দুধের দাঁত

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়


দু-হাজার অব্দে মানুষের অবস্থা কী দাঁড়াবে, বিশেষ করে বাঙালির অবস্থা, আমরা জানি না। তবে অনুমান করা যায়। শিল্পসভ্যতা ইওরোপ, আমেরিকার মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আত্মহননের প্রবণতা বাড়িয়েছে। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। পারিবারিক সুখ উবে গেছে। মুঠো মুঠো ঘুমপাড়ানি ওষুধ পকেটে পকেটে। জীবনেও লাগছে, মরণেও লাগছে। বিজ্ঞান এগিয়ে চলেছে বিজ্ঞানের রাস্তায়, মানুষ চলেছে মানুষের রাস্তায়। দুটি পথের কদাচিৎ মিলন ঘটে।

আমরা আজও জড়বিজ্ঞানে তেমন বিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারিনি। আধ্যাত্মিকতাতেও তেমন আস্থা নেই। আমরা দুটো জিনিস জানি, জন্মাতে আর মরতে। জনম আর মৃত্যুর মাঝে যে জীবন উপত্যকা, সেখানে সুস্থ আর স্বাধীনভাবে ঘুরে ফিরে বেড়ানো নির্ভর করছে একাধিক শক্তির হাতে।

এক নম্বর শক্তি হল, রাজনীতি।

দেশ থাকলেই রাজা থাকবে, থাকবে প্রজা। সেকালে অর্থাৎ অন্ধকার যুগে থাকতেন একজন রাজা। তাঁরই দাক্ষিণ্যে মুখে হাসি ফুটত, ছেলেমেয়ে দুধেভাতে থাকত। তাঁর রোষে জীবন বালব ফিউজ হয়ে যেত। কেউ যেত শূলে, কেউ পড়ত ডালকুত্তার মুখে। একালে সবাই রাজা। গণতন্ত্র চলছে। জনগণ জীবন নিয়ে ড্যাঙগুলি খেলছেন। কেউ উঠছেন ওপরে, কেউ নামছেন নীচে। রাজার আসন পাকা হয়ে প্রজাদের ভবিষ্যৎ ভাবার আগেই চিৎপটাং। সেজেগুজে মঞ্চে আসার আগেই ড্রপসিন পড়ে গেল। সুতরাং নির্বাচন আছে, শাসন নেই। সেভাবে শাসন করতে গেলে ভোট মিলবে না। মাইনাস শাসনে দেশের যা অবস্থা হওয়া উচিত, তাই হয়েছে। সর্বস্তরে চূড়ান্ত স্বাধীনতা মানে অরাজকতা। অরাজকতায় মানুষ বাঁচে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।

অর্থাৎ ভাগ্যং ফলতি সর্বত্রং। রাখে কেষ্ট মারে কে, মারে কেষ্ট রাখে কে! জ্যোতিষই হবে এ যুগের প্রধান আশ্রয়। তাবিজ, কবচ, পাথর, মাদুলি, সর্বাঙ্গে ঝুলিয়ে, ঠিকুজি, কোষ্ঠী সামনে মেলে ধরে, গ্রহ-নক্ষত্রের ষড়যন্ত্র বুঝে, পা মেপে মেপে চলতে হবে। মোড়ে মোড়ে সেলুনের মতো, ভাগ্য গণনালয় গজাতে শুরু করেছে। ভৃগু আর পরাশরের ছড়াছড়ি। ছক হাতে সব লাইন লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কারুর শনি বেঁকে বসে আছেন। কারুর দিকে রাহু তেড়ে আসছেন হাঁ করে। কারুর মঙ্গল চোখ লাল করে বসে আছেন।

মাত্রাতিরিক্ত বক্তৃতায় আর পরিকল্পনায় আমাদের ভাগ্য গেঁজে গেছে। নির্বাপিত হয়ে আসছে আদর্শের প্রদীপ। নির্বিচার ঔষধ সেবনে, রোগ জীবাণু মস্তানের চরিত্র পেয়েছে। সহজে মরার নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান অসহায়। শরীরে রোগের জগাখিচুড়ি তৈরি হচ্ছে। নয়া শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যে নয়া হাতিয়ারের কথা ভাবতে হচ্ছে। প্রেসক্রিপশান লেখার আগে ভাবতে হচ্ছে : ওষুধে ভালো হবে, না বিনা ওষুধে।

পুরোনো যুগ আবার ফিরে আসছে। মশা, মাছি, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ঠ্যাঙাড়ে, জলদস্যু, ঘাতক, রঘু ডাকাতের দল। বিদ্যুৎ প্রায় চলেই গেছে। দু'হাজার অব্দে মশালের ব্যবস্থা পাকা হয়ে যাবে। রাস্তাঘাট খুঁড়ে, নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হয়েছে। জ্বালানির ভাণ্ডার প্রায় শূন্য। কলের গাড়ি আর চলবে না। সব পয়দালেই মারতে হবে। ঐতিহাসিকরা বলেন, সভ্যতার ইতিহাস অনেকটা নাগরদোলার মতো। তুঙ্গে উঠে ক্ষণস্থিতি, অতপর নিম্নে পতন। আমাদের মনে হয়, আবার হয়তো প্রস্তর যুগ থেকেই শুরু করতে হবে। ইংরেজিতে যাকে বলে বিগিন ফ্রম দি বিগিনিং।

সেই পিছু হটার ফলে আমরা এখন মধ্যযুগে। আর কয়েক বছরের মধ্যেই এসে যাবে আদিযুগ। সেই যুগকে বরণ করার জন্যে দেশ প্রায় প্রস্তুত। সমস্ত ব্যবস্থাকেই সেইভাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। মানুষের জীবিকাও পালটাচ্ছে। প্রস্তর যুগে পাথরের অস্ত্র দিয়ে পশু মেরে ঝলসে খাওয়া হত। পশু আর তেমন নেই। সংখ্যায় কমে এসেছে। এখন চারপাশে থিকথিক করছে মানুষ পশু। চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম। এই ছিল নির্দেশ। আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালনে প্রস্তুত। মানুষ অকারণে মানুষ মেরে, মানবশিশু হত্যা করে মাঠে ময়দানে ছড়িয়ে রেখে দিচ্ছে। আদি যুগের প্রস্তুতি পর্বে, আদিম আচার-আচরণ শিখতে হবে বই কি! গুহামানবের ছবি দেখা আছে, সেকালের কথা কেতাবে পড়া আছে। থিওরিকে প্র্যাকটিসে ফেলতে না পারলে, বন মানুষের ফুলমার্ক মিলবে না।

ট্র্যানজিশান পিরিয়াডে মানুষ কিছু টেনশানে ভুগবে। এতকাল শেখানো হয়েছে, মানুষই দেবতা। সেই বিশ্বাস ভুলতে কিঞ্চিৎ সময় লাগবে। একে বলা চলে টিথিং ট্রাবল। বড় বড় দাঁত গজিয়ে গেলে আর ভয় থাকবে না। ইতিমধ্যে যাঁরা খাদ্যসহযোগে তিল তিল করে বিষ খাইয়ে আমাদের নীলকণ্ঠ বানিয়েছেন, তাঁদের ধন্যবাদ। যাঁরা ক্ষমতার আসনে বসে আচার-আচরণে, আমাদের মধ্যে সেই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করছেন, 'দ্যাখো বাপু, ধরাধামে কেউ কারুর নয়, থাকতে পারো থাকো, মরতে হয় মরো', তাঁদেরও ধন্যবাদ। সব প্রতিষ্ঠান উপহাসে পরিণত করে যাঁরা আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন, গণতন্ত্র বলে বাস্তবে কিছু নেই, মানুষের দুর্বল কল্পনা মাত্র, আছে নরদানবতন্ত্র, তাঁদেরও ধন্যবাদ।

গোষ্ঠীবদ্ধ অরণ্যচারী মানব, গোষ্ঠপালের বাহুবলাশ্রয়ে খোলা ময়দানে দিন কাটাত। আজও দেশের অর্ধশতাংশ মানুষের আশ্রয় নেই। শরীরে আচ্ছাদনী নেই। আমাদের টার্গেট হল নিরাবলম্ব, বায়ুভুক অবস্থাকে সেন্ট পারসেন্টে তোলা। আগামী দিনের জন্যে আমরা প্রস্তুত। সমস্ত হাসপাতালকে আমরা পশু চিকিৎসালয়ে পরিণত করব। মেডিসিন থাকবে না, থাকবে সার্জারি। কিছু ব্যাধিকে আমরা সঙ্গের সাথী করে রাখব। মারবে দুটি জিনিস—ক্যানসার আর মাস্তান। 'গোষ্ঠপাল'-এর আধুনিক নাম মাস্তান। তাঁদের আশ্রয়ে নতুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠা-তক একটু 'দুধের দাঁত'-এর সমস্যায় ভুগতেই হবে।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%