সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

তখন সকাল। স্থান কাশী। এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী দুর্গামন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন। হাঁটছেন তিনি। কাশীর গলি। অপরিসর। হঠাৎ নেমে এল একপাল বানর। তারা সন্ন্যাসীর পিছু নিয়েছে। সন্ন্যাসী ছুটছেন, বানরের পালও ছুটছে। এমন সময় এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী চিৎকার করে বললেন, 'থামো, থামো, ছুটো না রুখে দাঁড়াও। সন্ন্যাসী সাহসভরে ফিরে দাঁড়ালেন। বানররা প্রথমে থমকে দাঁড়াল, তারপর ছুটে পালাল।
স্বামী বিবেকানন্দ লিখছেন, এই ঘটনা আমাকে একটি মহৎ শিক্ষা দিয়ে গেল, রুখে দাঁড়াও। বিঘ্ন কিংবা বিপদ দেখে কখনও পালিও না। নির্ভয়ে মুখোমুখি দাঁড়াও। পরবর্তীকালে নিউইয়র্কে একটি বক্তৃতায় স্বামীজি এই ঘটনার উল্লেখ করে বলেছিলেন—'এই হল সারাজীবনের জন্য একটি শিক্ষা—ভয়ংকরের মুখোমুখি দাঁড়াও, সাহসের সঙ্গে তার সম্মুখীন হও।' Face the terrible, face it boldly. স্বামীজি বলছেন, Like the monkeys, the hardships of life fall back when we cease to flee before them. জীবনের প্রকৃত স্বাধীনতা যদি আমরা পেতে চাই, তাহলে প্রকৃতিকে জয় করতে হবে, ছুটে পালালে চলবে না। পালিয়ে তুমি যাবে কোথায় বৎস! দেহ ছেড়ে পালানো যায়! প্রাণ যে খাঁচার অধিবাসী। তাহলে প্রাণটাকে মেরে ফ্যালো, তার নাম আত্মহত্যা। পরাজয়। স্বামীজি বলছেন, cowards never win victories. লড়তে হবে ভয়ের সঙ্গে, সমস্যার সঙ্গে, অজ্ঞতার সঙ্গে, If we expect them to flee before us.
এ কথা ঠিক বেঁচে থাকার মতো কঠিন কাজ আর নেই। Life is difficult. একটা করে দিন যায় সমঝে দিয়ে যায় চব্বিশটা ঘণ্টা কোনওরকমে কাটল। জীবনের দিন থেকে ওয়ান মাইনাস হল। দেহের কলকবজা আরও একদিন পুরোনো হল। বিশ্রী, দগদগে ঝাঁঝাল সূর্যটা আবার উঠবে। খ্যা খ্যা করে কাক ডাকবে। মরচে ধরা গ্রিল ফুঁড়ে এক চিলতে রোদ ঢুকবে সংসারে। চারপাশ এলোমেলো। টেবিলে, চেয়ারে, মেঝেতে একপর্দা ধুলো। গুচ্ছের কাপড়, কাগজ, বাক্স-প্যাঁটরা। ধ্যোড়ধেড়ে গোটা কতক আলমারি। র্যাকে কিছু বই। একটার উপর আর একটা হেলে আছে। ধুলো মাখা জ্ঞানের থান ইট। কেউ পড়ে না। কখনই পড়বে না। ভাত কাপড়ের জোগাড় আর গাল-গল্প করতে গিয়েই সব শক্তি ফতুর। এই দৃশ্যেই প্লেটের গাড়ি চেপে চায়ের কাপ আসবে টাল খেতে খেতে। খানিকটা গরম জল। কদাকার স্বাদ। হয় চায়ের গুঁড়ো, না হয় একটা ছোট পিঁপড়ে ভাসবেই ভাসবে। যে হেতু স্বাস্থ্যের নিয়মে আছে খালি পেটে চা খেতে নেই। লিভার দরকচা মেরে যায়। কাপের কোনও একটা জায়গায় কড়কড়ে একটা কিছু লেগে থাকবেই। কী সেটা? প্রশ্নের সেই একই বাঁধাধরা উত্তর। আলু কাটতে কাটতে কাপ ধরেছি, অথবা আটার হাতে, অথবা কাজের মহিলা ফাঁকি মেরেছে। তাদের তো কিছু বলার উপায় নেই আজকাল। আমাদের পক্ষাঘাত, তাদের উৎপাত। না পোষালে জবাব দিয়ে দাও। সঙ্গে সঙ্গে বজ্রাঘাত।
বাঁচার দুশ্চিন্তার হতাশা, হতাশা থেকে মানসিক দুর্বলতা। উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় স্নায়ু বিকল। প্রেসার, সুগার, গলব্লাডার, হার্টের ব্যামো। ঘুম স্বপ্নে ভরা। সারা রাত এপাশ ওপাশ, ভোরের দিকে অজ্ঞান। সকালে দুর্বলতা। বিছানা ছাড়তে হয় জোর করে। তখন মনে হয় খাটের ধারেই অফিস, বাজার, দুধের ডিপোটা সরে আসে না কেন! হাত বাড়িয়ে পটল তুলব, পা বাড়িয়ে সেরেস্তায় ঢুকব।
সকলের মুখেই বিরক্তির ছাপ। কেউ কেন খলখল করে হাসে না! সব হাসি যাত্রায় চলে গেছে। গৃহিণী তেলে বেগুন ছাড়তে ছাড়তে মনে মনে বলছে, ধ্যাত তেরিকা। ছেলে পরীক্ষার পড়া করতে করতে বলছে, ধ্যাত তেরিকা। মেয়ে চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে বলছে, ধ্যাত তেরিকা। কাজের মেয়েটি মাছ কাটতে কাটতে বলছে, ধ্যাত তেরিকা। পিত্তি গলে গলে। মাছ হয়ে গেল করলা। মাছের ঝোল যেন সুক্তো।
এমন কেন হল? সেই একই স্ট্র্যাটেজিক উত্তর, 'খাও না, তেঁতো খাওয়া তো ভালো। পিত্তি কমে যাবে। তোমার তো পিত্তির ধাত।' কী পাওয়া গেল থিওরেম! মাছের পিত্তি চটকে গেলে মানুষের পিত্ত ভালো হয়।
ডালে যে নুন দিতে একেবারেই ভুলে গেছ?
একই উত্তর। বেশি নুন খেলে প্রেসার বাড়ে। প্রেসার বাড়লে রাগ হয়। রাগ বাড়লে ঝগড়া হয়। ঝগড়া হলে শত্রু বৃদ্ধি হয়। শত্রু বাড়লে বিপদের ভয় থাকে। বিপদ হলে চিন্তা বাড়ে। চিন্তা বাড়লে হজম কমে। হজম কমলে অম্বল হয়। অম্বল হলে চুল পাকে, গাল ভেঙে যায়, কাঠির মতো শরীর হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়, স্ত্রীকে সহ্য করতে পারে না, অনবরত গাল-মন্দ, অবশেষে কেরোসিন দেশলাই কাঠি। তারপর হাতে দড়ি, প্রেসিডেন্সি জেল, যাবজ্জীবন। অতএব বুঝেছ, নুনের কত গুণ!
কোনও জিনিস কেন খুঁজে পাওয়া যায় না, আলমারির চাবি, চেক বই, গেঞ্জি রুমাল, ঠিকানা, ফোন নম্বর?
এক উত্তর। আমি দশ মুণ্ডধারী মহিলা রাবণ নই, তোমার ব্যাংকের কমপিউটার নই। আছে। সবই আছে। একদিন না একদিন পাওয়া যাবে। বাড়ির জিনিস বাড়িতেই আছে। যাবে কোথায়। ডানা নেই যে উড়ে যাবে!
তা হলে?
ধৈর্য ধরো। অত উৎকণ্ঠা কীসের! টেনসান মানেই সেরিব্রাল অ্যাটাক। প্যারালিসিস, বিছানা। পর নির্ভর। ধৈর্য, সহ্য, এইসব বাড়াও, শুধু মেদ বাড়িয়ে লাভটা কী! যা পেলে তা পেলে, যা পেলে না, পেলে না। যখন কিছু পাবে না, স্রেফ মনে করবে তুমি মরে গেছ। মরে গেলে, শুধু চেক বই, জুতোর ফিতে, কাধ ছেঁড়া গেঞ্জি নয়, গোটা পৃথিবীটাই থাকবে না।
বুদ্ধদেব রাজার ছেলে। স্বয়ং তিনিই বলছেন, Life is suffering, জীবন একটা অসুখ। কাতরাতে, কাতরাতে, ঘোঁত করে ঢেঁকুর তুলে স্থির হয়ে পড়ে থাকা। লোক থাকলে পোড়াবে, না থাকলে পড়েই থাকবে। পড়ে পড়ে পচবে। নিজের গন্ধে নিজেই নাকে রুমাল চাপা দেবে। তোমার আত্মা যদি আবার ঢুকতে চায়, বাপ বলে পালাবে।
রাজার ছেলে গৌতম বুদ্ধ চারটি মহাসত্য আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন,
১।। The existence of sorrow. দু:খ সর্বত্র। তুমি আছ, তোমার দু:খও আছে। তুমি নেই, তোমার দু:খও নেই। কিন্তু দু:খ রয়ে গেল। যেই আবার আসবে ক্যাঁক করে ধরবে। জেল আর জেলার দুটোই রইল। তুমি মেয়াদ শেষ করে বেরোলে, আবার এসে ঢুকলে।
২।। The cause of sorrow. একটাই কারণ দেহ। জন্মালেই দু:খ, না জন্মালে কোনও দু:খ নেই। সমুদ্রে নামলে, ঢেউ, নোনা জল। না নামলে ফাসক্লাশ।
৩।। The cessation of sorrow. দু:খের নিবৃত্তি। বউ চিৎকার করে! মাকে লঙ্কা পোড়ার ধোঁয়া দেয়! রেগে গেলে লঘু-গুরু জ্ঞান থাকে না! বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দাও। যাবে না, কিছুতেই যাবে না। তাহলে তুমি শ্বশুর বাড়ি চলে যাও। দু:খের উৎসে যাও। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, ভূতকে যদি চিনতে পারো তাহলে আর ভূতের ভয় থাকে না। চোর চোর খেলায় যে বুড়ি ছুঁয়েছে তাকে তো আর চোর করা যাবে না। সব অশান্তির উৎপত্তিস্থল মানুষের অহং। কামনা, বাসনা। সংসারে ঢুকেছ, সহ্য তোমাকে করতেই হবে। সংসারে শান্তি, সংসারে মতের মিল, সংসারে বন্ধু ইত্যাদি অলৌকিক প্রাপ্তির আশা না করলেই দু:খের নিবৃত্তি। বুদ্ধদেব বলছেন, ও হে মানব পুত্র! When a tree is burning with fierce flames, how can the birds congregate therein? Truth cannot dwell where passion lives. দেহবৃক্ষটি কামনা বাসনার আগুনে জ্বলছে, তুমি কেমন করে আশা করো হে, যে সেই গাছের ডালে ডালে পাখি এসে বসবে, তোমাকে গান শোনাবে! সত্য আর কাম এক স্থানে থাকে কেমন?
৪।। The way which leads to the cessation of sorrow : বুদ্ধদেব দু:খ নিবৃত্তির অষ্টাঙ্গ মার্গ নির্দেশ করলেন, যেমন—যথার্থ বোধ, যথার্থ বিচার, যথার্থ উক্তি, যথার্থ কার্য, যথার্থ জীবিকা, যথার্থ উদ্যম, যথার্থ চিন্তা, যথার্থ ধ্যান।
কথার তরোয়াল দিয়ে পরস্পর পরস্পরকে কচুকাটা করা! স্ত্রী চায় স্বামী তার আদেশে কান ধরে ওঠবোস করবে। স্বামী চায় স্ত্রী তার কথায় ওঠবোস করবে। মা চাইবেন ছেলে আমার আঁচলের তলায় থাকবে। পিতা চাইবেন পুত্র চিরকাল তার বশে থাকবে। মালিক ভাববে কর্মচারী মানুষ নয়। কর্মচারী ভাববে মালিক মানুষ নয়। নেতা ভাববেন জনসাধারণ ভোট মাত্র। জনসাধারণ ভাববে নেতা মাত্রেই চোর। চতুর্দিকে মড় মড় করে ভেঙে পড়ার শব্দ। এরই মাঝে টিভির পর্দায় নায়িকা নাচছে আর গাইছে, নাচ মেরা বুলবুল।
এটা পালটাবে না, পালটাতে হবে নিজেকে। There never was, there never will be, nor is there now a person who is wholly blamed or wholly praised. একেবারে ভালো, একেবারে খারাপ এমন মানুষ কোনও কালে ছিল না, কোনও কালে থাকবেও না। সু আর কু-র মিকশ্চারই হল জগৎ। হিন্দি ছবির গান—আ ইয়া ইয়া করু ম্যায় কেয়া, সুকু সুকু। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, জটিল কুটিলে থাকবেই, তা না হলে লীলা পোষ্টাই হয় না। বুদ্ধদেব বলছেন, সত্য হল এই, পৃথিবীতে আলোও থাকবে অন্ধকারও থাকবে। অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়া যায়, আলো থেকে আরও আলোতে। আবার অন্ধকার থেকে আরও গভীর অন্ধকারে।
স্বামীজি বলছেন, Face the brutes. ভেতরে অহরহ দানবের আস্ফালন। ভয় দেখাচ্ছে অন্তর্শায়ী ভয়। সেই ভয়ের দিকে রুখে দাঁড়াও। একালের বিখ্যাত সাইক্রিয়াটিস্ট ডাক্তার পেক বলছেন—let us teach ourselves and our children the necessity for suffering and the value thereof, the need to face problems directly and to experience the pain involved. পলায়ন নয় সম্মুখ সমর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন