সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সব সংসারেই এখন বাবাদের মহা সমস্যা। বিশেষত যাঁরা ষাটের দশকে বাবা হয়েছেন। এইসব বাবাদের অধিকাংশেরই গোঁফ নেই। থাকলেও খুব বাহারি। মানে কালটিভেট বা চাষ করা, কেয়ারফুলি ট্রিমড, অনেকটা বড় লোকের বাড়ির লনের খাটো করে ছাঁটা হেজের মতো। এ গোঁফ গুম্ভের পর্যায়ে পড়ে না। চেহারা স্লিম। পরনে ট্রাউজার। কোমরে চওড়া বেল্ট। ঢ্যাপোস বকলস। গায়ে ছাপকা জামা। পাতলা চুল, তৈলহীন। সেলুন বিলাসী। চলচ্চিত্র রসিক। শৌখিন ভোজী। তিরিশের দশকের বাবারা এঁদের বাবা হওয়ার যোগ্যতা স্বীকার করেন না। তিরিশের বাবাদের গোঁফ দেখলেই মালুম হত, বেড়াল কী রকম শিকারি। বেশ প্রমাণ সাইজের ভুঁড়ি থাকত। মাথায় হয় টাক, নাহয় খেজুর-কাট চুল। গোঁফের ওপর সরষের তেলের ছিটের মতো র-নস্যির দরানি। ধুতি, শার্ট কিংবা পাঞ্জাবিতেই পারসোন্যালিটি কমপ্লিট। সংসারে তাঁরা ছিলেন কত্তা—ছোট কত্তা, বড় কত্তা। ছেলেদের নাম রাখতেন—প্যালা, ফ্যালা, আদরের সময় ফেলু। পোশাকি নাম অবশ্যই থাকত। যেমন : পতিতপাবন, গদাধর, হরিপদ, কেষ্টপদ, হরিচরণ, ভূতনাথ।
ষাটের দশকের বাবারা ছেলেদের নাম রেখেছেন অভিধান কনসাল্ট করে। বিশ্বরূপ, অর্কপ্রভ, ধ্রুবজ্যোতি। ইংরেজিতে নাম লিখতে ছেলে তিনবার টাল খায়। ষাটের বাবাদের সমস্যা হল, ছেলে মানুষ করা। যেটা তিরিশের বাবাদের ছিল না। তাঁরা মানুষ করতেন পশু পালনের কায়দায়। তাঁদেরটা ছিল কৃষি আর এঁদেরটা হল হর্টি কালচার। ঘরে ঘরে এঁদের গোলাপের বাগান—ভালো স্যার, ভালো পরিচর্যা। পটিং ম্যানিওরিং, মালচিং ট্রিমিং। তিরিশের বাবাদের ছিল ধর তক্তা মার পেরেক। হাওড়া কি মঙ্গলার হাটের ইজের, হাফ শার্ট। গোলমাল করলেই রদ্দা, নাহয় অর্ধচন্দ্র। ষাটে অত সোজা নয়। শিশু মনস্তত্ব বুঝতে হবে, জানতে হবে, পড়তে হবে। দেওয়ালে পুষ্টি তালিকা—কলা, মুলো, গাজর, ডিম্ব। ট্যাঁকে করে স্কুল। আউটিং, অ্যামুজমেন্ট। পিতা পুত্র সংসারে দুই ইয়ার। একটি নমুনা ডায়ালগ—ছেলে : খুব তো বাতেলা মারো, দেখি একটা ক্রিকেটের টিকিট ম্যনেজ করো তো। বাবা : ক্রিকেটের তুই বুঝিস কী? ছেলে : চলো, তোমার চেয়ে ভালো বুঝি। স্লিপ, গালি, একস্ট্রা কভার। বাপ ছেলে কাঁধ ধরাধরি করে চলল টিভি দেখতে।
তিরিশে এ সব ল্যাটা ছিল না। বিকেলে ঘণ্টাকতক গাদি, কবাডি কি ফুটবল। ছেলেরা মায়ের আঁচল ধরে গোবৎসের মতো মানুষ হত। মাঝে মাঝে মা'র আদেশে বাবাকে বাইরের ঘরের আড্ডা থেকে ভয়ে ভয়ে এইভাবে ডাকত : বাবা, আপনাকে ভেতরে একবার ডাকছেন। তিরিশের বাবারা সংসারের উপর পেপার ওয়েটের মতো চেপে বসে থাকতেন। ষাটের বাবাদের কোনও ওয়েটই নেই; সব ফুরফুরে কৃষ্ণকান্ত।
তিরিশের বাবারা বেঁচে থাকলে এখন দাদু। তাঁরা খুব সমীহ করে, নাতিকে ডাকার প্রয়োজন হলে ডাকেন—বিশ্বরূপবাবু, প্রভু বলছে ইচ্ছে করে চেপে যান। তিরিশের দাদুরা নাতিকে ডাকতেন—এই শালা এদিকে শোন। এখন 'শালার' বদলে দাদুকে কান ধরে পার্কের বেঞ্চিতে বসিয়ে দিয়ে আসা হবে, আনসিভিলাইজড বলে। বুড়ো বয়সে ধোপা নাপিত বন্ধ হয়ে যাবে। কী দরকার বাবা, পড়ে আছি গোলাপবাগের এক পাশে। দেখি না ষাটের বাবাদের সিভিলাইজড কেরামতি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন