সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বড়মামা বললেন, 'প্রত্যেক মানুষেরই, যা শিখেছে, তার বাইরেও, আরও কিছু শেখা উচিত। শিক্ষার শেষ নেই।' মেজমামা বললেন, 'ঠিক বোঝা গেল না, তুমি কোন দিকে যেতে চাইছ। আর একটু পরিষ্কার করে বলো।' বড়মামা বললেন, 'চাকরির দরখাস্তে একটা কলম থাকে, একস্ট্রা কারিকিউলার অ্যাকটিভিটি। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রমের বাইরে তুমি আর কী শিখেছ? যেমন ধরো, আমি ডাক্তার। ডাক্তারি ছাড়া আমি আর কী জানি! কিছুই জানি না। তুমি অধ্যাপক। অধ্যাপনার বাইরে তুমি কী জান? কিছুই জানো না। তাহলে চাকরির দরখাস্তে তুমি আর আমি ওইখানে কিছুই লিখতে পারব না। লিখতে হবে, নিল। এর চেয় লজ্জার আর কিছু নেই।'
মেজমামা বললেন, 'আমরা আর চাকরির দরখাস্ত করতে যাব কোন দু:খে। আমাদের জীবনে যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে।'
'ধরো, যদি করতেই হয়!'
'যদির কথা নদীর জলে।'
'এ কথা আমরা আমাদের ছেলেবেলায় বলতুম, তখন আমাদের বোধবুদ্ধি ছিল না। এখন আর ও কথা সাজে না। আমাদের যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। জানি না বলাটা পরাজয়। ডিফিটিস্ট মেন্টালিটি। পরাজিতের মনোভাব। শিক্ষার কোনও বয়েস নেই। যে কোনও বয়সে যে-কোনও জিনিস শিখতে শুরু করা যায়।'
'তুমি কোন লাইনে শুরু করবে?'
'বেহালা। আমি বেহালা শিখব। ঢোলা পাজামা, পাঞ্জাবি তৈরি হয়ে গেছে। ইটালি থেকে বেহালা আসছে। গুরুও পেয়ে গেছি। এরপর আমার নতুন লাইনে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ। সকলে চমকে যাবে।'
'বেহালা বুঝলুম। ঢোলা পাজামা পাঞ্জাবিটা কী কারণে?'
'এক এক বাদ্যযন্ত্রের জন্যে এক এক পোশাক। পাজামা পাঞ্জাবি পরে ব্যাগপাইপ বাজানো যায় না। ব্যাগপাইপের জন্যে চাই ব্যাগি কাজ-করা পাঞ্জাবি। ঢাকের জন্যে মালকোঁচা মারা খেঁটে ধুতি, হাফ-হাতা গেঞ্জি বা ফতুয়া। বেহালার জন্যে ঢোলা পাজামা, ঢোলা পাঞ্জাবি। লম্বা চুল। চোখে উড়ু-উড়ু দৃষ্টি। খোলা জানলার ধারে দাঁড়াতে হবে। একটা গাছের ডাল ছবির মতো ঝুলে থাকবে। বাঁ হাতের ওপর বেহালাটা উলটে থাকবে, ডান হাতে ছড়ি। বাঁ দিকে একটু হেলে থাকব। দু'আঙুলে ছড়ির আলতো টান। সিঁ করে সুর বেরোবে। বেহালার কান্না। যে বাজাচ্ছে, সে কাঁদছে, যারা শুনছে, তারা কাঁদছে। প্রকৃতি কাঁদছে। কাঁদছে পাখি। আকাশে মেঘ জমছে থরে থরে, ঝেঁপে বৃষ্টি।'
'কোনও দেশে বৃষ্টি না হলে, বেহালা বাজিয়ে বন্যা আনা যাবে?'
'সেইরকম বাজিয়ে হতে হবে। মিঞা তানসেন মেঘমল্লার গাইলে বৃষ্টি হত। দীপক গাইলে ঝাড়লণ্ঠন জ্বলে উঠত।'
'তোমার গুরু কে হচ্ছেন?'
'বিশ্বনাথ পাকড়াশী। তিনি বেহালায় যে-কোনওরকম শব্দ বের করতে পারেন। তাঁর বেহালা মাঝরাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। রেগে গেলে লোহাকাটা করাতের মতো শব্দ করে।'
'বেহালা তোমার মাথায় কে ঢোকাল?'
'ওস্তাদ বিশ্বনাথ পাকড়াশী। একটা মাইলড হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। আমার ট্রিটমেন্টে একেবারে ফিট। মানুষটার কৃতজ্ঞতা বোধ অপরিসীম। আমাকে বললেন, আমার যা আছে সব আপনাকে দিয়ে যাব ডাক্তারবাবু, শুধু বেহালাটা কিনে ফেলুন।'
'কত দাম?'
'ছ'হাজার।'
'জলে ফেলে দাও।'
'কোনটা? বেহালাটা?'
'না, না টাকাটা। তোমার বেহালা সাধার সময় কোথায়?'
'কেন মাঝরাতে! সব যখন নিশুতি হয়ে আসবে, তখন আমি ওই ঢোলা পাজামা আর লটরপটর পাঞ্জাবি পরব। কানে গুঁজব আতর। ঘর অন্ধকার। বাইরে চাঁদের আলো। দূরে পাপিয়া ডাকছে। মারব টান। সুঁই করে শব্দ বেরোবে। হৃদয় মোচড়ানো শব্দ। যারা ঘুমিয়ে আছে, তারা মধুর স্বপ্ন দেখবে। যাদের ঘুম আসছে না, তারা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়বে।'
সাতদিন পরে বড়মামার বেহালা এসে গেল। সুন্দর ছিমছাম বাক্স। বেহালাটার খুব রূপ। ঝকঝকে পালিশ। বড়মামা পাজামা, পাঞ্জাবি চড়িয়ে চলে গেলেন ওস্তাদজির বাড়ি। বড়মানুষ রোগীরা চেম্বারে বসে থেকে থেকে অধৈর্য হয়ে কোঁত পাড়তে পাড়তে চলে গেলেন। একজন বেঞ্চে লম্বা হয়ে নাক ডাকাচ্ছেন। বড়মামা এগারোটার সময় ফিরে এলেন। সেই নাছোড়বান্দা রোগীটিকে দেখে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমাকে বললেন, 'তুই ওকে দেখে ছেড়ে দে।'
'আমি ডাক্তার! তুমি আমাকে ধোলাই খাওয়াতে চাও! তুমিও বাদ যাবে না। আজকাল রোগীরা একটু এদিক সেদিক হলেই ডাক্তার পেটায়।'
কয়েকদিন আগেই রোগীসাধারণ ডক্টর প্রশান্ত সেনকে পিটিয়ে হাসপাতালে শুইয়ে দিয়েছে। কেসটা এখন তিন ধরনের ডাক্তারে মেরামত করার চেষ্টা করছেন, দাঁতের, চোখের আর হাড়ের। বড়মামার সেই ঘটনাটা মনে পড়ল। বেহালাটা রোগী দেখা বিছানায় শুইয়ে বেঞ্চে শুয়ে থাকা রোগী নিয়ে পড়লেন। এক একজন মানুষ থাকেন তাঁরা হলেন অসুখের অভিধান। শরীরের যেখানে হাত দেবে সেইখানেই অসুখ। বায়ু পিত্ত কফ আলসার ক্যানসার বাত, কিছু আর বাকি নেই। বড়মামা খানিক টেপাটিপি করে একটা ইনজেকশন দিয়ে দিলেন, সব শান্তি। রোগী চলে গেল। ডিসপেনসারি বন্ধ। বৃদ্ধ কমপাউন্ডার বললেন, 'সাতটা জরুরি কল ছিল, একটাতেও আপনি গেলেন না। কাজটা ভালো হল না। আজকাল প্রায়ই এইরকম করছেন। এতে আপনার বদনাম হয়ে যাবে। প্র্যাকটিস নষ্ট হবে।'
'আপনি বড় বড় করে লিখে দিন পোস্টার, সব অসুখই মনে। মন ভালো করুন। অনর্থক ডাক্তারকে পয়সা দিয়ে দেউলে হবেন না। মনের জোরে অসুখ সারান।'
রাত বারোটার সময় বড়মামা বেহালা হাতে দোতলার জানলায় দাঁড়ালেন। সামনে দক্ষিণের হুহু আকাশ। নারকেল আর সুপুরি পাতার খসখস। আকাশে একাদশীর চাঁদ। ঘরের আলো নেবানো। আমি বিছানায়। আমার ওপর আদেশ হল, সা রে গা মা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়। পিপারমিন্টের মতো মিষ্টি ঘুম।'
বেহালাটাকে খুব আর্টে ধরে বড়মামা ছড় টানলেন। ভয়ংকর একটা শব্দ বেরল। যেন কারও গলা টিপে ধরা হয়েছে, সে আর্তনাদ করে উঠছে। রাস্তায় যে কটা কুকুর ছিল সব কটা জানলার দিকে মুখ তুলে ঘেউ-উ করে উঠল। বীভৎস চিৎকার। বড়মামা বললেন, ওদের সা-টা ঠিক সহ্য হল না। আচ্ছা, রে-টা দেখি।'
আবার ছড় টানলেন। এইবার আরও ভয়ংকর শব্দ। যেন রেলে কেউ কাটা পড়েছে। পাশের বাড়ির একটা বাচ্চা ককিয়ে কেঁদে উঠল। কুকুরগুলো আরও তারস্বরে চিৎকার করে উঠল। বড়মামা ছড়ি তুলে দিয়ে বললেন, 'হোয়াট ইজ দিস! এরা এইরকম সুর-বিরোধী হয়ে উঠল কেন?'
মেজমামা বাইরে থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, 'সুর নয়, ওরা অসুর-বিরোধী। তোমার যন্তর থেকে যে দুটো সুর বেরল, এই যদি নমুনা হয়, তাহলে আর বের কোরো না। খোলে ভরে রেখে শুয়ে পড়ো। মানুষকে একটু শান্তি দাও।'
'এমন কিছু খারাপ সুর বেরোয়নি। বেশ মিহি মোলায়েমই বেরিয়েছে। তাও তো এখনও কোমল পর্দা লাগাইনি, সা আর রে—তাইতেই এই অবস্থা। আর একটু বেশি রাতে কোমল লাগাব। দেখবি আকাশ থেকে পরী নেমে আসবে।'
'শোনো, সাইকেল কোথায় শিখতে হয় জানো! ফাঁকা মাঠে। বেহালা কোথায় শিখতে হয় জানো! পোড়ো বাড়িতে। যার আশেপাশে মাইল তিনেকের মধ্যে কোনও লোকালয় নেই।'
'সে আমি পাব কোথায়? নিজের বাড়িতে বসে নিজের সাধনা করতে পারব না! এতো বড় তাজ্জব কী বাত!'
'আজকে শুয়ে পড়ো। রে পর্যন্তই থাক, কাল দুপুরে বরং গা-মা কোরো।'
'তোর আপত্তির কারণটা কী?'
'আমাকে কাল ভোরবেলা উঠতে হবে, কানের কাছে তোমার এই আতর্নাদ অসহ্য।' মেজমামা ওয়ার্নিং দিয়ে চলে গেলেন। রাত প্রায় একটা। বড়মামা সব দরজা জানলা বন্ধ করে বেহালা নিয়ে মশারির ভেতর চলে এলেন। আটকাঠ বন্ধ ঘর, মশারির ভেতর বেহালা।
কুঁই কুঁই করে বললুম, 'আজ থাক না বড়মামা, কাল আবার হবে।'
'শোন, সাধনা ইজ সাধনা। সাত রাউন্ড সারেগামা করে তারপর বেহালাকে শয়ন দিয়ে আমি শোব। একগুঁয়ে না হলে সাধনা হয় না, কিছু শেখা যায় না।'
রাত দুটো পর্যন্ত বেহালা নানারকম শব্দ ছেড়ে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল। ভোরবেলা আবার সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বড়মামা চেয়ারে বসে বেহালা সাধছেন। বেসুরো বীভৎস শব্দ। একটা পর্দাও কি সুরে বেরোচ্ছে? ভয়ে ভয়ে বললুম, 'বড়মামা, একটুও তো সুর নেই। সবটাই বেসুরো।'
বড়মামা বললেন, 'বেহালার মতো ডিফিকাল্ট কিছু নেই। পর্দা ছাড়াই সুর বের করতে হয়, আঙুলের হিসেবে। কাল রাতের চেয়ে আজ একটু ভালো হচ্ছে না তোর কী ধারণা?'
কায়দা করে বললুম, 'আরও হবে।'
'আহা, সে তো হবেই। সাধনার কি শেষ আছে! এখন কাঁকরের মতো শব্দ বেরোচ্ছে, এরপর বেরোবে মিছরির মতো। যতদিন না হচ্ছে, ততদিন ননস্টপ প্র্যাকটিস চলবে। অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তনের মতো।'
'তোমার প্র্যাকটিস?'
'ডাক্তারখানা লাটে তুলে দেব। আমি আর ডাক্তার নই। আমি সুরসাধক।' নীচে হঠাৎ একটা হইচই। অনেকের উত্তেজিত গলা, 'রোম পুড়ছে, নিরো বেহালা বাজাচ্ছে, নেমে আসুন মশাই।' বড়মামা চমকে উঠলেন। বেহালা ফেলে নীচে নেমে গেলেন। হরিচরণবাবু বড়বামার পেশেন্ট। হার্টের রোগী। কাল না কি যায়-যায় অবস্থা হয়েছিল। বড়মামাকে পাওয়া যায়নি। রাতটা কোনওরকমে কেটেছে, সকালে রোগীর অবস্থা আবার ঝুলে গেছে। আত্মীয় স্বজনের অভাব নেই। তাঁরা দল বেঁধে তেড়ে এসেছেন। বড়মামাকে শাসাচ্ছেন, হরিচরণবাবুর কিছু হলে, বড়মামাকেও তাঁর সঙ্গে সহমরণে যেতে হবে। বড়মামা তাঁর ব্যাগ নিয়ে যে অবস্থায় ছিলেন, সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে গেলেন। না হল মুখ ধোওয়া, না হল চা খাওয়া।
বারোটা বাজল, একটা বাজল, বড়বামার পাত্তা নেই। আমরা সব হাঁ করে বসে আছি। দেড়টার সময় শোনা গেল, 'বলো হরি, হরি বোল।' আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে হরিচরণবাবু চলেছেন। একদিকে কাঁধ দিয়েছেন বড়মামা। বাড়ির সামনে এসে বললেন, ' বেহালাটা নিয়ে আয়।' হরিচরণবাবুর, বুকের ওপর বেহালাটা রাখা হল। হরিচরণবাবু আর বেহালা একসঙ্গে শ্মশানে চলে গেল। মেজমামা, বললেন, 'আহা, কী দু:খের আনন্দ!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন