সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

জিভ বের করুন—হুঁ।
ব্যা করুন—হুম। চশমা খুলুন, দেখি, চোখ দেখি। হুম।
চোখটা বেশ লাল হয়েছে। চুলকোয়। কড়কড় করে। ক্লোরোমাইসিটিন অ্যামিক্যাপ...
আমার কাছে বলে লাভ নেই। চোখের ডাক্তার দেখান। দেখি জামাটা তুলুন। না না, গেঞ্জি তোলার দরকার নেই।
নিশ্বাস। জোরে জোরে। পেছন।
হুম, ভেতরে চলুন।
সুইং দরজা ঠেলে ভেতরের ঘরে ঢুকেই বাঁ দিকে জানালা ঘেঁষে উঁচু বেঞ্চ। পলিথিনের চাদরে ঢাকা বিছানা। মাথার দিকে নিরেট বালিশ। উঠে শোওয়ার জন্যে পাইন কাঠের দুটো স্টেপ। সামনের দেওয়ালে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের বড় ছবি। তলায় লেখা, জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। তার তলায় ব্যায়রাম=ব্যয় করলেই আরাম।
নিন শুয়ে পড়ুন। দেখে, দেখে জানলার পাল্লা। বাবা, কত কী পরে বসে আছেন মশাই! করেছেন কী?—পেট খালি করুন, খালি করুন। লাগে? লাগে?
এই লিভারের কাছটায় যেন...
লিভার কি স্টমাক জানি না। যেখানটা টিপছি সেখানটায় লাগে কি না?
একটু যেন লাগছে।
হুম। উঠে পড়ুন। সাবধান, জানলা!
আমাকে সাবধান করে, ডক্টর চৌধুরী পুবদিকের দেওয়ালে ফিট করা ওয়াশবেসিনে হাত ধুতে গেলেন। ডক্টর নিরঞ্জন চৌধুরী, এম আর সি পি লন্ডন, এম ডি ক্যাল, ডি টি এম, এফ আর এস সি আই এফ, এফ ও বি, ডক্টর জনার্দন চৌধুরীর ছেলে।
নামব?
নাববেন না তো কী বসে থাকবেন।
ভয়ে ভয়ে নেমে পড়লুম। নামবার সময় পা লেগে কাঠের ধাপ দুটো সরে গিয়ে একটু টাল খেয়ে গেলুম। তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে ডাক্তার জিগ্যেস করলেন, প্রেসার আছে? মুখটা কাঁচুমাচু করে বললেন, অ্যাবনর্ম্যালি লো, নাইনটি, ফিফটি।
হুঁ। কী করে বুঝলেন, অ্যাবনর্ম্যাল? প্রেসারের কী বোঝেন? সাবনর্ম্যাল বা নর্ম্যালও হতে পারে। কথা বলতে বলতে আমরা বাইরে এসে বসেছি। নেপোলিয়ানের কত প্রেসার ছিল? রোমেলের, আইজেনহাওয়ারের, চার্চিলের? আমি বোকার মতো উত্তর না জানা ছাত্রের মতো তাকিয়ে রইলুম। ডাক্তার নীচু হয়ে প্রেসার মাপা যন্ত্র বের করতে করতে বললেন, সকলেরই প্রেসার লো ছিল। ওটাই ছিল ওঁদের নর্ম্যাল। আপনি নর্ম্যাল অ্যাবনর্ম্যালের কী বোঝেন! মাথা ঘোরে?
মাঝে মাঝে বোঁ করে ঘুরে যায়।
বোঁ করে কেন? বোঁ মানে কী? কথায় কথায় প্রত্যয় লাগানো অভ্যাস। ব্যাড হ্যাবিট। আপনার মাথা ঘোরে উইন্ডে মশাই, উইন্ডে। হাওয়ায় পৃথিবী ঘোরে। মোগলাই চলে? কাটলেট, ফিশ ফ্রাই? রক্তের চাপ মাপা যন্ত্রের ওঠানামা থেকে কী বুঝলেন তিনিই জানেন। ফ্যাস করে হাওয়া বের করে দিয়ে পটিটা খুলতে খুলতে বললেন, কে বলেছে নাইনটি, ফিফটি?
ডক্টর সাহা বলেছেন, আমার অফিসের ডাক্তার।
যন্ত্রটা ফেলে দিতে বলুন। ক'জন ডাক্তার প্রেসার দেখতে জানে? ক'জন ডাক্তার ফুসফুস পড়তে জানে? হার্টের মার্মার ধরতে পারে? আপনার প্রেসার হান্ড্রেড অ্যান্ড সিকসটি। লটবহর লম্বা বাক্সে পাট করে গুছিয়ে রাখলেন। প্রেসার যন্ত্র আমিও লক্ষ করে দেখছি। হাওয়ার চাপে পারার মাথাটা ঠেলে ওঠে। তারপর আবার হুস হুস করে নামতে থাকে। এই ওঠানামার প্রেমের তুফানে কোথায় যে আমার প্রেসার বসে আছে কে জানে! ডাক্তারবাবু একটা শ্লিপকাগজ টেনে নিয়ে জিগ্যেস করলেন, বয়স কত? দুটো বছর গায়েব করে বললুম, আটত্রিশ। পেনসিল দিয়ে হিসাব করতে করতে বললেন, নাইনটি প্লাস থার্টি এইট ইজ ইকোয়ালটু হান্ড্রেড টোয়েন্টি এইট। একশো আঠাশের জায়গায় একশো। কী এমন কম? একটু কম। মাসখানেক মুরগি, দুশ্চিন্তাহীন গভীর নিদ্রা, প্রচুর বিশ্রাম আর দু-চামচে করে দুবেলা টনিক, দেখি আঠাশ কোথায় যায়। এখন বলুন ট্রাবল কী কী? ফরগেট ইয়োর প্রেসার। ইগনোর ইয়োর প্রেসার। মনে করুন, আপনি নেপোলিয়ান, রোমেল কাইজার, উইলহেলম, সক্রেটিস সফোক্লিশ, বায়রন, নিদশে।
ডাক্তারবাবু লিখতে শুরু করলেন। নাম্বার ওয়ান, শীত শীত করে জ্বর। জ্বর আসার আগে পায়ের পাতা বরফের মতো ঠান্ডা। মর্নিং সিকনেস। টকাস করে পেনসিলটা ফেলে দিয়ে বললেন, তখন বলেননি কেন? তখন, যখন শুইয়ে ফেলে পেট টিপছিলুম। একটা কাজ একবারে হওয়ার উপায় নেই। রিপিটেড এফার্টস। একে কী বলে জানেন, নন কোঅপারেশন। এ শর্ট অফ ভায়োলেনস অন মাই কস্টলি টাইম। শুনুন, অসুখ যদি চেপে রাখতে চান রাখুন, আমি ওই ইনকমপ্লিট ডায়ানগসিসের উপরই চিকিৎসা করব। আর যদি কিওর চান, বি ফ্রি অ্যান্ড ফ্র্যাংক। পড়েননি, ডাক্তার রোগীর বন্ধু রোগ নিবারণে, ধর্মই সবার বন্ধু জীবনে মরণে।
ফ্র্যাংকলি বলছি ডাক্তারবাবু, গোপন করা বা নন-কোঅপারেশন বা ভায়োলেনস আমিও পছন্দ করি না।
আমি তখন পিনপয়েন্ট করে কুহুনাড়ির সংকোচনের কথা বিশদ করলুম।
ডাক্তারবাবু অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, রোগের সঙ্গে যোগের কী সম্পর্ক?
বা:, সম্পর্ক নেই! হটযোগ দীপিকা, পাতঞ্জল, এঁরা কী বলেছেন? এইবার আমার কোর্টে বল। বত্রিশ টাকার ডাক্তারকে এবার আমার গোল দেওয়ার পালা। এঁরা বলেছেন শরীরম আদ্যম। সুশ্রুত বলেছেন বিসর্গদান বিক্ষেপৈ: সোমসূর্যা নিলো যথা। ধারয়ীন্ত জগদ্দেহ্য কফপিত্তানিলস্তথা: অর্থাৎ সোমসূর্য অনিল অর্থাৎ বরুণ, অগ্নি ও বায়ু, এই ত্রিদেবতা যেমন বিশ্বসৃষ্টি এবং বিশ্বের রক্ষণ ও পোষণ করিতেছেন তেমনি আবার এই ত্রিদেবতাই দেহবিশ্বকে পালন ও পোষণ করিতেছেন। দেহস্থ এই ত্রিদেবতার নামই আয়ুর্বেদমতে...বায়ু, পিত্ত ও কফ। ডাক্তারবাবু পেনসিল নামিয়ে রেখে বেজার মুখে বললেন, তা হলে আপনার ট্রিটমেন্টটা সুশ্রুতকে দিয়েই করান। আমার ভ্যালুয়েবল টাইম আর নষ্ট করবেন না।
প্রথম শুরু তো হ্যানিম্যান সাহেবকে দিয়ে করেছিলুম। প্রথমে সালফার খেয়ে সিসটেমটাকে নিউট্রাল করে নিয়েই নাক্সভোমিকা ঝেড়েছিলুম। মেথডটা বড় শ্লো। ধৈর্য রইল না। তখন সুইচওভার করলুম কবিরাজিতে। অনুমানেই মেরে দিলে। নিমগাছের ডাল থেকে ঝোলা গোলঞ্চ কুলে খাড়া, খেত পাঁপড়া, জটামাংসী, দারুহরিদ্র, মহাজ্বালা তারপর মধু। সবেতেই মধু, ওঁ মধু। এর ওপর খলে মারা। সকালটা যদিও চলে, দুপুর আর সন্ধে! তখন তো অফিসে! তা ছাড়া ওই অরিষ্ট ডিফেকটিভ প্রেপারেশন। শিশিতেই ফাংগাস হয়ে যায়। অরিষ্ট খেয়েই সঙ্গে সঙ্গে শুক্রিম আর জুতো ঝাড়া বুরুশ দিয়ে শরীরের ত্বক পালিশ করতে হয়। তা না হলেই বর্ষাই ভেজা সাদা সাদা ছাতাধরা শালখুঁটির মতো চেহারা হয়। তখন সুইচওভার করলুম যোগে।
এইবার সুইচ অফ করে কাজের কথায় আসুন, বুঝতেই পেরেছি অনেক ঘাটের জল খেয়েছেন। ডাক্তারবাবু পেনসিল তুলে নিলেন। বিবাহিত? প্রশ্ন শুনেই বুঝেছি চরিত্রের ওপর ডাক্তারের কটাক্ষ। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলুম, না না সেসব নয়। তবে আমার দাদু বলেছিলেন ডায়াবিটিস কি না একবার আপনাকে দিয়ে চেকআপ করাতে।
বুঝেছি, যার যা অসুখ আছে সব আপনাকে ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। শুনে রাখুন, অসুখের কথা একমাত্র ডাক্তারকে বলবেন, যেমন ইষ্টদর্শনের কথা একমাত্র গুরুকেই বলতে হয়।
ডাক্তারবাবু রোগের ফর্দ ফেলে চুরুট ধরালেন। মোটা ডাক্তার, মোটা চুরুট, লম্বা পাইপ, বড় কর্তার রিভলভিং চেয়ার, থানার দারোগা, কোর্টের পেয়াদা, বাড়ির গৃহিনী, ধারদাতা মুদি, ইলেকট্রিক বিল, অফিস টাইমের বাস, বিয়ের চিঠি, শেষ মাসের আত্মীয়, বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ, ট্রানজিস্টার রেডিও, বাজারের দরদাম, কোনও কিছুকেই আমি আর ভয় পাই না। সবকিছুর ক্যামোফ্লেজ আমি ধরে ফেলেছি। সব মানুষের মধ্যেই জ্ঞান আছে, অজ্ঞানতা আছে, নীচতা আছে, উদারতা আছে, দয়া আছে, নিষ্ঠুরতা আছে, ছাঁকনি ছাঁকা মানুষ হয় কি? হয় না। অতএব ভরা মুখে মোটা চুরুটে আমার রোগের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালেই কি আমি সুস্থ হয়ে যাব! গাড়ি নিয়ে গ্যারেজে সার্ভিস এলে সব ডিফেক্টের কথা যেন বলতে হয়, তেমনি আমিও হার্ট, লাংস, কিডনি, ব্রেন, লিভার, স্টমাক সব জায়গায় বাঁদরামি হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো করে ভাঙব। ডাক্তারের চুরুট আমাকে দাবাতে পারবে না।
এক মুখ পোড়া গন্ধ ধোঁয়া ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি চালু করে দিলুম আমার কিডনি কাহিনি। কিডনিটা একটু নন-কোঅপারেশন করছিল। প্রথম দিলুম ব্যাটাকে যোগের কবলে। স্বামী যোগানন্দ অর্ধচন্দ্রাসনে রেখে দিলেন মাসখানেক। তারপর ধনুরাসন করতে গিয়ে এমন পারমানেন্টলি পেছন দিকে অর্জুনের গাণ্ডীবের মতো বেঁকে গেলুম যেন কুমড়োর ফালি বা নৌকো। সেই ধনুক থেকে আস্তে আস্তে সোজা হতে তিন মাস লাগল। তখন ধরলেন ডা: ঘোষাল।
কোন ঘোষাল? খালধারের ঘোষাল? কে ডি ঘোষাল? ডক্টর শার্ক? ধরলে ছাড়ে না সেই ঘোষাল?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ডক্টর শার্ক নয়, কচ্ছপ। মেঘ না ডাকলে কামড় ছাড়ে না। ঘোষালের ওপর রাগ দেখে চৌধুরীকে উসকে দিলুম। আমার ওপর সিমপ্যাথি বাড়বে। সেই ঘোষাল চোখ কান বুজিয়ে একগাদা ডকসি সাইক্লিন খাইয়ে দিলেন। এক ধাক্কায় ফিফটি সিকস রুপিজ। নো জোক। রেজাল্ট ড্রাগ রিঅ্যাকশন। হবেই তো হবেই তো। ডক্টরকে বেশ উৎফুল্ল দেখাল। আমার সর্বনাশে ওঁর যেন পৌষ মাস! পা নাচাতে নাচাতে বললেন, কম রুগী মেরেছে! নিজেকে মনে করে যেন ডাক্তার গুডিভ!
আমি ছাড়ি কেন? একটু টিপ্পুনি যোগ করে দিলুম, যদিও আপনাদের শাস্ত্র বলে, শতমারী ভবেৎ বৈদ্য: সহস্রমারী চিকিৎসক। ডক্টর ঘোষাল যদি হাজার কমপ্লিট করে থাকেন তাহলে এতদিনে চিকিৎসক হতে পেরেছেন।
ডক্টর ঘোষালের ডায়গনসিসটা একবার শুনি। ডক্টর চৌধুরী ঘোষালের কেরামতিটা জানতে চাইলেন।
ডক্টর ঘোষাল বললেন, তিনটে কারণ থাকতে পারে। এক স্টোন, দুই ক্যানসার তিন টি বি।
বা: বা: বা: বা:। ডক্টর চৌধুরী আনন্দে আটখানা। জীবনে এত আনন্দ মনে হয় তিনি কখনও পাননি। সোজা হয়ে বসে বললেন, এই না হলে ডাক্তার! মার্ডারার। আমাদের প্রাোফেশনের কলঙ্ক। দেখি আর একবার এদিকে আসুন তো। উঠে গিয়ে সামনে দাঁড়ালুম। দুটো আঙুল দিয়ে গলা আর কানের পাশটা বেশ রগড়ে রগড়ে দেখলেন। না:, কিছু নেই। টি বি অত সোজা নাকি। হলেই হল। আবার চেয়ারে ফিরে এলুম। ফের শুরু হল রোগের ফর্দ।
ভীষণ দুর্বলতা। বসতে পেলে শুতে চাই। ওজন ঝরঝর করে কমছে। বেলা তিনটের পর থেকে চোখ জ্বালা, জ্বর জ্বর, মাথাধরা, শীতশীত, হাই ওঠা, অ্যালার্জি। মাঝরাতে ব্রিদিং ট্রাবল। জিয়ার্ডিয়া ছিল। অ্যামিবায়সিস যোগ হয়েছে। অম্বল। লিভারের ব্যথা। স্নায়বিক দুর্বলতা। হাত-পা অবশ হয়ে আসে, কাঁপে। অকালে চুলে পাক ধরেছে। মেলাঙ্কোলিয়া। পা ঝুলিয়ে বসলে চেটো দুটো বিকেলের দিকে গোদা গোদা হয়ে ওঠে। এক সাইজ বড় জুতো কিনেছি, সকালে বাড়তি শুকতালা দিয়ে পরি। বিকেলে শুকতালা দুটোকে পকেটে পুরি। ডক্টর চৌধুরী কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এইটুকু শরীরে এত অসুখের ঐশ্বর্য খুব কম দেখেচি মাইরি, এ যেন সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক। ফর্দাফাই রুগী। পোস্টমর্টেমের টেবিল থেকে খালাস পাওয়া মাল। মুচি ডেকে সেলাই করাতে হবে। পেনসিলের পেছন দিয়ে ভুরুর কাছে টোকা মারতে মারতে বললেন, কী দিয়ে শুরু করব? বড় হোটেলের ফিফটি সিকস কোর্স লাঞ্চ শুরু করার আগের প্রশ্ন। দুর্বলতা দিয়ে স্টার্ট করুন। রোজ রিকশা আর মিনি বাসে দেউলে করে দেওয়ার জোগাড় করেছে। এক পা হাঁটলেই হার্ট—ও হ্যাঁ, হার্টটা একটু নোট করে নিন, মিনিটে একটা করে বিট মিস করছে।
নিভে যাওয়া চুরুটটা হাতে তুলে নিয়ে ডাক্তার বললেন, আমি বলি কী আপনি হসপিটালাইজড হয়ে যান। আমি লিখে দিচ্ছি। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। হসপিটাল! পাগল হয়েছেন, হাসপাতালে কোন দু:খে মরতে যাব। মরি যদি সেও ভালো, আমার নিজের খাটই ভালো। কাকাবাবুর দুর্দশা দেখিনি! তিন তারিখে বেডপ্যানে চেয়ে সাত তারিখে পেয়েছিলেন। তাও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে সাত পাতার করুণ আবেদন জানিয়ে। আর পারছি না স্যার। একবার ছ নম্বর বেডের ইনজেকশন তাকে দিয়ে দিয়েছিল। সেই ওষুধ আবার মুরগি দিয়ে 'সাক' করিয়ে বের করে আনতে হয়েছিল। ইছাপুর থেকে রোজা আনিয়ে ঝাড়ফুঁক করে সেই সাপের বিষ নামাতে হল। রোজ রাতে পেল্লায় পেল্লায় ইঁদুরের পেছনে সারা ওয়ার্ডে দৌড়ে বেড়াতেন। এই বিস্কুটের প্যাকেট কাঁধে নিয়ে পালাচ্ছে, কখনও কড়াপাক সন্দেশের বাক্স, কখনও পাউন্ড রুটি। একবার বালিশের তলা থেকে একশো টাকার দুটো নোট নিয়ে গুরুভোজন করেছিল। ছ জোড়া চটি চুরি হওয়ার পর সপ্তম জোড়াটা রাতে বালিশের তলায় নিয়ে ঘুমোতেন। আর বেশ বড়দরের রুগি এলে রোজই তাঁকে ধরাধরি করে বাথরুমের দরজার সামনে ফেলে দিয়ে আসত যতক্ষণ না সেই ভি আই পি পেসেন্ট বেড থেকে কেবিনে উঠছেন। তিনবার ডেথ লিস্টে নাম উঠেছিল। একবার আমরা মর্গ থেকে উদ্ধার করে এনে গরম চাটুতে সেঁকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলুম। সেই হাসপাতালে আপনি আমাকে পাঠাতে চাইছেন! ও আমার নিঠুর দরদী!
ডক্টর চৌধুরী বেশ বিপাকে পড়েছেন মনে হল। সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা। আমি কী করতে পারি! ডাক্তারের সঙ্গে লুকোচুরি চলে না। সব খোলাখুলি। মহিলারা পর্যন্ত নিষ্কৃতি পান না। চাকরিতে ঢোকার আগে মেডিকেল টেস্টের কথা আজও ভুলতে পেরেছি কি! পাঁচটা টাকা পকেটে ছিল না বলে বৃদ্ধ ডাক্তার লাইনে দাঁড় করিয়ে সকলের সামনে সেই তরুণ বয়সে পোস্ট বক্স খুলে—
তাহলে একটা টনিক লিখে দি। সপ্তাহ খানেক খেয়ে দেখুন। সঙ্গে একটা করে ভিটামিন ক্যাপসুল থাক। প্রেসক্রিপশনের প্যাড টেনে নিলেন ডাক্তারবাবু। টনিক আর ভিটামিন তো নিজেই নিজেকে করতে পারতুম। এর জন্যে বত্রিশ টাকা খরচের কী দরকার ছিল। এর সঙ্গে চার যোগ করলে এক সপ্তাহের রেশন। টনিক প্লাস ভিটামিন প্রেসক্রাইব এক মাসের পথ খরচ। আমার আপত্তিটা প্রকাশ করেই ফেললুম, রোগের কারণটা জিইয়ে রেখে ফুটো পাত্রে টনিক অর ভিটামিন ঢেলে লাভ কী?
তাহলে ডু ওয়ান থিং, কাল সকালে খালি পেটে চলে আসুন, ব্লাডটা নি, আর ফার্স্ট ইউরিন একশিশি, এক ফোঁটা স্টুলও নিয়ে আসবেন, টেস্ট করে প্রেসক্রিপশন করব। তার আগে নয়। আদালতে যেতে দিন পড়ল। উকিল আর ডাক্তার টাকার এপিঠ আর ওপিঠ। ব্লাড বের করে নিয়েই বেরোবে। আর ডাক্তাররা তো সাধারণত আমাদের মত পুওর পেশেন্টদের চোখে ড্রাকুলার মতো। সমস্যা দ্বিতীয় আর তৃতীয় বস্তু নিয়ে। ও দুটি বস্তু তো আমার আজ্ঞাবহ নয়। একমাত্র উপায় পুলিশের রুলের তলপেটে গুঁতো। ডাক্তার বললেন, 'টেস্ট ছাড়া নো ট্রিটমেন্ট। আমি ডক্টর চৌধুরী, নট ঘোষাল। ঘোষাল যা পারে আমি তা পারি না।
ডক্টর চৌধুরী ফি না নিয়ে প্রমাণ করলেন তিনি প্রকৃত ডাক্তার নন। ডক্টর শার্ক নন। আপনি তো আবার আসছেন তখন দেবেন। বাসে দশ টাকা দিয়ে কুড়ি পয়সা টিকিট কাটতে চাইবার অভিজ্ঞতা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ডক্টর চৌধুরীও উঠে দাঁড়িয়েছেন, বোধহয় গলাধাক্কা দেবেন। পেছু হটতে হটতে বেরিয়ে যাব কি না ভাবছি। চৌধুরী খুব বিনীতভাবে বললেন, আপনার তো যোগের সঙ্গে বেশ যোগাযোগ আছে। যোগে ড্রাগ অ্যাডিকশনের কোনও কিওর আছে?
হঠাৎ আমি রোগী থেকে ডাক্তার হয়ে গেলাম। যোগ, জ্যোতিষ, অর্থশাস্ত্র, চিকিৎসা-বিজ্ঞান, বস্তুবিজ্ঞান, যন্ত্রবিজ্ঞান প্রভৃতি জ্ঞান আমি ততটুকুই অধিকার করি, যতটুকু আমার নিজের জন্য প্রয়োজন। নিজে ড্রাগসের ড-ও জিভে ছুঁইয়ে দেখিনি। আমার অ্যাডভাইস চায়। ডাক্তারকে ভরসা দিয়ে বললুম, নিশ্চয় আছে। জেনে জানিয়ে যাব। ডাক্তার চোধুরী বললেন, মিউচ্যুয়াল কেমন? আমি ফ্রিতে আপনার চিকিৎসা করব। একটু দাঁড়ান। ড্রয়ার খুলে এক গাদা ফ্রি স্যাম্পল বের করলেন। ভিটামিন, অ্যান্টাসিড, ল্যাকজেটিভ এনজাইম টনিক। সব আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ওষুধ আপনাকে খুব কমই কিনতে হবে। তবে ওই টেস্টের জন্য যা লাগবে দিতে হবে। দেখি আপনার জন্যে কী করতে পারি। রেশনের চাল থেকে কাঁকড় বাছার ধৈর্যে আপনার ট্রিটমেন্ট করতে হবে।
পকেট-ভরতি ওষুধ, অভঙ্গ একটি নোট, ইনট্যাক্ট সমস্ত অসুখ নিয়ে আমিও কী করতে পারি বলে সুইং দরজা দুলিয়ে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়লুম। ব্যয়ও হল না আরামও জুটল না। শরীরের সমস্ত অসুখ পোড়ো বাড়ির মতো হো হো করে উঠল—ওই দ্যাখো বেটা যাচ্ছে। যাকে ডাক্তারেও ছোঁয় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন