সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

জীবনের মতো জিনিস নেই, এইরকম একটা কথা অষ্টপ্রহর আমাদের কানের কাছে নামতার মতো আওড়ানো হয়। আমাদের মগজে মগজ ধোলাইয়ের কায়দায় ঢোকাবার চেষ্টা করা হয়। বেঁচে থাকো। ভালোবাসো। নাচো, গাও, নৃত্য করো। পৃথিবী কী সুন্দর! আকাশ, বাতাস, নদী, সমুদ্র, বৃষ্টি, রোদ। যেন খোলা একটি কবিতার বই। সেই কবিতার বইয়ের পরতে পরতে রুপোলি পোকার মতো ঘুরে বেড়াও। দু:খ আবার কী। বেদনাই বা কাকে বলে। জীবন হল আনন্দের ফোয়ারা।
ব্যাস। বলে-টলে যে যার বোতল নিয়ে বসে পড়ল। কয়েক ডজন মুরগি বেঘোরে প্রাণ হারাল। খড়কে দিয়ে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে গাড়িতে গিয়ে বসল। ভোঁ-ভোঁ সভাগৃহ। আলো নির্বাপিত। শূন্য আসন। নীরব নীরব মাইক্রোফোন। ভোজসভার অন্ধকার টেবিলে নেমে এল গোটা দুই ধেড়ে ইঁদুর। ভুক্তাবশেষ নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া।
'হ্যাঁ মশাই, আনন্দ কাকে বলে?'
'কেন, খাও-দাও, ফূর্তি করো। গাড়ি করো, বাড়ি করো। ভুঁড়ি বাগাও। পার্টিতে যাও।'
'আর ভালোবাসা?'
'খুব সহজ ব্যাপার। একজন সুন্দরী রমণী চাই। কয়েক লাইন মিষ্টি কথা চাই। তারপর একটা সুকোমল বিছানা চাই। তারপর ব্যাপারটা সড়গড় হয়ে গেলে, ধরো আর ছাড়ো, ছাড়ো আর ধরো।'
'টাকা আসবে কোথা থেকে?'
'রোজগার করো।'
'কী ভাবে?'
'চাকরি করো।'
'চাকরি কোথায়?'
'ভালো করে লেখাপড়া করো।'
'পয়সা?'
'কেন, তোমার বাবা?'
'আমাদের যে হাঁড়ি চড়াবার সঙ্গতি ছিল না।'
'ও তোমরা হলে হ্যাভনটস—তাহলে তো ভাই মুশকিল। এ তো তোমার গিয়ে ইউরোপ আমেরিকা নয়। সেখানে হয় ফ্রম র্যাগস টু রিচেস। কিছুই ছিল না, ফুটপাত থেকে গিয়ে উঠল স্কাই স্ক্র্যাপারে, এ দেশের নিয়ম হল তেলা মাথায় তেল। সোনার চামচে মুখে জন্মাতে হবে। তারপর সবই খুব সহজ। সোনার চামচ যতই কমুক, রূপোর তলায় তো আর নামবে না।
'তাহলে আমরা কী করব?'
'কী আর করবে, ভাগ্যকে মেনে নেবে। ইতিহাস পড়বে। ইতিহাস দেখবেও। গণতন্ত্রই বলো আর শোষণ তন্ত্রই বলো, মানুষের দুটো জাত থাকবেই থাকবে। এক, যাদের অনেক থাকবে আর যাদের কিছুই থাকবে না। তা ছাড়া দয়া শব্দটাতো আর অভিধান থেকে মুছে ফেলা যায় না। দয়া, দান, অনুগ্রহ, কৃপা। কী সব সুন্দর সুন্দর শব্দ। মানুষের গুণবাচক। মানুষের দুটো জাত না থাকলে কে কাকে দয়া করবে ভাই। আমার অনেক থাকবে, তোমার কিছুই থাকবে না। তবেই না আমি তোমাকে দয়া করব। লোকে আমাকে দয়ালু বলবে। দাতা বলবে। আমার নামে পার্ক হবে। রাস্তার নাম হবে। হাসপাতাল হবে। ফাউন্ডেশন হবে। চৌমাথায় বিশাল মূর্তি বসবে। আমি ব্যাবসার ব্যাবসা করব।'
'ব্যাবসার ব্যাবসা জিনিসটা কি?'
'সে খুব মজার। মাল কিনলে, সামান্য বেশি দামে বেচে দিলে। এ হল প্রাচীন ব্যাবসা। আধুনিক ব্যাবসা হল, মাল লোপাট। তারপর আস্তে আস্তে ছাড়ো। ধীরে ধীরে। ব্যাবসার এখন বড় মূলধন হল, মানুষের বিপদ, মানুষের সংকট। চাহিদা বাড়াও সাপ্লাই কমাও। দাম বেড়ে গেল, ডবল তিন ডাবল, চার ডবল। এই তখন ওখানেও দয়া। শুধু ব্যাবসা নয়। মিয়া সাহেব দয়া করে একটি মাল ছাড়ুন। কি এক ফাইল হার্টের ওষুধ। মিয়া সাহেব ফিসফিস করে বললেন, দাম একটু বেশি পড়বে। তাও আপনি বলছেন বলে, আপনার জন্য আমি চেষ্টা করব। অন্য কেউ হলে না বলে দিতুম। ক্রেতা তখন দশগুণ দামে মাল নয় টিনভরা, প্যাকেট ভরা দয়া কিনে হাসি হাসি মুখে বাড়ি ফিরে গেলেন। যেন ওয়াটারলুর যুদ্ধ জয় করে এলেন। ব্যাবসা মানে জনসেবা নয়, গণদোহন। মানুষকে মানুষ ভাবলে চলবে না। ইতিহাসের কোথাও নেই, যে মানুষকে মানুষ ভাবা হয়েছে। যুদ্ধবাজরা মানুষকে ভেবেছে কামানের গোলা, রাজনীতিকরা ভেবেছে ব্যালট পেপার। ডিক্টেটররা ভেবেছে ছাগল। ব্যাবসাদাররা ভেবেছে গরু দুয়ে নাও। দুধ হল অর্থ। বিপদে ফেলো। ফেলে দুধ দুয়ে নাও। তারপর এ যুগের রাস্তা এক নম্বর নয়। দু'নম্বর। সব সরিয়ে দাও দু'নম্বর খাতায়। টাকার উপর টাকা তার উপর টাকা। টাকার পাহাড়। এইবার সেই টাকায় জমি কেনো, বাড়ি কেনো, নেতা কেনো, রাজনীতি কেনো, শিল্প কেনো, সাহিত্য কেনো। সংস্কৃতির রূপরেখা পালটাও। দেশটাকে খলখলে করে দাও।
তাহলে আমরা কী করব, রাস্তার ধারে পাতার ঘরে ছেঁড়া ত্যানা পরে বাজার কুড়োনো এনে হাঁড়িতে ফুটাব, আর যদি টু-পাইস চুরিচামারি করে জোটে তো, সব দু:খ হরা চুল্লু মেরে বউ পেটাব।'
তা ধরো গণতন্ত্রে সকলেরই সবকিছু করার স্বাধীনতা আছে। চোর চুরি করবে। খুনি খুন করবে। মজুতদার কালোবাজারি করবে। নেতারা জ্বালাময়ী ভাষণে ভুয়ো প্রতিশ্রুতি দেবে। যে, যে লাইনে আছে, সে সেই লাইনে আত্মবিসর্জন দিয়ে যাবে। মৃত্যু নয়, আত্মবিসর্জন। আমরা সবাই শহীদ। একটি কথা জেনে যাও ভাই সকলে। আগে ছিল বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। একালে শৃগাল ভোগ্যা। শৃগালের মতো ধূর্ত ও নিশাচর প্রাণী হও। এক নম্বর উপদেশ। দু'নম্বর উপদেশ, ঝোপ বুঝে মারো কোপ। এই তোমাদের জীবন দর্শন হবে, জীবন হল খেলা। ফুটবল খেলা। একাদশ খেলোয়াড়ে খেলবে। সবাইতো আর খেলোয়াড় হতে পারে না। আর সেটা উচিতও হবে না। তাহলে গ্যালারিতে হাজার হাজার দর্শক আসবে কোথা থেকে। খেলে বাইশ জন আর দেখে বাইশ হাজার। তারা চেল্লায়। তারা তালি মারে। তারা পায়ের চাপে পিষ্ট হয়। আরেকটি কথা ভুলো না, পথেই থাকো আর প্রাসাদেই থাকো, কান দুটোতো খোলা আছে। শুনতে পাও না নেতারা তোমাদের কি বলে সম্বোধন করেন—বন্ধুগণ। তা বন্ধুর মতো আচরণ কোরো। সমালোচনা কোরো না। রাগ কোরো না। হিংসা কোরো না। শরীর খারাপ হবে। তোমার সব প্রেমসে থাকো। প্রেম দিয়ে টেসে যাও।'
'প্রেম মানে কি জানো। প্রেম দিয়ে যাও, ভোট দিয়ে যাও। ভোট দিয়ে যাও, প্রেম দিয়ে যাও।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন