সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সন্ধ্যা নামতে না নামতেই সাজো সাজো রব। শীতও পড়েছে জাঁকিয়ে। মাঘ মাস। সারাদিন উপবাসে। দুপুরবেলা গায়ে হলুদের ডামাডোলে বিধ্বস্ত। বাড়ির এক অংশে ছোটমতো এক চিলতে বাগান ছিল। সেইখানে তৈরি হয়েছিল কলাতলা। কাঠের একটা পিঁড়ে। তার উপর মোটা একটা ধুতি আর উত্তরীয় ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছি। চারকোণে চারটে কলার চারা। সুতোর বেড়া। উত্তুরে বাতাসে দাঁড়িয়ে আছি। পাড়া সম্পর্কিত বউদি, কাকিমা, পিসিমারা উলুধ্বনিতে বিরাট এক যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করেছেন। কমবয়সি ফাজিল মেয়েরাও ছিল। গুরু গম্ভীর পুরুষরা ধারে কাছে নেই। একা একটি ছেলে আর প্রায় একশো মহিলা। তাল তাল তৈল মিশ্রিত হলুদবাটা। ধান, দূর্বা। প্রবল শাঁখ, তরল উলু, শীতের বাতাস। খসখস করে পাতা ঝরে পড়ছে।
ইঙ্গিত মাত্রেই রাশি রাশি হাত প্রসারিত হল। চুড়ির শব্দ, মনে হল দশভুজা নয় শতভুজা দুর্গা হলুদ হস্তে মহিষাসুরকে আক্রমণ করেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই হলুদে হলুদ।
পিঁড়ের চারকোণে চারটি খুরি উপুড় করা ছিল। আদেশ হল, সুতোর বেড়া ছিঁড়ে, ডানপায়ের গোড়ালির আঘাতে সবকটা খুরি ভেঙে বেরিয়ে এস। মোটা মোটা মাটির শক্তপোক্ত খুরি আমার শক্তিতে ভাঙা সম্ভব হল না। কলাগাছ উলটে বেরিয়ে এলুম। সমাপ্ত হলে স্নানপর্ব। মেয়েরা চলে গেলেন মাছ আর তত্ব দেখতে। কী এসেছে, কেমন এসেছে। হলুদ চর্চিত একটি রোহিত মৎস্য কচি কলাপাতায় চিরনিদ্রায় শায়িত। সাকারের আয়োজন হচ্ছে—মুড়ো যাবে ডালে, ল্যাজা কানকো ছ্যাঁচড়ায়, ইত্যাদি। ট্রাজিডিটা এই—যার বিয়ে তার উপবাস।
দুপুরের হই হুল্লোড় এক সময় শান্ত হল। নামল শীতের সন্ধ্যা। শুরু হল রাজকন্যা জয়ের প্রস্ততিপর্ব। কয়েকটি সাদা মোটর গাড়ি। দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে। এসে গেছে আমার প্রাণের বন্ধুরা। শুরু হল আমাকে ধুতি পরানোর পর্ব। ধুতি 'ম্যানেজ' অপটুর কর্ম নয়। ধুতির ভাগ আছে। একের চার, তিনের চার। একের চারে কাছা, তিনের চারে কোঁচা। কোমরে জম্পেস একটা গাঁট। ফড়াক করে খুলে না যায়। ধুতির উপর ঘি ঘি রঙের পাঞ্জাবি। পায়ে বাদামি চামড়ার ঝকঝকে নিউকাট।
একটা লাজুক লাজুক ভাব। এতদিনের জীবনটা হঠাৎ পালটে যাবে। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই শ্রীর পাশে একটি শ্রীমতি যুক্ত হবে। এই বাড়িতে আমার একটি আলাদা ঘর হয়েছে। নতুন খাট, নতুন বিছানা। দাম্পত্য জীবনের সূত্রপাত। সকলের সঙ্গে সব সম্পর্ক ঠিকই থাকবে, আসল সম্পর্ক গড়ে উঠবে তার সঙ্গে, যে আসছে। যাকে কাল বরণ করে তুলে নেবে এই পরিবার।
এক প্রবীণা আত্মীয়া জলভরা চোখে আমার দুকাঁধ দুটো হাত রেখে ফিসফিস করে বললেন, 'আহা! আজ যদি তোমার মা বেঁচে থাকতেন!' তিনি আমার মনের কথাটি পড়ে ফেলেছেন। সকাল থেকে আমি তো সেই কথাটিই ভাবছি! তেইশ বছর আগে আমাকে একা ফেলে রেখে যিনি সীমার দরজা খুলে অসীমে পাড়ি দিলেন, তিনি আজ কতদূরে!
চন্দন আর লবঙ্গ দিয়ে মুখমণ্ডলে টিপ পরাতে এলেন এক তরুণী। সুন্দরী। ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আমার সামনে। সিল্কের শাড়ি, সুবাস। বড়ো রোমান্টিক এই রাত। জীবিত আর মৃত আত্মার উৎসব রজনী। তরুণীটি কপালে টিপের কারুকার্য রচনায় এত মগ্ন যে মাঝে মাঝে বক্ষলগ্ন হয়ে পড়ছে। এই রাত স্বাধীনতার রাত। শাসন, অনুশাসন আজ মুদ্রিত চক্ষু। মেয়েটি আমার হবু স্ত্রীর বান্ধবী। এমনও হতে পারত, যে বিপরীতটাই হল। নতুন বিয়ে বাড়ি। বেশ কায়দায় বাড়ি। নতুন, তাই চারিদিক ঝকঝকে তকতকে। যে আমার স্ত্রী হবে তার সঙ্গে তো আমার মারামারির সম্পর্ক। আমার বাল্য সাথী। আমাদের দুটি পরিবার প্রায় একটি পরিবারের মতোই ছিল অতীতে।
পরিচিত জনেরাই আজ কেমন পরিচিতের মতো ব্যবহার করছেন। বাড়তি খাতির। বরকে সাদরে বরণ করে তোলা হল তিনতলার বিশাল খোলা ছাদে বিবাহের আয়োজন, তাকে বলা হয় ছাদনাতলা। শীত বেশ জাঁকাল। মাথার উপর তারা ভরা আকাশ। চাঁদ হাসছে। রজনিগন্ধা গন্ধ ছড়াচ্ছে। শোলার সাদা টোপরের জমিতে অভ্রের ঝিলিক। সব সাদা কেবল আমার বউটা লাল। সোনার অলঙ্কারে ফুলের সাজে রাত কী রানি। বসে আছে অপরিচিতার অহংকারে। মুখ নীচু করে! অবশ্য শুভদৃষ্টি বলে একটা ব্যাপার আছে।
এইবার বরের সাজ বর্জন করে পট্টবস্ত্র, যাকে জোড়, সেইটি পরে আসনে বসার পালা। পুরোহিত মহাশয় মন্ত্র পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করলেন আমার পইতে নেই। সে কি? তুমি ব্রাহ্মণ, পইতে ছাড়াই বিয়ের মতো এক বড় একটা কাজ করতে এলে?
ছিল তো!
তা গেল কোথায়?
খোঁজ, খোঁজ। কে একজন হেঁটে বললেন, ওটা বোধ হয় গেঞ্জির সঙ্গে খুলে চলে গেছে। পইতে হরণে গেঞ্জি একসপার্ট। সত্যই তাই। উদ্ধার হয়ে গলায় ফিরে এল। পুরোহিত মশাই বললেন, আগে তিন রাউন্ড গায়ত্রী জপে নাও।
শুরু হল বিবাহপর্ব। যাবতীয় মন্ত্র। শীতের তারা ভরা আকাশের নীচে। তারারা যেন জ্যোতির্ময় বরযাত্রীর দল। কন্যা যথাসময়ে একটি পিঁড়েতে আরোহণ করে আমার চারপাশে ঘুরতে লাগল। জানি না, শাস্ত্রমতে আর ক'পাক ঘুরলে গোত্র বদলে বউ হবে। অত:পর দুজনে একটি মোটা চাদরের আচ্ছাদনের তলায়। বাইরে থেকে নির্দেশ, দুজনে দুজনের দিকে ভালো করে তাকাও।
আমার গভীর সন্দেহ, সেই চাদরে তলায় আমার স্ত্রী আমার দিকে যে বিদ্যুৎ দৃষ্টি হেনেছিল, তাকে গ্রাম্য ভাষায় বলে চোখ মারা। এরপর সেই বাসর জাগা। একটি সাদা বর, অতি ঘনিষ্ট একটি লাল বউ। তার বান্ধবী ও কমবয়সী আত্মীয়াদের যাবতীয় ফাজলামির অপার স্বাধীনতা। রাত এগোতে লাগল ভোরের দিকে।
বউ নিয়ে বাড়ি ফেরার পালা। মজার মজার সব স্ত্রীআচার। দুধ উতলান। মাছ ধরা! কুলোর ওপর খই আর কড়ি খেলা। অবশেষে সেই আসল অনুষ্ঠান, কুশণ্ডিকা। অগ্নি বেষ্টন করে স্ত্রীর আঁচলের সঙ্গে নিজের উত্তরীয় বেঁধে পায়ে পায়ে সাতপাক ঘোরা। তার আগে পাথরের থালায় দুধ আর আলতাপাতা ফেলে নব বধূর পা দুটিকে রাঙান হয়েছে। তাকে সামনে রেখে পেছন দিক থেকে দুকাঁধের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে কুলো থেকে অগ্নিতে যখন লাজ নিক্ষেপ করছি, তখন দেখছি কী, দূর অতীত থেকে মা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। যেন বলছেন, বেঁধে রেখে গেলুম দুজনকে। সংসার করো।
দু:খ সুখের পথ ধরে যৌথ যাত্রা। উথাল পাথাল। মাঝে মাঝে গুনগুন, আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ। আমি গিয়েছিলুম বিয়ে করতে সেজেগুজে। এইবার আমার বউ যাবে বিবাহে। বর সেই 'ইন্টারন্যাল' বংশধারী শ্যাম, যাঁর নাম মরণ। আমি কী সেজেছিলুম! একশো গুণ বেশি সাজ। সতী সাবিত্রী অগ্নিপথে চলে গেল মৃত্যুবাসরে। মাঝে পড়ে রইল দু:খসুখের তিরিশটা বছর। যা ক্রমশই হয়ে আসছে ছায়া। যার তলায় বসিয়ে দেওয়া যায় শেক্সপিয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি—It is a tale, told by an idiot full of sound and fury. Signifying nothing. বাতি জ্বলল, বাতি গলল—ভোর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন