সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পূজা আমার কাছে একটা টাগ-অফ-ওয়ার। দুপক্ষে দড়ি ধরে টানাটানি ঠিক নয়। চলে মন নিয়ে টানাটানি। এক পক্ষে আমি আর এক পক্ষে আমার সংসার, দড়ি হল আমার রোজগার। রোজগার ধরে টানাটানি। সংসারের দাবি আর চাহিদা অনেক, অপরদিকে আমার হিসেবি মনের আতঙ্ক। দিলে বুঝি সব ফাঁক করে। চিচিং ফাঁক। যত বয়স বাড়ছে তত পাওনাদার বাড়ছে। বয়স হয়েছে বেলা যে পড়ে এল, সঞ্চয়ের দিকে মন দাও শেষের সে দিন বড় ভয়ঙ্কর। তখন তোমাকে কেউ দেখবে না স্বয়ং মা দুর্গাও নয় যতই মা, মা, বলে চেল্লাও। মা তোমার মহিষাসুর ছাড়া আর কারও দিকে কখনও তাকাননি। অসুর নিধন সেই একবারই করেছিলেন। করে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল, তারপর থেকে তিনি কেবল অসুর পালনই করে আসছেন। যে মানুষ সৎপথে, সৎভাবে জীবনযাপন করতে চায় তার বরাতে কাঁচকলা আর যে মানুষ দু-নম্বরই করে তার বরাতে মর্তমান কলার ছড়া। এই তো দেখছি বাবা। সেই মানুষটি কে, যে এই পূজোর সময় নতুন জামাকাপড় পরার বায়নাক্কাটি চালু করে দিয়ে নি:শব্দে কেটে পড়েছে। তাকে একবার পেলে হয়। তখন সস্তা গণ্ডার বাজার ছিল। এখনতো সবই অগ্নিমূল্য। সংসার চালাব না পাঁজা পাঁজা শাড়ি কিনব! সংসারে গোটাকতক বাচ্চা থাকলে তো চক্ষু চড়কগাছ। বাচ্চাদের পোশাকের কী সাংঘাতিক দাম। সাধারণ একটা দোকানে ছোটদের জামা-প্যান্ট ঝুলিয়ে রেখেছে। একটা সেট খুব পছন্দ হল। বেশ সাহস করে দাম জিগ্যেস করলুম। দোকানদার ভদ্রলোক অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বোঝার চেষ্টা করলেন লোকটার পুঁজির জোর কতটা! রোগা-পাতলা, গাল ভাঙা একটা লোক। চোখে চশমা। সামনে চুল পাতলা হয়ে এসেছে। দুটো চোখ থমকে আছে একটা আতঙ্কের ভাব। দোকানদারের করুণা হল। তিনি বললেন, 'ভালো করে ধরে দাঁড়ান, দাম শুনলে ছিটকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।' তারপর উদাস হেসে বললেন, 'দাম বলতে আমার লজ্জা করছে, একশো নব্বই।' এক কি দেড় গজ কাপড়ের ছোট্ট একটা জামা আর একটা ইজেরের এমন অবিশ্বাস্য দাম। এর কোনও বিচার নেই, দুর্গা মাঈ। সত্যিই আমার মাথা ঘুরে গেল। দোকানদার ভদ্রলোক আমার অবস্থা দেখে বললেন, 'বিশ্বাস করুন, আমার নিজের দাম বলতে লজ্জা করে সবাই আসছেন হাত বুলিয়ে সরে পড়েছেন। কজনের ক্ষমতা আছে মশাই, এই দামে কিনবেন!' বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না। আমার নিজের গায়ের একটা জামা ফুটপাত থেকে দেখে শুনে কিনতে পারলে পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে পাওয়া যায়। বেশ ভালো জামা পরে যেকোনও ফাংসানে যাওয়া চলে। আজকাল আবার মার্কিন মুলুক থেকে এসেছে কলার-অলা গেঞ্জি কালচার। গেঞ্জি কুড়ি থেকে চারশো কুড়ি পকেট বুঝে যে-কোনও দামে কেনা যায়। বড়লোকের গেঞ্জি, ছোটলোকের গেঞ্জি, সবরকমের বাজারে অঢেল। আমাদের মেরেছে বাচ্চা আর মেয়েরা। শাড়ি যাই হোক, তার নামের চটক সাংঘাতিক। এক ধরনের শাড়ির নাম বমকাই। বল্কা ছেলে শুনেছি রকের ভাষায়, বমকাই শাড়ি সে আবার কী রে বাবা। কাঁথা শাড়ি। মানুষের মাথা বটে। মানুষই মানুষ মারার কল বের করে। একটা শাড়ির অষ্টেপৃষ্টে কাঁথার সেলাই মেরেই হয়তো বাজারে ছেড়েছে। পরলে কেমন দেখাবে সে বিচার পরে। ফ্যাশান। ফ্যাশানের ফাঁদে ফেমিনিন ওয়ার্ল্ড। আমাদের উপদেশ শুনছে কে? বাঘ যেমন নধর মানুষ দেখলে পাগল হয়ে যায়, মেয়েরা তেমনি শাড়ি দেখলে। মেয়েদের শাড়ি আবার আলমারিতে ডিম পাড়ে। সব জমছে। কত পরবে কত আর পরা যায়। সেটা কোনও কথা নয়। কিনতে হবে। ভাঁজে ভাঁজে থাকার ফলে ফেঁসে যাক সেও ভি আচ্ছা। একজন মহিলার এক এক ছাচ শাড়ি। মাঝে মাঝে হয়তো ভাদ্রমাসেই ছাদে রোদ খাওয়ানো হচ্ছে—শাড়ির পর শাড়ি। শাড়ির ফ্যাক্টরি। শুনেছি সিল্কের শাড়ি, পরে শুনলুম তাঁত-সিল্ক, তারপর শুনলুম হাফসিল্ক। অরগ্যান্ডি, সিফন, জর্জেট, শেষ নেই। শাড়ির জগৎ অনন্ত। ফেল কড়ি, ফোটাও প্রিয়জনের মুখে ফিনকি হাসি। হাসির দাম হাজার, দেড় হাজার, দু-হাজার। এই নকশার নাম দেওয়া যেতে পারে—একটু হাসির জন্য তুমি হাসবে আমি নির্জনে কাঁদব। মাইনে, বোনাস, মার ঘুলঘুলিতে ময়লা ময়লা যে-ক'টা চোতা নোট নিজেকে মেরে ঢুকিয়ে রেখেছিলুম, সব ঢুকে গেল প্রিয়জনদের খুশি করতে গিয়ে। জানে মার দিয়া মা দুর্গা। মাঝে মাঝে ভাবি নারী কত মূল্যবান। আমার প্যাকিং-এর দাম একশো দেড়শো, আর আমার সহধর্মিনীর মোড়কের দাম, চারশো, পাঁচশো। এর নাম ধর্মের অংশীদার? কোনও জবাব নেই। লা-জবাব।
আজকাল আবার একটা শাড়িতে মন ভরে না। ফাঁকা ফাঁকা লাগে। পাঁচদিন পাঁচখানা চাই। দেওয়া থোওয়া পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এ-বাড়ি, ও-বাড়ি, নানা বাড়িতে ছড়িয়ে যায়। দিতেই হবে—না দিলেই কথা হবে—ব্যাটা কৃপণ। শুধু নিতেই জানে দিতে জানে না। গণ্ডার। কাজিরাঙার গণ্ডার হওয়ার চেয়েও, স্নেহের সংসারে দেনাদার হওয়াই ভালো। ওয়ে—ওয়ে। কানে যা শুনছি তাই ধরে এনে পরাতে হবে শাড়ি করে। ওয়ে—ওয়ে শাড়ি। এক আত্মীয় শালোয়ার কামিজ পরেন ছ'গজ কাপড়ের ধাক্কা। অনেক বোঝালুম বাঙালি মেয়ে পুজোর সময় একটা মোলায়েম শাড়ি পরুক না। মা দুর্গা দেখবেন বেশ খুশি হবেন। আমার উদ্দেশ্যটা তেমন ভালো নয়। ধান্দাটা হল শাড়ি হলে কমের ওপর দিয়ে যায়। কেউ শুনল না, কেউ বুঝল না। তখন ভাবলুম, দোকানে গিয়ে একটু কেরামতি করা যাক। বিশিষ্ট এক টেলার আমার বন্ধু। সেই মাস্টারজিকে নিয়ে গেলুম কাপড়ের দোকানে। 'কতটা কাপড় লাগতে পারে মাস্টারজি?'
'চেহারা কেমন?'
'আজ্ঞে বেশ দশাসই।'
'মরেচে। হাইট?'
'তা মন্দ নয়। আমার চেয়েও ইঞ্চিদুয়েক বড়।'
'মরেচে। তাহলে তো সাড়ে ছয়ের কমে হচ্ছে না।'
'কোনও রকমে পাঁচে ম্যানেজ করা যায় না মাস্টারজি? তাহলে বাড়িতে যে কাজ করে তার শাড়ির দামটা বেরিয়ে আসে।'
'তা আসে, তবে শালোয়ার কামিজটা আর এ বছর পরতে পারবে না, পরবে সামনের বছরে। মেয়েটিকে স্লিমিং-ডায়েটে ফেলে রাখুন এক বছর।
'তা কী হয়। মেয়ে তো আমার নয় বাইরে থাকে, খায় দায় ভালো।'
'তা হলে ওই সাড়ে ছয়। স্বাস্থ্য ভালো হওয়া কি খারাপ!'
আমার একটা দীর্ঘশ্বাস, পড়ল। আর পকেট থেকে বেরিয়ে এল কড়কড়ে তিনশো পঁচিশ। মায়ের কাছে আমার প্রার্থনা, 'মা গো, বঙ্গললনার শাড়ি কেড়ে নিয়ে পাঠানি করে দিও না পাষাণী। জানে মরে যাব।'
পুজো এসে গেলেই আমার প্রথমে ট্যাকটিকস হল, বাজারটাকে নিজের আয়ত্তে রাখা। মহিলারা সঙ্গে থাকলে, হালে আর পানি পাওয়া যাবে না। আজকাল সব নতুন নতুন বাজার বসেছে। নিউ মার্কেট থেকে ফ্যান্সি মার্কেট ছুটিয়ে মারবে। যত না কিনবে, তার চেয়ে বেশি খাবে। থেকে থেকে জল তেষ্টা। অমনি বোতল-ভরা রঙিন জল। তেমনি তার দাম। আড়াইশো টাকার ফুচকা উড়ে গেল। আজকাল আবার একটা ফুচকার দাম হয়েছে পঞ্চাশ পয়সা। দু'টাকায় পাঁচটা। খাওয়ার নিয়ম হল গোটা লটবহর সমেত মুখে পুরে দাও। গপাগপ খেয়ে যাও। সামনে ঝুঁকি, চোখ আধবোজা করে, পরম আয়েসে। পাতলা পাতলা ঠোঁট। ঝালে হুসহাস। সেই অবস্থায়, টকেন সমাপয়েৎ। ওলটানো শালপাতা সামনে মেলে ধরে, টক দাও, টক দাও। আধ গেলাস তেঁতুল গোলা জল সাবাড়। কেনা-কাটা যাই হোক, অনুষঙ্গের ঠেলায় প্রাণান্ত।
আমার প্রথম কাজ হল মহিলা-বাহিনীকে পাশ কাটানো। ফুটবল খেলার টেকনিক। ডজ করে বেরিয়ে যাওয়া। আজ নয় কাল। কাল নয় পরশু। এই করতে করতে একদিন ঘোরতর সংঘর্ষ—'আমরা জানতে চাই, এবারে পুজোর বাজার হবে না হবে না? ভালো খেলোয়াড় কখনও মাথা গরম করে না। আমার ঠান্ডা উত্তর, সঙ্গে সামান্য মোচড়, 'কোন বারে না হয়?'
'হয়, অনেক লেবু কচলে। ষষ্ঠীর আর ক'দিন বাকি?'
'দেখছ তো, এই সাংঘাতিক বৃষ্টি, তার ওপর ভয়ংকর লোডশেডিং?'
'তাতে কী হয়েছে। পৃথিবীতে বৃষ্টি হবেই। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে না, শীতকালে শীত হবে না' এটা তো তোমার মামার বাড়ি নয়। আর সুতানুটি গোবিন্দপুরে ইলেকট্রিক আলো ছিল?'
'না তো।'
'তাহলে সায়েবরা তখন কেনাকাটা করত কী করে? ন্যাজে জেনারেটার বেঁধে? দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। এখন বুঝেছি, মা আজও কেন আসেন। তোমাদের মতো মহিষাসুরে বাজার ছেয়ে গেছে। এক মা দুর্গায় কী হবে? রাশি রাশি মা দুর্গা চাই। গোটা কুমোরটুলিতে যত মা দুর্গা, সব যদি জ্যান্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তবে যদি কিছু হয়?'
কলকাতার তিনশো বছরের কল্যাণে ইতিহাস এখন হেঁসেলে ঢুকে পড়েছে। তিনশো বছর পূর্তি উপলক্ষে কলকাতার সেদিনকার মতো পরিবেশ রচনার প্রয়াস চলেছে। সেই চব্বিশ না তেইশ আগাস্টের দিনটিতে যেমন ছিল আর কী। লাগাতার বৃষ্টি। ঘোর অন্ধকার। খানাখন্দ। দঁক কাদা। সুতানুটির হাটের বদলে, নিউমার্কেট, হর্কাস কর্নার। সেই ঝালর ঝোলর, চট, প্লাস্টিক ঝোলা স্টলের সারি। কোথাও হ্যাজাক, কোথাও গ্যাস। সেই অপূর্ব ঐতিহাসিক পরিবেশ গোবিন্দপুরের গোবিন্দবাবুরা নারীবাহিনী নিয়ে ছপর ছপর ঘুরছেন। সন্ধ্যার শাড়ি, মনুর ব্যাগ, পলাশের ব্যাগি এই চলছে। পেছন পেছন ঘুরছে সন্ধানী পকেটমার। কে আগে হালকা করতে পারে। দোকানদার না পকেটমার। সায়েবপাড়া, উচ্চবিত্তের এলাকায় সার সার জেনারেটারের ভটর ভটর শব্দ। যেন গোটা শহরটা পেট সভ্যতার বদহজমে ভুটুর ভাটুর করছে। মাঝে মাঝে দূরদর্শনের পরদায় সামান্য রসিকতা—কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে—জীবনানন্দ দাশ। কলকাতা ৩০০।
শেষে একদিন সংসাররূপী বাঘ ঘাড় কামড়ে ধরে—'বলো, আর কদিন ন্যাজে খেলাবে? আজ বাদে কাল পুজো।' দেনাদারের হাতে পাওনাদারের অবস্থা। সে যে পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে ধরা। তিনিই মা দুর্গা। ধরতে পারলে বলতুম—মা গো, যাদের ট্যাঁকে জোর নেই তাদের ট্যাঁক খালি করার জন্য কেন আস মা? সাদ আছে মা সাধ্য যে নাই। কে না চায় প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটাতে। কে চায় সার সার তোলা হাঁড়ির মতো মুখ দেখতে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন