প্রতি ভারত থেকে এসেছেন। ভারতের তরুণতম রাজা ছিলেন। মালা পরিয়ে প্ল্যাস্টিক বোমা ফাটিয়ে মেরে ফেলেছে।
—ধর্মরাজ, ভারতবর্ষে তো আর রাজা নেই। সেখানে তো প্রজাতন্ত্র।
—আপনার বুঝি সেইরকম ধারণা, শ্রীরামচন্দ্র! প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। আছে দলতন্ত্র। আর দলিততন্ত্র, গলিততন্ত্রও বলতে পারেন। যদি অনুমতি করেন, ভদ্রলোককে এখানে ডাকতে পারি। একা একা বসে আছেন মন খারাপ করে। বড় মানুষের ছেলে!
—হ্যাঁ, ডাকুন না। আমাদের দলটা একটু ভারী হোক। যুধিষ্ঠির এগিয়ে গেলেন। যুবক মন দিয়ে একটি যন্ত্র শুনছেন। যুধিষ্ঠির যোগবলে বুঝতে পারলেন, যন্ত্রটি বেতারযন্ত্র। ভারতের যাবতীয় সংবাদ ইথারে ভেসে আসছে। যুধিষ্ঠির বললেন, 'ধনুর্বাণধারী ওই রাজপুরুষকে আপনি চেনেন?'
—চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কোথায় যেন ছবি দেখেছি!
—উনি শ্রীরামচন্দ্র!
—তাই না কী? আমার কিছু প্রশ্ন আছে।
—তাহলে চলে আসুন।
যুধিষ্ঠির, শ্রীরাম আর সেই যুবাপুরুষ বরফের ওপর প্ল্যাস্টিকের চাদর বিছিয়ে বেশ আরাম করে বসলেন। কলকাতার ময়দানে শ্রীহরি এক যুগ ধরে কলসির চা বিক্রি করত। আর শ্রাবণ মাসে বাঁক কাঁধে নিয়ে জি. টি. রোড ধরে তারকেশ্বরে দৌড়োত বাবার মাথায় জল ঢালতে। সেই পুণ্যে মহাদেব তাকে হিমালয়ে নিয়ে এসেছেন। স্বর্গের তপোবনে একটা টি স্টল হবে। শ্রীহরি তার চার্জে থাকবে। শ্রীহরি তার কলসি নিয়েই হিমালয়ে চলে এসেছে। কোথাও কোনও ঘটনা দেখলেই শ্রীহরি তেড়ে আসে। অনেক দিনের অভ্যাস। ভারী, খসখসে গলায় হাঁকে—ভাঁচা। মানে ভাঁড়ে চা। শ্রীহরি ছুটে এল।
যুবাপুরুষ বললেন, 'তিনটে লাগাও। আদ্রক আছে?'
—'আছে মালিক।'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'চা খাওয়া উচিত হবে?'
শ্রীরাম বললেন, 'মদের চেয়ে ভালো, নয় কি?'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'কলিতে অবশ্য চা-ই পানীয়।'
শ্রীহরি চায়ের স্বর্গ-মর্ত্য করতে লাগল, অর্থাৎ একটা হাত উঁচুতে আর একটা নীচুতে। অদ্ভুত কায়দায় এ-পাত্রে ও-পাত্রে চা ঢালাঢালি করতে লাগল। অবিচ্ছিন্ন ধারাপাত। শ্রীরামচন্দ্র খুব খুশি হলেন কায়দা দেখে। ছোট ছোট ত্রিভঙ্গ মুরারি ভাঁড়ে সেই চা চলে এল হাতে হাতে।
চা খেয়ে ভাঁড় ফেলে দিয়ে যুবক শ্রীরামকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনি লঙ্কা আক্রমণ করেছিলেন?'
—আমি রাজ্য জয় করার জন্যে আক্রমণ করিনি। লঙ্কেশ্বর রাবণ আমার স্ত্রীকে হরণ করেছিলেন। আমার স্ত্রীকে উদ্ধার করার জন্যেই লঙ্কা আক্রমণ।
—আপনি হেরেছিলেন না জিতেছিলেন? আপনার স্টোরিটা আমার ঠিক জানা নেই।
—লঙ্কা আমি ছারখার করে দিয়েছিলুম। রাবণের বংশ নির্বংশ।
—আমার প্রশ্ন হল, লঙ্কা যদি জয়ই করলেন, তাহলে ওটাকে ভারতের মধ্যে টেনে আনলেন না কেন? তাহলে আমাকে লঙ্কা ইস্যুতে মরতে হত না!
—কেন? আমি তো সব রাক্ষস মেরে বিভীষণকে রাজা করে এসেছিলুম। আপনার স্ত্রীকেও হরণ করেছিল নাকি? কে করেছিল? বিভীষণের বংশধর?
—আপনি উত্তেজিত হবেন না। আমার স্ত্রীকে হরণ করেনি। ব্যাপারটা অন্যরকম। তামিলদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কানদের একটা অশান্তি চলছিল। তামিলরা বিদ্রোহী হয়ে গেরিলাবাহিনী গঠন করে আলাদা একটা রাজ্যের জন্যে লড়াই চালাচ্ছিল।
—চালাচ্ছিল চালাচ্ছিল, তাতে আপনার কী? তাদের রাজ্যের লেঠা তারা বুঝে নিত।
—সে আপনি বুঝবেন না। ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।
—সীতাহরণের সময় সে-কথা মনে ছিল না?
—সে তো রাবণের আমলে। তার সঙ্গে এই ইস্যুটা গুলিয়ে ফেলছেন। ভারতের একটা বিদেশ-নীতি আছে। সেই নীতি অনুসারে আমাকে অ্যাকশন নিতে হল। পৃথিবীর সব বড় বড় পাওয়ারই এইরকম করে। আমেরিকা করে, রাশিয়া করে।
—তা আপনি কী করলেন?
—আপনি তো একটা সেতু নির্মাণ করেছিলেন। সেটা গেল কোথায়?
—হ্যাঁ, সেতু তো একটা হয়েছিল। দশ যোজন বিস্তৃত শত যোজন দীর্ঘ। তিন দিন তিন রাত সমুদ্রের ধারে বসে আরাধনা করেছিলুম। কোনও ফল হল না দেখে রেগে গেলুম। বললুম, লক্ষ্মণ, আমার ধনুর্বাণ নিয়ে এসো, ব্রহ্মাস্ত্র হেনে সমুদ্র শুকিয়ে ফেলব।
—ব্রহ্মাস্ত্র মানে কি নিউক্লিয়ার ওয়েপন?
—আপনাদের আমলের ভাষা তো আমি জানি না। ব্রহ্মাস্ত্র দেখতে সামান্য একটা বাণের মতোই; কিন্তু সাংঘাতিক তার শক্তি। স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল আলোড়িত হয়, আগুন, ঝড়, ঝঞ্ঝা, জীবজগৎ ছিটকে আকাশে উঠে যায়, পাহাড় গলে যায়, দিন রাতের মতো অন্ধকার হয়ে যায়, সমুদ্র শুকিয়ে যায়, স্থলভাগে নতুন সমুদ্র তৈরি হয়।
—ওই তো, অ্যাটম বম। কোথা থেকে পেয়েছিলেন?
—আমাদের সময় অস্ত্রশস্ত্র আমরা দেবতাদের কাছ থেকেই পেতুম। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সময়েও বোধহয় একই নিয়ম ছিল!
যুধিষ্ঠির বললেন, 'একই নিয়ম। প্রচণ্ড তপস্যা করে দেবতাদের সন্তুষ্ট করে অস্ত্রলাভ করতে হত। অর্জুন তো ওসব লাভ করতে একেবারে স্বর্গে চলে গিয়েছিল।'
যুবাপুরুষ বললেন, 'তার মানে ইউরোপে। কি আপনাদের কালে, কি আমার কালে ভারত কোনওদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারল না। আমি সুইডেন থেকে কামান কেনার পর, সে কী কেচ্ছা। বললে, আমি না কি কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছি। আমারই এক বন্ধু আমার পেছনে আদাজল খেয়ে লেগে গেল। 'চোর হ্যায়', 'চোর হ্যায়' বলে সারা ভারতে সে কী নৃত্য!
ওপাশ থেকে কে একজন বলে উঠল, 'সে নৃত্য এখনও থামেনি।'
—কে? কার গলা?
বরফের আড়াল থেকে এক সায়েব বেরিয়ে এল মাথায় রোলার হ্যাট। গলায় ক্যামেরা। সায়েব সামনে এসে বললে, 'আমার গলা। আমার নাম স্টিফেন ট্রাম্পেট। একজন আমেরিকান সাংবাদিক। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই এক্সক্লুসিভ স্টোরির সন্ধানে। বোফোর্সের ইনসাইড স্টোরিটা বলুন তো এক্সক্লুসিভ একটা ছেড়ে দি। অনেকদিন ধরে জল ঘোলা হচ্ছে। টাকাটা কে খেয়েছিল?
যুবাপুরুষ বললেন, 'মিস্টার ট্রাম্পেট, আমাকে একটা ইনসাইড স্টোরি বলতে পারেন? আমাকে কে মেরেছিল? আপনাদের কেনেডি সায়েব সম্পর্কে তো নতুন তথ্য বেরিয়েছে। ডক্টর চার্লস ক্রেন শ এতদিন পরে মুখ খুলেছেন। তিনিই অপারেশন থিয়েটারে কেনেডিকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলেন। আততায়ী অসওয়াল্ডও তাঁর চিকিৎসায় ছিল। ট্রমা রুম ওয়ান-এ প্রেসিডেন্টকে আনা হল, ডালাসের পার্কল্যান্ড হসপিটালে। ক্রেন শ মেডিক্যাল টিম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।'
—জানি। প্রেসিডেন্টকে সামনে থেকেও দুটো বুলেট মারা হয়েছিল। একটা লেগেছিল গলায়, আর একটা লেগেছিল মাথার ডান দিকে। আততায়ী একজন নয়, দু-তিনজন। প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষীরা অবহেলা করেছিল। ইন্টেলিজেনস ঠিক মতো কাজ করেনি। পোস্টমর্টেমের সময় দেহে বাড়তি অস্ত্রোপচার করে ক্ষতস্থানের অদলবদল করা হয়েছিল। অনেক কিছু চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। আজও জানা সম্ভব হয়নি, আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে কারা মেরেছিল!
—আপনারা, পাওয়ারফুল সাংবাদিকরা তাহলে কী করলেন!
—আমরা হেরে গেছি। সরকারি চাপে সব সত্য চাপা পড়ে গেছে।
—আমার মায়ের মৃত্যু তো আপনাদের স্যাটিলাইটে প্রথম ধরা পড়ে। আমরা খবর দেওয়ার আগেই আপনারা খবরটা ফাঁস করে দিয়েছিলেন। আমার মৃত্যু সম্পর্কে কিছু জানেন?
—আপনাকে মেরেছিল রাতের অন্ধকারে। আর সেইসময় আপনি প্রধামন্ত্রী ছিলেন না। আপনাকে তো শ্রীলঙ্কার টাইগাররা মেরেছে। ক্ষমতায় থাকার সময় আপনি তো এক গাদা শত্রু তৈরি করেছিলেন। আপনার বন্ধু আর উপদেষ্টারা মোটেই ভালো লোক ছিলেন না। একদিকে পাঞ্জাব, একদিকে শ্রীলঙ্কা, আসাম, কাশ্মীর সব মিলিয়ে কী রাজত্বই আপনি করেছিলেন!
—পাঞ্জাবটা তো আমার মায়ের কীর্তি।
—আর শ্রীলঙ্কাটা এই মহামানবের কীর্তি।
—ইনি কে?
—অযোধ্যার রাজকুমার শ্রীরামচন্দ্র।
—আই সি! যাঁকে নিয়ে আবার নতুন হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। আর এই ভদ্রলোক কে? মোটাসোটা, গোলগাল!
—ইনিও এক একস রাজা। রাজা যুধিষ্ঠির অফ মহাভারত।
—গ্ল্যাড টু মিট ইউ। ভারতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনাদের ইন্টারভিউ আমি বক্স আইটেম করে দেব। হর্ষদ মেটা, স্ক্যাম, শেয়ার কেলেঙ্কারি সম্পর্কে আপনাদের ওপিনিয়ান কী? ড: মনমোহন সিংহের বিদায়-নীতি। গোল্ডেন শেক হ্যান্ড? পশ্চিমবাংলার লেফট ফ্রন্ট গভর্নমেন্ট। ট্রেড ইউনিয়ান, অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। দার্জিলিং-এর গোর্খা আন্দোলন, ঝাড়খণ্ড বিদ্রোহ। ফরোয়ার্ড ব্লকে ভাঙন, তিনবিঘা করিডর। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, কাশ্মীরে পাক জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ, আবার শ্রীলঙ্কা।
যুধিষ্ঠির বললেন, 'এ তো মডার্ন হিস্ট্রি, আমরা হলুম এনসেন্ট হিস্ট্রির মাস্টার।
—তাতে কী হয়েছে! প্রবীণের চোখে নবীন। মনে করুন, আপনারা এখন রাজত্ব করছেন, আপনারা এইসব সমস্যায় কী করতেন। মনে করুন, আপনি আছেন পাঞ্জাবে, শ্রীরামচন্দ্র আছেন উত্তরপ্রদেশে।
যুবাপুরুষ বললেন, তার আগে, আমি হিজ হোলিনেসকে একটা প্রশ্ন করেছিলুম, আপনি সেই সেতুটার কী করলেন। ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা!
সাংবাদিক ট্রাম্পেট বললেন, 'ওয়াজ দেয়ার এ সেতু?'
শ্রীরাম বললেন, 'একটা সেতু আমি তৈরি করিয়েছিলুম।'
—ফ্যান্টাস্টিক! ওই সমুদ্রের ওপর সেতু?
শ্রীরামচন্দ্র বললেন, 'মিথ্যে কেন বলব, ভাই। সারাটা জীবন আমি সত্যের পূজারি।'
অন্তরীক্ষে দুজন মহিলা একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, 'বামাকণ্ঠ? কে হাসছে এই অবেলায়?'
—আমরা মহারাজ। আমি আর পাঞ্চালী।
দুই মহিলা সামনে এগিয়ে এলেন। একজন গৌরী, তিনি সীতা। অন্যজন শ্যামা, তিনি দ্রৌপদী। অপূর্ব সুন্দরী দুই মহিলা।
দ্রৌপদী বললেন, 'ধর্মরাজ আবার পাশা খেলতে বসেছেন বুঝি?'
যুধিষ্ঠির চনমন করে উঠলেন, না পাঞ্চালী। তাস, পাশা সর্বনাশা। ওর মধ্যে আমি আর নেই। আমরা আলোচনা করছি। তোমরা কোথা থেকে এলে?
—আপনি স্বর্গসুখ ছেড়ে এখানে কেন?
—আমি যে-কোনও জায়গায় যেতে পারি। স্বর্গের হোম ডিপার্টমেন্ট আমাকে ইন্টারন্যাশনাল পাসপোর্ট দিয়েছে। তোমরা ওভাবে হাসলে কেন?
জানকী বললেন, 'আমার স্বামীর কথায়। সত্য, সত্য, সত্য। সত্যরক্ষার জন্যে উনি বনবাসে গেলেন। অহংকার। আমি সত্যের পূজারি। আমার শ্বশুরমশাই ছিলেন স্ত্রৈণ। দুর্বল। স্নায়ু বিকারের রোগী। তাঁর পার্কিনসন্স ডিজিজ ছিল। তিনি তাঁর স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্যে বড় ছেলেকে বনবাসে পাঠালেন। সেজো ঠাকুরপো রাজা হবেন।
শ্রীরাম গম্ভীর গলায় বললেন, 'জানকী! এতকাল তুমি কোথায় ছিলে জানি না। কোথা থেকে এলে তাও জানি না। তুমি এসেই একালের মেয়েদের মতো শ্বশুর-শাশুড়ির নিন্দে শুরু করলে। তুমি তো এমন ছিলে না।
—তোমাদের ব্যবহারেই আমরা এমন হয়েছি, মহারাজ! আমি আর আমার এই বান্ধবী পাঞ্চালী, আপনাদের জন্যে অশেষ নিগ্রহ সহ্য করেছি। একজন সত্য রক্ষার অহংকারে বনে গেলেন, অন্যজন জুয়ায় হেরে বনে গেলেন। কী সব গৌরব! আর দুজনেই জড়িয়ে পড়লেন যুদ্ধে। একটা বছর ঝড়ে, জলে, রোদে আমি ঠায় বসে রইলুম রাবণের অশোক কাননে একটা গাছের তলায়। মশার কামড়, মাছির জ্বালাতন। আমাকে ঘিরে বসে আছে একদল হোঁতকা হোঁতকা রাক্ষসী। গায়ে বোটকা গন্ধ, মাথায় উকুন। আমার নড়বার চড়বার উপায় নেই। না করতে পারি চান, না করতে পারি অন্য কিছু। এক বস্ত্রে বসে আছি একবছর।
—জানকী, যদি বলি তোমরাই তোমাদের দুর্ভাগ্যের কারণ!
—এটা কী ধরনের ব্যাখ্যা, মহারাজ?
—জানকী! তুমি জানতে না, সোনার হরিণ হয় না!
—মহারাজ! আপনিও কি জানতেন!
—অবশ্যই জানতুম।
—তাহলে পেছন পেছন দৌড়ালেন কেন?
—তোমার জন্যেই। তুমি নাচালে আমি নাচলুম। তুমি লোভী। তুমি দুর্মুখ। ভ্রাতা লক্ষ্মণকে পাহারায় রেখে গেলুম, তুমি তাকে যা-তা কথা বলে আমাকে খুঁজতে পাঠালে। তুমি এমন কথাও বলতে পেরেছিলে, লক্ষ্মণ ভরতের গুপ্তচর।
—যদি বলি, রাবণের বুদ্ধির কাছে আপনি হেরে গেছেন?
—যদি বলি, রাবণ যাতে তোমাকে হরণ করতে পারে, তার জন্যেই তুমি আমাকে আর লক্ষ্মণকে দূরে সরিয়েছিল। তুমি জানতে, লঙ্কায় প্রচুর সোনা আছে, স্বর্ণলঙ্কা।
—মহারাজ! আপনার মাথায় কোনও কালেই কিছু ছিল না। আপনাকে রাজা রাম না বলে, রামবাবু বলাই ভালো। একটা লোক, যার দশটা হেঁড়ে মাথা, তাকে কোনও মহিলা ভালোবাসতে পারে! সে আবার মানুষ খায়! অশোককাননে একদিন এসে আমাকে প্রেম নিবেদন করছে। যখন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, তখন খেপে গিয়ে বললে, আর দুমাস দেখব, তারপর তোমাকে কাবাব করে খেয়ে ফেলব। এইরকম একটা হাঁড়োলকে কেউ ভালোবাসতে পারে! কিন্তু তোমার এমন জেলাসি! জেলাসি আসে ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স থেকে। সত্যনিষ্ঠ, প্রজাবৎসল রাম, তুমি 'জনগণ', 'জনগণ' করে লঙ্কাবিজয়ের পর আমার সঙ্গে কী ব্যবহারটা করলে! তুমি বিভীষণকে বললে, সীতাকে শির:স্নান করিয়ে দিব্য অঙ্গরাগ ও আভরণে ভূষিত করে নিয়ে এসো। নারী বলে এত হেনস্থা, মহারাজ! সীতাকে শির:স্নান করিয়ে আনতে হবে কেন? না, সীতার দেহ অপবিত্র। পরপুরুষ স্পর্শ করেছে। কলুষিত করেছে। তাই না। এত বড় অপমান রাবণও আমাকে করেনি!
—রাবণ তোমাকে অপমান করবে কেন? তুমি তো পরস্ত্রী। রাবণ এক কামুক, লম্পট। সে তো তোমার পায়ে ধরবে, আদর করবে, উপহার দেবে, রাজত্বের লোভ দেখাবে, রামকে ভিখিরি বলবে, দুর্বল বলবে, কাপুরুষ বলবে।
—রঘুবীর আপনি তামসিক চিন্তায় মলিন হয়েছেন। আপনি অবতার, তবু আপনি মানুষের মন দেখতে পান না। আপনি অশোককাননে সীতা যে সংযম, যে চরিত্রবল দেখিয়েছে, আপনি তা জানেন না, ভাবতে আমার কষ্ট হচ্ছে। সেদিন আপনার মনের নীচতা দেখে আমি নিজেই লজ্জিত হয়েছিলুম। আমি আপনার মন পড়তে পেরেছিলুম। অবতারের মন নয়, সামান্য একজন মানুষের মন। অফিসের কেরানির মন। আপনি ভাবছিলেন, সীতাকে রাক্ষসে ধরেছে। কামুক রাবণ সীতাকে চটকেছে, বলাৎকার করেছে, কি সীতা নিজেই দেহদান করেছে। সীতাকে এতদিন নিজের অধিকারে রেখে রাবণ কি ছেড়ে কথা বলবে? এই চিন্তার বিষে আপনি জর্জরিত হয়েছিলেন। আপনার কাছে প্রেমের চেয়ে সংস্কার বড় হয়েছিল। কুলবধূকে পরপুরুষ হরণ করলে, তাকে আর কুলে ফিরিয়ে আনা যায় না। লোকে কী বলবে, তাই না মহারাজ! একালের কম্যুনিস্ট নেতাদের মতো আপনি 'জনগণ', জনগণ' করে অস্থির হতেন।
যুবাপুরুষ এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন। আর চুপ করে থাকতে পারলেন না, বললেন, 'জনগণ? আপনিও 'জনগণ', 'জনগণ' করতেন। জনগণকে আপনি চেনেন না, আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। আমাকে আঁচড়েছে, কামড়েছে, চুমু খেয়েছে, মালা পরিয়েছে, শেষে কোতল করেছে। জনগণ মানেই লেনেওয়ালা পার্টি। তাদের শুধু দিয়ে যাও। স্কুল দাও, কলেজ দাও, রাস্তা দাও, চাকরি দাও, রেল দাও। খালি দাও আর দাও। আর যেই আমি বোমার ঘায়ে টুকরো টুকরো, ত্রিসীমানায় কেউ নেই। না সিকিউরিটি, না পার্টির লোক। জনগণের ক্যারেক্টার চিরকালই এক। মরার পর বোঝা যায়!'
মিস্টার ট্রাম্পেট বললেন, 'এঁরা কী আলোচনা করছেন? রাক্ষস-টাক্ষস কী বলছেন!' যুবক বললেন, 'রাক্ষস হল একটা ট্রাইব। তারা মুখোশ পরে নৃত্য করে। রামায়ণ না পড়লে আপনি কিছু বুঝতে পারবেন না।'
—হোয়াট ইজ রামায়ণ?
—রামায়ণ ইজ এন এপিক। এই রামচন্দ্র একজন রাজা ছিলেন। কিং অফ অযোধ্যা।
—অযোধ্যা! এখন যেখানে পলিটিক্যাল প্রবলেম তৈরি হয়েছে! সমস্ত পাওয়ার থমকে দাঁড়িয়ে আছে? আই সি! ইনিই সেই রাম! একটা এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ ঝপ করে নিলে কেমন হয়?
—লোকে বিশ্বাস করবে না। এঁরা কোনও একসময় পৃথিবীতে ছিলেন কি ছিলেন না, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। হয়তো পুরোপুরিই গল্পের চরিত্র। ছবিও মনে হয় উঠবে না, কারণ বায়বীয় শরীর।
—তা হলে এঁদের কথা আমরা শুনেছি কেন?
—কারণ আমাদের আর অন্য কিছু করার নেই। পৃথিবীতে আমাদের আর কোনও অস্তিত্ব নেই। আমরা ভূত হয়ে গেছি। মানে অতীত। আমরা ছিলুম, আমরা আর নেই।
দ্রৌপদী বললেন, 'রঘুবীর, আপনার কিছু আদিখ্যেতার জন্যে আমার বান্ধবী সীতাকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল। সেকাল আপনাকে মহৎ করলেও, একালের চোখে আপনি বধূহত্যাকারী এক অপরাধী। আপনি সীতাকে মানসিক নির্যাতন করেছেন। আপনার তুলনায় আমার স্বামীরা অনেক প্রগতিশীল। একগাদা লোকের সামনে সীতাদিকে আপনি কী বলেছিলেন?'
সীতা বললেন, 'এক বছর আমার নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। ভাবছি, উনি ছুটে এসে আমাকে সীতা বলে জড়িয়ে ধরবেন। তার আগে সে কী করুণ গান, কোথায় সীতা, কোথায় সীতা, জ্বলছে বুকে স্মৃতির চিতা।'
রামচন্দ্র বললেন, 'জানকী! ওটা আমার গান নয়। নাট্যকার আমার মুখে ওই গান বসিয়েছেন। আমি জীবনে কখনও গান গাইনি। আমাকে নিয়ে অনেক গান লেখা হয়েছে।'
—আপনার মন ওইরকম একটা গান গাইতে পারে, নাট্যকার সেইরকম ভেবেছিলেন। তাঁর আর কী দোষ! তিনি জানবেন কী করে, আপনি কী ধাতের মানুষ! বিভীষণ ঠাকুরপো যখন এসে আমাকে বললেন, মহারাজের নির্দেশ, বউদি, আপনাকে চান করিয়ে কাপড় বদলে নিয়ে যেতে বলেছেন। আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল, কী, এত বড় কথা! নিজে বসে আছেন তাঁবুতে, আর চেলা এসে বলছে, চান করে, কাপড় ছেড়ে যেতে! আমি রেগে বলেছিলুম, অস্নাত্বা দ্রষ্টুমিচ্ছামি ভর্তারং রাক্ষসেশ্বর। আমি স্নান না করেই স্বামীকে দেখতে যাব।
দ্রৌপদী বললেন, 'ঠিক করেছিলে। ব্লিচিং পাউডার মাখিয়ে চান করাতে বলেনি, এই তোমার ভাগ্য।'
—কিন্তু ভাই, রাক্ষসেশ্বর বিভীষণ আমাকে বোঝালেন, দেবী, দাদা যা চাইছেন, তাই করুন। লঙ্কা জয় করে তাঁর প্রতাপ খুব বেড়েছে, মেজাজ টং হয়ে আছে। যা বলছেন, তাই করুন। স্বামীর কথা অমান্য করতে নেই, দেবী।
—ওই তো মুশকিল। আমরা 'স্বামী-দেবতা', 'স্বামী-দেবতা' করে জীবন বিসর্জন দিলুম, আর আমাদের স্বামীরা স্ত্রীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে গেলেন। আমি সইতে পারি না-বলা কথা, মন নিয়ে ছিনিমিনি সইব না।
—তারপরে শোনো না বাবুর কেরামতি! কতভাবে প্রকাশ্যে অপমান করা যায়? এঁরা হলেন দেবতা! মনে মনে জ্বলছেন। সীতাকে দেখছেন রাবণের খাটে। হনুমানের কাছে শুনেছেন, সীতা কীভাবে গাছতলায় ইটের পাঁজার ওপর মশার কামড়ে বসে আছে। আর ওই বৃষ্টি, সমুদ্রের হাওয়া। কাতারে কাতারে লোক। সবাই মজা দেখতে এসেছে। রাম-সীতার মিলন। বিভীষণ ঠাকুরপো জানতেন, রাজামশাই সকলের সামনে যা-তা কথা বলবেন, তাই তিনি মৃদু লাঠিচার্জ করতে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বামীদেবতা ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, সীতার চেয়ে জনগণ আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয়। নাটকটা ওদের সামনেই হবে। তুমি কার হুকুমে লাঠিচার্জ করছ!
দ্রৌপদী বললেন, 'সেই জনগণ এখন রামচন্দ্রকে মানুষের আদালতে টেনে নিয়ে গেছে। মন্দির হবে কি হবে না। সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছেন শ্রীরামচন্দ্র। আরে, রামচন্দ্র! তা, তুমি যখন সামনে গিয়ে দাঁড়ালে তখন কী হল?'
—চেহারাটা কালো হয়ে গেছে। দূর থেকে দেখছি। সন্দেহের আগুনে পুড়ে গেছে। চারপাশে মানুষের তাণ্ডব। হইচই, রইরই ব্যাপার। সেই ঠেলাঠেলির মধ্যে দিয়ে আমি চলেছি। আমার স্বামীর আদেশ। তাঁর যুক্তিটা কী! বিপদে, দুর্দশায়, যুদ্ধে, স্বয়ম্বরে নারীকে এইভাবেই জনগণের মধ্যে দিয়ে ঠেলাঠেলি করে আসতে হয়। সেইটাই নিয়ম। সীতা ওইভাবেই আসুক আমার কাছে। ভিড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা হতে হতে, পায়ে পায়ে জড়াতে জড়াতে, ঠ্যালা খেতে খেতে। সে কী লজ্জা! কী ভয়ঙ্কর অপমান! আমি মাথা হেঁট করে এগিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে, আত্মহত্যা করি। যেদিন সোনার হরিণের পেছনে দৌড়েছিলেন, সেইদিনই আমার বোঝা উচিত ছিল, মানুষটার মধ্যে কোনও আধ্যাত্মিক শক্তি নেই। কে কী, তা বোঝার ক্ষমতা নেই। রাবণ যে ফাঁদ পেতেছে, এটা ধরতেই পারল না। তুমি কেমন ভগবান? কবি ঠিক ধরতে পেরেছিলেন। রামায়ণে লিখছেন, জনবাদভয়াৎ রাজ্ঞো বভূর্ব হৃদয়ং দ্বিধা। মনে লোক-অপবাদের ভয় ঢুকেছে। হৃদয় দ্বিধাবিভক্ত। সামনে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই জনগণকে শুনিয়ে শুনিয়ে লেকচার শুরু হয়ে গেল। এক বছরের অদর্শনের পর স্ত্রীকে সম্বোধন করছেন, 'ভদ্রে!' ভাবছি, এ কে! আমার স্বামী, না অন্য কেউ। কী বলবেন? 'ভদ্রে! এ যুদ্ধ তোমার জন্যে করিনি।' সে আবার কী! তাহলে কার জন্যে করলে! 'আমার বংশের কলঙ্ক ও অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার বংশের গ্লানি দূর করার জন্যে শত্রুবিনাশ করেছি। তোমার চরিত্র সম্পর্কে আমার ভয়ঙ্কর সন্দেহ জেগেছে।' এর পর সুন্দর একটা উপমা ছাড়লেন, 'চোখের অসুখ থাকলে যেমন আলো সহ্য হয় না, সেইরকম তুমি আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছ, আমার অসহ্য লাগছে। আমার কষ্ট হচ্ছে। রাবণ তোমাকে চটকেছে। কামুকের দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকিয়েছে। অতএব, সীতা, তোমাকে তো আমি ফিরিয়ে নিতে পারব না। আমার মহান বংশের কী পরিচয় দেব? তোমার মতো পরমাসুন্দরীকে রাবণ ছেড়ে কথা কইবে? আমি অনেক ভেবেচিন্তেই তোমাকে বলছি, তুমি যেদিকে খুশি চলে যাও। তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নেই। লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, রাক্ষস বিভীষণ, যাঁর কাছে ইচ্ছে, তাঁর কাছে যাও।' রামচন্দ্রের কথায় সবাই থ মেরে গেল। এ কোন রামচন্দ্র! শত্রুর প্রতি যাঁর এত মমতা, তিনি নিজের স্ত্রীকে এ-সব কী কথা বলছেন? কালান্তক যমের মতো দেখাচ্ছে শ্রীরামচন্দ্রকে। সত্যিই তাঁর চোখের অসুখ হয়েছে। পাপের ছানি পড়েছে। একদিন হেলায় রাজলক্ষ্মীকে ছেড়ে, প্রেমলক্ষ্মী সীতাকে নিয়ে বনে গিয়েছিলেন। হঠাৎ রাজত্বের লোভ এসে গেল। জনগণেশের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
দৌপদী বললেন, 'পড়তেন আমার পাল্লায়। তোমার মতো ভালোমানুষ বলে পার পেয়ে গিয়েছিলেন?'
—মোটেই না। সেই জনসভাতেই আমিও শুনিয়ে দিলুম। বললুম, ইতর লোক যেরকম অসভ্য কথা বলে, তুমিও ঠিক সেই ভাষায় আমাকে অপমান করছ। আরে রামচন্দ্র, তোমার লজ্জা করা উচিত। তুমি যা ভাবছ, আমি তা নই। আমার শরীরে শক্তি থাকলে রাবণের সঙ্গে লড়াই করতুম। দেহটা সে হরণ করেছিল, হৃদয়টা নয়। দেহ সে স্পর্শ করেছিল, হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি। দশরথ-পুত্র, তুমি না কি চরিত্রজ্ঞ! আমার জন্ম, আমার বংশ, আমার চরিত্রের কোনও মর্যাদা দিলে না! আমার ভক্তি, ভালোবাসা, সতীত্ব, সব ঠেলে ফেলে দিলে, মহারাজ! আমাকে কুলটা ভাবলে?
যুধিষ্ঠির বললেন, 'আরে রামচন্দ্র! আপনি মশাই বউয়ের সঙ্গে এইরকম ব্যবহার করেছিলেন! আমার তো জানা ছিল না। কই, আমরা তো পাঞ্চালীর সঙ্গে এইরকম ব্যবহার করিনি। আমরা অনেক বেশি উদার ছিলুম। পাঞ্চালীকে তো রেপ করেছিল!'
শ্রীরাম বললেন, 'আরে, বলবেন কী করে! নিজেরাই তো অপরাধী। প্রথমত একজন মহিলার পাঁচজন স্বামী। তোবা তোবা। শাস্ত্র-বিগর্হিত, অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক। এডস হয়ে গেলে কিছু করার ছিল না। আপনাদের সময় এডস হত। উল্লেখ আছে। ভগবানের ডায়েরিতে রেকর্ড আছে।'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'স্ত্রীর কাছে তিরস্কৃত হয়ে যা-তা বলবেন না শ্রীরামচন্দ্র। ওই মারাত্মক অসুখটা আপনাদের আমলের। একটু লেখাপড়া করলেই জানতে পারতেন। হনুমান আর বাঁদর নিয়ে বেশি মাতামাতি করলেই ওই রোগে ধরবে। আফ্রিকার বাঁদরেই ওই ব্যামো আছে।'
—আপনার কোনও জ্ঞানই নেই, ধর্মরাজ। আফ্রিকার বাঁদর আর ভারতের বাঁদর অনেক তফাত। ভারতের হনুমান বুক ফাঁড়লে দেখবেন ভেতরে রাম, লক্ষণ, সীতার অ্যালবাম। পান-বিড়ির দোকানের ক্যালেন্ডার চোখে পড়েনি! রামভক্ত হনুমান বুকের জিপ-ফাস্টনার খুলে ছবি দেখাচ্ছে। এডস হল মহাভারতের অসুখ। আপনাদের সময় সেক্সটা যা বাড়িয়ে ছিলেন। ফ্রি-সেক্স মানেই এডস। কেউ দাসীপুত্র, কেউ রাজপুত্র, মুনি-ঋষিরাও নারী দেখলে খেপে যেতেন। গান্ধারী আবার সাপের মতো ডিমের থলি পেড়ে বসলেন। একশোটা বাচ্চা বেরিয়ে এল। আপনার পিতার আবার হার্ট ডিজিজ ছিল। সঙ্গম করলেই মৃত্যু হবে। ধর্ষণ, হরণ, জয়া, মৃগয়া, এই তো আপনাদের কালের কেচ্ছা। স্বর্গের বারাঙ্গনারা থেকে থেকেই নেমে আসত পৃথিবীতে। আপনাদের এক-একজনের তিন-চারটে বিয়ে। আপনার দুই বউ। ভীমের চার বউ। অর্জুনের চার বউ। তার মধ্যে উলুপীকে বিবাহিত স্ত্রী বলা যাবে না। রক্ষিতা। নকুলের দুই বউ। সহদেবের আবার চার বউ। এই হিসেবে দ্রৌপদী কমন। তিনি আবার সকলের বউ। দ্রৌপদীকে বাজি ধরলেন। সভায় টেনে এনে কামড়া-কামড়ি, আঁচড়া-আঁচড়ি। দ্রৌপদী তো আপনাদের দাসী, স্লেভ। তাঁকে নেওয়া না-নেওয়ার প্রশ্ন আসে কী করে! আমার রঘুবংশ, আর আপনাদের পাণ্ডববংশে অনেক তফাত। আপনাদের পুরো ব্যাপারটাই তো গোলমেলে। সন্দেহজনক, বিতর্কিত। এক-একজনের এক এক বাবা। আপনার মা আবার কুমারী অবস্থায় গর্ভবতী হলেন। প্রসূত সন্তানকে দিলেন জলে ভাসিয়ে। কোনও মা এমন কাণ্ড করতে পারেন?'
—আর আপনার মা, আপনাকে সস্ত্রীক বনে পাঠিয়ে দিলেন।
—আমার নিজের মা নয়, সৎ মা।
—আমারও সৎ-মা ছিলেন।
—তিনি আপনার পিতার সঙ্গে সহমরণে গিয়েছিলেন। লজ্জা ঢাকতে। বেঁচে থাকলে কী হত বলা শক্ত। আপনার পিতার মৃত্যু অত্যন্ত লজ্জাজনক অবস্থায় হয়েছিল। দৃশ্যটা ভাবা যায় না।
—আর আপনার পিতা! তাঁর তো সাড়ে তিনশো বউ ছিল। কৈকেয়ীর প্রেমে মজে আপনার মাকে দুয়োরানি করেছিলেন। কৈকেয়ীর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছেন আপনার অভিষেকের আগের রাতে। অন্ধকার ঘর। মেঝেতে বসে আছেন রাজা দশরথ। কোলে কৈকেয়ীর মাথা। এলো চুলে হাত বোলাচ্ছেন! মান ভাঙাচ্ছেন পাটরানির। বড় কড়া যৌবন। সুন্দরী, সর্পিণী। দেহের ভাঁজে ভাঁজে, খাঁজে খাঁজে স্ত্রৈণ দশরথকে বেঁধে ফেলেছেন। কামের অক্টোপাস। দুটি বর চাইবেন তিনি। ভরত হবে রাজা। রাম যাবেন বনবাসে। রাজা তাঁর মেয়ের বয়সি মহিষীর পায়ে ধরবেন। পায়ে মাথা খুঁড়বেন। রানি তুমি অন্য বর চাও। আর অন্য বর! রাজা তাঁকে আদর দিয়ে মাথায় তুলেছেন। কোশল থেকে অনেক দূরে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিপাশা আর শতদ্রু নদীর মাঝখানে গিরিব্রজ বা কেকয় রাজ্য। স্বাধীন, পরাক্রান্ত রাজা অশ্বপতি। সেই রাজার একমাত্র কন্যা কৈকেয়ী। আদরের দুলালী। কখনও কোনও শাসন পায়নি। আত্মসংযম শেখেনি। একদিকে অসামান্য রূপ, অন্যদিকে কোনও শিক্ষা নেই। অশিক্ষিতা সুন্দরী। রাজার আদরে, প্রশ্রয়ে স্বেচ্ছাচারী। রাজা দশরথ সেই মেয়েকে দেখে উন্মাদ হয়ে গেলেন। বিয়ে করবেন। অশ্বপতি বললেন, একটাই শর্ত, পণ দিতে হবে। কী পণ? রাজ্যশুল্ক। অর্থাৎ কৈকেয়ীর ছেলেকে রাজত্ব দিতে হবে। রাজা তখন কৈকেয়ীর জন্যে পাগল। ওই শরীর, ওই চুল, ওই রং, ওই যৌবন। রাজা দশরথ ওই শর্তেই রাজি হয়ে গেলেন। যেভাবেই হোক কৈকেয়ীকে বিছানায় চাই। ক্ষিপ্ত রাজা।'
—আমি প্রতিবাদ না করে পারছি না। আপনি অশালীন ভাষায় আমার প্রয়াত পিতাকে অসম্মান করছেন, ধর্মরাজ।
—প্রয়াত? আমরা সবাই অতীত। বর্তমানে পড়ে আছে আমাদের কাহিনি, আমাদের কৃতকর্ম। আমার পিতাকেও আপনি কম অসম্মান করেননি।
—আপনার পিতা আর আমার পিতা দুজনেই কামুক ছিলেন। স্ত্রীলোকই তাঁদের বিনাশের কারণ। মাদ্রীদেবী আপনার পিতার মৃত্যুর কারণ, কৈকেয়ী আমার পিতার মৃত্যুর কারণ।
—মাদ্রীর কোনও অ্যাম্বিশন ছিল না, কেবল একটু দেহসুখ চাইতেন। তাঁর ছেলে রাজা হবে, এমন বাসনা তাঁর ছিল না। কৈকেয়ী তাঁর মায়ের স্বভাব পেয়েছিলেন। অশালীন, উদ্ধত, নিষ্ঠুর, ত্রূর, খল। দশরথ যখন পায়ে মাথা খুঁড়ছেন, বলছেন, কৈকেয়ী, আমার সর্বনাশ কোরো না, আমার বড় খোকাকে বনবাসে পাঠিয়ো না, তখন তিনি কী বলছেন, দাঁতে দাঁত চেপে। বলছেন, রাজা! আমার দেহে মজে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সেই প্রতিজ্ঞা এখন অস্বীকার করতে চাইছেন? লোকের কাছে ধার্মিক বলে পরিচয় দেবেন কী করে? এতকাল মধু খেলেন আর পাওনাগণ্ডা দেওয়ার সময় পায়ে ধরা। পা থেকে মাথা তুলুন। যা চাইছি, তা দিন। স্মরণ করুন, রাজা অলক সত্যরক্ষার জন্যে নিজের দুটো চোখ উপড়ে দিয়েছিলেন। মহারাজা শিবি সত্যরক্ষার জন্যে নিজের শরীরের মাংস শ্যেন পক্ষীকে দিয়েছিলেন। আপনি যদি সত্যরক্ষা না করেন আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব। কৌশল্যা হবে রাজমাতা, এই দেখার আগে আমার মরণ ভালো। আমি বুঝতে পেরেছি, আমাকে আর আপনার ভালো লাগছে না। আপনার এখন অন্য মধু চাই। রামকে রাজা করে কৌশল্যার সঙ্গে বিহার করবেন। তার আগে আপনার সামনেই আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব।
দ্রৌপদী বললেন, 'ধর্মরাজ! মেয়েদের আপনারা মানুষ বলেই মনে করেন না। কৈকেয়ী বেচারার নামে যা খুশি তাই বলে যাচ্ছেন। জেনে রাখুন, নারী-স্বাধীনতা, নারী-প্রগতির যুগ পড়েছে। নারীকে আর গরু ভাবা চলবে না। আমরাও আপনাদের সমালোচনা করব। পতিদেবতা বলে পাদোদক খাব না। কৈকেয়ী ঠিকই করেছিলেন। রাজা দশরথের কীর্তি আপনি জানেন। রাজা তো নির্বীষ ছিলেন। সাড়ে তিনশো বউ, একটিও ছেলে নেই। শেষে পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করলেন। যজ্ঞচরু রানিদের মধ্যে বিতরণ করবেন দশরথ। কিন্তু কী পক্ষপাত! পায়সের অর্ধেকটা দিলেন কৌশল্যাকে। বাকি অর্ধেক দু'ভাগ করে তার একভাগ দিলেন সুমিত্রাকে। অর্থাৎ সমগ্রের একের চার অংশ। বাকিটা তো কৈকেয়ীকেই দেওয়ার কথা। তা কিন্তু দিলেন না। সেটাকে আবার দু'ভাগ করে এক ভাগ দিলেন কৈকেয়ীকে। তার মানে কৈকেয়ী পেলেন একের আট অংশ। দশরথের হাতে তখনও যজ্ঞের চরু রয়েছে। ভাবছেন কাকে দেবেন! কৈকেয়ীকে? দ্বিধা, দ্বন্দ্ব। কৌশল্যার বলিষ্ঠ সন্তান হোক। সেই রাজা হবে। কৈকেয়ীর সঙ্গেই রাত কাটান। সে সহচরী কিন্তু তার ছেলে যেন রাজা না হয়। কৈকেয়ীর পিতাকে সন্দেহ। শক্তিশালী শত্রুরাজ্য। শ্বশুর অশ্বপতি ক্ষতি করতে পারেন। কৈকেয়ীর সঙ্গে ফূর্তি করব, কিন্তু তাকে কোনও কিছুর অধিকার দেওয়া চলবে না। সে স্ত্রী হয়েও রক্ষিতা। চরুর শেষ ভাগটুকু তিনি সুমিত্রাকে দিয়ে দিলেন। তা হলে কী দাঁড়াল। কৌশল্যা খেলেন অর্ধাংশ, তিনের আট অংশ সুমিত্রা, আর কৈকেয়ী মাত্র একের আট অংশ। কেন? এইরকম দুই দুই করার কারণ? তুমি শুধুই আমার নর্মসহচরী। অশ্বপতিকে যদি অতই ভয়, তা হলে তার মেয়েকে তুমি বিয়ে করেছিলে কেন? স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার যদি নাই দেবে, তা হলে রাতের পর রাত তাকে ভোগ করলে কোন বিচারে? কোন আক্কেলে? নারী কি ভোগ্যপণ্য? গায়ে মাখার সাবান? মাথায় মাখার তেল? রাজা দশরথ, তোমার মৃত্যুবাণ তুমি নিজেই তৈরি করেছিলে। তুমি ওপরচালাকি করে, সাত তাড়াতাড়ি রামকে রাজা করতে গেলে। ভরত তখন রাজ্যের বাইরে। ভরত যেন কত বড় শত্রু। ভরত থাকলে রামকে সিংহাসন থেকে ফেলে দেবে। অভিষেকের আগের রাতে রামকে বললেন, খুব সাবধান! শত্রুপক্ষ সদাতৎপর। রামচন্দ্রের চারপাশে সিকিউরিটি গার্ড বসে গেল। শত্রু কে? কৈকেয়ী, ভরত, ভরতের মামার বাড়ি। অতি চালাকের গলায় দড়ি! ভরত থাকলে এই কেলেঙ্কারিটা হত না। ভরত তার মাকে ঠিক কব্জা করে ফেলত।'
সীতা বললেন, 'ভরত ঠাকুরপো খুব সুন্দর ছেলে ছিল। প্রকৃত ধার্মিক, দাদা-অন্ত প্রাণ। রাজা হওয়ার লোভ ছিল না। নিজের মাকে তার স্বভাবের জন্যে ঘৃণাই করত। অযোধ্যা থেকে দূত গেছে ভরতের কাছে। ভরত সকলের কুশল সংবাদ নিচ্ছে। সব শেষে জিগ্যেস করছে—আত্মকামা সদাচণ্ডী ক্রোধিনা প্রাজ্ঞমানিনী। অরোগা চাপি মে মাতা কৈকেয়ী কিমুবাচ হ।। উগ্রচণ্ডী স্বার্থপর আত্মবুদ্ধিতে অহঙ্কারী আমার মা কেমন আছেন? সেই ভরতকে শ্বশুরমশাই তো সন্দেহ করতেনই, আমার স্বামীও তাঁকে ভালো চোখে দেখতেন না। আমাকে বলেছিলেন, ভরতের সামনে তুমি আমার প্রশংসা কোরো না। সমৃদ্ধিশালী মানুষ অন্যের প্রশংসা সহ্য করতে পারে না। আবার লঙ্কা-বিজয়ের পর অযোধ্যায় ফেরার আগে হনুমানকে বলছেন, তুমি আগে যাও, গিয়ে ভরতকে আমার খবর দিয়ে খুব ভালো করে তার চোখ-মুখ লক্ষ্য করবে। তার হাবভাব দেখবে। তার মনের ভাব পড়ার চেষ্টা করবে। পৈতৃক রাজ্য হাতে পেলে মনের ভাবের পরিবর্তন হওয়া খুব স্বাভাবিক। সেই সন্দেহ। রামচন্দ্রকে বনবাস থেকে অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ভরত আসছে চিত্রকূটের অরণ্যে। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনে নির্জনে শিলাসনে বসে গল্প করছি। হঠাৎ সমস্ত বনভূমি শব্দে কোলাহলে কেঁপে উঠল। গাছের ডাল থেকে পাখিরা সব ভয়ে উড়ে পালাচ্ছে। রামচন্দ্র লক্ষ্মণ ঠাকুরপোকে বলছেন, 'দেখ তো কীসের শব্দ। সারা বনভূমি এমন ভয়ার্ত হয়ে উঠল কেন! কোনও রাজা অথবা রাজপুত্র কি শিকারে এসেছেন।' ঠাকুরপো তরতরিয়ে একটা শালগাছে উঠে পড়লেন। সে কী ভয়! গাছের ওর থেকে চিৎকার করে বলছে, 'রান্নাঘরের আগুনে জল ঢোল দাও, বউদি।' তুমি গুহার মধ্যে লুকিয়ে পড়ো। রাঘব, আপনি কবচ ধারণ করুন। ধনুর্বান হাতে নিন। যুদ্ধ, যুদ্ধ। রাম বলছেন, 'কী দেখছিস, সেটা রিলে কর না।' 'রথ আসছে রথ। সঙ্গে বিশাল সেনাবাহিনী। রথের মাথায় উড়ছে কোবিদারধ্বজা। অযোধ্যার রাজপতাকা। সামনেই শত্রুঞ্জয় হাতিটা। সে তো রাজা দশরথের প্রিয় হাতি। রথ, ঘোড়া, হাতি, হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে সে আসছে, আমাদের হত্যা করতে। কে সে? ভরত। যার জন্যে আমাদের এই বনবাস, সেই ভরত আসছে এইবার আমাদের বধ করতে। ঠাকুরপোর সে কী আস্ফালন! আসুক চিত্রশত্রু ভরত। আমিই তাকে বধ করব। কৈকেয়ী রাজমাতা হতে চেয়েছিল। এইবার তার ডেডবডি অযোধ্যায় ফেরত যাবে। কুব্জা মন্থরা আর কুটিল কৈকেয়ীকেও আমি শেষ করব। চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাব। শত্রু ভরতকে বধ করলে ভ্রাতৃহত্যার পাপ হবে না। ভরতকে কচুকাটা করে আজ আমি আমার ধনুর্বানের ঋণশোধ করব।' হই হই ব্যাপার! ভরত ঠাকুরপো আসছেন হাতে পায়ে ধরে দাদাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, আর দুই ভাই নৃত্য করছেন, 'মেরে ফেললে', 'মেরে ফেললে' বলতে বলতে। কী লজ্জার কথা! ভরত ঠাকুরপো দাদার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। ফিরে চলুন অযোধ্যায়। ফিরবেন কেন? তা হলে যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। রাবণও আর আমাকে ধরতে পারে না। হনুমান, বাঁদর নিয়ে লড়াইও করতে হয় না। চিরটা কাল সেই এক গোঁ। ডাইনে যেতে বললে বাঁয়ে যাই। আর, সত্য সত্য পিতৃসত্য!'
দ্রৌপদী বললেন, 'সব স্বামীই সমান। আমার ওটি তো সারাজীবন 'ধর্ম ধর্ম' করে লাফালেন। লম্ভ-ঝম্ভ করে লাভ কী হল? ভারত থেকে ধর্মটাই চলে গেল। নিজের কোলে ঝোল টানাটাই হল পরম ধর্ম।'
সীতা বললেন, 'ঠিক সেই সময় আমার শ্বশুরের পুরোহিত মন্ত্রিমণ্ডলীর অন্যতম ঋষি জাবালি এসে বললেন, রাম, গোটা অযোধ্যা তোমার জন্যে একবেণীধরা শোকাতুরা রমণীর মতো অপেক্ষা করছে। তুমি ফিরে চলো। রাজ সিংহাসনে বসো। পিতৃসত্য, পিতৃসত্য কোরো না। পুরুষার্থভোগে উদাসীন থেকে নিজেকে রাজসুখে বঞ্চিত কোরো না। তোমার এই পিতৃসত্য পালনের যুক্তি আমি বুঝি না। একটা অর্থহীন আদর্শকে আঁকড়ে ধরে আছ। ভেবে দ্যাখো, কে কার পিতা? মানুষ একা জন্মায়, একা মরে। বাপ, মা, ভাই, বোন এই সম্পর্ক নেহাত একটা মনগড়া, লৌকিক সংস্কারমাত্র। পৃথিবীতে কে কার? আজ আছি, কাল নেই। মনে করো, তুমি এক দূরপথের পথিক। গ্রামের পথে চলেছ। যেতে যেতে রাত নেমে এল। পথের ধারে একটা কুঁড়েঘরের দাওয়ায় রাতটা কাটালে। পরের দিন সকালে উঠে আবার চলে গেলে। পিতা, মাতা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও সেইরকম দু'দণ্ডের সম্পর্ক। এর কি কোনও মূল্য আছে, রঘুবীর? তুমি বলবে, পিতা জন্মদাতা। বৎস! সে তো একটা জৈবিক ব্যাপার। তোমার কথা ভেবে তো তাঁরা মিলিত হন না। নিজেদের উত্তেজনাই সন্তানের জন্মের কারণ। পিতামাতা নিমিত্ত মাত্র। নারীগর্ভে শুক্র ও শোণিতের উপাদানই কারণ। অতএব তাদের প্রতি তোমার কীসের দায়িত্ব? শ্রাদ্ধ দান যজ্ঞ পূজা এ সবেরই বা কি প্রয়োজন? সময়, অর্থ, সামগ্রীর অপচয়। ইহলোকই সব। পরলোক বলে কিছু নেই, রামচন্দ্র। সত্য, ধর্ম, তপস্যা—এ সব নিছক শাস্ত্রকথা। একদল চতুর, বুদ্ধিমান মানুষ লোক ঠকাবার জন্যে যত শাস্ত্র লিখেছে। সুতরাং বাস্তববাদী, চতুর মানুষের মতো তুমি ভরতের কথা শোনো। অযোধ্যায় ফিরে চলো। রাজা হয়ে রাজ্যশাসন করো। জাবালির কথা শতকরা একশো ভাগ খাঁটি। কেউ কারো নয়। সে তো আমিই হাড়ে হাড়ে বুঝলুম কয়েক বছর পরে। যাঁর সঙ্গে রাজ্য ঐশ্বর্য ছেড়ে বনে এলুম, জোঁক, সাপ, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, রাক্ষস, বনমানুষ সব উপেক্ষা করে সাহসে বুক বাঁধলুম। রাবণের রাজপ্রাসাদ, সোনার পালঙ্ক, দাসদাসী ছেড়ে গাছের তলায় পড়ে রইলুম একবস্ত্রে, লাল পিঁপড়ে, কাঠ পিঁপড়ের কামড় খেয়ে, তিনি একপাল লোকের সামনে হেঁকে বললেন, সীতা, তুমি কলঙ্কিনী, তুমি আমার নেত্রপীড়ার কারণ। রাবণ তোমাকে ধর্ষণ করেছে। লক্ষ্মণ ঠাকুরপোকে বললুম, জ্বালাও আগুন, আমি আত্মহত্যা করব। লক্ষ্মণ ঠাকুরপো রেগে দাদার দিকে তাকাচ্ছে। দাদা তো পাবলিকের কথা ভাবেন না, তিনি তাঁর রিপাবালিকের চিন্তায় বিভোর। প্রজাতন্ত্রী শ্রীরামচন্দ্র। বউ পুড়ে মরুক, কোনও দু:খ নেই। জনগণ যেন সন্তুষ্ট থাকে। তিনি পাথরের মূর্তির মতো বসে রইলেন, চিতা জ্বলে উঠল। আমি আমার একবগ্গা স্বামীকে একটা সেলাম ঠুকে মারলুম ঝাঁপ।
দ্রৌপদী বললেন, 'শ্রীরামচন্দ্র তখন নিশ্চয় হায় হায় করে উঠলেন।'
—ঘোড়ার ডিম! পলিটিক্যাল লিডারদের হৃদয় বলে কিছু থাকে কি! তোমার পাঁচ কর্তাকে তো দেখলে। তোমার শাড়ি ধরে টানাটানি করছে উল্লুকে আর পাঁটা মদ্দ বসে আছে মাথা নীচু করে। একজন সাত ফুট লম্বা, বুকের ছাতি চুরাশি ইঞ্চি। আস্ত একটা ছাগলের কাবাব খান। হিড়িম্বা যার বউ। তিনি হাঁ করে দেখছেন। আর একজন চাকার মধ্যে ঘুরন্ত মাছের চোখে তির মারেন। তিনিও বসে রইলেন। সবাই যেন একালের বঙ্গবাসী। পাতাল রেলের কালীঘাট স্টেশানে একটি মেয়ের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করছে দু:শাসন, কোনও প্রতিবাদ নেই। সব পাশ কাটিয়ে পালাচ্ছে। শেষে এক মহিলা রুখে দাঁড়াল। ধর্ম হচ্ছে ধর্ম। অধর্মে আবার ধর্ম কী! তুমি বসে আছ জুয়ার আসরে মাস্তানদের সঙ্গে, আর বলছ ধর্ম। এমন ধর্মের মুখে আগুন! ওই যে, মাস্তানদের সঙ্গে নেতাদের আঁতাত। সভায় তো সরকার পক্ষের সকলেই ছিলেন। এমন কী মহামতি ভীষ্মও ছিলেন। দলের লোক, কিছু তো বলা যাবে না। বললেই পেনসান বন্ধ হয়ে যাবে। পার্টি থেকে বহিষ্কার। আমার কর্তা রিপাবলিকের পাবলিকদের মধ্যে গেঁট হয়ে বসে রইলেন বাহাদুরের বাচ্চা হয়ে। পাবলিক দাঁড়িয়ে রইল আগুনের খেলা দেখার জন্যে।'
—কিন্তু, তুমি তো আগুনে পুড়লে না।
—কে বলেছে! আমি কি বম্বে ছবির স্টান্টম্যান। অ্যাসবেস্টাসের জ্যাকেট পরা না থাকলে আগুন থেকে বাঁচা যায়! আগুন পাপী, পুণ্যবান সকলকেই দহন করে। চিতায় চাপালে দুর্যোধন, দু:শাসন, বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য সবাই যাবেন ভাই। আমিও চড়বড়িয়ে পুড়ে গেলুম।
—কিন্তু, সে যুগে অনেক অলৌকিক ব্যাপার হত। যেমন অর্জুন তীর মেরে পিতামহকে জল খাইয়েছিলেন।
—বিজ্ঞানের বাইরে কিছু নেই। অর্জুন প্লাম্বিং জানতেন, একটা ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে দিয়েছিলেন।
—তা হলে আর একটা সীতা কোথা থেকে এল, তার ছেলে হল?
—কিছুই হল না। ওইটাই রামায়ণের গল্প। উত্তরকাণ্ডটা পূর্বকাণ্ডের সঙ্গে মেলে না। টেলি সিরিয়ালেও উত্তরকাণ্ডটা পাবলিক খায়নি। যুদ্ধ শেষ, আমি শেষ, রামচন্দ্র শেষ, রামায়ণ শেষ। পড়ে রইল আমার উত্তরাধিকার। ঘরে ঘরে বধুহত্যা অথবা আত্মহত্যা। গায়ে কেরোসিন ঢালছে, দেশলাই কাঠি মারছে। আর মেয়েরা সেমিনার করছে, নারী-স্বাধীনতা, নারীমুক্তি, পণপ্রথার বিরোধিতা। পুরুষশাসিত সমাজে নারীমুক্তি অসম্ভব। বাড়িতে বেড়াল থাকলে ইঁদুরকে মরতেই হবে। বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা যায় না। বিবেকের ঘণ্টা, মানবতার ঘণ্টা। আর ইঁদুর কোনওদিন বেড়াল হতে পারবে না। হঠাৎ কোথা থেকে একটা লোক তিড়িং করে সামনে লাফিয়ে পড়ল। হাত ছুঁড়ছে, পা ছুঁড়ছে, মুখে নানারকম শব্দ করছে। যুধিষ্ঠির বললেন, 'এটা আবার কে? রামবাবু আপনার কিষ্কিন্ধার কেউ নয় তো!'
—আমার কেউ নয়, তাদের লেজ ছিল।
—সাংবাদিক ট্রাম্পেট সাহস করে জিগ্যেস করলেন, 'হু আর ইউ?' লোকটি বললে, 'চিনতে পারছ না সায়েব! আমি ব্রুস লি।'
—ব্রুস লি? গুড হেভেনস। সেই ক্যারাটে, কুংফু এক্সপার্ট!
—ইয়েস। আমি এই মহিলা দুজনের কথা শুনে নেমে এলুম।
—কেন ভাই? তুমি এঁদের কোন উপকারে লাগবে?
—ক্যারাটে আর কুংফু এই হল নারীমুক্তির একমাত্র পথ। দৌপদী যদি ক্যারাটে জানতেন, তাহলে দু:শাসন ওইখানেই কাত হয়ে যেত। চোখে দুটো আঙুল গুঁজে দিয়ে দুর্যোধনকে ধৃতরাষ্ট্র করে দেওয়া যেত। সীতা যদি ক্যারাটে জানতেন, রাবণ তাঁকে কিডন্যাপ করতে পারত না। আমার কথায় যদি বিশ্বাস না হয়, আমি শ্রীরামচন্দ্র ও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির দুজনকে একসঙ্গে চ্যালেঞ্জ করছি। দুজনেই তো বিরাট যোদ্ধা।
দুজনেই একসঙ্গে বললেন, 'আমরা যুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছি, ভাই, বহুকাল।'
ব্রুস লি বললেন, 'ম্যাডাম, তাহলে আপনারা আমার স্কুলে ভরতি হয়ে যান? তিন বছরেই ব্ল্যাক বেল্ট পাইয়ে দেব।'
সীতা বললেন, 'সেটা কী জিনিস?'
—এই ডিগ্রি, ডিপ্লোমার মতোই একটা ব্যাপার। আমার ফিল্ম একটা দেখলেই আপনারা বুঝতে পারতেন, ক্যারাটে কী জিনিস? জেমস বন্ডের ছবিতে আছে, মেয়েছেলে ক্যারাটে করে সব কাত করে দিচ্ছে। এই বিদ্যা আয়ত্তে থাকলে স্বামীরা সব বশে থাকবে। স্বামীর বন্ধু, শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা আর রেপ করতে পারবে না। শ্বশুর, শাশুড়ীরা বধূ-নির্যাতনে সাহসী হবে না। কেরোসিন তেলে চান করে দেহাগ্নির প্রয়োজন হবে না। স্কুল, কলেজে যাওয়ার পথে রকবাজদের অশ্লীল মন্তব্য শুনতে হবে না। বাসে-ট্রামে-ট্রেনে দামড়া পুরুষদের হাতকে শাসন করা যাবে। এমন কী পুলিশ বা সেনাবাহিনীর লোকও যদি ধর্ষণ করতে আসে, মহড়া নিতে পারবেন। 'বাঁচাও বাঁচাও', বলে অসহায়ের মতো চিৎকার করতে হবে না। চিৎকার করলেও মাস্তানদের ভয়ে কেউ বাঁচাতে আসবে না। বানতলা করে ছাড়বে। আদালতে সাক্ষীও জুটবে না। আপনারা কিছু মনে করবেন না, একটা শব্দ বলছি, সেটা ছাড়া পুরুষদের ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই কমবে না। শব্দটা হল পেঁদানি। প্লেন অ্যান্ড সিম্পল বেধড়ক ধোলাই। উঠতে বসতে ঠেঙাও। এই যে দুই মহিলা, সীতা আর দ্রৌপদী, এঁরা যদি দজ্জাল স্ত্রী হতে পারতেন, তাহলে এঁদের স্বামীরা পায়ের তলায় পড়ে থাকতেন। যেমন কালীর পায়ের তলায় শিব!
সীতাদেবী বললেন, 'যেমন কৈকেয়ীর পায়ে ধরেছিলেন দশরথ।'
—রাইট।
—কৈকেয়ী তাঁর যৌবন দিয়ে, তাঁর ঝাঁঝ দিয়ে দশরথকে অ্যায়সা কবজা করেছিলেন, বউয়ের মুখের ওপর ট্যাঁ ফোঁ করার সাধ্য ছিল না।
—আমেরিকায় একে বলে পুসি ফ্লগিং।
—সে আবার কী?
—একটা অসভ্য কথা, মানে যৌনতা দিয়ে মানুষকে ভেড়ুয়া করা। আমাকে না দিলে তোমাকে আমার দেহ ছুঁতে দেব না।
—রাইট, রাইট। কৈকেয়ী সেই টাইপের মেয়ে।
—একেবারে মর্ডান টাইপ।
—রাজা দশরথ সারাটা রাত কৈকেয়ীর ঘরে বসে রইলেন। রাজ্যপাট সব দান হয়ে গেল। ভরতের সিংহাসন পাকা। একদিকে এই নাটক, অন্যদিকে শ্রীরামচন্দ্র আর আমি উপোস করে পড়ে আছি। অধিবাস। কাল হবে অভিষেক। রাজবাড়িতে সানাই বাজছে। অভিষেকের আয়োজন কমপ্লিট। কুশ পুষ্প দধি দুগ্ধ। ঘৃত সমিধ ব্যাঘ্রচর্ম। স্বর্ণ-মাল্যভূষিত সুলক্ষণ বৃষ, শ্বেত অশ্ব, মদমত্ত হস্তী। আরাত্রিকের জন্য যবাঙ্কুর নবপল্লব। মণিরত্নের নানাবিধ দক্ষিণাসম্ভার। বাদ্যবাদিত্র হাতে সালঙ্কারা সুন্দরী বারবণিতাগণ। মাঙ্গলিক আচারে নিরতা আয়তীবৃন্দ। উপহার হস্তে অপেক্ষমাণ প্রজাগণ। সব আয়োজন রেডি। ঝলমলে সকাল। আমার স্বামী রাম রাজা হবেন। আমি হব রাজরানী। সে কী টেরিফিক আনন্দ। সোনার পালঙ্কে বসে আছি।
আমেরিকান সাংবাদিক বললেন, 'সোনার পালঙ্ক! ভারতে তখন এত সোনা ছিল! গেল কোথায়! এখন থাকলে টাকার দাম এত কমাতে হত না। পাউন্ড এখন চৌষট্টি টাকা।'
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'সব গয়না হয়ে লকারে ঢুকে গেছে।'
যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন, 'রাজা দশরথ কি আমাদের চেয়ে বড়লোক ছিলেন!'
শ্রীরাম বললেন, 'অফকোর্স! তিনি তো রেস বা জুয়া খেলতেন না। তা ছাড়া তাঁর শকুনির মতো কোনও শ্যালক ছিল না। একশোটা বঙ্কা টাইপের জাড়তুতো ভাই ছিল না। তিনি রাজা হয়েও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। প্রজাদের পরামর্শ নিয়ে রাজ্যশাসন করতেন। যুদ্ধবিগ্রহ ছিল না, ফলে ওয়ার একসপেন্ডিচার কম ছিল। আপনাদের জীবন তো মশাই অজ্ঞাতবাসে, অরণ্যে আর কুরুক্ষেত্রের ক্যাম্পে কেটেছে। যুদ্ধের খরচে তো দেউলে হয়ে গিয়েছিলেন!'
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'মিস্টার চন্দ্র!'
রাম ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, 'চন্দ্র মানে? আমার নাম রামচন্দ্র।'
—আপনার টাইটেলটা কী? রাম হল ফার্স্ট নেম, চন্দ্র হল মিডল, সারনেমটা কী!
—ইক্ষ্বাকু।
—ইকশাকু। জাপানি টাইটেল!
—না রে বাবা! পিওর ভারতীয়। কৌশলো নাম মুদিত: স্ফীতো জনপদো মহান। নিবিষ্ট সরযূতীরে প্রভূত ধনধান্যবান। অর্থাৎ সরযূ নদীর তীরে কোশল নামে এক দেশ। বিশাল আয়তনের মহতী সমৃদ্ধিশালী ধনধান্যবান সতত সুখের অযোধ্যা নগরী। এইবার সেখানে কী হল! ইক্ষ্বাকুবংশপ্রভাবা রামো নাম জনৈ: শ্রুত:। নিয়তাতনা মহাবীর্যো দ্যুতিমান ঋতীমান বশী। অর্থাৎ ইক্ষ্বাকুবংশে রাম জন্মালেন।
—তা এই অযোধ্যা কি সেই অযোধ্যা!
—সে আপনার পণ্ডিতরা বলতে পারবেন।
—দুটো বড় বড় জিনিস আপনি চৌপাট করে দিয়েছেন। এক হল, ইন্ডিয়া লঙ্কা ব্রিজ। দুই হল আপনার প্যালেসটা। এখন এক খণ্ড জমি নিয়ে কী ফাটাফাটি! আপনার জন্মভূমি নিয়ে কোর্ট কাছারি, হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট। রাজনীতির জলঘোলা। যাক, আপনি এখন রাজনীতিওয়ালাদের খপ্পরে পড়েছেন। এই নিয়ে দুবার হল। মহাত্মাজি আপনাকে ধরেছিলেন। রামধুন গাইতেন, রঘুপতি রাঘব রাজারাম। বাংলাদেশের তার আবার প্যারডি হল, রঘুপতি রাঘব রাজারাম, বাজারে জিনিসের কেন এত দাম! যাক, সে আপনার ব্যাপার। আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করে লঙ্কাওয়ারে আপনার কত খরচ হয়েছিল? কারণ আমিও তো লঙ্কাওয়ার চেয়েছিলাম।
—আমার বলা চলে বিনাপয়সার যুদ্ধ। কায়দাটা এমন করেছিলুম যুদ্ধের ইতিহাসে অভিনব। কয়েকলক্ষ বাঁদর আর হনুমান। অস্ত্র হল পাথর আর গাছ। গাছ উপড়ে মারো আর বড় বড় পাথর ছোঁড়ো।
—কিছু অস্ত্র তো ছিল! সেস কী সুইডেনের!
—না, না, স্বর্গের। যোগবলে পাওয়া।
—গুল।
—গুল মানে?
—মানে, ডাহা মিথ্যে। আমেরিকা, রাশিয়া, সুইডেন, এই তো তিনটে দেশ। প্রতিরক্ষার জন্যে আমি বোফর্স কামান আনালুম, সেই কামান আমাকেই দেগে দিলে। আপনার ভাগ্য ভালো, ভি. পি.-র পাল্লায় পড়েননি। অ্যায়সা জল ঘোলা করে দিত, আপনারই অযোধ্যার অলিতে গলিতে আপনারই জনগণ চিৎকার করত, গলি গলিমে শোর হ্যায় রামচন্দ্র চোর হ্যায়। বোফর্স বোফর্স করে বারোটা বাজিয়ে দিত আপনার। আপনার সময় বলিউড বলে কিছু ছিল?
—বলিউড আবার কী, আমার দুই বন্ধু ছিল বালি আর সুগ্রীব। তা, আমি আবার একটা মহা অন্যায় করে বসলুম। সুগ্রীবকে দলে ভেড়াবার জন্যে দুম করে বালিবধ করে বসলুম। ইতিহাসে আমার নাম খাস্তা হয়ে গেল। আমি গাছের আড়াল থেকে অতর্কিতে বাণ মেরে বালিকে হত্যা করেছিলুম। বালি মারা যাওয়ার সময় তেড়ে গালাগাল করে গেল, রাম, তুমি দুরাত্মা, তুমি অধার্মিক। তুমি অর্ধমযুদ্ধে আমাকে মারলে। তোমার ধর্মের কাঁতায় আগুন। আমি বললুম, বালী, তুমি ধর্মও জানো না, অর্ধমও জানো না। তোমাকে বধ করে আমার রাগও হয়নি, দু:খও হয়নি। আমার জীবনে গোটাকতক স্ক্যান্ডাল খুব সাংঘাতিক। সবচেয়ে বড় স্ক্যান্ডাল, প্রথম সীতাকে আত্মহননে বাধ্য করা। সেটা আমি করেছিলুম লোক দেখাবার জন্যে, বাহাদুরি আদায়ের জন্যে। বাবার খুব দুর্নাম হয়েছিল স্ত্রৈণ বলে। আমাকে যাতে কেউ স্ত্রৈণ বলতে না পারে, তাই সীতাকে আগুনে ঢুকিয়ে দিলুম। জীবনে এলেন দ্বিতীয় সীতা। তিনি গর্ভবতী হলেন। সেই অবস্থায় দিলুম ডিভোর্স করে। আমার পলিটিক্যাল চাল। ওটা করেছিলুম ভোটব্যাঙ্কের দিকে তাকিয়ে। নিজের ইমেজ বাড়াবার জন্যে। যার ফল, আমার সংসার ফিনিশ।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'আমার সংসারও ফিনিশ হয়ে গিয়েছিল। রাজনীতি করলে ফ্যামিলি-লাইফ মেনটেন করা যায় না। আমার মা পাঞ্জাবকে খেপিয়ে গেলেন, তার ম্যাও সামলাতে হল আমাকে।'
রামচন্দ্র বলতে লাগলেন, 'আপনার কী হয়েছে জানি না, আমার ছেলে দুটো পর হয়ে গেল।'
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'আর আমার ছেলেমেয়ে দুটোর অবস্থা জানেন, টেররিস্টদের ভয়ে গৃহবন্দী ছিল। শেষে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েও নিশ্চিন্ত নই। কখন কী হয়, এই চিন্তায় আমার বউ রাত জাগছে। আমি তো চলে এসেছি নিজ নিকেতনে। আপনি আমার প্রশ্নটা ধরতে পারেননি। বলিউড মানে বম্বের ফিল্ম দুনিয়া। আপনার সময় বোম্বাই ছবি ছিল?'
—বোম্বাই আম ছিল। হনুমান খেত আর আঁটিগুলো রাবণকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারত।
—বোম্বাই ছবির কোনও হিরো আপনার বন্ধু ছিল?
—না, হনুমান আর বানর ছাড়া আমার কোনও বন্ধু ছিল না। আর এক রাক্ষস আমার বন্ধু ছিল। বিভীষণ।
—আপনার সময় লঙ্কায় টাইগার ছিল?
—টাইগার আপনি কুমায়ুন ছাড়া কোথায় পাবেন, সুন্দরবনের দিকে পাবেন। লঙ্কায় কেবল রাক্ষস। গিজগিজ করছে বড়, ছোট, মাঝারি রাক্ষস।
—এত রাক্ষসের ভয় ছিল। আপনাদের সময় আমাদের সময় ইলেকট্রিক আলো ছিল না। ইলেকট্রিক আলোয় ভূত, প্রেত, রাক্ষস বাঁচে না।
—আমার প্রশ্নটা ধরতে পারলেন না। টাইগার মানে বাঘ নয়, মানুষ বাঘ, তামিল টাইগার, যারা আমাকে জিলেটিন বোমা দিয়ে মেরেছিল।
—না, সেরকম টাইগার দেখিনি। সবই রাক্ষস। ইয়া ইয়া মাথা। রাবণরাজার দশটা মাথা।
—আপনি ভীষণ বোকা। রাবণের ওটা কথাকলি মাস্ক। নেচে নেচে যুদ্ধ করত তো!
—তা একটু নাচানাচি করত। রাসক্ষটার তেমন বুদ্ধি ছিল না তো। মাথামোটা টাইপের। আসলে একটা মাথার বুদ্ধি দশটা মাথায় চারিয়ে গিয়েছিল তো।
—আপনাকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারছি না, একটা লোকের দশটা মাথা হতে পারে না। বায়োলজিক্যালি ইমপসিবল। ওটা কথাকলি মাস্ক। দশেরার দিন রামলীলা ময়দানে গেলে দেখবেন, রাবণ নাচছে। আপনি নাচছেন, আপনার পরিবার পরিজন সব নাচছেন। রাক্ষস বলে কিছু নেই। ওটা পালা।
—আমি তাহলে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করলুম।
—আপনি নেচেছেন, যুদ্ধ করেননি। কথাকলি ড্যান্স। ইটপাটকেল, হনুমান, বাঁদর দিয়ে কি আর যুদ্ধ হয়? বড়জোর ছাত্র আন্দোলন হতে পারে।
—আপনারা বলছেন বটে, তবে জেনে রাখুন ইটপাটকেলের মতো শক্তিশালী হাতিয়ার খুব কম আছে। হাজার হাজার বাঁদর হাজার হাজার পাথর।
—রাবণের তো হেলিকপ্টার ছিল।
—পুষ্পক রথ। আমি চাপিনি, সীতা চেপেছিল।
—সেই কারখানাটা আপনি দেখেছিলেন! রাবণ তো অ্যাটম বম্ব, কেমিক্যাল ওয়েপনস ব্যবহার করেছিল। আপনার উচিত ছিল ভবিষ্যতের কথা ভেবে, বুশ সাহেব যেমন ইরাককে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করতে চাইছেন, সেইরকম লঙ্কাকে একেবারে নিরস্ত্র করা। মিলিটারি পাওয়ার যেন কিছুই না থাকে।
—আমি তো একেবারে নির্বংশ করে দিয়েছিলুম, আবার মর্ডান রাক্ষসরা জন্মে গেলে আমি কী করতে পারি।
—আপনারা একটু চুপ করুন, আমি একটু খবরটা শুনি। আমার ফ্রেন্ড নরসিমা রাও কিরকম ল্যাজে-গোবরে হচ্ছে শোনা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী যন্ত্রে দম দিলেন। পাহাড়ে ছড়িয়ে গেল আকাশবাণীর কণ্ঠস্বর। 'আকাশবাণী ইয়ে সমাচার। দিস ইজ অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো। নিউজ রেড বাই রাজু ভরতন। উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা একপ্রকার সুনিশ্চিত। পি ভি নরসিমা রাও ভালোই ব্যাট করছেন। ফাস্ট, স্পিন, গুগলি ইয়র্কার সবরকম বলেই সমান ব্যাট চালাচ্ছেন। অযোধ্যায় রাম আবার হারতে চলেছেন। করসেবকরা এখন রামমন্দির ছেড়ে লক্ষ্মণ মন্দির নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সাধুরা প্রধানমন্ত্রীর টোপ গিলেছেন। বড় বড় রুইকাতলা প্রধানমন্ত্রীর ছিপে গভীর জলে ভালোই খেলছে। রাম এখন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের তলায়। ইরাক প্রেসিডেন্ট বুশকে আবার খেলাতে শুরু করেছে। আদর দিয়ে মাথায় তুললে নামানো সহজ নয়। স্ক্যাম কেলেঙ্কারিতে আরও কয়েকজন ধৃত।
হর্ষদ মেটাকে আরও কয়েকদিন জামাই আদরে রাখার ব্যবস্থা। বিশেষ একটি দল গঠিত হয়েছে, মেটার মাথা খুলে দেখা হবে। সেই দলে আছেন, বিদেশের একজন সেরা অর্থবিদ, জালিয়াত, জোচ্চর, ইঞ্জিনিয়ার, সাপুড়ে, সম্মোহনবিদ, স্ট্রিপটিজ, ব্যাঙ্কার, শেয়ার বুল। মেটার মাথাকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করা যায় কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁকে ভারতের অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদে বৃত করলে, টাকা আর খোলামকুচির মধ্যে এখন যেমন আর কোনও পার্থক্য নেই, সেই অবস্থার সমাধান হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। স্ট্রিপটিজরা শিখবেন কী করে নিজেরা উলঙ্গ না হয়ে বড় বড় লোককে উলঙ্গ করা যায়। সি বি আই-এর মাধবন স্বেচ্ছা অবসর চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার আবার এক সংকটের মুখোমুখি। বফর্স কেলেঙ্কারির তদন্তের সুবাদে সৎ ও নির্ভীক বলে পরিচিত সি বি আই-এর এই প্রবীণ অফিসারের সিদ্ধান্ত ফের শুধু শেয়ার কেলেঙ্কারিকে পাদপ্রদীপের সামনে নিয়ে এসেছে তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওকেও প্রচণ্ড অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মাধবনের স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার হঠাৎ সিদ্ধান্ত শেয়ার কেলেঙ্কারির তদন্ত সত্যিই অবাধ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে কি না সেই প্রশ্নকে সামনে এনে ফেলেছে। ফেয়ার গ্রোথের বিভিন্ন শাখায় সি. বি. আই. হানা। শেয়ার কেলেঙ্কারি তদন্তে যুগ্ম সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সি. পি. এম.-কে দিতে কংগ্রেস আগ্রহী। বফর্স কামান বিক্রি সংক্রান্ত ব্যাঙ্কে রক্ষিত যাবতীয় নথিপত্র শীঘ্র প্রকাশ করবে সুইজারল্যান্ড। এর ফলে সুইডেনের এই অস্ত্র কারখানার দালালি করে যারা টাকা খেয়েছিল, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে বিতর্কের পর তাদের নাম জানা যাবে। বি. জে. পি. নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী আজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গর্ভগৃহ থেকে রামমূর্তি সরানো হবে না। তিনি বলেছেন, কোর্টের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, গত চল্লিশ বছর ধরে যেখানে রামের মূর্তি আছে, সেখান থেকে মূর্তি সরানোর অর্থই হল লক্ষ লক্ষ হিন্দু বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত। তিন হাজার পাঁচশো কোটি টাকার শেয়ার কেলেঙ্কারির প্রধান অভিযুক্ত হর্ষদ মেটা তাঁর সম্পত্তির কিছু অংশ ইতিমধ্যেই বিদেশি অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলেছেন বলে সি. বি. আই. সন্দেহ করছে।
কলকাতায় সেই অপরাধী ধরা পড়েছে যে মেয়েদের গায়ে ছুঁচ ফুটিয়ে আনন্দ পেত। কলকাতার উপকণ্ঠে একটি জায়গায় আটজন যুবক সারা রাত ধরে চল্লিশ বছরের এক বিবাহিতা রমণীকে গণধর্ষণ করেছে। পশ্চিম বাংলায় এ মাসে এক ডজন মহিলা গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। হাওড়া স্টেশনের কাছে একটি লজে সেদিন যে মহিলাকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই লজে পুলিশ তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। আরও কয়েকটি বেআইনী লজ বন্ধ করা হবে। পশ্চিমবাংলায় নারী নির্যাতন বন্ধ করার জন্যে একটি স্পেশাল সেল গঠন করা হচ্ছে। নির্যাতিতা মহিলারা নির্যাতনের পর জীবিত থাকলে যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁদের নিয়ে বক্তৃতা ও সেমিনার হবে। স্পোর্টস, বিশ্বঅলিম্পিকে ভারতের যে টিম বেড়াতে গিয়েছিল, তারা একটিও পদক না পেয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছে। এই অভূতপূর্ব নিরাসক্তির জন্যে তাদের সোনা দিয়ে বাঁধানো একটা ঘুঁটের পদক দেওয়া হবে। এই পদকটির নাম হল, ইনডিফারেনস মেডেল। এই পদকটি চিরকাল ভারতের জন্যেই বাঁধা রইল। ভারতের অলিম্পিক টিমকে বিপুল সম্বর্ধনা জানানো হচ্ছে। কালচার, পশ্চিমবাংলার একটি অপেরা পালাজগতে নতুন দিক সংযোজন করতে চলেছেন তাঁদের নতুন পালায়। পালার নাম জ্বলন্ত চিতায় জীবন্ত সীতা। খবর পড়া আপাতত শেষ হল।
সীতা লাফাতে লাফাতে বললেন, 'শাবাশ পশ্চিমবাংলা, মমতার বাংলা, সুভাষের বাংলা, রবিঠাকুর, শরৎচন্দ্রের বাংলা, বীর বিপ্লবী বিবেকানন্দের বাংলা। সারা উত্তর ভারত যখন রামকে নিয়ে লাফাচ্ছে, তখন পশ্চিমবাংলা জ্বলন্ত চিতায় জীবন্ত সীতাকে তুলছে। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমি যাব। পালাকারকে মালা পরাব। বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘোর ঘনঘটা! কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে, গলগল গলগল রক্ত।'
প্রাক্তন পি. এম. বললেন, 'শুধু বাংলা কেন! ভারতের ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘোর ঘনঘটা। বিশ্ব ব্যাঙ্ক কী করবে! নো হোপ!'
ব্রুস লি বললেন, 'আপনারা কী ক্যারাটে শিখবেন!'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'কেন অশান্তি করছ, ছোকরা। মারামারি করে কোনও সমস্যার সমাধান হয় না। শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কার সব রাক্ষস খতম করলেন, বেড়ে গেল বাঘের উৎপাত। নিজের স্ত্রীটিকে চিরকালের জন্যে হারালেন। ছেলেদুটো বিদ্রোহী হয়ে গেল। এখন তিনি ভক্তদের হাত থেকে রাজনীতিকদের হাতে গিয়ে পড়েছেন। মন্দির মসজিদের সেই পুরোনো লড়াই। তারপর আমাদের কুরুক্ষেত্রের কী দশা হল! আমাদের দুটো বংশ তো ছারখার হয়েই গেল, মাঝখান কৃষ্ণের পাপে যদুবংশ ধ্বংস হয়ে গেল। দুই মহিলার কীর্তি! দুই নায়িকা অ্যায়সা কাণ্ড করলেন! সীতা চাইলেন সোনার হরিণ, দৌপদী চাইলেন দু:শাসনের রক্ত। সব স্বামীই জানে, বিয়ের মতো বিতিকিচ্ছিরি জিনিস আর হয় না। তবু আমরা বিয়ে করি আর সারাটা জীবন বউয়ের গালাগাল খেয়ে মরি! জীবনে নারীই হল অভিশাপ। রাম আর আমি যদি ব্যাচেলার হতুম, আমরা কেমন মনের আনন্দে থাকতুম। লঙ্কাও হত না, কুরুক্ষেত্রও হত না। আর মেয়েরাও তেমনি, সেজে গুজে জনাইয়ের মনোহরা। এক-একটি ছেলেধরা ফাঁদ। ধরছে আর তুলোধোনা করছে। আমরাও বিয়ে করব, মেয়েরাও বিয়ে করবে। সমাধান একটাই, দৃষ্টিভঙ্গি পালটানো। মেয়েরা স্বামীকে স্ত্রীর চোখে না দেখে মায়ের চোখে দেখলে সব সমস্যার সমাধান। মা যেমন বুড়ো দামড়া ছেলেকেও ভাবেন গোপাল আমার, স্ত্রীরাও যদি স্বামীকে সেইরকম ভাবে, অবোধ বালক আমার। আমার খোকাটি, বুড়ো খোকা। অবোধ শিশু মায়ের চুল ধরে টানে, খামচে খুমচে দেয়, খোঁচা মারে, পা দিয়ে দুধের বাটি উলটে দেয়, কোলে হিসু করে, ধুলোকাদা মেখে আসে। মা মারে। ক্যারাটে মারে না। সে মার সোহাগের মার, আবার পর মুহূর্তেই আদর করে। বুকে টেনে নিয়ে মাই খাওয়ায়। মুখ মুছিয়ে কপালে কাজলের টিপ এঁকে দেয়। স্ত্রীরা স্বামীকে যদি অবোধ শিশু ভাবতে পারে, তাহলে আর কোনও সমস্যাই থাকে না। যেমন সেই কবিতা আছে, কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড় দিয়েছে পায়, সেইরকম স্ত্রীরাও যদি আওড়ায়, স্বামীর কাজ স্বামী তো করেছে অবোধ খোকা আমার। শ, ষ, স, সহ্য করো, সহ্য করো, সহ্য করো। যে সয় সে রয়, যে না সয় সে নাশ হয়। এই কায়দায় তা হলে নারীদের চিরশত্রু স্বামী চিরকালের জন্যে বধ হল। ও আমার বুড়ো খোকা। আর এক শত্রু রয়েই গেল শাশুড়ি। কিছু করার নেই, শাশুড়িরা চিরটাকালই পুত্রবধূকে সতীন ভাবেন। নারীর শত্রু নারীই, কারণ এক মেরুতে অবস্থান, দুটোই নেগেটিভ পোল, ফলে বিকর্ষণ। নারী আর পুরুষ প্রবল আকর্ষন, যেমন লোহা আর চুম্বক। যেমন আগুন আর পতঙ্গ। যেমন গর্ত আর বাতাস। একটা পজেটিভ একটা নেগেটিভ। ফিজিকস কী বলে? লাইক পোল রিপেলস, অপোজিট পোল অ্যাট্রাকটস। ও কিছু করার নেই। জীব-ধর্ম। সৃষ্টি তাহলে থেমে যাবে বৎস! ঈশ্বরের কেরামতি! পুরুষের আধখানা পুরুষ, আধখানা নারী। নারীর আধখানা নারী, আধখানা পুরুষ। মিলনের সময় পূর্ণ। হাফে হাফে ফুল। লড়ালড়ি করলে ডিভোর্স বেড়ে যাবে। সীতা মানে আধুনিক সীতা রামকে ছেড়ে শ্যামকে বিয়ে করল। রাম দিনকতক ফ্যা ফ্যা করে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে পাঞ্চালীকে বিয়ে করল। এক দু:শাসন, সে অফিসের বড় এগজিকিউটিভ, কি সেতার শিক্ষক, কি পাড়ার মাস্তান, কি টিভি সিরিয়াল হিরো হতে পারে, পাঞ্চালীর সঙ্গে ইয়ে করতে লাগল, রাম একদিন রাম খেয়ে পাঞ্চালীকে রাম ধোলাই দিলে। পাঞ্চালীর রাবণ রামকে অ্যায়সা দিলে ওপরের পাটিটা ফলস টিথ হয়ে গেল। আবার ডিভোর্স। ওদিকে শ্যাম শ্যাম্পেন খেয়ে সীতাকে টরচার শুরু করলে। শ্যামার সঙ্গে একস্ট্রা ম্যারিট্যাল রিলেশন। আবার ডিভোর্স। ডিভোর্স ম্যারেজ, ম্যারেজ ডিভোর্স, সারা জীবন এই চলুক। তার চেয়ে আমার দাওয়াই হল, বেস্ট দাওয়াই। মানসিকতার পরিবর্তন। স্ত্রীরা স্বামীকে অবোধ সন্তান ভাবতে শিখুন। সীতা রামকে যদি ভেবে নেন, পাগল ছেলে, সত্য পাগলা, তাহলে আর কোনও অভিযোগ থাকে না। রাম তো সত্যিই ম্যাড। যা নেই, তার পেছনে দৌড়োনোই তার আদত। সোনার হরিণ নেই, তার পেছনে ছুটল। সত্যও এক সোনার হরিণ। জগৎ সংসারে সত্য বলে কিছু আছে!' 'সবই মিথ্যা মায়া।' পাঞ্চালী বললেন, 'তোমাকে আমি কী ভাবব!'
—আমিও এক পাগল, ধর্মপাগল, পাশাপাগল। ধর্ম বলে কিছু আছে? নিজের সুবিধেটাই ধর্ম। বেঁচে থাকাটাই ধর্ম। ভোগই ধর্ম। কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যখন যেমন সুবিধে, তেমন বলেছেন। পরস্পর-বিরোধী কথা। একবার বললেন আত্মরক্ষাই ধর্ম। একবার বললেন, প্রেমে আর রণে কোনও ধর্ম নেই। অর্জুনের সুভদ্রাকে ভালো লেগে গেল। সুভদ্রা কৃষ্ণের নিজের বোন। কৃষ্ণ বললেন, হরণ করো। কামার্ত যখন হয়েছ, তখন আর কিছু করার নেই। ক্ষত্রিয়ের পক্ষে স্বয়ম্বর বিহিত, কিন্তু স্ত্রীস্বভাব অনিশ্চিত, কাকে বরণ করবে কে জানে। তুমি আমার ভগিনীকে সবলে হরণ করো; ধর্মজ্ঞরা বলেন, এরকম বিবাহ বীরগণের পক্ষে প্রশস্ত। নিজেই একটা সুভদ্রাহরণের প্ল্যান ছকে ফেললেন। সুভদ্রা রৈবতক পর্বতে পূজা দিতে যাবেন। সেই সময় যুদ্ধের সাজে সেজে অর্জুন যাবেন মৃগয়ায়। মৃগয়াটা ছল। আসল উদ্দেশ্য পাঁজাকোলা করে সুভদ্রাকে সোনার রথে তুলে নিয়ে চম্পট দেওয়া। একেবারে ছকা প্ল্যানে কাজ। সুন্দরী সুভদ্রা পুজো শেষ করে রৈবতক পর্বত প্রদক্ষিণ করে দ্বারকায় ফিরছে, অর্জুন তাকে সোজা জাপটে ধরে রথে তুলে নিলেন। যেমন একালে হয় আর কী! একটা মেয়ে কলেজে পড়ে। বড়লোকের মাস্তান ছেলের ভালো লেগে গেল। বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে। লাল একটা মারুতি এল। দুটো ছেলে বেরিয়ে এসে ঝট করে মেয়েটাকে টেনে নিয়ে চলে গেল। আর যারা দাঁড়িয়েছিল তারা শুধু দেখলে। বাধা, প্রতিবাদ, চিৎকার কিছুই করলে না। লাশ পড়ে যাবে। মেয়ের বাপ হয় তো পুলিশে যাবে। ঘোড়ার ডিম হবে। ধার্মিক পুলিশ অশ্লীল, অসামাজিক ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। সেকালে আবার পুলিশ ছিল না। তবে সুভদ্রার সঙ্গে কয়েকজন সৈন্য ছিল। সুভদ্রা অর্জুনের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে, রথ ছুটছে ইন্দ্রপ্রস্থের দিকে। সৈন্যরা চিৎকার করছে। রথ তখন অনেক দূরে। সৈন্যরা সুধর্মা নামক মন্ত্রণাসভায় ছুটে গেল। মহাসর্বনাশ। ধরা যাক, ওইটাই সেকালের পুলিশ ফাঁড়ি। ঘটনাটা সভাপালকে জানানো মাত্রই, সভাপাল যুদ্ধসজ্জার জন্যে মহাভেরী বাজাতে লাগলেন। যাদবরা সারাটা দিনই পানভোজনে ব্যস্ত থাকতেন। ভেরীর শব্দ শুনে তারা গেলাসটেলাস ফেলে তেড়ে এল। চলো যুদ্ধে। অর্জুনকে পিটিয়ে সুভদ্রাকে উদ্ধার করতে হবে। বলরাম সেই সভায় উপস্থিত ছিল। মাল খেয়ে একেবারে টাল। পরিধানে নীল বসন। গলায় বনমালা। বলরাম বললে, আগেই সব হ্যা হ্যা করে চেল্লাসনি। নির্বোধের দল! কৃষ্ণের কী মত আগে জানা দরকার গাধার দল। গরু চরিয়ে চরিয়ে সব গাধা হয়ে গেছিস। সামনেই কৃষ্ণ। বলরাম বললে, তুমি এমন নির্বাক কেন হে! তোমার জন্যেই আমরা অর্জুনকে সম্মান করেছি, কিন্তু সেই কুলাঙ্গার সুভদ্রার যোগ্য নয়। যার সৎকুলে জন্ম, সে অন্নগ্রহণ করে ভোজনপাত্র ভাঙে না। সুভদ্রাকে হরণ করে সে আমাদের মাথায় পা দিয়েছে। এই অন্যায় আমি সইব না, আমি একাই পৃথিবী থেকে কুরুকুল লোপাট করে দেব। যাদবরা সব হইহই করে উঠল। ঠিক ঠিক। বলরামবাবু উচিত কথা বলেছেন। কৃষ্ণ এক সাংঘাতিক জিনিস। সখা তো সবই জানেন। তাঁর প্ল্যানেই তো সব হচ্ছে। কৃষ্ণ বললেন, অর্জুন যা করেছেন তাতে আমাদের বংশের অপমান হয়নি, বরং মানবৃদ্ধি হয়েছে। গোয়ালার মেয়েকে রাজার ছেলে তুলে নিয়ে গেছে। এর চেয়ে সম্মানের আর কী আছে! আমরা ধনের লোভে মেয়ে বিক্রি করব, এমন কথা তিনি ভাবেননি। স্বয়ংবরেও তিনি সম্মত নন। এই কারণেই তিনি ক্ষাত্রধর্ম অনুসারে কন্যা হরণ করেছেন। অর্জুন ভরত-শান্তনুর বংশে কুন্তীর গর্ভে জন্মেছেন। তিনি যুদ্ধে অজেয়। মূর্খের দল! এমন সুপাত্র কে না চায়! তোমরা জলদি গিয়ে মিষ্টি কথায়, জামাই আদরে তাঁকে ফিরিয়ে আনো, এই আমার মত। যুদ্ধ করতে গেলে কী হবে! তিনি আমাদের পরাজিত করে নিজের ডেরায় ফিরে যাবেন। তার চেয়ে অপমানের আর কিছু থাকবে না। আমাদের যশ নষ্ট হবে। মিষ্টি কথায় ফিরিয়ে আনলে সে ভয় থাকবে না। যতই হোক আমাদের পিসিমার ছেলে, তিনি আমাদের সঙ্গে শত্রুতা করবেন কেন। এই হলেন আমাদের সখা কৃষ্ণ। কখনও বলেছেন, ধর্মটাই ধর্ম, কখনও বলেছেন পাপটাই ধর্ম। কখনও বলছেন সত্যই ধর্ম, কখনও বলছেন মিথ্যাই ধর্ম। কখনও বলছেন সংযম ধর্ম, কখনও বলছেন অসংযমই ধর্ম। দেখলুম, কৃষ্ণকে বোঝার ক্ষমতা আমার পিতারও সাধ্য নয়। শেষে একদিন দেবভাষায় স্পষ্টই বলে দিলেন, আমাকে বিচার করার চেষ্টা কোরো না।
যৎ করোষি যদশ্লাসি যজ্জুহোসি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ পুরুম্ব মদর্পণম।
যা অনুষ্ঠান করবে, যা আহার করবে, যা হোম করবে, যা দান করবে, যে তপস্যা করবে, সব আমাকে সমর্পণ করে দাও। চুকে গেল ল্যাঠা। তোমাদের আর ন্যায়অন্যায়, পাপপুণ্যের বিচারের প্রয়োজন নেই। তা হলে কী হবে, সখা কৃষ্ণ! শোনো কী হবে!
শুভাশুভফলৈরেবং মোক্ষ্যসে কর্মবন্ধনৈ:।
সন্ন্যাসযোগযুক্তাত্মা বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।।
সমস্ত কাজের ফল আমাকে অর্পণ করলে, কাজের ভালো খারাপ ফল ভোগ থেকে তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে। এরই নাম সন্ন্যাসযোগ। এই যোগে জীবিতকালেই মুক্তি পেয়ে যাবে। আর মৃত্যুর পর আমার ভেতরে চলে আসবে, যেমন খামের ভেতর চিঠি আসে। আর তোমাকে কোনওদিন জন্মাতে হবে না।
কথাটা একেবারে খাঁটি সত্য। তিনি যা বলেছেন, আমি তাই করেছি। কখনও নিজের বুদ্ধি খাটাইনি। মা বললেন, বউটাকে পাঁচজনে ভাগাভাগি করে নাও। যেন গাছ থেকে একটা বড় কাঁঠাল ভেঙে এনেছি আমরা পাঁচটা শেয়াল। ফল কী হল? দ্যুতসভায় দু:শাসন যখন চুল ধরে দ্রৌপদীকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে এল, কাপড়চোপড় প্রায় খুলেই গেছে। সিল্কের শাড়ি এমনিই গায়ে থাকতে চায় না, টানাটানিতে তো আরও খুলে যায়। আমি তো নির্বোধ। নির্বোধের মতোই মাথা নীচু করে বসে আছি। চোরের মতো পিটপিট করে দেখছি, দ্রৌপদীর যৌবন সভাসমক্ষে প্রায় বেরিয়ে পড়েছে। দু:শাসন এইবার মারবে টান, ফুল নেকেড হয়ে যাবে। আমাদের জামাকাপড় টেনে হিঁচড়ে খোলার আগে নিজেরাই খুলে দিয়ে পাঁচ ভাই উদোম। ধৃতরাষ্ট্র চোখে দেখেন না, কানে শোনেন। তিনি থেকে থেকে বলছেন, পাঞ্চালীর বস্ত্রহরণ কি হয়ে গেছে। আর দ্রৌপদী জনে জনে প্রশ্ন করছে, বিলাপ করছে, এই কুরুবীরদের মধ্যে আমাকে টেনে আনা হল। প্রায় উলঙ্গ করে ফেলেছে। দু:শাসন আমার খারাপ জায়গায় খামচে দিয়েছে, থেকে থেকে ধাক্কা মারছে আর গুন্ডাদের মতো খ্যাত্যের খ্যাত্যের করে হাসছে, আর 'দাসী দাসী' করে কানের কাছে অসভ্যের মতো চিৎকার করছে। মুখে ভকভক করছে মদের গন্ধ। ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদূর আর রাজা ধৃতরাষ্ট্ররা কি সব মরে গেছেন! বুড়োগুলো কি এই অসভ্যতা, বলাৎকার দেখতে পাচ্ছেন না? চোখে ঠুলি এঁটে বসে আছে? না কি দেখতে বেশ মজা লাগছে? শ্বশুরদের সামনে পুত্রবধূর ধর্ষণ। ভরতবংশের ধর্ম আর চরিত্র দুটোই গেঁজে গেছে। পিতামহ ভীষ্ম গোটা এপিসোডে মাত্র দুটো কথা বলেছিলেন, ভাগ্যবতী, ধর্মের তত্ব অতিশয় সূক্ষ্ম, আমি তোমার প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে পারছি না। কর্ণ মুখ ভেঙচে বললে, ভাগ্যবতী, না হাতি! স্ত্রীদের একপতিই বেদবিহিত, দ্রৌপদীর অনেক পতি, অতএব এ বেশ্যা। খোল, এর কাপড় খোল। আর ওই পাঁচটা দামড়াকেও ল্যাংটো কর। লজ্জায় মাথা নীচু করে বসে আছি আমি। ধার্মিক জুয়াড়ি। দ্রৌপদী আবার ভীষ্মকে বললেন, কিছু বলুন, কিছু করুন। তিনি কি বলবেন? বুড়োদের কথা কোন কালে কে শুনেছে! ভীষ্ম কাকে বলবেন! কি বলবেন! কে শুনবে! দু:শাসন শাড়ি ধরে টানছে। দ্রৌপদী স্তন সামলাচ্ছে। দুর্যোধন ঊরুতে চাপড় মারছে। কর্ণ বলছে, টান, জোরসে টান। পিতামহ পাখি-পড়া বুলি আওড়াচ্ছেন, কল্যাণী, আমি তোমাকে বলেছি যে, ধর্মের গতি অতি দুর্বোধ্য, সেইজন্যে আমি উত্তর দিতে পারছি না। যা বলার যুধিষ্ঠিরই বলুক। দুর্যোধন শেয়ালের মতো হেসে বললে, ভীম আর অর্জুন বলুক না যে যুধিষ্ঠির তোমার স্বামী নয়, সে মিথ্যেবাদী, তাহলে তোমাকে আমরা ছেড়ে দেব। না হয় ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠিরই বলুক, সে তোমার স্বামী নয়। আমি তো তখন প্রায় অচৈতন্য। সেই দিনই বুঝেছিলুম, ধর্ম একটা ভেক। একমাত্র বিকর্ণ সেদিন দ্রৌপদীর হয়ে লড়েছিল। বিদূরকে তো কেউ পাত্তাই দেয়নি, বংশ-পরিচয় ছিল না বলে। দাসীপুত্র, ক্ষত্তা। বিকর্ণ একটা কথার মতো কথা বলেছিল। বলেছিল, মৃগয়া মদ্যপান আর অধিক স্ত্রীসংসর্গ—এই তো রাজাদের ব্যসন। তার মানে রাজারা হল, মোদো মাতাল, লম্পট। রাজা কেন, প্রায় সব মানুষই তাই। মদ আর মৃগয়া বাদ দিলেও, মেয়েছেলে দেখে নোলায় জল পড়ে না, এমন পুরুষ কজন আছে? তা না হলে ব্যাচেলার ভীষ্ম সভায় বসে থাকেন। নাত-বউয়ের কাপড় খোলা হবে, ধর্মের গতি অতি সূক্ষ্ম বলে পাঞ্চালীর শরীর দেখবেন। আর আমি এক ধার্মিক, দ্রৌপদীকে বাজি ধরার সময় তার শরীরের বর্ণনা দিচ্ছি, যিনি অতিখর্বা বা কৃপা নন, কৃষ্ণা বা রক্তবর্ণা নন, যিনি কৃষ্ণকুঞ্চিতকেশী, পদ্মপলাশাক্ষী, পদ্মগন্ধা, রূপে লক্ষ্মীসমা, সর্বগুণান্বিতা, প্রিয়ংবদা, সেই দৌপদীকে পণ রাখছি। বেশ্যালয়ের ম্যাডাম যেন খদ্দেরকে বর্ণনা দিচ্ছে। লোভ দেখাচ্ছে। দ্রৌপদী মেয়ে নয়, মাল। আরে, ছ্যা: ছ্যা: যুধিষ্ঠির। যেমন রাম, তেমন তুমি। দ্রোপদী ম্যাজিক জানত। কাপড়ের ম্যাজিক দেখিয়ে দিলে। দু:শাসন টেনে শেষ করতে পারে না। গলদধর্ম হয়ে বসে পড়ল। ধৃতরাষ্ট্র চোখে দেখেন না। তিনি ধারা-বিবরণী শোনেন। জিগ্যেস করছেন, কি হল, পাঞ্চালী বিবস্ত্রা হয়েছে! যেই শুনলেন, অদ্ভুত অলৌকিক ব্যাপার। যত টানে ততই শাড়ি বেরোয়। গোটা একটা টেক্সটাইল মিল বেরিয়ে এসেছে।
আমেরিকান সাংবাদিক বললেন, 'এক্সকিউজ মি, সেই শাড়ি কি কোনও মিউজিয়ামে রাখা আছে। না, পিসপিস করে বিক্রি করা হল!'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'সায়েব সে তো মায়া শাড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই উবে গেল। জাস্ট লাইক ক্যামফার। সে শাড়ি টানলে বেরোয়, ছেড়ে দিলে ভ্যানিস হয়ে যায়। ডোন্ট ইন্টারফিয়ার। লেট মি ফিনিশ দা স্টোরি। ধৃতরাষ্ট্র দৌপদীর ম্যাজিক শুনে ভয়ে ভয়ে বললেন, পাঞ্চালী, তুমি আমার বধূদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা এবং ধর্মশীলা সতী, আমার কাছে বর চাও। দ্রৌপদী প্রথম বরে আমাকে আর আমাদের দুজনের ছেলেকে, মানে প্রতিবিন্ধাকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করল।'
আমেরিকান সাংবাদিক থাকতে না পেরে বললেন, 'এক্সকিউজ মি?'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'আবার কী হল?'
—একটা কৌতূহল। দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী। প্রত্যেকেই কি সন্তান করেছিলেন?'
—অফকোর্স! ছেড়ে কথা বলার লোক আমরা নই। আমরা প্রত্যেকেই লড়ে গেছি। আমাদের রাইট, আমাদের মাইট। আমরা পাঁচ ভাই তখন ইন্দ্রপ্রস্থে দ্রৌপদীকে নিয়ে একটু সমস্যাতেই আছি। একটা বউ পাঁচটা স্বামী। সবাই লালায়িত। কেউই স্বামীর অধিকার ছাড়তে রাজি নয়। অমন সুন্দর একটা উত্তর ভারতীয় মেয়ে! কী তার যৌবন! সবাই ছটফট করছে! অর্জুনই তো লক্ষ্যভেদ করে স্বয়ংবর সভায় পাঞ্চালীর মালা পরেছিল। বাকি আমরা তো সব নেপো পার্টি। আমরা তো বলতে পারতুম, ভাই অর্জুন, মা না দেখেই বলে ফেলেছিলেন। ভেবেছিলেন, আমরা কাঁঠাল পেড়ে এনেছি। তা না, আমরা ভীষণ মাতৃভক্ত হয়ে, পাঁচটা পাঁচ বয়েসের লোক একটা মেয়েকে নিয়ে খামচাখামচি শুরু করে দিলুম। দুধের বাছা সহদেব, সেও ডাকছে, শুনছ! একবার এসো তো, আমার একটু ইয়ে চেগেছে। আমাদের সকলের চিরকালের গ্রেট ফ্রেন্ড, ধর্মের ট্র্যাভলিং সেলসম্যান নারদ একদিন এলেন। দ্রৌপদীকে দেখে বেশ চিন্তিত হলেন। এই রূপসী তো ভাইদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেবে। নারদের মনে পড়ে গেল সুন্দ, উপসুন্দের কাহিনি। পুরাকালে মহাসুর হিরণ্যকশিপুর বংশজাত দৈত্যরাজ নিকুম্ভের সুন্দ, উপসুন্দ নামে দুই পরাক্রান্ত পুত্র জন্মেছিল। যৌবনে পা দিয়ে তাদের অ্যাম্বিশন হল, ত্রিলোক জয় করবে স্বর্গ মর্ত্য পাতাল। মানে, আমেরিকা হবে। স্পেসে চলে যাবে, পৃথিবীর এফোঁড়-ওফোঁড় করবে। বিন্ধ্যপর্বতে গিয়ে লাগিয়ে দিলে কঠোর তপস্যা। তপস্যা বানচাল করার জন্যে ভগবান অনেক এজেন্ট, রিএজেন্ট পাঠালেন। কিছুতেই কিছু হল না। তখন ব্রহ্মাকে আসতেই হল। বললেন, নাও, আর কি হবে, বর চাও। তারা বললে, আমরা অমর হতে চাই। ভগবান বললেন, ইম্পসিবল, তোমরা ত্রিলোক জয়ের আশা নিয়ে তপস্যায় বসেছিলে, তোমাদের আমি অমর করতে পারব না। বিষয়ী, ভোগী কখনও অমর হয় না। অন্য কিছু চাও। তখন তারা প্ল্যান করে বর চাইলে, আমরা যেন মায়াবিৎ অস্ত্রবিৎ বলবান কামরূপী হই। আর আমাদের যদি অমর না-ও করেন, একটা কাজ করে দিন, যেন ত্রিলোকের স্থাবরজঙ্গম থেকে আমাদের কোনও ভয় না থাকে। মৃত্যু যদি হয় তো পরস্পরের হাতেই হবে। ব্রহ্মা বললেন, ঠিক হ্যায়। তাই হবে। এই পর্যন্ত ব্রহ্মার একটা মাথাই ছিল।
আমেরিকান সাংবাদিক বললেন, 'এক্সকিউজ মি, হাউ মেনি হেডস ব্রহ্মা হ্যাড। রাবণ হ্যাড টেন।'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'হোয়াই হ্যাড? ইজ ব্রহ্মা ডেড? ব্রহ্মা অমর, তিনি সৃষ্টিকর্তা বিধাতা। অ্যাট প্রেজেন্ট ব্রহ্মা ওনস ফোর হেডস। পরে আরও অ্যাড হবে কি না, আমি জানি না। লেট মি সে, এই চারটে মাথা কেমন করে হল! ব্রহ্মার বরে, টেরিফিক শক্তিশালী হয়ে তারা দৈত্যপুরীতে গিয়ে, আমোদ-আল্হাদ নারী ধর্ষণ নির্যাতন করে মনের আনন্দে দিনাতিপাত করতে লাগল। হঠাৎ তাদের মনে হল স্বর্গ জয় করতে হবে। দেবতাদের পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখাতে হবে। দেবতাদের চিরকালের বোকামি হল—নিজের বিপদকে আমন্ত্রণ করে আনা। শিব একবার একজনকে বর দিয়েছিলেন, সে যার মাথায় হাত রাখবে সে ভস্ম হয়ে যাবে। বর পেয়েই সে বললে, ঠাকুর, তোমার মাথায় হাত রেখে পরীক্ষা করে দেখতে চাই, সত্যিই আমার সেই শক্তি হয়েছে কি না। শিব দৌড়োচ্ছেন, পেছনে ছুটছে সেই বর-প্রাপক। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালে ছোটাছুটি। শেষে শিব এসে স্ত্রীর পায়ের তলায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। মা কালী খাঁড়া হাতে শিবের বুকের ওপর চেপে দাঁড়ালেন—আয় ব্যাটা! এলেই ধড় থেকে মুণ্ড ক্যাচাৎ। আজও সেইভাবে স্বামীকে পায়ে চেপে দাঁড়িয়ে আছেন—বর দেওয়ার মতো অপকর্ম আর যাতে করতে না পারেন। পেপার ওয়েটের মতো হাজব্যান্ড ওয়েট। ব্রহ্মারও সেই অবস্থা, বর দিয়ে কেলেঙ্কারি অবস্থা। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে সুন্দ, উপসুন্দ স্বর্গ অ্যাটাক করে বসল। দেবতারা তো আমেরিকানদের মতো। তেমন মাতামাতি লড়তে পারে না। দেবতারা যাদের বর দেন তার টেরিফিক লড়তে পারে। সুন্দ-উপসুন্দ আসছে শুনেই দেবতারা স্বর্গ ছেড়ে চম্পট। তাঁরা জানেন, ব্রহ্মা অ্যায়সা বর দিয়েছেন, দেব-মানব কেউ তাদের বধ করতে পারবে না। স্বর্গ ছেড়ে সোজা ব্রহ্মলোকে। দেবতাদের দেবভাষার অনুস্বর, বিসর্গে ব্রহ্মার নিদ্রা ছুটে গেল। কী ব্যাপার তোমাদের? এত হল্লা কীসের? স্বর্গ ছেড়ে সব আমার গেস্ট হাউসে? ক্যা হুয়া! দেবতারা বললেন, হুক্কা হুয়া। অ্যাটাকড বাই সুন্দ-উপসুন্দ। এমন বর দিয়েছেন, আমাদের অস্ত্রে অবধ্য। দুর্বোধ্য ভাষায় খিস্তি-খেউড় করছে। এদিকে সুন্দ-উপসুন্দ ইন্দ্রলোক, যক্ষ, রক্ষ, খেচর, পাতালবাসী নাগ, সমুদ্রতীরবাসী ম্লেচ্ছ, সব জয় করে, আশ্রমবাসী তপস্বীদের ওপরেও টরচার চালাতে লাগল। ব্রহ্মা দেখলেন, মহা প্রবলেম! দেবতারা ব্রহ্মলোকের বাজেট ফেল করিয়ে দেবে। রিফিউজি হয়ে কতকাল থাকবে! পিপে পিপে মদ ওড়াচ্ছে। দিস্তে দিস্তে লুচি! হাণ্ডা হাণ্ডা ক্ষীর। ব্রহ্মা বিশ্বকর্মাকে ডাকলেন।
সাংবাদিক বললেন, 'হু ইজ দ্যাট গাই?'
—গরু নয়, গরু নয়।
—আমরা আমেরিকানরা মানুষকে গাই বলি।
—আই সি। বিশ্বকর্মা বিশ্বরূপ কর্মটি করেছেন। তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার, মেকানিক্যাল, সিভিল, কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল। তিনি একজন ভাস্কর, ল্যান্ডস্কেপ আর্টিস্ট। ব্রহ্মার ওয়ার্কশপ, স্টুডিয়ো, ল্যাবরেটরির ইনচার্জ। ব্রহ্মা বিশ্বকর্মাকে ডেকে বললেন, তুমি এমন এক প্রমদা সৃষ্টি করো, যাকে সকলেই কামনা করে। বিশ্বকর্মা ত্রিলোকের স্থাবরজঙ্গম থেকে যতরকমের মনোহর উপাদান আছে, সব সংগ্রহ করে নিজের ওয়ার্কশপে নিয়ে এলেন। রাতের পর রাত কাজ করে, জগতের উত্তম বস্তু তিল তিল করে মিলিয়ে, অতুলনীয়া রূপবতী এক নারী সৃষ্টি করলেন। ব্রহ্মা তার নাম রাখলেন তিলোত্তমা। ব্রহ্মা বললেন, যাও, সুন্দ-উপসুন্দর মাথা ঘুরিয়ে দিয়ে এসো। বলে নিজের মাথাটাই ঘুরে গেল। তিলোত্তমা যাওয়ার আগে দেবতাদের প্রদক্ষিণ করছে। ঘুরতে ঘুরতে তিলোত্তমা যেদিকেই যায়, তাকে দেখবার জন্যে সেই দিকেই ব্রহ্মার একটা করে মুখ বেরোয়। অরিজিন্যালি ব্রহ্মার একটা মুখ ছিল, তিলোত্তমার রূপের ঠেলায় চারটে মুখ বেরিয়ে পড়ল। তিনি চতুর্মুখ হলেন। ইন্দ্রের হয়ে গেল এক হাজার চোখ। শিব ঠাকুর স্ট্যাচু হয়ে গেলেন। সেইজন্যে তাঁর নাম হল স্থাণু। তিলোত্তমা বেরিয়ে পড়ল তার মিশনে। সুন্দ-উপসুন্দ তখন বিন্ধ্যপর্বতের কাছে পুষ্পিত শালবনে সুরাপানে মত্ত হয়ে বিহার করছিল। এমন সময় মনোহর রক্তবসন পরে তিলোত্তমার এন্ট্রি। সুন্দ তার ডান হাত আর উপসুন্দ বাঁ হাত ধরলে। ভুরু কুঁচকে সুন্দ বললে, এ আমার বউ, তোমার গুরুর মতো। প্রণাম করো। উপসুন্দ বললে, মাইরি আমার। মামার বাড়ি! এ আমার বউ, তোমার মেয়ের মতো। হাতটা ছেড়ে দাও, গুরু। তখন সুন্দর তাল ঠোকা, আয় আমার সম্বন্ধীর পো। উপসুন্দ বললে, আয় শালা, মেরে তক্তা করে দেব। দুজনে গদা নিয়ে গদা-গদি শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে দুজনে ফিনিশ। দেবতা আর মহর্ষিদের নিয়ে ব্রহ্মা বিন্ধ্যপর্বতে এসে তিলোত্তমাকে বললেন, ওয়েল ডান, সুন্দরী। তবে তোমার জন্যে আরও অনেকে মরার আগে তোমাকে আমি আদিত্যলোকে ডেসপ্যাচ করে দিচ্ছি। তোমাকে ভালো করে আর কেউ দেখতে পাবে না। এই গল্পটি বলে, নারদ-সাবধান করলেন, ধর্মরাজ! পাঞ্চালীকে দেখলুম। বিউটি বিউটি। তোমরা পাঁচ ভাই, সুন্দ-উপসুন্দ হতে বেশি দেরি হবে না। তার আগেই নিজেদের মধ্যে একটা চুক্তি করলুম, দ্রৌপদী এক একজনের কাছে এক এক বছর থাকবে। সেইসময় অন্য কোনও ভাই তাকে বা তাদের দেখলে, তাকে ব্রহ্মচারী হয়ে বারো বছর বনবাসী হতে হবে। তার মানে চার বছর পরে পরে দ্রৌপদী এক একজনের কাছে, ফিরে আসবে। এই ভাবেই আমরা পাঁচজনে পাঁচটা ছেলে করে ফেললুম, আমার ছেলের নাম, প্রতিবিন্ধা, ভীমের সুতসোম, অর্জুনের শ্রুতকর্মা, নকুলের শতানীক আর সহদেবের শ্রতসেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর অশ্বত্থামা চোরের মতো এসে আমাদের পাঁচটি ছেলেকেই কচুকাটা করেছিল। আমাদের মতো ক্যাবলা ভূভারতে খুব কমই জন্মেছে। তবে রাজা রাম আপনি আমার উপমা।
শ্রীরাম বললেন, 'কীরকম, কীরকম!'
—একবার পাশায় সর্বস্বান্ত হয়েও আমার শিক্ষা হল না। ধৃতরাষ্ট্র যেই দ্বিতীয়বার পাশা খেলায় ডাকলেন আমি অমনি ধেই ধেই করে নেচে উঠলুম। সবাই বললে, তোমার এখনও শিক্ষা হল না। আমি বললুম, না, হয়নি। মানুষের ভালোমন্দ ভগবানের হাতে। বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র যখন ডেকেছেন, তখন বিপদ হবে জেনেও আমাকে যেতে হবে। বলেই আপনাকে টেনে আনলুম—রাম জানতেন যে, স্বর্ণময় জন্তু অসম্ভব, তথাপি তিনি স্বর্ণমৃগ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বিপদ আসন্ন হলে লোকের বুদ্ধির বিপর্যয় হয়। এই বলে আবার আমি শকুনি মামার সঙ্গে পাশা খেলতে গেলুম। এক দানেই বাজিমাৎ আর বনবাস। সেধে কেউ ভাগ্য বিপর্যয় ডেকে আনে? আনে, তার নাম ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। পাশার একদানে সব ফেলে দিয়ে বনবাস।
সবাই চমকে উঠলেন, তারস্বরে গান, 'কোথা তুমি গুরুদেব তা তো জানি না, তোমার করুণা ছাড়া কিছু চাহি না।' গান ক্রমশ এগিয়ে আসছে। আসছে একটা ট্যুরিস্ট বাস। বাসটার গায়ে একটা ফেস্টুন ঝুলছে, জয় বাবা তারকনাথ ট্র্যাভেলস। ভেতরে একগাদা নারী-পুরুষ কচি-কাঁচা হইহই করছে। সিঙ্গাপুরী কলা খাচ্ছে। ফেস্টুনে আরও লেখা আছে, কম খরচে ভূ-ভারত দর্শন। কোলের বাচ্চা ফ্রি, শিশুদের হাফ টিকিট। প্রাো: পতিতপাবন কুণ্ডু, একস ম্যানেজার বিপ্লবী অপেরা।
ভুঁড়িদাস একটা লোক নেমে এসেই খুব লম্ভঝম্ভ শুরু করল, সেই মনে হয় পতিতপাবন। হাতে একটা খেঁটে লাঠি। আস্ফালন করতে করতে বলছে, 'নেমে আসুন, নেমে আসুন, হিমালয় দর্শন করুন। এখানে তিনঘণ্টার বেশি নয়। বড় ছোট যার যা করার করে নিন। যাদের ডায়াবিটিস আছে তারা হাতা দিয়ে তুলে তুলে ডায়াবিটিস আইসক্রিম খান। তাকিয়ে দেখুন চারপাশে। এ হল ঈশ্বরের মালাই কারখানা। কামধেনুর খাঁটি দুধ থেকে তৈরি। ঈশ্বর এখানে মালাই হয়ে আছেন। গলায় সাতপ্যাঁচ মাফলার জড়িয়ে খাবেন। সর্দিকাশির ওষুধ আমার শর্ট পড়েছে।' 'কোথা তুমি, গুরুদেব...।' পতিত হুকুম দিলে 'গান স্টপ, গান স্টপ। গান চলবে মুভমেন্টের সময়। থেমে থাকলে গান নয়। কানের পোকা বেইরে এল বাপ।'
হঠাৎ পতিত-এর নজর পড়ল এই জমায়েতের ওপর। এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলেন, 'আপনারা কোন ট্রাভেলস, হালদার ট্রাভেলস।'
যুধিষ্ঠির বললেন, 'আমরা ট্রাভেলস নই, ট্রাভলার। আমরা স্বর্গ থেকে আসছি।'
—আপনারা স্বর্গ থেকে আসছেন? আমরা স্বর্গে যাচ্ছি। নেপাল থেকে কলকাতায় ফিরতে গিয়ে সাতশো ফুট নীচে খাদে পড়ে গেলুম তারপর দেখলুম যে যেভাবে ছিলুম সেইভাবেই এখানে চলে এসেছি। বাসের আত্মার ভেতর মানুষের আত্মা। আপনারাও কী আত্মা।
—আমার কেসটা একটু গোলমেলে। আমি তো সশরীরে স্বর্গে গিয়েছিলুম।
—আপনি কে?
—আমার নাম ছিল ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। আর ওই যে বসে আছেন রাজার ছেলে শ্রীরামচন্দ্র, বর্তমানে বাবরি মসজিদখ্যাত। ওঁর ডেথটা কী ভাবে হয়েছিল জানা নেই আমার। রমণী দুজনের একজন হলেন সীতা, অন্যজন দ্রৌপদী আমার স্ত্রী। ওই কমবয়সি, ফরসা ছেলেটি ভারতের একস প্রাইম মিনিস্টার, যাঁকে গঁদের বোমা দিয়ে মারা হয়েছিল। আর ওই চোটপাট চ্যাংড়া ছেলেটা হল ক্যারাটে মাস্টার ব্রুস লি। আর ওই ভদ্রলোক হলেন আমেরিকান সাংবাদিক।
—আইব্বাস! হিমালয়ের মাথায় কী কেলেঙ্কারি! তা আপনার স্বর্গ ছেড়ে চলে এলেন?
—আমাকে তো জানো। আমার স্বভাবই হল ছাড়া। দু'দুবার রাজত্ব ছেড়ে বনে গেছি। জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে হরণ করল। ভীম অর্ধচন্দ্র বাণে মাথা মুড়িয়ে দিলে। মাথাটা উড়িয়েই দিত। দু:শলা বিধবা হবে। বললুম, ছেড়ে দাও। সেই জয়দ্রথ কুরুক্ষেত্রে আমাদের কালঘাম ছুটিয়ে দিলে। আমি ছুটি নিয়ে এসেছি। কৃষ্ণ আমাকে পাঠিয়েছেন দেখতে, ধর্মের গ্লানি।
হয়েছে কি না! তা হলে তিনি আর একবার জন্মাবেন। যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম। ধর্মের অধ:পতন আর অধর্মের অভ্যুত্থান হলেই আর রক্ষা নাহি। তিনি মায়াবলে দেহ ধারণ করবেন, হাতে সুদর্শন চক্র।
—তাঁকে গিয়ে বলবেন স্যার, ধর্মের গ্লানি কী? ধর্মবস্তুটাই লোপাট। রাধা আর কৃষ্ণ ছাড়া কিছু নেই। সবাই রাধা, সবাই কৃষ্ণ? রাধারা পেট, পিঠ দেখিয়ে ঘুরছে, আর কৃষ্ণরা ধরধর করে ছুটছে। সব গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলছে, একটা ছেলে একটা মেয়ের গলায় মালা পরিয়ে সিঁদুর দিয়ে দিলে। নামি কলেজের অধ্যাপক নিজের বাড়িতে ছাত্রীকে বই পড়াবার নাম করে বইয়ের র্যাকের পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে ছাত্রীর শরীরের ভূগোল চটকাতে শুরু করলেন। পুলিশ বাসের মধ্যেই মহিলা-যাত্রীর স্তনমর্দন করছে। ছবি বেরিয়েছে পত্রিকায়। গণতন্ত্রের গণ এখন দুটো জায়গায় জমেছেঃ গণধর্ষণ আর গণধোলাই। আপনার কৃষ্ণকে বলবেন, আর জন্মাবার দরকার নেই। খুব হয়েছে। মালপো আর মালাইকারি একসঙ্গে চলেছে। কলি শেষ হতে তিন কোটি বছর নাকি এখনও। কলির ধর্মই হল মদ, মেয়েছেলে, কালো টাকা। সৎ পথে না খেয়ে মরো, অসৎ পথে বিরিয়ানি হাঁকাও।
শ্রীরাম বললেন, 'আরে সে তো আমার ভক্ত তুলসীদাস লিখেই গেছেন কলির শ্লোক :
গোউয়া দোকে কুত্তা পালে ওসকি বাছুর ভুখা।
শালেকে উত্তম খিলাওয়ে বাপ না পাওয়ে রুখা।।
ঘরকা বহুরি প্রীত না পাওয়ে চিত চোরাওয়ে দাসী।
ধন্য কলিযুগ তেরি তামাসা দুখ লাগে ঔর হাসি।।
মানেটা হল, হে কলিযুগ! তুমি ধন্য! তোমার তামাসার শেষ নেই। গরুর দুধ দুয়ে নিয়ে কুকুরকে খাওয়াচ্ছে আর তার বাছুর দুধ না পেয়ে শীর্ণ হচ্ছে। শালাকে কালিয়া কোপ্তা খাওয়াচ্ছে, বাপের পাতে শুকনো রুটি। নিজের স্ত্রী শূন্য বিছানায়, স্বামী বেশ্যালয়ে মেয়েমানুষ জাপটে শুয়ে আছে। গলায় হীরের পদক। ধন্য কলি। দু:খও হয়, হাসিও পায়। কলি শেষ না হলে কৃষ্ণ জন্মে কি করবেন! নির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। তবে পশ্চিমবাংলার কংগ্রেস আবার ভাঙছে। নারীজাগরণ হচ্ছে। সীতা আর পাঞ্চালী গিয়ে হাত মেলাতে পারেন। এম. পি., এম. এল. এ. হয়ে যদি কিছু করতে পারেন।
তিন মা আর তিনজন কিশোর এগিয়ে এল। একটা বাচ্চা বললে, 'ওমা! ওই দ্যাখো, ঠিক যেন ব্রুস লি। আমাদের দেওয়ালে পোস্টার আছে।' ছেলের মা বললে, 'ঘিরে ধর, ঘিরে ধর। অটোগ্রাফ চা। অটোগ্রাফ।' পতিতপাবন বললেন, 'ব্রুস লি! আরে আপনি এই টং-এ চড়ে বসে আছেন কেন? পশ্চিমবাংলায় আপনার কত বড় ফিলড পড়ে আছে। সেখানকার মায়েরা ছেলেদের অল ইন ওয়ান করতে চাইছেন। যোগশিক্ষা, সংগীত, নৃত্যশিক্ষা, সাঁতার, ছবি আঁকা, হাইজাম্প, লংজাম্প, পোলভল্ট, আবৃত্তি, শ্রুতিনাটক, ক্যারাটে, কুং ফু, লেটার নিয়ে পাশ করবে, আই. এ. এস. হবে, আসরে বসে রবীন্দ্রসংগীত গাইবে, সিনেমার হিরো হবে। সব হবে, সব হবে। বড়লোকের জামাই হবে, পূজা ভাটের মতো বউ হবে।' পতিতপাবন হাসতে হাসতে বললেন, 'অ্যায় হুলো, আমাদের ওই জাতীয় সংগীতের ক্যাসেটটা চালিয়ে দে তো!'
হিমালয় স্পন্দিত হল গানের সুরে। বঙ্গদেশের জাতীয় সংগীত :
মা আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল,
নুন আনতে পান্তা শেষ হয়ে যায়, মা।
কারো দুধে চিনি কারো শাকে বালি, মা
আর নেপোয় মারে দই, ই ই হি।।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন