সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমরা তখন কলেজে পড়ি। ৫৩-৫৪ সালের কথা।
সে সময় কলকাতা শহরটা এখনকার চেয়ে সুন্দর ছিল। এত লোকজন ছিল না! খেলার মাঠে তেমন মারাত্মক হাঙ্গামা হত না। শুধু টিকিটের লাইনের ওপর দিয়ে মাঝে সাঝে ঘোড়া ছুটে যেত। দু-একজন ছিটকে গিয়ে ময়দানের সিমেন্ট বাঁধানো বিশাল খানায় পড়ে হাত-পা ভাঙত। কখনও ঘোড়া পড়ে যেত পুলিশ আরোহী সমেত। কেউ কেউ খেলার মাঠের কাঠের বেড়া টপকে কাঁটা তার সরিয়ে গ্যালারিতে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক সময় তারে আটকে গাজনের সন্ন্যাসীর মতো ঝুলে থাকত। পুলিশ তখন ঘোড়ার পিঠে দাঁড়িয়ে সেই ফুটবলপ্রেমিককে নামিয়ে এনে একটু রদ্দা- টদ্দা মেরে ছেড়ে দিত। পুরো ব্যাপারটাই ছিল মজার। জীবন নিয়ে টানাটানির সম্ভাবনা ছিল না। খেলা শেষ। ময়দানও ফাঁকা। সবাই ভুলে যেত কী হয়েছে। আবার বড় খেলা হলে দেখা যাবে। এখনকার মতো মারাত্মক খুনোখুনি, বীভৎস অসভ্যতা, বিকট তাণ্ডব, গাড়ি পোড়ানো, দোকানের কাচ ভাঙা কখনই ঘটত না।
শীতের কলকাতায় ইডেনের তখন বড় আকর্ষণ ছিল ক্রিকেট। এখনও হয়তো আছে। তবে তখন আমরা ছাত্র ছিলাম তো। মনটা আকাশের মত, ভাবনা ছিল নদীর জলের মতো স্বচ্ছ, পরিষ্কার। তাই ইডেনকে যেন মনে হত স্বপ্নের বাগান, কত ফুল, কত গাছ, পাখি, আঁকাবাঁকা খাল, নৌকা, পাশেই গঙ্গা, জাহাজের মাস্তুল, ভোঁ। সেই ইডেনে ক্রিকেট। সেই সময়কার সব বাঘা বাঘা খেলোয়াড় অমরনাথ, হাজারে, মানকাঁড়, পঙ্কজ রায়, মুস্তাক। আমরা সব ছবি দেখতুম কাগজে—ক্রিকেটারদের ছবি, সাদা প্যান্ট, সাদা সোয়েটার, ভি-গলা, নীল বর্ডার, পায়ে প্যাড, হাতে ব্যাট। রেডিও রিলে শুনতুম—ইংরেজি ধারাবিবরণী, ইংরেজি শব্দ—স্পিন, গুগলি, ইয়র্কার, বাউনসার। মোহিত হয়ে যেতুম। সাহেবি খেলা। ইংল্যান্ডের লর্ডস, ওভাল থেকে আমদানি। এদেশে বড়লোকের ছেলেরাই খেলে! তখনও ভারতে সব নেটিভ স্টেটের রাজা মহারাজাদের দারুণ প্রতিপত্তি ছিল। মোটা মোটা টাকা ভাতা পেতেন। মহারাজ অফ জয়পুর, মহারাজ অফ কপূরথালা, গায়কোয়াড়, সিন্ধিয়া। রেসের মাঠে বিলিতি ঘোড়া ছুটত, একস মহারাজারা পোলো খেলতেন। শীতের কলকাতা রাজা মহারাজায় জমজমাট। গ্র্যান্ড হোটেল, গ্রেট ইস্টার্ন, স্পেনসেস সর্বত্র ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই। কলকাতার রাস্তায় রোলসরয়েস ছুটছে, আমেরিকান ফোর্ড, বুইক, জার্মান মার্সিডিজ। সেই কলকাতার ইডেনে ক্রিকেট। মনটা কেমন করে উঠত।
ক্রিকেট মানেই সুন্দর সুন্দর পোশাক পরা, সুন্দর সুন্দর খেলোয়াড়। ক্রিকেটের দর্শক মানেই স্যুটপরা, মাথায় কপাল ঢাকা টুপি রাজামহারাজা, বড়লোক, সুন্দর সুন্দর সিল্কের শাড়ি পরা মহিলা, বিলিতি সেন্টের গন্ধ। ক্রিকেট যেন রূপকথার জগতের খেলা—ঝাড়লণ্ঠন, কারপেট, বিশালবাড়ি, কাঠের সিঁড়ি, সাদা বিলিতি কুকুর, বলনাচ, পিয়ানো, অর্গান, বিশাল খাবার টেবিল থরে থরে সাজানো খাবার, ফল, লাল আঙুর, ফুটফুটে মানুষ, কেবল হাসি, মোটরের দরজা খোলা ও বন্ধ করার শব্দ।
দুপুরের দিকে গঙ্গার দিক থেকে শীতের ঠান্ডা হাওয়া আসত। ময়দানের সবুজ ঘাসে লুটিয়ে থাকা শীতের নরম রোদ কেঁপে উঠত। এখানে সেখানে পড়ে থাকত কমলা লেবুর টাটকা খোলা, দামি সিগারেটের প্যাকেট, আইসক্রিমের ডোরাকাটা ডোরাকাটা খালি কাপ। ময়দান আমাদের ভীষণ ভালো লাগত—শীতের ময়দান। ময়দানে এলে মনে হত পৃথিবীটা কাজের নয়, দু:খের নয়, অভাবের নয়, শুধু আমাদের উল্লাসের।
আমরা করতুম কী?
শীতের ময়দানে মাঝে মধ্যে দল বেঁধে পালিয়ে আসতুম। পালাবার জন্যে তো একটা ছুতো চাই। তা না হলে কলেজ পালিয়ে ময়দানে যাব কী করে? চাঁদা করে ক্রিকেট ব্যাট, বল, প্যাড, গ্লাভস সব কেনা হল। সেই কেনাটাও যেন স্বপ্নের দোকান থেকে, স্বপ্নে কেনা।
হেদো থেকে ট্রামে উঠলুম। ট্রামে উঠলেই তখন মনে হত—বিলেত চলে এসেছি। কোনও ঝাঁকানি নেই, পেট্রলের গন্ধ নেই, ধুলো নেই, ধোঁয়া নেই। লম্বা কামরা, দুপাশে দুসার গদি মোড়া কালো বসার আসন। কেমন সুন্দর একটানা গদি। তারে তারে একট সুইট শব্দ। যাঁরা বসে আছেন সকলেই যেন বেশ বয়স্ক, গম্ভীর। ট্রামে ধর্মতলায় নেমে আমরা হাঁটতে হাঁটতে পার্কস্ট্রিটের দিকে এগিয়ে চললুম।
সেই সময়কার চৌরঙ্গীতে একটা পরিষ্কার পরিষ্কার সায়েব গন্ধ লেগেছিল তখনও। গ্র্যান্ড হোটেলের তলাটা পেরোতে কেমন যেন ভয় ভয় করছিল। উলটো দিকের মাঠে বহু লোক হোটেলের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। শোনা গেল—হোটেলে সাংঘাতিক ব্যাপার—ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট খেলোয়াড় দল এসে রয়েছে আর এসেছেন বম্বের কয়েকজন চিত্রতারকা।
পার্কস্ট্রিটের সাহেব পাড়ার সাজানো দোকান থেকে আমরা ক্রিকেটের সরঞ্জাম কিনে ফেললুম। এমন দোকান কলকাতার আর কোথাও আমরা দেখিনি। চারদিকে তাকাতে তাকাতে চকচকে রাস্তা ধরে, ঝকঝকে সব দোকান দেখতে দেখতে আমরা ফিরে এলুম।
এরপর সময় পেলেই আমাদের লটবহর নিয়ে ট্রামে চেপে চলে যেতুম ময়দানে। ভীষণ ভালো লাগত বিভিন্ন ক্লাবের তাঁবু আর সংলগ্ন বাগান দেখতে। রেঞ্জার্স, ড্যালহৌসি, মহামেডান, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল। দূরে ফোর্টের র্যামপার্ট। এই ময়দানেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের পেছন দিকেই ঘাসে ঢাকা এমন সুন্দর একটা মাঠ আছে—যেটাকে মনে হত কলকাতার কোনও জায়গা নয়, নিশ্চয়ই বিলেত টিলেত হবে। সেখানে দুপুরের রোদ যেন হালকা হলুদ রঙের মতো গড়িয়ে গেছে—মাখামাখি হয়ে আছে। কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই মনে হত কেউ যেন খুব নরম উলের সোয়েটার জড়িয়ে দিচ্ছে পায়ে। আলোয় আলোয় চোখ দুটো যেন কাচের মতো হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক ছিল না কিছুই।
কবে কোথায় খেলার জায়গা মিলবে আমরা জানতুম না। সেদিন আমরা বোধহয় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের মাঠের ধারে একটু খেলার জায়গা পেয়েছিলুম। খেলা তো কাঁচকলা। না পারি আমরা বল করতে, না পারি ব্যাট চালাতে। ওই একটা আনন্দ। সারাদিন রোদ, হাওয়া সবুজ মেঘে সন্ধের সময় স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফেরা। তখন তো আমরা ছাত্র, পুরো দস্তুর বেঁচে, কত আশা, কত কত আনন্দ!
হঠাৎ সেদিন অবাক এক কাণ্ড ঘটল।
সেরা মাঠের ভেতর থেকে হঠাৎ একটা ডিউস বল তির বেগে আকাশের দিকে উঠে গেল। আমরা হাঁ করে দেখছি। ভাবছি—বাবা, কী মার! বলটা এসে পড়ল আমাদের এলাকায়। বলটা কুড়িয়ে নিয়ে ভাবছি—কী করব? হঠাৎ একটা কুচকুচে কালো মুখ ঠেলে উঠল দেওয়ালের মাথায়। ঝকঝকে হাসিমাখা মুখ। আমরা বলটা দেখালুম—এই যে, হিয়ার ইট ইজ।
মুখটি প্রশ্ন করলেন—কলেজ স্টুডেন্টস? আমরা বললুম, ইয়েস, পুওর স্টুডেন্টস। সঙ্গে সঙ্গে মুখটি বললেন—দেন টেক ইট। মুখটি সরে গেল। আমাদের মধ্যে যে চিনত সে বললে—উরেব্বাস—রোহন কানহাই। ওরে কী ভাগ্য আমাদের!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন