সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

তোমার কী ইচ্ছে করে? এই প্রশ্নের কী উত্তর হবে? ধরা যাক ইচ্ছাপূরণের দেবতা এসে বলছেন, বল, গদাই, তোর ইচ্ছেটা কী! তোর বাসনা আমি পূর্ণ করব। সঙ্গে সঙ্গে আমার বউ এসে, কনুই মেরে আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলবে—'থামো, থামো, চিরকালের মাথামোটা তুমি। তোমার বড় ভাই ভুজুংভাজুং দিয়ে বাড়ির দোতলার দখল নিয়ে নিয়েছে। যে কেউ এসে কাঁদলেই তুমি দাতা কর্ণ। মুখচোরা, লাজুক, ভীতু, মাথামোটা, ম্যাদামারা টাইপের একটা লোক।'
আমার বউ হোঁত হোঁত করে সামনে এগিয়ে এল,
—আপনি ভগবান?
—লোকে তাই বলে। কী চাই বলো।
—এর আর বলাবলি কী আছে! প্রচুর টাকা চাই।
—তথাস্তু! তাই পাবে। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
বাক্স, পেঁটরা, সিন্দুক, আলমারি, গুদাম, আটচালা, মাটচালা, প্যাকিংকেস, জুতোর খালি বাক্স, এমনকী ছাতের একপাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ফুটো জলের ট্যাঙ্ক, সব টাকায় টাকায় ভরে গেল।
এত টাকায় কী করা যায়!
বউ বলল, পাঁচ হাজার দামি দামি শাড়ি ব্লাউজ আর পেটিকোট কিনব। যতদিন বাঁচব আমরা কেবল ইলিশ আর চিংড়ি মাছ খাব। জলের বদলে ফলের রস। সবসময় জামদানি আর বালুচরি পরে থাকব। সিল্কের গামছা ব্যবহার করব। চটিতে ডায়মন্ড ফিট করব। বিশাল একটা 'প্যালেস' তৈরি করাব। চারপাশে এত বড় একটা বাগান, যে হেঁটে ঘোরা যাবে না, হাতির দাঁতের পালকিতে চেপে ঘুরব। কোনও সময়ে কোনও কাজ করতে হবে না। একশো কাজের লোক। হাত থেকে একটা সেফটিফিন পড়ে গেলেও নীচু হয়ে তুলব না। একজন এসে তুলে দেবে। যখন খবরের কাগজ পড়ব, তখন পাশে একজন বসে থাকবে, পাতা উলটে ভাঁজ করে দেওয়ার জন্যে। বাতাসে খবরের কাগজের পাতা ওলটানো যে কী ঝকমারি কাজ! গ্রীষ্মকালে সব ঘর মেশিন-ঠান্ডা, শীতকালে মেশিন-গরম। এমন একটা বিছানা তৈরি করাব যা নৌকার মতো দুলবে। বালিশে যন্ত্র ফিট করা থাকবে, মাথা রাখলেই অটোমেটিক ঘুমপাড়ানি গান। ছেলেমেয়েদের আর, ওরে পড়, ওরে পড়, বলে মাথা খারাপ করার প্রয়োজন হবে না। তিন পুরুষ বসে বসে খাবে। লোকে সপরিবারে পুরী যায় আমরা যাব সুইজারল্যান্ডে। বিস্কুট খাব, কেক খাব, চকোলেট খাব, চিজ খাব, আইসক্রিম খাব, ডজন ডজন সোনার ঘড়ি কিনব। তুমি কাঠের খড়ম পরে আল্পসের বরফে স্কি করবে। আমি হিন্দি ছবির নায়িকার মতো চোখে 'গোগো গগলস' পরে মাউন্টেন টপ রেস্তোরাঁয় বসে রূপোর কাঠিতে গেঁথে গেঁথে স্ট্রবেরি খাব, অ্যাভাক্যাডো খাব। ম্যাগাজিনে পড়েছি, চোখে দেখিনি কোনও দিন। হাজার শিশি ভীষণ দামী সেন্ট কিনব। এক ঝলক মাখলে এক মাইল এলাকা আমোদিত। চিমনি লাগানো একটা কটেজ কিনব। প্ল্যাস্টিক সার্জারি করে চামড়া টান টান করাব। যৌবনকে চিরস্থায়ী করে আষ্টেপৃষ্টে ভোগ করব। যা খাব তাই হজম হবে। গাঁটে গাঁটে বাতের ব্যাথায় যাতে বাবারে মারে করতে না হয়, সেইরকম একটা ব্যবস্থা করব। চুল যেন ভুসভুস করে না ওঠে, খুসকি যেন না হয়! জাপান থেকে নানারকমের উইগস কিনে এনে এক একদিন এক এক রকম হেয়ার স্টাইল করব। ঘরের মধ্যেই একটা সুইমিং পুল থাকবে। ছোট ছোট রাজহাঁস ভেসে বেড়াবে। ঠোঁটে করে সাবান এগিয়ে দেবে।
—রাজহাঁস ছোট পাবে কোথায়। সবই তো ধেড়ে ধেড়ে। বাজখাঁই প্যাঁক প্যাঁক।
—আরে ধুর! পয়সায় কি না হয়! হাতি ছুঁচো হয়। বনসাই করা বট গাছ হয়, রাজহাঁসের বনসাই হবে না কেন? ঘরের মধ্যে চেপে বেড়াবার জন্যে অস্ট্রেলিয়া ছোট ছোট ঘোড়া তৈরি করেছে। বিলিতি ম্যাগাজিনে ছবি দেখেছি। জাপানিদের অর্ডার দিলে সব করে দিতে পারে। একজনের চাপার মতো ছোট্ট টুলের মাপের হেলিকপটার তৈরি করেছে। পাখা খুলে খাটের তলায় রাখা যায়। টুলটাকে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে বসে বসে মাংসে হেলুনি মারা যায়। বিজ্ঞানে কী না হয় বৎস! একটা মানুষের মতো আরও একশো, হাজার মানুষ তৈরি করা যায়। এর নাম 'ক্লোনিং'। আমি ভাবছি আমার দশটা নকল তৈরি করাব। আমি শূন্য অবস্থা হতে দেব না।
—অবিকল তোমার চেহারা!
—অবিকল।
—ওইরকম ভোঁতা নাক। লক্ষ্মী ট্যারা চোখ! পাঁউরুটির মতো ঠোঁট।
—এই দেখেই প্রেমে পড়েছিলে!
—হিপনোটাইজ করেছিলে। তিন বছরেই জ্ঞানচক্ষু খুলে গেছে। তোমার নকলের স্বভাব-চরিত্রও কি ওই আসলটার মতোই হবে!
—অবশ্যই।
—ওইরকম, ঘরের পলস্তারা খসানো গলা!
—তোমাদের মতো বদ পুরুষদের দাবিয়ে রাখার জন্যে এইরকম হাবিলদারের মতো গলারই দরকার। যেদিকে তাকাবে, যতদিন তাকাবে দেখবে আমি, শুনবে আমার গলা। আকাশে বাতাসে আমার সরব, সগৌরব উপস্থিতি।
—খোলটা যাই থাক, ভেতরে প্রেমের পুরটা খানিক বাড়ানো যায় না, সেই বিয়ের আগে যেমন ছিল! মধুবাতা ঋতায়তে!
—আমেরিকান বিজ্ঞানী, যাদের দিয়ে করাব, তাদের জিগ্যেস করব। তবে, প্রেম মনে হয়, দেহে থাকে না, বাইরের মাল। মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন