সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

চৈত্রের শেষ দিন। ট্যাট্যাং ট্যাট্যাং করে ঢাকে যেন সজনে ডাঁটার চাঁটি পড়ল। গেরুয়াপরা বাবার উপোসী চ্যালা আর চেলীরা বাবা তারকনাথের সেবায় লাগি বলে নেচে কুঁদে বছরটাকে ফুঁকে দিলেন। ছোট কল্কের চড়া টান। ভাঙা গালে আধপো কড়ুয়ার তেল ধরে যায় এমন গাব্বু। ওদিকে হুসহাস কলের গাড়ি প্যাঁকাপ্যাঁকিয়ে ছুটছে। গাড়ির ভেতর ফিতে গান বাজছে, জমানা বদল গিয়া। সুর্মা সুন্দরী রাজা সিগারেট টানছেন। পাশে ডেনিমপরা ঝুমকো চুলো ছেলে বন্ধু। বুকের কাছে ফোটো যন্ত্র! ওদিকে চড়ক গাছে গজাল গেঁথা ছোকরা দুলছে। মেলায় বিকোচ্ছে শহুরে গার্দা। কাঁকরিকাটা ঝকঝকে লোহার থালা, গেলাস, বাটি, ঘটি। প্লাস্টিকের গয়না। অম্বলের ওষুধ। ধনেশ পাখির তেল। বোম্বে ছবির নায়ক-নায়িকার রং করা ফোটো। এসেছে পাঁচালি। ছুরি, কাঁচি, বঁটি, কাটারি। চিনেবাদাম বালির কড়াতে হুড়োমুড়ি করছে। পাতলা রস গরম জিলিপির ওপর ধুলোর পোঁচড়া পড়ছে। যুবকরা সব গলায় রুমাল বেঁধে চোয়াড়ে গালে সস্তার সিগারেট ফুঁকছে আর আড়ে আড়ে ডাঁশা মেয়েদের দিকে তাকাচ্ছে! গাজনের মেয়েরা গাছতলায় এখানে ওখানে হেদিয়ে পড়েছে। হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে হাঁটু ছেতরে বসে আছে। বেওয়ারিশ বাচ্চারা নেচে নেচে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে এতে ওতে ঝটাপটি লাগলেই আধো মুখে কাঁচা খিস্তির খই ফুটছে! ঢাকিরা ডিঙি মেরে মেরে চ্যাড়াক চ্যাড়াক বোল ছাড়ছে। কারুর ঠোঁটে বিড়ি নাচছে। পাশের পানাপুকুরে কমলিরা গতর ঠান্ডা করছে। যা গরম পড়েছে বাপস। মা নেওটা ছেলে কোল ছাড়তে চাইছে না। বুকের চুষী খুঁজছে ঢুঁ মেরে মেরে। গোটা কতক বুড়ো হাবড়া ঘোলাটে চোখে ইতিউতি চাইছে। এখনও আশ মেটেনি। হাতে ছেলে বিউনি লাল তাগা বেঁধে নন্দ মিস্ত্রির গায়ে গতরে বউ চিমসে তেলে ভাজা কড়ায় তুলছে আর ফেলছে। পোদ্দার পাশে দাঁড়িয়ে মশকরা মারছে। মুফতে যা মেলে। চাপদাড়ি কলকাতার বাবু ক্যামেরার চোখে সংস্কৃতি খুঁজছে। কাগজে আর্টিকেল লিখবে। একটা গরুর এই মোচ্ছবে পেট আলগা হল। থ্যাসথেসিয়ে নেদে দিলে। আর ঠিক সেইসময় পরানমাঝির পোলা আগুনে ঝাঁপ খাচ্ছে। দাঁতের কালো মাজনের গুণ গাইছে ক্যানভাসার। যৌবন নেতিয়ে গেলে কী দাওয়াই খাবে হাঁকছে হাকিম। এরই মাঝে সূর্য পশ্চিম আকাশে পটকে গেল। টুপুস টুপুস আলো নেচে উঠল এপাশে ওপাশে। মন্দাকিনী যাত্রাপালার কনসার্ট এক রাউন্ড বেজে গেল। হেভি নাটক, পতির কোলে সতীর পুণ্য। মেয়ে মদ্দ সব মাঠ ভেঙে ওগো চলো গো, ওগো চলো গো, বলে পালের মতো তেড়ে আসছে।
বছর ঘুরে গেল কোথাও মালক্ষ্মী, কোথাও অলক্ষ্মী। কেউ ফুলে ফেঁপে কোঁদলা হল। কারুর গায়ে খড়ি। কেউ করে ধানের হিসেব, কেউ করে খড়ের হিসেব। শহুরে খেটে খাওয়া মাসকাবারি বাবুরা মায়ের ভক্ত। আবার ওদিকে যারা গদিতে গজকচ্ছপের মতো গড়াতে গড়াতে সারা জীবন কেবল ভাও কিতনা, ভাও কিতনা করছেন তাঁদের অবশ্য তারকেশ্বরে খুব মতি। সে আবার মজা মন্দ নয়। ছোকরারা শেঠের দেওয়া গেঞ্জি, প্যান্ট গতরে চড়িয়ে, কোমরে নতুন তোয়ালে জড়িয়ে কাঁধে বাঁক নিয়ে ছুটছে ভোলে বোম, তারক বোম, ঘণ্টা বাজছে ঝুমুর ঝুম। মন্দিরের কাছে একটা পয়েন্টে সব জড়ো হবে। শেঠ আসবে গাড়িতে সেখান থেকে বাঁকটি কাঁধে নিয়ে দু-পা হেঁটে বাবার সেরেস্তায়। দু-ঘড়া জল হুড়হুড় করে ঢেলে দিলে চমকানো চিৎকার ভোলে বোম, তারক বোম। সারা বছরের বাণিজ্য ছলকে উঠল।
আমাদের বাবা-মা দুগগা, মা কালী! মা আমার মন্দির আলো করে, বাবাকে পায়ের তলায় পেড়ে ফেলে বরাভয় দায়িনী। বছরের শুরুতে ওই মা-ই আমাদের গতি। মায়ের আমার কৃপার শেষ নেই। ওই মাথায় কলি-তীর্থ কালীঘাট আর এ মাথায় আমাদের রাসমণির ভবতারিণী। মাঝখানে পিলপিল করছে কয়েক কোটি পাপীতাপী। কোথাও শান্তি নেই মা। পেটে কিলোচ্ছে, পিঠে কিলোচ্ছে। ঘরে ঘরে গজকচ্ছপের লড়াই। কোথাও বাড়িওয়ালা দোতলা থেকে মাথার চাঁদিতে গরম ফ্যান ঢালছে। কোথাও ভাড়াটে ভাড়া চাইতে গেলেই কামড়াতে আসছে। কী করা যায় মা। জনতার জলকলে জলের লড়াই। তেলের লাইনে টিনের লড়াই! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভরতির লড়াই। হাসপাতালে যমে মানুষে নয়, ডাক্তার আর রাজনীতির লড়াই; শ্মশানে মাস্তান আর শবদাহকারীদের লড়াই। চাকরির জন্যে মুরুব্বি ধরার লড়াই। মা ভবতারিণী, তোর হাতের খাঁড়ায় কি ধার নেই মা। একটা লণ্ডভণ্ড লাগিয়ে দে মা।
পয়লা তারিখে মায়ের কাছে আর্জি জানাতে শয়ে শয়ে সন্তান এঁকেবেঁকে ছুটছে। কারুর পেটে আলসার কারুর কোমরে বাত। কারুর বাইপাস করা হার্টে আর তেমন পাম্প নেই। মা তো কারুর একার নয়, পাবলিকের মা। সেখানেও লম্বা লাইন। আগের রাতে ইট রেখে আগেভাগে ঢুপুস করে একটি পেন্নাম ঠুকে আসবে সেটি হওয়ার জো নেই।
টেবিল ঘড়িতে অ্যালার্মে দিয়ে রাখো। শেষ রাতে কানের কাছে কাঁসর বাজবে। তুড়ুং করে লাফিয়ে ওঠা। চটজলদি মেরে দাও এক কাপ চা। মায়ের দরবারে খালি পেটেই যাওয়া উচিত; তবে উষাকালে সূর্যোদয়ের আগে কয়েক চুমুক চা আগের দিনের অ্যাকাউন্টেই জমা পড়বে। শাস্ত্রকে আমরা অল্প একটু দুমড়েছি। আর সংবিধানই সহস্রবার সংশোধন হয়ে গেল, শাস্ত্রে কী দোষ। এরপর ট্রেন ধরার মতো মায়ের লাইন ধরতে ছোটো। কোন মাকে ধরব। কালীঘাট কি দক্ষিণেশ্বর। দুই মা-ই সমান জাগ্রত। ঠিক মতো ধরতে পারলে বছরটা সামলে যাবে।
কে জানত দাদারও দাদা আছে। যত আগেই যাই তিনশো জনের পেছনে লাইন। আজ্ঞে আমরা যে কাল থেকে লাইন মেরেছি। আমরা হলুম গিয়ে লাইন এক্সপার্ট। আমাদের ঐতিহ্যকে কি সহসা ম্লান করা যায়। আমরা ময়দানে খেলার টিকিটে লাইন দিয়ে লাইন পাকা হয়েছি। রেলের টিকিটে লাইন মেরে দুঁদে হয়েছি। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ধৈর্য অভ্যাস করেছি। লাইন আমরা ধরতে জানি, লাইন আমরা লাগাতে জানি।
ভাববেন না, মন্দির আর বিলিতি ব্যাংক এখন সমান। এফিসিয়েন্সি ক্রমশই বাড়ছে। মন্দির তো এখনও জাতীয়করণ করা হয়নি যে কর্মীরা হেলতে দুলতে আসবেন, গল্প করবেন, খবরের কাগজে পড়বেন, খেলা নিয়ে তক্কো করবেন আর কাস্টমার কাউন্টারে বাঁকা শ্যাম হয়ে ভুরু কোঁচকাবেন। মন্দিরে পুজো হয় টেলার সিস্টেমে। উপায় কী? পপুলেশন বাড়ছে, প্রবলেম বাড়ছে, ভণ্ডরা কাতারে কাতারে ছুটে আসছে। কতক্ষণ তারা চাতালে গড়াগড়ি যাবে! একের পর এক সার দাঁড়িয়ে আছে, হাতে পুজোর নৈবেদ্যর চ্যাঙারি। জবাফুলের কান লকলক করছে। তায় আবার ঝুমকো। এক পাঁজা ধূপ চিমনির মতো ধোঁয়া ছাড়ছে। মায়ের দরজার সামনে মানুষের পাঁচিল। হ্যাগা, মাকে যে একবার চোখের দ্যাখা দেখব, বচ্ছরকার প্রথম দিনে। অতই সোজা। অন্যের চোখে দেখুন। 'আপনি কি মাকে দেখলেন?'
'ওই কোনও রকমে একটু।'
'কী দেখলেন?'
'কপালের ত্রিনয়ন।'
'যাক তাহলে আমার দর্শন হল।'
দাঁড়াবার কি উপায় আছে। আমরা মানুষ না ষাঁড়। অনবরত গুঁতিয়ে চলেছে। একেবারে মাকো মাকো ব্যাপার। কে একজন জানিয়ে দিলেন, মা নয় নজর রাখুন পকেটের দিকে। বছরের প্রথম দিনেই গড়ের মাঠ না করে দেয়।
রোদ চড়ছে। টাক ফাটছে। ফল শুকোচ্ছে। ধূপ পুড়ে ছাই হচ্ছে। গিন্নির বড় দয়ার শরীর। কত্তার টাকে পাট করা তোয়ালে চাপিয়ে দিচ্ছেন। বেশ ফরসা মোটাসোটা হাত। বাগবাজারের কিরিকাটা শাঁখা মা জননীর হাতে কাপ হয়ে বসে গেছে। নোয়াতে সেপটিপিন দুলছে। বৈশাখের তরুণ রোদে ফিনফিনে চামড়ার অস্তর ফুঁড়ে লাল রঙের আভা গোলাপি মেরেছে।
জুতো রাখার জায়গায় তিন চার মণ জুতোর তাগাড় তৈরি হয়েছে। কোন বাবুর পাটি কার তলায় খুঁজে নিতে জান বেরিয়ে যাবে। বুদ্ধিমানেরা আবার কাঁধ-ব্যাগে চটি ভরে কাঁধেই ঝুলিয়ে রাখেন। অকুতোভয় নয়, অকুতোভয়ে 'মা মা' করেন। সারসার মিষ্টি আর ফুলের দোকানে পোঁ পোঁ মাছি উড়ছে। সাদা বাতাসের পিঠে কালো ডেও পিঁপড়ে ড্রিল চালাচ্ছে। মালিক বসে আছেন বটে, কর্মচারীরা চু-কিত কিত খেলছে বাইরে। ভক্ত দেখলেই তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে—ও দাদা, ও দিদি, ও মা, ও মাসি, ও জামাইবাবু এদিকে এদিকে। ফিরি জুতো।
দিদিমার বয়সি মহিলার হাত ধরে টানাটানি। বৃদ্ধা বলছেন আমোলো দুটো পয়সার জন্যে মুখপোড়ারা করছে দ্যাখো। রসিক ভদ্দরলোক জিগ্যেস করছেন, ফিরি জুতোটা কী বটে? এই পয়লা দিনেই জুতো পেটা করবে? টাটের টাট্টু আধহাত জিভ কেটে বললেন, বলেন কী স্যার? জুতো রাখার ফিরি ব্যবস্থা করেছি। বলুন মাকে 'ক সিকি চড়াবেন? পাঁচ সিকে না কুড়ি সিকে? জবা কি একশো আট! আরে গদা বাবুর গায়ে গঙ্গার জল ছিটো।
নাট মন্দিরে কালী কীর্তনের দল ধুম গান জুড়েছে—পাবি না ক্ষেপা মায়ের ক্ষ্যাপার মতো না ক্ষেপিয়ে। ওদিকে এক ক্ষেপা ঘণ্টার দড়ি ধরে প্রবল টানে দমকলের ঘণ্টি বাজাচ্ছে। ভক্তির আগুন লেগেছে। মা কি আর কালা হয়ে থাকতে পারেন?
গঙ্গা থেকে ভিজে কাপড়েই ভক্ত সোজা চলে এসেছেন মন্দির চাতালে। মা হা মা হা করে চিৎকার ছাড়ছেন। তারস্বরে মন্ত্র পড়ছেন সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে। মন্দিরে মায়ের ঘরে চারজন সেবায়েত গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পুজোর কুচকাওয়াজ চলেছে। চ্যাঙারি ডানদিক দিয়ে ঢুকছে হাতে হাতে নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে মায়ের পায়ে, হাফ হয়ে ফিরে আসছে বাঁদিক ঘুরে ভক্তের হাতে। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ে অর্ধচন্দ্র খেয়ে তিনি সিঁড়ি বেয়ে হড়হড়িয়ে নেমে আসছেন চাতালে। ব্যবসায়ীদের বগলে নতুন খেরোর খাতা বুকে মাটির গনেশ। ভুঁড়িটি ফুলিয়ে বুকপকেটের কাছে শুঁড় ঝুলিয়ে রেখেছেন। খাতার পুজোয় সারা বছরের কামাই ভালো হওয়ারই কথা। মা জগদম্বার কাছে এসেছেন বাবা গনেশ। ঠোঁটকাটা জিগ্যেস করছে, হ্যাঁ মশায়, এটা আপনার এক নম্বর খাতা না, দু-নম্বর। ভদ্রলোক মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। রাগা চলবে আজকের দিনে খিস্তি চলবে না। আজ যা করবে সারা বছর তাই করতে হবে।
ওদিকে জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে প্রেমিক হংস হংসী। গঙ্গার ফুরু বাতাসে ভাবের ঢেউ ছলকে উঠছে। এসব দৃশ্য আজকাল দেখেও দেখতে নেই। শুধু মনে মনে বলতে হয়—মা, আমার ঘরে প্রেমের তুফান ঢুকিও না। এ কেষ্টকলি বাইরেই দুলুক।
রাম ভক্তরা ছড়া ছড়া কলা নিয়ে হনুমান সেবায় হামলে পড়েছেন! এক ব্যাটা বীর হনু যুবতীর কমলালেবু শাড়ি খামচে ধরেছে। বাঁশীর সুরে তিনি চিৎকার তুলেছেন, জনতা মুফত মজায় তালি বাজাচ্ছে।
চায়ের আটচালায় কেলে কড়ায় টোপর টোপর সিঙ্গাড়া বাদামি হয়ে উঠছে। আরেকটা কড়ায় জিলিপি প্যাঁচ মারছে। ফেলে দেওয়া এঁটো ভাঁড়ের গাদায় ধুমসো কুকুর মড়মড়িয়ে খাবার খুঁজছে। প্রবীণ প্রবীণাকে সোহাগ করে বলছেন গরম জিলিপি আর দুটো নেবে নাকি? সিঙ্গাড়ার ঝালে নাকে জল এসে গেছে। মধুপক্কি রুমালে নাক মুছতে মুছতে বলছেন, নেবে নাও তবে অম্বল হবে।
ভিখিরিরা সার দিয়ে বসে আছে। নানা সুরে পয়সা সাধছে। মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি লেগে যাচ্ছে। এক সধবা ভেঙচি কেটে এক বিধবাকে বলছে—আ মর ডাইরি মাগি। কাকে এক ভদ্রলোকের পাঞ্জাবির পিঠে চুনকাম করে দিয়েছে। দর্শক বলছেন—বড় শুভ লক্ষণ।
সংসারী মহিলা কাপডিশ কিনছেন ঠুকে ঠুকে, ঠিং ঠিং মিঠে আওয়াজ। শিবঠাকুরের মূর্তি কিনছে একটি মেয়ে। শ্যামলা সধবার হাত মুচড়ে মুচড়ে কাঁচের চুড়ি পরাচ্ছে দোকানি। ঝাঁঝাঁ রোদ কাঁপছে গাছের নবঘন সবুজ পাতায়।
দুহাতে দুটো তরমুজ নিয়ে কর্তা বাড়ি ঢুকছেন। সন্ধের ঝোঁকে গোলাপ জল দিয়ে শরবত। দোকানের মাইকে হিন্দি গান। কানের পোকা বের করে ছেড়ে দিচ্ছে। আজ আবার হালখাতা। গয়নার দোকানের আয়নায় আলো ঝলমল। মুদির দোকানে খাতা খুলে বসে আছে মালিক। তলায় ক্যাশবাক্স। দশ কুড়ি যা পারো জমা দাও। ছোট্ট মিষ্টির বাক্স খুলে খুনখারাপি রঙের রসকদম্ব গেলো। আমপাতা আর শোলার কদমের মালা দুলছে। চটে বরফের চাঙড়া পুরে কাঠের মুগুর দিয়ে পেটাচ্ছে। চুরচুর শব্দ। মাঠা তোলা দুধের দই। সেই দইয়ের ছাড়াকাটা ঘোল। মাথায় না ঢেলে গলায় ঢালছে। আজ হালখাতা।
কলেজ স্ট্রিটের পাবলিশার পাড়ায় ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন জীবনরসের রসিক বাঘাবাঘা সাহিত্যিক। পথ পেরোতে মুখোমুখি দেখা। প্রশ্ন, কটা বেরুলো? কে বার করলে! বড় পাবলিশারের ঘরে চাঁদের হাটবাজার। হাতে হাতে ঠান্ডা জলের বোতল। ঠোঁটে ঠোঁটে পাইপ। প্রিয় লেখককে ছেঁকে ধরেছে ভক্ত পাঠক। সই চাই। শুভেচ্ছা চাই। আজকাল এইসব খুব হয়েছে। ঠোঙাতেই অটোগ্রাফ মারো। উড়ো উড়ো খবর আসছে! অমুক প্রকাশক আজ একটা রামকৃষ্ণ জীবনী ছেপে প্রকাশ করেছিলেন, পুলিশকে ক্রেতার ভিড় ঠেকাতে সকাল থেকে তিনবার লাঠি চালাতে হয়েছে। তমুক প্রকাশক আর একটা প্রেমের বই ছেপেছিলেন, তিন ঘণ্টায় প্রথম সংস্করণ খামচাখামচি করে নিয়ে গেছে। এইসব শুনে না বিকনো লেখকদের মুখে কালো ছায়া নামছে। একজন মুখ ভার করে বলছেন, আর ভাই সেই কথা—ধর্ম-অর্থ-কাম। এপাশে ধর্ম ওপাশে কাম মাঝখানে অর্থ। বুঝলেন না একালের এই হল স্যান্ডউইচ।
আজ আবার স্টুডিয়ো পাড়ায় নতুন বইয়ের মহরত হল। শুক্লা প্রাোডাকশনের সত্যবাদী পুলিশ। স্টোরি, দুর্ধর্ষ সেনাপতি। পরিচালক, চপলা চঞ্চলা। প্রযোজক, গজেন সাঁতরা। নায়িকা নবাগতা, মিস বেঙ্গল রানার্স আপ, ফুলকলি। স্টোরিতে আজকাল আদর্শ পুলিশ থাকলে পাবলিক খুব খাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বই হিট। বক্স অফিস ভেঙে টুকরো। ফ্লোরে নায়িকা প্যাঁজখোসা কাপড় পরে বক্ষ উন্মোচন করে দাঁড়িয়ে আছেন। ক্ল্যাপস্টিক ঠুকছেন। গজেন সাঁতরার গুরু, জটা বাবা। ফটাফট ছবি তুলছেন ক্যামেরাম্যান। লেখক দুর্ধর্ষকুমার পাকাপাকা কথা বলছেন। চিত্র সাংবাদিকের প্রশ্ন—গল্পটা মারা না ওরিজিন্যাল। চপলা চঞ্চলার জাত আর সেক্স কোনওটাই বোঝা যাচ্ছে না। বেশ টেনেছেন, তেমনি ঘেমেছেন, তবে অ্যাম্বিশন সাংঘাতিক। এই প্রথম বইতেই তিনি বেরিয়ে আসবেন ককটেল হয়ে। সত্যজিৎ, মৃণাল সেন, তপন, তরুণের পাঞ্চ। বাংলা ছবির জগতের শেষ কথা।
একটু বেশি রাতে, কর্তা লেটকে পড়েছেন চৌপায়ায়। বছরের প্রথম দিনটি খসে গেল। এইবার তার পোস্টমর্টেম। আগে ছিল পুজোয় নতুন জামা কাপড়, এখন নববর্ষেও সেই সব্বোনেশে রেওয়াজ চালু হয়েছে। কর্তা গুনগুন করছেন—হাসিমুখে ফাঁসি বরণ করছে বিপ্লবী ভ্যাদারাম। মা ষষ্ঠীর কৃপায় এ পুরুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। দেওয়ালে যৌথ পরিবারের পরলোকগত যাঁরা তাঁরা ছবি হয়ে ঝুলছেন। দেবদেবী আর তাঁরা সব মিলিয়ে গোটা চব্বিশ রজনিগন্ধার মালা পরেছেন। বড়য়-ছোটয় মিলিয়ে গড়ে প্রতি মালা পাঁচ। মেরে দিয়ে গেছে রে বাপ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন