সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

হিন্দু বিবাহের মতো এমন সুন্দর একটি অনুষ্ঠানের তাৎপর্য ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আসবে। তার জন্যে একটা আয়োজন তো চাই। প্রবাহের মতো আসবে, ভেসে ভেসে চলে যাবে। সন্তান থেকে পিতা, মাতা। আবার সন্তান। লালন, পালন, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠা, বিদায়। পৃথিবী মনুষ্যশূন্য হবে না কোনওদিন। মানুষের সংসার, সভ্যতা, জমজমাট একটা ব্যাপার। উৎসবের মতো। কত প্রেম, আলিঙ্গন, গান, সুখ, দু:খ, হাসি, কান্না। আসলে আগুন, ঝলসে যাওয়া। অগ্নিসাক্ষী করে আমাদের বিবাহ। স্বামী আর স্ত্রী যেন দুটি ধাতু। আগুনে ফেলে জোড় লাগানো। দুজনেরই একই ভাগ্য। একই দিকে পথচলা। এমন সম্পর্ক আর দ্বিতীয় নেই।
হঠাৎ কী হল কে জানে! এমন প্রগতির ঢেউ এল, সব গোলমাল। অধিকাংশ সংসারেই এখন গিলে করা দম্পতি। সদা সর্বদাই ভুরু কুঁচকে আছে। কোনও প্রসঙ্গ শুরু হওয়ার পরেই ঠোকাঠুকি। কর্তার কথা গিন্নির সহ্য হয় না, গিন্নির কথা কর্তায়। দুজনেরই অসম্ভব ঝাঁজ। সব আলোচনা দুটি কথায় এসে ঠেকবে, 'কী বলতে চাইছ?' কী করতে চাইছ!' অবশেষে 'আমি জানি না। আমাকে জিগ্যেস করছ কেন?' সসেমিরা অবস্থা।
ইলেকট্রিসিয়ান এসে জিজ্ঞাসা করেছেন, 'বউদি! ওই যে একটা এক্সট্রা পয়েন্ট হবে, কাজটা কি ধরব?'
'আমাকে জিগ্যেস করছ কেন? আমি এ বাড়ির কে! ওই যে বারান্দায় বসে আছেন, তাঁকে জিগ্যেস করো।'
ইলেকট্রিসিয়ান দাদাকে জিগ্যেস করতে গেলেন, 'কাজটা কী ধরব?'
'আমাকে জিগ্যেস করছ কেন? এ বাড়ির কোনও ব্যাপারে আমি নেই।'
ঘড়াঞ্চি কাঁধে ছেলেটি রাস্তায় বেরিয়ে এসে বলল, 'যা: বাবা!'
স্ত্রী প্রশ্ন করলেন, 'শোভনের বিয়েতে কী দেওয়া হবে?'
স্বামীর উত্তর, 'তোমার ভাই তুমি বোঝো।'
'তোমার কেউ নয়?'
স্বামীর গম্ভীর উত্তর, 'অত বড়ো ইঞ্জিনিয়ার, হীরের আংটির কমে কি প্রেসটিজ থাকবে!'
স্ত্রী গুম গুম করে শোওয়ার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। তাঁর শিশুটি পড়ছিল, ধড়াধাম পেটাতে লাগলেন।
স্বামী চিৎকার করে বললেন, 'এটা ভদ্দরলোকের পাড়া।'
স্ত্রীর জবাব, 'সে তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।'
শিশুর বিকট চিৎকার। দুধ পোড়ার গন্ধ। এক প্রতিবেশী এসেছিলেন জিগ্যেস করতে—বউমা সপ্তমীর দিন বেলুড় মঠের পুজো দেখতে যাবে কি না!
বউমা বললেন, 'একেবারে যমের বাড়ি যাব।'
প্রতিবেশী বললেন, 'তোমরা একটা শান্তিস্বস্তেন করাও। দুজনে যেন চিনে খত্তাল। অনবরতই রেলকম ঝমাঝম। এরপর পা পিছলে আলুর দম।'
দাম্পত্য কলহ খুব মধুর ব্যাপার, মজার ব্যাপার ছিল একসময়। এখন আর নেই। কোর্টে হাজার হাজার দড়ি-কাটার কেস ঝুলছে। আইনজীবীরা বেশ খেলিয়ে খেলিয়ে উভয়পক্ষকে ঘায়েল করছেন।
একটি ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করি। দাম্পত্য সম্পর্ক কত মধুর হতে পারে। কেশবচন্দ্র সেন ও তাঁর সহধর্মিণী। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন, 'একদিন আমি কেশববাবুর সহিত কোনও বিশেষ আলাপ করিবার জন্য তাঁহার ঘরে গেলাম। তখন তাঁহার বিশ্রাম করিবার সময়। কিন্তু দেখিলাম তিনি ঘরে নাই। তাঁহার পত্নীকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বলিলেন, 'আমাকে কোনও কারণে রাগতে দেখে, তিনি প্রথমে বললেন, 'তাই তো, তুমিও রেগে উঠলে?' এই বলে এই ঘরেই কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে রইলেন, পাষাণের মূর্তি; তারপর বাহির হয়ে গেলেন। খুঁজে দেখুন, বোধহয় বাগানের কোনও গাছতলায় চোখ বুজে বসে আছেন।' শুনিয়া আমি হাসিতে লাগিলাম। তিনি বলিলেন, 'হাসেন কী? ওই চোখ বুজে বুজেই আমায় সেরে আনছেন। আমি কিছু অন্যায় করলেই, রাগ নাই, উষ্মা নাই, চোখ বুজে একেবারে পাষাণপ্রতিমা হয়ে যান। আমি লজ্জায় মরে যাই। ভবিষ্যতে যাতে আর ওরূপ না করি, তার জন্যে ঈশ্বরচরণে বারবার প্রার্থনা করতে থাকি।'
একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে গিরিশবাবুর খুব নিন্দা হচ্ছিল। উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী সুরতকুমারী। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি চলে যান। পতিনিন্দা শুনবেন না। পুরাণে আছে মহাদেবের নিন্দা শুনে সতী দেহত্যাগ করলেন। সর্বাধুনিক ঘটনা, স্বামী চাকরি করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বেকার যুবকদের টাকা আত্মসাৎ করতেন। প্রবঞ্চিত যুবকেরা বাড়িতে এসে যাচ্ছেতাই অপমান করে গেল। স্ত্রীর আত্মসম্মানে লাগল। তিনি একটি পাতকুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলেন। সেই দিন আসছে নাকি? স্বামী আর স্ত্রী দুজনেই বালিশের তলায় রিভলভার নিয়ে শোবেন। মাঝরাতে ডুয়েল। শ্বশুরের বেটা মরে কি বেটি মরে! এরপর তো লোকে বাজারে গিয়ে বলবে, ' দেখি এক কেজি গুলি, দুটো রিভলভার। বড় সাইজের বোমা আছে? দশকর্মার ভাণ্ডারে গিয়ে ধুনোর বদলে আর ডি এক্স চাইবে। গুষ্টিসুদ্ধ শেষ করে দেব!'
বুল ডগ রক্তের স্বাদ পেলে মনিবকেও কামড়ে মেরে ফেলতে পারে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন