সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

লাল মেঝের ওপর একটি চালের দানা পড়েছিল। কারও নজরে পড়ার কথা নয়! আমারও হয়তো পড়ত না। ছেলেবেলায় আমার প্রাচীনা মা আমাকে শিখিয়েছিলেন, বাবা চাল অতি পবিত্র জিনিস। অন্নই দেবতা। জীবের জীবন। অনাদর কোরো না। এক মুঠো ভাতের জন্যে এই সংসারে মানুষের কত ছোটাছুটি! মাথার ঘাম পায়ে ফেলা! কপাল দোষে হা ভাত, কপাল গুণে খা ভাত। মায়ের এই উপদেশ সংস্কারে চলে গেছে। চালের দানাটিকে অনাদরে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে মনে হল, মানুষের দেবতা ধূলায় লুটোচ্ছে। তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে হাতের তালুতে রাখলুম। এত ভালোভাবে একটি চালের দানা আমি আগে কখনও নিরীক্ষণ করেছিলুম কি না স্মরণে এল না! এ যেন অনবদ্য এক ক্ষুধার কবিতা। হিন্দি বলয়ে এক প্রবাদ অতি প্রচলিত—দানে দানে পে লিখা হুয়া হায় খানেবালেকা নাম। কার বরাতে দুমুঠো জুটবে, কার বরাতে জুটবে না। সে বরাতই জানে।
ছোট্ট একটি দানা। জমাট শিশিরের মতো রং। রূপসী ক্ষুধার নাকছাবির পাথর। ছেলেবেলায় আমার জেঠামশাই আমাকে পাশে শুইয়ে অনেক গল্প বলতেন। গল্প শুনতে শুনতে ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসত। তখন গল্প সব স্বপ্ন হয়ে যেত। এক চাঁদের আলোর রাতে তিনি আমাকে ধানের গল্প বলেছিলেন। শরৎ তখন হেমন্তে এসে মিশেছে। ফসলের মাঠে পাকা ধানের সুবাস। শুরু হবে ধান কাটা। আমনের আনন্দ বাতাসে। আকাশে হেমন্তের সেই চিরপরিচিত চাঁদটি। কোজাগর। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে যেটি লাফিয়ে আকাশে উঠে পড়ে কৃষককে লণ্ঠন দেখায়। 'আলো ধরে আছি। কেটে যাও ধান কেটে যাও।' কাটি ধান, কাটি ধান আয় রে! রবীন্দ্রনাথের সেই সোনার তরীটি ভরে দাও। বর্ষায় অবগাহনে থাকে ধান গাছ। তারপর জল নেমে গেলে টান ধরে মাটিতে। যেদিকে তাকাও শুধু সবুজ। সবুজের গালচে পাতা শ্যামল কোমল একটি গ্রাম। বর্ধনের বিস্ময়, সব গাছই এক মাপের। অদৃশ্য হাতে ছাঁটা অদ্ভুত এক কারিকুরি। সেই সবুজের গল্প। নরম কিন্তু খসখসে পাতার কোলে কোলে ধান শিশুর শিষ ফুটেছে। মধ্যরাতের আসমান থেকে নির্জন সেই শস্য ক্ষেত্রে নেমে আসছে অজস্র শিশিরবিন্দু, প্রতিটি ধান নিজেকে উন্মোচিত করে সেই শিশির বীর্য ধারণ করছে। গর্ভিনী ধান পৌষের প্রান্তে গোলাভরে দেবে ধানে। শুরু হবে পার্বণের মাস। নতুন ধান্যে হবে নবান্ন তোমার ভুবনে ভুবনে।
এমনি এক ধান কাটার মাঠে আমি দাঁড়িয়েছিলুম একদা। বলিষ্ঠ হাঁসুয়ার নির্দয় কিন্তু প্রয়োজনীয় আঘাতে মাঠ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। চতুর্দিকে কর্মঠ নরনারীর অসীম ব্যস্ততা। খড়ের টুকরো ইতস্তত ছড়িয়ে যাচ্ছে হাঁসুয়ার তীব্র আঘাতে। অদ্ভুত সুন্দর গন্ধে চতুষ্পার্শ্ব আমোদিত। মাটি আর নবীন ধান ও ওষধির মিলিত গন্ধ। সূর্য অস্ত গেলেন সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব দিগন্তে প্রকাশিত হল পূর্ণিমার চাঁদ। গোল একটি রুপোর থালা। একেবারে মাঠের কিনারায়। মনে হল হাত বাড়ালেই বুঝি স্পর্শ করা যাবে! রুপোর থালা পেতে চাঁদ যেন বলতে চাইছে, সোনার ধানে ভরে দাও আমার এই পাত্র। দেখতে দেখতে মাঠটি নিরাভরণ হয়ে এল। সব অলঙ্কার গুচ্ছে গুচ্ছে বাঁধা, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। বলিষ্ঠ মানুষগুলি ক্রমে ঘনীভূত ছায়ামানবে পরিণত হল। সারা মাঠে চাঁদ ছড়িয়ে দিল সরু সরু রূপোর পাত। কোথা থেকে উড়ে এল একজোড়া সাদা পেঁচা। ক্ষুন্নিবৃত্তির সেই সান্ধ্য উৎসবের স্মৃতি ভুলিনি।
পবিত্র চালের দানাটি কাঁচের ওপর রেখেছি। সুসিদ্ধ হলে ফুটে উঠবে কোমল আর এক রূপ। ক্ষুধা যেমন কঠিন এক সৌন্দর্য, তীব্র আগ্রাসী। নিবৃত্তি সেইরকম কোমল, স্নেহসিক্ত। চালের দানাটি আমার মায়ের নাকের নোলক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন