সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বেঁচে থাকার যাচ্ছেতাই একটা একঘেঁয়েমি আছে। বাঁচতে বাঁচতে আমার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটাও বুড়িয়ে যাচ্ছে। সেই একই আকাশ, একই বাতাস। চারপাশে একইরকম ঘর-বাড়ি, মানুষজন। সকাল, বিকেল, রাত। আবার সকাল বিকেল রাত। চাকা ঘুরেই চলেছে। তেল দাও আর নাই দাও।
যখন বালক, তখন একরকম। নতুন চোখে পৃথিবী দেখা। কল্পনার ঘোড়া ছুটছে। ছোট ছোট চাহিদা। বড় বড় স্বপ্ন। শিকারি হব। ভূ-পর্যটক হব। খেলোয়াড় হব। পাইলট হব। গোয়েন্দা হব। এমন কিছু করতে হবে যা কেউ কখনও করেনি। অভিভাবকদের ছাতপেটাই সহ্য করে নিতে পারলে, জীবনের ওই অবস্থাটা নেহাত মন্দ নয়। পৃথিবীর ভাসমান রূপে মুগ্ধ। আলোর খেলা। অন্ধকারের খোঁজখবর কে রাখে। ওই জীবনে চোর, জোচ্চোর, বাটপাড়, অকৃতজ্ঞ, মামলাবাজের অস্তিত্ব নেই। একমাত্র ভয় বছরে বার তিনেক পরীক্ষায় বসা। পাসফেলের আতঙ্ক। তা ছাড়া বেশ স্বাধীন জীবন। রোজ সকালে পড়ি কি মরি করে জীবিকার হাতল ধরার জন্যে নাকে মুখে গুঁজে, কাছা কোঁচা খোলা অবস্থায় ছুটতে হয় না। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাক পাখির মতো ফুরফুরে মুক্ত জীবন। লাট্টু, লেত্তি, ঘুড়ি, লাটাই, মাঞ্জা, ফুটবল, টেনিসবল, রহস্য রোমাঞ্চ নিয়ে অদ্ভুত এক হিংসে করার মতো জীবন। ফেলে আসা শৈশবের কথা। ভাবলেই মন বিষন্ন হয়ে ওঠে। কেন মরতে ধেড়ে হলুম। আমি কি আর ইচ্ছে করে হলুম। হইয়ে দিলে। পক্ব কেশ, বাতের ব্যথায় কোমর সোজা হয় না। মাথায় দুশ্চিন্তার মাছি ভ্যান ভ্যান করছে। ঝাপটা মারলেও যেতে চায় না। তেড়ে তেড়ে আসে। লক্ষপ্রকার দায়দায়িত্ব। ট্যাক্স, বিল, ভাড়া, লাইসেন্স। পাশ বইয়ে পাঁচটা শূন্য থাকলেও, মন কিন্তু সদাসর্বদাই তুবড়ে থাকবে। লাইফ হেল। হাসতে গেলে মুখে কান্নার ভাঁজ। বিছানায় শুয়ে হাজার ভেড়া গুনলেও চোখ বুজে আসার আগেই আগেই কাজের মহিলার কর্কশ কড়া নাড়া। পরিবারস্থ সকলের সঙ্গে ভাগাড়ের জ্যান্ত মড়া আর শকুনের সম্পর্ক। দেহি, দেহি। স্কুলের মাইনে দাও। গৃহশিক্ষকের প্রণামী দাও। শাড়ি দাও, মাসোহারা দাও, এন্টারটেনমেন্ট ট্যাক্স দাও। খাবলে খুবলে স্কেলিটোন বের করে দেওয়ার জন্যে সব তেড়ে আসছে। পান থেকে চুন খসার উপায় নেই। মুখ সব তোলো হাঁড়ি হয়ে যাবে। টেবিলে জলের গেলাস নামবে হিরোসিমার অ্যাটমবোমার শব্দে। একাক্ষরে কথা চলবে, হুঁ আর না।
যৌবন হল বাল্য আর বার্ধক্যের মাঝে পড়ে থাকা সবুজ উপত্যকা। ভবিষ্যতের ভাবনা আছে। ঘোড়া একটা ধরতেই হবে। টগবগে ওয়েলার হলে কথা নেই, বেতো হলে মন্দের ভালো। সারাটা পথ পয়দালে মারতে হলে যৌবনেই জীবন্মৃত। যৌবনে বেশ পাকা হতে স্টিয়ারিং ধরতে না পারলে সোজা গাড্ডায়। কেউ তখন টেনে তুলবে না। অন্তত বাঙালিকে তোলার মতো বাঙালি বিরল। বড় জোড় দুটো জ্ঞানের কথা ছুড়ে দেবে। ঠিক হয়েছে ব্যাটা, যেমন কর্ম তেমন ফল।
তবু যৌবন হল জীবনের কোকিল। কুহু তানে ভরপুর। একটা প্রেমিক প্রেমিক ভাব। ছন্দ মিলুক না মিলুক দু'চার চরণ কবিতা আসবেই। যে কোনও নাটক মঞ্চে একবার ঠেলে তুলবেই। অসমাপ্ত হলেও জীবনরসে ভরপুর একটি নভেল খাতা ঝাড়লে খোঁড়া আরশোলার মতো খসে পড়বে। যৌবন তেড়েফুঁড়ে একই সঙ্গে বিভিন্ন পথে জলের মতো প্রবাহিত হতে চায়। আধখেঁচড়া একটা প্রেমের ব্যাপারও থাকা অসম্ভব নয়। যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবে কে? পাখির যেমন পালক, বেড়ালের যেমন গোঁফ, চোখের যেমন পালক, যৌবনের তেমনি প্রেম। একালে বেশিরভাগ প্রেমই ছাঁদনাতলায় গিয়ে শেষ হয়। প্রেম আর সার্জারি, দুটো জিনিসেরই এযুগে খুব উন্নতি হয়েছে। একশোটা অপারেশনে নিরানব্বইটা সাকসেসফুল। প্রেমে সাফল্যের হার শ'য়ে শ'য়ে না হলেও ফিফটি-ফিফটি তো বটেই। সে যুগে ছিল মেডিসিন। দাওয়াই দিয়ে ব্যামো সারাবার চেষ্টা চলত। প্রেমরোগের দাওয়াই ছিল আড়ং ধোলাই। অভিভাবকদের বিদঘুটে মেজাজ ছিল। দেউড়ির ভোজপুরী দারোয়ানের মতো। ইংরেজ পুলিশ-সার্জেনদের মতো। মেয়ে যদিও বা প্রেমিক হল, মেয়ের পিতা যেন কবিরাজি পাঁচন। অবাক হয়ে ভাবতে ইচ্ছে করত, অমন বাপের এমন মেয়ে হয় কী করে। যেন দৈত্যকুলে স্ত্রীলিঙ্গ প্রল্হাদ। সে যুগের শ্বশুর দেখলে বিয়ের ইচ্ছে মাথায় উঠত। স্বাধীন হওয়ার এই বছর তিরিশ পরে দেশজুড়ে প্রেমের একটা বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানের যেমন উন্নতি হয়েছে, প্রেমেরও সেই রকম উন্নতি হয়েছে। সেকালের প্রেম ছিল জনডিসের মতো। ধরলে রুগি হলদে মেরে যেত। সবাই অনুভব করত ছোকরার একটা কিছু হয়েছে। তোড়ে কবিতা নামছে ড্যাম ফাটা জলের মতো। দৃষ্টি এ জগতে নেই। তখন মালার খোঁজ পড়ত। দৈব মালা নয়। জুতোর মালা। সে যুগে প্রেম আর ভূত একই কায়দায় ছাড়ানো হত। প্রেম থেকে ছাঁদনাতলার ঘটনা দু-একটা ঘটত না যে তা নয়। প্রবীণ, প্রবীণারা প্রেমিক দম্পতিকে ছিছিক্কার করতেন। আর নবীনরা দিতেন নায়ক-নায়িকার সম্মান। মেয়ের অভিভাবক মেয়েকে আর ছেলের অভিভাবক ছেলেকে বিদ্রোহী হওয়ার অপরাধে নড়া ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিতেন। তাতে প্রেমের ভাবমূর্তি আরও বেড়ে যেত। ফুটবল ম্যাচ জেতার পর বিজয়ী-দলকে যেমন শিল্ড দেওয়ার প্রথা চালু আছে, উপায় থাকলে সেইরকম একটা কিছু দেওয়া হত। কিছু না হোক একটা সংবর্ধনা।
একালে প্রেমের আর সেই জলুস নেই। দ্বাদশবর্ষী বালক-বালিকারা বলছে, আমার লাভার। চার্মটাই নষ্ট হয়ে গেছে। পার্কে, গঙ্গার ঘাটে, মাঠে-ময়দানে জোড়ায় জোড়ায় দিবসরজনী কেজি কেজি চীনেবাদাম খেয়ে ফোঁস ফোঁস দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ রেখে, পুলিশ আর ছেনতাই পার্টির তাড়া খেয়ে প্রেমকে ভয়ংকর চিপ করে ফেলেছে। সেই টনটন রোঁমানস আর নেই। প্রেমের এখন ইংরেজি নাম হয়েছে পারমিসিবিলিটি, ফ্রি সেক্স। মনের চেয়ে হুমদো দেহ বড় হয়েছে। সেই চির প্রেমিক-প্রেমিকা রাধা-কৃষ্ণ এখন হীনপ্রভ। বৈষ্ণবপদাবলি অপাঠ্য।
প্রেমের গল্প, প্রেমের উপন্যাস, কবিতা বস্তা বস্তা লেখা হয়; কিন্তু শেষের কবিতা হয় না। রেমার্কের থ্রি কমরেডস হয় না। আঁদ্রে মারোয়ার ক্লাইমেটস অব লাভ হয় না। হ্যামসুনের প্যান হয় না। প্রেমে হাঁপানির অনুপ্রবেশ, রাজনীতি, ট্রেড ইউনিয়নের খোঁচা। মিলনের পথে আয়ান ঘোষ নয়, বাধা হয়ে দাঁড়ায় জীবিকা, বাসস্থান, অর্থনীতি। প্রেম ধরে টান মারার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সোসিও-ইকনমিক স্ট্রাকচার শিকড় সমেত উঠে চলে এল। দেবদাস এখন বঙ্গের পাত্র। অমিতের পপুলারিটি সেকালের চেয়ে একালে বেড়েছে না কমেছে গবেষকরা বলতে পারবেন। একালের প্রেম তিন রকম, উপন্যাসের প্রেম, বাংলা ছায়াছবির প্রেম, আর হিন্দি ছায়াছবির প্রেম। ইংরেজি উপন্যাস আর ছায়াছবি থেকে প্রেম উবে গেছে। আছে সেকস আর ভায়োলেনস। বাংলা ছায়াছবির চরিত্রদের সোস্যাল স্ট্যাটাস আর আগের মতো নেই। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের অবস্থা, মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল। এধারে এক জোড়া, ওধারে এক জোড়া বাপ-মা। এ সংসারের হাল ধরে আছে ছেলে, ও সংসারের হাল ধরে আছে মেয়ে। মেয়ের বিয়ে করা মানে সংসার লাটে ওঠা। ছেলের বিয়ে মানে হালে পানি না পাওয়া সংসারে বাড়তি চাপ। বোনের বিয়ে হয়নি। বেকার ভাই। পিতার শ্বাসকষ্ট। মায়ের বাত সহযোগে অ্যানিমিয়া। এই পরিস্থিতিতে প্রেমিক-প্রেমিকার অপরাহ্ন মিলন। বসে বসে পায়ের কাছে ঘাস ছেঁড়া আর আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁতে কাটা। ব্যাকগ্রাউন্ডে রাজনৈতিক মিছিল। স্লোগান। নেতার বক্তৃতা। নায়কের দীর্ঘশ্বাস—আর কতকাল! নায়িকার দীর্ঘশ্বাস—আর কতকাল! এরই মাঝে অফিস-বয় ভিলেনের চেহারা নিয়ে মূল কাহিনিতে ঢুকে পড়তে পারে। মাপা ডোজে সেক্স না ছাড়লে বই বিকোবে না। বড়লোকের দামড়া ছেলে ছায়া ফেলতে পারে। নায়িকার হঠাৎ বিয়ে হয়ে যেতে পারে। অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে নায়িকা বলতে পারে, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না প্রসূন। কাহিনি তখন ট্রাজেডির দিকে মোড় নেবে। নায়ক সারাজীবন বিয়ে না করে অন্যের বিয়ে দিয়ে বেড়াবে। জীবনে আর একটি মেয়ে আসতে পারে। নায়ক তখন নারীবিদ্বেষী। শেষ মুহূর্তে চরম কথাটি বলবে রাতের গঙ্গার ধারে—প্রেম বলে কিছু নেই সীমা। সবই হল দেহ আর অর্থ। সীমার চোখে হাপুস জল—কী বলছ তুমি প্রসূন। ডবল ট্রাজেডির দ্বিতালিকা। ব্রেকডাউন স্টেটবাসের মতো কাহিনির সমাপ্তি। সিনেমা সচেতন ঔপন্যাসিক এই ফর্মূলায় আরও মালমশলা ঢোকাতে পারেন। একটা প্রেমের ত্রিভুজ তৈরি করতে পারেন। কোনও নেতাকে এনে রাজনীতির ঝলক ফেলতে পারেন। রাজনীতির সঙ্গে মাস্তান আসবেই। যেমন কান টানলে মাথা। এ ফর্মুলা পাবলিক খাবেই। বছর না ঘুরতেই রুপোলি পর্দায়। সিনেমার কল্যাণে স্টোরির খোল নলচে পালটে যাবে এবং অবধারিত ফ্লপ।
হিন্দি সিনেমার ফাউন্ডেসানই হল প্রেম। একটা ছাঁচ একবারই তৈরি হয়েছিল। সেই ছাঁচেই যুগ যুগ ধরে হাজার হাজার ছবি ঢালাই হয়ে আসছে। নায়ক ধনী হলে নায়িকা গরিব। প্রথম সাক্ষাতে একটা খিচিমিচি হবে। হয় নায়িকার ডিলুক্স সিডানের তলায় নায়ক, আর তা না হলে নায়িকা পড়বে। কেস হাসপাতাল অবধি নাও গড়াতে পারে, আবার পারেও। যে ডিরেকটারের যেমন ইচ্ছে। এরপর গজ-দশেক একটা গান। গানেই প্রেম এসটাব্লিশড হবে। দুজনেরই দুজনের কথা মনে পড়তে থাকবে। গানের প্রতি চরণে মোহব্বত শব্দটি থাকবে। অত:পর শুরু হবে রক-হার্ড বাপের খেল। দুই জেনারেশনের ইনফাইট। এই সময় ভীষণ ভালো ভালো ডায়ালগ ছোঁড়াছুঁড়ি হবে দু-পক্ষে। অর্থনীতি প্রেমের পথে বাধা হতে পারে না। যেসব শব্দের ওপর ডায়ালগ ঘোরাঘুরি করবে তার মধ্যে প্রধান হবে, ইনসান, মোহব্বত, আজাদি, ঝুটা। এই প্রেমের ট্র্যাংগলে পিতা হবে ভিলেন। তারই নিযুক্ত পোষা গুন্ডারা দুটো চেষ্টা করবে। নায়ক কড়োরপতি হলে, নায়িকাকে রেপ করার। আর নায়িকা কড়োরপতি হলে নায়ককে মার্ডার করার। দু-মাইল লম্বা এই কাহিনির মাঝে মধ্যেই এক রাউন্ড ফাইটিং চলবে। ঘুসোঘুসি, নাচ, গান ঘুরে ঘুরে আসবে। কমিনে, কুত্তের ছড়াছড়ি, অবশেষে প্রেমের জয়, ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়।
শিল্পের জগতে দুটি শব্দ প্রায়ই শোনা যায়, প্রডাক্ট আর বাইপ্রডাক্ট। হিন্দি ছবির প্রেম হল প্রডাক্ট। যুবচিত্তে এখন ক্রাইম আর ভায়োলেনশের প্রভাবই বেশি। বেশ একটা ম্যানলি ব্যাপার। সেকালের ভারতীয়রা বিলেতে পড়তে যেতেন। অনেকে পণ্ডিত হয়ে ফিরতেন, আবার অনেকে ফিরে আসতেন শুধু গেলাস ধরা আর টাই আঁটা শিখে। বঙ্গসন্তান বিলেত থেকে ফিরে এসে, খেতে বসে পিসিকে বলছেন, পিসি পিসি, মোচার ঘ্যান্ট, মোচার ঘ্যান্ট। বি সি দত্ত ফিরে এসে হয়ে গেলেন বি সি ডুটা। আমাদের বর্তমান হালচাল অনেকটা সেইরকম। বম্বে আমেরিকাকে মেরে ফাঁক করে দিলে, আর আমরা কায়াছবির বদলে, ছায়াছবি হয়ে সর্বত্র ঢিসুম ঢিসুম করে বেড়াচ্ছি।
ডি এল রায় লিখেছিলেন :
আমার বাংলা গিয়েছি ভুলে
আমরা শিখেছি বিলিতি বুলি
আমরা বিলিতি ধরনে হাসি
আমরা ফরাসি ধরনে কাশি
আমরা পা ফাঁক করে সিগারেট
খেতে
বড্ডই ভালোবাসি।
সব আমরা সাহেবি রকমে হাঁটি
স্পিচ দেই ইংরেজি খাঁটি
কিন্তু বিপদেতে দেই বাঙালিরই
মতো
চম্পট পরিপাটি।
ইংরেজ আর আমাদের অনুকরণীয় নয়। আমেরিকার কাউবয়ের বোম্বাই ভার্সানেই যুবসমাজ গুরুর সন্ধান পেয়ে গেছে। আর ভাবনা নেই। ঘরে ঘরে হিরো। ছাদে হিরোইন। অভিভাবকহীন সংসার, মাথাহীন সমাজ, ব্যক্তিত্বহীন প্রশাসন, লোভী রাজনীতিক, কমপ্লিট ফ্রিডাম ফর অল। অভয়ারাণ্যে বাঘ, সিংহ, শৃগাল হরিণ বিচরণ করছে। টং ঘরে বসে আছেন জনতার প্রতিনিধি। এগজিসটেনসিয়ালিস্ট দি গ্রেট। আজ বাঁচি, কালের কথা কাল ভাবা যাবে।
এখনকার প্রবীণদের যৌবন ভরে রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র। 'বেশ করেছি প্রেম করেছি, করবই তো'র যুগে রবীন্দ্রনাথ এখনও অতলে তলিয়ে যাননি। তবে যেভাবে আমাদের নিজেদের ঔর্ধ্বদাহিক ক্রিয়া চলেছে তাতে কালে ডিসকো রবীন্দ্রসংগীত শুনতে হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এখন রিমিকের যুগ চলেছে। পপ কালচারে দেশ ছেয়ে গেছে। বোধবুদ্ধি ঘুমিয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে। কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। কবির এই আক্ষেপে কেউ সাড়া দেয়নি। মুখেন মারিতং জগৎ। একালের পাঠ্য, জেমস হ্যাডলি চেজ, আর্ভিং ওয়ালেস, এলিয়েস্টার ম্যাকলিন, আর্থার হেইলি। ক্লাসিকাল রাইটারদের আর সে অ্যাপিল নেই। হার্ড নাট টু ক্র্যাক। জীবনভাবনায় এতই সব ভাবিত, পড়তে ভাল্লাগে না। বোরিং। টান নেই। বয়স্কদেরও এখন শিশুর মগজ। মজা চাই, মজা। কমিকস, অরণ্যদেব। জীবনই নেই তো জীবন ভাবনা। শার্দুলরা সব শৃগাল হয়ে গেছে! এই অবক্ষয় ঠেকাবে কে? স্যাডিস্ট জাত মেরে আর মরে আনন্দ পায়। চেতনা জাগ্রত করার মতো কথা শুনলে বলে ব্যাটা জ্ঞান দিচ্ছে। টকসে দে। সেই ছাত্রদ্বয়ের মতো অবস্থা, কিছুতেই যখন পড়বে না, মাস্টারমশাই ভাই দুটিকে নিয়ে ছাদে গেলেন। নাও ঘুড়ি ওড়াও। খুব মজা। উড়ছে ঘুড়ি। প্রথম প্যাঁচে একটা ঘুড়ি কাটল। দ্বিতীয় প্যাঁচে আর একটা। কায়দা করে অঙ্ক শেখাতে হবে। মাস্টারমশাই জিগ্যেস করলেন, কটা কাটল? ছোট ভাই মাস্টারমশাইয়ের ধান্দা ধরে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলত, দাদা পাইলে আয়। মাস্টার শালা অঙ্ক শেখাচ্ছে। দেশ এখন থেকে পালাতে চাইছে। সবই অন্তসারশূন্য। সব কিছুর কাঠামো আছে, প্রাণ নেই। বাইরের পোশাক ঝলমলে, ভেতরে ছোবড়া।
রিপাবলিক মানুষ চায় না। চায় কিছু ব্রুট্যাল, ইনহিউম্যান মানুষ। নিরেট মস্তিষ্ক দ্বিপদ কিছু প্রাণী। যে মানুষ ভাবে, যে মানুষ ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, যারা উন্নত মানুষের জীবন-যাপন করতে চায়, তাদের হাত থেকে সহজে ভোগা দিয়ে মোয়া খাওয়া যায় না। সুতরাং। ব্লুপ্রিন্ট হল যুবশক্তির বারোটা বাজিয়ে দাও। তাদের হোলসেল ক্রিমিন্যাল বানিয়ে দাও। ক্রিমিন্যালদের মর্যাল থাকে না। তখন তারা ক্ষমতার হাতের মুঠোয় ক্রীতদাস। উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে। সব দাবার ঘুঁটি। ইংরেজের সেই নীতি, ডিভাইড অ্যান্ড রুল। সারমেয় প্রথা। পাড়ায় পাড়ায় কেনেল ক্লাব। দাদারা হলে কিপার। দাদাইজম আর ক্যানাইনিজম দেশকে হইহই করে অগ্রগতির দিকে নিয়ে চলেছে। যার ছেলে তার ছেলে নয়, দাদার কাছে টিকি বাঁধা। পুত্র তোমার পরিচয়? আমি ওমুকের চামচা। শব্দটাও বোম্বে ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রির দান। জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ সাধনের পর ভ্যাকুয়াম তো থাকতে পারে না। গ্রামকে পাড়ার টুকরোয় ভেঙে এক এক পাড়া তুলে দেওয়া হয়েছে এক এক মস্তানের হাতে। তারাই পালক, শাসক, সংহারক। তারা খাজনা আদায় করে, তোলা তোলে, যথাস্থানে আইনের দেবালয়ে খাজনা জমা দেয়। আইন অমনি স্মিত নেত্রে বরাভয় প্রদান করে, চালিয়ে গুগলু, আমি এই পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লুম। দেখেও দেখব না, শুনব না। তোমরা নতুন কোড অফ কন্ডাক্ট তৈরি করো। নতুন ভ্যালুজ। চরিত্রের নতুন ডেফিনেশান। শিক্ষার নতুন ব্যবস্থা। জীবনের নতুন রুটিন।
বৈদিক আমলে শিক্ষার্থীর শৈশব আর যৌবনের অগ্রভাগ আলোর তপস্যায় গুরুগৃহে অতিবাহিত হয়। গুরুরা আবার ফিরে এসেছেন ভোল পালটে, ড্রেস পালটে, নতুন ভ্যালুজ নিয়ে। তাঁদের কণ্ঠেও উপনিষদের বাণী। তবে প্রার্থিতবস্তু একটু অন্য ধরনের, অসতো মা সদ অসতোগময়। তমসো মা তমসোতরগময়। মৃত্যোর্মা গরল। গময়। অসত্য থেকে আরও অসত্যের দিকে নিয়ে চলে। অন্ধকার থেকে নিয়ে চলো আরও অন্ধকারে। মৃত্যু থেকে ঠেলে দাও গরলসমুদ্রে। আধুনিক গুরু চ্যালা চামুণ্ডা নিয়ে ঘোটুলে বসবাস করেন। রক হলে চৌকি। ঊষাকালে নিদ্রা। রাত্রে জাগরণ। তখনকার করণীয় কর্মের নাম অ্যাকশন। সেকাল বড়ো বেকাল ছিল। যুদ্ধ হত দেশে দেশে এখন হয় পাড়ায় পাড়ায়। কে জাগে? আমরা জাগি আর জাগে পাল পাল নেড়ি। সূর্যাস্তে শয্যাত্যাগ নবগুরুবিধান। আরক পান। নার্ভ-উত্তেজক বটিকা সেবন। তারপর চুইংগাম চিবোতে চিবোতে দেশের নতুন ভবিষ্যৎদের সাধনা শুরু, কখনও শাক্তমতে, কখনও বৈষ্ণবমতে। শাক্তধারায় অ্যাকশন, বৈষ্ণবধারায় লীলা।
একালের যৌবনে প্রেম নেই। দেহ আছে। দৈহিক ক্রিয়া আছে। গণ্ডিবদ্ধ জীবন। যৌবন বিকিয়ে গেছে। ভালো কিছু হওয়ার বাসনা নেই। ভালো শব্দটাও আপেক্ষিক। সেকালের ভালো ছেলে বলতে বোঝাত, লেখাপড়ায় ভালো, দৈহিক আর মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী, বিনয়ী, সচ্চরিত্র, ম্যানারস আর এটিকেটদুরস্ত। জীবনে প্রতিষ্ঠিত। ডাক্তার অথবা আইনজীবী, কি অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার অথবা সৎ ব্যবসায়ী এবং পরোপকারী। সংজ্ঞা এখন পালটে গেছে। ঔদ্ধত্য, অসভ্যতা, তেরিয়া-মেরিয়া স্বভাবের অধিকারী না হলে পাঁচজনে বলবেন, অ্যা: ব্যাটা মেনিমুখো, ম্যাদামারা। বাপ বললে, শালা না বললে চরিত্র সার্টিফিকেট থেকে পঞ্চাশ নম্বর কাটা পড়বে। ম্যানারস, এটিকেট সেকেলে ন্যাকামি। পারমিসিভ সোসাইটি। যে যা করবে সেইটাই আচরণ বিধি। রাত বারোটায় হল্লা মাচাও, মাইক চালাও, বোমা ফাটিয়ে বিজয়ানন্দ প্রকাশ করো। চা খেয়ে তলানি সমেত ভাঁড় ছুঁড়ে দাও পথচারীর গায়ে। যত্রতত্র থুতু ছেটাও। দেওয়াল ভাসিয়ে দাও। পা বাড়িয়ে কনুয়ের গুঁতো মেরে এগিয়ে চলো। প্রতিবাদ করলেই লাশ ফেলে দাও নর্দমায়।
যৌবনের ভিসুভিয়াসের ওপর বার্ধক্য কাঁপছে। সমাজের দিকে তাকালেই দেখা যাবে প্রবীণদের কী হতাশ অবস্থা। রাস্তার একপাশ দিয়ে, নর্দমার কিনারা ঘেঁষে গুটিসুটি চলেছেন অমুকের বাবা, তমুকের বাবা। এক সময়ের মাননীয়, আদর্শপরায়ণ শিক্ষক। সৎ নাগরিক। কর্তব্যপরায়ণ সংসারী। ওল্ড ফুলের দল। রাস্তায় মাঝখান দিয়ে বুক চিতিয়ে চলেছে যৌবন। মুখে নয়া জামানার ল্যাঙ্গোয়েজ। মনে? মনে কী আছে? আবার ডি এল রায়কে স্মরণ করি :
You are not far wrong if you think.
যে আমরা করি একটু বেশি drink কিন্তু codsidering our evolution-এর
আমাদের morals নয় খুব loose
তবে about morals
we care a hang if you think
তা'লে
তিন মাথা সার, বুদ্ধি নেমে তার, এই আপ্তবাক্য, একালের প্রাপ্তবয়স্কারা কিঞ্চিৎ সংশোধন করে নিয়েছে। তিনমাথা যার সে একটি বুদ্ধু।
বিপদভঞ্জন মধুসূদন ব্রাত্য প্রবীণদের সহায়। ব্যবসায়ী মধুসূদন ভেজাল তেল খাইয়ে চোখের লেন্সে চালসে ফেলেছেন। দূর থেকে জগৎ ঝাপসা। পর্দার ওপাশে চলমান ক্যারিকেচার। ড্রাইভার মধুসূদন ইলেকট্রিক ভেঁপু মেরে মেরে কানের পর্দা থ্রেডবেয়ার করে দিয়েছে। কোনও বাক্যই আর স্পষ্ট নয়। তাল গোল পাকানো নয়েজ। প্রশাসক মধুসূদন অর্থনীতির হাল অ্যায়সা কঠিন মুঠোয় ধরেছেন, দৈহিক পুষ্টির আর প্রশ্নই ওঠে না। পেটে কী ঢুকছে, ঢুকে তার কী কনট্রিবিউশন, কেউ আর মাথা ঘামায় না। সেই আপ্তবাক্যও একালে অচল, মাঝপুকুরের জল খাবে, প্রতি গ্রাসে মাছের মুড়ো। অতএব অকালেই ভীমরতি। মন কিছু নেয়ও না, ধরে রাখতেও পারে না। মানুষ বললে মানুষ, গাধা বললে গাধা। লগবগে পায়ে ওই একবার মেয়ের বাড়ি নয়তো বড় ছেলের বাড়ি, নয়তো বাল্যবন্ধু আর এক ওলডফুলের সুইট হোমে। যেখানে অষ্টপ্রহর শব্দের জগাখিচুড়ি চলেছে। সস্তা ট্রানজিসটার গলিত হিন্দিগান ঢালছে। রেকর্ড প্লেয়ার নাকি সুরে কাঁদছে।þ বৈঠকখানায় তরুণদের তরতাজা বাণী বেরচ্ছে, হেঁসেলে গৃহবধূ তাল ঠুকছে। কলতলায় কাজের মহিলা খই ভাজছে পাশের বাড়িতে কর্তাগিন্নির স্টক টকিং চলছে পাড়া কাঁপিয়ে, শীতলাতলায় বাবা তারকনাথের ক্যাম্প খোলা হয়েছে, মাইক ফুঁসছে অমায়িক আস্ফালনে। কোণের গুমটি ঘরে বাল্যবন্ধু বসে আছে। ছানাবড়া চোখ। পাথরের মুখ। স্টোন ফেসেড। উঠানে বড় ছেলে আর মেজ ছেলেতে কাজিয়া চলেছে, মর্ডান ভোকাবুলারিতে। বার কয়েক শুয়োরের বাচ্চা শ্রুত হয়েছে। বৃদ্ধের তাজিয়া যতদিন না এ বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে ততদিন এই কাজিয়া চলছে, চলবে। বুড়ো গন তো বাড়িও গন। ক্যমুনাল রায়ট বেঁধে যাবে।
নেশা আর আশা এই নিয়ে বাঁচা। সেকালে মানুষ বাঁচত ছেলের আশায়, মেয়েকে সৎপাত্রস্থ দেখে যাওয়ার আশায়। তীর্থে স্ত্রীর কোলে মাথা রোখে মৃত্যুর আশায়। মুখে এক চামচ গঙ্গোদক, ঠোঁটে ছেলের হাতের আগুন। প্রিমিটিভ ডিজায়ার্স। একালের আশা—এমন থাকবে না দিন অবশ্যই পালটাবে। আবার পক্ষিসকল গান করিবে, অপ্সরাগণ নৃত্য করিবে, স্বর্গে দুন্দুভি বাজিবে। নিরাশাবাদীর ধমক, কাঁচকলা হবে। আরও খারাপ দিন, ভেরি ভেরি ব্যাড ডেজ আর কামিং। মানুষ অতপর মানুষ ধরে খাবে।
আশা গেল তা রইল নেশা। বাঁচার নেশা। যে কোনওরকম বাঁচারই একটা নেশা থাকে। সেই নেশায় আর একটু নেশা ঢালতে পারলেই দু:খের রজনি আর দীর্ঘ মনে হবে না। চোলাইয়ের নেশা নয়। অন্য নেশা। জ্যোতিষী মন্দ নয়। গ্রহনক্ষত্রে পরিবর্তনশীল লাগাতার চক্রান্ত। সেই চক্রান্ত ফাঁস করার চেষ্টায় জগৎ মিথ্যা হয়ে যাবে। চোখ ভালো থাকলে পড়ার নেশা। একালের মতো এত বই, এত রকমের বই কোনও কালে ছিল না। তা না হলে মাছধরার নেশা। ছিপ ফেলে বোসো। লটারির নেশা একটা কাটলে এক সপ্তাহ বেঁচে থাকার স্টিম্যুলেন্ট এসে গেল। সেটা না লাগলে, আর একটা, আবার এক সপ্তাহ। ওটা না লাগলে আর একটা, আবার এক সপ্তাহ। গেঁটে বাতের মতো, নেশার আশা, নেশায় গাঁট থেকে গাঁটে উতরে যাওয়া। যে গাধা চলতে চায় না তার নাকের ডগায় গাজর দুলিয়ে, আশায় আশায় চালাতে হয়। গাধা ভাবে একধাপ এগোলেই গাজর নাগালে এসে যাবে। মানুষগাধা জানে আশা সাধারণত অপূর্ণই থেকে যায়। জীবন নিয়ে কাব্য করে বলা যায়—আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়। মানুষ দার্শনিক প্রাণী। অতৃপ্তি, অসুখ, আশাভঙ্গ, ব্যর্থতা, বেদনা থেকেও একধরনের তৃপ্তি খুঁজে বের করে। সফল প্রেমিকের চেয়ে ব্যর্থ প্রেমিকের সুখ অনেক বেশি। প্রেম থেকে বিবাহ থেকে সন্তান-সন্ততি, চ্যাঁ-ভ্যাঁ, দুধ, বেবিফুড, অয়েল ক্লথ, মুতো কাঁথা। টিউমারের মতো সংসার বাড়বে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। যে প্রেমিকার হাত ধরে চাঁদের আলোয়, ঝাউবনে সিনেমার ঢঙে গান গাওয়া হয়েছিল—তুমি আর আমি, সেই প্রেমিকা স্ত্রী হলেই নিত্য খ্যাচোখেচি। প্রেমের এ হেন অপমান অসহ্য। প্রেম আকাশের চাঁদের মতো, হাতের নাগালের বাইরে ফুটে থাকা ফুলের মতো হলে তবেই তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। তুমি আমায় ভালোবাসো, আমি তোমায় ভালোবাসি। দাস ফার অ্যান্ড নো ফার্দার। ব্যর্থ প্রেমিক সেই কারণে অনেক সুখী। আশাভঙ্গের তিক্ততায় বলতে হয় না—হায়! এর নাম প্রেম? সারাজীবন একটা বিরহী ভাব নিয়ে, বৈষ্ণব পদাবলি হয়ে জীবন কাটানো যায়। দাগামারা বিরহী। সে এমন একটা জিনিস, বলে বোঝানো যাবে না। এমন মানুষ যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বে এলে আত্মভোলা, সদাশিব। মেজভাই, ছোটবোন বলবে—দাদা! দাদা তো আর বিয়ে-টিয়ে করলে না, ওই নিয়েই আছে। কী নিয়ে আছে?
এই নিয়ে থাকাটাই সব। মগজের একটা দুটো ইস্ক্রূপ সামান্য ঢিলে করে দিয়ে পাটোয়ারের দুনিয়ার বাইরে নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি করে তোফা থাকা। 'শ্যান পাগল বুঁচকি আগল' হলে চলবে না। প্রকৃত একসেন্ট্রিক হতে হবে। একটু খামখেয়ালি, একবগগা। এমন মানুষ বড় সুখে দিনাতিপাত করে। কোনও কিছুতেই তেমন আগল থাকে না, বাঁধন থাকে না। মন থেকে বিষয়ের চিন্তাটা কোনও রকমে সরাতে পারলেই বেঁচে থাকার আনন্দদায়ক রাস্তা খুলে যায়। অমুকের তমুক হল। গাড়ি হল, বাড়ি হল, ছেলের ভালো চাকরি হল, মেয়ের ভালো বিয়ে হল, বিরাট প্রাোমোশন হল, বিদেশ গেল, এইসব ভেবে ভেবে জলবিছুটি খাওয়া মানুষের মতো চিড়বিড় করে জীবন কাটাতে হবে না। যৌবনের শুরুতেই বেশ একটা ঘা খেয়ে মনের অসমপ্রবৃত্তিগুলোকে ভোঁতা করে ফ্যালো, তারপর জীবন একেবারে সহজ সরল। নারীই পুরুষকে পথ দেখায়। কোনও সন্দেহ নেই। আদ্যাশক্তি। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললে ঘোরতর সংসারী। বাঁধন খুলে দিলে মুক্তপাখি। সারা জীবন উড়ে উড়ে বেড়াও। সংসারের জোয়ালে জুততে না হলে, কত কী যে করা যায়! জীবনের ধরনধারণই পালটে যায়। মনের সব প্যাঁচপোঁচ খুলে যায়। টাকা আনা পাইয়ের প্রবল দুশ্চিন্তা নেই। জীবিকা ভয় দেখাতে পারে না। তেলের পাত্র নিয়ে ওপরে ওঠার পথ সুগম করতে হয় না। সর্বসময় সেই গল্পের কোলাব্যাঙের মতো গালগলা ফুলিয়ে বলে যাও—'কে কার কড়ি ধারে'। সেই ব্যাঙটি একটি আধুলি পেয়েছিল।
এমন মানুষ যে কত আছেন। ট্যাঁকে ছেলে নিয়ে যাঁদের কোনওদিন শিশুবিশেষজ্ঞের চেম্বারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিতে হল না। সারারাত জেগে জেগে পাখার বাতাস টানতে হল না। মাঝরাতে প্রসব তাড়নায় কাতর স্ত্রীকে নিয়ে ছুটতে হল না নার্সিং হোমে। ঠিকুর রোদে দাঁড়াতে হল না কেরোসিনের লাইনে। ছেঁড়া রেশন কার্ড পালটাবার জন্যে বাবা তারকনাথের স্থানে হত্যা দেওয়ার মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতে হল না রেশনিং অফিসে। সরকারি দুধ এল না বলে বিহারী দুগ্ধ ব্যবসায়ী চরণের সেবায় লাগতে হল না। এইসব মানুষ নারীজাতির ভীষণ ভালোবাসার পাত্র। এক নারীর ল্যাং খেলে সমগ্র নারীজাতির ভালোবাসার সহস্রধারা খুলে যায়। জীবনের এই এক মজা। যাকে চাওয়া যায়, তাকে পাওয়া যায় না। পেলেও বনিবনা হয় না। আর তখন যে চায় তার কাছে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ডগ ইন দি ম্যানজার। নিজেও খাবে না ঘোড়াকেও খেতে দেবে না। প্রেম উত্তম বস্তু। মানুষের স্বভাবচরিত্র পালটে দেয়। সংসার কিন্তু ভালো নয়। বিজ্ঞান বলে, বেশি আঁচে সেদ্ধ হলে তরিতরকারির ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়। কলে বেশি ছাঁটাই হলে চালের ভিটামিন-বি ঝরে যায়। প্রেমকে ওই কারণে সংসারের আঁচে ফেলতে নেই। পার্ক, গঙ্গারধার, সিনেমা, রেস্তোরায় ফেলে রেখে সরে আসতে হয় স্মৃতি নিয়ে, ক্ষত নিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীই হল আমাদের জীবনের প্রকৃত বন্ধু। যে কেড়ে নেয় সেই আমাদের আসল জিনিস দিয়ে যায়। দিয়ে যায় জীবন-দর্শন। বদ্ধপুরুষকে দেখিয়ে দেয় মুক্তপুরুষের রাস্তা।
সংসার এক ধরনের আলসার। মশলাবর্জিত জীবনের বোঝা টেনে যেতে হয়। অথচ জীবনের কত রকমের মশলাই না আছে! প্রতিদিন এক ভদ্রলোক পার্ক স্ট্রিটের অকশনারদের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ান। মধ্যবয়সী মানুষ। দুপাশে দু-ভাগ করা কাঁচা-পাকা চুল। চোখে চিকচিকে সোনার চশমা। ওয়েলড্রেসড। অনুসন্ধানের বস্তু পুরোনো আমলের ঘড়ি। ঘড়ি-পাগল মানুষ। সর্বযুগের ঘড়ি শোভিত ঘরে বসে দিনরাত সময়ের চলন শোনেন। আমার সঙ্গে পরিচয় নেই। না থাকলেও আমি তাঁর জীবনকাহিনি লিখতে পারি। কারণ আমরা দুজনেই এক পালকের পাখি। আমার অনুসন্ধানের বস্তু কলম। দেশ-বিদেশের পুরোনো আমলের কলম। আমরা দুজনেই ব্যর্থ প্রেমিক। আমাদের চপলা কি কমলা আমাদের রাইভ্যালের কণ্ঠলগ্না। এখন তারা স্থূলকায়া। সন্তানের মুখরা জননী। তাঁরা যাঁদের স্কন্ধারূঢ় তাঁরা হয়তো মনে মনে সদাসর্বদাই বলছেন—ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। যতই বলো না কেন, কমলি নেহি ছোড়তি। আমরা দুই মুক্তপুরুষ বেশ মজায় আছি। একজনের আকর্ষণ ঘড়ি, আর একজনের কলম।
নার্সারিতে নার্সারিতে যে গাছপাগল মানুষটি প্রায়ই যাওয়া আসা করেন, তাঁকেও আমি চিনি। মানুষের কাছে ঘা খেতে খেতে দ্বিপদ মনুষ্যসমাজ থেকে সরে এসে গাছের জগতে মুক্তি খুঁজছেন। মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। হতাশ করতে পারে। গাছ কিন্তু করে না। পরিচর্যা করলে সময়ে ফুলে ফলে ভরে উঠবেই। সন্তান বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরে পড়তে পারে। সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে বিপথে যেতে পারে। গোলাপ পরিচর্যায় গোলাপই দেবে। কামিনী ভরে যাবে বর্ষার আগমনে। শীতের চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া। রোদ ঝলসানো বৈশাখে হলুদ সোঁদাল। আইনস্টাইন শেষ জীবনে হতাশাগ্রস্ত এক পত্রলেখককে উপদেশ দিয়েছিলেন—লাভ নেচার, বি-ফ্রেন্ড অ্যানিম্যালস। প্রকৃতিকে ভালোবাসলে সেন্টপারসেন্ট রিটার্ন পাওয়া যায়। কোনও সন্দেহ নেই। আর জীবজগৎ থেকে মনের মতো একটি কুকুর। সব নি:সঙ্গতা ভরে যাবে।
কুকুর-প্রেমী মানুষকেও আমি চিনি। মানুষের পেছনে, কোনও মানবীর পেছনে উপহারের ডালা সাজিয়ে ছুটে কী হবে ন্যাকান্যাকা প্রেমের কথা বলেই বা কী লাভ! আবেগের কোনও মূল্য আছে। ভস্মে ঘি ঢালা। মানুষ বড়ো নিষ্ঠুর, স্বার্থপর প্রাণী। কুকুরকে ভালোবাসলে প্রভুর জন্যে জীবন দেবে। বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত বসে থাকবে পথ চেয়ে, অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে মাথার কাছে বসে থাকবে অন্ন-জল ত্যাগ করে, কোনও মানুষ কী এমন ব্যবহার করবে। ঘাটের মড়া কোথায় আড্ডা মারছে কে জানে। রইল রাতের খাবার চাপা।
বই পাগল মানুষকেও আমি চিনি। খেয়ে না খেয়ে একের পর এক বই কিনে চলেছেন। ঘরদোর বইয়ে ঠেসে গেছে। দৃকপাত নেই। সংসার-সমুদ্র ছেড়ে জ্ঞান-সমুদ্রে নিমজ্জিত। দুটি সুন্দর মলাটের অন্তরালে পৃথিবীর যত ষড়যন্ত্র সব ফাঁস হয়ে আছে। মহাকাশের রহস্য পশুর গোপন আচার-আচরণ, নিভৃত অরণ্যের শোভা। মানুষের পদসেবা করে পাওয়া যাবে অকৃতজ্ঞতা, তিক্ততা। বই মানুষকে শুধু হাতে, শুকনো মুখে ফেরাবে না। এক এক করে জীবনের পাত ওলটালেও জ্ঞান বাড়বে। সেখানেও রহস্য রোমাঞ্চ আছে। তবে জীবনের সব পাতা একেবারে ওলটানো যায় না। জীবনের শেষ দিন শেষ পাতাটি ওলটাতে হবে। তখন আর জমাখরচের হিসেব থাকে না। কী দিলুম আর কী কী পেলুম, অর্থহীন প্রশ্ন। জ্ঞান-সমুদ্র আগের বহু আগের, বর্তমানের মানুষের দানসমুদ্র। দ্রষ্টার ভবিষ্যৎদর্শনেও সমৃদ্ধ। সেয়ানাপাগল না হয়ে জ্ঞানপাগল হলে পুনপুন গতাগতির এই বিচিত্র, অজানা, রহস্যময় জগতের কাণ্ড কারখানা আর তেমন অসহ্য লাগে না।
বহু পথ ধরেই জীবনান্তরের সিংহ-দরজায় যাওয়া যায়। হাসতে হাসতে যাওয়া ভালো, না নাকের জলে চোখের জলে যাওয়া ভালো। যার যেমন অভিরুচি। সকলেরই তো এক অবস্থা :
কোঈ উম্মীদ বর নঁহী আতী,
কোঈ সুরৎ নজর নঁহী আতী।।
[গালিব]
কোন আশাই পূর্ণ হয় না,
কোন পথই দেখা যায় না কোথাও।
[অনু : আবু সয়ীদ আইয়ুব]
এই অবস্থাটাই তো আমরা বুঝি না। চোগাচাপকানের অহঙ্কার, জীবিকার অহঙ্কার, ডিগ্রি-ডিপ্লোমার অহঙ্কার, জাগতিক জ্ঞানের অহঙ্কার নিয়ে হিলতোলা জুতোর মতো খটমট কত রকমের অহঙ্কার যে আছে! একটু ভালো চেহারা, উঁচু নাক, ফরসা চামড়, ব্যস হয়ে গেল! প্রিনস অফ ওয়েলস। কথায় কথায় এমন উক্তি—ওই প্যাঁচামুখো ছেলেটা কে এসেছিল হে? অমুকের কেলে কিসকিণ্ডে বউটা লাল শাড়ি পরে চলেছে, যেন টিকেয় আগুন। সামান্য চুলেরও কত অহঙ্কার। কী? না মাথায় এক মাথা চুল আছে। এই তেল পড়ছে, এই শ্যাম্পু পড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলের কেয়ারি। চুলের পেছনেই ফরচুন ঢালা। পোশাকের অহঙ্কার। সেও এক সাংঘাতিক ব্যাপার। সব সময় টিপটপ। ওয়ার্ডরোব উপচে পড়ছে। জামাকাপড়ে হিসেব থাকে না। এর ওপর যদি আবার ফরেনের নেশা চাপে, দুনিয়া অন্ধকার। ফরেন প্যান্ট শার্ট পরে গরমে গায়ে ব্লিস্টার, মরো মরো অবস্থা। তা হোক। দেহসুখ না থাক, ইগো স্যাটিসফায়েডে। পোশাকের পরিচর্যায় সব সময় চলে গেল। ধোলাই। পাতিলেবুর রস, কমলালেবুর রস, ভিনিগারে চোবানো। নরমে নরমে ইস্তিরি। দাগ লেগে যাবে কি পাট ভেঙে যাবে বলে, চলতে ফিরতে উঠতে বসতে আড়ষ্ট কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ। এমন মানুষ প্রায়ই চোখে পড়বে। বাসস্টপে অথবা প্রেক্ষাগৃহের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সকলের থেকে পৃথক। রুমাল চাপা নাক। যেন বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং থেকে সড়াৎ করে নেমে এসেছেন। এমন মানুষও আছেন যাঁর শ'খানেক সোয়েটার আছে। আমরা যেমন শুনি, স্বল্পং স্তথা শীতায়ু বহবশ্চ শীতবস্তা। মাস দুয়েক স্থায়ী শীতে শ'দেড়েক সোয়েটার পরা। কী যে যাতনা। যে মহিলার শ'পাঁচেক শাড়ি তাঁরই বা কী অবস্থা? ন্যাজে-গোবরে ব্যাপার। যে ভদ্রলোক গোটা বারো বিভিন্ন ফ্রেমের চশমার মালিক, বারে বারে ভোল পালটাবার অপরাধে পুলিশ যদি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, কিছু বলার আছে? যিনি শ'আড়াই কলমের মালিক, তাঁর অবস্থাও তো মোগল-বাদশাহের মতো। কলমের হারেম। ছুটির দিন শুধু জল পোরো আর জল ফেলো। নয় তো কলম শুকিয়ে চামচিকি হয়ে যাবে।
যাঁর নিজের কিছু নেই, তিনি আবার অন্যের গরবে গরবিত। আমার বউ সুন্দরী, প্যারাগন অফ বিউটি। স্ত্রী চলেছেন আগে আগে, দু-পা পেছনে স্বামী। মোরগের মতো গর্বিত চলন, মিটিমিটি ইতি-উতি চাওয়া। জগৎ দ্যাখো, দ্যাখো, সুন্দরী বউয়ের মালিক আমি এক শশধর।
আমার ভায়েরা ফরেনে বিরাট ইঞ্জিনিয়ার, সেই গর্বেই গদাধর। সারা জীবনে সেই ভায়রা কদাচ খবর নিলেন না। শ্যালিকা আমেরিকায় থাকেন। সেই অহঙ্কারেই জনৈক চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খাওয়ার পর টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচেন। কারুর কিছু প্রয়োজন হলেই আগ বাড়িয়ে বলেন, আমেরিকা থেকে আনিয়ে দেব। আমি দিশি ব্লেড ব্যবহার করি না, দিশি পারফ্যুম, সাবান আমি ছুঁই না। ওই যে আমার শ্যালি আমেরিকায় থাকেন। ওয়ানস এ ইয়ার কামস হিয়ার।
জীবন থেকে সরে এসে, নভোচরের মতো সামান্য ঊর্ধ্বে উঠে জগৎ সংসারের দিকে তাকালে অদ্ভুত এক প্যান্টোমাইম। ক্রেজি ওয়ার্ল্ড। কেউ হাসছে, কেউ গাইছে, কেউ কাঁদছে, কেউ হাত-পা ছুঁড়ে বক্তৃতা মারছে। কেউ যোগাসনে, কেউ ভোগাসনে। কেউ জ্ঞান দিচ্ছেন, কেউ জ্ঞান নিচ্ছেন। কেউ সেবক, কেউ সেবিত। যেন রক্তমাখা সব সঙের খেলা। কবীর যা দেখেছিলেন, সেই দর্শনই হবে আকাশ আর ভূমি, এই দুই জাঁতার মাঝখানে গমের দানার মতো জীবন ঠিকরে বেড়াচ্ছে। বাবুরা কাবু। জীবন যন্ত্রণায় বেহাল। তবু আস্ফালন। আঁতেলের আঁতলামো, ভাঁড়ের ভাঁড়ামো, ভণ্ডের ভণ্ডামি, ইতরের ইতরামি, বাঁদরের বাঁদরামি। তালগোল পাকানো জীবনের মণ্ড। আমরা Beautiful muddle, a queer amalgam of শশধর Husley and goose.’
গল্পের খোঁজে লেখকদের নানা জায়গায় যেতে হয়। নানা দেশে নানা পরিবেশে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দিনলিপিতে লিখছেন—সব কোয়েন্ট ধরনের লোকের সঙ্গে মিশতে হবে। 'মম' এসেছিলেন ভারতবর্ষে, গ্রাহাম গ্রিন গেলেন আফ্রিকায়। জ্যাক লন্ডন হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ালেন চরিত্রের সন্ধানে গল্পের সন্ধানে! কমপিউটারকে যেমন আগেভাগেই নানা তথ্য দিয়ে তার যান্ত্রিক মস্তিষ্কটি তৈরি করে দিতে হয়, তা না হলে কোনও সমস্যাই তার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব হয় না, কোনও প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর আসে না, লেখাকেও তেমনি সর্বসময়ে আইডিয়া দিয়ে, মুড দিয়ে, নিজেকেই নিজে ভরপুর করে রাখতে হয়। কখন বেদনা ফিরে চাবকাতে হয়, কখন সুখ সুখ ভাবের ময়ূর-পেখম মনের আকাশে মেলে দিতে হয়। কখন রাগ, কখন বিষাদ, কখন হর্ষ, কখন উল্লাস—নানাভাবে মানসিক অবস্থায় নিজেকে রেখে নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি মেজাজের আবরণ তৈরি করে, বিভিন্ন পরিস্থিতি, পরিবেশের মধ্যে থেকে জন্ম দেওয়া। চরিত্রের জন্ম, ঘটনার জন্ম, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জন্ম। দিনের জন্ম, রাতের জন্ম। প্রথম একাত্মতা, পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে এসে অনুভূতি আর কল্পনা দিয়ে বাস্তবের আদলেই নিটোল একটি জগৎ তৈরি করা। ক্রশবিদ্ধ যিশুর কথা ভেবে এক ভক্তের হাতের আর পায়ের তালু থেকে রক্তক্ষরণ হত। যবন হরিদাসকে চাবুক মারা হল, দাগ ফুটে উঠল শ্রীচৈতন্যের শরীরে। দুটো হৃদয় না থাকলে সৃষ্টি হয় না।
তাহলে গল্পের খোঁজে অন্য কোথাও যাওয়ার আগে নিজের কাছে সরে আসা ভালো। যার হাত ধরে পথে বেরিয়েছি, আসরে নেমেছি, যাকে সামলাতে, সুখে রাখতে, মেজাজে রাখতে এত কসরত, যার আবদার সামলাতে নাজেহাল, সেই আমিটাকেই যদি ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লক্ষ করা যায়, সেই আমিই তো কয়েকশো চরিত্রের কাহিনির জন্ম দিতে পারে। আমিটাকে বিকিয়ে দেওয়ার জন্যেই তো পৃথিবীতে আসা।
'আমির বাহার' বহুরূপ সম্মুখে আমার—আমি। ভীতু আমি, সাহসী আমি, ভোগী আমি, ত্যাগী আমি, প্রেমিক আমি, বিরহী আমি, ঋষি আমি, উদার আমি, শয়তান আমি, প্রকাশিত আমি, অপ্রকাশিত আমি। আমির কেয়ারি করা বাগান।
'চাপের আমি, আমির চাপ' আমার বা আমাদের আসল আমি বা ভার্জিন আমিটা কেমন ছিল বলা মুশকিল। শৈশবে আমিটা যখন সবে কুঁড়ি খুলে ফুল হতে চলেছে তখনই আমির বাগানের বড় বড় মালিদের নানারকম ছাঁটকাট শুরু হয়ে গেল। চেয়ারে বসানো হল, সামনে আয়না। পিতার হাতে কাঁচি, মাতার মুখে হাসি, অভিভাবকদের নানা উপদেশ। 'আমি ছাঁটাই সেলুন।' ওই যে কানের পাশ দিয়ে অবাধ্যতা খোঁচা মেরেছে—একটু ছেঁটে দাও। ঘাড়ের কাছে বড্ড বেশি স্বাধীন ইচ্ছে লটপট করছে, দাও একটু চেঁছে। পুডিং তৈরির টিনের খোপে 'আমি টাকে গুলে ঢেলে দাও, তারপর আমাদের ইচ্ছের উনানের তাপে জমিয়ে, 'আমাদের' ভালোবাসার ফ্লেবার দিয়ে বাজারে ছেড়ে দাও। শ্রীমান অমুকচন্দ্র তমুক।
সেই চাপের আমি ছাঁটের আমি, চারদিকে আমির চাপ, আমির ছাঁট তৈরির চেষ্টা করে চলেছে। তোমার 'তুমি'র ওপর, আমার 'আমি'টা চেপে বসে থাকবে। কারণ আমার 'আমি'টার ওপর অন্যের 'আমি'টা জড়িয়ে আছে।
'ফুল পয়েন্ট, তিন পয়েন্ট'। আমি চাই, পাখা ঘুরবে তিন পয়েন্টে। ফুল পয়েন্টে সাঁই সাঁই পাখা ঘুরলে আমি বিরক্ত হই। দেওয়ালে ক্যালেন্ডারের ঠ্যাং ছোঁড়ার শব্দ হয়, খবর কাগজ পড়তে পারা যায় না। বইয়ের পাতা উড়তে থাকে। সব কিছু চেপে রাখতে না পারলে সারা ঘরে উড়তে থাকে। আমি চাই তিন, তুমি চাও ফুল স্পিড। ঘরের মালিক আমি, আমার পয়সার পাখা। বিল দেব আমি। আমি বলছি তিন, তিনেই থাকবে।
'ফুল পয়েন্ট ভার্সাস তিন পয়েন্ট'। ফুল পয়েন্টে যিনি পাখা চালাতে চান, তাঁকে কিছু অধিকার দিয়েই জীবনে প্রবেশ পথ করে দেওয়া হয়েছে। সেই 'তুমি' আর 'আমি' দুটোরই স্বতন্ত্র ওজন আছে। দুটোকে দু'পাল্লায় রাখলে কাঁটা যদি সমান থেকে যায়, তাহলে একটা রফা হবে—বেশ, তোমার কথাও, আমার কথাও থাক, চারে চলুক। আমি যদি ভারী হই তাহলে রাখো তোমার ফুল। তিন, তিন তিনেই চলবে। 'তুমি' যদি ভারী হও, তাহলে রাখো তোমার তিন, ফুল স্পিড লাগাও।
একটা সময় ছিল যখন সব সংসারেই কর্তা 'আমি'র বেশ ওজন ছিল। নাদুস-নুদুস নেয়াপাতি ভুঁড়ি। হয় ন্যাজঝেলা গোঁফ, না হয় কার্নিস খোলা গোঁফ, অথবা হিটলারি বাটার ফ্লাই। ভেতরে একটা গমগমে 'আমি'। বাড়ির ঝি বাইরে বর্ণনা দিচ্ছে—কর্তা এই এতখানি শরীর নিয়ে লাল একটা লুঙ্গি পরে লাল মেঝেতে আসন পেতে খেতে বসেছে। টকটক করছে চওড়া পিঠ। ব্রহ্মদত্যির মতো সাদা চওড়া পৈতে। মুক্তোর মতো ঘাম ফুটে উঠেছে। ঝকঝকে থালার পাশে গোল করে সাজানো বাটি। আমের আঁটিটা মুখে ধরেছে। যেন সুন্দরবনের রয়েল বাঘ প্রসন্ন মুদির ঘাড় কামড়ে ধরেছে। পাশে বসে গিন্নী ঝালর লাগানো হাতপাখার হাওয়া করছে। বয়েস হয়েছে তো, সাদা ধবধবে শাড়ি, চওড়া ভেলভেট পাড়। এই এতবড় আঁচলা। থেবড়ে বসেছে, পেছনটা যেন চৌধুরীবাবুদের বাড়ির থাম। সাদা গোল হাতে মিছরিকাটা চুড়ি বাজছে টিনটিন। ঘুম এসে যায়। ল্যাংড়ার আঁটি চুষতে চুষতে কর্তা গিন্নির দিকে যখন তাকাচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে, এই বড় একটা কদম ফুল। যেন রাধিকার দিকে চেয়ে আছে। গোঁফে আমের রস। দুটো নীল মাছি ঠোঁটের কাছে ভ্যান ভ্যান করছে। লোমওয়ালা সাদা কাবলে বেড়ালটা সামনে থেবড়ে বসে মিটি মিটি চাইছে। মাঝে মাঝে জড়ানো গলায় মিউ মিউ করছে। একবার করে উঠতে চাইছে, গিন্নি বাঁ হাত দিয়ে মাথায় চাপড় মেরে বলছেন—খুঁশি খুঁশি। খাওয়া শেষ করে ঢেঁকুর তুললে—মনে হল গোয়ালে মুংগিটা ডেকে উঠল—হাম্বা! কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়লেন—মোক্ষদা হাতে জল দিয়ে যা। শব্দ শুনে ঘুলঘুলি থেকে দুটো পায়রা ঝটপট করে বেরিয়ে আকাশে তিন চক্কর পাক খেয়ে এল। হাত মুছে বললেন—কই গো পান দাও। মনে হল বারোয়ারি তলায় ঢাকে কাঠি পড়ল।
তিরিক্ষি মেজাজের খিটখিটে কর্তার খোলেও ঝনঝনে একটা 'আমি' থাকতে পারে। ডিসপেপসিয়ায় তোবড়া গাল, গর্তে বসা হলদেটে চোখ নাকের তলায় খ্যাংরা গোঁপ। মাথার ব্রহ্মতালুটা কমিয়ে ডিম ছুড়ে ছেড়ে দিলে পোচ তৈরি হয়ে যাবে। রাতে ঘুমোতে পারে না। জানালার ধরে টুলে বসে ঘন ঘন নস্যি নেয় যতক্ষণ না রাত ভোর হচ্ছে। মাঝে মাঝে গলা খাঁকারি দিয়ে সন্ধান নেয় 'আমি'টা খোলের মধ্যে ঠিকঠাক আছে কি না। এরা সব শুকনো আমি। খায় কম। জীবনে ভোগের চেয়ে দুর্ভোগ বেশি। চরিত্র, আদর্শ, ঈশ্বর, প্রেততত্ব এই সব নিয়ে মাথা ঘামায়। ইচ্ছে করে সিনেমায় যেতে চায় না। বউ জোর করে বগলদাবা করে ধরে নিয়ে যায়। বিয়েবাড়িতে লোকলৌকিকতা করতে যাওয়ার নাম শুনলেই এইসব 'আমি'দের মুখ ভার হয়, মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়। ইয়া খোঁপা করা, সিল্কের শাড়ি পরা, ক্ষয়াক্ষয়া চেহারার বউকে দাবড়ে ওঠে—মনে রেখো যাচ্ছ বিয়েবাড়িতে, কোনও খারাপ পাড়ায় নয়। বুঝেছ! খোঁপার ভেতর থেকে গোলাটা খুলে ফেলে দাও। ভালো করে মুখটা ধুয়ে এসো, খড়ি ফুটে আছে। ছাইপাঁশ না মেখে একটু সরসের তেল মেখে এসো। ভদ্রবাড়ির বউদের মতো দেখাক। পরেছ তো মেয়ের ব্লাউজ, পিঠ বেরিয়ে আছে। নিজের জামা নেই?
'আমি'র আক্রমণে 'তুমি' ফুঁসে উঠল। দু-হাত দিয়ে খোঁপার ধামাটা ঘাড়ের ওপর থেকে ঠেলে মাথার দিকে তুলতে তুলতে তুমি বলে উঠল—ওই যে জায়গায় নাম করলে সেই জায়গায় যাও বুঝি, তা না হলে জানলে কী করে, খোঁপা কেমন, মুখের পাউডার কীরকম। নিজের বউয়ের দিকে তো জীবনে তাকালে না, বাইরের ছেলেমেয়ে সামলাতেই মর্কট মেরে গেলে। মেয়েরা বিয়েবাড়িতে যাওয়ার আগে এই ভাবেই খোঁপা করে। মুখটা তেলতেল করে বলেই একটু পাউডার ঘষা। গরমে ঘাম শুকিয়ে একটু খড়িখড়ি দেখাবেই। আর, বড় ব্লাউজ ম্যানুফ্যাকচার হয় না আজকাল। কোথায় পাব তোমার পিসিমার আমলের ঘটিহাতা জামা।
'আমি' চিৎকার করে উঠল—ওপাড়ায় যেতে হয় না আমাকে। বাড়িটাই ওপাড়ার ওপর যায়। যেমন চাল, তেমনি চলন, তেমনি কথার ছিরি। দুটো জিনিস পাশাপাশি চলছে—সুরুচি, কুরুচি। নিলে নিলে কুরুচিটাই নিলে। আর হবে না, ছেলেবেলার বদশিক্ষা। ভদ্দরলোকের বউয়ের মতো সাজতে পারো যাব, না পারো এই বসল 'আমি'।
যেতে হবে না, এই রইল তোমার জিনিস। 'তুমি' ছুঁড়ে দিল শাড়ির প্যাকেট। ছিঁড়ে চিৎপটাং হয়ে মেঝেতে পড়ল ছাপা শাড়ি।
এই তো চেয়েছিল 'আমি'। নাক কেটে যাত্রাভঙ্গ। 'আমি'র ভালো লাগছে না 'তুমি'র লাগছে। 'আমি' চাইছে 'তুমি'র আত্মসমর্পন, 'তুমি' চাইছে 'আমি'র। যে 'আমি' ঝুঁকতে জানে, মানাতে জানে, যে 'তুমি' মানাতে পারে, ছাড়তে পারে, 'আমি' আর 'তুমি' সেখানে একরকমের গল্প। তা না হলেই সংঘাত।
নানারকম সবজি দিয়ে এক এক স্বাদের তরকারি। বিশ্বকটাহে উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ, তৃতীয় পুরুষ টপবগ করে ফুটছে। 'স্মোক নুইসেনস অফিসার' খুব বড় বাড়ির ছাদ থেকে চোখে দূরবিন লাগিয়ে চিমনি দিয়ে ওঠা ধোঁয়ার রং দেখে বলতে পারেন, কীসের ধোঁয়া, কতটা ক্ষতিকারক ধোয়া, কিংবা স্বাভাবিক ধোঁয়া। অনেক জ্যোতিষী আছেন, মানুষের চেহারা দেখে বুঝতে পারেন—শনির জাতক, শুক্রের জাতক, বুধের জাতক। সিংহের কি বৃষের কি মেষের চরিত্র। বাসের মাঝখানে বেশ দাঁড়িয়েছিলেন সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে। হঠাৎ ভূত দেখার মতো সরতে সরতে ঘাড়ে এসে পড়লেন। ব্যাপারটা কী! ওই যে দেখছেন না, গোঁফওলা, শনি প্রবল, পাশে দাঁড়ালেই ঝগড়া করবে, তাই হুড়ুম করে আপনার ঘাড়ে চাপলুম। আমি কে! বুধের মানুষ—ছেলে ছেলে, খোকা খোকা ভাব। আজীবন বুড়ো খোকা, বোকা। বোকা আপনি কে—আমি! চিনতে পারলেন না—রাহু। মুণ্ডু আছে ধর নেই। মুখ দিয়ে গলে গলা দিয়ে বেরিয়ে যাবেন।
গল্পের খোঁজে, চরিত্রের খোঁজে, চরিত্রের ভেতরে ঢুকতে হলে কী যে হতে হবে—ঈশ্বর কিংবা জ্যোতিষী, কিংবা তান্ত্রিক স্পাই অথবা সখা! মেয়েদের মতো দরজার বাইরে আড়ি পেতে দাঁড়াতে হবে, শুনি ওরা ভেতরে কী বলাবলি করছে। বদমাইশ হোটেলওলাদের মতো পার্টিশানে ফুটো করে অন্যের ঘর গেরস্থালির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। কী করতে হবে লেখকই জানেন। স্রষ্টা 'আমি' অজস্র 'সে' 'তুমি' 'তোমরা' 'তাহারা'র স্রোতে ভেসে চলেছে। সংঘাত, মিলন, আনন্দ, বেদনা, কিছু দেখা, কিছু অদেখা, সব মিলিয়েই 'তোমাকে' উপহার—আমাদের জীবন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন