সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বৃন্দাবন বসাক মারা যাচ্ছেন। বাড়িতে নয় হাসপাতালে। পয়সাকড়ি আছে। পয়সার জোরে সেরা হাসপাতালে স্থান পেয়েছেন। স্পেশাল নার্স নিযুক্ত করা হয়েছে, সর্বক্ষণ তদারকি করার জন্যে। বুড়ো ইদানীং খুব খিটখিটে হয়ে গিয়েছিলেন। ছেলে আর ছেলের বউরা মিলে হাসপাতালে ভরে দিয়ে এসেছে।
আত্মীয়স্বজন, পুত্র, পুত্রবধূ, ডাক্তার, নার্স, চারপাশে সবাই ছড়িয়ে রয়েছে। ডাক্তার এই শেষ সময় বিশেষ খোঁচাখুঁচি করতে চাইছেন না। ইংরেজিতে বলছেন—লেট হিম ডাই পিসফুলি। পুত্রবধূরা নানারঙের সিনথেটিক শাড়ি পরেছেন। সেন্ট মেখেছেন। চোখে কাজল টেনেছেন। গায়ে গন্ধ মেখেছেন। কায়দা করে খোঁপা বেঁধেছেন।
বড়ছেলে অল্প একটু দূরে দাঁড়িয়ে দামি সিগারেট খেতে খেতে মেজকে বলছেন, বউবাজার থেকে ভাল দেখে একটা খাট আন, নিউমার্কেট থেকে ফুল আন। মেজ বলছেন, আনতে চলে গেছে।
মেজছেলের চামড়ার কারখানা। কারখানার কর্মচারীদের এই কেনাকাটার কাজে লাগানো হয়েছে। ফোরম্যান নিজে তদারকি করছেন। তিনি খাট কিনতে কিনতে ভাবছেন—শালারা পাঁচশো টাকা মাইনে দেয়, এই মওকায় শ'তিনেক ঝেঁপেনি। পাশে একজন মেকানিক দাঁড়িয়ে ছিল ল্যাংবোটের মতো। তাকে বললেন—রাজু টেম্পো বোলও! ফার্নিচারের দোকান থেকে রাজু বেরিয়ে যেতেই মালিককে বললেন—খাটটার একটা ভাউচার করে দিন পাঁচশো লিখবেন না, সাতশো লিখুন।
মেজপুত্রবধূ বড়বউকে বললেন—বড়দি গঙ্গাজল রেডি করো। বড় ছোট হাত-আয়নায় মুখ দেখছিলেন। সেটাকে হাত ব্যাগে ভরে ছোট একটা শিশি বের করলেন, তারপর ব্যাগটা হাঁটকে পাঁটকে আক্ষেপের সুরে বললেন—ইস রূপোর চামচেটা আনতে ভুলে গেছিরে মেজো। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন—চামচে আনবার আর সময় নেই। এই নিন ড্রপার।
মেজ বললেন, ভালো করে ধোয়া তো?
বড়ছেলে বললেন—এখন আর অত বাছ-বিচার কী? লাস্ট মোমেন্ট? চলো এক এক ফোঁটা মুখে দিতে থাকি। লাস্ট রাইটস—শেষকৃত্য।
বড় ড্রপার হাতে বাপের কাছে এগিয়ে যেতেই বৃন্দাবন ফিস ফিস করে বললেন—তাড়া আছে?
বড় ছেলে চমকে সরে এসে ডাক্তারকে বললেন—হি ইজ টকিং।
ডাক্তার বললেন—সজ্ঞানেই মৃত্যু হবে। যে কলে মানুষ চলে তার সবই প্রায় থেমে এসেছে; স্রেফ ইচ্ছাশক্তির জোরেই বেঁচে আছেন। ইচ্ছাশক্তির জোর কতটুকু বলুন? গেল বলে।
বড়ছেলে স্ত্রীর হাতে শিশিটা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন—না:, ঝামেলা হয়ে গেল, সন্ধের সময় আমার একটা ককটেল পার্টি ছিল।
বউ বললেন—আমারও তো একটা এনগেজমেন্ট ছিল। কী আর করবে বলো? কর্তব্য তো করতেই হবে।
বড় ডাক্তারের কাছে এসে বললেন—মানুষের ইচ্ছাশক্তিটাকে মেরে ফেলা যায় না? ওটা কি ক্রিমনাল অফেনস?
ডাক্তার বললেন—ওর যেমন বাইরে থেকে জন্ম দেওয়া যায় না, মারাও যায় না। ওটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। একটু ধৈর্য ধরুন। শক্তিটা অটোমেটিক কমে আসবে।
—মহা মুশকিল হল, বড় ঘন ঘন সিগারেট টানতে লাগলেন।
এমন সময় মেজ ঘরে ঢুকে বললেন—দাদা খাট আর ফুল এসে গেছে। কত দেরি? বড় আক্ষেপের সুরে বললেন—এখনও তো স্পষ্ট কথা বলছেন।
—মাই লর্ড? তাহলে কী হবে?
—তোরা থাক, আমি ঝট করে একটা কাজ সেরে আসি।
বড় বেরিয়ে গেলেন। মেজ শিশি আর ড্রপার হাতে বাপের কাছে এগিয়ে যেতে বৃন্দাবন সেই একই কথা বললেন—তাড়া আছে?
মেজ বিমর্ষ হয়ে ফিরে এলেন। বউকে বললেন, তোমরা থাকো, আমি চট করে একটা কাজ সেরে আসি।
—এর মধ্যে যদি মারা যান?
—ভয় নেই, নীচে সব ব্যবস্থা করা আছে। লোকজন আছে।
বউমা তখন ডাক্তারকে জিগ্যেস করলেন, ব্যাপার কী? একটু তাড়াতাড়ি করা যায় না?
জন্ম-মৃত্যু কী বলা যায় মা। যখন হওয়ার তখন ঠিকই হবে।
বড়বউ চেয়ারে বসে ম্যাগাজিন পড়তে লাগলেন। মেজবউ উল বের করে সোয়েটার বুনতে শুরু করলেন। নার্সকে বললেন, সময় হলে বলবেন, মুখে গঙ্গাজল দিয়ে দেব।
ডাক্তার বৃন্দাবনের নাড়িটা দেখতে গেলেন, বৃন্দাবন ফিসফিস করে বললেন—ব্যস্ত হবেন না, আমি যাওয়ার আগে একটু টাইম দিয়ে যাব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন